শৈলেন ঘোষ

ওই দেখছ মাথার ওপর নীল আকাশ। এই দেখো নদীর জলে নীল আকাশের ছায়া। দেখো, নদীর ধারে মস্ত মাঠ। সবুজ গাছগাছালি। গাছগাছালির আড়ালে দেখতে পাচ্ছ একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। ছোট্ট, কিন্তু কী সুন্দর। চারদিকে অনেকটা খোলা জায়গা। বেড়া দিয়ে ঘেরা বাগান। ঠিক তার মধ্যিখানে ঘরখানি দাঁড়িয়ে আছে। ওই ঘরে থাকে এক বুড়ো আর তার বউ। সে-ও বুড়ি। তা, বয়েস হলেও বুড়ো-বুড়ি এখনও বেশ খাটতে পারে। ওই যে কুঁড়েঘরের চারদিকে ঘেরা বাগান, ওই বাগানে তারা ফসল ফলায়। বুড়ো হাটে-বাজারে ফসল বেচে আসে। বুড়ো হাটে গেলে বুড়ি ঘরকন্নার কাজ করে। তা, কাজ তো আর কম নয়। ঘর-দোর ঝাড়পোঁছ করো। কাপড়-জামা কাচো-ধোও। এটা ওটা রান্না করো। হলেও দুটো মানুষের সংসার, কাজের কী শেষ আছে!
আগে কিন্তু সংসারটা তাদের এত ছোট ছিল না। তাদের একটা ছেলে ছিল। তাকে আদর-যত্নে বড় করল। লেখাপড়া শেখাল। বিয়ে-থা দিল। একটি নাতি হল। তারপর একদিন বাপ-মাকে ফেলে ছেলে-বউ চলে গেল বুড়ো-বুড়ির আদরের নাতিকে সঙ্গে নিয়ে। সেই থেকে ঘরখানা খাঁ-খাঁ করছে। বুড়ো-বুড়ির মনও ফাঁকা ঘরে হা-হা করছে। তা, ছেলে যদি থাকতে না চায় তো কী করা যাবে! তাকে তো আর ধরে-বেঁধে রাখা যায় না। ছেলের বউ বলে, কুঁড়েঘর ভাল না। থাকা যায় না। ছেলে বলে, মাটি কোপানো ছি-ছি! পারা যায় না। তাই তারা ঠিক করল শহরে যাবে। ছেলে শহরে কাজ করবে। সেখানে অনেক ভাল ভাল কাজ আছে এই ভেবে তারা একদিন সত্যিই শহরে চলে গেল।
তো, এই হল ছেলের আক্কেল। বাপ-মাকে একা ফেলে চলে গেল শহরে। আর, সেই থেকে দুটিতে একা-একা পড়ে রইল এখানে। বিপদ-আপদ হলে কেউ দেখবার নেই। অসুখ-বিসুখ হলে কিছু করবার নেই। এমনই করে থাকতে থাকতে মানুষদুটো বুড়ো হয়ে গেল। মাথার চুল পাকল। গায়ের চামড়া ঝলঝলে হয়ে গেল। মুখে-কপালে বলিরেখা দেখা দিল। কিন্তু ছেলে আর এল না। বুড়ো-বুড়িও তাকে আসার জন্যে সাধাসাধি করল না। নিজেরাও তার কাছে গেল না। ছিঃ! যে-ছেলে বাপ-মাকে ভুলে থাকে, তার কাছে যেতে আছে! তাই দুটিতে একা-একা থাকে। একা-একা সুখ-দুঃখের কথা কয়। সময় কাটায়।
এমন সময় একদিন বুড়ো বলল, “বুড়ি, আমাদের দিনগুলো কেমন হুস-হুস করে কেটে গেল!”
বুড়ি উত্তর দিল, “কোথা দিয়ে যে কোথায় চলে যায় সময়টা।”
বুড়ো বলল, “কী আশ্চর্য বলো, দিন হচ্ছে, দিনের পর রাত নামছে, আবার দিন হচ্ছে, আবার রাত নামছে, সঙ্গে সময়ও ছুটছে, খালি ছুটছে।”
বুড়ির মুখে তখন হঠাৎ হাসির আভা ফুটে উঠল। মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে ঠাট্টা করে বলল, “একদিন তুমিও তো ছুটতে!”
“কে ছোটে না বলো,” বুড়ো জিজ্ঞেস করল। “তোমার ছেলেটা যখন এতটুকু, কথা বলতে পারত না ভাল করে, তখন কেমন ছুটে-ছুটে খেলা করত। তোমারও তখন বয়েস কম। তুমিও কেমন তার সঙ্গে খেলা করতে। সে খেলতে খেলতে খিলখিল করে হাসত। তুমিও তখন তার হাসির সঙ্গে গলা মিলিয়ে খিলখিল করতে। আমার কী ভালই না লাগত। আমি মনে মনে স্বপ্ন দেখতুম, ছেলেকে আমি আমার সঙ্গী করে মাঠে মাঠে ফসল ফলাব। হায় রে, স্বপ্ন দেখাই সার হল!”
বুড়ি বললে, “মনে আছে তোমার, একবার ছেলেটার সঙ্গে খেলতে খেলতে আমি কেমন পড়ে গেছলুম?” বলতে বলতে বুড়ি নিজেই হেসে ফেলল। “তারপর তুমি ছুটে এসে হাত বাড়িয়ে আমাকে তুলে নিলে। তখন ছেলের সে কী হাসি! ‘মা পলে গেছে, মা পলে গেছে’ বলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে একেবারে কুটোকুটি। আমার যদিও ব্যথা লেগেছিল খুব, কিন্তু ছেলের সেই আনন্দ দেখে, কোথায় ব্যথা আর কোথায় কী। আমি নিজেই তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলুম। সেদিনগুলো কোথায় গেল বলো তো?”
“এ সবই সময়ের কারসাজি,” উত্তর দিল বুড়ো। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমার মনে আছে বুড়ি, ছোট্টবেলায় ছেলেটা যখন হারিয়ে গেছল, সেই কথা?”
বুড়ি বলল, “বাব্বা, সে কথা মনে থাকবে না? সে কী কাণ্ড! সকালবেলা তুমি বাগানে মাটি খুঁড়ছ। আমি রান্না করছি। ছেলেটা ছবির বইয়ের পাতা উলটে ছবি দেখছে। তারপর একফাঁকে এসে আমাকে বললে, ‘মা গো, এই দ্যাখো ছবির বইয়ে কত বড় একটা মাছ! মাছটা যদি জ্যান্ত হত? কী মজা হত বলো?’
“আমি উত্তর দিলুম, ‘ঠিক বলেছিস বাবা, জ্যান্ত হলে ভারী মজা হত। ভেজে দিতুম, ভাত দিয়ে খেতিস।’
“ছেলে তখন এক উদ্ভট প্রশ্ন করে বসল, ‘আচ্ছা মা, ছবির মাছ কেন জ্যান্ত হয় না?’
“আমি উত্তর দিয়েছিলুম, ‘ও মাছ তো রং দিয়ে আঁকা। আঁকা ছবি কখনও জ্যান্ত হয়? জ্যান্ত মাছ জলে থাকে। আর আঁকা মাছ বইয়ের পাতায় থাকে।’ তারপরেই তো ছেলে হারিয়ে গেল।”
বুড়ো উত্তর দিল, “তখন আমাদের কী ভয়ানক অবস্থা। আমার ছেলের খোঁজে হন্যে হয়ে ছোটাছুটি করি। ছুটে যাই খেলার মাঠে।”
বুড়ি বলল, “ছুটে যাই ঠাকুরতলায়।”
“আমবাগানে।”
“নদীর ঘাটে।”
বুড়ি নদীর ঘাটের কথা মুখে আনতেই বুড়োর চোখদুটো যেন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, “হ্যাঁ, নদীর ঘাটে গিয়েও দেখি সে নেই। তবে কি ছেলেটা নদীর জলে মাছ ধরতে নেমে...” আতঙ্কে তোমার চোখ ছলছল করে উঠল। তুমি চোখের জল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলে, ‘এবার কোথায় খুঁজব তাকে?’ বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠলে তুমি। আমি আর থাকতে পারলুম না। ছুটলুম মাঠে। তুমিও আমার পিছু নিলে। আমি ছেলের নাম ধরে চেঁচাই, ‘ও ভোলা-আ-আ, ভোলা রে-এ-এ।’ আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে তুমিও ডাক দাও, ‘ফিরে আয় বাবা-আ-আ! তুই ফিরে না-এলে আমরা বাঁচব কী নিয়ে-এ-এ!’ এমনই করে ডাকতে ডাকতে সারা গ্রাম আমরা চষে ফেললুম হায় কপাল! কই ছেলে! তখন তোমার মতো আমারও চোখ উপছে জল আসে। ভাবি, তবে বুঝি ছেলেটা সত্যিই নদীর জলে ভেসে গেছে! আমরা আবার ছুটলুম নদীর ঘাটে। এবার নদীর ঘাটে গিয়েও আমরা হতভম্ব হয়ে গেলুম। তাজ্জব ব্যাপার! দেখি, ছেলে আমাদের নদীর জলে ভেসে যায়নি। কালু মাঝির নৌকোয় বসে সে জলের ওপর ভাসছে। কালু মাঝি মাছ ধরছে জাল ফেলে, ছেলে তা-ই দেখছে আনমনে। বাব্বা, সেই দেখে তবে ধড়ে প্রাণ এল!”
বুড়োর কথা শেষ হতেই বুড়ি বলে উঠল, “তারপর সেই ছেলে যখন আরও একটু বড় হল, শিখল গাছে চড়তে। তখন একবার কী বিপদে পড়েছিলুম আমরা বলো? ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়!”
বুড়ো উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ছেলেটা গাছে উঠেছিল পাখির ছানা ধরবে বলে। এ ডাল-ও ডাল করতে করতে একটা পলকা ডালে যেই পা রেখেছে, অমনই ডাল ভেঙে পড়ল! একেবারে সটান মাটিতে। পড়েই রক্তারক্তি কাণ্ড। ছেলে অজ্ঞান হয়ে গেল। ছোট ছোট হাসপাতালে ছোট। তা হাসপাতালে নিয়ে যেতেই ডাক্তারবাবু বকাবকি করে বললেন, ‘ছেলেটাকে তো আধমরা করে এনেছেন। শরীরে তো আর রক্ত নেই। এক্ষুনি রক্ত না-দিলে বাঁচানো যাবে না?’ আমি বললুম, এখন রক্ত কোথায় পাব ডাক্তারবাবু? আমার রক্ত দিলে যদি হয়, দেখুন। তা ভাগ্য ভাল, আমার রক্ত ছেলের কাজে লাগল। ছেলেটা বাঁচল। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।”
বুড়ি শুনতে শুনতে জবাব দিল, “ভাবলে মনে হয় গল্প-কথা।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বুড়ো।
তো, এমনই করে ছেলের কথা ভাবে দুটো মানুষ। একা-একা নিজেরাই সুখ-দুঃখের গল্প করে। হাসে, না-হয় মন খারাপ করে বসে থাকে।
একদিন হল কী, বুড়ো বলল, “বুড়ি, ক’দিন ধরে নাতিটার জন্যে মনটা বড় আনচান করছে।”
আর একদিন হল কী, বুড়ি বলল, “বুড়ো, ছেলেটার জন্যে মনটা বড় কেমন-কেমন করছে।”
তখন বুড়ো উত্তর দিল, “বুড়ি, যখন আমারও মন আনচান-আনচান করে, তোমারও মন কেমন-কেমন করে, তখন চলো কাল শহরে যাই। তাদের খুঁজে বার করে দেখে আসি তারা কেমন আছে।”
বুড়ি বলল, “বাব্বা! অত বড় শহরে কোথায় খুঁজবে তাদের?”
“চেষ্টা করতে দোষ কী?”
বুড়োর কথাটা বুড়ির খুব ভাল লাগল। বলল, “তবে চলো।”
তো, পরের দিন দুটিতে শহরে চলল।
বাস রে বাস! শহরের এ কী চেহারা হয়েছে! বুড়ো ছোটবেলায় কী দেখেছে এই শহরে, আর এখন কী দেখছে! গিজগিজ করছে লোকে-লোকে। বড় বড় বাড়ি। চওড়া চওড়া রাস্তা। গাড়ি-ঘোড়ার ছোটাছুটি। চেনাই যায় না। বাবা রে বাবা! এখানে কোথায় খুঁজবে তারা তাদের ছেলে, বউ, নাতিকে? কাকে জিজ্ঞেস করবে? কে বলবে তাদের ভোলা কোথায় থাকে? আর তা ছাড়া এই শহরে ভোলা নামে কি শুধু তাদেরই ছেলে থাকে? কত ভোলা যে ছড়িয়ে আছে শহর জুড়ে তার হিসেব কে রাখে? তবু বুড়ো-বুড়ি যতক্ষণ পারল এদিক-ওদিক আঁতিপাতি করে খুঁজল। কিন্তু খোঁজাই সার। শেষমেশ হয়রান হয়ে রাস্তার ধারে একটা বাগানে এসে বসে পড়ল। এখন নিশ্চয়ই পা টাটাচ্ছে! তা যেমন জ্ঞানগম্যি। অত হাঁটে!
বাগানে বসে বুড়ো বললে, “আমি একটু ঘাসের ওপর গড়িয়ে নিই।”
বুড়ি বললে, “ওই দ্যাখো, বরফ দেওয়া শরবত বিক্রি হচ্ছে! চলো, কিনে খাই!”
বুড়ো উত্তর দিল, “ঠিক বটে। ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে কী মেহনতই না করতে হল। আমার কথা ছেড়ে দাও, তোমায় কত কষ্ট করতে হল বলো! এখন দু’জনে দু’-গ্লাস শরবত খেতেই পারি। চলো যাই।” বলে দু’জনে শরবত খেতে চলল।
দুটিতে দু’-গ্লাস শরবত খেয়ে আবার ঘাসের ওপর এসে বসল। বুড়ো খানিক ঘাসের ওপর গড়াল। বুড়ি খানিক পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে রইল। বসে বসে দেখতে লাগল, কত মানুষ এদিকে যায়, কত মানুষ ওদিক থেকে আসে। কত মা ছেলেকে নিয়ে পথ হাঁটে। চমকে ওঠে বুড়ি। মনে মনে ভাবে, হায় রে, তার ছেলেও একদিন এমনই ছিল! তার ছেলেকে নিয়েও একদিন সে এমনই করে হাত ধরে পথে পথে বেড়াতে যেত। ছেলে হাসত। নাচত। ছুটত। আহা! সে-দিনগুলো কী সুন্দর ছিল!

বুড়িকে অমন মুখ চুন করে বসে থাকতে দেখে বুড়ো ঘাসের ওপর গড়িয়ে গড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, “অমন মন খারাপ করে কী ভাবছ বুড়ি?”
বুড়ি বলল, “আর ভাল লাগছে না। চলো বাড়ি যাই!”
বুড়ো ঘাসের ওপর থেকে উঠতে উঠতে বলল, “হ্যাঁ, আর দেরি করা ঠিক নয়। বেলা গড়াচ্ছে। সন্ধের আগেই বাড়ি পৌঁছতে হবে। চলো!” বলে বুড়ো আর বুড়ি শহর ছেড়ে বাড়ি চলল।
চলতে চলতে অনেকখানি পথ যখন তারা পেরিয়ে এসেছে, তখন বুড়ি দেখল কী, রাস্তার মধ্যিখানে একটা গোলাপ ফুল পড়ে আছে। এই বুঝি বুড়ো মাড়িয়ে ফেলে! না, বুড়ি চট করে বুড়োর হাত ধরে ফেলল। টান দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এই-ই-ই।”
বুড়ো থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
বুড়ি বলল, “এক্ষুনি মাড়িয়ে ফেলেছিলে!” বলতে বলতে ফুলটা রাস্তা থেকে তুলে নিল।
বুড়ো স্বস্তির নিশ্বেস ছেড়ে বলল, “ও হো, তাই বলো, গোলাপ ফুল। আমি ভাবি বুঝি কী না কী মাড়াই।”
বুড়ি বলল, “কী না কী বলে এমন সুন্দর গোলাপটাকে অমন হতচ্ছেদ্দা করছ কেন? আহা! তোমার মায়া হচ্ছে না? কে ফেলল এমন একটি রঙিন ফুল রাস্তায়? রাস্তায় যে ফুল ফেলে দেয়, সে কী নির্দয় বলো?”
বুড়ির কথা শুনে বুড়ো খানিক তাকিয়ে রইল ফুলটির দিকে। তারও মনটি যেন দুলে উঠল সেই ফুল দেখতে দেখতে। তারপর বলল, “দাও, ফুলটি বাড়ি নিয়ে যাই।” বলে বুড়ির হাত থেকে ফুলটি নিয়ে আবার দুটিতে হাঁটতে লাগল।
অনেকটা হেঁটে আরও খানিকটা পথ যেতেই বুড়ি হাঁকপাক করে বলে উঠল, “বুড়ো, দাঁড়াও, দাঁড়াও। ওটা কী পড়ে আছে দ্যাখো তো!”
“একটা রক্তমাখা তির!” বলতে বলতে বুড়ো তিরটা তুলে নিল।
বুড়ি অবাক হয়ে দেখতে দেখতে বলল, “এ নিশ্চয়ই কোনও বদ লোকের কাজ। তির মেরে কাউকে বধ করেছে বোধহয়।”
বুড়ো বলল, “তিরটাও ঘরে নিয়ে যাই, কী বলো? ছেলে-নাতির দেখা পেলুম না অনেক চেষ্টা করেও। তার বদলে পথে কুড়িয়ে পেলুম একটি গোলাপ ফুল আর একটি রক্তমাখা তির। এরাই এখন আমাদের সঙ্গী। একটি রক্তরাঙা ফুল। আর একটি রক্তমাখা শর।”
আবার তারা পথ হাঁটতে লাগল।
কী আশ্চর্য, মাত্তর কয়েক পা তারা হেঁটেছে। হঠাৎ তাদের নজরে পড়ে গেল একটা সাদা ধবধবে হাঁসের পালক খসে পড়ে আছে রাস্তার ওপর।
বুড়ি বলল, “ওই দ্যাখো, একটা হাঁসের পালক।”
বুড়ো পালকটা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে একমনে দেখতে দেখতে বললে, “নিশ্চয়ই কেউ এই তির ছুড়ে হাঁসের গায়ে আঘাত করেছে। হায়! হায়! চলো দেখি হাঁসটাকে দেখতে পাই কি না।”
বুড়ি বলল, “যে হাঁস মেরেছে, সে কি আর তোমার জন্যে রেখে গেছে হাঁসটা। দ্যাখো গে, সে হয়তো এতক্ষণে রান্নাঘরে পাক হচ্ছে।”
বুড়ির কথা হয়তো তখনও শেষ হয়নি, হঠাৎ তারা শুনতে পেল একটা হাঁসের কাতরানির শব্দ।
বুড়ো বললে, “শুনতে পাচ্ছ?”
বুড়ি খানিক থমকে দাঁড়াল। এধার-ওধার চোখ ঘোরাল। তারপর উত্তর দিল, “আহা রে! কোথায় পড়ে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বলো তো?”
বুড়ো বললে, “বোধহয় ওই ঝোপের মধ্যে। চলো দেখি।” বলতে বলতে রাস্তার ধারে সেই যে একটা ঘন ঝোপ দেখা যাচ্ছে, তার ভেতরে ঢুকে পড়ল। খুঁজতে লাগল ঝোপের ডালপালা সরিয়ে আঁতিপাতি করে।
হঠাৎ বুড়ি চিৎকার করে উঠল, “ও বুড়ো, ও বুড়ো, পেয়েছি।”
“কই?” বুড়ো ছুটল সেইদিকে।
দেখা গেল একটা দুধের মতো সাদা ধবধবে হাঁস। রক্তে ভেসে যাচ্ছে গায়ের পালক। যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
আহা রে! বুড়ি তুলে নিল বুকে। বুড়োকে জিজ্ঞেস করল, “কী হবে?”
বুড়ো বলল, “চলো ঘরে নিয়ে যাই।”
বুড়ি বললে, “চলো, কাছেপিঠে জল পাই কি না দেখি। বারবার হাঁ করছে। নিশ্চয়ই তেষ্টা পেয়েছে।”
তবে, তাদের যেতে হল না বেশি দূর। দু’-পা যেতেই সামনে পড়ল একটা দিঘি। ঢকঢক করে এক পেট জল খেল হাঁসটা। বুড়ি জলের ছিটে দিয়ে হাত বুলিয়ে তার গায়ের রক্ত মুছে দিল। দিতে দিতে বলল, “ভাগ্যিস বুকে লাগেনি। দ্যাখো, তিরটা ফসকে এইখানটায় আঘাত করেছে। একটু রক্ত ঝরেছে বটে, তবে তেমন কিছু হয়নি মনে হচ্ছে।”
“কই দেখি?” বলে বুড়ো হাঁসের ডানা সরিয়ে পেটের নীচটা দেখল। তারপর বলল, “না তেমন ক্ষত হয়নি। দাঁড়াও, এই গোলাপ ফুলের পাপড়ি ঘষে রসানি লাগিয়ে দিই ক্ষতের ওপর। ভাল হয়ে যাবে।”
বুড়ি বললে, “একেই বলে বরাত। ফুলটা বুঝি এই কাজের জন্যেই পথের ওপর পড়েছিল। ঠাকুরের দয়ায় যদি হাঁস প্রাণ ফিরে পায়, তবে এ-হাঁস আমি কাউকে দেব না। হাঁস আমাদের কাছে থাকবে। আমরা পোষ মানাব।”
বুড়ো বুড়ির কথায় সায় দিয়ে বলল, “ঠিক বলেছ বউ। আমাদের কেউ নেই। আজ থেকে এই হাঁসই হবে আমাদের মেয়ে। হাঁস-মেয়ের সঙ্গে হেসে-খেলে আমাদের বাকি দিনগুলো আনন্দেই কাটবে। চলো, হাঁস-মেয়েকে ঘরে নিয়ে যাই।”
এই ভেবে বুড়ো-বুড়ি হাঁসকে তাদের ঘরে নিয়ে এল। ঘরে আনার পরে দু’-দুটো দিন হাঁস দাঁড়াতে পারল না। বুড়ো তার জন্যে বাজার থেকে গুগলি-গেঁড়ি কিনে আনল। হাঁস পেট ভরে খেল।
তিনদিনের দিন হাঁস একটু একটু দাঁড়াতে পারল। কিন্তু হাঁটতে পারল না। বাজার থেকে বুড়ো তার জন্যে শ্যাওলা-ঝাঁঝি কিনে আনল। হাঁস পেট ভরে খেল।
চারদিনের দিন হাঁস এক-পা, এক-পা হাঁটতে পারল। একটু একটু ছুটতে পারল। ছুটতে ছুটতে খেলতে পারল। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে বুড়ির কোলে উঠে পড়ল। বুড়ি তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করল। মুখে বলল, “লক্ষ্মী, লক্ষ্মী, মেয়ে আমার ভারী লক্ষ্মী।”
তারপর পাঁচদিনের দিন হাঁস-মেয়ে একটি ডিম পাড়ল। বুড়ো বলল, “থাক, থাক, ছানা হবে।”
বুড়ি বলল, “এবার আমাদের নাতি হবে, নাতনি হবে। এবার আমার সুখের মুখ দেখব।”
দেখতে দেখতে একটির পর দুটি ডিম পাড়ল। দুটির পর তিনটি পাড়ল। এমনই করতে করতে দশটি ডিম পাড়ল হাঁস। ডিমে তা দিতে দিতে ডিম ফুটে ছানা বেরোল। তারা পোকা খায়, মাকড় খায়, মায়ের সঙ্গে পুকুরে যায়। পুকুর থেকে বাড়ি ফিরে বুড়ো-বুড়ির কোলে-কাঁকালে ঝাঁপিয়ে-লাফিয়ে খেলা করে।
বুড়ো বলল, “বুড়ি, বুড়ি, তোমার শূন্য কোল এবার ভরে গেল।”
বুড়ি বলল, “বুড়ো, বুড়ো, পৃথিবীটা কত সুন্দর।”
“খুব সুন্দর,” বলতে বলতে বুড়ো আর বুড়ি দু’জনেই হেসে উঠল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন