শৈলেন ঘোষ

ছেলেটার নাম ফালটুং। পরনে প্যান্ট। গায়ে জামা। মাথায় টুপি। গালদুটো লাল টুকটুক। পাহাড়ের নীচে, যেখানে বেলা ফুরোলে সূর্যের ছায়া পড়ে, সেখানে সে থাকে। সে থাকে, বাবা থাকে, মা থাকে। তা নয় নয় করে ফালটুং-এর বয়স তো দশ-বারো হবেই। বাবার একটা গাধা আছে। গাধা নিয়ে বাবা পাহাড়ের পথ ধরে ওপরে উঠে ভাঙা পাথর বস্তাবন্দি করে। তারপর, গাধার পিঠে চাপায়। এনে ফেলে মালিকের ডেরায়। মালিক, সেই ভাঙা পাথরের সওদাগরি করে। আর, ছেলে ফালটুং তখন এর বাড়ি, তার বাড়ি, কি অন্য আরও যার বাড়িতে ছাগল, নয়তো ভেড়া আছে, তাদের নিয়ে পাহাড়ে ওঠে। পাহাড়ের যেখানে সবুজ আছে, সেখানে চরায়। তা, বলতে নেই ছেলেটা ফাঁকি দেয় না। ঘুমে গড়ায় না। সারাক্ষণ চোখ রাখে। একটা ছাগল যদি ওদিকটায় চলে যায়, তার চোখ ঠিক সেদিকটায় দেখতে পাবে।
তো, সারাদিন ফালটুং-এর পাহাড়ে পাহাড়েই কাটে। সেই সকাল থেকে সন্ধে নামার আগে পর্যন্ত। তাই, মা তার জন্যে খাবার করে দেয়। রুটি, তরকারি, না হয় অন্যকিছু, পরোটা, নয়তো পুরি। আহা, গায়ে-গতরে বাড়ন্ত ছেলে। সারাদিন উপোস করে থাকতে পারে!
কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এক একদিন ভারী আনমনা হয়ে পড়ে ফালটুং। নজর তার ছাগল-ভেড়ার দিকে থাকে বটে, কিন্তু ভাবনা তার অন্যদিকে। সে ভাবে, এই যে পাহাড় এ কেন এমন! পাথরে পাথরে ছড়াছড়ি। এদিক থেকে ঢেউ খেলে সেই কত দূরে মিলিয়ে গেছে! পাহাড়ের গায়ে ওই যে সবুজ গাছ-গাছালি, কোথা থেকে আসে এরা! কিংবা মাথার ওপর ওই যে আকাশ, সেও তো ভারী অবাক করা। দিনে সূর্য উঠছে। রাতে তারা ঝলমল করছে। চাঁদের আলো ঝরছে। আবার কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি। আকাশটা যেন পাখিদের। গাছের ফুল যেমন মৌমাছি কি ভোমরার, কিংবা ধরো প্রজাপতির।
এইসব ভাবতে ভাবতে রোজ সে শেষবেলায় পাহাড় থেকে নেমে আসে ছাগল নিয়ে। আবার ভোরবেলায় চড়াই-উতরাই করতে করতে ওঠে পাহাড়ে। ছাগল খেদিয়ে।
অবিশ্যি পাহাড়ের ওপরে তার যে আরও বন্ধু নেই, তেমন যেন ভেবো না। তার দু’জন বন্ধু আছে, তার বয়সি। তারা অবশ্য পাহাড়ে ছাগল-ভেড়া চরায় না। কাঠ কাটে, না-হয় পাথর ভাঙে। আর যখন দুপুরের খাবার খায়, তখন তিনবন্ধু একসঙ্গে গল্প করে! বলতে কী, সে-গল্প পাহাড় নিয়ে নয়। নয়, আকাশ নিয়েও। সে গল্প ভূতের, না হয় ডাইনির।
ডাইনির নাম শুনলেই ফালটুং-এর বুকটা কেমন ধক করে ওঠে! ছুনমাসির মুখখানা মনে পড়ে যায়! বড্ড ভালবাসত ছুনমাসি ফালটুংকে। কত গল্প বলত। রামায়ণে সেই যে অন্ধমুনির ছেলে সিন্ধুর গল্পটা, সেটা সে ছুনমাসির মুখেই শুনেছিল। শুনে খুব কেঁদেছিল। কাঁদবেই তো। সিন্ধুর বাবা-মা দু’জনাই অন্ধ। ছেলেই তাদের একমাত্র ভরসা। আর সেই ছেলেই যখন রাজা দশরথের শব্দভেদী বাণে প্রাণ দিল, তখন কার চোখে জল আসে না! কী, না ছেলেটা বাবা-মা’র জন্যে খাবারের জল আনতে গেছল বনের নদীতে। জল যখন সে পাত্রে ভরছে, ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ উঠছে। ঠিক সেই সময় রাজা দশরথ বনে শিকার করতে এসে ভাবলেন, এ বুঝি হরিণের জল পানের শব্দ। দিলেন ছুড়ে বান। সিন্ধুকে আঘাত করল। তারপর সব শেষ।
এমন যে ছুনমাসি, এমন গল্প যে জানে, সে কখনও ডাইনি হতে পারে! অথচ, তাকেই একদিন সবাই ডাইনি বদনাম দিয়ে এমন মারল... ভাবলেই শিউরে ওঠে ফালটুং। চোখে জল এসে যায়! আচ্ছা, কারও যদি অসুখ করে আর সে যদি স্বগ্গে যায়, তবে তাকে ডাইনিতে মেরে ফেলেছে এমন কথা বলা কি ঠিক? কেন বলে মানুষে! ছুনমাসির কেউ ছিল না, তা-ই। থাকলে তুলকালাম বেধে যেত। এমনকী, একজনও ছুনমাসিকে সেদিন বাঁচাতে রুখে দাঁড়াল না। মনে কারও একটুও দয়া হল না! ছিঃ!
বন্ধুদের মুখে সে ভূতের গল্পও শুনেছে। অবশ্য সে-ভূত মানুষ নয়, শেয়াল।
আশ্চর্য, শেয়ালও ভূত হয়?
কেন হবে না? বন্ধুরা বলে, মানুষ মরলে মানুষ যদি ভূত হতে পারে, তবে শেয়াল মরলে শেয়াল কেন ভূত হবে না? তবে, মানুষের চেয়ে এই শেয়াল-ভূতগুলো আরও দজ্জাল। মানুষ-ভূতগুলো তো অন্ধকার রাতে ঘুরঘুর করে। গাছের ওপর ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে থাকে। গাছের নীচ দিয়ে কেউ একা একা গেলে, ঠ্যাং দিয়ে ঠকাস করে ঠোক্কর মারে। খুব বেশি হলে, চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকে মাছ চুরি করে খায়। কিন্তু এই শেয়াল-ভূতগুলো কী করে, যেখানে সেখানে গর্ত খুঁড়ে রাখে। গর্ত খুঁড়ে তার ওপর গাছের ডাল, পাতা দিয়ে এমন করে ঢেকে রাখবে, কার সাধ্যি বোঝে সেটা একটা গর্ত। আর সেই গর্তের ওপর অজান্তে কারও যদি পা পড়ে যায়, তবে আর দেখতে হবে না, গর্তের ভেতর ধপাস। আর, অমনই সঙ্গে সঙ্গে সেই শেয়াল-ভূতটা আড়াল থেকে ছুটে এসে খপাত! তাকে ধরবে। তারপর তার ঘাড় মটকে গপগপ গপাত। মানে, পেটপুজো করবে!
বাব্বা! কী সব্বনেশে কথা!
ফালটুং অবশ্য ভূতটুত এসব বিশ্বাস করে না। সে যা নিজের চোখে দেখেনি, তা বিশ্বাস করতে তার মন চায় না। আকাশে উড়োজাহাজ সে দেখেছে, তাই বিশ্বাস করে। মাটি কেঁপে যে ভূমিকম্প হয়, সেটাও জানে সে। কেন না, সেদিনও মাটি কেঁপেছিল। মান্ধাতার আমলের একটা পুরনো মন্দির তার চোখের সামনেই ধসে পড়েছিল। সে বিশ্বাস করে, ওই যে পোস্টে পোস্টে বাঁধা তার, মাথার ওপর টানটান হয়ে ঝুলছে, ওর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ গেছে। তাই, অনেকের ঘরে এখন আর হ্যারিকেন জ্বলে না। ওই তারের আলোয় ঘর ঝলমল করে। অবিশ্যি ফালটুংদের ঘরে এখনও ঢোকেনি ওই আলো। তাদের এখনও হ্যারিকেন।
কিন্তু, কেমন করে যে উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ে, সেটা জানে না ফালটুং। জানে না, কেন ভূমিকম্প হয়। কেমন করে ওই তারের ভেতর দিয়ে ঝলমলে আলো জ্বালানোর বিদ্যুৎ যায় ঘরে ঘরে! ভাবে ফালটুং। ভাবে এও কি ম্যাজিক!
হ্যাঁ, তার ম্যাজিকই মনে হয়। কেন না, এই ক’দিন আগে, সে নিজে ম্যাজিক দেখেছে, এক ম্যাজিকওলা এসেছিল তাদের এই পাহাড়তলিতে। এর আগে তো কোনওদিন ম্যাজিক দেখেনি ফালটুং, তাই, যখন ম্যাজিকওলা একটা একটা খেলা দেখাচ্ছিল, ছেলেটা যেন বিভোর হয়ে পড়ছিল দেখতে দেখতে। কোথাও কিচ্ছু নেই, ম্যাজিকওলার হাতও ফাঁকা। অথচ হঠাৎ, চোখের পলকে কোত্থেকে যে একটা এত্তোবড় ছুরি তার হাতে এল কে জানে। আবার দ্যাখো একটা ছোট্ট কৌটো। তার ভেতর থেকে জল পড়ছে তো পড়ছেই! ওই ছোট্ট কৌটোর মধ্যে এত জল ধরল কেমন করে! তারপর ধরো সেই রংবেরঙের রুমালের খেলাটা! টানছে একটা বাকসের ভেতর থেকে, গিঁট বেঁধে লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসছে! কী করে হয় এমন! কিন্তু, শেষ খেলাটার কথা বলো! যে-খেলাটায় একটা ফুটফুটে মেয়ে মস্ত একটা বাকসে শুয়ে পড়ল। আর ম্যাজিকওলা একটা চকচকে করাত দিয়ে তাকে কাটতে লাগল! তখন কে না শিউরে ওঠে? কার গায়ে না কাঁটা দেয়? কিন্তু শেষমেশ মেয়েটা যখন জ্যান্ত হয়ে বেরিয়ে এল বাকসোর ভেতর থেকে, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ফালটুং। গোটা চত্বরটা হাততালিতে ফেটে পড়ল।
সত্যিই, এইসব অসম্ভব-অসম্ভব কাণ্ডকারখানা দেখলে কার না ইচ্ছে করে ম্যাজিকওলা হতে? হায় রে, খেলাটা যদি সে শিখে ফেলতে পারত!
বটেই তো, শেখা তার কিছুই হয়নি। না লেখাপড়া, না ম্যাজিক। সে কিছুই জানে না। জানে শুধু এর বাড়ির, তার বাড়ির ছাগল-ভেড়া নিয়ে পাহাড়ে চরাতে। না হয়, খিদে পেলে হ্যাংলার মতো গিলতে। অথচ দ্যাখো, কেউ তো আর বলতে পারবে না, পাহাড়তলিতে ইস্কুল নেই। কত ছেলে, কত মেয়ে রোজ ইস্কুলে যায় বলো! তারা নিশ্চয়ই শিখছে, উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ছে। কেন ভূমিকম্প হয় মাটি কেঁপে। তারের ভেতর দিয়ে কেমন করে আলো যায় ঘরের ভেতর। পাহাড় উঠেছে মাটি ফুঁড়ে আকাশে কেমন করে।

তো, একদিন সত্যিই একটা ভোজবাজি ঘটে গেল। কী হল? না, কোনওদিন যা হয়নি, তাই ঘটল। হয়তো ফালটুং-এর শরীরটা সেদিন ভাল ছিল না। গাছের ছায়ায় বসে ছাগল-ভেড়ার ওপর নজর রাখতে রাখতে হঠাৎ কখন যে চোখ তার ঘুমে জড়িয়ে এল, সে নিজেও টের পেল না। তারপরে, তার যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেলা গড়িয়ে গেছে। সে ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। রক্ষে এই, ছাগল-ভেড়াগুলো তার আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। তবু সে চটপট গুনে ফেলল। না, একটা কম হচ্ছে কেন? আবার গুনল। বারবার গুনল। একটাই কম। একটা ভেড়া। কী সর্বনাশ! সে ছুটল এখানে ওখানে। খুঁজল আঁতিপাতি করে। যাঃ নেই, নেই! তাই তো, কার ভেড়া হারিয়ে গেল! তার তো চেনাই আছে, কার ভেড়া কোনটা। আর, সে তাই বুঝতেও পেরেছে, যাঁরটা হারাল, তিনি মাস্টারমশাই। বুকটা ধক করে উঠল ফালুটং-এর। এখন সে কী করবে! কেমন করে মাস্টারমশায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে!
অনেকক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল ফালটুং। অনেকক্ষণ পর যখন তার মনে হল, আর বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে বাবা ছুটে আসবে, তখনই সে দুরুদুরু বুকে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল। নেমে, যার যার ছাগল, যার যার ভেড়া, তার তার ঘরে পৌঁছে দিল। শুধু বাকি রইল মাস্টারমশায়ের ভেড়া।
এবার ফালটুং একা। একা একা নিরাশ হয়ে পথ হাঁটতে লাগল। কিছু করার নেই তার। হাঁটতে হাঁটতে সে কোথায় যাচ্ছে অমন করে?
সে যাচ্ছে দর্জিদাদার কাছে। বড্ড ভালবাসে দর্জিদাদা ফালটুংকে। যত রাজ্যের গল্প তার দর্জিদাদার সঙ্গে। দর্জিদাদার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দর্জিদাদা জিজ্ঞেস করল, “কীরে ফালটুং, বাড়ি যাসনি?”
ফালটুং খুব হতাশ গলায় উত্তর দিল, “না গো দর্জিদাদা, আমি বড় বিপদে পড়েছি।” বলতে বলতে দর্জিদাদার পাশে গিয়ে বসল।
দর্জিদাদা চমকে তাকাল ফালটুং-এর দিকে। জিজ্ঞেস করল, “কেন, কী হল?”
“মাস্টারশায়ের ভেড়াটা পাহাড়ে চরতে চরতে কোথায় হারিয়ে গেছে।”
“এঁ! বলিস কী!”
ফালটুং এবার আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী করি বলো তো?”
দর্জিদাদা অবাক হয়ে বলল, “এমন তো আর কোনওদিন হয়নি! তোর চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোনও ছাগল-ভেড়া হারিয়ে গেছে, এমন কথা তো শুনিনি! কেমন করে হল?”
ফালটুং উত্তর দিল, “তোমায় কী বলব, আজ অজান্তে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। কেন জানি, মাথাটা বড় ঝিমঝিম করছিল।”
“চ, আমার সঙ্গে!” ব্যস্ত গলায় দর্জিদাদা বলল।
“কোথায়?”
“মাস্টারমশায়ের বাড়িতে।”
“মাস্টারমশাই যদি মারেন?”
“না রে বাবা, আমি তাঁকে সব বুঝিয়ে বলব’খন। চল।”
বলতে বলতে দর্জিদাদা দোকানের সব কাজ ফেলে ফালটুংকে মাস্টারমশায়ের কাছে নিয়ে চলল।
মাস্টারমশাই বাড়িতেই ছিলেন। দর্জি আর ফালটুংকে একসঙ্গে দেখে যেন অবাক হলেন। দর্জিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হে ওস্তাগর, হঠাৎ এসময়ে ফালটুংকে নিয়ে তুমি কেন?” সঙ্গে সঙ্গে ফালটুংকেও জিজ্ঞেস করলেন, “কই রে, আমার ভেড়া কই?”
ফালটুং উত্তরই দিতে পারল না। ভয়ে যেন বোবা। উত্তরটা দিল ফালটুং-এর দর্জিদাদা, “আজ্ঞে মাস্টারজি, সেইজন্যেই তো আপনার কাছে আসা। সেইজন্যেই ফালটুংকে সঙ্গে আনা।”
“কেন, কী হয়েছে?” ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন মাস্টারমশাই।
“ফালুটং-এর খুব বিপদ। আজ হয়েছে কী, ওর শরীরটা ভাল নেই। খারাপ শরীর নিয়েই সে ভেড়া চরাতে গেছল পাহাড়ে। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল বলে ওর ঘুম ঘুমও পাচ্ছিল। অজান্তে ঘুমিয়েও পড়েছিল। আর সেই ফাঁকে ভেড়াটা কোথায় পালিয়ে গেছে! বেচারা অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পায়নি।”
মাস্টারমশাই যেন আঁতকে উঠলেন। বললেন, “সে কীরে!”
দর্জিদাদা আবার বলল, “এই খবরটা দিতে ফালটুং একা আপনার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছিল বলেই, ওকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।”
মাস্টারমশাই উত্তর দিলেন, “সে তো ভাল করেছ ওস্তাগর, কিন্তু আমার ভেড়াটা যে গেল! সেটা যে অনেক দামি ভেড়া। আমার ভারী শখের।”
হঠাৎ ফালটুং মুখ খুলল, “আজ্ঞে কত দাম?”
মাস্টারমশাই বললেন, “কেন তুই দিবি?”
ফালটুং উত্তর দিতে পারল না।
উলটে মাস্টারমশাই উত্তর দিলেন, “ওরে বাছা, শখের জিনিস হারিয়ে গেলে সে কি দাম দিয়ে মেটানো যায়!”
দর্জিদাদা তখন জিজ্ঞেস করল, “তা হলে মাস্টারজি কী হবে?”
মাস্টারমশাই বললেন, “তুমি এখন যাও! ফালটুং আমার কাছে থাক। ভয় নেই ফালটুংকে আমি কিছু বলব না। তুমি বরং যাবার সময় ফালটুং-এর বাড়িতে খবর দিয়ে যাও, ফালটুং আমার কাছে আছে।”
কীরে বাবা, মাস্টারমশাই কি তা হলে ফালটুংকে ছাড়বেন না! ঘরে আটকে রাখবেন! মনে এমনই খটকা নিয়ে দর্জিদাদা সেখান থেকে চলে গেল। যেতে যেতে অবশ্য এও ভাবল, মাস্টারজি মানুষ ভাল। ভালমানুষ কি আর মারধর করেন!
যাই হোক দর্জিদাদা চলে গেলে মাস্টারমশাই ফালটুংকে ডাকলেন, “আয়, ভেতরে আয়।”
ফালটুং দুরুদুরু বুকে মাস্টারমশায়ের বাড়ির ভেতরে ঢুকল। মাস্টারমশায়ের ঘরে কত বই রে!
মাস্টারমশাই বললেন, “এখানে বোস!”
ফালটুং মেঝের ওপর মাদুর পাতা, তাতে বসল। আর অবাক হয়ে ঘরের চারদিকটা দেখতে লাগল। এরই ফাঁকে মাস্টারমশাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। একটু পরেই আবার এলেন। হাতে খাবারের থালা। বললেন, “খেয়ে নে।”
ফালটুং থমকে গেল।
“খা!”
ফালটুং ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “আমার খিদে পায়নি।”
“যা বলছি শোন!” মাস্টারমশাই গলা চড়ালেন।
ফালটুং কথা বাড়াল না। মানে মানে মুখে খাবার তুলল। খাবার মানে, রুটি।
“আমার ঘরে কত বই দেখছিস?”
ফালটুং মাস্টারমশায়ের কথা শুনে আবার হতভম্ব হয়ে দেখতে লাগল বইভর্তি ঘরটা। মাস্টারমশাই বললেন, “এত বই, আমি সব পড়ে ফেলেছি। তুই পড়তে পারিস?”
মাস্টারমশায়ের কথা শুনে ফালটুং চমকে ওঠে। রুটির শেষ টুকরোটা তার গলায় যেন আটকে যায়। সে বিষম খায়। বিষম খেতে খেতেই সে বলে ওঠে, “আমি অত বড় বড় বই পড়তে পারি না।”
“তবে?”
“অ-আ, ক-খ পড়তে পারি। লিখতে পারি।”
মাস্টারমশাই বললেন, “ওরে ছেলে বই না পড়লে, অনেক না-জানা জিনিস জানবি কেমন করে? বই না পড়লে হারানো জিনিস খুঁজে পাবি কেমন করে? তুই অ-আ, ক-খ পড়তে পারিস। সে তো ভাল। কিন্তু ছাগল-ভেড়ার বানান লিখতে পারিস? পড়তে পারিস?”
ফালটুং ঘাড় নাড়ল, “না।”
“শিখবি?”
এবার তার ঘাড় নড়ল, “হ্যাঁ।”
“তবে আয় শিখিয়ে দিই,” বলে, মাস্টারমশাই একটা খাতা আর পেনসিল বার করে শেখালেন, কেমন করে ‘ছ’-এর গায়ে আকার দিলে ‘ছা’ হয়। কেমন করে ‘ভ’-এর আগে একার দিলে ‘ভে’ হয়। কতক্ষণই বা লাগল। ফালটুং একনিমেষে শিখে ফেলল, ‘ছাগল’ আর ‘ভেড়া’ বানান দুটো। তারপর কোনও অজানা জিনিস আবিষ্কার করলে মানুষের যেমন আনন্দ হয়, তেমনই আনন্দে আচমকা ফালটুং চিৎকার করে বানান করতে লাগল, ছা-গ-ল = ছাগল, ভে-ড়া = ভেড়া। এমনি করে চেঁচাল সে একবার, দু’বার, তিনবার। তারপরে হঠাৎ এক কাণ্ড! মাস্টারমশায়ের ঘরের ভেতর থেকে শোনা গেল একটা ভেড়ার ডাক, “ব্যা-এ্যা-এ্যা!”
থতমত খেয়ে গেছে ফালটুং।
মাস্টারমশাই হেসে ফেলেছেন। বললেন, “ওই, শুনতে পাচ্ছিস?”
ফালটুং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল মাস্টারমশায়ের মুখের দিকে।
মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “আমার মুখের দিকে চেয়ে অমন করে কী দেখছিস? তোকে বললুম না, যত পড়বি, তত জানবি। হারানো জিনিস খুঁজে পাবি। ওটা সেই হারানো ভেড়া। আমার। এখন তোর গলার স্বর শুনে সাড়া দিল। ভাবছিস, এখানে এল কেমন করে? ওরে ছেলে, তুই যখন ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিলি, তখন আমি পাহাড়ে উঠেছিলুম দেখতে, তুই কী করছিস! যখন দেখলুম তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস, তখন আমি চুপিচুপি আমার ভেড়াটা নিয়ে আসি বাড়িতে। আমি জানতুম, ভেড়া খুঁজে না পেলে তোকে আসতেই হবে আমার কাছে। হলও ঠিক তা-ই।”
তারপর তার যত ভয়, সব শেষ। এমনকী ভয় পেল না মাস্টারমশাইকেও। সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ম্যাজিক।” চিৎকার করতে করতে মাস্টারমশায়ের ছোট্ট ভেড়াটা কোলে নিয়ে ছুট দিল সে। বেরিয়ে এল ঘর থেকে বাইরে। ছুটতে ছুটতে চলল সে দর্জিদাদার কাছে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে তার গলার শব্দ প্রতিধ্বনি তুলল, “ম্যাজিক-ক-ক!”
বোধহয় সে মনে মনে ভাবতে লাগল, এই ম্যাজিক খেলাটা সেই ম্যাজিকওলার খেলার চেয়ে কম না! অদ্ভুত যত কাণ্ড বটে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন