রহস্যের নাম সুন্দরী

শৈলেন ঘোষ

আমাদের বাড়িটা অনেক বছরের পুরনো। খুব একটা বড় নয়। কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর। এমন সুন্দর সুন্দর বাড়ি ছবিতে হামেশাই দেখা যায়। তবে, আমাদের এখানে যে বড় বাড়ি নেই তা যেন ভেবো না। সুন্দরী যে-বাড়িটায় থাকে, সেটা তো খুবই বড় বাড়ি। তেমনই দেখতেও চমৎকার। চারদিকে বাগান। মধ্যিখানে বাসভবন। তিনতলা।

সুন্দরীকে আমরা অবশ্য কেউ কোনওদিন দেখিনি। তবে শুনেছি, সুন্দরীকে দেখতে অপরূপ। অপ্সরাদের মতন, তা, সেই অপরূপ অপ্সরা কতটা সুন্দরী, আমরা কেউ জানি না।

কারণ সে কাউকে কোনওদিন দেখাই দেয় না। এমনকী, তার বাড়ির ভেতরে কেউ ঢুকতেও পারে না। অবশ্য বাগানটা দেখভাল করার জন্যে দু’-তিনজন মালী কাজ করতে আসেন রোজ সকালে। আর তাঁদের কাজের তদারকি করেন একজন কাজের মাসি। আসলে মাসিই সব। সুন্দরীর ঘরকন্নার কাজও করছেন তিনি। বাগান, বাড়ির দেখাশোনাও করছেন। আবার হাটবাজারেও যাচ্ছেন। আর যিনি সুন্দরী তিনি পায়ে পা তুলে রূপের গুমরে বুঁদ হয়ে বসে আছেন। কেন যে সুন্দরী দেখা দেয় না কে জানে! তাই তাকে দেখার জন্যে আমরাও সময় পেলেই উঁকিঝুঁকি দিই। দেওয়াই সার! ফক্কা! আশ্চর্য কী জানো, বাড়িতে, এই দুটি প্রাণী ছাড়া, মানে সুন্দরী আর কাজের মাসি ছাড়া আর নেইও কেউ। তাই কেমন যেন রহস্য-রহস্য লাগে বাড়িটা।

আমরা যেখানে থাকি, সে জায়গাটাকে ঠিক শহর বলা যাবে না। আধা শহর আধা গ্রাম। চারদিকে সবুজে সবুজে ছেয়ে আছে। দু’পা দূরেই নদী। প্রতি বছর শীতের সময় কত মানুষ এখানে হাওয়া বদল করতে আসেন। দু’-দশ দিন থাকেন, আবার চলে যান। আমরা প্রত্যেক বছর কত যে নতুন মানুষের মুখ দেখি। কতরকমের বাহারি সাজগোজ তাদের। তাদের মধ্যেও এক-একজন কী অপরূপ দেখতে। কিন্তু হলে কী হয়! আমাদের এখানকার যারা বাসিন্দা তাদের সবার মুখে এক কথা, আমাদের সুন্দরীর কাছে এরা! ফুঃ!

সবাই বলে, আমি এখন বড় হয়ে গেছি। তা দশ বছর বয়স হলে যদি বড় বলা যায়, তবে বলতে পারো আমি বড়ই। আমি সবে ক্লাস ফাইভে পড়ছি। সুতরাং বাবার মতো বড় হতে এখনও আমার অনেক বছর লেগে যাবে। আর আমি যখন বাবার মতো বড় হব, তখন বাবাও বুড়ো হয়ে যাবেন। এখন যেমন দাদু বুড়ো। আমি জানি না। এখন সুন্দরীর কত বয়েস। কেউই জানে না। এখন তার বয়েস যদি কমও হয়, তবে, আমি বাবার মতো বড় হয়ে গেলে, সে-ও তো বুড়ি হয়ে যাবে। তখনও কি সবাই তাকে সুন্দরী বলবে?

আমাদের ক্লাসের কুণাল ভারী অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলে। ও নাকি কার কাছে শুনেছে, এ-সুন্দরী যে-সে সুন্দরী নয়। এ-সুন্দরীর বয়েস বাড়ে না। যখনই চোখে পড়বে, দেখবে, ফুটফুট করছে। এরা মন্তর জানে। মন্তরের জোরেই এরা চিরদিন এমন সুন্দরী থাকতে পারে। গভীর রাতে অচেতন হয়ে আমরা যখন ঘুমোই, তখন এরা সবার অলক্ষ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এমনই এক গভীর রাতে কুণালের এক পিসতুতো দাদা নাকি সুন্দরীকে দেখতে পেয়েছিল। কুণালের পিসতুতো দাদা অবশ্য এখানে থাকে না। থাকে গিরিডিতে। মাঝে মাঝেই দাদা বেড়াতে আসে এখানে। সেবার বেড়াতে এসে দেখে কী, সুন্দরীর বাড়িটা ঘিরে যে বাগানটা আছে, সেই বাগানে সুন্দরী গাছে গাছে ফুল তুলছে। কী জলুস তার গায়ের রঙে! মনে হচ্ছে যেন গা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোতেই ফুল দেখছে, আর তুলে নিচ্ছে। এটা তার পিসতুতো দাদার নিজের চোখে দেখা। দেখেছে কুণালদের ছাদ থেকে।

আমি কুণালের মুখে তার দাদার এইসব কথা শুনে মা, বাবা, দিদি, দাদু সবাইকে বলেছিলুম। কেউ উত্তর না দিলেও বুঝতে পারছিলুম কথাটা কেউ ফেলতে পারছে না। আর সেইদিন থেকে নিশুতি রাতে সুন্দরীকে দেখার ইচ্ছেটা আমায় দারুণ পেয়ে বসল।

ইচ্ছে হলেও সব ইচ্ছে তো আর এই বয়েসে মানুষের মেটে না। আমি যদি বাবার মতো বড় হতুম, তা হলে যা ইচ্ছে তাই করতে পারতুম নিজে নিজে। এখন আমার কিছু করার ইচ্ছে হলে, বাবার আজ্ঞা ছাড়া করার জো নেই। কাজেই আগে অন্য কারও কাছে না গিয়ে বাবার কাছেই গেলুম। বাবাকে আমার ইচ্ছের কথাটা খুলেই বললুম। বাবা আমার সব কথা শুনলেন। তারপরে গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কুণালের দাদা যে-রাতে সুন্দরীকে দেখতে পায় সে-রাতটা কোন তিথিতে পড়েছিল, সে-কথা কি তার দাদা বলেছে?”

বাবার কথা শুনে আমি হাঁ হয়ে গেলুম। তিথি কাকে বলে, আমি আর জানব কেমন করে! কাজেই হাঁদারামের মতো বাবাকে বলেই ফেললুম, “সে-কথা তো কুণাল বলেনি।”

বাবা বললেন, “তবে ভাল করে জিজ্ঞেস করে আসিস।”

আমি হতাশ গলায় উত্তর দিলুম, “জানলে কি আর কুণাল বলত না? ঠিক বলত। এখন জানতে হলে কুণালের দাদার কাছে ছুটতে হয়। কিন্তু দাদা তো থাকে অনেক দূরে।”

“কোথায়?”

“গিরিডিতে।”

“তা হলে আর কী করা।” বাবা আর কথা বাড়ালেন না। উলটে আমায় ঠুকে দিলেন। বললেন কী, “সারাজীবনটাই তো তোমার সুন্দরীর ভাবনায় কেটে গেল। এবার পড়াশোনার ভাবনাটাও একটু করো!”

বাবার কথা শুনে আমার ভীষণ দুঃখ হল। আসলে পড়াশোনা যে আমি করি, এটা বাবা খুব ভাল করেই জানেন। এখন আমার মাত্র দশ বছর বয়েস। এই দশটা বছরকে বাবা কী করে বললেন, আমার সারাজীবন! আমার কি দাদুর মতো বয়েস হয়েছে। আমি বুড়ো হলে তুমি যদি এ-কথা বলতে, মেনে নিতুম। ঠিক আছে, বয়েসের কথা না হয় ছেড়েই দিলুম, আমি যে সুন্দরীকে নিয়ে সারাজীবন ভাবছি, এ-কথাটা তুমি বললে কী করে! এ তল্লাটে সুন্দরীকে নিয়ে ভাবছে না কে, শুনি! তুমিও তো কতদিন কত লোকের সঙ্গে সুন্দরীকে নিয়ে আলোচনা করেছ! তার বেলা? নিজের বেলায় আঁটিশুঁটি!

অবশ্য বাবার একটা কথা আমায় ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছে। বাবা এই যে তিথির কথা বললেন, ভাবনা সেইটা নিয়ে। তিথি কাকে বলে আমায় জানতেই হবে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, তিথি কাকে বলে দিদি জানে না। মা হয়তো জানেন, কিন্তু মাকে জিজ্ঞেস করলে কৈফিয়ত দিতে দিতে অস্থির হতে হবে। তার চেয়ে বরং দাদুকে জিজ্ঞেস করাই ভাল। তাই আমি দাদুর কাছেই ছুটলুম।

দাদুর কাছে তো সারাদিনে অগুনতিবার ছোটাছুটি করতে হয়। যতবারই দাদুর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ততবারই দাদু বলবেন, “ভাগ্যিস এলি।” বলেই হেসে উঠবেন। তা, তোমরাই বলো, অমন একটা অদ্ভুত কথা বলে কোনও মানুষ যদি হেসে ওঠেন, তবে তোমাকেও তো হাসতে হয়। এমনই করে আমি দাদুর কাছে অগুনতিবার যাই। দাদু অগুনতিবার ‘ভাগ্যিস এলি’ বলে হাসবেন। আর আমিও অগুনতিবার হি-হি করে হাসি। কিন্তু এবার গিয়ে আমি হাসলুম না। দাদু আমায় হাসতে না দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন। আমার মুখের দিকে চেয়ে বললেন, “পেট ভরেছে তো?”

আমি দাদুর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলুম না। তাই দাদুর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “মানে?”

দাদু তাঁর আদর-মাখা গলার স্বরটাকে লুকিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কার কাছে খেলি?”

এবার আমি বুঝতে পেরেছি। হেসেও ফেলেছি। দাদু ভেবেছেন, আমি কারও কাছে মার খেয়ে তাঁর কাছে নালিশ করতে এসেছি। তাই দাদুকে ভরসা দিয়ে বললুম, “না, না, আমায় কেউই মারেনি।”

“তবে?” দাদু রাগ চেপে গলা নরম করলেন।

“তবে এতক্ষণ মুখে হাসি দেখিনি কেন?”

“হাসতে ভাল লাগছে না।” উত্তর দিলুম আমি।

“কেন? এই বয়সে তোমার মতো ছেলেরা তো হাসবে, খেলবে, ফেলবে, ভাঙবে। মুখ গোমড়া করবে কেন? শুনি কী হয়েছে?”

“কুণালের এক পিসতুতো দাদা যে সুন্দরীকে দেখেছে, এই কথাটা বলতে গেলুম, আর বাবা আমাকে বকে দিল।”

“বেশ করেছে।”

আমি চমকে উঠলুম দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর বললুম, “তুমি তো আচ্ছা, সব কথা না-শুনেই হুট করে বলে দিলে বেশ করেছে!”

দাদু এবার গলায় জোর দিয়ে উত্তর দিলেন, “ঠিক বলেছি। তোর বন্ধু কুণালের দাদা গালগল্প করেছে। যাকে কেউ কোনওদিন দেখল না, তাকে সে দেখেছে! এটা বিশ্বাস করার কথা?”

আমিও জোর গলায় বললুম, “আরে বাবা, নিশুতি রাতে বাড়ির ছাদ থেকে সে নিজে দেখেছে, সুন্দরী ফুল তুলছে। আর তার সারা গা দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ছে, চারদিকে।”

“ডাহা মিথ্যে।”

এবার আমি বললুম, “তুমি মিথ্যে বললে কী হবে, বাবা কিন্তু বলল, হতে পারে। তবে সে-রাতটা কোন তিথিতে পড়েছিল, সেটা জানা দরকার। আমি বাবার মুখে ওই তিথির কথা শুনেই তোমার কাছে জানতে এসেছি, তিথি কাকে বলে।”

“তোমার এখন তিথি কাকে বলে জানার বয়েস নয়।” দাদু উত্তর দিলেন। “যারা বাত-বেদনায় ভোগে তিথির খবর তাদের রাখার কথা।”

আমি মনে মনে ভাবলুম, “যাঃ বাব্বা! এ যে উলটো বুঝিলি রাম হয়ে গেল। নাহ্‌ তিথি নিয়ে কথা বাড়িয়ে আর কোনও লাভ হবে না। তাই তিথির কথা ছেড়ে আমি দাদুকে জিজ্ঞেস করলুম, “বাত-বেদনা কাদের হয় দাদু?”

দাদু উত্তর দিলেন, “সেটাও এখন তোমার জানার কথা নয়। বয়স হোক তারপরে জানবে।”

এই যে থেকে থেকে সবাই বয়েস তুলে আমায় হেনস্থা করছে, এটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছিল। শেষমেশ আমিই রেগেমেগে বলে ফেললুম, “তা হলে কি বলতে চাও, আমার বয়েস হয়নি বলে সুন্দরীকে নিয়ে কোনও কথা কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারব না? আমার বুঝি সুন্দরীকে দেখতে ইচ্ছে করে না?”

এবার দাদু হো-হো করে হেসে উঠলেন।

আদর করে আমার চিবুকে হাত দিলেন। তারপর বললেন, “সুন্দরী দেখা না দিলে দেখবি কেমন করে?”

“দেখার চেষ্টা তো করতে হবে।” আমি উত্তর দিলুম। “ঠিক আছে, কুণালের দাদা না হয় গালগল্প করেছে, কিন্তু সুন্দরী যে বাড়ির ভেতরে আছে এটা তো সত্যি? আমরা তো একদিন সবাই মিলে বাড়ির ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে তাকে দেখে আসতে পারি!”

দাদু আমার কথা শুনে যেন আঁতকে উঠলেন, “খবরদার, খবরদার, ও কাজটি একদম কোরো না। পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে। তোর মাথায় কে ঢোকাল এই দুর্বুদ্ধিটা?”

“কেউ ঢোকায়নি। আমার নিজেরই মনে হয়েছে।”

“এমন একটা দুর্বুদ্ধি মাথায় আসাটা মোটেই ভাল কথা নয়। আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাব।” দাদু যেন ভয় পেয়েছেন।

আমি কিন্তু আমার মনকে কিছুতেই মানাতে পারলুম না। সে খুঁত খুঁত করতেই থাকল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, কুণালের দাদা এলেই তাকে ধরব। আমার বিশ্বাস, সুন্দরীকে সে-ই আমায় দেখাতে পারবে। অন্তত তার কাছে জানতে তো পারব, তিথি কাকে বলে। যতদিন না তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, ততদিন আমার স্পিকটি নট থাকাই ভাল। দেখাই যাক, কবে আসে সে।

না, বেশিদিন দেখতে হল না। না, না, কুণালের দাদা এল না, এল একটা অন্য খবর। খবর ছড়িয়ে পড়ল, সুন্দরী দেখা দেবে। এমন একটা জবর খবর সে কী চাপা থাকে! ঝড়ের মতো ঝাপটে পড়ল ঘরে ঘরে। কিন্তু দেখা দেবে, এ কথাটা শুনেই সবার সে কী উল্লাস।

এখন আমাদের এখানে পুজোর মরশুম শুরু হয়ে গেছে। দলে দলে লোক হাওয়া বদলের জন্যে বেড়াতে এসেছে। একদল আসবে, একদল যাবে। আমরা জানি, এই আসা-যাওয়া চলবে সেই বর্ষা না আসা পর্যন্ত। শুনতে অবাক লাগবে, অনেকে এখানে যে শুধু হাওয়া বদলের জন্যে আসে, তা নয়। অনেকে আসে সুন্দরীকে দেখার লোভেও। সুন্দরীর রূপের কথা মুখে মুখে চাউর হয়ে কোথায় না ছড়িয়ে পড়েছে! আসলে রহস্যের গন্ধ পেলে মানুষের নাক সুড়সুড় না করে পারে!

এমন সময় হঠাৎ একদিন হাওয়া উঠল, আজ রাত্তিরেই সুন্দরী ছাদে উঠে চাঁদের আলোয় দর্শন দেবে সবাইকে।

হাওয়াটা যে কে ছড়াল বা কোথা থেকে এল, তার হদিস করতে পারল না কেউ। আজ রাত্তির মানে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পূর্ণিমা। ওহ! আজ প্রমাণ হয়ে যাবে, কার আলোর বেশি জেল্লা, চাঁদের, না সুন্দরীর!

আমি ছুটলুম দাদুর কাছে। দাদুর ঘরে ঢুকতেই দাদুর মুখে সেই এক কথা, “ভাগ্যিস এলি।” বলতেই আমি হেসে ফেললুম। দাদুও হাসলেন তারপর হাসতে হাসতে চোখ বড় করে বললেন, “আজ তো হচ্ছে!”

আমি অবাক হয়ে গেলুম। বললুম, “এরই মধ্যে খবরটা তোমার কানেও পৌঁছে গেছে?”

দাদু বললেন, “আরে বাবা, এসব খবর চাপা থাকে!”

“তুমি কেমন করে জানলে?”

“তুই যেমন করে জেনেছিস?”

আমি বললুম, “আমিও যে কেমন করে জানলুম বুঝতে পারছি না।”

দাদু উত্তর দিলেন, “আমারও ঠিক তোমার মতো অবস্থা।”

“দাঁড়াও, আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করে আসি।” বলে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবার কাছে পৌঁছে গেলুম। ওমা, ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাবা বলে উঠলেন, “আর কী, আজ তো সব সমস্যার সমাধান!”

আমি বললুম, “তুমিও জানো?”

বাবা উত্তর দিলেন, “তুমিও জানো মানে? সারা তল্লাটে হইহই পড়ে গেছে। কার জানতে বাকি আছে শুনি!”

“দাঁড়াও তো মা জানে কি না দেখি।” বলে আমি ছুটলুম রান্নাঘরে। রান্নাঘরে ঢুকতেই মা বলে উঠলেন, “কেমন চালাক দেখেছিস? রূপের কী গুমর! নিজের রূপ জাহির করার জন্যে যত পেরেছে ঢাক-ঢোল পিটিয়েছে। সুন্দরীর রূপের বাহার যে কতখানি, তা বোঝা যাবে আজ!”

মায়ের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে উঠেছি, “তার মানে, কারও জানতে বাকি নেই।”

মা বললেন, “এসব কথা কি চাপা থাকে?”

তা হলে দিদিও তো নিশ্চয় জানে। ছুটলুম দিদির কাছে। গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “দিদি, জানিস তো?”

“জানলেই বা কী!” দিদি কেমন যেন তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর দিল।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কেন, তোর দেখার ইচ্ছে নেই?”

দিদি বলল, “দেখলে কি সাপের চার পা গজাবে?”

দিদির এই মুখ বেঁকানো কথা শুনলে কার না রাগে গা রি রি করে বলো! তবে হ্যাঁ, দিদিও সুন্দরী। তার মানে, তুমি যতক্ষণ না দেখছ, ততক্ষণ তুমি কেমন করে বলবে দিদি সুন্দরীর চেয়েও সুন্দরী! আমিও তাই দিদিকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্যে বলে উঠলুম, “তুই ভীষণ হিংসুটি! সুন্দরী দেখা দিলে তোর রূপের বড়াই অসার হয়ে যাবে, তাই তুই চাস না সুন্দরী দেখা দিক।”

দিদি রেগে টং। এই বুঝি দেয় ঠাস করে চড়িয়ে! রক্ষে, দিদি চড়াল না। উলটে চেঁচিয়ে উঠল, “মা, দ্যাখো না, রুন্টু আমার সঙ্গে লাগছে!”

মা-ও রান্নাঘর থেকে ধমক দিলেন, “এই রুন্টু, কী হচ্ছে কী! যাচ্ছি দাঁড়া! আমি গেলে কিন্তু একা যাব না। আমার সঙ্গে এই গরম খুন্তিটাও যাবে।”

এই নিয়ে যে মায়ের গরম খুন্তি হাতে তেড়ে আসাটা কতবার হয়ে গেল! কিন্তু একবারও কাজে হল না। আর আমিও তাই মাকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্যে বলে উঠলুম, “দাদু তোমাকে বলেন ঘরের লক্ষ্মী। আজ সেই লক্ষ্মীপুজো। আজ কোথায় তুমি আমাদের হাসিমুখে আদর করবে, তা নয়, তুমি আমায় খুন্তি দেখাচ্ছ। দাঁড়াও, আমি দাদুকে বলে দিচ্ছি।”

ব্যাস! আমার এই একটি কথাতেই মা কাত। মা সঙ্গে সঙ্গে হাঁকপাক করে চেঁচিয়ে উঠে আমাকে ডাক দিলেন, “এই রুন্টু, শোন, শোন! তাড়াতাড়ি একবার এদিকে আয়! মুড়কির মোয়া করেছি। আর ছোলার ডালের বরফি।”

বুঝতে পারলুম এখন দাদুর কাছে নালিশ করার চেয়েও ছোলার ডালের বরফির দিকে ছুটে যাওয়া বেশি কাজের। তাই দিদিকে তেরছা নজরে নিমেষ দেখেই আমি ছুটলুম মায়ের কাছে। মা আমার এক হাতে মোয়া আর এক হাতে বরফি ধরিয়ে দিয়ে হাসলেন। আমিও হাসতে হাসতে দিলুম কামড় মোয়ায়। আহা! কী স্বাদ!

আশ্চর্য কথা কী, সেই পূর্ণিমার রাতে সুন্দরীকে দেখার জন্যে কত যে লোক জমায়েত হয়েছিল তার বাড়ির সামনে, কী বলব! ভিড়ে ভিড়াক্কার। এত লোক কোথায় ছিল কে জানে! কিন্তু ভয়ানক কথা কী, সুন্দরী দেখা দিল না। ছাদ ভোঁ ভাঁ। বারান্দা খাঁ খাঁ। জানলা বন্ধ। সুন্দরীর ‘সু’-ও কারও নজরে পড়ল না। এ কী কাণ্ড! সবার এত আশা, এত উৎসাহ, এক ঝটকায় ফুস! উফ, সেই লক্ষ্মীপুজোর রাতটা যে আমার কী কষ্টে কাটল, কী বলব। তার ওপর দিদিও যখন ভেংচি কেটে আমাকে শুনিয়ে গেল, “ঠিক হয়েছে,” তখন মনের জ্বালায় মরে গেলুম। আর ঠিক সেই তখন থেকেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, আমাকে যেমন করেই হোক সুন্দরীকে দেখতেই হবে। কিন্তু সেই যেমনটা কেমন করে হবে, তার উত্তর আমার জানা ছিল না। জানা ছিল না বলেই উত্তরটা ভাবতে ভাবতেই আমি ঘুমিয়ে পড়লুম সেই লক্ষ্মীপুজোর রাতে।

সত্যি বলতে কী, যে-রাতটা আমার সবচেয়ে কষ্টের রাত হওয়া উচিত ছিল, সেই রাতেই আচমকা আমি একজনের স্বপ্ন দেখে ফেললুম। স্বপ্নটা অন্য আর কারও নয়, সুন্দরীর বাড়িতে যে মাসি কাজ করে, স্বপ্ন দেখি তার। আমি তাকে রাস্তায় দেখি। বাজার করে ফিরছে। আমায় দেখে হাসল। আর অমনই আমার ঘুম ভেঙে গেল।

আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলুম। তখন আর রাত নেই। ভোর হয়ে গেছে। অনেকের মুখেই আমি শুনেছি, ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে হয় না। কিন্তু আমি তখন এতই বিভোল হয়ে পড়েছিলুম যে, সত্যি-মিথ্যে নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো আমার অবস্থা তখন ছিল না। তখন আমার মাথায় অন্য একটা মতলব ঝলকে উঠল। মনে হল, আচ্ছা, ওই মাসিকে ধরলে তো সুন্দরীকে দেখা যায়! ব্যাস! মনের ভেতর এই মতলবটা গেড়ে বসতেই শুরু হয়ে গেল হাঁকপাকানি। কখন যে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছি, কখন যে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি, কখন যে হঠাৎ সেই স্বপ্নের মাসিকে দেখতে পেয়েছি, আমার একদম খেয়াল নেই। আমি যেন একটা মন্তর-পড়া জাদু-পুতুলের মতো মাসির সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলুম। তারপর মাসিকে ফিসফিস করে বলেছিলুম, “মাসি একটা কথা শুনবে?”

মাসি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমার মুখের দিকে চেয়ে হেসে ফেলেছিল। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, “কী কথা?”

“রাগ করবে না তো?” বলতে আমার গায়ে কাঁটা দিল।

মাসি উত্তর দিল, “কী কথা না শুনলে, রাগ করব কি না কেমন করে বলি!” বলতে বলতে মাসি একটু জোরেই হেসে ফেলল।

মাসির সেই হাসি শুনে আমার আর তর সইল না। আমি একদম হু হু শব্দে বলে ফেললুম, “আমার অনেকদিনের ইচ্ছে, সুন্দরীকে দেখব। সত্যি বলছি, তুমি যদি আমাকে দেখাও আমি কাউকে বলব না। তুমি যেমন করে বলবে, আমি তেমন করে কথাটা লুকিয়ে রাখব।”

আমার কথা শুনে মাসির সেই হাসিখুশি মুখখানা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। সে হতাশ গলায় বলল, “তুমি আর যা করতে বলো, পারলে করব। কিন্তু সুন্দরীকে তো দেখাতে পারব না। সে আমাকেও তো যখন তখন দেখা দেয় না।”

“মানে?” আমি অবাক হয়ে গেলুম। বললুম, “সে কেমন কথা। তুমি তার কাছে আছ, কত যত্ন-আত্তি করছ, বাজার করছ, রান্নাবান্না করে খাবার তৈরি করে দিচ্ছ, আর তাকে দেখছ না?”

“হ্যাঁ দেখি, সে একটা মুখ-ঢাকা ছায়ার মতো।” মাসি উত্তর দিল।

“সুন্দরী তোমার সঙ্গে কথা বলে না?” আমি জিজ্ঞেস করলুম।

“কেন বলবে না! যখন দরকার পড়ে সে আমায় ডাকে, আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।”

“ভারী অদ্ভুত তো!”

“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, ভারী অদ্ভুত। এমন একটা অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে ঘর করতে করতে আমিও একটা অদ্ভুত মানুষ হয়ে গেছি। দ্যাখো, না, কবে যে আমার মাথার চুলগুলো পেকে গেছে, তাও খেয়াল করিনি।” বলতে বলতে মাসি হাসল।

“তা হলে বলো, সুন্দরীরও চুল পেকে গেছে?” আমি খুব হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করলুম।

মাসি এবার হি-হি করে হেসে ফেলল। বলল, “সুন্দরীদের চুল যে পাকে না, এটা বুঝি তুমি জান না? এই যে বছর বছর দুগ্গা আসেন, তার কোনওদিন পাকা চুল দেখেছ?”

বলতে বলতে মাসি হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে বলল, “তোমার সঙ্গে আর একদিন কথা বলব! আজ দেরি হয়ে গেল। আমি চলি।”

আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে?”

“কাল হতে পারে। আমি তো রোজই দোকানপাট করি।”

যাই হোক, এরপর রোজই মাসির সঙ্গে আমার দেখা হত। সুন্দরীর বাড়ির ভেতর সে আমায় নিয়ে যেত না বটে, তবে, তার মুখে শুনতুম সুন্দরীর সব অবাক-করা কথা। সেই মাসির কাছেই আমি প্রথম শুনি মানুষের দেহকে বলে ‘তনু’। মাথাকে বলে ‘একাঙ্গ’। মুখকে বলে “আনন’। চোখকে বলে ‘লোচন’। আসলে সুন্দরীর রূপের গল্প শোনাতে শোনাতে এই কথাগুলো বারবার বলত মাসি। আমি মনে মনে ভাবতুম, মাসি শুধু থলে হাতে বাজারই করে না, সুন্দর সুন্দর কথাও জানে অনেক। যাই বলো আর তাই বলো, মানুষটার জ্ঞান আছে অনেক।

এমন সময় হঠাৎ একদিন হল কী, মাসিকে দেখা গেল না। বাজারেও না, দোকানেও না। তো আমি ভাবলুম, হতে পারে আজ বাজার-হাট করার দরকার পড়েনি। তাই বাইরে বেরোয়নি হয়তো।

কিন্তু না, তার পরের দিনও মাসিকে দেখা গেল না!

তার পরের দিনও মাসি বেরোল না। এমনকী, তার পরের দিনও না।

এমনই করে সাতদিন কেটে গেল। মাসির সঙ্গে যে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, এ-কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ জানে না। সুতরাং কাউকে কিছু বলতেও পারি না। মনের মধ্যে মাসির কথা চেপে রেখে আনচান করি। ছাদে উঠি। বাড়ির আশেপাশে উঁকি মারি। রাস্তায় রাস্তায় টো টো করে ঘুরি। কিন্তু না, সব মিথ্যে হয়ে গেল। তাই তো, কী হল তা হলে?

কী হল, কী হল, এই চিন্তায় একদিন আমার মনকে আমি আর কিছুতেই বশে আনতে পারি না। মন বারবার বলে উঠছে, যাই সুন্দরীর বাড়িতে গিয়ে মাসির খবর নিয়ে আসি। তারপরেই আবার মনে হয়, বাড়ির ভেতরে ঢুকলে যদি কোনও বিপদে পড়ি! এমনই সব নানান ভাবনাই মন তোলপাড় করতে লাগল। কিন্তু একদিন আর আমি কিছুতেই থাকতে পারলুম না, মন আমাকে অস্থির করে তুলল। শেষমেশ আমাকে যেতেই হল।

সেদিন তখন দুপুর। আমি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লুম। ক’ পা হাঁটলেই সুন্দরীর বাড়ি। বাড়ির গেটের সামনে মুহূর্ত দাঁড়ালুম। দেখলুম, গেটে আংটা লাগানো। হাত গলিয়ে আংটা খুলে ফেললুম। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে আবার আংটা লাগিয়ে দিলুম। সামনেই বাগান। বাগানের গায়ে দরজা। কী আশ্চর্য, দরজাটা খোলা। ভেজিয়ে রাখা। ঠেলা দিতে হাট হয়ে গেল। একটু দোনোমনা করে ভেতরে ঢুকে পড়লুম। ঢুকতেই দেখি একটা পেল্লাই উঠোন। গোলাকার। গোল উঠোনের চারদিক ঘিরে ঘরের গায়ে ঘর। আমি ঘূর্ণি উঠোনটার চতুর্দিকে ঘুরপাক খেতে খেতে দেখি, প্রত্যেকটা ঘর তালাবন্ধ। কেউ কোথাও নেই। নিঝুম। খাঁ-খাঁ করছে! চোখে পড়ে গেল, সামনেই ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আলতো পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ওপরে উঠে গেলুম।

ওপরে উঠেও দেখি, একই দৃশ্য। কোথায় মাসি, আর কোথায় সুন্দরী! ভোঁ-ভাঁ।

দোতলাটাও চক্কর দিয়ে আমি এবার উঠলুম তিলতলায়। বলতে কী, তিনতলাটা একেবারেই আলাদা। খানিকটা খোলা ছাদ। আর সেই খোলা ছাদের কোলে একটা মস্ত ঘর। মস্ত ঘরের একটা মস্ত দরজা। তবে কী ওই ঘরেই সেই সুন্দরী থাকে? হবে হয়তো। কিন্তু মাসি কোথায় থাকে?

আমি যদিও দেখলুম, এই মস্ত ঘরের দরজায় তালা ঝোলানো নেই, তবুও আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলুম না। বাইরে দাঁড়িয়ে রইলুম ঘাপটি মেরে। বুঝতে পারছি বুকের ভেতরটা কী ভীষণ ধকধক করছে। করতে দাও। আমাকে এইখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সাহস করে যখন এতটা আসতে পেরেছি, তখন আজ সুন্দরীকে না দেখে আমি যাচ্ছি না। অন্তত মাসির সঙ্গে তো দেখা হবেই। তারপর যা হয় হবে।

এই রে! দেখতে পাচ্ছ, আকাশ কেমন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে! শরৎকালে এই এক খামখেয়ালি প্রকৃতির। এই আলো, এই অন্ধকার। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। এখন এই খোলা ছাদে যদি বৃষ্টি নামে আমি কী করব?

দেখছ, হঠাৎ কেমন দমকা দমকা হাওয়া বইছে। দরকার নেই বাবা। পালাই এখান থেকে।

এ কী, হাওয়ার দাপটে মস্ত ঘরের মস্ত দরজাটা যে হাট হয়ে খুলে গেল! কেউ বেরিয়ে আসবে নাকি!

না, কেউ বেরিয়ে এল না। ঘরের ভেতরে উঁকি মারার জন্যে আমার মন উথালপাথাল করতে লাগল। আমি পারলুম না নিজেকে সামলে রাখতে। ভেতরটা ঝাঁ করে এক ঝলক দেখে নিলুম। না, ঘরে তো কেউ নেই। শূন্য।

আর বলতে না-বলতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। কাজেই, মাথা বাঁচাতে শূন্য ঘরেই আমি সাঁ করে ঢুকে পড়লুম। ঢুকেই চোখে ধাঁধা লেগে গেল। দেখি, সারা ঘরে মস্ত মস্ত ছবি টাঙানো। রঙে রঙে ঝলমল করছে। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, ভেতরে ঝলমলে ছবি। কাজেই আমি একমনে ছবি দেখতে লাগলুম।

প্রথম ছবিটার সামনে দাঁড়াতেই দেখি নীচে লেখা: এটা আমার বাবার ছবি। আর একটা ছবির নীচে লেখা: আমার মা। তারপরের ছবিতে লেখা: আমি, আমার ভাই, আমার বাবা, মা, মায়ের পায়ের কাছে আমাদের কুকুর টোটো। তার পরেরটায় লেখা: এটা আমাদের বাগান, শিউলিতলায় ফুল ছড়িয়ে পড়েছে, বাগানে আমি আর ভাই, টোটোর সঙ্গে খেলা করছি।

অবাক চোখে ছবিগুলো দেখতে দেখতে ঢুকে পড়েছি ঠিক পরের ঘরটায়। এখানেও দেওয়াল জুড়ে ছবি টাঙানো। একটাতে লেখা: এটা আমাদের বাড়ি, বাড়ির পাশ দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে, নদীতে বাঁধ, বাঁধের ওপর দিয়ে সার সার হাঁস যাচ্ছে। আর একটাতে লেখা: আমাদের গ্রাম, সবুজ খেত, সামনে বাজারের রাস্তা। রাস্তা দিয়ে চাষিরা চলেছেন আনাজপাতি বিকিকিনি করতে। এই ছবিটাতে লেখা: এটা বাজার, লোকজন কেনাবেচা করছে, ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখাচ্ছে। এটা আমাদেরই স্কুলের ছবি, আমরা দল বেঁধে ইস্কুলে যাচ্ছি। এই ছবিটায় দেখা যাচ্ছে আমাদের গ্রামের ভয়ংকর এক বন্যার দৃশ্য, বন্যায় গ্রাম ডুবে গেছে, আমাদের বাড়িটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে টোটো, আমি একটা গাছের মগডাল আঁকড়ে আছি। পরের ছবিতে লেখা: একজন অচেনা মানুষ। বন্যায় সব হারিয়ে আমি এখন তাঁর আশ্রয়ে একা বসে আছি। পরেরটায় লেখা: আমার বিয়ের ছবি। কিন্তু এই ছবিটা দেখে আমি চমকে উঠেছি। কেন না, এটা তো সুন্দরীর বাড়ির ছবি। এই বাড়িটা তো আমরা রোজ দেখি! ছবিটার নীচে লেখা: এটা আমার শ্বশুর বাড়ি, এই বাড়িতেই এখন আমি একা থাকি।

সবশেষে যে ছবিটার সামনে এসে আমি দাঁড়ালুম সে ছবিটা মাসির ছবি। দেখে আমি হতবাক। কেন না তার নীচে লেখা: আমার নাম সুন্দরী, এখন আমি বুড়ি! তার মানে; মাসির নামই সুন্দরী!

আচমকা আমার চোখে পড়ে গেল, ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা বিছানা। দেখি, মাসি ঘুমোচ্ছে। আমি ডাকব? যদি মাসি রাগ করে! না, রাগ কেন করবে। মাসির সঙ্গে তো আমার বন্ধুত্ব। আমি মাসিকে জিজ্ঞেস করব, তুমিই যে সুন্দরী, এই সত্যি কথাটা তুমি এতদিন কাউকে না-বলে গোপন রেখেছিলে কেন? আমি সাহস করে নরম গলায় ডাক দিলুম, “মাসি।” মাসি সাড়া দিল না। আবার ডাক দিই, “মাসি।” এবারও মাসি সাড়া দিল না। এবার মাসির গায়ে হাত দিলুম। আঁতকে উঠি। কী ভীষণ ঠান্ডা। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলুম, “মাসি-ই-ই!”

সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল, প্রচণ্ড জোরে বাজ পড়ল। থরথর করে কেঁপে উঠল বাড়িটা। আমি ছুট দিলুম। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমি তরতর করে নীচে নেমে এলুম। ছুটতে ছুটতে একেবারে বাড়িতে। ঠিক সেই মুহূর্তে কান ফাটিয়ে আবার একটা বাজ পড়ল। চেয়ে দেখি মাসি যে ঘরে শুয়ে আছে বাজ পড়েছে সেই ঘরের মাথায়।

আগুনের ঝলক দেখা যাচ্ছে। আমি থ হয়ে তাই দেখছি। কী ভয়ংকর দাউদাউ করে জ্বলছে সেই আগুন। বুঝি সব গ্রাস করে ফেলবে এক্ষুনি! আমি কী করব কিছুই ভেবে পেলুম না। ভয়ে কাঠ হয়ে দেখছি, শুধুই দেখছি!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%