সেতুপারের বন্ধুরা

শৈলেন ঘোষ

বাবা কাল প্রথম ‘আম’ বানানটা শিখেছেন। মা এখনও ‘অ, আ, ক, খ’ মুখস্থ করছেন। আম বানানটা বাবা শিখেছেন বটে কিন্তু এবছরে আমাদের গ্রামে যতগুলো আমগাছ আছে তার একটাতেও ভাল আম হয়নি। নদীর ওই পারে যে জঙ্গলটা দেখছ ওই জঙ্গলেও শুনেছি কোথাও কোথাও আমবাগান আছে। ওই নদীর ওপারের জঙ্গল থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে। একটা ঘণ্টার শব্দ। খুব অস্পষ্ট শুনি। আর আমার মন ওই অস্পষ্ট শব্দ শুনে ছুটে যেতে চায় ওই জঙ্গলটার দিকে। কিন্তু মধ্যিখানে নদী। আমি এখনও তেমন সাঁতার কাটতে পারি না। একেবারেই যে পারি না, তা নয়। কিন্তু নদীর ভীষণ স্রোতে সাঁতার কাটতে ভয় লাগে। তা না হলে হয়তো একদিন কাউকে কিছু না বলে আমি সাঁতার কেটে ওপারের ওই জঙ্গলে চলে যেতুম। আর খুঁজতুম ওই ঘণ্টাটা কে বাজায়।

অবিশ্যি একটা আনন্দের কথাও আছে। সেদিন দেখি ওই যেদিকে নদী, যেখানে অনেকখানি চর দেখা যায়, সেখানে অনেক ইট-পাথর, লোহালক্কড় ফেলা হয়েছে। আর একদিন দেখি কোট-প্যান্ট পরা ক’জন মানুষ চরের কাছে ঘুরছেন, ফিরছেন। নিজেদের মধ্যে কীসব আলোচনা করছেন। হাসছেন। ওই জঙ্গলের ওপারের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াইনি। কারণ আমি তখন ইস্কুলে যাচ্ছিলুম। ইস্কুলে গিয়ে আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে ওই সাহেবদের নিয়ে গল্প করলুম। আমরা যখন গল্প করছি। মাস্টারমশাই আমাদের দেখতে পেলেন। ধমক দিলেন। বললেন, “কথা বলছ কেন?” সবাই চুপ করে বসে পড়ল। আমি বসলুম না। মাস্টারমশাই বললেন, “স্বজন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

আমি তখন খুব নরম গলায় মাস্টারমশাইকে বললুম, “মাস্টারমশাই, আমাদের গ্রামে যেখানে নদীর চরটা অনেকখানি বড় ওখানে কয়েকজন সাহেব মানুষ এসেছেন। ওখানে অনেক ইটপাথর লোহালক্কড় পড়ে আছে। কেন পড়ে আছে, সেই নিয়েই আমরা বন্ধুরা কথা বলছিলুম।” মাস্টারমশাই রাগ করলেন না। আমাকে বকলেন না। মুচকি হাসলেন। বন্ধুরা হাসল। ক্লাসসুদ্ধু সবাই হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মাস্টারমশাইয়ের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বন্ধুরা আমার মুখের দিকে তাকাল। আমরা সবাই খুশিতে ঝলমল করে উঠলুম।

আমি কখনওসখনও মাকেও অক্ষর শেখাই। অবিশ্যি আমি নিজে থেকে অক্ষর শেখার কথা বলি না, মা-ই আমাকে ডাকেন। বর্ণপরিচয় বইটা আমার হাতে দিয়ে বলেন, ‘এই অক্ষরটাকে কী বলে রে?’ সেটা যদি ‘র’ হয় আমি তখন বলি, এটার নাম ‘র’। আর ক-খ-গ-ঘ তো তুমি তো জানো, এই ‘ঘ’-এর পরে যদি ‘র’ লেখ তা হলে হবে এই আমাদের ‘ঘর’। মা আমায় কাছে টেনে নেন। আদর করেন আর বলেন, ‘তুই এত শিখেছিস!’

মাকে তো হাজারটা কাজ করতে হয় সংসারের। কাজেই অক্ষর শিখতে মায়ের সময় লাগে বেশি। আর বাবা যদিও কাজ করেন মাঠে, তবু সময় পান বেশি। কাজেই বাবা অনেক শিখে ফেলেছেন। নিজের নাম তো সই করতেই পারেন, এমনকী ‘কষ্ট’ বানানটা পর্যন্ত জানেন। বাবার শিখতে অনেক সময় লাগল বটে, তবে শিখতে যতদিন সময় লাগল সেই শেখার ফাঁকে ফাঁকেই নদীর বুকে সেতু তোলার অনেকগুলো থাম বসে গেল। বাবা যখন গোপালের সেই মাসির কান কামড়ানোর গল্পটা শিখে ফেলেছেন ততদিনে সেতুও এপার-ওপার তৈরি হয়ে গিয়েছে। তখনও পর্যন্ত অবিশ্যি আমাদের সেতুর ওপর উঠতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু যেদিন নতুন সেতুর গায়ে নানান রং সাজিয়ে গ্রামসুদ্ধু মানুষকে নেমন্তন্ন করে একটা উৎসব করা হল, অনেক বড় বড় লোক বাইরে থেকে এলেন, সেইদিন আমরা প্রথম সেতুর ওপর উঠলুম। ওপর থেকে নীচের জল দেখি, নদীর স্রোত দেখি, নদীর জলে মাছের খেলা দেখি আর অনেক বকের আনাগোনা দেখি। সেদিন যেন মন ভরে গেল আমার। অবিশ্যি ততদিনে মা বর্ণপরিচয় অনেকখানি শিখে ফেলেছেন। মা তখন ‘কাকাতুয়া’ বানানটাও লিখতে পারেন। তবে একটা কথা সবাই বললেন যে হুট করে যেন ওপারে যেয়ো না। জঙ্গলটা অনেকটা কাটা হয়েছে বটে, কিন্তু রাস্তা এখনও তেমন তৈরি হয়নি। বড়দের এই নিষেধটা শুনে আমার ভীষণ মন ছটফট করতে লাগল। এবারে আমি সেতুর মাঝামাঝি গিয়ে কান পেতে শুনি ঘণ্টার শব্দ। এখন যেন আরও স্পষ্ট। আমি থাকতে পারি না। কিন্তু বড়দের কথা অমান্য করি কী করে? মাকে বললুম, “মা, সবাই ওপারে যেতে বারণ করে কেন?” মা বললেন, “আজকে বারণ করছেন রাস্তা হয়নি বলে। যেদিন রাস্তা হয়ে যাবে সেদিন সবাই যাবে। তুমিও যেয়ো তখন।”

বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু রাস্তা হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখি না। এমনকী ওদিক থেকে কাউকে আসতেও দেখি না। এদিক থেকেও তো কেউ যায় না। একদিন মন এত ছটফট করতে লাগল, আমি আর থাকতে পারলুম না। মনে হল মাকে বলি। কিন্তু মাকে বলতে পারলুম না। মনে হল বাবাকে বলি। তা পারলুম না। আমার ইস্কুলের বন্ধু রবিকে বললুম, “সেতু তো হল, কিন্তু সেতুর ওপরই শুধু পার খাচ্ছি। ওপারে তো যেতে পারছি না। যাবি একদিন?” রবি রাজি হল না। আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। এতদিন নদীর স্রোত দেখে ওপারে যাইনি। এখন নদীর ওপরে সেতু হয়েছে, তাও যাওয়া বারণ। আমি মানতে পারলুম না।

সময়টা ঠিক আমার মনে নেই। হয়তো তখন বসন্তকাল। সেই সময়ে একদিন আমি ইস্কুলে যাওয়ার নাম করে ইস্কুলে গেলুম না। কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি সেতু পেরিয়ে আমি ওপারে জঙ্গলে রওয়ানা দিলুম। এ যেন এক নতুন দেশ!নদীর এপারে যে এমন একটা সবুজ অরণ্য আছে, কে জানত! গাছে গাছে ফুল ফুটেছে, গাছে গাছে ফল। আমাদের ওদিকে যত পাখি তার চেয়ে আরও অনেক পাখি। উড়ছে, ডালে ডালে নাচছে। খেলা করছে। ডাকাডাকি করছে। আমার মন জুড়িয়ে গেল। আমি সেই ফুল আর পাখি দেখতে দেখতে জঙ্গলে ঢুকে পড়লুম। আমার একটুও ভয় করল না। কিন্তু তখন কোনও ঘণ্টার শব্দ ছিল না। তাই বুঝতে পারছি না, কোন দিকে গেলে ঘণ্টার শব্দ শুনব কিংবা কোনদিকে আছে সেই ঘণ্টা যা এখন বাজছে না। আনিমানি করে আমি খুঁজতে লাগলুম। ইতিউতি আমি ছুটতে লাগলুম। আর গাছের পাখিরা আমাকে দেখে হয় অবাক হল, নয়তো ভয় পেল। চারদিকে উড়তে লাগল। অন্তত সেই সময়টুকু ঘণ্টার শব্দ না-শুনলেও পাখিদের কলতান আমাকে কেমন বিভোর করে রাখল। অনেকখানি হাঁটলুম। যেখানেই যাই সেখানেই পাখি, সেখানেই গাছ। আমার পা ব্যথা হয়ে গেল। একটা মস্ত দেবদারু গাছ। কী পেল্লায় তার গুঁড়িটা! সেটা দেখে ভাবলুম ওর গায়ে গা ঠেকিয়ে একটু জিরিয়ে নিই। আর ঠিক যেই আমি বসব বসব করছি সেই ঘণ্টা বেজে উঠল। আমি শিউরে উঠলুম সেই শব্দ শুনে। এতদিন অস্পষ্ট শুনেছি। আজ কত স্পষ্ট! কী মিষ্টি! কী অদ্ভুত সেই শব্দের তরঙ্গ! আমি আর বসলুম না। ওই শব্দ শুনতে শুনতে আমি এগিয়ে গেলুম। মনে হল এখনও পর্যন্ত এখানে যতটা এসেছি আর তার খানিকটা গেলেই আমি বোধহয় সেই ঘণ্টা দেখতে পাব। এখন আর আমার ক্লান্তি নেই। এখন পা দ্রুত ছুটছে। আমি এগিয়ে চলেছি সেই ঘণ্টার শব্দ শুনতে শুনতে।

খানিকটা যেতেই আচমকা থেমে গেল ঘণ্টার শব্দ। কেন যে থামল জানি না। কিন্তু আমিও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। আশ্চর্য! ঘণ্টার রেশটা মিলিয়ে যেতে-না-যেতেই একটা মিষ্টি সুরেলা শব্দ ভেসে আসতে লাগল আমার কানে। সেটা যেন কোনও বাজনার। তারপরেই সেই বাজনার সুরে সুর মিলিয়ে শোনা গেল কে যেন গান গাইছে। আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম। এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে বাজনার সুরে কে গান গায়! কী গম্ভীর তার গলার স্বর! ভাবতে-না-ভাবতেই সেই গভীর গলার সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মনে হল আরও দুটি ছোট্ট ছেলের গলার স্বর। তারাও গান গাইছে। আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমি ওই গানের ঝংকার শুনতে শুনতে এগিয়ে চললুম জঙ্গলের আরও ভেতরে। হঠাৎ নজরে পড়ল অনেক গাছের আড়ালে যেন একটা মন্দিরের চুড়ো। আমি অবাক চোখে দেখতে লাগলুম চুড়োটা। দেখতে দেখতে ধীর পায়ে এগিয়ে চললুম। বাজনার শব্দ, গানের সুর, আর মন্দিরের মতো ওই চুড়ো এইসবই কেমন স্বপ্নের মতো মনে হল আমার কাছে। আমি থামলুম না। এগিয়েই চললুম। আরও বেশ খানিকটা এ-গাছের ও-গাছের এলোমেলো শিকড় ডিঙিয়ে, অনেক শুকনো ঝরাপাতার উপর শব্দ তুলতে তুলতে আমি যখন সেই মন্দিরটার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি, তখন আমার মনে হল এই সবুজ অরণ্যে কে যেন একটা শ্বেতপাথরের রাজপ্রাসাদ গড়ে রেখেছে। এই সুযোগে বলে রাখি, সেটি কিন্তু সত্যিই রাজপ্রাসাদ নয়। পরে আমি বাবার মুখে শুনেছি সেটি সাহেবদের গির্জা।

এর আগে আমি আর কখনও সাহেব দেখিনি। আমি যখন আরও খানিক এগিয়ে এসেছি সেই গির্জার কাছে, যখন শুকনো পাতা আমার পায়ের সঙ্গে ছোটাছুটি করছিল, তখনই হঠাই আমি সেই গির্জার এক মস্ত জানলা দেখতে পেলুম। এবার আমি স্পষ্ট বুঝলুম ওই জানলার ভেতর দিয়ে বাজনার সঙ্গে গানের সুর ভেসে আসছে। আমি এবার খুব ধীর পায়ে চুপিচুপি জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। উঁকি দিয়ে দেখব, কি দেখব-না এই ভাবনায় যখন আমি অস্থির হচ্ছি, তখন একটা মস্ত অর্জুন গাছে একটা পাখি এমন চিৎকার করে উঠল যে, আমি থমকে গেলুম। শুধু তা-ই নয়, সেই চিৎকারের শব্দে গানের সুরও আচমকা থেমে গেল। আমি চমকে গাছের দিকে তাকাতেই দেখি, একটা বাজপাখি একটা টিয়াপাখিকে ছোঁ মেরেছে। আর টিয়ার গলার শব্দটা যেন কান্নার মতো সারা বাগানটাকে কাঁপিয়ে তুলেছে। আমি যখন উপরদিকে তাকিয়ে আছি, তখনও পর্যন্ত বাজপাখিটা টিয়াটাকে নিয়ে উড়ে পালায়নি। তখনই হঠাৎ দুটো ছোট্ট ছেলে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল। এসে আমাকে দেখে কী যে বলল, আমি বুঝতে পারলুম না। আমি তাদের দেখে অবাক হয়ে গেলুম। কী চমৎকার টকটকে তাদের গায়ের রং। কেমন যেন মনভোলানো তাদের মুখের চেহারা! কী জ্বলজ্বলে তাদের দৃষ্টি! তাদের দেখে আমার ভয় লাগল না, কিন্তু ভীষণ লজ্জা করল। কারণ আমার চেহারা, আমার গায়ের পোশাক—দুটোই কী বিচ্ছিরি তাদের পোশাকের কাছে। একেবারেই আমি বেমানান। তাই লজ্জায় আমি ছুটে পালালুম সেখান থেকে। আমার দেখা হল না টিয়াপাখিকে বাজপাখিটা ঠুকরে খেয়ে ফেলল কি না।

আমি যখন ছুটছি, সেই ছেলেদুটিও আমার পেছনে ছুটে আসছে। তাদের হাঁক শুনে আমার মনে হল, তারা আমাকে থামতে বলছে। কিন্তু আমি থামলুম না। ছুটতে ছুটতে সেতুর একেবারে মধ্যিখানে চলে এলুম। সেখানে দাঁড়িয়ে খানিকটা দম নিলুম। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে সেতুর নীচে এসে বাড়ির দিকে পা বাড়ালুম। বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন। মা তখন রান্না করছিলেন। বাবা-ই আমাকে দেখতে পেলেন প্রথমে। আমার ওইরকম এলোমেলো হয়ে যাওয়া মাথার চুল, ভয়ে আড়ষ্ট চোখের দৃষ্টি, আর বুকের নিশ্বাসের শব্দ শুনে বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, কী হল?”

আমি বাবার হাত ধরে বাবাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেলুম। গিয়ে সমস্ত ঘটনা বাবাকে বলতেই বাবা মুচকি হাসলেন, আর তখনই আমাকে বললেন, “ওটা মন্দির নয়, ওটা গির্জা।”

পরদিন স্কুলে গিয়ে আমি আমার বন্ধু রবিকে সব কথা বললুম। রবি শুনল। শুনে বলল, “তোর সঙ্গে আমিও একদিন যাব।” আমি রবিকে বললুম, “তা হলে চ, কালই যাই।” রবি রাজি হল।

কাল মানে সেদিনটা শনিবার। আমার ইস্কুলের হাফ-ডে। আমি ইস্কুলে যাওয়ার সময় বাবাকে বললুম, মাকেও বললুম, ‘আমি আর রবি আজ ওই গির্জা দেখতে যাব।’ বাবা যেমন মুচকি হাসেন তেমনি হাসলেন। মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বলছ, যাবে?’ বাবা ঘাড় নাড়লেন মানে—যাক না।

তো, সেদিন ইস্কুল ছুটির পর আমরা দু’জন সেতু পেরিয়ে গির্জা দেখতে গেলুম। গায়ে যত রোদ লাগছে তার বেশি ছায়াও লাগছে। ছায়া আর রোদের সঙ্গে খেলা করতে করতে আমরা গির্জার কাছে গিয়ে পৌঁছলুম। একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলুম। তখন কিন্তু গানও নেই, কোনও শব্দ নেই। ওই কিছুক্ষণ আগে ঘণ্টার শব্দ সেই যা শেষ শোনা। এবারে সেই নিস্তব্ধ দুপুরবেলায় আমি আর রবি লুকোচুরি খেলার মতন গাছের এফাঁকে ওফাঁকে চোখ রেখে খুঁজতে লাগলুম সেই ছেলেদুটিকে। কিন্তু তাদের দেখতে পেলুম না। দেখতে পেলুম একজন মানুষকে যাঁর গায়ে ধপধপে সাদা পোশাক। পা অবধি নেমে এসেছে। এরকম পোশাক আমি আগে কাউকে পরতে দেখিনি। তিনি এই দুপুররোদেই সেই গির্জার চারদিকে সাজানো যে বাগান, সেই বাগানে ঘুরে ঘুরে ফুলগাছের শুকনো পাতাগুলো টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন। আর এমন করতে করতে আমরা যেখানে লুকিয়েছিলুম সেখানে চলে এসেছেন। আমরা পালাব, কি পালাব-না ভাবছি, অমনি তিনি আমাদের দেখে ফেললেন। দেখে ফেলেই তিনি ‘হেই’ করে কী যে বললেন, আমরা বুঝলুম না। ‘হেই’ করতেই ছুট দিলুম। তিনি রবিকে ধরে ফেললেন। রবি কেঁদে ফেলল। আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। রবি বিপদে পড়েছে। এখন রবিকে ফেলে আমার পালানোটা কি ঠিক? আমি তাই এগিয়ে গেলুম সেই সাদা ধপধপে পোশাক-পরা মানুষটির দিকে। গিয়ে রবির কাঁধে হাত দিলুম। তাঁর কথা বলার শব্দগুলো ঠিকঠিক বুঝতে না-পারলেও এটা বুঝতে পারলুম, তিনি রবিকে কাঁদতে বারণ করছেন। রবি তবু কাঁদছে। তিনি নিজের হাতে রবির চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। আমার এত ভাল লাগল, আমি রবিকে জড়িয়ে ধরলুম। দু’জনে একসঙ্গে তাঁর পায়ের কাছে মাথা হেঁট করলুম। তিনি আমাদের তুলে ধরলেন। কপালে চুমু খেলেন। আর সেই চুমুর স্পর্শে আমার চোখ ছলছল করল। মনে হল মানুষটি কী ভাল! আমার যখন চোখ ছলছল করছে, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রবিরও চোখ ছলছল করছে। আমরা তখন দু’জনে দু’জনার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছি। ইস্কুলের বইগুলো তখন আমাদের সঙ্গেই ছিল ব্যাগের মধ্যে। তিনি আমাদের দু’জনের কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে নিলেন। নিজের হাতে ব্যাগ দুটি নিয়ে আমাদের দুজনকে একসঙ্গে গির্জার ভেতর নিয়ে গেলেন। গির্জার ভেতরটা কী শান্ত! কী পরিচ্ছন্ন! কী অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা! হঠাৎ নজরে পড়ল একটি মানুষের দিকে। অনেক বড় একটি ছবির মানুষ। দু’দিকে দুটো হাত ছড়িয়ে রয়েছে। মাথাটি এক দিকে হেলে পড়েছে। পাদুটি যেন মাটি ছোঁয়ার জন্য আকুলিবিকুলি করছে। মনে হল, কে যেন পেরেক ঠুকেঠুকে তাঁকে শাস্তি দিয়েছে। সেই সাদা পোশাক-পরা মানুষটি মুখে এবারে যে শব্দ করলেন সেই শব্দ আমি বহুবার শুনেছি। ইস্কুলের বইয়েও পড়েছি। মনে পড়ল এ-ছবির মানুষটি আমার চেনা। এ-ছবির মানুষটির নাম বাবা-ই প্রথম বলেছিলেন—যিশু খ্রিস্ট। তাঁর গল্প আমি শুনেছি। তোমরা অনেকেই তা জানো। সে গল্প থাক। এখন আসল গল্প।

সেই যে ছোট্ট ছেলেদুটিকে দেখে আমি পালিয়েছিলুম, হঠাৎ দেখি তারা যেন কোন এক অদৃশ্য জায়গা থেকে চলে এসেছে আমাদের কাছে। রবি আর আমি অবাক হয়ে তাদের দু’জনকে দেখতে লাগলুম। ওরা হাসছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। সেই সাদা পোশাকপরা মানুষটিকে কী যেন বলছে। তারপর ওরা দু’জন আমার আর রবির হাত ধরে গির্জার ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে গেল। তারা ছুটতে লাগল আর চেঁচাতে লাগল। আমার মনে হল, ওরা আমাদের সঙ্গে খেলতে চাইছে। কী জানি কেন, সেই সাদা পোশাকের মানুষ হাত দিয়ে এমন করে ইশারা করলেন, যেন আমাদের বললেন, যাও খেলা করো। আমরা তখন ছোটাছুটি করে খেলতে লাগলুম চারজনে। তখন আমাদের আর মনেই হল না আমার আর রবির পোশাক এইরকম। মনে হল না, আমাদের রং কালো, ওরা অমন ধপধপে ফরসা। মনে হল না, আমরা যে-ভাষায় কথা বলি সে-ভাষায় ওরা কথা বলে না। আমরা হাসছি। চিৎকার করে হাসছি খেলতে খেলতে। ওরাও হাসছে। সেই হাসি যেন আমার কথা, রবির কথা আর আমাদের ওই দু’জন নতুন বন্ধুর কথা এক হয়ে সারা বাগানটা তোলপাড় করতে লাগল। আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

শুনতে ভারী আশ্চর্য লাগছে তাই না? রবির সঙ্গে আর আমার সঙ্গে সেই দুই অপরিচিত ছোট্ট দুটি ছেলের ভোজবাজির মতো হঠাৎ কেমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল! সত্যিই তাই। সেই দিন থেকে রোজ সেতু পেরিয়ে আমি আর রবি সেই ছোট্ট দুই বন্ধুর সঙ্গে খেলা করছি, হাসছি, গান গাইছি। হ্যাঁ, এবার তোমাদের সেই গানের কথাই বলি।

আমি একদম গান গাইতে পারি না। তবু রবি গুনগুন করে দু’-একটা লাইন গাইতে পারে। কিন্তু আমি তাও পারি না। একদিন আমরা যখন সেই গির্জায় হাজির হয়েছি, সেদিন তখনও রোদ আকাশে ঝলসাচ্ছে। আমাদের সেই নতুন বন্ধু ছেলেদুটি আর সেই সাদা পোশাকপরা মানুষটি একসঙ্গে গান গাইছেন। এর আগেও গান শুনেছি। তবে সে গির্জার বাইরের জানলায় কান পেতে। কিন্তু আজ গির্জার ভেতর ঢুকে তাদের গলায় যে গান শুনলুম, সে যেন আরও চমৎকার। আরও অদ্ভুত। রবিকে আমি কানে কানে ফিসফিস করে বললুম, “তুইও গানটা শিখেনে না। তুই যদি শিখে নিতে পারিস তা হলে আমিও পরে শিখে নেব তোর কাছে। তারপর একদিন আমরাও এই গির্জার মধ্যে গেয়ে উঠব এই গান। সেদিন কী মজা হবে বল তো!” রবি আমার কথা শুনে হাসল। তারপর খুব আস্তে আস্তে সুর মিলিয়ে গানের সুরটা অভ্যেস করতে লাগল। আমাদের দেখে ছেলে দুটি আরও জোরে, আরও আনন্দে, আরও ফুর্তির সঙ্গে গাইতে লাগল সেই সাদা পোশাকপরা মানুষটির সঙ্গে। আর চুপি চুপি লুকিয়ে রবি সেই গান গলায় তুলতে লাগল। তারপরে গান শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন একটা শব্দের তরঙ্গ ধীরে ধীরে গির্জার অন্দরে ঘুরতে ঘুরতে নিস্তব্ধ হয়ে আসতে লাগল। আমার কেমন যেন মনকেমন করতে লাগল দুদিকে দু’হাত ছড়ানো মানুষটিকে দেখে। যাঁর মাথায় কাঁটার মুকুট—ওঁর নাম যিশু খ্রিস্ট।

তারপর হঠাৎ ছেলেদুটি আমাদের দু’জনের হাত ধরে টানতে টানতে এবার বাইরে চলে এল। আর রবিটা এত দুষ্টু, গানের সুরটা ঠিক মনে রেখেছে। ওদের সঙ্গে ছুটতে ছুটতে গানটা গাইতে লাগল। আর আমি বোকার মতো ওদের গান তাড়া করে পেছনে পেছনে ছুটতে লাগলুম। গাইতে পারি না তো। হঠাৎ সেই সাদা পোশাকপরা মানুষটি আমার ওই দুর্দশা দেখে আমাকে হাঁক পেড়ে ডাকলেন। জানি না কেমন করে তিনি আমার নামটা জানতে পেরেছিলেন। আমার নাম ধরেই ডাকলেন—“সো-জ-ন-ন-ন!” আমি থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে দেখলুম তাঁকে। তিনি হাতছানি দিচ্ছেন। আমি পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালুম তাঁর সামনে। এতক্ষণ ছুটেছি তো, তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি হাঁফাতে লাগলুম। তিনি আমার হাত ধরলেন। গির্জার মধ্যে নিয়ে গেলেন। তারপর সেই বাজনাটা, যার নাম আমি পরে শুনেছি পিয়ানো, সেটা বাজাতে লাগলেন। আর আমার হাত ধরে ধরে সেই বাজনার শব্দগুলো টিপতে শেখালেন। আমি একবার ডানদিকের একটা শব্দ টিপি, টংটং করে বেজে ওঠে। আবার বাঁদিকে শব্দ টিপি কেমন টুং টাং করে বেজে ওঠে। তারপর তিনি যে চেয়ারটায় বসে বাজাচ্ছিলেন সেখানে আমাকে বসতে বললেন। বসে বাজাতে বললেন। আমি একা বসে বসে বাজাতে লাগলুম। কত রকমের শব্দ যে বেরোচ্ছে, আর কী আনন্দ যে আমার লাগছে কী বলব! যেন আনন্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে বুকের ভেতরটা।

তারপর আরও ক’দিন গেছি। কেমন যেন আপনার জন হয়ে গেছি তাদের। ওই দুটি ছোট্ট বন্ধু কেমন যেন আমাদের আপন ভাই। আর ওই মানুষটি গুরুজন। আমাদের আর কোনও বাধা ছিল না। গির্জার মধ্যে ঢুকতেও আর কোনও ভয় ছিল না। যেন আমাদের জন্যে খোলা দ্বার। আমরা এক হয়ে গেলুম। দুর্গাপুজোর সময় রবি আর আমি ওই দুই বন্ধুকে বারোয়ারিতলায় নিয়ে এলুম সেতু পেরিয়ে। খুব অবাক হল সবাই ওদের দেখে। সাদা পোশাকপরা মানুষটিকে অবিশ্যি বলেই ওদের এনেছিলুম। পুজোর ঢাকের শব্দ, পুজোর আরতির শব্দ, পুজোর মন্ত্রপাঠ আমরা একসঙ্গে শুনলুম। যেমন ওদের আনন্দ, তেমনি আমাদের আনন্দ। আমাদের পুজোর সঙ্গী হয়ে গেল ওরা। তেমনি ক’দিন পরেই বড়দিনের সময় আমরাও এক হয়ে গেলুম ওদের উৎসবের সঙ্গে। দূরের সাঁওতালপাড়া থেকে আসা আমাদের চেয়ে কালো কালো মানুষগুলির সঙ্গে আমরাও সাজালুম সেই গির্জা। খাবার খেলুম একসঙ্গে। আর এক হয়ে গেলুম গির্জার মধ্যে পিয়ানোর সুরের সঙ্গে, গান গেয়ে।

এমনি করেই কেটে গেল অনেকগুলো দিন। ওই দুই ছোট্ট বন্ধুর নামও শিখে ফেলেছিলুম। একজনের নাম জন, অন্যজনের নাম জিম। ওরাও আমাদের নাম শিখে ফেলেছিল। আমাকে ডাকত ‘সোজন’ বলে আর রবিকে ডাকত ‘রোবি’ বলে। সে বড় মজার ডাক।

এই মজার সঙ্গে একাকার হয়ে আমাদের দিনগুলো ভারী সুন্দর কাটছিল। রবির বাবাও জানেন মাও জানেন, আমার বাবাও জানেন মাও জানেন—সবাই জানেন ওই গির্জায় আমরা যাই, গির্জার বাগানে আমরা খেলা করি আমাদের দুই ছোট্ট বন্ধুর সঙ্গে। এমনি করতে করতে অনেক দিন কেটে গেল। আমাদের বন্ধুত্ব বুঝি আর কোনওদিন নষ্ট হবে না।

আমি জন্মেছি বসন্তকালে। চৈত্রমাসের শেষ রবিবারে। তো, রবির সঙ্গে মতলব করলুম মাকে বলব, আমাদের দুই ছোট্ট বন্ধু আর সাদা পোশাকপরা ওই মানুষটির জন্যে আমার জন্মদিনে পিঠে তৈরি করে দিতে। আমরা নিয়ে যাব। রবি বললে, তা হলে খুব ভাল হয়।

তখন আমার জন্মদিনের দু’-তিন দিন বাকি আছে। আমরা দু’জনেই গির্জায় যাচ্ছি খেলা করতে। হঠাৎ দেখা রঞ্জনকাকার সঙ্গে। রঞ্জনকাকা আমাদের খুব ভালবাসেন। আমাদের দেখে উনি কোথা থেকে এসে সামনে দাঁড়ালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছিস?” আমরা বললুম, “গির্জায়।” তিনি আমাদের দিকে কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টি হেনে মুচকি হাসলেন। আমরা কিছু বুঝলুম না। হাসতে হাসতে উনি চলে গেলেন। আমরাও হাসতে হাসতে গির্জার দিকে চলে গেলুম।

তারপর আর একদিন দেখি কয়েকজন অচেনা মানুষ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে কী কথাবার্তা বলছে। আমরা সেই কথাবার্তা শোনার কোনও আগ্রহই দেখালুম না। কিন্তু রবি আমাকে বলল, “স্বজন, আমার কেমন ভয় করছে রে।”

হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞেস করলুম, “কেন বল তো?”

রবি বলল, “তা বলতে পারব না।”

“কেন ভয় করছে তা বলতে পারবি না?”

রবি তখন বলল, “আমার কানে যেন শব্দ এল—ছেলেদুটো রোজ ওখানে যায়।”

আমি চমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম রবির কথা শুনে। তারপর লোকগুলোর দিকে তাকালুম। তাদের দেখে আমারও যেন কেমন ভয় করল।

কাল আমার জন্মদিন। মাকে বলেছি পিঠে তৈরি করে দেবার কথা। মা করেও দেবেন বলেছেন। বাবাও বলেছেন, “হ্যাঁ, আমি এনে দেব বাজার থেকে পিঠে তৈরির জন্য যা যা দরকার।” আমার খুব আনন্দ হল। বিকেলবেলা খেলাধুলো করে এসে যেমন রোজ একটু জিরিয়ে নিয়ে পড়তে বসি সেদিন তেমনই পড়তে বসলুম। পড়তে বসার সঙ্গে সঙ্গে গির্জার ঘণ্টা শুনতে পেলুম। যেমন রোজই পাই। তারপর অনেকক্ষণ বাংলা-ইতিহাস-ভূগোল পড়া শেষ করে যখন মাকে বললুম, “মা খিদে পেয়েছে,” তখন বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি চাঁদের আলো উঠেছে আকাশ ভরে। বাবা বসে আছেন বাইরে মাদুর বিছিয়ে। আমি বাবার পাশে গিয়ে বসে আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলি, “ওই দ্যাখো ধ্রুবতারা, ওই দ্যাখো সপ্তর্ষিমণ্ডল। চাঁদের আলোয় আজ যেন ধ্রুবতারার জৌলুস অনেকটা কমে গেছে।” বাবা হেসে বললেন, “তবে তুই বড় হলে তোর আলোয় আমাদের জৌলুস কিন্তু বাড়বে।”

এমন সময় প্রচণ্ড শব্দ হল। আমরা চমকে উঠলুম সে শব্দে। এমন শব্দ এর আগে আমি কখনও শুনিনি। হয়তো বাবা শুনেছেন, তাই বললেন, “কোথাও বোমা ফাটল!” বাবা উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার যেন মনে হল ধোঁয়ায় জ্যোৎস্নার আলো অনেক আবছা হয়ে গেছে। বোমার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে যেন বিচ্ছিরি একটা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর চারদিক থেকে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। রবি ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছে। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেসা করলুম, “বাবা কী হল?” বাবা যেন কেমন হতভম্ব। আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, রবিকেও জড়িয়ে ধরলেন। তারপর দেখি সেতুর ওপারে যে জঙ্গল, সেখানে যেন আগুন লেগে গেছে। বাবা বললেন, “আগুন লেগেছে বনে।” আমি জিজ্ঞেসা করলুম, “বাবা, তবে ওই শব্দটা কীসের?” বাবার মুখের দিকে রবি তাকাল। আমিও তাকালুম। বাবা কোনও উত্তর দিলেন না। তারপর আমাদের দু’জনকে ছেড়ে বাবা হঠাৎ ছুটলেন। আরও অনেকে ছুটলেন। বোধহয় ওই আগুন নেভানোর জন্যে। আমরাও ছুটতে যাচ্ছিলুম। মা এসে ধরে ফেললেন। আমরা কিছু বুঝলুম না। মাকে জিজ্ঞেসা করলুম, “মা হঠাৎ এত কীসের গণ্ডগোল?” মা কোনও উত্তর দিলেন না। সবুজ বনে আগুনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। নাকে পোড়া গন্ধ আসছে। তারপর কে জানে, হয়তো সবাই মিলে জল ছুড়ে ছুড়ে সেই আগুন নিভিয়ে ফেলল।

আস্তে আস্তে ফের গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেল সেতুর ওপারের বন। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম, আর ভাবতে লাগলুম আমাদের দুই বন্ধুর কিছু হয়নি তো? যাই হোক ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে গেল। রবিকে বললুম, “আজ তুই আমার কাছে থাক। কাল সকালবেলায় দু’জনে যাব। মা পিঠে তৈরি করেছে। আমার জন্মদিনের পিঠে। ওদের জন্য নিয়ে যাব।”

বাবাকে খানিক পরে ফিরে আসতে দেখে আমরা ছুটে গেলুম। মা-ও ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছিল বনে? আগুন লাগল কী করে অমন?”

বাবার চোখে-মুখে এখন আর উদ্বেগ নেই, আতঙ্ক নেই। বললেন, “ঠিক জানি না। তবে সেতুর কাছে রঞ্জনদের সঙ্গে দেখা হল। ওরাই ফিরিয়ে দিল আমাদের। বলল, “বাড়ি চলে যান। কিছুই হয়নি ওখানে।”

বাবা ফিরে এলেন। একটু পরে বাবাই রবিদের বাড়িতে বলে এলেন রবি আমাদের কাছে আছে।

খুব সকালে সেদিন ঘুম ভেঙে গেছিল। বাবাকে প্রণাম করেছি। মাকে প্রণাম করেছি। আমার জন্মদিনের আনন্দে রবিকে জড়িয়ে ধরেছি। তারপর কী সুন্দর করে মা থালায় সাজিয়ে দিলেন পিঠে। আমি আর রবি দু’জনে সেই পিঠে নিয়ে সেতু পেরিয়ে গির্জার দিকে গেলুম। গির্জা আছে, কিন্তু সেই মানুষটিকে দেখতে পেলুম না। গির্জা আছে কিন্তু আমাদের সেই ছোট্ট দু’জন বন্ধুকে দেখতে পেলুম না। গির্জার সেই বাগান আছে। বাগানের কোথাও কোথাও আগুনের আঁচ লেগে আছে। কিন্তু আমার সেই ছোট্ট বন্ধু নেই কোথাও। আমরা ছুটে ছুটে কেবল হাঁক পাড়ি—জ-অ-অ—অ-ন! জি-ই-ই-ই-ম! রবিও ডাকে, আমিও ডাকি। কিন্তু কারও সাড়া পাই না। খুঁজতে খুঁজতে গির্জার পেছনে গিয়ে দেখি আগুনে ঝলসে আছে অনেকটা জায়গা। আমি চমকে উঠলুম। রবি আমাকে জড়িয়ে ধরল। তবু ভয় পেলুম না। আমরা ডাকতে থাকলুম আমাদের বিদেশি সেই দুই বন্ধুকে। ডাকতে ডাকতে জঙ্গলের ভেতরে যেখানে কেউ যায় না, সেখানেও চলে গেলুম। তবু সেই সাদা পোশাকপরা মানুষটিকে, আর আমাদের বন্ধুদের কোথাও খুঁজে পেলুম না। কোথাও না। যখন কোত্থাও খুঁজে পেলুম না, তখন আচমকা রবি চিৎকার করে উঠল— “স্ব-জ-অ-অ-ন!” আমি চমকে উঠলুম ওর চিৎকার শুনে। তারপর ছুটতে ছুটতে এসে ও আমাকে জড়িয়ে ধরল। কেঁদে ফেলল। আমিও কেঁদে ফেললুম। আমার হাতের পিঠে আমার হাতেই রয়ে গেল। তারা নেই। কোথায় গেল, তাদের যে কী হল, তার কিছুই জানতে পারলুম না।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%