শৈলেন ঘোষ

আমার নাম ছই।
আমাকে দেখে কেউ বলে মেয়েটার বয়স নয়। আবার অনেকে বলে দশও হতে পারে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আমি কোথায় থাকি, আমি সোজাসাপটা উত্তর দিই, “থাকি না কোথাও।”
তুমি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ আমার কথা শুনে। আসলে কী জানো ‘আমি থাকি না কোথাও’ এমন একটা কথা বলার কথা ছিল না আমার। একদিন আমার সব ছিল। মা, বাবা, ঘর-বাড়ি এমনকী একটা কুকুরও। কিন্তু এক অন্ধকার রাতে একটা গুন্ডালোক আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাল আমার বাবা-মার কাছ থেকে। অনেকটা রেলগাড়ি চেপে, অনেকটা জাহাজে ভেসে সে যে আমায় কোথায় নিয়ে পালাল, আমার মনে নেই। মনে থাকার কথাও নয়। কারণ ছিনতাই করার সময় আমার নাকের ভেতর এমন একটা বিটকেল গন্ধ ঢুকিয়ে দিয়েছিল, সেই গন্ধের ঝাঁঝে আমি তো ভুলে গেলুম সবই। সেই সঙ্গে ভুলে গেলুম কথা বলতেও। পরে অবশ্য আমার একে-একে যখন আবার সব মনে পড়ে গেল, তখন আমি অসহায়ের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি। আর দেখি, একটা অজানা জায়গায়, অচেনা বাড়িতে আমি আছি। একটা বদখত লোক আমাকে গাধার মতো খাটাচ্ছে। সব সময় হুকুম করছে, এটা কর, সেটা কর। আর না করলেই চুলের ঝুঁটি ধরে নুড়োনুড়ি করে দিচ্ছে। একদিন তারই মুখের তড়পানি শুনে আমি জানতে পারি, লোকটা আমায় সেই গুন্ডাটার কাছ থেকে কিনে নিয়েছে।
সেইদিন থেকে আমি আর হা-হুতাশ করে চোখের জল ফেলতুম না। মনে মনে ফন্দি আঁটকুম, এখান থেকে পালিয়ে যাবার। তা, একদিন ফাঁক পেয়েও গেলুম। তার চোখে ধুলো দিয়ে পালালুম তার আস্তানা থেকে।
তারপর কত যে ঘুরেছি, কত পথ হেঁটেছি, কত মানুষের দয়ায় দুটো খেতে পেয়েছি, সেসব গল্প আর কত বলব! আসল গল্পটা শুরু হল, যেদিন মাখনজেঠু আমায় দেখতে পেল। মাখনজেঠু অবশ্য আমার নিজের কেউ নয়। পাতানো জেঠু। সেই গল্পই বলি:
সেদিন আমার খুব খিদে পেয়েছিল। আমি পথের ধারে বসে-বসে কাঁদছিলুম। সেইসময় মাখনজেঠু পিঠে একটা ঘাসের বস্তা নিয়ে পথ হাঁটছিল। আমায় দেখতে পেল। আমায় দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কীরে মেয়ে কাঁদছিস কেন?”
আমি চমকে তাকালুম তার মুখের দিকে। তখন লোকটাকে আমি একদমই চিনতুম না। কিন্তু কী জানি কেন, তার মুখখানা দেখে আমার মনে হল, লোকটা বোধহয় ভাল। তবুও কথা বলতে সাহস করে না। আমি কাঁদতেই থাকলুম।
তখন মাখনজেঠু বলল, “দুর বোকা, তুই কথা না বললে, আমি জানব কী করে, তোর কী হয়েছে? খিদে পেয়েছে বুঝি?”
মাখনজেঠু খিদের কথা বলতেই আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। অমনই জেঠু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “তাই বল, খিদে পেয়েছে বলে কান্না হচ্ছে। এই নে, পয়সা নে। কিছু কিনে খেয়ে নিগে যা।” বলে ফতুয়ার পকেট থেকে জেঠু পয়সা বার করে আমার দিকে ছুড়ে হনহন করে হাঁটা দিল। আমি ভাবলুম, জেঠু নির্ঘাত আমায় ভিখিরি ঠাউরেছে। আমি জেঠুর পয়সা ছুঁলুম না। যেখানের পয়সা সেখানেই পড়ে রইল।
দু’পা গিয়েই জেঠুর কী মনে হল, হাঁটতে হাঁটতে থামল। পেছন ফিরে দেখল। আবার আমার কাছে এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল, “কীরে, পয়সা দিলুম নিলি না?”
আমি বললুম, “তোমার কাছে তো আমি পয়সা চাইনি।”
“না চাইলে কী হয়েছে। মুখ দেখে তো বুঝতেই পারছি, তোর খিদে পেয়েছে। আর, তোর কাছে পয়সা নেই, এও আমার জানতে বাকি নেই।” মাখনজেঠু গড়গড় করে আমায় শুনিয়ে দিল।
আমিও ছাড়ি না। বলি, “তুমি ভেবো না আমি ভিখিরি। আমি এমনি-এমনি কারও কাছে পয়সা নিই না। লোকের এটা-ওটা কাজ করে দিলে, তারা পয়সা দেয়। তা কাল থেকে কেউ আমায় কাজ দেয়নি। আমি পয়সাও পাইনি। তাই কিছু খাওয়াও হয়নি।”
তা বলতে নেই, মাখনজেঠু আমার কথা শুনে খুব খুশি হল। ঘাসভর্তি বস্তাটা পিঠ থেকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ করবি তুই? তোর তো এখন কাজ করার বয়েসই হয়নি রে। ঠিক আছে, তুই যখন বলছিস, আয়, আমার ঘাসের বস্তাটা দু’জনে ধরাধরি করে নিয়ে যাই। পারবি তো?”
বস্তাটা দেখে আমি বুঝতেই পারছিলুম, খুব একটা ভারী হবে না। তাই বললুম, “তোমার ধরার দরকার নেই, এটা আমি একাই বয়ে নিয়ে যেতে পারব।”
মাখনজেঠু ততক্ষণে সেই ছুড়ে ফেলা পয়সাগুলি তুলে নিয়েছে। নিয়ে বলল, “তাই কী হয়, তুই মোট বইবি আর আমি লাটসাহেবের মতো হাত দুলিয়ে রাস্তায় হাঁটব? এ তো আমি ভাবতেই পারি না। পৃথিবীতে এমন হয় নাকি? তার চেয়ে দু’জনে একসঙ্গে বস্তাটা ধরাধরি করে রাস্তায় হাঁটলে তোরও কষ্ট হবে না, আমাকেও কেউ নিন্দে-মন্দ করবে না। তোর কী মনে হয়, সেটা ভাল নয়?”
মাখনজেঠুর কথা শুনে রাজি হয়ে গেলুম। তারপর দু’জনেই বস্তার দু’দিক ধরে মাখনজেঠুর বাড়ির দিকে রওনা দিলুম। আর তখনই আমি জানতে পারি লোকটির নাম মাখন। আর তখন থেকেই লোকটি হয়ে গেল জেঠু। মাখনজেঠু।
না, খুব একটা দূরে যেতে হল না। যতটুকু পথ গেলুম, ততটুকু পথেই জেঠু আমার সাতসতেরো সব খবর একটি একটি করে জেনে নিল। আমার মুখে আমার সব খবর শুনে জেঠুর বোধহয় দয়া হল। কিন্তু আর তেমন কথাবার্তা হল না। কারণ একটা আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে মাখনজেঠু বলল, “এই দ্যাখ, এসে গেছি।”
আমি জায়গাটার ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে জিজ্ঞেস করলুম, “এখানে তুমি থাকো?”
জেঠু উত্তর দিল, “হ্যাঁ রে, এখানেই আমি থাকি। এখানে তুইও থাকবি। এবার বস্তাটা আমায় দে। আয় আমার সঙ্গে।”
ঘাসভর্তি বস্তাটা জেঠু এবার আমার হাত থেকে নিয়ে পিঠে ফেলে চলল। আমি গুটিগুটি তার পিছু নিলুম। যদিও জেঠুকে আমার ভাল লেগে গেছল, তবুও অচেনা জায়গায়, অচেনা লোকের সঙ্গে যেতে গা তো একটু ছমছম করতেই পারে।
ও বাবা, আস্তাবলের ভেতর গিয়ে দেখি, একটা ছ্যাকড়াগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই একটা ঘোড়া বাঁধা। আমি তো অবাক। জেঠুকে দেখেই ঘোড়াটা চিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠল। পা ঠুকল। হয়তো আনন্দে। নাকে একটা কেমন ফরর-ফরর করে শব্দ করল। জেঠু ঘাসের বস্তাটা ঘোড়ার মুখের সামনে রাখল। রেখে বস্তার মুখটা খুলতে খুলতে বলল, “বুঝতে পেরেছি, খুব খিদে পেয়েছে। এই নে, খা।”
ঘোড়াটার তর সইল না। বস্তার ভেতর মুখ ঢুকিয়ে ঘাস টেনে বার করে আর চিবোয়। টাটকা সবুজ ঘাস ঘোড়াটার যে খুব পছন্দ, সে তার চিবনোর বহর দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
মাখনজেঠু এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার তোর পালা। পয়সা নিবি, না রুটি তরকারি খাবি?”
পয়সার চেয়ে আমার যে তখন রুটি তরকারির দিকেই মন ঝুঁকবে, একথা মুখে না বললেও আমার মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধে হবে না কারও। কিন্তু হ্যাংলার মতো সে-কথা বলা যায় কি? সুতরাং মুখ নিচু করে আমি দাঁড়িয়ে রইলুম চুপটি করে।
ঠিক সেই সময়ে জেঠু আবার জিজ্ঞেস করল, “কীরে মেয়ে, উত্তর দিলি না? বুঝতে পেরেছি, বলতে লজ্জা করছে। খিদে যে তোর ভয়ানক পেয়েছে, সে মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। ঠিক আছে, তোর পয়সা যা পাওনা হয়েছে আমি দিয়ে দেব। তার আগে ক’খানা রুটি খেয়ে খিদেটাকে তো ঠান্ডা কর।”
কিন্তু আমি সে-সব কথায় কান না দিয়ে জেঠুকে জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি এইখানে থাকো?”
জেঠু বলল, “কেন, জায়গাটা তোর পছন্দ হচ্ছে না?”
“কেন পছন্দ হবে না,” আমি উত্তর দিলুম, “তোমার এখানে এই ঘোড়া আর গাড়ি ছাড়া আর তো কাউকে দেখছি না, তাই জিজ্ঞেস করছি। তোমার আর কেউ নেই?”
জেঠু বলল, “কেন থাকবে না। আমার সব আছে। দেশে আমার বাড়ি আছে। আমার ছেলে আছে। তার মা আছে। শুধু নেই তোর মতো একটা মেয়ে। থাকলে ভাল হত।”
সত্যি বলছি মাখনজেঠুর ঘোড়াটা দেখে আমার খুব ইচ্ছে করছিল ঘোড়াটার গায়ে হাত দিই। ঘোড়াটার গায়ের রং নীলও নয়, আবার কালোও নয়। কেমন যেন অন্যরকম। ছ্যাকড়াগাড়ির ঘোড়াগুলো বলো কেমন রোগাপটকা হয়? এটা একদম তেমন নয়। এ ঘোড়াটা যেমন হৃষ্টপুষ্ট, তেমনই বিচ্চু, আমার কেমন ভালো লেগে গেল ঘোড়াটাকে। বারবার মনে হচ্ছিল, ঘোড়াটার পিঠে চড়ি। অবিশ্যি আমি আগে কখনও ঘোড়ার পিঠে চড়িনি। পিঠে চড়ার কথা ছেড়েই দাও, এমন একটা আস্তাবলের ছাদের নীচে দাঁড়িয়ে ঘোড়াকে কাছ থেকে দেখিইনি।
তা জেঠু যখন বলল, আমার মতো তার একটা মেয়ে থাকলে ভাল হত, তখন খুব ইচ্ছে করছিল জেঠুর মেয়ে হতে। অন্য কোনও কারণে নয়, শুধু ওই ঘোড়াটার জন্যে। সে-কথা আর মুখ ফুটে বলি কেমন করে।
কিন্তু কী আশ্চর্য, আমি যখন আপনমনে এই ভাবছি, ঠিক সেই সময়ে মাখনজেঠু আচমকা জিজ্ঞেস করল, “তুই কখনও ঘোড়ায় চড়েছিস?”
আমার বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। মনে ভাবলুম, আমার মনের কথাটা জেঠু বুঝতে পারল না কি! বুঝতে পারলেই বা কী, আর না-পারলেই বা কী। যেটা সত্যি কথা সেটাই আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, বললাম, “না, কে আর আমায় ঘোড়ায় চড়াবে?”
ওমা! সঙ্গে সঙ্গে জেঠু বলে উঠল, “চড়বি?”
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। আনন্দে থিরথির করে কেঁপে উঠল আমার সারা মন। আমি আর থাকতে পারলুম না, বলে ফেললুম, “তুমি যদি চড়াও, কেন চড়ব না?”
“ঠিক আছে তবে আগে খেয়ে নে। বলছিলি না, তোর খিদে পেয়েছে।”
ঘোড়ায় চড়ার কথা শুনে তখন কোথায় খিদে, আর কোথায় কী। আমি বললুম, “আগে একটু চড়ে নিই, তারপর খাব।”
জেঠু আপত্তি করল না। ঘাস খেতে খেতে ঘোড়া তখন প্রায় অর্ধেকটা বস্তা শেষ করে ফেলেছে। বাকি অর্ধেকটা তার মুখের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে জেঠু আমাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল। তারপর নিজেই লাগাম ধরে, হাঁটতে হাঁটতে, ঘোড়াটাকে আস্তাবলের বাইরে নিয়ে এল। অনেকখানি রাস্তা চলেও এল। আমার তখন কী মজাই না লাগছিল। ঘোড়া হাঁটছে, আমি দুলছি। ভাবছি, ঘোড়াটা ছুটলে বোধহয় আরও মজা লাগবে। তাই জেঠুকে বলেই ফেললুম, “একটু ছোটাও না!”
জেঠু বলল, “না, পড়ে যাবি।”
জেঠুর কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করল না। আমি জেদ ধরে বলতেই থাকলুম, “না, না, আমি পড়ব না, ছোটাও না একটু!”
জেঠু বলল, “পড়লে কিন্তু হাত-পা ভাঙবে।”
আমি গোঁ ছাড়ি না। বলি, “একবার ছুটিয়ে দ্যাখো না, আমি ঠিক পারব।”
তো, আমার এমন সাধাসাধিতে জেঠু রাজিও হয়ে গেল। জেঠু বলল, “ঘোড়ার গলাটা তুই ভাল করে জড়িয়ে ধর। আমি ছোটাচ্ছি।” বলে, জেঠু ঘোড়ার লাগাম ধরে হঠাৎ ছুটতে শুরু করে দিলে।
আমার হাত দুটো নেহাতই ছোট। অতবড় ঘোড়ার গলার সবটা জাপটে ধরার সাধ্যি নেই আমার। হাতই পৌঁছবে না। তবু যতটা পারলুম ততটাই আঁকড়ে থাকলুম। জেঠুর সঙ্গে ঘোড়াও ছুটতে লাগল। টগবগ-টগবগ করে ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠেছে। কী ভালই না লাগছে।
এমন সময়ে একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেল। ঘোড়াটা আচম্বিতে জেঠুর লাগামে মারল এক টান। জেঠুর হাত থেকে লাগামটা গেল ফসকে। ঘোড়াটা তিরবেগে ছোটা দিলে। জেঠু ছুটতে ছুটতেই চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “রুস্তম, রুস্তম, রোখ যা! রোখ যা!”
আমি বুঝতে পারলুম, ঘোড়াটার নাম রুস্তম। কিন্তু বুঝলে কী হবে, জেঠুর ডাক শুনে ঘোড়া দাঁড়াল না। বরং জেঠুই ছুটতে ছুটতে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি পড়লুম বিপদে। এমন একটা বিপদে পড়লে মানুষ যা করে আমিও তাই করলুম। চেঁচালুম, “রুস্তম, দাঁড়া, দাঁড়া।”
কিন্তু রুস্তম দাঁড়ানো দূরে থাক, জেঠুকে ফাঁকি দিয়ে, আমায় পিঠে নিয়ে একদম পগার-পার। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়ার কেশর খামচে ধরলুম। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটা করল কী, থামল। থেমেই চোখের পলকে পেছনের ঠ্যাংদুটো তুলে দিল এক ঝটকা। আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়লুম ছিটকে মাটিতে, ধপাস! তারপর দিল আবার ছুট। ঘোড়াটা ছুটতে ছুটতে কোনদিকে, কোথায় যে চলে গেল, আমি আর দেখতে পেলুম না। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে আমার লেগেছিল খুব। তবে রক্ষে হাড়গোড় ভাঙেনি। বেঁচে গেছি।
কিন্তু বাঁচলেও কি নিস্তার আছে। আমি অনেকক্ষণ ধরে ঘোড়াটাকে খুঁজলুম। এদিকে গেলুম, ওদিকে গেলুম। কোথাও পেলুম না। খুঁজতে খুঁজতে যেখানে পৌঁছলুম সেই জায়গাটা এমন নির্জন কী বলব! এই নির্জন জায়গায় গলা ফাটিয়ে যদি চেঁচাও, তোমায় কেউ উদ্ধার করতে আসবে না। আমি একপা, একপা করে হাঁটি, আর ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক দেখি, মনে-মনে ভাবি, কী কুক্ষণেই না ঘোড়ায় চড়ার শখ হয়েছিল আমার।
এমন সময়ে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল, একটা গাছের নীচে বসে বসে একজন আধবুড়ো মানুষ মুড়ি খাচ্ছে। এতক্ষণ খিদের কথা আমার একদম মনে ছিল না। কিন্তু তার খাওয়া দেখে আমারও খিদে চাগাড় দিয়ে উঠল। সত্যি বলছি, তখন হ্যাংলার মতো আমি তার খাওয়া দেখতে লাগলুম একদৃষ্টে। আমি একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিলুম। সে কোঁচড় থেকে মুঠোভর্তি করে মুড়ি তুলছে, আর গালে ফেলছে। ফেলেই, লঙ্কায় কামড় দিচ্ছে। যার পেটে খিদে থাকে, সে আর কতক্ষণ এমন দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে! আমারও নোলা জলে টসটস করতে লাগল। আমি গুটি গুটি পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলুম।
কাছে গিয়ে দেখি, লোকটার একমাথা চুল। একগাল দাড়ি। পা ভর্তি ধুলো। নোংরা ধুতি। তাপ্পিমারা ফতুয়া। লোকটা আমায় দেখে কেমন ফিক করে হেসে উঠল। আমি লজ্জায় মরে যাই। তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। অমনই লোকটা জিজ্ঞেস করে বসল, “কী রে মেয়ে, দু’মুঠো খাবি নাকি?”
আর মেয়ে! আমার তখন যত লজ্জা পাচ্ছে, ততই পাচ্ছে খিদে। তখন দু’মুঠোর জায়গায় একমুঠো পেলেই বেঁচে যাই। অথচ তখন আমার মুখে হ্যাঁ-ও নেই, না-ও নেই। ঘাড় নেড়ে যে সায় দেব, তা ঘাড়ও যেন আড়ষ্ট। নড়তে চাইছে না।
হঠাৎ দেখি কী, লোকটা উঠে আমার দিকেই আসছে। আমি বুঝে উঠতে পারছি না পালাব, না দাঁড়াব।
না, পালাতে আমি পারলুম না। আমাকে দাঁড়িয়েই থাকতে হল। আচ্ছা বলো, খিদে পেলে পালানো যায়? তার ওপর সামনে যখন মুঠোভর্তি মুড়ি!
লোকটা বলল, “নে খা! অমন সুন্দর মুখখানা শুকিয়ে কী হয়েছে! আয় গাছের নীচে একটু বসবি আয়। আরে বাবা, খিদের জ্বালা ভীষণ জ্বালা। যার খিদে পায় সে-ই জানে। আয়!” বলতে বলতে লোকটি প্রায় আমাকে টানতে টানতে গাছের নীচে বসিয়ে দিল। তার মুঠোভর্তি মুড়ি আমার মুঠোয় ধরিয়ে দিয়ে বলল, “খা!”
আমি তখন দোনোমনা করছি মুখে দেব, কি দেব না। লোকটা তক্ষুনি আবার বলে উঠল, “খেয়ে নে!”
আমিও তখন আগুপিছু আর কিছু না-ভেবে মুখে পুরে ফেললুম আমার মুঠোর সব মুড়ি। তা, একমুঠো মুড়ি আর কতক্ষণ মুখে থাকে। দেখতে দেখতে মুখ থেকে পেটের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
এই ফাঁকে লোকটি অন্য আর এক মুঠো নিজের গালে দিয়ে, আমার জন্যে মুঠোভর্তি আর একটা হাত এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে।”
এবার অবশ্য আমার আর ততটা লজ্জা করল না। এরপর আমি নিজেই তার কোঁচড় থেকে মুড়ি তুলে মুখে পুরতে লাগলুম। যাক, তবু তো ক’মুঠো মুড়ি পেটে পড়ল। এতক্ষণ খিদের জ্বালায় ছটফট করছিলুম। কিছুটা তো জ্বালা মিটল।
যতক্ষণ মুড়ি খেয়েছি ততক্ষণ কারও মুখে কোনও কথাই ছিল না। খাওয়া শেষ হতেই লোকটা জিজ্ঞেস করল, “খিদে অনেকটা কমেছে, কী বলিস?”
আমার মুখে কথা সরল না।
আমার কোনও কথা না-শুনে লোকটি নিজেই কথা বলতে লাগল। বলল, “তোকে দেখে মনে হচ্ছে, তোর দশা আমারই মতো। আমার তবু একটা ঘোড়া আছে। মনে হয়, তোর তা-ও নেই।”
ঘোড়ার নাম শুনেই আমি চমকে উঠেছি।
আমার চমকানোটা ঠিক তার নজরে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কীরে, চমকে উঠলি কেন?”
আমি কী আর উত্তর দেব! নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করলুম, “কই তোমার ঘোড়া?”
লোকটি যেদিকে হাত তুলে দেখাল, সেই দিকেই চোখ ফিরিয়ে দেখি, সত্যিই তো, প্রায় চোখের সামনেই গাছের গায়ে একটা ঘোড়া বাঁধা! আরে, এ যে সেই মাখন জেঠুর ঘোড়াটাই! গায়ের রং-টা স্পষ্ট মিলে যাচ্ছে। এই ঘোড়াটাই তো আমাকে পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে পালায়! তাই আমি খানিকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলুম, “এটা তোমার ঘোড়া?”
“তবে আর কার?” উত্তর দিল লোকটা, “জানিস, ঘোড়াটা চুরি হয়ে গেছল।”
আমি আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “চুরি হয়ে গেছল? আবার পেলে কেমন করে?”
“পেলুম যেমন করে হারিয়ে গেছল, তেমন করে।”
“মানে?”
লোকটি উত্তর দিল, “মানে খুব সোজা। আমার ঘর থেকে হারিয়ে গেছল, আবার আমার ঘরের দোরেই এসে ধাক্কা মারছিল, আজই। মনে হয় ফাঁক পেয়ে চোরের খপ্পর থেকে পালিয়ে এসেছে।”
তার কথা শুনে আমি তো থ।
লোকটি বলল, “আয় আমার সঙ্গে।”
আমি তার সঙ্গে ঘোড়ার সামনে গিয়ে হাজির। জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার ঘোড়ার নাম নেই?”
সে বলল, “কেন থাকবে না? আমার ঘোড়ার নাম ঘো-ঘো। নামটা ভাল না?”
আমার কেমন যেন সব গুলিয়ে গেল। মাখনজেঠু ঘোড়াটাকে ডাকছিল রুস্তম বলে। অথচ এ ডাকছে ঘো-ঘো বলে। এতো ভারী আশ্চর্য ঘটনা। আমি তখন খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘোড়াটাকে দেখছি। আর মনে মনে ভাবছি, আমি যে এরই পিঠ থেকে পড়েছি তাতে আর কোনও সন্দেহই নেই।

হঠাৎ লোকটি বলে উঠল, “ঘোড়া পোষা ভারী ঝামেলার কাজ, বুঝলি। আমি ভাবছি, ঘোড়াটা বেচে দেব।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “ঝামেলা কেন?”
“ঝামেলা নয়? খেতে দাও, গা-গতর টিপে দাও। তার চেয়ে বরং, তুই যদি রাজি থাকিস, তোকে আমার কাছে রাখব। আমার কেউ নেই, তোরও যে কেউ নেই, এও আমি বুঝতে পেরেছি। তুই আমার মেয়ে হবি।”
আমি বললুম, “সে না-হয় আমি তোমার মেয়ে হলুম, কিন্তু ঘোড়াটাকে বেচবে কেন? ঘোড়াটাকে বেচে দিয়ে আমাকে তোমার মেয়ে করার কী দরকার? বরঞ্চ ঘোড়াটাও থাক, আমিও থাকি। আমি তো তোমার ঘোড়াটার দেখাশোনাও করতে পারব। দ্যাখো, কোনও কাজ না করে, কারও কাছে আমি থাকতে পারব না।’
“তা যদি পারিস তা হলে ঘোড়াটা রেখেই দেব।”
শেষ পর্যন্ত লোকটি আমার কথায় রাজি হয়ে গেল, আমিও লোকটির কাছে থেকে গেলুম। থাকলুম বটে, কিন্তু মনে-মনে ফন্দি আঁটলুম, ঘোড়াটা নিয়ে পালাতে হবে। এ ঘোড়া নির্ঘাত মাখনজেঠুর। না-হয়ে পারে না। আমায় ফেলে ঘোড়াটা যখন পালাচ্ছিল, নিশ্চয়ই এই লোকটি ঘোড়াটাকে ধরেছে। সুতরাং যার ঘোড়া, তাকে ফেরত দিতেই হবে আমাকে। নইলে সে ভাববে, আমিই চোর।
এই নির্জন জায়গার একটু কাছেই লোকটির একটা ছোট্ট চালাঘর আছে। তারই পাশে এক চিলতে জায়গা। ঘোড়াটার আস্তানা সেখানেই। সেই চালাঘরেই ক’টা দিন থেকে গেলুম, আর তাল খুঁজতে লাগলুম ঘোড়াটাকে নিয়ে পালাবার। বলতে পারো, ক’টা দিন ঘোড়ার দেখাশোনা করতে-করতে ঘোড়াটার সঙ্গে আমার ভাবও হয়ে গেল। এই লোকটি যখন ঘরে থাকত না, তখন মাখনজেঠু যে-নামে ঘোড়াটাকে ডাকত, সেই রুস্তম নামেই আমি তাকে ডাকতুম। ঘোড়াটা আমার মুখে তার নাম শুনে, পা ঠুকত, ল্যাজ নাড়ত, আর নাকে একটা ‘ফ-র-র-র’ করে এমন শব্দ করত, তাতে আমার বুঝতে বাকি থাকত না, ঘোড়াটার নাম ঘো-ঘো নয়, রুস্তমই।
তা, ক’দিন থাকতে থাকতেই একদিন দেখি, একজন অচেনা লোক হাজির সেখানে। ঘোড়াটা দেখতে দেখতে কেনাবেচার কথাও শুরু করে দিলে। কিন্তু যে-কারণেই হোক লোকটির সঙ্গে ঘোড়ার দামদর নিয়ে বনিবনা হল না। অচেনা লোকটা চলে গেল। বুঝতে পারলুম, লোকটি এবার ঘোড়াটা বিক্রি করার তোড়জোড় শুরু করেছে। সুতরাং আর তো দেরি করা যাবে না। কোনদিন কোন্ ফাঁকে ঘোড়াটাকে বেচে দিলে, তখন আর কিচ্ছুটি করার থাকবে না। কাজেই কালকের জন্যে ফেলে রাখা চলবে না। আজই কিছু করতে হবে।
এই ভেবে সেদিন তক্কে তক্কে থাকলুম। বরাত ভাল, সুযোগও পেয়ে গেলুম। লোকটি কী একটা কাজে বাইরে চলে গেল। অবশ্য যাবার সময় আমায় বলে গেল, তার আসতে একটু দেরি হবে। আমি যেন না ভাবি।
ব্যাস! লোকটি চলে যেতে আমিও ঘোড়ার পিঠে বসে দে পিটটান। আর কে ধরে আমায়!
ইস, সব ভেস্তে গেল। লোকটার বুদ্ধির সঙ্গে আমি পারব কেন? কী করে যে সে আমার মতলবটা আঁচ করতে পেরেছিল, আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। আশ্চর্য, সে কেমন করে বুঝল, আজই আমি ঘোড়াটাকে নিয়ে পালাব! আমি যে পথ দিয়ে পালাচ্ছি, সে-ও ঠিক সেই পথেই লুকিয়ে ছিল। একটা মস্ত লাঠি নিয়ে সটান ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘোড়া চিঁ-হিঁ-হিঁ ডাক ছেড়ে মারল লাফ। পারল না। ঘোড়ার পায়ে জড়িয়ে গেল লতাপাতা। আমিও টাল সামলাতে পারলুম না। পড়লুম ছিটকে ঘোড়ার পিঠ থেকে। পড়েই উঠে পড়েছি। তারপরেই দে ছুট। পিছু ফিরে দেখলুমও না ঘোড়ার কী হল।
অনেকক্ষণ ছুটেছি। কখনও জোরে, কখনও আস্তে। শেষমেশ আর দম নেই। পারছিলুম না। তখন থামলুম। একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে দমটাকে সামলাতে লাগলুম। ভাবতে লাগলুম, যেমন করে হোক মাখনজেঠুর আস্তানাটা খুঁজে বার করতে হবে।
কিন্তু ক’দিন ধরে অনেক কষ্ট করে খোঁজাখুঁজি করেও আমি মাখনজেঠুর সেই আস্তানাটা খুঁজে বার করতে পারলুম না। এ ক’টা দিন যে আমার কেমন করে কেটেছে, আমি কী বলব! এর-তার মোট বয়ে, না-হয় এটা-ওটা কাজ করে পয়সা পেয়েছি। সে পয়সায় পেট ভরে না। কোনওরকমে দিন কেটেছে। শরীরও আধপেটা খেয়ে খেয়ে আধখানা হয়ে গেছে। আর হাঁটতে পারছিলুম না। শেষমেশ, সেদিন একটা মস্ত বাড়ির মস্ত ফটকের সামনে বসে ঝিমোতে লাগলুম।
হঠাৎ মস্ত বাড়ির মস্ত ফটক খুলে গেল। দেখি, একটি বুড়ি মানুষ ফটক খুলে বেরিয়ে আসছে। আমায় দেখতে পেল। আমায় দেখে থতমত খেয়ে যায় বুড়ি। অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে, “কে রে তুই?”
আমি ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিলুম, “আমি ছই।”
“কোথায় থাকিস তুই?”
কথা বলতে আমার কষ্ট হল। তবু কষ্ট করেই বলি, “আমি কোথাও থাকি না।”
“তোর মা-বাবা কোথায় থাকেন?”
মা-বাবার কথা বলতেই আমার চোখে যেন অন্ধকার নেমে এল। আমি বসতে পারি না। সেই ফটকের সামনেই শুয়ে পড়ি। তারপর আর কিছুই জানি না। আমি যেন ঘুমিয়ে পড়লুম।
অনেকক্ষণ পর আমি চোখে আলো দেখতে পেলুম। হঠাৎ যেন চমক ভাঙল। এ আমি কোথায় এসেছি। এটা তো রাস্তা নয়, কিংবা সেই মস্তবাড়ির মস্ত ফটকের আশপাশও নয়। এ তো একটা ঘর। আমি তো রাস্তায় শুয়ে নেই। বুঝতে পারলুম, আমায় রাস্তা থেকে তুলে এই ঘরে আনা হয়েছে। ঘরের চারপাশটা দেখছি, অবাক লাগছে। কত ছবি, ফুল। মিষ্ট গন্ধ। অথচ ঘরে কেউ নেই। শুয়ে শুয়েই ছটফট করতে লাগলুম।
এমন সময়ে আমি ভীষণ থতমত খেয়ে গেছি। একটা ঘোড়ার চিঁ-হিঁ-হিঁ ডাক আমি শুনতে পেলুম। ডাকটা এত স্পষ্ট ভেসে এল, মনে হল, কাছে পিঠেই কোথাও একটা ঘোড়া আছে। আমি কষ্ট করে উঠে বসলুম। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই বুড়ি মানুষটি ঘরে ঢুকল। তার হাতে দুধের বাটি। আর খাবারের থালা। বুঝতে কষ্ট হল না, দুধ আর খাবার আমার জন্যে। বুড়িমানুষটি দুধের বাটি এগিয়ে দিল আমার হাতে। বলল, “খেয়ে নে!”
শেষ কবে দুধ খেয়েছি, মনে করতে পারি না। আদতে কোনওদিন দুধ খেয়েছি কিনা তা-ও মনে নেই। আমি যখন দুধের বাটি হাতে নিয়ে এইসব ভাবছি, তখন সে আবার বলল, “খা!”
আমি আর দোনামনা করলুম না। দুধে চুমুক দিয়ে, খাবারের থালার দিকে তাকালুম। ফুলকো লুচি, তরকারি, রসগোল্লা। এতদিন এসব আমি দোকানে দেখেছি সাজানো। এমন সব খাবার যে আমার ভাগ্যে জুটবে কোনওদিন, আগে ভাবতেই পারিনি।
আমার দুধ খাওয়া হয়ে গেলে বুড়িমানুষটি বলল, “এবার লুচি ক’খানা খেয়ে নে। এখনও গরম আছে।”
আমি লুচির থালায় হাত বাড়ালুম। এক টুকরো মুখে পুরলুম। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোড়াটা আবার ডেকে উঠল—চিঁ-হিঁ-হিঁ।
আমি চমকে থামলুম।
বুড়ি মানুষটি বলল, “আমার নাতির ঘোড়া। নতুন, কালই কিনেছি। নাতির ঘোড়ার খুব শখ। চড়তে পারে। ঘোড়াটার নতুন জায়গায় এখনও মন বসেনি, তাই চেঁচাচ্ছে।”
আমি আনমনে লুচি চিবোতে লাগলুম। ঠিক তক্ষুনি মাখনজেঠুর ঘোড়ার কথা মনে পড়ে গেল। আর এই বুড়িমানুষটির নাতির কেনা নতুন ঘোড়াটা দেখার জন্যে আমার মন ভীষণ ছটফট করতে লাগল। অবশ্য, সে কথা আমি মুখ ফুটে বলতে পারলুম না। উলটে বুড়িমানুষটিই বলতে শুরু করল নিজের কথা। বলল, এই মস্ত বাড়িটা তার।
আবার ঘোড়াটা ডেকে উঠল।
আমার মন এমন আনচান করতে লাগল, কী বলব! বুড়ির বোধহয় তা নজর এড়াল না। বুড়ি বলে উঠল, “ঘোড়ার ডাক শুনে তুই বারবার অমন করে চমকে উঠছিস কেন বল তো? ঘোড়ার ডাক শুনলে ভয় পাস?”
এবার কথা না-বলে পারলুম না। আমি বললুম, “ঘোড়ার ডাকটা আমার খুবই চেনা-চেনা লাগছে।”
“কী রকম?”
আমি তখন বুড়িকে যা ঘটেছিল আগাগোড়া সব বললুম। বুড়ি আমার মুখে সেই সব ঘটনা শুনে অবাক হয়ে বলল, “তাই নাকি রে! তবে তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। খেয়ে নিয়ে চ তো আমার সঙ্গে। দেখবি চ, এই ঘোড়াটাই সত্যি সেই ঘোড়াই কি না!”
আমি তাড়াতাড়িই খেয়ে নিলুম। সেই গরম দুধটা যখন পেটে পড়েছে, সেই তখন থেকেই শরীরে একটু একটু করে জোর পাচ্ছিলুম। তার ওপর যখন লুচি ক’খানা খেয়ে ফেললুম, তখন মনে হল, এবার আমি চলতে-ফিরতে পারব। সত্যিই, আমি উঠে দাঁড়াতে পারলুম। বুড়িমানুষটির সঙ্গে হেঁটে হেঁটে ঘোড়া দেখতে চললুম।
আসলে বাড়িটা সত্যিই মস্ত। যতই হাঁটতে হাঁটতে দেখছি, ততই অবাক হচ্ছি। যাই হোক, এখন ঘোড়াটা দেখার জন্যেই মন আমার ছটফট করছে। কাজেই, মস্ত বাড়িটা দেখে যতই অবাক হই, ঘোড়াটা দেখার ভীষণ ইচ্ছার কাছে সেটা কিছুই না।
বাড়িটার একটা মস্ত উঠোন পেরিয়ে আমি ঘোড়াটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। যেখানে ঘোড়াটা আছে, তার মাথায় একটা উঁচু ছাদের ছাউনি। আমি ঘোড়ার সামনে যাবার আগেই দূর থেকে ঘোড়ার গায়ের রং দেখেই চিনে ফেলেছি। সে আমায় দেখেই আবার ডেকে উঠল গলা ছেড়ে। আমি বুড়িমানুষটির সামনেই তাকে ‘রুস্তম’ বলে ডাকতে সে ঘাড়-মুখ নেড়ে এমন পা ঠুকতে লাগল যে, সেটা বুড়িমানুষটির নজর এড়াল না। আমি বুঝতে পেরেছি, এ সেই রুস্তম।
এমন সময় বুড়িমানুষটি হঠাৎ বলে উঠল, “তোকে চেনে মনে হচ্ছে।”
আমি লুকোছাপা না-করে সোজাসুজি বললুম, “হ্যাঁ। এই ঘোড়াটাই আমার সেই মাখনজেঠুর ঘোড়া।”
“বলিস কী রে!” বুড়িমানুষটি ভীষণ অবাক হল। “তা হলে তো তোর মাখনজেঠু তোকেই দুষবে। ভাববে তুই-ই ঘোড়াটা চুরি করে নিয়ে পালিয়েছিস। তাকেই তুই ঠকিয়েছিস!”
বুড়ি মানুষটির কথা শুনে আমি থাকতে পারলুম না। আমার চোখ উপচে জল গড়াল। আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললুম, “বুড়িমা, আমি তো ইচ্ছে করে এমন কাজ করিনি। কে জানত, এই ঘোড়ার জন্যে আমার এমন বিপদ হবে। এখন আমি কী করি বলো তো? মাখনজেঠু ভাববে আমি একটা আস্ত চোর! ছিঃ!”
বুড়ি মানুষটি আমার মুখের দিকে খানিক চেয়ে রইল। কী ভাবল জানি না। বলল, “তোকে দেখে আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে। কী অবস্থা হয়েছে তোর। মাথার চুল উশকো-খুশকো। ডাগর ডাগর চোখদুটো তোর যেন নিভতে বসেছে। জামাটার কী দুর্দশা! চ তুই আমার সঙ্গে, তোকে ভাল করে চান করিয়ে দিই। এমন নোংরা হয়ে মানুষ থাকে?”
হ্যাঁ, সেদিন আমার খুব ভাল করে চান করিয়ে দিয়েছিল সেই বুড়ি মানুষটি। একটা চোখ ঝলমল নতুন ফ্রক দিয়েছিল গায়ে সাজিয়ে। কত রকমের রান্নাবাড়ি করে কত খাইয়েছিল আমায়। তারপর আমায় অবাক করে বলেছিল, “দ্যাখ মেয়ে, এই নাতি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। এই যে দেখছিস আমার এত ধন-দৌলত, সব আমি আমার নাতির জন্যে আগলে রেখেছি। আমার এই বাড়ি আগে এমন শূন্য ছিল না। তখন আমার ছেলে ছিল। ছেলের বৌ ছিল। ছেলের বাবা ছিল। আর ছিল আমার এইটুকুনি একটা নাতি। বাড়ি গমগম করত লোকজনে। এখন নাতি ছাড়া আর কেউ নেই আমার।” বলতে বলতে থামল বুড়িমানুষটি। দেখি, তার চোখদুটি আমার চোখ ছুঁয়ে ছলছল করতে লাগল। আমি বোবা হয়ে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম।
কিছুক্ষণ চুপ। তার পরেই বুড়িমানুষটি আবার বলতে শুরু করল, “সে কতদিন হয়ে গেল। সেই থেকে আমি একা। সেই থেকে একা-একা আমি নাতিটাকে বড় করেছি। তখন তার কতই বা বয়েস। এখন সে কত বড় হয়েছে। তোকে দেখাতে পারলুম না আমার নাতিকে। এই ঘোড়াটা কিনে সে গেছে শহরে ঘোড়ার সাজ কিনতে। আসতে দেরি আছে। তুই এক কাজ কর, এই ঘোড়াটা নিয়ে যা। ফেরত দিয়ে আয় তোর মাখনজেঠুকে। তুই এমন লক্ষ্মী মেয়ে। আহা! মানুষটা কেন শুধুমুধু তোকে চোর ভাববে! তুই তো সত্যিই কোনও দোষ করিসনি। ঘোড়াটা তোর মাখনজেঠুর কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তুই আমার কাছেই ফিরে আয়। আর তোকে পথে পথে একা ঘুরতে হবে না। আমার মেয়ে হয়ে আমার কাছেই থাকবি।”
বুড়ি মানুষটির কথা শুনে আমার কেমন যেন ভয় করতে লাগল। আমি বললুম, “বুড়িমা, তোমরা পয়সা দিয়ে ঘোড়া কিনলে, সেই ঘোড়া ফেরত দিতে বলছ আমাকে? তোমার নাতি রাগ করবে না?”
বুড়ি মানুষটি উত্তর দিল, “আমার নাতি তোর সব কথা শুনলে কখনও রাগ করবে না। তাকে আমি জানি। সেও আমায় জানে। আমার কোনও কথা সে অমান্য করে না। তবে, তুইও শুনে রাখ আমার একটা কথা, তুইও যেন অমান্য করিস না? নিশ্চয়ই ফিরে আসিস আমার কাছে।”
আমি বিদায় নিলুম। এখন আমি রুস্তমের পিঠে বসে আছি। রুস্তম টগবগ টগবগ করে হাঁটছে। মাখনজেঠুর আস্তাবলটা কোনদিকে, কোনপথে আমি একেবারেই মনে করতে পারি না। কিন্তু আশ্চর্য কী, হাঁটতে হাঁটতে রুস্তমই সেই আস্তানা খুঁজে দিল আমায়। আমি রুস্তমের পিঠ থেকে নেমে ছুটে গেলুম মাখনজেঠুর সন্ধানে। কিন্তু পেলুম না তার দেখা। উলটে দেখলুম তার ঘরে তালা-চাবি। আস্তাবলটা খালি পড়ে আছে। এই ক’দিনে অযত্নে গাড়িটারও কী হাল। মনে মনে ভাবলুম, তবে কি রুস্তম কে হারিয়ে এদেশ ছেড়ে নিজের দেশে চলে গেছে! না কি রুস্তমকে খুঁজে বেড়াচ্ছে!
অবশ্য, আমি মাখনজেঠুর আস্তানার সামনে রুস্তমকে নিয়ে তার আশায় খানিক দাঁড়িয়ে রইলুম। যদি আসে।
এল না।
অগত্যা আমি আবার রুস্তমের পিঠে বসে পথে পথে খুঁজে বেড়াতে লাগলুম মাখনজেঠুকে। খুঁজতে খুঁজতে কতদিন কেটে গেল। তবু খুঁজে পেলুম না। কোথায় যে গেছে জেঠু কেউ বলতেও পারল না। আমিও খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলুম। যেখানে পাই সেখানেই পড়ে পড়ে ঘুমোই। যেদিন পাই দুটো খাই। যেদিন পাই না, উপোস করে থাকি। এমনই করতে করতে একদিন আর পারছিলুম না। এমনকী রুস্তমের পিঠ থেকে নামতেও ইচ্ছে করছিল না। বসেই রইলুম রুস্তমের পিঠে। ঘোড়াটা নিজে নিজেই হাঁটে, যেদিকে ইচ্ছে। আমি তার পিঠে বসে বসে ঢুলি, না হয় তার পিঠে মাথা নামিয়ে চোখ বুঁজে থাকি।
সেদিন চোখ বুজে থাকতে থাকতে আমি সত্যি-সত্যি রুস্তমের পিঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। তারপর আর কিছু জানি না।
ওমা! যখন ঘুম ভাঙল চেয়ে দেখি, আবার সেই চেনা ঘর। সেই ছবি, সেই ফল, সেই মিষ্টি গন্ধ। আর সেই বুড়িমানুষটি। আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টে। মুখে তার হাসি। হাতে তার সেই গরম দুধের বাটি আর থালাভরতি লুচি-তরকারি।
আমি চমকে ধড়ফড় করে উঠে পড়লুম। হ্যাঁ, সত্যিই তো, আমি যে আবার সেই বুড়িমানুষটির কাছেই ফিরে এসেছি! কেমন করে? তবে কি রুস্তমই আবার আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে! তা ছাড়া আর কে নিয়ে আসবে!
বুড়ি মানুষটি বললেন, “তুই বোধহয় খুঁজে পাসনি তোর সেই মাখনজেঠুকে। তুই বোধহয় তাকে খুঁজতে খুঁজতে কাহিল হয়ে গেছিস। তাই তোর ঘোড়াই আবার তোকে আমার কাছেই ফিরিয়ে এনেছে। ভারী বুদ্ধি তোর ঘোড়ার। সে ঠিক বুঝেছে আমার এই বাড়িতেই আছে তোর জন্যে ভালবাসা। আছে তোর আপনজন। হ্যাঁ রে, সে আপনজন যে আমি। আজ থেকে তুই আমার কাছে থাকবি। আমায় মা বলে ডাকবি।” বলতে বলতে বুড়িমানুষটি নিজেই আমার মুখে দুধের বাটি তুলে দিয়ে হাসতে হাসতে বললে, “তুই আমার লক্ষ্মী মেয়ে।”
আমি সেই গরম দুধ ঢকঢক করে খেয়ে নিয়ে অবাক চোখে পলক তাকিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলুম। তারপর অস্ফুটস্বরে বলে উঠলুম, “মা।” বলেই আমি কেঁদে ফেললুম। সে আমার আনন্দের কান্না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন