শৈলেন ঘোষ

বুক্কুটা একদম বোক্কা।
বোক্কা কেন? না, না, বোক্কা বলাটা তোমার একদম ঠিক নয়। সব্বাই জানে সে একটা বানর। শুধু বানর নয়, একটা বাচ্চা-বানর। এই সেদিন পর্যন্ত সে হয় মায়ের কোলে চড়ে, না-হয় মায়ের পিঠে বসে টুকটুক করে একটু বড় হয়েছে। এখন সে, হু-ই-ই ওখান থেকে, হে-ই-ই এখান পর্যন্ত লাফ দিতে পারে। এখন আর সে মায়ের পিঠেও বসে না, কোলেও ওঠে না।
তবু কেন তাকে বোক্কা বলবে?
বলবই তো! বোক্কাটা করবে কী, এট্টা-ওট্টা জুলজুল করে দেখবে। আর মায়ের মুখের দিকে পিটপিট করে তাকাবে! আসলে কোনটার নাম ফড়িং আর কোনটার নাম শুঁয়োপোকা সে জানে না তো, তা-ই! মা বলে দিলে, তবে, মায়ের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে ফড়িং নয়তো শুঁয়োর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকাবে।
এ তো সবাই করে! কে আর সব জেনেচিনে জন্মায় বলো! পৃথিবীর আলোয় প্রথম চোখ মেললে তবে না তুমি দেখবে। তবে না তুমি দেখতে দেখতে সব জানবে, চিনবে!
সেদিন একটা ভারী মজা হয়েছে। হয়েছে কী, অশত্থগাছের ডালে একটা টিয়াপাখি এসে বসেছে। বসেছিস বেশ করেছিস, বোস! কে বারণ করেছে। কিন্তু বুক্কুকে দেখে অমন ট্যাঁ-ট্যাঁ করে চিল্লিয়ে ভেংচি কাটবার কী দরকার ছিল!
তা অবশ্য বলতে নেই, বুক্কু ভেংচি কাটা কাকে বলে, এখনও জানে না। এখন না-জানলে কী হয়েছে, ক’দিন পরে শিখে ফেলবে। কাকে ভেংচিকাটা বলে, আর কাকে বলে দাঁত খিঁচুনি, শিখে ফেলবে সব।
ঠিক আছে, সে যখন শিখবে, তখন শিখবে। এখন কিন্তু তার টিয়াপাখিটাকে দেখে খুব ভাল লেগে গেল। ওটা যে পাখি, পাখি যে ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারে, সেটা বুক্কু ক’দিন আগেই মায়ের কাছে শুনে নিয়েছে। কিন্তু এখন গাছের ডালে ট্যাঁ-ট্যাঁ করছে যে-পাখিটা সে পাখিটার যে কী নাম, সেটা তার জানা নেই। তাই বুক্কু তার মাকে জিজ্ঞেস করল, “মাগো, মাগো, ওই পাখিটার নাম কী মা?”
মা বলল, “ওটার নাম সবুজ টিয়া।”
বুক্কু বোকার মতো জিজ্ঞেস করে বসল, “সবুজ কী মা?”
মা বলল, “গায়ের রং।”
বুক্কু মায়ের মুখের দিকে হাঁদার মতো তাকিয়ে বলে বসল, “ওর গায়ের রং সবুজ, আমার তবে এমন কেন?”
মা উত্তর দিল, “ভগবান যাকে যেমন করেন।”
“ভগবান কে মা?”
মা এবার ফ্যাসাদে পড়ল। কিছু ভেবে না-পেয়ে উত্তর দিল, “তাকে কোনওদিন দেখিনি বাপু। অন্য কেউ দেখেছে কি না তাও জানি না। সবাই বলে, তাই বললুম।”
ফট করে বুক্কু বলে বসল, “ভগবানের ক’টা চোখ মা?”
মা বললে, “কেন চোখের কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
বুক্কু উত্তর দিল, “না, এমনি জিজ্ঞেস করছি। আসলে কী জানো মা, আমি যতই দেখছি, ততই আমার মজা লাগছে। ওই টিয়াপাখিটার গায়ের রং যেমন সবুজ, তেমনি তার আবার দুটো পা। অথচ আমাদের হাত-পা মিলিয়ে চার-চারটে। পাখিটা ঠোঁট দিয়ে পোকা ধরে খায়, আমরা হাত দিয়ে কলা ছিঁড়ে খাই। ওরা আকাশে ওড়ে, আমরা গাছে-গাছে লাফাই। আমাদের ঝোলাল্যাজ, ওদের ল্যাজই নেই। চোখ আমাদের অবশ্য দুটো-দুটো। কে জানে ভগবানকে আমাদের মতো দেখতে, না ওই পাখিদের মতো! না কি ভগবান অন্য রকম দেখতে, তার চোখ একটা, না ক’টা কে জানে! সেই জন্যেই চোখের কথা জিজ্ঞেস করছি।”
যাক গে যাক, বুক্কুর এত কথার একটা কথারও উত্তর দিতে পারল না মা। কেন না, ঠিক এই সময়ে বনের ভেতর দিয়ে একদল শুয়োর খাবার খুঁজতে বেরিয়েছিল। বুক্কু জিজ্ঞেস করলে, “মা ওরা কারা?”
মা বললে, “শুয়োর।”
বুক্কু জিজ্ঞেস করল, “ওদের সঙ্গে একটু খেলা করব মা?”
মা নাক সিটিয়ে বলল, “ছিঃ, ওদের সঙ্গে খেলে না।”
“কেন মা?”
“ওরা পচা পাঁকে মুখ ডুবিয়ে কেঁচো খায়?”
বুক্কু জিজ্ঞেস করল, “আমরা বুঝি কেঁচো খাই না?”
মা এবার রাগ করল। ধমক দিয়ে বলল, “তুই একটা গাধা।” বলতে-বলতে মা সত্যি-সত্যি একটা গাধার দিকে ইশারা করে ছেলেকে দেখাল। বলল, “ওই দ্যাখ, ইদিকে একটা গাধা আসছে। মরবে। বাঘে দেখতে পেলেই ঘাড় মটকাবে। তুই কোথাও নড়িস না। এখানে চুপচাপ বসে থাক। আমি দেখি, খুঁজেপেতে খাবার নিয়ে আসি।” বলে, বুক্কুর মা এগাছ থেকে লাফ দিতে দিতে অন্য গাছে হারিয়ে গেল।
এদিকে, গাধাটা একেবারে বুক্কুর চোখের সামনে পৌঁছে গেল। বুক্কু গাছের ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখছে, আর ভাবছে, ডাকবে, কি ডাকবে না। শেষমেশ সে ডেকেই দিল, “এই গাধা!”

যেই ডেকেছে, গাধাটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখছে। ভাবছে, কে ডাকল! যখন কাউকে দেখতে পেল না, তখন সে আবার হাঁটল।
বুক্কু আবার ডাক দিল, “যাচ্ছিস কোথায়? আমি এই যে গাছের ওপর।”
গাধা দাঁড়িয়ে পড়ল। গাছের ওপর দিকে তাকাল। বুক্কুকে দেখতে পেল। তারপর বলল, “ও তুই, বাঁদর!”
“না, আমার নাম বুক্কু। আমি বানর।” উত্তর দিল বুক্কু।
গাধা খেপে গেল। বলল, “তুই তো আচ্ছা ডেঁপো!”
বুক্কু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল। “তুমি আবার ভুল বললে, আমি ডেঁপো নই। আমি বুক্কু। আমি বানর।”
“ফাজলামি করার জায়গা পাসনি,” এবার গাধাটা খিঁকিয়ে উঠল, “তুই আমাকে বানর আর বাঁদরের তফাত শেখাচ্ছিস! জানিস আমি ইনফ্যান্ট ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। জানিস লোকে আমায় বিদ্বান বলে।”
বুক্কুটা ভীষণ ঘাবড়ে গেল গাধার ধাতানি খেয়ে। ভয়ে ভয়ে বলে ফেলল, “তবে যে মা আমায় গাধা বলে গাল পাড়ল।”
বুক্কুর কথা শুনে গাধাটা রেগে টং। মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠল, “তোর মা একটা কপিনী,” বলে গাধাটা আর কথা বাড়াল না, কেটে পড়ল।
বুক্কু ভাবতে বসল, তাই তো “কপিনী” আবার কেমন গালি!
তা সে যাই হোক, ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ একটা হরিণ সেই গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। সে কচি ঘাস খুঁজছে। খিদে পেয়েছে। কী সুন্দর দেখতে হরিণটাকে। গাছের শাখা-প্রশাখার মতো মাথায় শিং। হলুদ গায়ে ফুল-ফুল ছাপ। টানাটানা চোখ। তার দিকে চোখ পড়তেই বুক্কু একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। সে থাকতে পারল না। এই প্রথম সে হরিণ দেখছে। তাই অনেকটা খুশি-খুশি গলায় গাছের ওপর থেকে ডাক দিল, “তুমি কে গো? কী সুন্দর দেখতে তোমায়!”
সুন্দর বলতেই, হরিণের গর্বে যেন মাটিতে পা পড়ে না। এক ডাকেই তার গাছের ওপর চোখ চলে গেছে। বুক্কুকে দেখে বেশ দেমাকি গলায় উত্তর দিল, “কেন, তুই আমায় চিনিস না?”
বুক্কু বলল, “আমি তো সবে একটু বড় হয়েছি, তাই একটু একটু করে সবাইকে চিনছি।”
বুক্কুর কথা শুনে হরিণটা ঠোঁট উলটে বলল, “ধুস, তুই একটা আস্ত বোকা। আমায় বনের সবাই চেনে। তোর মা-ও চেনে। আমার নাম হরিণ। তোর মা তোকে এখনও বলেনি আমার কথা?”
“মা না-ই বলুক! আমি তো তোমার নিজের মুখেই শুনলুম তোমার নাম। আমার খুব ভাল লাগল। আমার বড্ড ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে খেলা করি! তুমি গাছে উঠতে পারো?”
“কেন? গাছে ওঠার কথা বলছিস কেন?”
“তুমি গাছে উঠলে, আমরা দু’জনে গাছে বসে বসে খেলা করতুম।”
বুক্কুর কথায় হরিণ হাসবে, না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারল না। উলটে বলল কী, “তোর বানর হয়ে জন্মাবার কথা ছিল, তুই বানর হয়েই জন্মেছিস। ওরে বুদ্ধু তোর সাধ তো কম নয়। তুই বানর হয়ে হরিণের সঙ্গে খেলা করতে চাস। তা-ও আবার গাছের ওপর বসে! তোর বুদ্ধির কপাট খুলতে এখনও অনেক দেরি আছে! ওরে বানর, হরিণ কখনও গাছে চড়ে না। সে মাটিতে পা ফেলে হাঁটে, না হয় ছোটে! সে যখন ছোটে, তখন বাঘও হেরে ভূত হয়ে যায় জানিস!”
এদিকে এক কাণ্ড হয়েছে।
কী হয়েছে?
একটা বাঘ তো এতক্ষণ ওত পেতে বসেছিল! এবার হরিণটাকে শিকার করবে বলে, চোখে টিপ পাকিয়ে নিঃসাড়ে বেরিয়ে আসছে! আর পড়বি তো পড় বুক্কুর চোখে পড়ে গেছে! রক্ষে এই, বাঘের চেহারাটা আগেই মা তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। তাই যেই না বাঘকে দেখা, অমনি সে হরিণটাকে চিৎকার করে সাবধান করল, “এই হরিণ, তোর পেছনে বাঘ।”
আর যাবে কোথায়! অমনি সঙ্গে সঙ্গে হরিণ দিয়েছে ছুট। আর বাঘটাও মেরেছে লাফ।
একবার হরিণটা সামনে ছুটতে ছুটতে পেছনে প্যাঁচ খায়, তো বাঘটাও ধরতে ধরতে ফসকে যায়।
এমনই একবার, দু’বার তিনবার করার পর যেই চারবারের বার বাঘটা হরিণটাকে প্রায় ধরে ফেলে, তখন বুক্কু করল কী, গাছের ওপর থেকে মারল লাফ, একেবারে বাঘের পিঠে। বাঘের পিঠে পড়েই বুক্কু খামচে ধরল বাঘের পেটটা। তারপর এমন কাতুকুতু দিতে লাগল বাঘের পেটে যে, বাঘ হরিণ ধরবে কী হাসতে হাসতেই বুঝি তার দম ফেটে পড়ে। হরিণ তো তখন ভোঁকাট্টা। বাঘের তো সে যাত্রায় হরিণ ধরা হলই না, উলটে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। আর সেই তক্কে বুক্কুটা তিড়িং। লাফিয়ে একেবারে ডালে!
বাঘের হাসি থামল। রেগে কটমট করে গাছের ওপর দিকে তাকাল বাঘ। বুক্কু সেই চোখ দেখে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। কিন্তু বাঘের ভয়ে বুক্কু গাছের এত ওপরে উঠে গেছে, বাঘের সাধ্যি কী তাকে ধরে। অগত্যা বাঘ রাগে গরগর করতে করতে সেখান থেকে অন্য পথে চলতে শুরু করল। যাক বাবা বাঁচা গেল!
ক’দিন পরে হল কী, সেই হরিণটা বুক্কুদের সেই গাছের নীচ দিয়ে যাচ্ছিল। বুক্কু দেখতে পেয়েছে! চেঁচিয়ে উঠল, “এই যে, এই যে হরিণ, তুমি আবার এপথ দিয়ে কোথা যাচ্ছ?”
হরিণ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে, গাছের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই এইখানে? তোকেই তো আমি খুঁজছি! তোর নাম কী রে?”
“বুক্ক।”
“বাহ্! তোর নামটা তো বেশ!”
বুক্কু বলল, “তোমার নামটা আরও ভাল, হরিণ।”
হরিণ উত্তর দিল, “বুক্কু আয়। আজ থেকে তুই আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে খেলা করব। তুই সেদিন না থাকলে আমার কী দশা হত বল! আসলে কী জানিস, আমি ভাবতুম আমি হরিণ, আমি বানরের চেয়ে জাতে বড়। কিন্তু তুই একটা ছোট্ট বানরছানা। আমার চোখ খুলে দিলি। আমি বুঝতে পারলুম বন্ধুর কোনও জাত নেই।”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন