শৈলেন ঘোষ

পৃথিবীর এক দেশ যখন ঘুমোয়, তখন আর-এক দেশ জাগে। এক দেশের আকাশ যখন ভরে যায় রোদে, অন্য দেশ তখন চাঁদের আলোয় উছলে ওঠে। না-হয় অন্ধকারে মুখ ঢাকে। রোদ ওঠা মানেই তো জেগে ওঠা। জেগে ওঠা মানেই হই-হট্টগোল। হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি। কে কাকে ডাকছে, কে কোথায় হাঁকছে সে নিয়ে কে আর মাথা ঘামাচ্ছে! কিন্তু দূর থেকে যে-আবছা শব্দটা এখন ভেসে আসছে সেটা বোধহয় শুনতে কেউ ভুল করছে না। কারণ, শব্দটা শুধুই শব্দ নয়। যেন একরাশ ঘুঙুর বাজছে। তালে-তালে। দূর থেকে যতই ভেসে আসছে কাছে, ততই যেন চমক লাগছে। কী আসছে? কে আসছে অমন ঝনকঝনক শব্দ বাজিয়ে?
তাকে এতক্ষণে দেখা গেল। দেখা গেল, খোলা মাঠের ওপর দিয়ে যে-রাস্তাটা এখান দিয়ে সিধে চলে গেছে সামনে, সেই রাস্তায়— একটা ঘোড়া। তার গলায় ঘণ্টা। চারপায়ে ঘুঙুর। একটি-একটি পা ফেলে সে ছুটছে। ঘাড় তুলে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে। যেন কাউকে সে তোয়াক্কা করে না। বুঝি একাই সে সবাইকে জানান দিয়ে পৃথিবীটা জয় করে নেচে বেড়াচ্ছে।
কাছে আসতেই বোঝা গেল, তার গায়ের রংটা কালো নয়। ঘন নীল। ঘাড়ের ওপর কেশর। তালে তালে যেমন ঘোড়ার পা পড়ছে, তেমনই তালে তালে তার ঘাড়ের কেশর দুলছে। দূর-সামনে ছাড়া আর কোনও দিকে তার চোখ নেই। যেন দেখেও দেখে না। মনে ভাবে, আমি কাকে দেখব, আমাকেই দেখুক সবাই।
ঠিক বটে, এমন যার ঠাট, সে আর কাকে দেখে! অবশ্য তাকে কেউ দেখছে কি না, সেটি সে ঠারেঠোরে দেখতে ভুল করছে না।
কিন্তু হঠাৎ যে একটা কালো-কুচকুচে কাক তাকে দেখে অমন কক-কক করে হেসে উঠবে, এটা ঘোড়া ভাবতেই পারেনি। ছুটতে ছুটতে হাসি শুনে ঘোড়াটা যে একটু থতমত খেয়ে যায়নি, এমন কথাও বলা যাবে না। কিন্তু থতমত খেলেও, সামলে নিতেও তার দেরি হয়নি। সে ঘাড় উঁচিয়ে ছুটতেই লাগল।
কাকটাও পিছু নিল ঘোড়ার। হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে সে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “চার পায়ে ঘুঙুর পরে, এই রোদ-সকালে কোথায় চললেন ঘোড়ামশাই। কে আপনার পায়ে ঘুঙুর পরিয়ে দিল? আপনার চলার ঢং দেখে মনে হচ্ছে, আপনি নাচছেন।” বলেই কাকটা দ্বিগুণ জোরে কক-কক করে হাসতে লাগল।
ঘোড়া তো আর বোকা নয়। কাকটা যে তাকে ঠাট্টা করছে, এটা বুঝতে তার কষ্ট হল না। ঘোড়া কিন্তু তার ঠাট্টা শুনে রাগ করল না। উলটে কাককে বলল, “কালুকাকা, আমার পায়ে যে ঘুঙুর পরিয়ে দিয়েছে, সে আমার মনিব। আমি আলো খুঁজতে বেরিয়েছি।”
কাক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সে কী কথা! আলো আবার কেউ খুঁজে বেড়ায় নাকি! সে তো আকাশ থেকে নেমে সারা রাজ্যেই ছড়িয়ে আছে।”
ঘোড়া উত্তর দিল, “এ আলো সে আলো নয়।”
“তবে কী আলো?” জিজ্ঞেস করল কাক।
“সে আমিও জানি না।” জবাব দিল ঘোড়া।
কাক বলল, “ওমা, এ কী বোকার মতো কথা বলছেন? যা আপনার জানা নেই তাই বুঝি খুঁজছেন ছুটে ছুটে! খুঁজে পাবেন কেমন করে?”
“তবে বলি শোনো আসল কথা,” ঘোড়া উত্তর দিল, “আমার মনিবের একটি মাত্র ছেলে। ভারী আদরের। আমার সঙ্গেও তার খুব বন্ধুত্ব। সেই ছেলের এখন খুব অসুখ। এই যায়-সেই যায় অবস্থা। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে। ডাক্তারবাবুর জবাব শুনে আমার মনিবের যে কী অবস্থা, সে তো বুঝতেই পারছ। মনিব সর্বক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, আর হা-হুতাশ করে কাঁদছে। তাকে দেখে আমিও চোখের জল সামলে রাখতে পারিনি।
“তা এমন সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক ফকির। আমার মনিবকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে তোমার? চোখে জল কেন?’ আমার মনিব তার দুঃখের কথা শোনাল ফকিরকে। ফকির বলল, ‘তোমার যদি আপত্তি না থাকে, আমি কি তোমার ছেলেকে একবার দেখতে পারি?’
“আমার মনিবের আপত্তি করার কোনও কারণই ছিল না। ফকিরকে নিয়ে গেল বাড়ির ভেতর। ছেলেকে দেখাল। ফকির খুব যত্ন করে ছেলেকে দেখল। তারপর বলল, ‘তোমার ছেলে ভাল হয়ে যাবে যদি একটা কাজ করতে পারো।’
“আমার মনিব ফকিরের কথা শুনে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আজ্ঞে কী কাজ আপনি বলুন। আমি ঠিক পারব।’
“ফকির বলল, ‘পারলে তো ভালই। কিন্তু তুমি পারবে না। কাজটা বড় শক্ত। পারলে পারতে পারে তোমার ঘোড়া।’
“আমার মনিব ফকিরের কথা শুনে থমকে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজ্ঞে হুজুর, এমন কী শক্ত কাজ যে, আমি পারব না, আমার ঘোড়া পারবে? ঘোড়া তো আর মানুষ নয়?’
“ফকির উত্তর দিল, ‘ঠিক বলেছ ঘোড়া মানুষ নয়। কিন্তু এমন অনেক কাজ আছে, যা শুধু ঘোড়া পারে, মানুষ পারে না। তুমি এখনই পারবে দিক্বিদিক ছুটে ছুটে একটু আলোর সন্ধান করতে। যে আলোর আছে নীল আভা। সেই নীল আলোর আভা তোমার ছেলের মুখে যদি একবার ছড়িয়ে পড়ে, তবে তখন আর কেউ কাড়তে পারবে না তার প্রাণ। তুমি তোমার ঘোড়ার পায়ে পরিয়ে দাও ঘুঙুর। গলায় ঝুলিয়ে দাও ঘণ্টা। ওর ঘুঙুরের ঝংকারে খুশির কলতান শোনা যাবে। দিকে দিকে পৌঁছে যাবে ঘণ্টার টুং টাং শব্দ। কে জানে, ঠিক তখনই হয়তো সে খুঁজে পাবে নীল আলোর আভা।’ এই নিদান শুনিয়ে ফকির চলে গেল। আর আমার মনিব ছেলের প্রাণের আশায় আমার পায়ে ঘুঙুর পরিয়ে দিল।”
এতগুলো কথা ঘোড়া শোনাল কাককে সারাক্ষণ ছুটতে ছুটতে। কাকও শুনল তার সব কথা সারাক্ষণ উড়তে উড়তে। উড়তে উড়তেই কাক উত্তর দিল, “আপনি আমায় মাপ করবেন ঘোড়ামশাই। আপনি যে একটি ছোট্ট ছেলের প্রাণের আলো খুঁজতে বেরিয়েছেন, এ আমি জানতুম না বলেই আপনার পায়ে ঘুঙুরের বহর দেখে হেসে ফেলেছি। এখন যদি সাহস দেন, আপনাকে একটা কথা বলতে পারি।”
“কী কথা?” জিজ্ঞেস করল ঘোড়া।
“আমি আপনার এই আলো খোঁজার কাজে কি সঙ্গী হতে পারি?” উত্তর দিল কাক।
ঘোড়া কাকের কথা শুনে বলল, “এ তো খুব ভাল কথা। তুমি আমার সঙ্গী হলে আমারই মনের জোর বাড়ে। কিন্তু আমি কতক্ষণে সেই আলো খুঁজে পাব জানি না। আর তুমিই বা কতক্ষণ পারবে শূন্যে উড়ে উড়ে আমায় সঙ্গ দিতে? তোমার কষ্ট হবে। তার চে বরং তুমি আমার পিঠে বসো। আমার পিঠে বসে তুমিও আলো খোঁজো, আর ছুটতে ছুটতে আমিও খুঁজি।”
কাক জিজ্ঞেস করল, “আপনার পিঠে বসলে কষ্ট হবে না তো?”
ঘোড়া উত্তর দিল, “তুমি আমায় হাসালে। আরে বাবা, তুমি তো একটা হালকা ফুরফুরে পাখি। কত ভারী ভারী লটবহর পিঠে নিয়ে আমি এ-দেশ ও-দেশ করতে পারি। এসো, তুমি বসে পড়ো আমার পিঠে, কিন্তু-কিন্তু করার কিচ্ছু নেই।”
ছুটন্ত ঘোড়ার সঙ্গে উড়তে উড়তে কাক নেমে এল শূন্য থেকে ঘোড়ার পিঠে। বসে পড়ল। ঘোড়ার পিঠে দুলতে দুলতে সে-ও আলো খুঁজতে লাগল।
ঘোড়া জিজ্ঞেস করল, “এর আগে তুমি কখনও ঘোড়ার পিঠে চড়েছ?”
কাক বলল, “সুযোগ হয়নি। তবে মোষের পিঠে বসে ওদের জ্বালাতন করেছি অনেক।”
“এখন তোমার কী মনে হয়, কার পিঠ ভাল, মোষের, না আমার?” জিজ্ঞেস করল ঘোড়া।

“আসলে কী জানেন,” উত্তর দিল কাক, “মোষের পিঠে বসে পোকা খুঁজি, আর আপনার পিঠে বসে আপনার সঙ্গে খুঁজছি আলো। অনেক তফাত।”
“ভাল লাগছে?” জিজ্ঞেস করল ঘোড়া।
“খুউব।” উত্তর দিল কাক।
“কিন্তু আমি বোকার মতো ছুটছি খালি। কোথা যাচ্ছি জানি না। আমার পায়ে ঘুঙুরই বাজছে। আলো দেখছি না।”
এমন সময় কাক আচমকা জিজ্ঞেস করে বসল, “ঘোড়ামশাই, আপনি গান জানেন?”
কাকের কথা শুনে ঘোড়া ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে পড়েই এমন চিঁ হিঁ হিঁ হিঁ করে হেসে উঠল যে, সারা চত্বরটাই যেন থরথর করে কেঁপে ওঠে। পাশে ছিল একটা ঝিল। ঝিলের জলে একঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে একটা বক মাছের ধান্ধা করছিল। ঘোড়ার হাসি শুনে সে-ও চমকে উঠেছে। সে চোখ ফিরিয়ে দেখতে না-দেখতেই ঘোড়ার পায়ের ঘুঙুর বেজে উঠল আবার। ঘোড়া ছুট দিল।
ঘোড়ার পিঠে একটা কাককে বসে থাকতে দেখে বক তো থ। ব্যাপারটা ভাল করে ঠাওর করার জন্যে চোখের পলকে বকও ঝিল থেকে উড়ল আকাশে। তিরবেগে ভেসে এল ঘোড়ার মাথার ওপর। ঘোড়ার হাসির রেশটা তখনও তার মুখে ছড়িয়ে ছিল। তাই দেখে হেসে উঠল বকও। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “কীরে কাক, তুই কি উড়তে ভুলে গেছিস? ঘোড়ার ঘাড়ে চেপে কোথায় চললি এমন আরাম করে?”
কাক বলল, “তোমার অত জমা-খরচের কী দরকার? হিংসে হচ্ছে বুঝি আমায় দেখে?”
বকও ঘোড়ার ছোটার সমান তালে উড়তে উড়তে বলল, “হিংসে কেন করব! এসব দৃশ্য দেখি না তো, তাই জিজ্ঞেস করছি।”
এবার ঘোড়া কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, “বকমশাই, পৃথিবীতে আপনি কী কী দৃশ্য দেখেছেন। আর কী কী দৃশ্য দেখেননি তার যদি একটি ফিরিস্তি দেন, তো ভারী উপকৃত হই। আপনি কি বলতে পারেন নীল আলো কোথায় পাওয়া যায়? বলতে কি পারেন, সেই নীল আলো কেমন করে সঙ্গে নিয়ে আমি ফিরতে পারি আমার মনিবের কাছে? আমার মনিবের ছেলের অসুখ। সেই নীল আলোর আভা ছেলের মুখে ছড়িয়ে পড়লে তবেই সে প্রাণে বাঁচবে। নইলে সব শেষ। আমি আর আমার কালুকাকা এই কাক, সেই আলো খুঁজে বেড়াচ্ছি। আপনার যদি সেই আলোর সন্ধান জানা থাকে আপনিও আমার ঘাড়ে চেপে আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারেন।”
ঘোড়ার কথা শুনে বকমশাই নিজেই নিজেকে ছি ছি করে উঠল। বলল, “আমি সবকথা না জেনে আপনার সঙ্গে ‘ঘাড়’ তুলে কথা বলে খুবই অন্যায় করে ফেলেছি। আপনারা মানুষের জন্যে এত বড় একটা কাজ করতে ছুটোছুটি করছেন, এ দেখে আমি কেমন করে স্থির থাকতে পারি। আমাকেও আপনাদের সঙ্গী করে নিন। একটি ছোট্ট শিশুর প্রাণ বাঁচাতে আমিও যদি আপনাদের সাহায্য করতে পারি, তবে ধন্য হয়ে যাই।”
ঘোড়া তখন খুব খুশি হয়ে বলে উঠল, “তবে আর উড়তে হবে না আপনাকে। বসে পড়ুন আমার ঘাড়ে।” বলে ঘোড়া হেসে উঠল। সঙ্গে কাকও হাসল। আর বকমশাই কাকের পেছনে টুক করে বসে পড়ল। মনে হল লজ্জা পেয়েছে।
সে এক ভারী মজার দৃশ্য। ঘোড়া ছুটছে। তার পায়ে ঘুঙুর বাজছে। তার পিঠে একটা কাক। কালো কুচকুচে। একটা বক। সাদা ধবধবে।
ঘোড়া জিজ্ঞেস করল, “বকমশাই, আপনি জল ছেড়ে ঘোড়ার পিঠে উঠলেন। এই কি প্রথম?”
বক বলল, “বলতে পারেন।”
“ঘোড়ার পিঠে বসে কেমন বুঝছেন?” জিজ্ঞেস করল ঘোড়া।
“ভাল।”
ঘোড়া আবার জিজ্ঞেস করল, “শুধুই ভাল।”
বক উত্তর দিল, “ভাল ছাড়া আর কী বলব বলুন?”
ঠিক এই সময়ে কাকটা আচমকা চিৎকার করে উঠল, “এই রে, সামনে একটা নদী। ঘোড়ামশাই আপনি পার হবেন কী করে?”
ঘোড়া বলল, “তাই তো।”
বক তখন ঘোড়াকে নিরাশ হতে দেখে বলল, “ঘোড়ামশাই ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমরা তো আছি। আগে নদীর কিনারা অবধি যাই চলুন। তারপর কী করা যায় ভাবা যাবে।”
এতক্ষণে কাকের মুখ দিয়ে আসল কথাটা বেরিয়ে এল। সে বলে উঠল, “ঘোড়ামশাই, আমরা তো আপনার পিঠে বসে শুধু ছুটেই চলেছি। কিন্তু কোন দিক দিয়ে কোথায় গেলে সেই নীল আলো পাওয়া যাবে, সেটা তো আমরা জানি না। আমাদের ছোটাটা বেকার হয়ে যাচ্ছে না?”
কাকের কথা শুনে ঘোড়া বলে উঠল, “তাই তো!” তারপর ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ততক্ষণে নদীর কাছেই প্রায় পৌঁছে গেছে তারা। ঘোড়া জিজ্ঞেস করল, “এবার তা হলে কী করা যায় বলো তো?”
বক বলল, “ঘোড়ামশাই, এখন করার অনেক কিছুই আছে। আমরা দলে আছি তিনজন। আমি এক কাজ করি, আমি উড়তে উড়তে নদীর ওপারে চলে যাই তালাশ করতে। কাক, তুই যা নদীর বাঁয়ে। আর ঘোড়ামশাই আপনি যান ডানদিকে। দেখুন, কেউ-না-কেউ ঠিক খোঁজ পেয়ে যাব নীল আলোর।”
বকের কথাই ঠিক কথা। বকের কথা মেনেই কাক ঘোড়ার পিঠ ছেড়ে উড়ান দিল বাঁয়ে। বক উড়ল নদীর ওপর বাতাস বেয়ে ওপারে। ঘোড়া ছুটল ডানদিকে পায়ে ঘুঙুর, গলায় ঘণ্টা বাজিয়ে। এতক্ষণ তবু ছিল ভাল তিন বন্ধু একসঙ্গে। এখন দল ভেঙে সবাই একা-একা। নীল আলোর সন্ধান কে আগে পাবে কে জানে! না কি পাবে না কেউ-ই। না-পেলে তখন?
দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল বক উড়তে উড়তে। উড়তে উড়তে হারিয়ে গেল কাক চোখের আড়ালে। শুধু পড়ে রইল ঘোড়া। তার তো ডানা নেই যে উড়বে! তার পা আছে চারটে। চার পায়ে তার ঘুঙুর। সে এবার ছোটে না, তালে তালে পা ফেলে হাঁটে। আর এদিক ওদিক দেখে।
এমন সময় হল কী, হল এক কাণ্ড! কোথায় ছিল গাছের ফোকরে একটা বানর। সে শুনতে পেয়েছে ঘোড়ার পায়ের ঘুঙুর। দেখতে পেয়েছে ঘোড়াটাকে। অমনই সে তরতর করে নেমে এসেছে গাছ থেকে। দু’-চারটে লম্ফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ঘোড়ার সামনে। ঘোড়ার পথ গেল আটকে। ঘোড়া বলল, “কেন রে বানর পথ আটকাস?”
বানর বলল, “আটকাব না? তোমাকে দেখলেই তো বুঝতে পারছি, তুমি কার নাচের ঘোড়া। পালিয়ে বেড়াচ্ছ।”
ঘোড়া উত্তর দিল, “তোর মুন্ডু। যেমন তোর নাম, তেমনই তোর বুদ্ধি। আমি নাচতে পারি ঠিকই, কিন্তু পালাতে যাব কোন দুঃখে!”
“তোমাকে দেখে তো তাই মনে হচ্ছে,” বানর উত্তর দিল, “কেমন চোরের মতো পা ফেলছ! চোরের মতো চোখ চেয়ে এদিক ওদিক দেখছ! বুঝি, লুকনোর ধান্ধা করছ?”
ঘোড়া রেগে টং। বলল, “এই বানর, তুই আমায় চোর বললি কেন রে? আমি যদি ঠ্যাঙের বাড়ি একখানি ঝাড়ি, তোর কম্ম সারা হয়ে যাবে। আমি চোর হতে যাব কোন দুঃখে। আর লুকোতেই বা যাব কেন? জানিস, আমি আলো খুঁজছি, নীল আলো। আমার মনিবের ছেলেটা মর-মর। একজন ফকির বলেছে, ছেলের মুখে নীল আলো ছড়িয়ে পড়লে সে বেঁচে যাবে। তাই, আমি সেই আলোই খুঁজছি।”
বানর ঘোড়ার কথা শুনে বেশ লজ্জায় পড়ল। সব কথা ঠিক-ঠাক না-জেনে কাউকে যে চোর-ছ্যাঁচড় বলাটা উচিত নয়, সেটা বুঝতে তার বেশি দেরি লাগল না। তাই সে জিব কেটে বলে উঠল, “ইস! কী ভুল করে ফেলেছি! এমন একটা মহৎ কাজে তুমি যে এদিক-ওদিক করছ এটা তো আগে বলবে! দ্যাখো দিকিনি, ঝুটমুট তোমাকে কতকগুলো আজেবাজে কথা বলে ফেললুম। কিছু মনে কোরো না।”
ঘোড়া উত্তর দিল, “না, না মনে আমি কিচ্ছু করিনি। অজানা-অচেনা কেউ বেপাড়ায় এসে এমন ঘুরঘুর করে কিছু খোঁজাখুঁজি করলে সন্দেহ হতেই পারে। এটাই স্বাভাবিক। আমার এখন ভাবনা একটাই, কেমন করে পাব সেই আলো!”
ঘোড়ার কথা শুনে বানর বলল, “দ্যাখো বাপু, সেই আলো কোথায় পাওয়া যাবে সে তুমি জানো না, আমিও জানি না। তুমি মিছেই আলোর খোঁজে ঘুরপাক খাচ্ছ। তার চে বরং এক কাজ করো। তোমার পায়ে ঘুঙুর। তুমি নাচতে জানো। তুমি নাচো। আর আমি তোমার গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়ি। আমাদের মজা দেখতে তখন হই-হই পড়ে যাবে। কেউ যদি বলে, ‘এ কী উদ্ভট কাণ্ড।’ তখন আমরা বলব, ‘উদ্ভট কাণ্ড নয়। আমরা একটি ছোট্ট ছেলের জন্যে আলো খুঁজছি। যে-আলো নীল। যে-আলো তার মুখে ছড়িয়ে পড়লে ছেলে বেঁচে উঠবে। এমন আলোর খোঁজ কেউ যদি জানো , আমাদের বলে দাও! আমরা নিয়ে যাব।”’
বানরের বুদ্ধিটা ঘোড়ার খুব মনে ধরল। বলব কী, ঘোড়া সত্যি-সত্যি নাচতে শুরু করল। আর বাঁদরটাও একলাফে তার গলাটা জড়িয়ে ধরে ঝুলতে লাগল। সে যা দৃশ্য, একবার দেখলে কে চোখ ফেরায়!
সত্যি, বানর-ঘোড়ার সেই কাণ্ড দেখে লোকে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। না-চাইতেই যে এমন মজা দেখতে পাবে, সে আর কে ভেবেছিল আগে। তাই, যারা জুটল, তারাও ঘোড়ার পায়ের ঘুঙুরের তালে তালে হাততালি দেয়, আর থেকে থেকে নেচে ওঠে।
এমন সময় হয়েছে কী, কোথায় ছিল একটি মেয়ে। সে যেমন টুকটুকে, তেমনই ফুটফুটে। সে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। ভিড়ভাট্টা ঠেলে চলে এল একেবারে ঘোড়ার সামনে। বানরের ল্যাজ ধরে মারল টান। বানরটা চিতপটাং। মেয়েটা নিজেই জড়িয়ে ধরল ঘোড়ার গলা। নিজেই ঝুলতে লাগল ঘোড়ার গলা জড়িয়ে। ঘোড়া দ্বিগুণ জোরে নাচতে লাগল পায়ের ঘুঙুর বাজিয়ে। সে আর-এক মজা!
চিতপটাং বানর টপাস করে লাফিয়ে উঠল চোখের পলকে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠল, “ঘোড়ামশাই। মেয়েটার চোখের তারা নীল। মেয়েটার চোখের আলোয় নীলের আভা। তোমাকে আর নাচতে হবে না। মেয়েটাকে নিয়ে ছোটো। তোমার নাচার কাজ শেষ। তুমি খুঁজে পেয়েছ নীল আলো।”
ঘোড়া মেয়েটাকে গলায় ঝুলিয়ে ছুটল। মেয়েটা খানিক গিয়ে ঘোড়ার গলা বেয়ে তার পিঠে গিয়ে বসল। ঘোড়ার পায়ের ঘুঙুর মাটি কাঁপিয়ে যত বাজছে, মেয়েটা ততই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হাসছে, আর বলছে, “আমি বন্ধু পেয়েছি বন্ধু! বন্ধু আমার নাচের ঘোড়া।”
সত্যিই সে বন্ধু পেল, শুধু এই ঘোড়াই নয়, বন্ধু হল ঘোড়ার মনিবের ছেলেও। কেননা, মেয়েটির নীল চোখের নীল আলোয় তার অসুখ ভাগল কোথায়, দেখাই গেল না। এখন সে মেয়েটির সঙ্গে খেলা করে, হাসে, আর জিজ্ঞেস করে, “তোমার কে আছে?”
মেয়েটি উত্তর দেয়, “আমার আর কাকে দরকার, এই তো তুমি আছ, তোমার বাবা আছেন, আর ওই ঘোড়া আছে। এই তো বেশ।”
মেয়েটির কথা শুনে ছেলেটি হাসে শুধু। শুধুই হাসে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন