তুসি জাদু জানে

শৈলেন ঘোষ

তুসি তখন কত ছোট। সবে চার-এ পড়েছে। হেঁটে-ছুটে খেলতে শিখেছে। আধো আধো কথা বলে গান গাইতে শিখেছে। মায়ের কাছে গল্প শুনে খিলখিল করে হাসতে শিখেছে। তখনই সে একবার মামার বাড়ি গেছল। সেই যা যাওয়া। আর এই ক’দিন আগে তুসি দশ-এ পা দিল। অথচ এই ক’বছরে আর একবারও তার মামার বাড়ি যাওয়া হল না। সেই চার বছর বয়েসের কথা তার যতটা মনে আছে, তার চেয়ে সে ভুলে গেছে অনেক বেশি। আসলে বললেই তো আর হুট করে মামার বাড়ি যাওয়া যায় না। কারণ, তুসিরা থাকে দিল্লিতে, আর তার মামার বাড়ি কলকাতায়। সুতরাং এই দিল্লি থেকে কলকাতা যাওয়া মানে, সে তো আর বউবাজার থেকে বাগবাজার যাওয়া নয় যে, বাসে চেপে বসলেই হুস-শ-শ করে পৌঁছে যাবে!

মামার বাড়ি যেতে কার না ইচ্ছে করে! কিন্তু কে আর নিয়ে যাচ্ছে তুসিকে! দু’-একবার মাকে যে বলেনি, তেমন না। মা কথা কানেই নেন না। শেষকালে একদিন তুসি বলেই ফেলেছিল, “মা, মামার জন্যে তোমার মন কেমন করে না?”

মা সে-কথারও কোনও উত্তর দেননি। তুসির দাদু, দিদা কেউ নেই। সেই কারণেই মা’রও হয়তো মন টানে না। কিন্তু ভাই তো আর দু’-পাঁচটি নয়, একটি। তাকেও তো দেখতে ইচ্ছে যায়! তুসি শুনেছে, মামি নাকি তার খুব ভাল। মাঝেমধ্যে চিঠি লেখে মাকে। চিঠিতে তুসির কথা কত লেখা থাকে, ‘কেমন আছে? কেমন পড়াশোনা করছে? কেমন দেখতে হয়েছে?’ সাত-পাঁচ আরও অনেক কথা। আর সেইসব কথা শুনে শুনে তুসিও মনে মনে মামিকে খুব ভালবেসে ফেলেছে।

তুসির মামাতো ভাই দুটি, একটি বোন। তাদেরও কথা তুসি কিচ্ছু জানে না। মামির চিঠিতেও তেমন কিছু লেখা থাকে না। তাদেরও দেখার জন্যে তুসির মনটা যদি ছটফট করে, তুমি দোষ দিতে পারো না। যতই হোক, নিজেরই তো মামাতো ভাইবোন।

শুনলে অবাক হবে, মামার বাড়ি যাওয়ার সুযোগটা তুসির একদিন হঠাৎ এসে পড়েছিল। অফিসের কী একটা জরুরি কাজে বাবাকে কলকাতা থেকে হলদিয়ায় যেতে হবে। কথাটা তুসির কানে যেতেই ও এবার মাকে কিছু না বলে বাবাকেই ধরে বসল। বলল, “বাবা, এখন তো আমার বড়দিনের ছুটি থাকবে স্কুলে। আমায় নিয়ে চলো না, মামার বাড়িতে? তুমি যখন ফিরবে, তোমার সঙ্গে ফিরে আসব!”

বাবা বললেন, “আমায় বললে কী হবে, তোর মাকে জিজ্ঞেস কর।”

তুসি উত্তর দিল, “মা আমার কথা শোনেই না।”

বাবা বললেন, “তা হলে আমি আর কী করব!”

“তুমি নিজে একবার বলো না মাকে,” আবদার করল তুসি।

“তোর কথাই যখন শোনে না, আমার কথা শুনবে কেন?” বাবা জবাব দিলেন।

“হুঁ, তাই বইকী। তুমি বললে শুনবে না আবার!”

“যদি রাজি না হয়?”

“রাজি না-হওয়ার কী আছে বাবা! যাচ্ছি তো নিজের মামার বাড়ি।”

শেষমেশ বাবা উত্তর দিলেন, “ঠিক আছে দেখব’খন।”

বাবা অবশ্য কথা রেখেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন মাকে। মা কিন্তু এবারও সাড়া দেননি।

মায়ের কোনও সাড়া না পেয়ে বাবা বলেছিলেন, “কেন, তোমার আপত্তি কীসের? এখন স্কুলের ছুটি। পড়াশোনারও তেমন চাপ নেই। যখন অত করে বলছে, একবার ঘুরেই আসুক না। ক’টা দিন তো। আমি নিয়ে যাব। কলকাতায় ওকে রেখে, হলদিয়ার কাজটা সেরে আমিই ওকে নিয়ে ফিরে আসব। আর তা ছাড়া মাঝেমধ্যে এই বয়সে একটু এধার-ওধার ঘুরে আসা ভাল।

উত্তরে মা বলেছিলেন, “আমার আপত্তিটা কোথায় দেখলে?”

মায়ের উত্তর শুনে বাবা একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, আসলে মা তো কোনও আপত্তিই করেননি। চুপ করে ছিলেন, এই যা। তাই বাবা আমতা আমতা করে বলেছিলেন, “না, তেমন না। আপত্তি কিছু দেখছি না বটে, কিন্তু চুপ করে আছ তো!”

“যেতে যখন চাইছে, যাক না”, মা বলেছিলেন, “তবে কী জানো, ও তো কখনও একা যায়নি এতদূরে। থাকতে পারবে কি না, সেইটাই ভাবনা।”

তুসি আড়াল থেকে সব শুনছিল। মায়ের এই কথা শুনে একেবারে ছুট্টে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল “খুব পারব মা, খুব পারব।”

একথা কে না জানে, তুসি এক আশ্চর্য মেয়ে। যেমন কথাবার্তায়, তেমনই ব্যবহারে, তেমনই লেখাপড়ায়। আর দেখতেও খুব সুন্দর। কোনওদিন দেখবে না তুমি, মুখখানা হাঁড়ি করে বসে আছে। সবসময় মুখে হাসি। প্রত্যেক বছর ক্লাসে ফার্স্ট হবে। প্রোগ্রেস রিপোর্টে লেখা থাকবে ‘গুড কনডাক্ট’। তাই মা-বাবারও ভারী আদরের মেয়ে তুসি। অবশ্য সে-আদরেও এতটুকু আদেখলেপনা নেই। মা আর বাবা যেমন, মেয়েও তেমনই। ভারী সুন্দর একটি ছোট্ট সংসার।

শেষমেশ সত্যিই চিঠি চলে গেল মামার বাড়ি। সত্যিই একদিন বাবার সঙ্গে রেলে চেপে তুসি কলকাতায় পৌঁছে গেল। মা কাজের দিদিকে নিয়ে একা রইলেন দিল্লিতে।

হয়তো তুসি ভেবেছিল, মামা আসবেন স্টেশনে তাকে নিতে। কিন্তু অবাক হয়ে তুসি দেখেছিল, মামাও আসেননি, কেউ আসেনি। বাবা এই দেখে কী ভেবেছিলেন, তুসি জানে না। কিন্তু তুসি ভেবেছিল, মামা নির্ঘাত কোনও কাজে আটকে গেছেন। আপিস-কাছারি যাদের করতে হয়, তাদের তো আর হাতে অঢেল সময় থাকে না। তা ছাড়া আজকাল পোস্ট অফিসেরও যা কাজের বহর! দ্যাখো আবার চিঠি পৌঁচেছে কি না।

অবশ্য বাবা অপেক্ষা করেননি। একটা ট্যাক্সি নিয়ে সিধে লেকটাউন। সেখানেই মামার বাড়ি। তুসিকে নামিয়ে দিয়ে, কোনওরকমে মামির সঙ্গে দুটো কথা বলেই ছুট। কারণ, এমনিতেই ট্রেন লেট। তার ওপর আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এসপ্ল্যানেড থেকে হলদিয়ার বাস ছাড়বে। আজই পৌঁছতে হবে সেখানে। না হলেই নয়। সুতরাং যে ট্যাক্সিতে এসেছিলেন, সেই ট্যাক্সি ধরেই ছুট দিলেন এসপ্ল্যানেডে বাস ধরতে।

কী দারুণ খুশি হয়েছিলেন মামি তুসিকে দেখে। তুসিকে জড়িয়ে ধরে আদর যেন আর শেষ হয় না, ‘ওমা, তুসি কত বড় হয়ে গেছে! কী সুন্দর দেখতে হয়েছে! ওঃ সেই কবে দেখেছি, তখন তুসি কতটুকু।’ কত কথা মামিমা’র মুখে।

তুসিও তেমনই মামির সঙ্গে নিমেষে এমন সহজ হয়ে কথাবার্তা শুরু করে দিল, যেন তার কতকালের চেনা এই মামি। বলতে গেলে মামির কথা তার কিচ্ছু মনে ছিল না। তবু চোখের পলকে এমন আপন হয়ে গেল ভাবলে অবাক লাগে।

কিন্তু আশ্চর্য তো! বাড়িতে আর কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছে না তুসি! না দেখছে মামাকে, না ভাইবোনকে! তাই তুসি জিজ্ঞেস করল, “মামি, মামাকে দেখছি না?”

মামি যেন কেমন হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, “ওই তো ওপরের ঘরে আছে, যা না।”

তুসি বললে, “কোনদিকে যেতে হয় আমি তো জানি না।”

মামি বললেন, “সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যা। বারান্দার সামনেই ঘর।”

সিঁড়ি দিয়ে একাই তুসি ওপরে উঠে এল।

দুই

লেকটাউন-এ এখন অনেক নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে। কত সব নতুন নতুন ডিজাইন। অবশ্য দু’-একটা পুরনো বাড়ি যে দেখতে পাবে না, তা বলি না। অনেক বাড়ির সামনে-পেছনে বাগান। সাজানো-গোছানো বেশ দেখতে লাগে। এমন একটা বাগান এ বাড়িতেও আছে। পেছন দিকে। তবে এখন তাকে বাগান না বলে জঞ্জাল ফেলার জায়গা বললে অন্যায় হবে না। যদিও বাড়িটা খুব একটা নতুন নয়, তবে ঝরঝরেও নয়।

মামার চেহারাটা তুসির একদম মনে ছিল না বলেই, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তুসি মনে মনে ভেবেই নিয়েছিল, মামা তার নিশ্চয়ই খুব হাসিখুশি মানুষ। নিশ্চয়ই তুসিকে দেখে আনন্দে আটখানা হয়ে আদর করবেন।

ওপরে উঠতেই বারান্দার সামনে লাগোয়া ঘরটা দেখে তুসি একটু দাঁড়াল। তারপর উঁকি মারল। ব্যাস! অমনি আচমকা একটা কুকুর ঘরের ভেতর থেকে ঘেউঘেউ করে তেড়ে এসেছে। তুসির তো ভয়ে প্রাণ যায় আর কী! না, খুব রক্ষে, কুকুরের মনিব সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলেন, “বেলি, বেলি।”

বেলি মনিবের ধমক খেয়ে তেড়েমেড়ে ল্যাজ নাড়তে লাগল। আর চারপাশে ঘুরপাক খেতে খেতে গজরাতে লাগল। তুসি বুঝতে পারল না, কুকুরের মনিব তার মামা কি না! আর মামাই যদি হন, তবে যে তাঁর ঘরের সামনে একজন নতুন অতিথি এসেছে, তিনি তো উঠে আসবেন! তা নয়, পেছন ফিরে টেবিলের সামনে বসে কী যেন করছেন। কাজেই এখন তুসি কুকুরটার জন্যে না পারছে ঘরে ঢুকতে, না পারছে কুকুরের মনিবকে ‘মামা’ বলে ডাকতে। অথচ ওখান থেকে যে ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, মামির কাছে পালাবে তারও জো নেই। কেন না, পালাতে গেলেই নির্ঘাত কুকুরটা তেড়ে এসে কামড়ে দেবে। অগত্যা তুসি দাঁড়িয়েই রইল।

প্রথম চোটেই যে তুসিকে এমন একটা ধাক্কা সামলাতে হবে, একথা তুসি ভাবেইনি একদম। কিন্তু লোকটা যদি সত্যিই তুসির মামা হন, তবে তাঁরই বা কী আক্কেল! তুসি যে এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, একবার চোখের দেখাও তো দেখবেন!

সুতরাং তুসি লোকটাকে ‘মামা’ বলে ডাকবে, কি ডাকবে না, এর উত্তর ভেবে না-পেয়ে দাঁড়িয়েই রইল।

কতক্ষণই বা দাঁড়িয়েছে, এক সেকেন্ডও হবে না, কোত্থেকে আচমকা ধাঁই করে একটা ইট পড়ল তুসির মাথায়। তুসি চমকে উঠেছে। মাথায় হাত দিয়ে পিছু ফিরতেই, দুম! পিঠে একখানা কিল পড়ল। তুসি চোখ ফেরাতে না-ফেরাতেই মাথার চুল ধরে হিড়হিড় করে এক টান।

তুসি উঁ-হু-হু করে চেঁচিয়ে উঠেছে। অমনই সেই ঘরের লোকটা ধমকে উঠল, “কে? কে ওখানে চিৎকার করছে?”

তুসি দেখতে পেয়েছে। দেখল কী, তিনখানা মুখ আড়ালে দাঁড়িয়ে তার দিকে উঁকি মারছে। একজনের জিভ-ভেংচানো মূর্তি। একজন ঘুষি পাকিয়ে, আর একজন চোখ টেরিয়ে ভয় দেখাচ্ছে! তুসির বুঝতে বাকি রইল না, এই তার মামাতো ভাইবোন। যে জিভ ভেংচাচ্ছে, সে দোলা। যে ঘুষি পাকিয়ে আছে, সে টুলু। আর চোখ টেরাচ্ছে যে, সে নিলু। নিলু মানে সবচেয়ে বড়। তারপর টুলু। আর সব-ছোট বোন দোলা। অবশ্য তুসির চেয়ে তিনজনেই ছোট। তুসি নিলুর চেয়ে খুব বেশি হলে এক বছরের বড়। তারপর টুলু আর দোলা। ওদের ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুসি আর মুখে হাসি আটকে রাখতে পারল না। হি-হি করে হেসে উঠেছে। যদিও এইমাত্র যে ঘটনাটা ঘটল, তাতে মানুষের মুখে হাসি ফোটাটাই আশ্চর্য। বেমক্কা পেছন থেকে এমন করে কেউ ভেংচালে কার না রাগ ধরে! তারওপর, মানুষটা এইমাত্তর অতদূর থেকে আসছে। তা ঠাট্টা যদি করতেই হয়, এখনই কি ঠাট্টা করার সময়? না, এমন হওয়া উচিত ঠাট্টার ধরন?

কিন্তু তুসির হাসি শুনে নিমেষে লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, “বেলি, বেলি, লু— লু!”

আর দেখতে! কুকুরটা একলাফে তেড়ে এল তুসির দিকে, “ঘেউ ঘেউ।”

তুসির তো হাত-পা পেটের মধ্যে! হাসিটাসি মাথায় উঠল। উরি বাবা! কুকুরটাকে কী দেখতে! কালো একদম আবলুশ কাঠ। মুখখানা হাঁড়ির মতো। গলাটাও তেমনই হেঁড়ে। অন্য কেউ হলে, “ওরে বাবা রে” বলে মারত ছুট। কিন্তু তুসির যদিও ভীষণ ভয় লাগছিল, তবুও সে ছুটল না। ভয়ে চেঁচালও না। কুকুরটা চিৎকার করে যতই লাফায়, তুসি ততই ‘তু-তু’ করতে থাকে, ভারী মজার কাণ্ড তো! এই দ্যাখো, কোথায় কুকুরটা তুসিকে ঘ্যাঁক করে কামড়ে দেবে, তা নয়, তুসির মুখে তু-তু শব্দ শুনে ল্যাজ নাড়তে শুরু করে দিলে! এ কী! তুসির পা শুঁকছে যে! তুসি হাতটা বাড়িয়ে দিতেই কুকুর হাত চাটছে! কোথায় তুসিকে শায়েস্তা করার জন্যে কুকুরটাকে লেলিয়ে দেওয়া হল, এ যে দেখি উলটে কুকুর তুসির সঙ্গে ভাব করে বসল। তুসি সঙ্গে সঙ্গে হেঁট হয়ে কুকুরটার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে ডাক দিল, “বেলি, বেলি, চুচ্চু!” কুকুরটা আনন্দে দু’পা তুলে জড়িয়ে ধরল তুসিকে।

ঠিক তক্ষুনি ঘরের লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এক ধমক দিল তুসিকে, “কী হচ্ছে! অ্যাঁ! আমার কুকুরের গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছে কেন?”

তুসি এতক্ষণে দেখতে পেল লোকটাকে। কী লম্বা একজোড়া গোঁফ রে বাবা! তুসি আর একটু হলেই হেসে ফেলেছিল। হাসিটাকে কোনওরকমে সামলে নিয়ে বলল, “না, কুকুরটা বেশ!”

“বেশ, কি বেশ নয়, সেটা আমি বুঝব।”

তুসি লোকটার এমন ব্যবহারে প্রথমটা একটু থতমত খেয়ে গেল। তাই আমতা-আমতা করে বলল, “আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“কথাটা যদি জিজ্ঞেস করার মতো হয়, জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।”

“আপনি কি আমার মামা?”

“এটা তোমার মামার বাড়ি। মামার বাড়িতে মামার মতো যখন একটা মানুষ রয়েছে, তখন তাকে মামা বলতে তোমার আপত্তি আছে নাকি?”

তুসি চট করে ছুটে মামার পায়ের ধুলো নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আমি তুসি।”

মামা তেমনই গম্ভীর স্বরেই বললেন, “সেটা আমার জানা আছে।”

“বাবার খুব তাড়া। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করার সময় পেল না। এক্ষুনি হলদিয়ার বাস ছাড়বে। তাই চলে গেল। ক’দিন পরে ফিরবে। তদ্দিন আমি এখানে থাকব।”

মামা তেমনই রুক্ষ স্বরে বললেন, “বাইরে কোথাও গেলে, সবাই আবার ফিরে আসে। এতে ঢাক পিটিয়ে বলার কিছু নেই। তবে আমার এখানে থাকতে গেলে কতকগুলি নিয়ম মেনে চলতে হয়। আমি হইহই পছন্দ করি না। আমি বেহায়ার মতো হাসাহাসি পছন্দ করি না। আমার কুকুরের গায়ে হাত দিয়ে যে আহ্লাদেপনা করে তাকে আমি দেখতে পারি না। হুটহাট কেউ রাস্তায় বেরিয়ে ঝালমুড়ি বা ফুচকা খেয়ে আসে, এও আমি পছন্দ করি না। এগুলো এ-বাড়ির নিয়ম। এখানে সকাল হয় ভোর পাঁচটায়। আর রাত হয় ঘড়ির দশটায়। আমার ছেলেমেয়েদেরও আমি এই নিয়ম শিখিয়েছি। আশা করি আমাকে আর কিছু বলতে হবে না।”

ঠিক সেইসময় দেখা গেল মামার ছেলেমেয়েরা তুসিকে পাশের ঘরের দরজার আড়াল থেকে বক দেখাচ্ছে। তুসি বুঝতে পারল পাশের ঘরটা ওদের পড়বার ঘর। সেদিকে একবার আড়চোখে দেখে নিল তুসি। তারপর মামার এইসব নিয়মের কথায় একটুও মুষড়ে না পড়ে হাসতে হাসতেই বলল, “জানেন মামা, দিল্লিতে ঝালমুড়ি পাওয়াই যায় না। ওখানে ভেলপুরির একেবারে ছড়াছড়ি। আমাদের স্কুলের সামনেই রোজ তিন-চারজন ভেলপুরি বিক্রি করতে আসে।”

বুঝতেই পারছ, তুসির মুখে এ-কথা শোনার পর মামার মুখের কী অবস্থা হয়! তাঁর গম্ভীর মুখখানা রাগে আরও ফুলে উঠল। সেই ফোলা মুখ নিয়ে তিনি একটু চোখ ফেরাতেই নজরে পড়ে গেল, নিলু, টুলু, দোলা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে। তিনি তো রেগে টং। বাজখাঁই গলায় হাঁক পাড়লেন, “নিলু, টুলু, দোলা!”

বাবার হাঁক শুনে নিলু, টুলু, দোলা তো ভয়েই অস্থির। একেবারে পড়িমরি করে বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। তুসি স্পষ্ট দেখল, তিনজনের মুখই যেন শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। ওরই মধ্যে ছোট্ট মেয়ে দোলা একবার বাবার দিকে আর একবার তুসির দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে। বাবা তিনজনকে সামনে পেয়ে তেমনই তিরিক্ষি মেজাজে ধমক মারলেন, “আটটার সময় ক’টা বাজে?”

তিনজনে প্রায় একই সঙ্গে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “আটটা বাজে।”

বাবা আর ছেলেমেয়ের কথাবার্তা শুনে তুসি তো হেসেই আকুল। বললে, “আটটার সময় আটটা বাজবে না তো ক’টা বাজবে?”

তুসির হাসি শুনে তো নিলু, টুলু, দোলার চক্ষু কপালে। এই রে! বাবা বুঝি এই দিলেন তুসির গালে ঠাস করে চড়িয়ে। না, তিনি তা করলেন না। শুধু কড়কে উঠলেন। বললেন, “আমি তোমায় আগেই বলেছি, বেহায়ার মত হাসাহাসি আমি পছন্দ করি না!”

তুসি মামার ধমকটা কানে না নিয়ে বলল, “আচ্ছা, হাসির কথা হলে মানুষে হাসবে না?”

“হাসির কথাটা কোথায় হল যে, মানুষে হাসবে?”

তুসির যদিও এখনও ভীষণ হাসি পাচ্ছিল, তবু অনেক কষ্টে হাসিটাকে আটকে রেখে বললে, “আটটার সময় আটটা না বাজলে নিশ্চয়ই আটটার সময় দশটা বাজবে না?”

তুসির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মামার চোখদুটো কটমট করে উঠল। সেদিকে তুসি না-তাকিয়ে দোলার কাছে এগিয়ে গেল। ওর চিবুকটি ধরে আদর করে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম দোলা?”

ওমা! দোলা অমনই প্যানপ্যান করে চেঁচিয়ে উঠল, “দ্যাখো না বাবা, মেয়েটা আমায় আদর করছে!”

তুসি তো অবাক। ভাবলে, যাচ্চলে! আদর করলে কেউ আবার নালিশ করে নাকি!

মেয়ের নাকি-কান্না শুনে বাবা ক্ষিপ্ত হয়েই তুসিকে বললেন, “মনে হচ্ছে লেখাপড়া তুমি একদম করো না! বইটইয়ের মুখোমুখি হওয়া অনেক আগেই চুকিয়ে ফেলেছ!”

তুসি উত্তর দিল, “আমি ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি।”

“ভেলপুরি পেটে পড়লে পড়াশোনা আসে?”

“আমি ফার্স্ট হই।”

মামা একটু থমকে গেলেন। তারপর চোখ পাকিয়ে নিলু, টুলু, দোলাকে ধমকে উঠলেন, “এখনও পর্যন্ত পড়াশোনার নাম নেই, যাও!” বলতে বলতে মামা ঘরে ঢুকে গেলেন। নিলু, টুলু, দোলা পালাল।

এতক্ষণ এতসব কথাবার্তা মামার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হচ্ছিল। এতক্ষণ তুসিও ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। মামা ঘরে ঢুকতে তুসিও পিছু পিছু ঢুকে পড়ল। ওমা! বেলিটা তো ছাড়ছে না তুসিকে। তুসি ঘরে ঢুকে মামাকে বলল, “আমায় কিন্তু কেউ বকে না। কাউকে বকতে দেখলেও আমার কষ্ট লাগে।”

মামা তো চটেই ছিলেন। তুসির এই কথা শুনে যেন ভস্মে ঘি পড়ল। বললেন, “ওসব আবদার আমার কাছে চলবে না। আমি লাই দিই, আর তোমরা আমার মাথায় উঠে নাচো! ভারী মজা, না?”

“জানেন মামা, আমি নাচতে পারি।”

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি।”

“এবার স্কুলে একটা নৃত্যনাট্য হয়েছিল, আমি নেচেছিলুম।”

“ছিঃ, ছিঃ! এতবড় মেয়ে স্টেজে উঠে পাঁচজনের সামনে ধেই ধেই করে নাচা!” বলতে বলতে মামার মুখখানা কী বিচ্ছিরিরকম বেঁকে গেল।

তুসি বলল, “আমাকে দেখেই বলছেন ‘এত বড়’! আমাদের স্কুলের ক্লাস টেনের মীরাদিকে দেখলে কী বলবেন তা হলে? আমার চেয়ে কত বড়। কিন্তু কী সুন্দর নাচে! মীরাদির নাচ দেখলে আপনাকে হাততালি দিতেই হবে। প্রত্যেক বছর কমপিটিশনে মেডেল পায় মীরাদি।”

মামা গজরাতে লাগলেন, “ঠিক আছে, এসব ব্যাপার নিয়ে তোমার মাকে আমি আচ্ছা করে চিঠি লিখব। মেয়ে বড় হচ্ছে, এ কী, স্টেজে নাচানাচি! ছ্যাঃ!”

“আমি তো গানও গাইতে পারি।”

মামা এমন কটমট করে তাকালেন তুসির দিকে, যেন ভস্ম করে দেবেন। তারপর বললেন, “আমার আপিস যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”

কিন্তু সে-কথা কানে নিল না তুসি। ছুট্টে ঘরের পেছনদিকে একটা জানলা ছিল, সেই জানলাটার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “পেছন দিকে কী আছে মামা?”

মামা কোনও উত্তর দিলেন না।

তুসি জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে বললে, “ওমা! পেছনে কত জায়গা! এমন জঞ্জালে ভর্তি কেন? বাগান করলে কী সুন্দর লাগত।”

মামা খেঁকিয়ে উঠলেন, “আমি কি পাখি? বাগান করে গাছের ডালে নেচে বেড়াব!”

এইবার আর থাকতে পারল না তুসি। ভীষণ জোরে হেসে উঠল, হি-হি-হি! হাসতে হাসতেই বলল, “আপনি তো মানুষ, পাখি হবেন কী করে।”

তুসির কথার উত্তর দিলেন না মামা। শুধু মুখে একটা ঝাপটা মেরে দুম করে গায়ের জামাটা খুলে ফেললেন। খুলে বিছানায় ছুড়ে দিলেন।

তুসি বললে, “ওখানে রাখছেন কেন? জামা তো আলনায় থাকে।” বলে তুসি নিজেই জামাটা আলনায় গুছিয়ে রাখলে। মামা তুসির দিকে আর না তাকিয়ে ঘড়ির দিকে ফিরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “ইস, কত বেলা হয়ে গেল!” তারপর সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে চলে গেলেন চান করতে।

তুসি এই ফাঁকে মামার টেবিলের ওপর অগোছালো বইপত্তরগুলো গুছিয়ে রাখল। বিছানায় ছড়ানো-মড়ানো বালিশ-চাদর ভাল করে পেতে রাখল। আলনায় জামা-কাপড়গুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখল। আলমারির আয়নাটার গায়ে রাজ্যের ধুলো পড়েছে। সাফ করল। ছোট্ট হলে কী হবে, এরই মধ্যে সে ঘরকন্নার টুকিটাকি কাজগুলো সব শিখে ফেলেছে। মা একা। যদিও কাজের দিদি মাকে অনেকখানি সাহায্য করে, তবু ফাঁক পেলে কাজের দিদির সঙ্গে তুসিরও মাকে এটা-ওটা করে দিতে খুব ভাল লাগে। সত্যি বলতে কী, মা ভারী ভাল। তুসিকে একদম বকেন না। অবশ্য বকার কথা ওঠেই না। কেন না, তুসি তো বকার মতো কাজ করে না। কী ভাল গান গায় মা। মায়ের কাছেই গান শিখেছে তুসি। মায়ের শরীরে যেন রাগই নেই। অথচ দ্যাখো, মামা কী সাংঘাতিক রাগি। মায়েরই তো ভাই। অথচ একদম উলটো স্বভাব। দেখলেই মনে হয়, মামার ভেতরে যেন একটা রাগি-দত্যি সবসময় চোখ রাঙিয়ে ফোঁসফোঁস করছে। মামার তাড়া খেয়ে খেয়ে ছেলেমেয়েগুলোও হয়েছে তেমনই। অবশ্য এসব নিয়ে তুসির কোনও ভয়ও নেই, ভাবনাও নেই। কারণ অতশত বোঝার এখন তো তার বয়স নয়। তুসির জগৎটা খুশির জগৎ। আর এই খুশি ওর মনের মধ্যে গেঁথে গেছে মা আর বাবার জন্যে। অদ্ভুত দুটি সুখী মানুষ তুসির মা আর বাবা। আর আশ্চর্য তাঁদের এই মেয়েটি।

মামার সত্যিই আপিসের দেরি হয়ে গেছে। কোনওরকমে চান করে, নাকে-মুখে গুঁজে মামা অফিসে চলে গেলেন। অফিসে যাবার সময় তো আর কথা বলার সময় থাকে না। তার ওপর যদি দেরি হয়ে যায় তো আর দেখতে হবে না। অফিস যাবার সময়েও কিন্তু মানুষটার একবারও মনে হল না, তাদের বাড়ির এই ছোট্ট অতিথিকে অন্তত একটা কথা বলে যাই। অবশ্য বেরোবার সময় তুসি বলতে ভোলেনি, “মামা সাবধানে যাবেন। শুনেছি আপিস-টাইম-এ কলকাতার রাস্তায় ভীষণ গাড়ির ভিড়।” মামার তখন তুসির কথা শোনার সময় নেই। শুনলেও চোখ ফিরিয়ে দেখারও ফুরসত নেই।

তিন

এখন একটু একটু ক্লান্তি লাগছিল তুসির। যতই হোক, সারারাত ট্রেনে আসা! ধকল তো আছেই। কিন্তু তুসির মুখ দেখে তা বোঝবার উপায় নেই। তাই মামি যখন জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, কী কথা হল মামার সঙ্গে?”

তুসি মুখখানি হাসিতে ভরিয়ে ফেলে জবাব দিল, “মামা খুব ভাল।”

প্রথম যে-প্রাণীটির তুসি মন জয় করেছিল, তার নাম বেলি। মামার কুকুর। মামা বেরিয়ে যাবার পর বেলি যেন তুসিকে ছাড়তে চায় না। তুসির সঙ্গে বেলির এত ভাব দেখে মামিও অবাক। বললেন, “বাড়িতে অচেনা লোক দেখলে রক্ষে নেই। বেলি চেঁচিয়ে একেবারে বাড়ি মাথায় করে। দেখি, তুসির সঙ্গে তো বেশ খেলা করছে!”

ওমা! কোথায় ছিল দোলা, ছুটে এসে বেলির সামনে দাঁড়িয়ে ধমক মেরে ডাক দিল, “অ্যাই বেলি, শিগগির আসবি। কে বলেছে তোকে ওর সঙ্গে খেলা করতে!”

দোলার কথা শুনে মামি বললেন, “ছিঃ দোলা, অমন কথা বলতে নেই, দিদি হয় না!”

দোলা ঠোঁট উলটিয়ে বলল, “উঃ, দিদি না ঘেঁচু।” তারপর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে ডাক দিল, “দাদা, দাদা, মেয়েটা বেলিকে আসতে দিচ্ছে না।”

মামির মুখখানা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আপন মনেই বলে উঠলেন, “ইস! ছেলেমেয়েগুলো যেন দিনকে-দিন কী হচ্ছে!”

তুসি কিন্তু দোলার কথা শুনেই হেসে ফেলল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বেলিকে ডেকে নিয়ে চলল, “বেলি, বেলি, আয়!”

বেলি তুসির ডাক শুনে টপাস-টপাস করে সিঁড়ির ওপর লাফ মারল। একছুটে ওপরে। তুসিকে ঘরেও যেতে হল না। বারান্দা অবধি গেছে, দ্যাখে কী, নিলু, টুলু দোলা তুসির পথের সামনে চোখ পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনে যেন তিন খুদে-ডাকাত।

তুসি হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলল, “আমার নাম তুসি। আমি তোমাদের দিদি।”

নিলু তখন ডাকাত-সর্দারের মতো চোখদুটো রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমাদের কুকুরের গায়ে হাত দিয়েছ কেন? বাড়াবাড়ি আমি পছন্দ করি না,” তারপর বেলির কান ধরে টান দিল, “বেলি আয় এখানে!”

বেলি কিন্তু এল না। তুসির কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাজ নাড়তে লাগল।

তাই দেখে টুলুর কী রাগ। তুসির দিকে হাত উঁচিয়ে বলল, “এক থাপ্পড় মারব।”

দোলা ভেংচি কেটে দিল, “উঁ! মাথায় আবার রিবন বেঁধেছে!”

তুসির কিন্তু তেমনই হাসি হাসি মুখ। বলল, “আমার অনেকগুলো রিবন আছে। দোলা, তোমায় একটা দেব।”

দোলা ঠোঁট উলটিয়ে বললে, “অত আর না। গায়ে পড়ে ভাব করতে আসছে।”

দোলার কাছে এগিয়ে গিয়ে তুসি ওর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, “কেন, আমার সঙ্গে ভাব করবে না?”

দোলা এক ঝটকায় তুসির হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “আমার গায়ে হাত দেবে না বলে দিচ্ছি! আমি বাবাকে বলে দেব!”

টুলু হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,“বাবাকে বলতে হবে না। আমিই ঠান্ডা করে দিচ্ছি,” বলে তিরের মতো ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

তুসি কিন্তু রাগতে জানে না। অথচ নিলু তেমনই মেজাজ দেখিয়ে বলল, “এ-বাড়িতে ঢুকেছ যখন ঠিক আছে। ওপরে উঠবে না। আমাদের ঘরে ঢুকবে না।” বলে নিলু আবার ডাক দিল, “বেলি, আসবি! আয় বলছি।” তবু বেলি নড়ল না।

তুসি এবার খুব জোরে হেসে উঠে বলল, “বেশ, তোমাদের ঘরে নাই গেলুম, মামার ঘরে তো যেতে আপত্তি নেই!”

নিলু খেঁকিয়ে উঠে বলল, “একটা কথা দশবার বলার সময় নেই আমার। একবার বলেছি, তুমি ওপরে উঠতে পারবে না। ব্যাস! এরপর আর কোনও কথা নেই।”

ঠিক এই সময় তুসি চট করে নিলুর হাতটা ধরে বলল, “দেখবে এসো, মামার ঘরের জানলা দিয়ে পেছনের জায়গাটা দেখবে এসো। কতখানি জায়গা একদম জঞ্জালে ভর্তি হয়ে পড়ে আছে।”

তুসির হাত ছাড়িয়ে নিলু বলল, “দেখেছি, আর দেখতে হবে না।”

“তবে আমি আর-একবার দেখে আসি,” মামার ঘরে ঢুকতে গেল।

“খবরদার,” নিলু পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ল।

দোলা চেঁচাল, “মা, দেখবে এসো, মেয়েটা বাবার ঘরে চুরি করতে ঢুকছে!”

মা শুনতে পেলেন কি না কে জানে, সাড়া দিলেন না। সাড়া দিল টুলু। একটি গুলতি হাতে নিয়ে টুলু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তুসির দিকে টিপ করে বলল, “ঘরে ঢুকেছ কি একদম মাথা ফুটো করে দেব!” তোমায় বলব কী, সঙ্গে সঙ্গে বেলি ঘ্যাঁক করে মেরেছে এক লাফ টুলুর ঘাড়ে। টুলু তো ভ্যাবাচ্যাকা। নিলু তাই না দেখে যেই বেলিকে একখানি টেনে ঘুষি মেরেছে, ব্যাস, তখন আর বেলিকে আটকায় কে! তিরের মতো ছুটে এসে নিলুকে তাড়া করল। তাই না দেখে দোলা ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “কামড়ে দিল, কামড়ে দিল!”

বেলি কিন্তু নিলুকে ছাড়েনি। নিলু আর কোথা যায়! তাড়া খেয়ে বাবার ঘরে ঢুকে পড়েছে। বেলিও ঢুকেছে। নিলু বাবার বিছানার ওপর উঠে পড়েছে। বেলিও বিছানায় মেরেছে লাফ। সেখান থেকে ডিগবাজি খেয়ে নিলু একেবারে আলমারির আড়ালে ঢুকে পড়ল।

তুসি চোখের পলকে বেলিকে জাপটে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “বেলি, বেলি।”

বেলি তখন রেগে আগুন। তুসি কি তখন সামলাতে পারে! আলমারির আড়ালে ঢুকে এই বুঝি নিলুকে কামড়ে দেয় বেলি।

ঠিক সেই সময়ে টুলু ছুটে এসে দিয়েছে হাতের গুলতি ছুড়ে। ঠাঁই! একদম সিধে তুসির কপালে। উঃ!

নীচের থেকে মা চেঁচালেন, “কী হল রে?” তারপর ওপরে উঠে এসে দেখেন, তুসির কপালে রক্ত। অমন গোলাপ-রাঙা মুখখানি আরও রাঙা হয়ে উঠেছে। তুসি কপালে হাত দিয়ে মামিকে দেখে জোর করে হাসল যেন। বুঝতে বাকি রইল না, তার খুব লেগেছে। ততক্ষণে নিলু-টুলু-দোলা হাওয়া।

মামি তাই দেখে থমকে গেলেন। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল রে তুসি? কপাল কাটল কী করে?”

তুসি টুলুর নামেও দোষ দিল না, নিলুকে নিয়েও কিচ্ছু বলল না। নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিয়ে বলল, “মামি, খেলতে খেলতে আলমারির ওপর পড়ে গিয়ে কপালটা কেটে গেল।”

মামি তুসির কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন, “ছিঃ ছিঃ! কতখানি কেটেছে রে! চল নীচে চল। ওষুধ লাগিয়ে দিই। পরের মেয়ে।”

তুসি মামির সঙ্গে নীচে নেমে গেল। বেলি যে কোথায় গেল, এখনকার মতো আর দেখা গেল না। আর নিলু-টুলু-দোলা পড়ার ঘরে ঢুকে আড়াল থেকে তুসির সব কথা শুনে নিয়েছে। এতক্ষণ যে-মেয়েটাকে ওরা দু’চক্ষে দেখতে পাচ্ছিল না, টুলুর গুলতির ইটে যার কপাল কাটল, সে কিনা তবুও নালিশ করল না কারও নামে! নিলু-টুলু-দোলা মেয়েটার কথা ভেবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে করতে কেমন যেন দুঃখ পেতে লাগল।

তুসির কিন্তু একটুও দুঃখ নেই, রাগও নেই। শুধু যা কপালের ওই ব্যথাটা একটু কষ্ট দিচ্ছে। কপালের ওই ব্যথা নিয়েই নেয়ে-খেয়ে শুয়ে পড়ল। শুতে না-শুতেই দু’চোখে তার ঘুম যেন জড়িয়ে এল। এতখানি পথ ট্রেনে আসা। যতই হোক, ট্রেনে কী আর তেমন ঘুম হয়? সুতরাং কপালের ব্যথার চেয়ে ঘুমটা যে তার বেশি পাচ্ছিল, এখন তাকে দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবে। ওঃ! কী অঘোরেই না ঘুমোচ্ছে! হয়তো এমনই করে আরও অনেকক্ষণ ঘুমোবে।

চার

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছল তুসির। পাশ ফিরতে দ্যাখে, মামিও তার পাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন। দরজার দিকে নজর পড়ে যেতেই অবাক হয়ে গেল তুসি। দেখল, কাঁচুমাচু মুখে দোলা দাঁড়িয়ে আছে।

তুসি উঠে পড়ল। খুব সাবধানে। যেন মামির ঘুম না ভাঙে। এগিয়ে গেল দোলার দিকে। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে দোলা?”

দোলার চোখ ছলছল করছে। তুসির কপালের দিকে চেয়ে কান্না-ভেজা গলায় বলল, “আমি তোমায় মারিনি কিন্তু!”

তুসি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দোলাকে আড়ালে নিয়ে গেল। দোলাকে আদর করে জড়িয়ে ধরতেই সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তুসি বলল, “এ ম্যা, কী বোকা দেখেছ! আমায় আবার মারল কে, আমি তো নিজেই পড়ে গেলুম!”

দোলা তেমনই কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “না, এটা তো মিথ্যে কথা। টুলুদা তো গুলতি মেরে তোমার কপাল ফাটিয়ে দিয়েছে। টুলুদাকে পাছে মা মারে, সেইজন্যে মাকে তুমি মিথ্যে করে বলেছ যে, খেলতে গিয়ে পড়ে তুমি নিজেই মাথা ফাটিয়েছ। তোমার কথা শুনে টুলুদাও কাঁদছে আর বলছে, “তুসি দিদি খুব ভাল দিদি।”

তুসি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “কই টুলু?”

“ওপরে।”

“চলো দেখে আসি,” বলে তুসি দোলার হাত ধরে ওপরে চলল।

ভাগ্যিস এখনও মামি ঘুমোচ্ছেন, নইলে টুলুর যে কী হত কে জানে।

এ কী, ঘরে তো কেউ নেই, না টুলু, না নিলু। “কই টুলু?” এদিক ওদিক দেখতে দেখতে তুসি দোলাকে জিজ্ঞেস করল।

দোলা বলল, “এই তো ছিল। নিলুদাও ছিল, টুলুদাও ছিল। এতক্ষণ ধরে নিলুদা এই তো খাতাটায় কীসব লিখছিল,” বলে দোলা খাতাটা তুসিকে দেখাল।

“কই দেখি,” বলে তুসি খাতাটা হাতে নিয়ে পাতা ওলটাল। ওমা! পাতাভর্তি বড় বড় করে এসব কী লিখেছে খাতায়! এক পাতায় লেখা: বাবা আমাদের ভালবাসে না। পরের পাতায়: বাবা আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না। তারপরে পরপর:

আমরা খেলা করতে পাই না।

সবাই সার্কাস যায়, আমাদের কেউ নিয়ে যায় না।

পড়তে পড়তে ঘুম পেলে হাই তোলা বারণ।

হাসলে বকা খাই।

গল্প করলে কানমলা খাই।

কেউ গান গাইলে কানে আঙুল দিয়ে বসে থাকতে হয়।

লুকিয়ে ঝালমুড়ি খেয়েছি জানতে পারলে সেদিন খাওয়া বন্ধ।

খাতাটা পড়তে পড়তে হি-হি করে হেসে উঠল তুসি। বলল, “বুঝেছি, তাই তোমাদের আমার ওপর এত রাগ। ঠিক আছে, আমি খেলা করব তোমাদের সঙ্গে। আমি তোমাদের গান শোনাব। আমি ঝালমুড়ি খাওয়াব। দেখি, তোমাদের কে কী বলে!”

হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, টুলুর গলার শব্দ শোনা গেল, “আমি তোমাকে গুলতি দিয়ে মেরেছি, তুমি বাবাকে বলে দেবে না তো?”

তাই তো! কোথা থেকে টুলুর গলার শব্দ শোনা গেল? ও হরি! ওই তো, খাটের নীচে দু’ভাই কেমন ঘাপটি মেরে বসে আছে! দেখতে পেয়েছিল দোলা। খাটের নীচে মাথা গলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এই তো, এইখানে নিলুদা, টুলুদা লুকিয়ে আছে!”

তুসি দ্যাখে দু’ ভাই-ই ভয়ে একেবারে কাঠ। টুলু তো কাঁদছিলই, নিলুর চোখও ছলছল করছে।

খুব হাসি পেলেও এবার কিন্তু তুসি হাসল না। তুসি খাটের নীচে উঁকি মেরে নিলু-টুলুর গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, “এসো!”

নিলু জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

“আমরা খেলা করব। চলো, পেছনের বাগানটা আমরা পরিষ্কার করে ফেলি। ওটা আমাদের খেলার জায়গা হবে।”

নিলু টুলু দু’জনায় খাটের নীচে বসে বসেই চেঁচিয়ে উঠল, “সত্যি?”

আর দোলা আনন্দে হাততালি দিয়ে নেচে উঠল, “কী মজা! কী মজা!”

বেলি কোথায় ছিল, ছুট্টে এসে এমন ল্যাজ নাড়তে আরম্ভ করল, মনে হল, এই বুঝি ল্যাজ খসে পড়ে!

সেই দুপুর থেকে বিকেল অবধি ওরা যে শুধু পেছনের বাগানটাই পরিষ্কার করল, তাই না। সারাবাড়ি একেবারে ঝেড়েমুছে তকতকে ঝকঝকে করে ফেলল। কোথাও একটু নোংরা নেই, ধুলো নেই, জঞ্জাল নেই। মামি তো তাই দেখে অবাক। বললেন, “বাঃ, তুসি তো ভারী কাজের মেয়ে হয়েছে! আমার এই বেয়াড়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেন ম্যাজিক দেখিয়ে দিলে।”

মামির এই কথা শুনে তুসি বলল, “মামি, আমরা যে এত কাজ করলুম, এবার আমাদের একটা কথা রাখো!”

“কী কথা?”

“আমরা ঝালমুড়ি খাব”, আবদার করল, তুসি।

মামি আঁতকে উঠলেন, “ও বাবা! তোর মামা জানতে পারলে কেটে ফেলবে!”

“মামা কেমন করে জানতে পারবে?” উত্তর দিল তুসি, “মামার আসতে তো এখনও অনেক দেরি। আমরা তিনজনে যাব, কিনব আর চলে আসব।”

মামি একটু কিন্তু কিন্তু করলেন। তারপরে বললেন, “ঠিক আছে, যাও। একদম দেরি করবে না।”

তুসি খুশিতে উছলে চেঁচাল, “নিলু-টুলু-দোলা, আয়!”

মামি বললেন, “পয়সা নিয়ে যা।”

তুসি বলল, “পয়সা আমার কাছে আছে মামি। আমি আজ সক্কলকে খাওয়াব। তোমার জন্যেও নিয়ে আসব।”

পাঁচ

সন্ধেবেলায় মামা যখন ঘরে ফিরলেন, তখন নীচের ঘরে চুপিচুপি সকলকে গান শেখাচ্ছে তুসি। মামা সটান ওপরে উঠে গেলেন। একটু অবাক হলেন তিনি। কেন না, তাঁর মনে হল, বাড়িটা যেন অন্য দিনের মতো লাগছে না। কেমন যেন একটু আলাদা আলাদা। তিনি ঘরে ঢুকলেন। আপিসের জামা-কাপড় ছাড়তে ছাড়তে তিনি হাঁক পাড়লেন, “নিলু-টুলু-দোলা!”

নিলু-টুলু-দোলার বদলে মামি এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”

“ওরা কোথায়?”

“তুসি ওদের গান শেখাচ্ছে।”

মামা যেন ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠলেন, “গান শেখাচ্ছে!”

“কেন, তোমার আপত্তি কীসের?”

“আমি যেসব জিনিস পছন্দ করি না, সেসব জিনিস এ-বাড়িতে হতে দেব না,” বলে মামা দ্বিগুণ জোরে হাঁক পাড়লেন, “নিলু-টুলু-দোলা!”

নিলু-টুলু-দোলা এল না। সিঁড়ি ভেঙে ছুটে এল তুসি, “মামা, আপনি ডাকছেন?”

মামা মুখটা ব্যাজার করে তুসির কপালের দিকে নিমেষে চাইলেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, “তোমাকে নয়।”

তুসি মামার কাছে এগিয়ে গেল। আপিসের জামাটা হাতে নিয়ে পাট করতে করতে বলল, “জানেন মামা, টুলুর কী সুন্দর গানের গলা! আর দোলাও তেমনই নাচে।”

মামা যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রেগে গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে বললেন, “আমি তোমায় আগেই বলেছি, আমি এসব পছন্দ করি না। এ-বাড়িতে থাকতে হলে, এ-বাড়ির নিয়ম মেনে চলতে হবে!”

“কিন্তু জানেন মামা, আমাদের স্কুলের দিদি বলেছেন, “খেলবে, গাইবে, নাচবে— সুস্থ দেহে বাঁচবে।”

মামা তেমনই তিরিক্ষি মেজাজেই বললেন, “তোমার স্কুলের দিদি কী বললেন, সে নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আমার বাড়িতে আমি যা বলব, তা-ই হবে।” বলেই তিনি আবার হাঁক দিলেন, “নিলু-টুলু-দোলা!”

“নিলু-টুলু-দোলা এবার প্রায় ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নীচের থেকে ওপরে বাবার ঘরে ছুটে এল। ওদের দেখে মামি বললেন, “তুসি, আয়, আমরা নীচে যাই।”

তুসি মামির সঙ্গে নীচে চলে গেল। তারপর যে নিলু-টুলু-দোলার কী হল, সে তুসি জানতে পারল না।

এখন যেন একটু একটু খারাপ লাগছিল তুসির। কপালের ব্যথাটা একটু কমলেও, একেবারে যায়নি। ফুলে আছে এখনও। মামা যে দেখেছেন, সে তুসি জানে। ভাগ্যিস কিছু জিজ্ঞেস করেননি! তা হলে আবার মিথ্যে বলো! কিন্তু জিজ্ঞেস না করারই বা কারণ কী? মামা কি তবে গ্রাহ্য করলেন না তুসিকে? তুসির ওই সুন্দর মুখে অমন যে একটা আঘাত, তা দেখে কি মামার মনে একটুও দয়া হল না?

“জানিস তুসি, কাল আমার মা আসবে। কাশী গেছল। ফিরেছে।” হঠাৎ মামি ময়দা মাখতে মাখতে বললেন।

তুসি জিজ্ঞেস করল, “কাশী থেকে ফিরে মেয়েকে দেখতে আসছেন বুঝি?”

“হ্যাঁ।”

“আচ্ছা মামি, নিলু-টুলুর মতো তোমার মা তো আমারও দিদিমা হলেন, তাই না?”

“হ্যাঁ রে।”

“আমি এই প্রথম তাঁকে দেখব।”

মামি বললেন, “মা-ও তোকে কোনওদিন দ্যাখেনি।”

মামির ময়দা মাখা হয়ে গেলে তুসি বলল, “মামি, দাও না, আমি রুটি বেলে দিই। আমি পারি।”

“না থাক। দু’দিনের জন্যে এসেছিস, তোকে আর এসব করতে হবে না। তার ওপর কপাল ফাটিয়ে বসেছিস। তোমার বাবা এসে দেখলে, মুখে কিছু না-বলুক, মনে মনে তো রাগবে!”

তুসি বলল, “না, না, বাবা রাগ করবে কেন? তোমাদের তো কোনও দোষ নেই। খেলতে গিয়ে আমি নিজে মাথা ফাটিয়েছি। তোমাদের কেন কথা শুনতে হবে?”

তুসির কথা শুনে মামি এক ঝলক চেয়ে দেখলেন ওর মুখের দিকে। তুসি হেসে ফেলল।

পরের দিন সকালবেলাতেই দিদিমা এসে হাজির। বয়স যে খুব বেশি, তা নয়, কিন্তু চোখের চশমাটা কী মোটা কাচের। চোখটা বোধহয় একেবারে গেছে। মামির ছোট ভাই পৌঁছে দিয়ে গেল। তারপর লেগে গেল হই হই কাণ্ড? “নিলু কই? টুলু কই? দোলা কোথা গেলি?” যেন একাই একশো। এখনও বাড়িতে বাবা আছেন। অন্য সময় হলে দিদিমাকে নিয়ে নিলু-টুলু-দোলার জগঝম্প শুরু হয়ে যেত।

“এই দ্যাখ রানি, তোর জন্যে কাশী থেকে এই শাড়িটা নিয়ে এলুম।” দিদিমা স্যুটকেস খুলতে আরম্ভ করলেন।

মামির জন্যে শাড়ি বেরোল। সত্যি কী সুন্দর শাড়িটা। দোলার জন্যে একসেট রুপোর গয়না বেরোল। নিলু-টুলুর জন্যে ব্যাট-বল। আর মামার জন্যে সিলকের পাঞ্জাবি। দোলার তো আর তর সইল না। সঙ্গে সঙ্গে গয়না পরার সাজ শুরু হল। আর নিলু-টুলু ব্যাট-বল নিয়ে নিঃসাড়ে ওপরে পালাল। এখন থাক। বাবা, বেরিয়ে গেলে দেখতে পাবে ওয়ান-ডে-ক্রিকেট কাকে বলে!

“ও রানি, এ মেয়েটি কে রে?” হঠাৎ তুসির দিকে দিদিমা’র চোখ পড়ে গেল, “ভারী সুন্দরী তো!”

তুসি লজ্জা পেল।

মামি বললেন, “তুসি, আমার ননদের মেয়ে।”

“ও, তোর সেই ননদ, দিল্লিতে থাকে?”

“হ্যাঁ।”

“কবে এল?”

“কাল।”

“কপালে কী হয়েছে?”

“পড়ে গিয়ে কপালটা কেটে ফেলেছে।”

“খুব ছটফটে বুঝি?”

“না, খুব লক্ষ্মী। তার ওপর গান জানে, নাচ জানে, পড়াশোনায় ফার্স্ট হয়।”

দিদিমা অমনই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “আমি তো তা হলে তোমার গান শুনব দিদি।”

তুসি দিদিমাকে প্রণাম করল। তারপর খুব নরম গলায় বলল, “আমি তেমন পারি না।”

দিদিমা ওর চিবুক ধরে চুমু খেয়ে বললেন, “যেমন পারো, তেমন শুনব।”

কী জানি কেন, দিদিমাকে তুসির খুব ভাল লেগে গেল। এক-একটা মানুষই এমন। মুখে-চোখে অফুরন্ত খুশি ছড়ানো। দেখলেই মনে হয়, মানুষটার মনের ভেতরে যেন যত রাজ্যের আনন্দ ভর্তি হয়ে আছে। এমন মানুষকে কার না ভাল লাগে? কার না ভালবাসতে ইচ্ছে যায়?

“হ্যাঁরে, মানিক কি আপিসে চলে গেছে?” দিদিমা একটু ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন। মানিক তুসির মামার নাম।

মামি বললেন, “না। এখনও সময় হয়নি।”

“দেখা করে আসি,” বলে দিদিমা তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন মামার সঙ্গে দেখা করতে। দেখে মনে হল, এখনও খুব শক্ত আছেন।

ছয়

নিলু-টুলুর কানে একটি খবর পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। খবরটা মোটেই বলার মতো নয়। খুবই দুঃখের। কেন না, মামা আজ অফিস যাবেন না। নিলু-টুলুর মাথায় হাত। বাড়িতে যেন অন্ধকারের ছায়া নেমে এল। কাল সারাদিন ধরে পেছনের বাগানটা পরিষ্কার করা হল। না চাইতেই হাতে ব্যাট-বল এসে গেল। কিন্তু এখন সব গুবলেট। সুতরাং সারাদিন মুখ-গোমড়া করে ঘরের ভেতর বন্দি থাকো!

মামা অফিস যাবেন না শুনে তুসি ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল মামার কাছে। মামা তখন ওই পেছনের জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে বাগানটা দেখছিলেন। তুসি ঘরে ঢুকেই একটু থমকে দাঁড়াল। তারপর ডাকল, “মামা!”

মামা কোনও সাড়া দিলেন না।

“আজ আপিস যাবেন না? শরীর ভাল নেই?”

মামা ঘুরে দাঁড়ালেন। খুব রুক্ষ গলায় উত্তর দিলেন, “আমি জানতে চাই, বাগানটাকে অমন পরিষ্কার করল কে?”

তুসি হাসতে হাসতে বলল, “আমরা কাল পরিষ্কার করেছি।”

“আমরা!” মামা যেন ভূত দেখলেন।

“হ্যাঁ, আমি, নিলু, টুলু, দোলা।”

“আমি তোমায় আগেই বলেছি, আমি এসব পছন্দ করি না।” মামা যেন রাগে ফেটে পড়লেন।

তুসি তেমনই সহজ সুরেই বলল, “কেন মামা, বেশ তো পরিষ্কার লাগছে। কী বিচ্ছিরি হয়েছিল। ওখানে আমরা ফুলের বাগান করব। ওখানে খেলার জায়গাও হবে অনেকটা। আজ একটু পরে আমরা ক্রিকেট খেলব। নিলু আর টুলুকে দিদিমা ব্যাট-বল এনে দিয়েছেন। আপনাকেও খেলতে হবে মামা।”

মামা একেবারে বাঘের মতো গর্জে উঠলেন, “নিলু-টুলু!”

নিলু-টুলু প্রায় পড়তে পড়তে ছুটে এল।

“ব্যাট-বল কোথায়?”

নিলু-টুলুর মুখে শব্দ নেই। ভয়ে কাঠ।

“শিগগির নিয়ে আসবি!”

নিলু-টুলু তবুও দাঁড়িয়ে রইল।

“মামা...”

“তুমি থামো,” তুসি কিছু বলতে যাচ্ছিল, মামা ধমক মারলেন। তারপর নিলু-টুলুকে আবার বললেন, “কোথায় রেখেছিস ব্যাট-বল?”

নিলু নিজেদের ঘরের দিকে হাত উঁচিয়ে দেখাল।

“কার হুকুমে ব্যাট-বল ঘরে ঢুকেছে? এক্ষুনি নিয়ে আসবি।”

নিলু-টুলু চলে গেল। মুহূর্ত দেরি না করে ব্যাট-বল নিয়ে এল। মামা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে কড়কে উঠলেন, “ফের যদি কখনও দেখি ব্যাট-বল হাতে নিয়েছ, পিটিয়ে হাড় গুঁড়িয়ে দেব। যাও!”

নিলু-টুলু মুখ নিচু করে সুড়সুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে দেখতে লাগল তুসি।

মামা যে কেন এত রাগি, তুসি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। মামার কাছে এত যে বকাঝকা খাচ্ছে, তবু তার মনে এতটুকু দুঃখ নেই। অন্যায় করলে তো বড়দের কাছে বকা খেতেই হয়। অবশ্য তুসি এখনও পর্যন্ত জানে না, সে কী অন্যায় করেছে। মামার বাড়িতে এসে আনন্দ করাটা কি অন্যায়? এর উত্তর খুঁজে পায় না তুসি। সুতরাং দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে মামা যখন ঘুমিয়ে পড়লেন, এমনকী, দিদিমাও যখন কাশীর গল্প করতে করতে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন, তখন তুসি ভাবছিল, ওপরে যাবে কি না! নিলু-টুলু-দোলার সঙ্গে শীতের এই দুপুরবেলায়, পেছনের ওই বাগানে, রোদে গা এলিয়ে তার ভারী গল্প করতে ইচ্ছে করছিল। এমন সময় ওপর থেকে কখন যে নিঃসাড়ে দোলা নেমে এসেছে, একদম খেয়াল করেনি তুসি। দোলাকে দেখে যেই চমকে উঠেছে তুসি, সঙ্গে সঙ্গে দোলা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে শব্দ করল, “শ-শ-শ।” যার মানে, একদম কথা বোলো না।

তুসি কথা বলতেই যাচ্ছিল। থেমে গেল। শুধু ইশারায় ঘাড় হেলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী?”

দোলা হাতছানি দিয়ে ডাকল তুসিকে।

তুসি উঠে দাঁড়াল।

দোলা ছুটল পেছনের বাগানের দিকে।

তুসিও তার পিছু নিল।

কী ব্যাপার?

বাগানে ঢুকে তুসি তো একেবারে থ। নিলু আর টুলু ক্রিকেট শুরু করে দিয়েছে! কারও মুখে কোনও কথা নেই। একদম স্পিকটি নট। ব্যাটে-বলে খটাখটি চলছে শুধু।

তুসি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দোলাই গলগল করে বলে ফেলল, “বাবা ঘুমোচ্ছে তো! নিলুদা আর টুলুদা বাবার ঘরে চুপিচুপি ঢুকে ব্যাট আর বলটা নিয়ে পালিয়ে এসেছে।”

এবার তুসির মুখে ভয়ের ছায়া দেখা দিল। নিলু-টুলুর বরাতে যে এবার উত্তম-মধ্যম আছে, তুসি এখন সে-বিষয়ে নিশ্চিত। তুসিকে দেখে নিলু-টুলুর খুশি হওয়ারই কথা। সুতরাং নিলু বেশ চাপা উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, “তুসিদি, তুমিও খেলবে এসো!”

কিন্তু অমন যে হাসিখুশি তুসি, সে এবার একটু বেশ গম্ভীর হয়েই বলল, “ব্যাট-বল কোত্থেকে পেলে?”

টুলু খেলতে খেলতে একটু থামল। বলল, “সে একটা গ্রেট অ্যাডভেঞ্চার।”

“কীরকম?” জিজ্ঞেস করল তুসি।

এবার নিলু উত্তর দিল, “বাবার মাথা ডিঙিয়ে আলমারির মাথার ওপর থেকে উদ্ধার করে এনেছি।”

“কাজটা কিন্তু ঠিক করনি,” উত্তর দিল তুসি।

“কেন?” একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল নিলু।

তুসি বলল, “মামা যখন পছন্দ করছেন না, তখন তাঁর অবাধ্য না হওয়াই ভাল। আমার মনে হয়, খেলা বন্ধ করে, যেখানে ব্যাট-বল ছিল, সেখানেই রেখে আসা উচিত। এবার কিন্তু ধরা পড়লে, আমাদের অশেষ দুর্গতি।”

তুসির কথা শুনে খেলা ঠিকই বন্ধ হল, কিন্তু যেখানকার জিনিস সেখানে রেখে আসার সাহস হল না কারওই। অগত্যা তুসি বললে, “ঠিক আছে, আমিই রেখে আসছি।”

এ তো খুবই স্বাভাবিক যে, মাঝপথে খেলা বন্ধ হয়ে গেলে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তার ওপর যদি খেলা জমে ওঠে, তা হলে তো কথাই নেই। অবশ্য এ-কথাটাও ঠিক, খেলার সময় মারধোর কিংবা বকাঝকার কথা শুনলে বিচ্ছিরি লাগে। তার চেয়ে বাবা খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়াই ভাল!

ব্যাট আর বল নিয়ে তুসি ছুটতে ছুটতে ওপরে উঠে এসেছিল। মামার ঘরে ঢোকার আগে একবার সে থমকে দাঁড়াল। উঁকি মারল। চমকে উঠল। দেখল, মামার ঘুম ভেঙে গেছে। মামা জানলায় দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে চেয়ে আছেন। তুসির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তার বুঝতে দেরি হল না, মামা সব দেখেছেন। হাতেনাতে ধরা পড়েছে। সুতরাং তুসি ভাবল, ধরা যখন পড়েইছি, তখন আর লুকিয়ে কোনও লাভ নেই। যা থাকে কপালে! তুসি ঘরে ঢুকে পড়ল। ভয়ে ভয়ে ডাক দিল, “মামা, ব্যাট।”

মামা ঘুরে দাঁড়ালেন না। তুসিকে দেখলেন না। কোনও কথা বললেন না। যেমন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তেমনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তুসি এবার গলায় একটু জোর দিয়েই বলল, “মামা, আমরা অন্যায় করে ফেলেছি।”

মামা এবারও মুখ ফেরালেন না। অবশ্য কথা বললেন, খুব গম্ভীর স্বরেই বললেন, “যাদের জিনিস, তাদের কাছে ফেরত নিয়ে যাও!”

হঠাৎ মামার এই কথা শুনে তুসির অবাক হওয়ারই কথা। সে আরও কয়েক মুহূর্ত বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। আর কোনও কথা বলার মতো সাহস হল না তার। সে ব্যাট-বল হাতে নিয়ে ফিরে এল।

কিন্তু ঠিক সন্ধের সময় আর-এক কাণ্ড হল। দিদিমা তুসিকে চেপে ধরলেন গান শোনাবার জন্যে। তুসি তো ভয়ে কাঠ। বলল, “দিদিমা, গান গাইলে মামা বকবেন।”

দিদিমা হাসতে হাসতে বললেন, “কী বোকা রে তুই, গান গাইলে কেউ কখনও বকা খায়! নে, আমি আছি, তোর কিচ্ছু ভয় নেই। গা।”

তুসি আমতা-আমতা করে বলল, “কিন্তু মামা যে বলেছেন।”

“কী বলেছে?”

“এ-বাড়িতে গান গাওয়া চলবে না।”

দিদিমা এবার জোরে হেসে ফেললেন। বললেন, “তোর মামা তোকে ভয় দেখাবার জন্যে বলেছে। তুই গাইলেই বুঝতে পারবি, আমার কথা সত্যি কি না!”

তুসি গান গাইল। সত্যিই তো, কী সুন্দর গলা তুসির। সারা বাড়ি তার গানের সুরে ঝলমলিয়ে উঠল যেন। একটা, দুটো আরও অনেক গান গাইল তুসি। দিদিমার খুশি কে দ্যাখে! তুসির চিবুক ধরে কত আদর করলেন তিনি। নিলু-টুলু-দোলা পর্যন্ত কখন যে ওপরের ঘর থেকে নেমে এসে গানের জলসায় বসে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি। এ তো জানা কথাই, মামা আসবেন না। উলটে তুসি ওপরে গেলে যা বকুনি খাবে না! বকা যখন খেতেই হবে, তুসিও তখন কেমন যেন মরিয়া হয়ে দিদিমাকে বলল, “আমার গান তো শুনলেন দিদিমা। কিন্তু আপনি দোলার নাচ তো কোনওদিন দ্যাখেননি। আজ আমার গানের সঙ্গে দোলা আপনাকে নাচ দ্যাখাবে।” বলে তুসি ডাক দিল দোলাকে। দোলা উঠে আসতেই দিদিমা অবাক হয়ে বললেন, “দোলা নাচতে পারে?”

“দেখুন না,” বলে তুসি যেই গান ধরল অমনি দোলা ছোট্ট পায়ের আলতো দোলায় নাচ শুরু করে দিল। এবার যে-গানটা তুসি নাচের সঙ্গে গাইল, সে-গান এর আগে একবারই সে গেয়েছে। তারই জন্মদিনে। কথাগুলো কেমন শোনো:

ছোট্ট ফুলের গন্ধ এত কতই না তার হাসি,

ওই যে সুদূর তারার আকাশ তাকেও ভালবাসি।

একমুঠি এক রঙিন-পাখির সুরের যে নেই শেষ,

দুলকি নদীর জলতরঙ্গ শুনতে লাগে বেশ।

একেই বলি গান,

ছন্দ-সুরে নিত্য বাজে খুশির কলতান।

একটি ছোট জোনাক জ্বলে ঘুচিয়ে আঁধার কালো,

একটুখানি প্রদীপ-শিখা কতই না তার আলো।

ছোট্ট শিশুর মনের কোঠায় মানিক জ্বলে নিতি,

আধো আধো কথায় যে তার ঝরছে সুধা-গীতি।

একেই বলি গান,

বিশ্ব-ভুবন ছড়িয়ে আছে জগৎ-পিতার দান।

বললে বিশ্বাস করতে পারবে না, এ-গান শুনে নিলু-টুলুও থাকতে পারেনি। তুসিদিদির সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও গেয়ে উঠেছিল। আর গেয়েছেন দিদিমাও গুনগুন করে দোলার নাচের সঙ্গে। যেন এক আনন্দের বন্যায় সবাই উথালি-পাতালি করে ভাসতে লাগল।

মামা লুকিয়ে লুকিয়ে গান শুনেছিলেন কি না কেউ জানে না। কিন্তু তুসি যে গান গেয়েছে, এটা কি আর তাঁর কানে পৌঁছয়নি? অথচ অবাক কথা তুসিকে বকা দুরে থাক, মামা মুখে একটি টু শব্দ পর্যন্ত করেননি। যে-মামা অমন গম্ভীর মেজাজে এ-বাড়ির নিয়মকানুনগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার হুকুম দিলেন তুসিকে, সেই মামাই হঠাৎ এমন চুপচাপ হয়ে গেলেন কেন? তবে কি মামা দিদিমাকে দেখে বকাঝকা বন্ধ করেছেন? হবেও বা। সত্যি কথাই, নাতি-নাতনিদের বকলে কোন দেশের কোন দিদিমা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন? হ্যাঁ বাবা, নাতি-নাতনি মানেই চোখের মণি, বুকের ধন। সুতরাং তাদের বকাঝকা? কক্ষনও না, কক্ষনও না।

তা হলে বলতে হয় দিদিমা যতক্ষণ আছেন, মামাও ততক্ষণ কিচ্ছু বলছেন না। তা হলে তো দিদিমা থাকতে থাকতেই একটা বেশ পিকনিক করা যায়! হ্যাঁ, খুব মজা। দিদিমা বললে, মামাও কি আর পিকনিকে না গিয়ে থাকতে পারবেন! কথাটা যেই না তুসি পেড়েছে, ব্যাস, অমনি সঙ্গে সঙ্গে নিলু-টুলু-দোলা চেঁচিয়ে উঠল, “হুররে, পিকনিক।”

নিলু-টুলু-দোলাকে সঙ্গে নিয়ে তুসি চুপিচুপি প্ল্যান আঁটতে বসল। পিকনিক মানেই শীতের দিনে ঘর ছেড়ে পালিয়ে চলো অনেক দূরে। চলো সেখানে, যেখানে অনেক গাছ, অনেক বন আর অনেক খুশি আছে। সুতরাং এখন দিদিমাই ভরসা।

সাত

পরের দিন সাতসকালেই নিলু-টুলু-দোলা হুমড়ি খেয়ে পড়ল দিদিমার কাছে, “দিদিমা, দিদিমা, আমাদের পিকনিক করতে নিয়ে চলো!”

দিদিমার বয়স হলে কী হবে, এখনও ঠিক তেমনই ছেলেমানুষ আছেন। নিলু-টুলু-দোলার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাজি। কী উৎসাহ। বললেন, “সে তো খুব মজা রে। তা যাওয়া হবে কোথায়?”

“যেখানে অনেক বন আছে, গাছ আছে।”

“তা কে কে যাবি?”

“তুমি যাবে, মা যাবে, বাবা, তুসিদি আর আমরা।”

“কিন্তু তোর বাবা কি রাজি হবে!”

“তুমি বললে ঠিক হবে।”

“আচ্ছা,” বলে দিদিমা তক্ষুনি তক্ষুনি বাবার কাছে ছুটলেন। আর নিলু-টুলু-দোলা ঘরের কোণে চুপটি করে বসে ভগবানকে ডাকতে লাগল, “হে ভগবান, বাবাকে রাজি করে দাও!”

একটু পরেই দিদিমা ফিরে এলেন। বাবা রাজি। ওঃ! সে কী আনন্দ নিলু-টুলু-দোলার। “কিন্তু,” দিদিমা বললেন, “তোমাদের বাবা যাবে না। অবশ্য বলে দিয়েছে এয়ারপোর্টের পেছনে একটা খুব ভাল পিকনিক করার জায়গা আছে, ওখানে যেতে।”

তুসি কিন্তু এবারও অবাক। এবারও মামা আপত্তি করলেন না। তা হলে কি মামা সত্যিই দিদিমাকে ভয় করেন?

ঠিক হল পরশু রবিবার পিকনিক। কী কী রান্না হবে তার একটা ফর্দও তৈরি হয়ে গেল। দিদিমাই করলেন। প্রথম প্রথম মামি যেতে রাজি হননি। তারপর দিদিমার পাল্লায় পড়ে আর না করতে পারলেন না। কিন্তু তুসির মনটা ভাল লাগছিল না। সবাই যাবে, অথচ বাড়ির একটা মানুষ যাবেন না, এই কথাটা ভাবতে ভাবতে তার মনটা ভীষণ কেমন কেমন করছিল। কী জানি তার কী মনে হল, ঠিক করল, সে নিজেই মামাকে একবার বলবে। সে গুটিগুটি ওপরে চলে গেল তক্ষুনি। মামা আজ আপিসে যাবেন, তাই কাগজপত্তরগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। মামার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল তুসি। তুসির মুখে আজ হাসি নেই। কিন্তু আজ সে নিলু-টুলু-দোলার মুখে হাসি ফুটিয়েছে। এতদিন ওরা ভয়ে জবুথবু হয়ে ঘরে বসে থাকত। আজ তুসিকে সঙ্গী পেয়ে ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খেলা করছে, হাসছে, গাইছে। তুসি যখন এ-বাড়িতে এল, বাড়িটা ছিল থমথমে, বোবা। কিন্তু আজ খুশিতে ভরে গেছে সারা বাড়ি। শুধু একটা মানুষ এখনও নিশ্চুপ। তিনি তুসির মামা।

“মামা!” ঘরের বাইরে থেকে খুব ভয়ে ভয়েই ডাক দিল তুসি।

মামা বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠে তুসির মুখের দিকে তাকালেন।

“আপনি পিকনিকে যাবেন না?”

“না,” স্পষ্ট স্বরে উত্তর দিলেন মামা।

“দিদিমা বলছিলেন, আপনি বলেছেন জায়গাটা খুব ভাল।”

“হ্যাঁ।”

“আপনি গেলে খুব মজা হবে।”

“আমাকে নিয়ে মজা করাটাই এখন দেখছি তোমাদের বাকি আছে।”

“না, সঙ্গে একজন বড় কেউ না থাকলে...”

“কেন, তোমার মামি যাচ্ছে, দিদিমা যাচ্ছেন।”

“ওঁরা তো রান্নাবান্না নিয়েই থাকবেন। আমাদের সঙ্গে তো আর খেলা করতে পারবেন না।”

“মানে? কী বলতে চাও তুমি? আমাকে নিয়ে তোমরা খেলা করবে?”

“তাতে কী হয়েছে। দিল্লিতে আমরা যখন কোথাও পিকনিক করতে যাই, সঙ্গে বাবা যাবেই। বাবাকে নিয়ে খুব মজা হয়। লুকোচুরি খেলতে গেলে, প্রত্যেকবার বাবা চোর হবে। বাবা আমাকে কিছুতেই ধরতে পারে না। একবার হল কী, আমি একটা গাছে উঠে চুপটি করে লুকিয়ে রইলুম। বাবা আমাকে খুঁজেই পেল না।”

“বাঃ,” বলে মামা একটু থামলেন। তারপর বললেন, “গাছে চড়াও অভ্যেস আছে!”

“গাছে চড়া আর এমন কী। দিল্লিতে আমাদের বাড়িতেই তো একটা আতাগাছ আছে। আতার সময় গাছভর্তি আতা হয়। গাছে উঠে পাকা আতা দেখলেই আমি খেতে শুরু করে দিই! বাবাও এক-একদিন গাছে ওঠে।”

“আর তোমার মা?” কেমন আড়চোখে তাকিয়ে মামা কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।

“মা এখন আর ওঠে না, আগে উঠত। কাপড়টাকে গাছ-কোমর করে বেঁধে তরতর করে উঠে পড়ত। দেখতে যা মজা লাগত না!” একটু থামল তুসি। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনি বুঝি গাছে উঠতে পারেন না?”

“দরকার পড়েনি।”

“শিখে রাখা ভাল। আমি নিলু-টুলু-দোলাকে শিখিয়ে দেব।”

“আর কী শেখাবে? সবই তো একে একে হচ্ছে, নাচ, গান, ক্রিকেট।”

“আমি ঘোড়ায় চড়তে পারি।”

“তাই নাকি। আর কী পারো?”

“আমাদের স্কুলের স্পোর্টসে আমি প্রত্যেকবার প্রাইজ পাই। পিকনিকে গেলে দেখবেন, আমি সক্কলকে হারিয়ে দেব। আপনিও আমার সঙ্গে পারবেন না।”

মামা বললেন, “তোমার সঙ্গে আর আমার বকবক করার সময় নেই। আমার আপিসের সময় হয়ে গেল।”

“তা হলে আপনি পিকনিকে যাবেন তো?”

“আমি তো আগেই বলেছি, না।”

“তা হলে আমিও যাব না।” উত্তর দিল তুসি।

মামা আর কোনও কথা বাড়ালেন না।

আট

মামা অফিসে চলে গেলে সারাটা দুপুর এক মুহূর্তের জন্যেও স্থির হয়ে বসেনি নিলু-টুলু-দোলা। কখনও বাগানে গেছে ব্যাট-বল নিয়ে। কখনও দিদিমা’কে জাপটে ধরে গল্প শুনেছে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ছড়া বলেছে। ছুটোছুটি করেছে। আর গান গেয়েছে। আশ্চর্য, কত পালটে গেছে এ-বাড়ির ছোট মানুষগুলি।

“চিঠি।” বাইরে পোস্টম্যান ডাক দিল।

তুসি ঠিক বুঝতে পেরেছে, এ তার বাবার চিঠি। স্পিডপোস্টে পাঠিয়েছেন। তুসি একছুটে পোস্টম্যানের কাছে হাজির। জিজ্ঞেস করল, “কার চিঠি?”

“মানিক রায়।”

মানে, মামার নামে স্পিডপোস্টে এসেছে।

“কোত্থেকে আসছে?”

“হলদিয়া।”

চিঠি পড়ে সবাই জেনে ফেলেছেন, কাল তুসির বাবা আসছেন।

“বাবা আসছে মানে তো এবার তুসি মামার বাড়ির মায়া কাটিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাবে!” কথাটা বলতে দিদিমার যেন কষ্ট হল।

মামির মুখখানাও শুকিয়ে গেল নিমেষে!

নিলু, টুলু খানিক তুসির মুখের দিকে চেয়ে ছুটে ওপরে পালাল। দোলা থাকতে পারল না। জড়িয়ে ধরল তুসিকে। কান্না-জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি সত্যি চলে যাবে?”

তুসি হেসে উঠল। বলল, “ওমা, কী বোকা! আমি এখনই যাচ্ছি নাকি! বাবা এলে আমরা একসঙ্গে পিকনিকে যাব, সার্কাস দেখব, ক্রিকেট খেলব, সে এখন অনেক দেরি।”

“তুমি যে একদিন বলেছিলে, আমায় নিয়ে ফাংশান করবে? আমি নাচব, তুমি গাইবে?” দোলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“নিশ্চয়ই ফাংশান হবে,” তুসি বলল, “বাগানে আমরা স্টেজ বাঁধব। সেই স্টেজে তুমি নাচবে, আমি গাইব, তারপর আরও কত কী হবে।”

দোলা জিজ্ঞেস করল, “খুব মজা হবে?”

তুসি উত্তর দিল, “খু-উ-ব।”

তুসির বাবার এ-বাড়িতে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে যে-খবরটা হাওয়ার আগে সবার কানে পৌঁছে গেল, তা হল, তুসিকে কালই বাবা নিয়ে যাবেন। অনেক মেহনত করে ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেছে। হলদিয়ার কাজের পর দিল্লিতে চটজলদি পৌঁছতেই হবে। খুব জরুরি। সুতরাং পিকনিক হচ্ছে না। সার্কাসের কথা ছেড়েই দাও।

মামি বললেন, “দুটো দিন থেকে গেলে হত না?”

বাবা বললেন, “উপায় নেই, বউদি।”

“মেয়েটা আনন্দ করে সবাইকে পিকনিকে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করল...।”

“আবার যখন আসবে, তখন হবে’খন,” বাবা উত্তর দিলেন।

হঠাৎ দিদিমা বললেন, “হুট করে বললেই তো আর অত দূর থেকে আসা যায় না বাবা। কোথায় দিল্লি, আর কোথায় কলকাতা।”

বাবা বললেন, “সে তো ঠিক কথাই। কিন্তু তুসির ছুটিও তো ফুরিয়ে এল। স্কুল খুললেই আবার পড়াশোনা।”

মামি বললেন, “এই ক’টা দিন মেয়েটা বাড়িটাকে একেবারে হাসিতে-খুশিতে ভরিয়ে রেখেছিল। চলে গেলে বড্ড কষ্ট হবে আমাদের।”

বাবা এবারে কিন্তু অনেক জিনিস কিনে এনেছেন। মামির জন্যে সিল্কের শাড়ি এনেছেন। মামার জন্যে একটা বেশ দামি শাল। নিলু-টুলুর জন্যে ব্যাডমিন্টন সেট। আর দোলার জন্যে দুটো জিনিস, টকিং ডল, আর একটা সুন্দর ফ্রক। ডলটা ভারী মজার কিন্তু! পেছনে একটা বোতাম আছে। টিপলেই সে কথা বলে, “আমার নাম টিংলিং। নমস্কার, আপনি বসুন।”

দোলা কাঁদছিল। নিলু-টুলু চুপচাপ ঘরে বসেছিল। আর মামা নিজের ঘরে পেছনের জানলার গরাদ ধরে ওই বাগানের দিকে চেয়ে কিছু ভাবছিলেন।

“কেমন আছেন দাদা?” হঠাৎ ঘরে ঢুকে বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

মামা জানলা থেকে মুখ ঘুরিয়ে, বাবার দিকে তাকালেন। তারপর উত্তর দিলেন, “ভাল।” মামার গলা যেন আজ অত্যন্ত ম্লান।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “এ ক’দিন তুসি আপনাদের খুব জ্বালাতন করেছে তো?”

মামা এ-কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বললেন, “কাজের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে না এলেই পারতে।”

বাবা হাসলেন।

“আর দুটো দিন থাকলে ক্ষতিটা কী হত?”

বাবা বললেন, “উপায় থাকলে নিশ্চয়ই থেকে যেতুম। কিন্তু এমন একটা কাজের দায়িত্ব পড়েছে, আমাকে ফিরতেই হবে।”

“তবে মেয়েটাকে দু’দিন রেখে যাও,” মামা বললেন।

“তুসির স্কুল খুলে যাবে যে!” বাবা উত্তর দিলেন।

মামা চুপ করে গেলেন।

পিকনিক হল না। তুসি চলে যাবে কাল সকালের ট্রেনে। সুতরাং গোটা বাড়ি থমথম করছে।

“বাবা!” যখন বাবা একা ছিলেন, তখন তাঁর কাছে এল তুসি।

“কীরে?”

“আমাকে একটা জিনিস এনে দেবে?”

“কী?”

“একটা আতাগাছের চারা।”

“কী করবি?”

“পেছনের বাগানে পুঁতে দেব, একটাও গাছ নেই।”

বাবা বললেন, “ঠিক আছে। বিকেলে বেরিয়ে দেখি, যদি কোনও নার্সারির দোকানে পাই?”

আজ সারাদুপুর নিলু আর টুলু খুব ব্যস্ত। কী যে করছে কে জানে! দিদিমার সঙ্গে চুপিচুপি কী শলা-পরামর্শ হয়েছিল কেউ জানে না। তারপর সন্ধেবেলায় যখন তুসির বাবা আতাগাছ কিনে ফিরলেন, তখন পেছনের বাগানে আলো জ্বলছে। একটা চৌকি পাতা হয়েছে। তার ওপর সুন্দর করে চাদর-বিছানো ক’টা চেয়ার সাজানো। বাগানের দেওয়ালে একটা মস্ত বড় কাগজ আটকানো। তাতে বড় বড় করে লেখা: তুসিদির জন্যে এই ছোট্ট ফাংশান। সকলকে আসতে হবে।

হ্যাঁ সক্কলেই এসেছিলেন। আসেননি শুধু মামা। তিনি নিজের ঘরে বন্দি হয়ে কী যে করছিলেন, কে জানে! ফাংশানের শুরুতেই নিলু-টুলু-দোলা একসঙ্গে গান গাইল। নিলু বলল, “এ-গান আমরা তুসিদির কাছে শিখেছি।”

তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দিদিমা গান ধরলেন, সেই গানের তালে দোলা নাচ শুরু করল। ওঃ! সে কী মজা! তারপর নিলু ছড়া বলল। আর টুলু বলল একটা গল্প। বলল, তুসিদির গল্প: “ওই যে তুসিদির কপালে আঘাতের চিহ্নটা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, ওটা আমিই করেছি। আমি গুলতি ছুড়ে তুসিদিকে মেরেছি। আর তুসিদি এত ভাল, পাছে বাবা আমায় মারে, তাই সকলকে মিথ্যে মিথ্যে বলল, খেলতে খেলতে পড়ে গিয়ে নিজে নিজে কপাল কেটে ফেলেছে।” বলতে বলতে টুলুর গলা কেঁপে উঠল। সে কেঁদে ফেলল। আর কিছু বলতে পারল না।

সবশেষে তুসি গান গাইল। ফাংশান শেষ হয়ে গেল।

তারপর আরও অনেক রাত অবধি জেগেছিল সবাই। আরও অনেক গল্প হল। তারপর ঘুমের পালা।

নয়

খুব ভোরবেলা উঠেছিল তুসি। সক্কলের আগে। সেই আতাগাছের চারাটা নিয়ে সে বাগানে গেল। মাটি খুঁড়ে চারাটি বসিয়ে জল দিল। তারপর মনে মনে বলল, “গাছ, আমি বড় হওয়ার আগে তুমি বড় হোয়ো। তোমার ছায়ায় এসে আমি যেদিন খেলা করব, সেদিন যেন তোমার ডালে বসে অনেক পাখি গান গায়।”

সকালে ট্রেন। ঠিক সময়ে ট্যাক্সি এসে গেল। সক্কলের কাছে বিদায় নেওয়ার আগে মামার কাছে গেল তুসি। আজই ওর চোখে প্রথম জলের ফোঁটাগুলি টলমল করে দুলে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। মামাকে তুসি প্রণাম করল। তারপর বলল, “আমি যদি ভুল করে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি, কিছু মনে করবেন না মামা।”

মামা কিছু বলতে পারলেন না। তুসিকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তাঁর সব রাগ নিমেষে যেন মুছে গেল মন থেকে। মামা তাঁর শক্ত হাতের মুঠি খুলে ধীরে ধীরে তুসির চোখের ফোঁটাগুলি মুছিয়ে দিতে দিতে নিজেরই চোখের জল সামলাতে পারলেন না।

চলে গেল তুসি। রেখে গেল, নিজ্‌ঝুম বাড়িটার আনাচে-কানাচে অনেক আনন্দ আর মুঠো মুঠো খুশি।

এখন রোজ সকালে, সকলের ঘুম ভাঙার আগে, বাগানে যান মামা। ওই আতাগাছের গোড়ায় রোজ জল দেন। তারপর ওপরে এসে জানলায় দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকেন ওই গাছটার দিকে! তিনি যেন দেখতে পান, ওই গাছ যেন আলো-বাতাসে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। একদিন সত্যিই নতুন পাতারা গাছের ডালে দুলে উঠল। সেদিন তাঁর মুখে হাসি দেখা গেল। তিনি সেদিন আলমারির চাবিটা খুললেন। একটা ছেঁড়া খাতা বার করলেন। হ্যাঁ, এ সেই নিলু-টুলুর খাতা। এই খাতারই একটি পাতায় বড় বড় হরফে নিলু লিখেছে: বাবা আমাদের ভালবাসে না। বাবা আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না... হ্যাঁ, সেদিন তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে নিলু-টুলুর ঘরে ঢুকে হঠাৎ খাতাটা দেখতে পেয়েছিলেন। তারপর? তারপর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলেমেয়েদের তিনি ভালবাসেন না। সেইদিন থেকেই তিনি থমকে আছেন। কেমন যেন পালটে গেলেন তিনি ধীরে ধীরে।

আজ সেই খাতাটাই হাতে নিয়ে তিনি ডাক দিয়েছিলেন, “নিলু-টুলু-দোলা।”

বাবার ভয়ে ছুটে এসেছিল ওরা। বাবার সামনে এসে চুপটি করে দাঁড়াল। বাবা হাত বাড়ালেন, “তোদের খাতা।”

নিলু-টুলু চমকে উঠল।

বাবা বললেন, “নে, ধর।”

নিলু ধরল। তারপর ভয়ে কাঁপতে লাগল।

বাবা ওদের মুখের দিকে তাকালেন খানিক। তারপর আচমকা হো-হো করে হেসে উঠলেন। বাবাকে হাসতে দেখে থতমত খেয়ে গেল নিলু-টুলু-দোলা। বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে রইল বাবার মুখের দিকে। কেন না, এমন করে বাবাকে তো তারা কোনওদিন হাসতে দেখেনি।

তেমনই করে হাসতে হাসতেই বাবা বললেন, “যা, ব্যাডমিন্টনের ব্যাট নিয়ে আয়। আজ আমি তোদের সঙ্গে বাগানে খেলা করব।”

এই কথা শুনে নিলু-টুলু-দোলা হতবাক হয়ে থমকে বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ভাবে, তাদের বাবা কি সত্যি এই কথা বলছে! এ যেন স্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে তাদের কানে।

বাবা এবার নিলু-টুলু-দোলার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “যা, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

“সত্যি!” হঠাৎ তিনজনে একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।

বাবা বললেন, “হ্যাঁ রে, সত্যি। তোরা আমাকে কেউ হারাতে পারবি না। তোদের কাছে আমি যদি হেরে যাই, সক্কলকে সার্কাস দেখাব। কিন্তু আমার কাছে যদি তোরা হেরে যাস?”

নিলু আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠল, “তখন সার্কাস দেখাবে দিদিমা।” বলেই দিদিমাকে জড়িয়ে ধরল নিলু।

আজ নিলু-টুলু বাবাকে হারাবেই হারাবে। বাবাও হাতে ব্যাট নিয়ে ছোট্ট ছেলের মতো লাফালাফি শুরু করেছিলেন ওদের সঙ্গে। বাবা যেন আজ সত্যিই নিলু-টুলুর বন্ধু হয়ে গেলেন!

হ্যাঁ, বন্ধুই তো! কেন না, তুসি যে জাদু জানে।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%