শৈলেন ঘোষ

অদ্ভুত নাম ছেলেটার—নাংচি। নামটা বিচ্ছিরি, না সুচ্ছিরি সে তোমরা ভেবো। এ ভাবনাটা নাংচির মাথায় ঢোকেনি কোনওদিন। বরং তার ভাবনা ওই দোলনাটা নিয়ে। ওই যে ঝুলছে মস্ত বাগানে। নাংচি জানে, এই মস্ত বাগানটা মহারাজের। আর, বাগানের পেছনে ওই যে বিরাট বাড়িটা, ওটা মহারাজের বাড়ি। মহারাজকে কোনওদিন দেখেনি নাংচি। তবে শুনেছে, মহারাজের এই বাগানে নাংচির মতো ছোট্ট যারা, তারা ওই দোলনায় চড়ে খেলা করলে কেউ বারণ করবে না। কিংবা বাগানের এগাছে-ওগাছে লুকিয়ে-ছাপিয়ে লুকোচুরি খেলা করলেও কেউ বাধা দেবে না। মহারাজের হুকুম। তাই তো, ওই দোলনায় কেমন দুলছে ওই ছোট্ট মেয়েটি! আর তার বন্ধুরা দোলনার পাশে তাকে ঘিরে কেমন খুশিতে উছলে উঠেছে! মুখভর্তি একরাশ হাসি তাদের। কখনও তালি দেয় তারা, কখনও নেচে ওঠে। নাংচি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্যাখে খালি। মনে মনে ভাবে, আহা রে, সেও যদি দোলনায় অমন করে দুলতে পারত।
হ্যাঁ, সবাই দুলতে পারলেও নাংচি পারে না। কেন না, তার গায়ে রং-ঝলমল জামা নেই। যেটা আছে সেটা ময়লা চিরকুট। পাদুটো খালি, ধুলোয় মাখামাখি। মাথার চুলগুলো উসকো-খুসকো। অথচ দোলনায় দুলন্ত ওই মেয়েটিকে দেখতে কী সুন্দর। ও যতই দুলছে মাথার চুলগুলি ততই কেমন ফুরফুর করে উড়ছে। যেন রেশম। মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে। জামার গায়ে কত ফুল, ছাপ ছাপ। ঝকমক করছে। ওর বন্ধুরাও কেমন রং-ঝলমল জামা পরেছে। পায়ে রঙিন জুতো। একে একে ওরা সবাই দোলনায় দুলবে, শুধু নাংচিই দূর থেকে দেখবে। কেউ ওকে ডেকে বলবে না, এসো, তুমিও দুলবে এসো। কেন না, নাংচি রাস্তার ছেলে। ওদের সবার ঘর আছে, মা আছেন, বাবা আছেন। কিন্তু নাংচির মা ছাড়া আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। এমনকী একটা থাকবার মতো ঘর পর্যন্ত নেই। কেন নেই, জানে না নাংচি। অথচ মা’র কত কষ্ট বলো এই খোলা আকাশের নীচে থাকতে। এখানেই বসা, এখানেই রান্নাবান্না, এখানেই রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকা। কালবোশেখি না হলে গরমটা তবু একরকম। বাকি সময় তো আকাশের মর্জির ওপরই থাকতে হয়। নাংচির কথাই ধরো, ও আকাশের মেঘ দেখলেই বুঝতে পারে ঝড় উঠবে, না বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি নামলে কষ্টের একশেষ। বেবাক ভেজো। বৃষ্টির মতো শীতটাও কম যায় নাকি। যদি তেমন তেমন শীত পড়ে, তবে আর রক্ষে নেই। শীতের সময় জামা বলতে নাংচির গায়ে এখন যা আছে। কিবা শীত, কিবা বর্ষা। এই জামার ওপরেই একটা হাঁসানো-ফাঁসানো কাঁথা জড়িয়ে শীতের রাতে ঘুমিয়ে কাটাও। কিন্তু মায়ের যে তাও নেই। মায়ের কষ্ট দেখলে কান্না পায় নাংচির। তাই নিজের এই ছেঁড়া কাঁথাটা মায়ের গায়ে আধাআধি জড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে নাংচি। কিন্তু ঘুম কি আর তেমন হয়। শীতের সময় দিনের বেলা তবুও যাহোক-তাহোক করে কেটে যায়। আকাশভর্তি রোদ। রোদের তাপ গায়ে মেখে ছুটোছুটি করতে ভারী মজা। কিন্তু গরমের দিনে সেই রোদই কী কষ্টের বলো! আচ্ছা বলো তো, ওই যে ছোট্ট-ছোট্ট ছেলেমেয়েরা দোলনার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে, লাফাচ্ছে, তালি দিচ্ছে, তাদের কোনও কষ্ট আছে?
না তাদের কষ্ট নেই।
তবে কেন নাংচির মায়ের এত কষ্ট? কেন কষ্ট নাংচির? ওরাই বা কেন অমন করে দোলনায় দুলবে, আর নাংচি দূর থেকেই তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? কেন ওই ছেলেমেয়ের দল ডাকে না নাংচিকে? কেন কেউ বলে না, এসো, আমাদের সঙ্গে দোলনায় দুলবে এসো? নাংচি রাস্তার ছেলে বলে কি তাই ডাকে না? হ্যাঁ, এটাই সত্যি কথা। এই সত্যি কথাটাই মায়ের মুখে শুনেছে নাংচি। শুনেছে বলেই মন তার গুমরে উঠেছে। গুমরে গুমরে মন বলছে, ওই যারা দোলনায় দুলছে, ওরাও যা নাংচিও তাই। নাংচিও দুলবে। ওদেরই মতো।
সেদিন এই কথা ভাবতে ভাবতেই নাংচি এগিয়ে গেছল এই দূর থেকে দোলনার দিকে। দাঁড়াল গিয়ে দোলনার সামনে। তারপর চিৎকার করে উঠল, “আমিও দোলনায় দুলব।”
চমকে উঠল সেই রং-ঝলমল পোশাক-পরা ছেলেমেয়ের দল। সবার দৃষ্টি নাংচির ওপর। নাংচি তখন হাঁফাচ্ছে। তার চোখদুটো দুরন্তপনায় ছটফট করছে।
দোলনায় দুলছিল যে মেয়েটি, সে থামল। দোলনায় বসে বসেই মুখ ঝামটা দিল, “কে তুই যে, তোকে দোলনায় দুলতে দেব? আবদার।”
“আমি কে, সে তোমাদের জানার দরকার নেই।”
ওরই মধ্যে একজন চেঁচিয়ে উঠল, “ছেলেটা রাস্তায় থাকে।”
নাংচি তেড়ে উঠল, “হ্যাঁ রাস্তায় থাকি, তাতে কীরে?”
একজন বলল, “ভিক্ষে করিস তো।”
“বেশ করি।” নাংচি কড়কে উঠল।
এমন সময় দলের একজন ঝট করে একটা পাথর তুলে ছুড়ে দিল নাংচির দিকে। খেঁকিয়ে উঠল, “বেরো এখান থেকে।”
গায়ে পাথরটা আচমকা পড়তেই নাংচি থমকে গেছে। উঃ! লেগেছে তার। নিমেষের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে নাংচি পাথরটা তুলে নিয়েছে। “তবে রে—” বলেই সে পাথরটা ছুড়বে বলে হাত তুলেছে। তাই না দেখে রং-ঝলমল পোশাক-পরা ছেলেমেয়েরা চিৎকার করে মারল ছুট। ছুটল নাংচিও তাদের পেছনে, তাড়া করে। কিন্তু ততক্ষণে তারা পগার-পার।

না, পাথরটা আর কোনও কাজে লাগবে না নাংচির। ফেলে দিল। ফিরে দাঁড়াল। এখান থেকেই তার দৃষ্টি পড়ল দোলনটার দিকে। একেবারে ফাঁকা। এখন আর দোলনায় দুলতে নাংচির কোনও বাধা নেই। তবুও সে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পেছনটা দেখে নিল। না, আর দেখা গেল না তাদের। ছুটে গেল নাংচি দোলনাটার দিকে। বসে পড়ল দোলনার ঝুলন্ত কাঠটার ওপর। লোহার শেকল দিয়ে বাঁধা। বসতেই দোলনা দুলে উঠল। শিউরে উঠল নাংচি। কিন্তু দুলতে দুলতে কেমন করে অনেকটা ওপরে উঠতে হয়, সে তো জানে না নাংচি। দুলতে দুলতে হুই-ই শূন্যে উঠতে না পারলে মজা কী! তবু সে চেষ্টা করে। বারবার চেষ্টা করে। পারে না। একটুখানি উঠছে, একদম এইটুকু। এতে কি মজা আছে? না, একটুও মজা পায় না নাংচি। ও যদি ওই ওপরদিকে শোঁ-ও-ও-ও করে উঠে যেত! তারপর...
আচ্ছা, দেখতে পাচ্ছ, সেই রং-ঝলমল পোশাক-পরা ছেলেমেয়েগুলোকে? ওই দ্যাখো, কেমন গাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে তারা নাংচিকে। আবার কোথা থেকে এল?
নাংচির অবশ্য দৃষ্টিই পড়েনি সেদিকে। পড়বে কেমন করে? সে তো দোলনা নিয়েই ব্যস্ত এখন।
ছেলেমেয়েগুলোর কী ধান্ধা বলো তো? নাংচির সঙ্গে কি বন্ধুত্ব করবে? নাকি একসঙ্গে দোলনায় দোল দোল খেলা করবে?
না, না, ওই দ্যাখো, ওরা সবাই আচমকা চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এল আড়াল থেকে। নাংচি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা সবাই মিলে ভীষণ জোরে ঠেলা দিল দোলনায়। দোলনাটা শূন্যে উঠে যেই গোত্তা মারল, নাংচি দোলনা থেকে ছিটকে পড়ল দশ হাত দূরে। ছি ছি, এ কী বদবুদ্ধি! নাংচির নিশ্চয়ই লেগেছে। ওই দ্যাখো, সে আর উঠতে পারছে না। পড়েই আছে। সাড়াশব্দ কিছুই তো নেই! ছেলেটা কি অজ্ঞান হয়ে গেল।
মনে হচ্ছে তা-ই।
নাংচিকে অমন করে পড়ে থাকতে দেখে ছেলেমেয়ের দল যে যেদিকে পারল পালাল। একটু পরেই অচেনা লোকের ভিড় জমে গেল। কেউ নাংচির মুখে জল দিল। কেউ নিজের রুমাল দিয়ে তার মাথায় হাওয়া করতে লাগল। কিন্তু তবুও নাংচির জ্ঞান ফিরল না। অগত্যা তাকে নিয়ে ছুটল সবাই। কোথায়? কে জানে! নিমেষে আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেল নাংচি।
অনেকক্ষণ পর নাংচির জ্ঞান ফিরেছিল। খানিক পরেই সে উঠে বসে খুঁজছিল মাকে। দেখতে পায়নি। দেখতে পেয়েছিল অন্য একজন অচেনা মানুষকে। লম্বা-চওড়া এক জবরদস্ত মানুষ। গায়ে তাঁর জোব্বা। পায়ে নাগরা। দেখলেই কেমন ভাল লেগে যায়। তিনি এতক্ষণ নাংচির দিকেই তাকিয়ে বসেছিলেন, একা, এই ঘরে। এ কোথায় এসেছে নাংচি! এমন সুন্দর এ কার ঘর! এ কোথায় বসে আছে নাংচি! খাটে! নরম তুলতুলে এ কার বিছানা! নাংচি থতমত খেয়ে গেল নিজের দিকে তাকিয়েও। তার গায়েই বা কোত্থেকে এল এমন একটা ঝকমকে জামা! কোথায় গেল তার নোংরা পাজামাটা! নিজেকে দেখতে দেখতে সে চোখ ফেরাল মানুষটির দিকে। তিনি মুচকি হাসলেন। নাংচি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাঁকে দেখতে লাগল।
তিনি বললেন, “উঠলি কেন? শুয়ে থাক।”
নাংচি খাট থেকে নামতে গেল। মানুষটি এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেললেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, “নামছিস কেন?”
নাংচি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “মায়ের কাছে যাব।”
“কোথায় থাকিস তোরা? কোথায় তোর মা আছেন?”
“এখন কোথায় আছে জানি না।” উত্তর দিল নাংচি।
“তোদের বাড়ি কোথায়?”
“আমাদের বাড়ি নেই।”
“তবে?” অবাক হলেন মানুষটি।
“আমরা রাস্তায় থাকি।” বলে আরও জোরে ফুঁপিয়ে উঠল নাংচি। ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বলল, “আমাকে যেতে দাও। মা আমাকে নিশ্চয়ই খুঁজছে।”
তিনি বললেন, “তোকে যেতে হবে না। আমি দেখছি।” বলে হাঁক দিলেন, “এই, বাইরে কে আছ?”
“হুজুর!” একজন প্রহরী ঢুকল।
তিনি বললেন, “এই ছেলেটির মা ছাড়া আর কেউ নেই। এদের কোনও ঘরবাড়ি নেই। রাস্তায় থাকে এরা। এর মাকে খুঁজে আনতে হবে।”
প্রহরী বলল, “আজ্ঞে রাস্তা তো অনেক। কোন রাস্তা না-বললে খুঁজে পাব কেমন করে!”
তিনি বললেন, “তবে তোমরা আছ কেন? সব রাস্তাই দেখে তাকে খুঁজে বার করে নিয়ে এসো। ছেলের জন্যে দ্যাখো, মা হয়তো হন্যে হয়ে ঘুরছেন।”
প্রহরী বেরিয়ে গেল।
প্রহরী বেরিয়ে গেলে তিনি এবার নাংচিকে বললেন, “যা পারিস না তা নিয়ে ওস্তাদি করতে যাস কেন? মাথাটা ফেটে যে চৌচির হয়ে যায়নি, এই রক্ষে। তোকে দেখলে তো মনে হয়, অনেকক্ষণ কিছুই খাসনি।”
এই কথা শুনে চমকে তাকাল নাংচি তাঁর মুখের দিকে। তাকাবার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ ছলছলিয়ে উঠল। গড়িয়ে পড়ল ক’-ফোঁটা কান্নার জল গাল বেয়ে। কথা বলতে তার স্বর যেন আটকে যায়। তবু সে অনেক কষ্টে বলে ফেলল, “মা আমার জন্যে খাবার আনে। আমি খাই। নিজে খায় না। আমি কান্নাকাটি করলে, মা তবে একটুখানি মুখে দেয়।” বলতে বলতে গলা কেঁপে উঠল নাংচির। এবার কান্নার জলে চোখদুটো তার উপচে পড়ে। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, “আমি কোনও দোষ করিনি। আমি দোলনায় দুলতে চেয়েছিলুম বলে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে আমাকে দোলনা থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল।”
“তবে যে সবাই বলছিল, তুই বাহাদুরি করে দুলতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছিস! এখন মিথ্যে কথা বলছিস আমাকে?” তিনি যেন রাগ করলেন।
নাংচির চোখদুটো একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
তিনি বলে উঠলেন, “আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী ভাবছিস অমন করে?”
নাংচি কুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, “মায়ের কথা ভাবছি। মা একদিন আমাকে বলেছিল, যাদের ঘর নেই, দোর নেই, যারা খেতে পায় না, পরতে পায় না, তারা সত্যি বললেও লোকে ভাবে মিথ্যে বলছে।”
তিনি থতমত খেয়ে গেলেন নাংচির কথা শুনে। পলকে তাঁর মুখের চেহারাটা কেমন যেন পালটে গেল। ছেলেটা যে মিথ্যে বলছে না, এটা বুঝতে তাঁর কষ্ট হল না। বুঝতে পারলেন, মায়ের কষ্ট ছেলেটাকে কষ্ট দেয়।
নাংচি বলে উঠল, “কই, আমার মা তো এখনও এল না?”
তিনি বললেন, “খুঁজে না পেলে এত তাড়াতাড়ি কেমন করে আসবে? আগে খুঁজে পাক।”
“তুমি আমাকে ছেড়ে দাও! আমি না খুঁজলে আমার মাকে কেউ খুঁজে পাবে না।” চোখের জল মুছতে মুছতে বলল নাংচি।
“তোর এখন যাওয়া চলবে না।” তিনি উত্তর দিলেন।
নাংচি জেদ ধরল, “না, আমি যাব।”
তিনি বললেন, “তুই অজ্ঞান হয়ে ছিলি অনেকক্ষণ। এই কিছুক্ষণ হল তোর জ্ঞান ফিরেছে। তোকে আরও খানিক শুয়ে থাকতে হবে।”
“না।” নাংচি ব্যস্ত হয়ে ঘরের দরজার দিকে তাকাল।
তিনি যেন এবার ছলনা করে একটুখানি বকে দিলেন, “আমি বলছি, তোর এখন যাওয়া চলবে না।”
নাংচি কান্নায় ভেঙে পড়ল।
তিনি ব্যস্ত হলেন। তিনি নাংচির মাথায় হাত রাখলেন। তার মাথার এলোমেলো চুলগুলি গোছাতে গোছাতে বললেন, “দুর বোকা, মায়ের জন্যে অমন করে কাঁদছিস কেন? তোর মা যেখানেই থাকুন, আমার লোকেরা ঠিক তাঁকে খুঁজে আনবে। তোর মা এলে, এই ঘরে থাকবেন তোর সঙ্গে। এই ঘরটা আমি তোকে আর তোর মাকে দেব। আর তোদের রাস্তায় থাকতে হবে না। বল, ঘরটা ভাল নয়?”
নাংচির কান্না থমকে গেল। সে অবাক হয়ে তাকাল সেই মানুষটির দিকে। কে মানুষটি? নাংচি কি স্বপ্ন দেখছে? শুনছে কি কোনও জাদুকরের মুখে আজব কোনও গল্প? অনেকক্ষণ কথা বলতে পারল না নাংচি। অনেকক্ষণ মায়ের মুখখানি ভাসতে লাগল তার চোখের ওপর।
অনেকক্ষণ তিনিও কথা বলতে পারেননি। অনেকক্ষণ তিনিও দেখছিলেন নাংচির স্বপ্ন-দেখা সেই মুখখানি। তাঁর ভাল লাগছিল। নাংচির মতো এমনই অসংখ্য খুদে বন্ধুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। তাই তো তিনি ওই মস্ত সবুজ বাগানটা ওদের জন্যে খুলে রেখেছেন। তিনি যে মহারাজ। এই মস্ত বাড়িটা যে তাঁরই।
মা আসেনি। সারাদিন খুঁজেছে মাকে মহারাজের লোকেরা। সারাদিন আকুল হয়ে পথ চেয়ে বসেছিল নাংচি। সারাদিন মহারাজ তাকে আগলে রেখেছিলেন নিজের কাছে। কখনও তিনি গল্প বলেছেন নাংচিকে। কখনও শুনতে চেয়েছেন গল্প, নাংচির মুখে। বলতে পারেনি নাংচি। অস্থির হয়েছে মায়ের জন্যে। কী করছে মা এখন? কোথায় আছে মা? কোথায় খুঁজে বেড়াচ্ছে নাংচিকে এধারে ওধারে, তোলপাড় করে? মাকে ফিরে না পেলে কী হবে এ ঘর? চাই না, চাই না ঘর। এই ঘরের চেয়ে মা যে নাংচির অনেক বড়।
দিনটা কেটে গেল এই ঘরে বসে বসে নাংচির। রাত এসেছিল নীল আকাশের রাজ্যে তারার আলো জ্বেলে। মহারাজ বলেছিলেন, “আজকের দিনটা কেটে গেল। যাকগে। কাল আলো ফুটলে আমি নিজে তোকে সঙ্গে নিয়ে তোর মাকে খুঁজে আনব। তারপর দেখিস, কী করি আমি। আজকে ঘুমিয়ে পড়!”
অনেক রাত্তির হয়ে গেছল তখন। ঘুম তো পাবেই ওই ছোট্ট নাংচির। অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে এই ঘরে নরম তুলতুলে বিছানায়। একা। কিন্তু আচমকা তার ঘুম ভেঙে গেছল। যেন তার মনে হল, কে যেন তার নাম ধরে ডাকল! ধড়ফড় করে উঠে পড়ল নাংচি। মনে হল, এ যেন মায়ের গলার স্বর। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল খোলা জানলাটার দিকে। চোখ মেলে সে চেয়ে দেখল বাইরেটা। অন্ধকার। এখন নিশ্চয়ই গভীর রাত। মাকে দেখতে পেল না নাংচি। ভীষণ ছটফট করে উঠল তার মন। নাংচির মনে হল, সে চেঁচিয়ে ডাক দেয়, মা-আ-আ-আ।
না, ডাক দিল না নাংচি। এই গভীর রাতে সক্কলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোতে দাও। সারাদিন তাকে আটকে থাকতে হয়েছে এই ঘরে। এক পা-ও তাকে বেরোতে দেননি মহারাজ। তাকে বন্দি থাকতে হয়েছিল। ঘর কি তবে মানুষকে বন্দি করেই রাখে। এখানে সবুজ মাঠ নেই। গাছ নেই। পাখি নেই। নেই নীল আকাশ। নাংচির হাঁফ ধরে যায় ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে। মনে মনে ভাবে, ঘরের চেয়ে আকাশ সুন্দর লাগে! বুকটা তার ছ্যাঁত করে কেঁপে উঠল মায়ের জন্যে। মনে হল, কতকাল যেন সে মাকে দেখেনি। এই সুযোগ তার। এবার সে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটবে। মায়ের কাছে যাবে।
সে সত্যি-সত্যিই ঘরের দরজা খুলে ফেলল। নিঃসাড়ে। সে সত্যি-সত্যিই ছুটল। ছুটতে ছুটতে মহারাজের মস্ত বাড়ির চত্বর পেরিয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেল, কেউ জানতেও পারল না। হয়তো খুঁজে পেয়েছিল নাংচি মাকে। হয়তো কোনও এক নদীর তীরে মায়ের সঙ্গে ভিজছিল নাংচি। বৃষ্টির জলে কোনও এক বর্ষায়। হয়তো কোনও এক জ্যোৎস্না-রাতে গল্প শুনছিল নাংচি মায়ের কাছে। নয়তো, কোনও হেমন্তের রোদে সবুজ ঘাসের ওপর বসে বসে পাকা ধানের গন্ধ শুঁকছিল নাংচি। সে ভারী মিষ্টি গন্ধ! দেওয়াল-ঘেরা বন্ধ ঘরে বন্দি থাকলে কি এ গন্ধ পাওয়া যায়? কক্ষনও না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন