তিড়িং-তিড়িং পাখিটা

শৈলেন ঘোষ

ফুলটু সেদিন চিড়িয়াখানায় গেছল বাবার সঙ্গে। তো, চিড়িয়াখানায় ঢোকার আগে হঠাৎ ফুলটু দেখল কী, একজন ফিরিওলা পাখি বিক্রি করছে। পাখি মানে, তা বলে যেন মনে কোরো না সত্যি পাখি! খেলনা। কিন্তু ভারী মজার। পিঠে একটা দু’-হাত লম্বা রবারের দড়ি আঁটা। দড়ি ধরে টানো, পাখি তিড়িং তিড়িং লাফাবে। না হয় ধিনিক-ধিনিক নাচবে। তাই না দেখে খুব ভাল লেগে গেল ফুলটুর। আবদার করল, “বাবা, বাবা, পাখিটা কিনব।”

তা, বাবা আপত্তি করলেন না। কিনেই দিলেন।

ফুলটু খেলনাপাখি হাতে নিয়ে চিড়িয়াখানার ভেতরে ঢুকে পড়ল। তখনও ভিড় একটা তেমন হয়নি। তবে যে একেবারে ফাঁকা, তেমনও না। শীতের দুপুর। ঝকমকে রোদ। চারদিকে রং ঝলমল বাহার। এটা একটা জিরাফের আস্তানা। একটা-দুটো-তিনটে জিরাফ। অবশ্য তিন নম্বরটাকে একটা না-বলে বলা ভাল, আধখানা। কারণ সেটা বাচ্চা। হলেও বাচ্চা, তা-ও কী কম ঢ্যাঙা! ফুলটুকে ছাড়িয়ে মাথাটা হু-ই-ই-ই ওপরবাগে তুলে, ঘুরতে ঘুরতে একেবারে ফুলটুর সামনে এসে দাঁড়াল। ফুলটু বাইরের দিকে দাঁড়িয়ে। জিরাফ লোহার জালে বন্দি হয়ে ওদিকে আটক। তা ঠিক আছে, সামনে দাঁড়াতেই পারে সে। ফুলটুও তাকে “এই জিরাফ-ছানা” বলে ডাকতেও পারে। কিন্তু জিরাফ-ছানা যে ফুলটুর সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তার হাতের পাখিটার দিকে তাকিয়ে দেখবে, এটা ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারেনি ফুলটু। জিরাফ-ছানার দৃষ্টি তার হাতের দিকে পড়তেই, ফুলটু চেঁচিয়ে উঠেছে, “এই জিরাফ, পাখি নিবি?” বলেই ফুলটু পাখির পিঠে আঁটা রবারের দড়িতে টান দিয়েছে। পাখি তিড়িং করে লাভ মেরেই একেবারে জিরাফের মুখের সামনে। জিরাফ-ছানা চমকে উঠেছে! চমকে উঠেই দে পিটটান। একেবারে মায়ের কাছে পৌঁছে গেছে। তখন ফুলটুর সে কী হাসি!

তারপর ফুলটু পাখি নিয়ে, বাবার হাত ধরে চলল বাঁদরের খাঁচার দিকে। বাঁদরের খাঁচার সামনেই যত ভিড় ছোটদের। কেউ হাততালি দেয়, বাঁদর লাফায়। কেউ চেঁচায়, “বাঁদর কলা খাবি?” বাঁদর মুখ ভ্যাংচায়। এরই ফাঁকে ফুলটু করেছে কী, রবারের দড়ি টেনে বাঁদরের সামনে তার পাখিটাকে নাচাতে লাগল। প্রথমে একটা বাঁদর অবাক হয়ে দেখছিল। তারপরে আর একটা বাঁদরের চোখ পড়ে গেল পাখিটার দিকে। ওমা! কোথাও কিছু নেই, সেই বাঁদরটা পাখিটাকে নাচতে দেখে, নিজেও নাচতে লাগল। একটা বাঁদরকে পাখির সঙ্গে নাচতে দেখে আর একটা বাঁদর নাচ জুড়ে দিল খাঁচার ভেতরে। তারপর একে একে দশ-পনেরোটা বাঁদরের একসঙ্গে শুরু হয়ে গেল, তাক-ধিনা-ধিন নাচ। ফুলটুর সে কী আনন্দ। এবার ফুলটু একা হাসল না। যত খুদে খুদে দর্শক খাঁচার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সবাই হেসে কুটোকুটি হয়ে গেল। শেষমেশ কী হাততালির ধুম।

এবার হল কী, ফুলটু চলল জলহস্তীর জলের ধারে। উরি বাবা! ধুমসো হস্তী কেমন জলের ভেতর গা ডুবিয়ে নড়ছে। এদিক ওদিক ভাসছে। কী ভয়ানক মুখখানা। ফুলটু বোধহয় এই প্রথম জলহস্তী দেখল। তাই প্রথম দেখেই গা তার একটু ছমছম করে উঠেছিল। তারপর যখন ভয় আর পাচ্ছিল না, সে করল কী, পাখির রবার ধরে পাখিটাকে দিল উড়িয়ে জলহস্তীর মুখের সামনে। বলব কী, চোখের পলকে হস্তী জল তোলপাড় করে, পাখিটাকে গিলবে বলে তার ঢাপ্পুস মুখখানা হাঁ করে ফেলেছে। আর দেখতে হয়? ফুলটু এমন ভয় পেয়ে গেল তার হাঁ দেখে যে, তার হাত থেকে ফসকে গেল পাখিটা। সামনেই জলের ওপর হেলে ছিল একটা গাছ। শূন্যে ছিটকে পাখি মারল ডিগবাজি গাছের ডালে। রবারের দড়ি ডালে জড়িয়ে পাখি নাচতে লাগল। যাঃ! এবার কী হবে! কী আর হবে। শূন্য হাতে বাড়ি চলো! অগত্যা, পাখিকে গাছের ডালে দুলতে দেখে ফুলটু মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে এল বাবার সঙ্গে। মন খারাপ না-করে আর করবেই বা কী! পাখিটাকে যে পাড়বে গাছ থেকে, তেমন উপায়ই নেই। ওখানে হাতই যাবে না!

সেই তিড়িং-তিড়িং পাখিটার কিন্তু মন একটুও খারাপ হল না। সে একটা খেলনা-পাখি, কিন্তু মনটা তার জ্যান্ত পাখির মতো। তাই গাছের ডালে ফুরফুরে হাওয়ায় দুল-দুল করে দোল খেতে তার বেশ মজা লাগছে। সত্যিকারের পাখিগুলো সারাদিন কেমন গাছে গাছে নেচে বেড়ায়।

তিড়িং-তিড়িং পাখিটা গাছের ডালে অনেকক্ষণ দোল খেল। তারপর কখন যে আনমনে সে চোখের পাতা বুজে ফেলল! আহা! বড্ড ভাল লাগলে আরামে চোখের পাতা যে আপনিই বুজে যায়।

কতক্ষণ যে তিড়িং-তিড়িং পাখিটা চোখ বুজে ছিল কে জানে। হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছিল। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল! চোখের সামনে ওটা কী রে বাবা! দেখি তো ভাল করে। পাখি ভয়ে ভয়ে পিট পিট করে দেখতে লাগল। বাস রে, বাস! ওটা যে হাঁ করে আছে! হাঁ-এর গর্তটা কত বড়! বাবা! যেমনই গাব্বুস গর্ত, তেমনই ঢাপ্পুস দাঁত! হায় রে, এই সময় ফুড়ুত করে উড়ে ওর নাকের ডগায় যদি একটা টুসকি মেরে আসতে পারত তিড়িং-তিড়িং পাখি! তা হলে কী মজাই না হত!

হ্যাঁ, যাও না দেখি! ওর নাম জলহস্তী! এমন একখানি দেবে ঝাপটা! পাখির কম্ম সারা হয়ে যাবে!

উরি বাবা, এ কী ব্যাপার! হাঁ-চন্দর হাঁদারামের হাঁ-টা আগুন জ্বালানো হাপরের মতো বুজছে খুলছে, উঠছে-নামছে কেন? যেন গলা দিয়ে কী বিটকেল বিচ্ছিরি আওয়াজ বেরিয়ে আসছে ওঠা-নামার তালে তালে! কিছু বলছে নাকি? শুনি তো!

তাই তো! তাই তো! ঠিক বটে! জলহস্তী যে ডাক ছাড়ছে তিড়িং-তিড়িং পাখিটার দিকে চেয়ে চেয়ে: আঁই-খাঁই, আঁই-খাঁই!

পাখিটার মনে তখন ভয় ঢুকল না আনন্দে ভরল, কে জানে! পাখি তখন গাছের ডালে আরও জোরে জোরে দোল খেতে লাগল, আর গলা বাড়িয়ে বলে উঠল, “আবদার দেখে মরে যাই!”

পাখিটার কথা শুনে জলহস্তী আরও জোরে গর্জে উঠল: আঁই-খাঁই, আঁই-খাঁই।

পাখিটাও আরও জোরে দুলে উঠল: তোর মুখে দেব ছাই।

তারপরে হল কী, রেগেমেগে জলহস্তী গজরাতে লাগল:

আঁই-খাঁই, আঁই-খাঁই!

পাখিটা ভেংচাতে লাগল:

মুখে ছাই, মুখে ছাই!

এমনি করে চেঁচামেচি করতে করতে জলহস্তীর চোয়ালে ব্যথা ধরে গেল।

আর তিড়িং-তিড়িং পাখিটার নাচানাচির ঝাঁকুনিতে রবারের প্যাঁচটা ফস করে খুলে গেল। আর যায় কোথায়। পড়বি তো পড় গিয়ে সিধে জলহস্তীর নাকের ডগায়। জলহস্তী অমনি তেড়েমেড়ে মাথা নাড়ল। কান ঝাড়ল। লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিল। আর পাখিটা করল কী, নাকের ওপর লাগিয়ে দিল নাচানাচি। নাকের ওপর একবার নাচে তো, আর একবার কপালের ওপর। একবার নাকে সুড়সুড়ি দেয় তো, আর একবার দেয় টিকির ওপর ঠুক করে ঠুকরে।

একবার হল কী, সুড়সুড়ির ঠেলায় নিজেকে সামলাতে না-পেরে জলহস্তী হাঁ-হাঁ-হাঁ, হু-হু-হু করে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠেছে। যেই না হাসা, অমনি তিড়িং-তিড়িং পাখিটার পা ফসকে গেছে। পড়বি তো পড় গিয়ে জলহস্তীর নাকের গাব্বুর ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে! নাকের নিশ্বেস গেছে নাকের ভেতর আটকে! গলায় হাওয়া টেনে হাঁপাতে লাগল জলহস্তী। হাঁপাতে হাঁপাতে হয়েছে কী? তার নাকের গর্তে তিড়িং-তিড়িং পাখিটার ল্যাজের খোঁচা লেগে গেছে! আর যায় কোথায়! জলহস্তী ফ্যাঁচ-চ-চ করে ফেলেছে হেঁচে! একেবারে বাজখাঁই হাঁচি! যেই না হাঁচা, অমনি পাখিটা বন্দুকের গুলির মতো ছিটকে আকাশে উড়ে গেল! উড়তে উড়তে ঝিঁঝিপোকা, না জোনাকি, জোনাকি না চামচিকি, চামচিকি না আকাশের তারা, কী যে হয়ে হারিয়ে গেল, আর দেখা গেল না। জলহস্তী তখন জলের ভেতর মুন্ডুটা ডোবাল। নাকে জল টানল। তারপর মনে মনে ভাবল, নাহ্, নাকটা তার নাকেই আছে। পাখির সঙ্গে নাকটাও যে উড়ে যায়নি, এই রক্ষে!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%