শৈলেন ঘোষ

ছেলেটাকে সবাই ডাকত ‘হাবলা’ বলে।
মা ডাকতেন। বাবাও।
দাদা ডাকত। দিদিও।
অথচ ছেলেটাকে দেখে কেউ বলতে পারবে না, তাকে দেখতে একটা আস্ত হাবলার মতো। যেমন দেখতে মিষ্টি, তেমনই ফুটফুটে। এমন ফুটফুটে ছেলের মিঠে-মিঠে নাম না-হয়ে কেন যে অমন হাবলা-হাবলা নাম হল, কে জানে। নামটা তার নিজেরই খুব ভাল লাগত কি না, সে কথা সে ছাড়া আর কে বলবে।
একদিন হয়েছি কী, তখন আকাশে ঝলমল করছে রোদের আলো। ওমা! বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ কোত্থেকে একটুকরো মেঘ উড়ে এসে জুড়ে বসল আকাশের এক কোণে। এদিকে রোদ আর ওদিকে মেঘ। তারপর হল এক মজার কাণ্ড। ঝিরঝিরিয়ে নামল বৃষ্টি। ঠিক যেমন ইলশেগুঁড়ি। আকাশে রোদও হাসছে, বাদলও হাসছে। আর, ঘরে বসে সেই হাবলা নামের ফুটফুটে ছেলেটা জানলায় মুখ ঠেকিয়ে আবাক চোখে তাই দেখছে।
দেখতে দেখতে হঠাৎ তার চোখদুটি খুশিতে উছলে উঠল। তার চোখের ওপর ভেসে উঠল রং। সাতটি রঙের রামধনু। দেখতে দেখতে পলক পড়ে না চোখের। মনে মনে ভাবে, আহা! রামধনু কেন আকাশ থেকে নেমে আসে না সবুজ মাঠে! তা হলে ওই রং নিয়ে খেলা করি!
তারপর?
তারপর, আকাশে-আঁকা রামধনুর রং আর কতক্ষণই-বা দেখা গেল! কোথায় গেল রামধনু? কোথায় লুকোল? আকাশের কোন পারে? ছেলেটা ছুট্টে বেরিয়ে এল ঘর থেকে বাইরে। না, না, বৃষ্টিও নেই, মেঘও নেই। রংও নেই। নেই রামধনুও। সে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল আকাশের দিকে চেয়ে! আর আনমনে ভাবতে লাগল, আহা রে, তার নামটা হাবলা না-হয়ে যদি রামধনু হত। সেইদিনই সে মুখ ফুটে বলে ফেলল, “হাবলা নামটা ভাল্ না।”
আর একদিন।
হয়েছি কী, মাঠ দিয়ে সে হাটে যাচ্ছিল। হাঁটতে হাঁটতে কোঁচড়ভর্তি সে মুড়ি খাচ্ছিল। এমন সময়ে পথের ধারে, জামগাছে একটা পাখি ডাকল, “টুররর, টুর-টু! টুররর, টুর-টু।”
ছেলেটা থমকে থামল। গাছের ডালে চোখ পড়ল। পাতার ফাঁকে একটা কী সুন্দর পাখি। আহা রে! গাছের পাখি তার সঙ্গে যদি ঘরে যেত! এই কথাটা ভাবল বলেই সে ডাক দিল, “ও পাখি, ছোট্ট পাখি, তুমি আমার সঙ্গে যাবে? আমাদের বাড়িতে? আমি তোমায় গল্প বলব, তুমি আমায় গান শোনাবে!”
পাখিটা মাথামুণ্ডু কী বুঝল কে জানে, আবার ডেকে উঠল, “টুররর, টুর-টু।”
ছেলেটা বলল, “ও পাখি, ছোট্ট পাখি, তুমি মুড়ি খাবে?” বলতে বলতে কোঁচড় থেকে মুড়ি নিয়ে ছড়িয়ে দিল। পাখিটা সুড়ুত করে নেমে এল গাছের ডাল ছেড়ে মাটিতে। টুক-টুক করে মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খেতে লাগল।
ছেলেটা এবার মুঠোভর্তি মুড়ি নিয়ে হাত বাড়িয়ে পাখিকে বলল, “ও পাখি, ও পাখি, এই আমার হাত থেকে খাও।”
ওমা! পাখিটা সতি সত্যি ফুড়ুত করে উড়ে এসে ছেলেটার হাতে বসে মুড়ি ঠোকরাতে লাগল। এই ফাঁকে যেই না ছেলেটা পাখির গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে গেছে, ব্যাস! পাখি উড়ুত। কোথায় যে উড়ে পালাল আর দেখাই গেল না।
ছেলেটার মন ভারী খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা ভাবল, “আহা রে, আমি যদি পাখি হতুম, তা হলে কী মজাই না হত! আমিও পাখির সঙ্গে পাখি হয়ে আকাশে উড়ে বেড়াতুম!”
ঠিক তক্ষুনি তার আবার মনে হল, আমার নামটা হাবলা না হয়ে যদি পাখি হত। সে মুখ ফুটে আবার বলে ফেলল, “হাবলা নামটা ভাল্ না।”
সেই থেকে মনটা তার ভারী খারাপ। কারও সঙ্গে সে কথা বলল না। না-বলল মা-র সঙ্গে কথা, না বলল বাবার সঙ্গে। এমনকী, দিদির সঙ্গেও না, না দাদার সঙ্গেও।
দাদা জিজ্ঞেস করল, “কী হল রে হাবলা, কথা বলছিস না কেন? কেউ বকেছে?”
হাবলা মুখ ব্যাজার করে উত্তর দিল, “না।”
দিদি জিজ্ঞেস করল, “কী হল ভাই হাবলা, গল্প করবি না? কেউ মেরেছে?”
হাবলা মুখ হাঁড়ি করে উত্তর দিল, “না।”
মা ছুটে এলেন, “হাবলা, হাবলা, কী হল সোনামণি, কার সঙ্গে রাগারাগি করলে?”
হাবলা তিরিক্ষি মেজাজে উত্তর দিল, “কারও সঙ্গে নয়! তোমরা আমায় হাবলা-হাবলা করবে না তো! আমার শুনতে ভাল্ লাগে না। তোমরা কেউ আমার নাম ধরে ডাকবে না!”
বাবা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে হাবলা, রাগ করছিস কেন বাবা?”
এবার ভীষণ খেপে গেল হাবলা। চেঁচিয়ে উঠল, “জানি না, জানি না, জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না।”
অগত্যা আর কী করা, মা বললেন, “তবে আমিই যাই হাটে।”
মা হাটে গেলেন।
বাবা বললেন, “আমারও তো সময় হয়ে গেল। আমিও যাই সদরে।”
বাবা সদরে চলে গেলেন।
দাদা চলে গেল বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে।
দিদি গেল গান শিখতে।
এখন একা, এক্কেবারে একা চুপটি করে মুখ ঘুরিয়ে ঘরে বসে রইল হাবলা।
মা হাটে গেছেন।
বাবা সদরে গেছেন।
দাদার হাঁকাহাঁকি নেই। দিদিরও ডাকাডাকি নেই।
একদম চুপচাপ, নিঃঝুম ঘরখানা। হাবলা নিজের নিশ্বেস ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তাই, একটু পরেই তার উশখুশুনি শুরু হয়ে গেল। এপাশ-ওপাশ ঘুরে দেখল। ভোঁ-ভাঁ। সব সুনসান। জানলায় মুখ ঠেকাল। বাইরে মিঠাইওলা যাচ্ছে মাথায় মিঠাইয়ের ধামা নিয়ে হাঁকতে হাঁকতে। হাবলার সেদিকে চোখ গেল, কিন্তু মন গেল না। মাঠের ওপর মা-ছাগলের পিছু কালো কুচকুচে ছাগলছানাটা লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে! সেদিকে তার চোখ পড়ল, কিন্তু মুখে হাসি ফুটল না। কেমন করে ফুটবে! কেউ কোত্থাও নেই। সবাই তাকে একলা ফেলে ঘর শূন্য করে চলে গেল। দিদি নেই যে, দিদিকে বলবে, “দ্যাখ দিদি, মিঠাইওলা যাচ্ছে! কিনবি?” কিংবা মা নেই যে, মাকে বলবে, “দ্যাখো মা, কালো-কুচকুচে ছাগলছানাটা কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে।”

অনেকক্ষণ একা একা নির্জন ঘরে বসে থাকতে থাকতে ভীষণ কান্না পেয়ে গেল হাবলার। বুকের ভেতরটা দুরদুর করতে লাগল। জানলায় মুখ ঠেকিয়ে সে দেখতে লাগল, দাদা আসে, না, দিদি আসে। মা আসেন, না, বাবা আসেন।
না, কেউ আসেন না। তবে কি সবাই চিরদিনের মতো হাবলাকে ছেড়ে চলে গেলেন! তা হলে এখন কী করবে হাবলা! একবার তার মনে হল, সে ঘর থেকে ছুটে পালায়। লুকিয়ে পড়ে কোথাও। কিংবা হারিয়ে যায়! কেউ খুঁজে পাবে না। তখন বেশ হবে। তখন হাবলা-হাবলা বলে সবাই যতই ডাকুক, টু শব্দটি পর্যন্ত করবে না। কেন, কী এমন অন্যায় করেছে সে যে, তাকে সবাই একা ফেলে চলে গেল! দাঁড়াও না, দেখাচ্ছি মজা!
হঠাৎ চমকে উঠল হাবলা। ওই তো হাট থেকে মা আসছেন!
কী যেন মনে হল হাবলার, অন্য কিছু ভেবে না পেয়ে চোখের পলকে দেরাজের পেছনে ছুটে গিয়ে ঝুপ করে লুকিয়ে পড়ল। দেখি না, কী হয়!
মা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে এধার-ওধার দেখলেন। হাবলার নাম ধরে একবারও ডাকলেন না। ছেলেটা কোথায় আছে, তারও খোঁজ করলেন না।
হাবলা দেরাজের ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগল মাকে। হাট থেকে কত কী কিনে এনেছেন আনাজপাতি। সেই নিয়েই মা ব্যস্ত। হাবলা ঘরে আছে কি নেই, না থাকলে ছেলেটা গেল কোথায়— এই ভাবনায় মা যে একেবারে অস্থির হয়ে পড়েছেন, মায়ের মুখ দেখলে তা বোঝাই যায় না। মা নির্ভাবনায় এটা নাড়ছেন। ওটা দেখছেন। আর মাঝে মাঝে হাই তুলছেন।
আর থাকতে পারল না হাবলা। অভিমানে তার মুখ লাল হয়ে গেল। দেরাজের আড়ালে লুকিয়েই সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। “কে কাঁদে রে, কে কাঁদে?” মা যেন অনেকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
তবু হাবলা সাড়া দিল না। সে আরও জোরে ফুঁপিয়ে উঠল।
মা বললেন, “বুঝতে পেরেছি, আমার ডাক নাম যার পছন্দ নয়, সেই ছেলে আমার কাঁদছে।”
হঠাৎ দেরাজের পেছন থেকে একেবারে ছিটকে বেরিয়ে পড়ল হাবলা। তারপর মাকে জড়িয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে বলে উঠল, “কে বলেছে তোমার ডাকা নাম আমার পছন্দ নয়! আমি একটু রাগ করে বলেছি বলে তোমরা আমায় একলা ফেলে সবাই চলে গেলে। তুমি ঘরে ফিরেও আমায় ডাকলে না। আমি কোথায় আছি, তাও খুঁজলে না। এতে আমার কান্না পায় না?”
“ও বুঝতে পেরেছি,” বলে মা হেসে ফেললেন। তারপর হাবলার কপালে একটা চুমো খেয়ে আদর করে বললেন, “হাবলা, ছিঃ! কাঁদে না!”
নিজের নামটা মায়ের মুখে হঠাৎ শুনে হাবলা চমকে চাইল মায়ের মুখের দিকে। তারপর বলল, “তুমি আর একবার ডাকো আমার নাম ধরে!”
মা আবার ডাকলেন, “হাবলা, হাবলা।”
এবার হাবলাই হেসে ফেলল। তার চোখ উপচে অশ্রু-ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, আর ঠোঁটদুটি হাসিতে ঝলমলিয়ে উছলে উঠছে। হাসি-কান্না মেশানো হাবলার সে-মুখখানি কী মিষ্টি।
মা হাবলার চিবুকে হাত দিয়ে আদর করলেন। হাবলা মায়ের আঁচলের মধ্যে মুখ ঢেকে আবার বলল, “মা, আর একবার ডাকো!”
মা হাসতে হাসতে ডাকলেন, “হাবলা।”
ঠিক সেই মুহূর্তে হাবলার মনে হল, রামধনুর সাতটি রঙের চেয়ে মায়ের ডাকা নামটি তার আরও সুন্দর, অনেক সুন্দর।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন