ভেলকির নাম ঘোড়া

শৈলেন ঘোষ

আমি একটি ঘোড়া।

আসলে আমায় ঘোড়া বলল ভুল বলা হবে। কেননা, আমি ঘোড়া ছিলুম না। আমি ঘোড়া হয়ে গেছি।

আমি কিন্তু তোমাদেরই মতো একটি ছোট্ট ছেলে। আমি যখন ঘোড়া হইনি, মানে, তোমাদের মতো আমার যখন মাথা কিংবা নড়া, ঠ্যাং কিংবা ধড় ছিল, বা যখন আমি তোমাদের মতো গান গাইতে অথবা ঝগড়া করতে কিংবা চুমুক দিয়ে দুধ খেতে পারতুম, তখন সবাই আমায় মানুষ বলেই জানত। প্রত্যেক মানুষের যেমন একটি করে নাম থাকে, আমারও ছিল। অনেক পাঁজি-পুঁথি ঘেঁটে বাবা আমার নাম রেখেছিল গণেশ।

মা দুগ্গার ছেলে গণেশঠাকুর পুজোর সময় মায়ের সঙ্গে যখন মর্তে আসেন, তখন তাঁকে দেখলে শান্তশিষ্টই মনে হয়। আসলে গণেশঠাকুর শান্তই। এখন ভাগ্যদোষে মুন্ডুটা ঠাকুরের হাতিমার্কা হয়ে গেছে, সে আর কী করা! আমার বাবাও হয়তো ঠাকুরের এই শান্তশিষ্ট ভাবটি দেখেই আমারও নাম রেখেছিল গণেশ। হয়তো আশা ছিল, ওই গণেশ ঠাকুরের মতো আমারও স্বভাবটি হবে শান্ত। আমিও ঠাকুরের মতো লক্ষ্মী ছেলে হয়ে মায়ের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করব। তা অবশ্য হল না। কারণ আমার জ্ঞান-গম্যি, হবার আগেই আমার মা আমায় ছেড়ে স্বগ্‌গে গেলেন। অগত্যা বাবার কাছেই আমি মানুষ হয়েছি। আর মা না থাকলে যা হয়, সবাই বলল, বাবা আমায় আদর দিয়ে একটি বাঁদর করেছে! সত্যি, আমি একটি ভয়ানক দুরন্ত ছেলে হয়ে উঠলুম। আমায় সবাই বলল, ছেলে নয়তো, গুন্ডা। তাই আমার নামও হয়ে গেল গুন্ডা গণেশ।

তা আমি যদি চোপরদিন মারামারি করি, দশজনের মাথা ফাটাই কিংবা দশটা গাছের আম পেড়ে, কিছু পেটে পুরে বাকি ছড়িয়ে মড়িয়ে অন্যের লোকসান করি, তখন তো লোকে আমায় ফুল-চন্দন দিয়ে পুজো করবে না! লোকে গুন্ডা বলবেই।

অবশ্য আমার সামনে ও-নামটি মুখ ফুটে বলার কারও সাধ্যি ছিল না। বললে যে কী হয়, সেটি জানতেও কারও বাকি ছিল না। কাজেই কে আর আমায় ঘাঁটাতে আসে। গুন্ডা দেখলে দশ হাত দূর দিয়ে কেটে পড়াই ভাল।

বেশ লাগে! আমায় সবাই ভয় পায়! আমার সঙ্গে গায়ের জোরে সবাই হেরো। বীরের মতো বুক ফুলিয়ে পথঘাট দিয়ে হেঁটে বেড়াতে বেড়ে লাগে। আমি যেন গুন্ডার সর্দার!

আমার দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ হয়ে পাঁচজনে পাঁচ কথা যে বাবার কাছে বলছে না, তা নয়। সে-সব কথা বাবার এক কান দিয়ে ঢোকে, আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাবা আমায় আদর দিতে কোনওদিন কসুর করেনি। বাবার তো অভাব ছিল না কিছুরই। ধান-ভানাই কলের মালিক। ঝিকঝিক করে কল চলছে, ঝনঝন করে টাকা আসছে। তাই এই মা-মরা ছেলেটার জন্যে দুধ-ঘিয়ের ঘাটতি যাতে না পড়ে, সেদিকে বাবার সবসময়ে নজর। বায়না ধরলে কী পাই না! চাই কী, যদি বলি, আমার নাক বিঁধিয়ে দাও, আমি নাকছাবি পরব, বাবা আমার না করবে না। কিন্তু আমি জানি ওটা মেয়েদের সাজ! ছ্যাঃ ছ্যাঃ! ছেলেরা কখনও মেয়েদের মতো সাজে! বিশেষ করে আমার মতো ছেলে!

শেষকালে কিন্তু আমার মতো এই ছেলে যে বেঁড়ে ওস্তাদি করতে গিয়ে একটি চার-ঠ্যাং-এ ল্যাজওলা ঘোড়া হয়ে যাবে, এটা কে ভাবতে পারে! আমি যে আমি, যার কাছে বিপদ-টিপদ ফুঃ, সে-ই পড়েছি গাড্ডায়! কী কুক্ষণে যে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপটা খুঁজে বার করার ভূত চেপেছিল আমার মাথায়, তাই এখন ভাবি। সেই গল্প বলি।

আমাদের গ্রামটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেদিকে খানিকটা ঝোপ, খানিকটা জঙ্গল। পায়ে-চলা একটা সরু রাস্তা ওইদিকে চলে গেছে। অবশ্য ওই রাস্তা ধরে কেউ বড়-একটা হাঁটে না। বিচ্ছিরি অন্ধকার আর ঘুপচি-মতো জঙ্গলটা। বাঘ-ভাল্লুক না থাক, সাপ-খোপ যে নিশ্চয়ই আছে, সে-কথা আর বলতে! শুনেছি, জঙ্গলটার মাঝ-বরাবর নাকি একটা অনেকদিনের পোড়ো-বাড়ি আছে। দিন-দুপুরে ঠাওর করলেও দেখা যায় না। সবাই বলে, ওটা নাকি সলোমন সাহেবের বাড়ি।

সলোমন সাহেবকে কেউ দেখেনি। তিনশো-চারশো বছরের ওই পুরনো বাড়িটার মতো সলোমন সাহেবের নামটাও তিনশো-চারশো বছর ধরে সবাই জানে। সলোমন সাহেবের নাম করলেই ভয়ে কাঁপে সবাই। বলে, সাহেব নাকি এখনও মরেনি। এখনও নাকি নিঝুম রাত্তিরে ওই ভাঙা বাড়ির ছাতের ওপর একটা টিমটিমে আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ায়। ইংরিজিতে গান গায়। আর নয়তো জঙ্গলের গাছ-গাছালির আড়ালে কী যেন আঁতিপাতি করে খুঁজে বেড়ায়!

সত্যি বলতে কী, গান শোনা তো দূরের কথা, কোনওদিন সাহেবের গলার টুঁ শব্দটি পর্যন্ত আমার কানে আসেনি। তবে সাহেবের গল্প শুনতে শুনতে আমার যেন কেমন সব গোলমাল হয়ে যেত। সবাই বলে, সাহেব নাকি নানারকম ভেলকিবাজির মন্তরও জানে। কিন্তু যখন শুনলুম, ওই ভেলকির জোরেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপটা সাহেব ভাঙা বাড়ির গুপ্তঘরে লুকিয়ে রেখেছে, তখনই আমার মাথা ঘুরে গেল। আমি কিন্তু আগে আশ্চর্য প্রদীপটা কী, জানতুম না। বিপদ হল, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের গল্পটা বাবার মুখে শুনে।

বাবা কি গল্প বলতে চায়! আমিও ছাড়ব না। এমন ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করে দিলুম, বাবার ‘না’ বলে নিস্তার নেই। মশাই, পড়াশোনার নাম শুনলে যার গায়ে জ্বর আসে, সেই আমি এখন একেবারে একটি লক্ষ্মী ছেলে। বাবার পাশে শুয়ে শুয়ে কখনও ‘হ্যাঁ’, কখনও করে, আবার কখনও ‘এরপর কী হল’ ‘তারপর কী হল’ করতে করতে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের গল্প শুনতে লাগলুম। যখন গল্প শেষ হল, আসলে ভূতটা তখনই আমার মাথায় চাপল। আমার মনে হল ওই প্রদীপটা পেলে তো মন্দ হয় না। ওটা যদি সঙ্গে থাকে তা হলে তো যখন খুশি যা চাই তাই পাই। বাবাকে তখন আর কলে পিষে ধান ভানতে হবে না। আশ্চর্য প্রদীপ মাটিতে ঘষলেই হল। অমনি দত্যি হাজির। আমার সামনে মাথা হেঁট করে সেলাম জানিয়ে বলবে, “প্রভু, আমি আপনার হুকুম তামিল করার জন্যে হাজির। এখন আদেশ করুন আমায় কী করতে হবে!”

আমি অমনি সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলব, “আমার সামনে ওই যে মাঠটা দেখছ, ওখানে এখুনি একটা রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দাও। আমার বাবাকে পৃথিবীর সব সেরা পোশাক এনে দাও। আমার বাবা হবে সব রাজার সেরা রাজা। আমি হব পৃথিবীর সবচেয়ে বীর আর সাহসী রাজপুত্তুর।”

সুতরাং ওই আশ্চর্য প্রদীপটা আমার চাই-ই চাই। তাই আমি কাউকে কিছু না বলে, আশ্চর্য প্রদীপের খোঁজে একদিন ভরদুপুরে পোড়ো-বাড়ির জঙ্গলে ঢুকে পড়লুম।

বাইরে থেকে বোঝাই দায়। জঙ্গলের ভেতরটা এমন সাংঘাতিক রকমের থমথমে ভোঁ-ভাঁ। কেউ কোথাও নেই। মাঝে মাঝে ওই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছের মাথার ওপর দিয়ে দমকা দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কে জানে রাক্ষসের হাসি কেমন শুনতে! মনে হচ্ছিল, গাছের মাথায় হাওয়ার ওই তোলপাড় রাক্ষসের হাসির চেয়েও বুক-কাঁপানো!

তোমরা যদি ভেবে থাকো, এতেই আমি জুজু হয়ে গেছি, তা হলে মাপ করতে হল। ভেবো না, আমার মতলব শিকেয় তুলে, উলটো রাস্তায় হাঁটা দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরব। সে-ধাতে আমি গড়া নই। আমি হাঁটতেই লাগলুম। জঙ্গলের ভেতরে, আরও ভেতরে। যতই হাঁটছি মনে হচ্ছে একটা চাপা অন্ধকার হাত বাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আশ্চর্য এই, এতখানি হেঁটেও সলোমন সাহেবের বাড়ির টিকিটি পর্যন্ত আমার নজরে পড়ল না। আমার আগে ধারণা ছিল, জঙ্গলটা এমন কী আর! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এমন গোলমেলে জঙ্গল পৃথিবীতে হয়তো আর দুটি নেই। সে যাই হোক, সলোমন সাহেবের বাড়ি আমায় খুঁজে বার করতেই হবে!

খিদে পাচ্ছে। আমি একটি বুদ্ধু। উচিত ছিল সঙ্গে কিছু খাবার নেওয়া। সে যখন নেওয়া হয়নি, এখন আর ও-কথা ভেবে লাভ নেই, কারণ তা হলে সঙ্গে একটা লণ্ঠনও নেওয়া উচিত ছিল। সত্যি, কী ভীষণ অন্ধকার। এরপর তো বোঝাই দায় হবে এখন দুপুর না বিকেল। সন্ধে না রাত্তির।

হঠাৎ সামনের ঝোপটা খসখস করে নড়ে উঠল। আমি থমকে গেলুম। এতক্ষণ কোনও কিছুর সাড়া-শব্দ ছিল না। তাই চোখ ঠারিয়ে চেয়ে রইলুম সেদিকে। কিছুই দেখতে পেলুম না। মনে মনে ভাবলুম ওদিকে আর না এগোনোই ভাল। পাশ কাটালুম। ঝোপটা আবার নড়ে উঠল। কীরকম সন্দেহ হল আমার। তড়বড়িয়ে সরে গেলুম। এই নিঃঝুম জঙ্গলে এই যেন প্রথম আমার গায়ে কাঁটা দিল। ওদিকে আর না-তাকিয়ে জোরে পা ফেললুম। কিন্তু জোরে হাঁটা সহজ নয়! ঝরঝরে রাস্তা তো নেই যে, গড়গড়িয়ে এগিয়ে যাব। গাছ-আগাছা সরিয়ে নাড়িয়ে এগোতে হচ্ছে।

“কু-উ-উ-উঁ!”

কীসের চিৎকার! চমকে উঠেছি। এ আবার কী! চিৎকার করেই নিশ্চুপ হয়ে গেল যে! আমি থমকে দাঁড়িয়ে নিঃসাড়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে লাগলুম। কিছুই নজরে পড়ল না। ওঃ কী ভীষণ নির্জন! কী করব! আর এগোনো কি ঠিক হবে! না, এগোনো ঠিক না। এই ঝোপটার আড়ালে একটু দাঁড়াই। এখানে আমাকে কেউ দেখতে পাবে না।

একদম নট-নড়ন-চড়ন নট-কিচ্ছু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিক এমনই নিস্তব্ধ যে মনে হচ্ছে, আমার নিজেরই নিশ্বাস যেন সাপের মতো ফোসফেঁস করে তেড়ে উঠছে। আমি সামলাবার চেষ্টা করেও পারছি না। আমি বোধহয় ভয় পেয়েছি।

“ঠকাস!”

উঃ! কী পড়ল আমার মাথার ওপর! একটা মরা-মোষের মুন্ডু! মাথাটা ঝনঝনিয়ে উঠল। চনমনিয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে আমার চক্ষু ছানাবড়া! গাছের ওপর ওটা কী রে বাবা! একটা দানব নাকি! না। একটা শকুনি।

শকুনি! বাপ রে বাপ, এত বড়। গাছের ডালে বসে আমার দিকে চেয়ে ডানা নাড়াচ্ছে। কী বিচ্ছিরি কুচুটে চাউনিটা! চোখদুটো ভাঁটার মতো ড্যাবড্যাবে! এত বড় শকুনি আমি জীবনে কখনও দেখিনি। মার ছুট!

ছুটব কোথায়? ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসার পথ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আমি ওইখানেই পেটকাটা ঘুড়ির মতো ঘুরপাক খেতে খেতে এদিক ওদিক গোত মারতে লাগলুম।

হঠাৎ শকুনিটা ডানা ঝাপটিয়ে আমার দিকে ছোঁ মারলে। তাই দেখে আমিও পড়ি-মরি ঝোপ ডিঙিয়ে লাফ মারলুম। তার আগেই শকুনিটা তার ইয়া লম্বা ঠ্যাং দিয়ে আমার মুন্ডুটা জাপটে ধরলে। আমায় হুস করে টেনে আকাশে তুলে নিলে। আমি শকুনির ঠ্যাং-এ কবজার মতো আটকে হাওয়ায় উড়তে লাগলুম। শকুনি তার ঠ্যাং দিয়ে আমার গলাটা এমনভাবে চেপে ধরেছে যে, আমি শত চেষ্টাতেও চেঁচাতে পারছি না। অগত্যা তেড়েমেড়ে হাত-পা ছুড়তে লাগলুম। কিন্তু তাতে কি ওর শক্ত ঠ্যাং-এর খোঁচা নখের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায়! আমি ঠ্যাংঝোলা হয়ে আঁকপাক করতে লাগলুম আর মনে মনে ভাবতে লাগলুম, এবার গণেশবাবাজির কম্ম শেষ! ঠ্যাং দিয়ে ঠুকেই শকুনি আমার ন্যাটা চুকিয়ে দেবে!

উঃ। আমার নিশ্বেস আটকে আসছে! কী করি! আমি প্রাণের দায়েই আমার হাত দিয়ে শকুনির ঠ্যাংদুটো আঁকড়ে ধরলুম। তখনই কে যেন আমার মাথায় বুদ্ধি দিলে, ওর ঠ্যাংদুটো ভেঙে দে। আমি শকুনির ঠ্যাংদুটো দু’ হাত দিয়ে চেপে ধরলুম। খ্যাঁক-খ্যাঁক করে বিকট আওয়াজ করে খিঁচিয়ে উঠল শকুনিটা। আমার মাথায় টেনে ঝাড়ল ঠোঁটের ঠোক্কর। মাথা আমার ঝনঝনিয়ে উঠল। আমিও ছাড়বার পাত্তর নই। ঘুষি পাকিয়ে ওর মুখের দিকে ছুড়তে লাগলুম। শকুনিটা উড়তে উড়তে মুখ সামলাতে লাগল।

হঠাৎ শকুনির গলাটা নাগাল পেয়ে গেলুম। আমি চেপে ধরেছি। ওই আকাশের ওপর শকুনের সঙ্গে আমার ঝটাপটি লেগে গেল। শকুনি ডানা ঝাপটিয়ে আমায় যতই কাবু করতে চাইছে, আমি ততই ওর গলাটা দু’ হাত দিয়ে খামচে ধরছি। কিন্তু কী অসম্ভব শক্তি! আমার গায়ে, মাথায় ঠোক্কর মেরে একেবারে নাস্তানাবুদ করে তুলল। আমার গা দিয়ে ঝরঝরিয়ে রক্ত পড়ছে। আমিও ওর গলাটা মটকে দেবার জন্যে প্রাণপণে লড়তে লাগলুম। জানি না যুদ্ধের সময় আকাশে উড়োজাহাজের লড়াই কেমন হয়। কিন্তু শকুনি-মানুষে এই লড়াইটা তখন কেউ দেখলে নিশ্চয়ই শিউরে উঠত। অবশ্য কেউ কেউ বলতে পারো, হুঁঃ! কথা বলছে! একটা সামান্য শকুনির সঙ্গে লড়তে পারে না!

একদম আচমকা দু’হাত দিয়ে শকুনির ডানাদুটো জড়িয়ে ধরেছি। একঝাঁক পালক ডানা থেকে ফর ফর করে খসে পড়ল। উড়তে উড়তে থমকে গেল শকুনিটা। দু’জনে একসঙ্গে আকাশ থেকে ছিটকে পড়ছি। আমি ঠিক জানি, এবার আমার মরণ! বলতে বলতেই গাছের ওপর ধাক্কা খেলুম। তারপর মাটির ওপর, না কাঁটাঝোপে হুমড়ি খেয়ে পড়লুম, তা আমার মনে নেই। কেননা, আমার মনে হল, আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলুম।

হয়তো অনেকক্ষণ অজ্ঞান হয়েছিলুম। হঠাৎ আমি চমকে উঠলুম। “হি-হি-হি”— কার যেন হাসি কানে আসছে। হাসি শুনে আমি চমকে উঠলুম, না চমকে উঠে আমি হাসি শুনতে পেলুম, তা আমি এখনই বলতে পারছি না। তবে বুঝতে পারলুম, আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। এতক্ষণ মুখ গুঁজড়ে পড়েছিলুম। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছি। আবার কানে এল হাসি, “হি-হি-হি।”

কোনও বুড়ো-মানুষের হাসির শব্দ নিশ্চয়ই এমন হতে পারে না। ও যেন কোনও ছোট্ট মেয়ের কচি কচি হাসি। আমি চোখ কচলালুম। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলুম না। ভীষণ অন্ধকার। শুধু বুঝতে পারলুম, এটা জঙ্গলের কোনও আগাছাঘেরা জায়গা নয়। একটা সুড়ঙ্গ। এখানে যে কেমন করে এলুম, আমি জানি না। আশেপাশে শকুনিটাকেও দেখছি না। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালুম। পা টলছে। ভীষণ কষ্ট লাগছে। আবার সেই ছোট্ট মেয়েটির কচি-হাসি খিলখিলিয়ে উঠল। চমকে উঠে চেঁচিয়ে উঠলুম, “কে—?” আমার চিৎকারের ধ্বনিটা প্রতিধ্বনি হয়ে “কে-কে” করতে করতে সুড়ঙ্গের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কিন্তু হাসি আবার খিলখিলিয়ে উঠল। আমি হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলুম। এত অন্ধকার কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তবু সামলে সামলে পা ফেলছি। মনে হচ্ছে গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছি আমি।

কই, আর তো শুনতে পাচ্ছি না হাসিটা! হঠাৎ এমন চুপ করে গেল কেন? একেবারে নিঃঝুম, নিঃশব্দ! আমি অন্ধকারে একলা একটা কানামাছি। সুড়ঙ্গের এবড়ো-খেবড়ো খানা-খন্দে টাল খেতে খেতে এগিয়ে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, জানি না।

“ক্যাঁক-ক্যাঁক।”

উঃ! একটা প্যাঁচা ডেকে উঠেছে। একেবারে আমার পেছনে। প্যাঁচার ডাক কত শুনেছি। কিন্তু নিস্তব্ধ অন্ধকারে প্যাঁচার ডাক যে এমন ভয়ংকর, আমি জানতুম না। ভয়ে আঁতকে উঠেছি। পাদুটো আচমকা লাফিয়ে উঠল। হোঁচট খেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে সেই সুড়ঙ্গের ফাঁক-ফোকর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে চামচিকি বেরিয়ে এসে আমার ঘাড়ে মাথায় খোঁচাতে লাগল। আমি চামচিকি সামলাতে অন্ধকারে হাত ছুড়তে লাগলুম। চামচিকির সঙ্গে আমার খামচা-খামচি লেগে গেল। আমি ছুট দিলুম। চামচিকিরা পালিয়ে গেল।

একটু ছুটেই হকচকিয়ে গেছি। অন্ধকারে যেন আলো দেখা যাচ্ছে! ঠিক তাই। আলতো পায়ের ডিঙি মেরে এগিয়ে চললুম আলোর দিকে।

একটা জানলা। আলো আসছে জানলা দিয়ে। পাল্লাদুটো যেমন-তেমন ভেজানো। একটুখানি ফাঁক। সেই ফাঁকেই আলো। আমি জানলার সামনে এসে চুপিসারে দাঁড়ালুম। ফাঁকের মধ্যে চোখ মেলে উঁকি মারলুম। স্পষ্ট দেখলুম, একটা ঘর। একটা ভাঙা চৌকির ওপর লম্ফ জ্বলছে টিমটিম করে। নোংরা। ঘরের দেওয়ালের চুন-বালি খসে খসে যেন নেড়িকুত্তার হাড় ক’খানা জিরজির করছে। দেওয়ালে টাঙানো বড় বড় ছবিগুলো কান্নিক মেরে লটকে আছে। রংচটা টুটো-ফুটো ছবিগুলো যেন এক-একটা কঙ্কাল! আলো-আঁধারিতে ভয়ের মুখোশ পরে মুখ খিঁচিয়ে চেয়ে আছে। কিন্তু ঘরের মধ্যে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো! আমি অবাক চোখে চেয়ে রইলুম।

হঠাৎ একটা ছায়া নড়ে উঠল। আমার চোখের দৃষ্টিও সঙ্গে সঙ্গে সেই ছায়ার ওপর লাফিয়ে পড়ল। এ কী! এ যে সেই শকুনিটা। আবছা আলোর ছায়ার ভেতরে যেন সত্যিই একটা দানব। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে! শকুনিটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বুঝতে পারছি, আমার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ঠ্যাং ভেঙেছে কিংবা চোট খেয়েছে। চোখদুটো বিচ্ছিরি রকমের হিংসুটে। তীক্ষ্ণ ঠোঁটে ছোপ ছোপ রক্ত! দেখলে মনে হয় অনেক বয়েস। ছ্যাতলা পড়েছে গায়ে।

এতক্ষণ দেখতে পাইনি, ঘরের একপাশে একটা খাটও পাতা। তার ওপর ছেঁড়া-ময়লা বিছানা। বালিশের ঢাকনাটা নোংরা চিরকুট। তেলচিটচিটে। শকুনিটা লেংচে লেংচে এসে বিছানার ওপর লাফিয়ে বসল। ডানার ঝাপটায় একঝাঁক ধুলো সারাটা ঘর ঘুরপাক খেয়ে এই জানালাটার ফাঁক দিয়ে আমার নাকে এসে ধাক্কা মারল। উঁ! কী গন্ধ! আমি নাকে হাত দিয়ে চোখ সরিয়ে নিলুম।

আবার উঁকি দিয়েছি। দেখি, শকুনিটা ঠ্যাং গলিয়ে বালিশের তলা খামচাচ্ছে। আমি স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। কী বার করল ওটা বালিশের নীচ থেকে? আমি শিউরে উঠলুম। উত্তেজনায় ঠকঠক করে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। দেখলুম, শকুনিটার ঠ্যাং-এর খাঁজে একটা প্রদীপ। এই কি তা হলে সেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ! তা হলে কি আমি এখন সলোমন সাহেবের বাড়ির অন্দরে আটকা পড়েছি!

শকুনিটা বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল। ঘরের কোণে একটা কানা-ভাঙা শেওলা-পড়া মাটির কলসি। প্রদীপটা নিয়ে সেই কলসির মধ্যে ঠ্যাং ডোবাল। যখন তুলল, দেখলুম, প্রদীপ উপচে জল গড়াচ্ছে। শকুনিটা প্রদীপে চুমুক দিয়ে জলটা গিলে ফেলল। ঘরের লম্ফটা হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল। অন্ধকার ঘরটা আলোয় আলোয় ঝলসে গেল। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। দেখি, শকুনিটা আর শকুনি নেই! একটা সাহেব! উশকো-খুশকো চুল—ঝাঁকড়া মাথায় এক পুরনো ত্যাবড়ানো টুপি। তাপ্পিমারা একটা প্যান্ট। হাঁ-করা ছেঁড়া-কুটো একজোড়া জুতো পায়ে গলানো। খোঁচা খোঁচা ময়লা-ভর্তি নখ। দাড়িগোঁফে ময়লা জমে পাঁশুটে পানা হয়ে গেছে। কত বয়েস আমি বলতে পারি না। বয়েসের ভারে নিজে যেমন বেঁকে গেছে তেমনি একটা বাঁকা ছড়ি হাতে। ছড়িটার মাথায় স্পষ্ট দেখলুম একটা ছোট্ট মুন্ডু—ঘোড়ার। সাহেব হঠাৎ ছড়িটা বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে ঘোরাতে চেঁচিয়ে উঠল, “মাই হর্স, মাই হর্স।” আমি লেখাপড়া শিখিনি, তাই কথাটার মানে বুঝলুম না। তবে বুঝতে পারলুম লোকটা সাহেবি ভাষায় কথা বলল। তা হলে বোধহয় এই সাহেবই সলোমন সাহেব।

এতক্ষণে আমার ভয়টা ভীষণ হয়ে উঠেছে। আমি বুঝতে পারছি, সলোমন সাহেবই হয়তো শকুনি সেজে এই অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে আমায় ধরে এনেছে। আমি বোধহয় বন্দি। হয়তো এইখানেই আমার ইহলীলা শেষ। কিন্তু মরবার আগে আমি শুধু একটা কথাই জানতে চাই, একটা শকুনি কী করে সাহেব হল? এ কেমন করে হয়? কী করে হয়?

ভাবতে ভাবতেই দেখি সাহেব টুপি খুলে ফেলেছে। মাথাটা যেন পাখির বাসা। চুলের ভেতর আঙুল গুঁজে খসখস করে চুলকোতে আরম্ভ করল। তারপর মাথা ছেড়ে টাকের ওপর খচমচানি লাগিয়ে দিলে। ইস! টাকে কী বিচ্ছিরি দগদগে ঘা। চুলকোতে চুলকোতে নিজেই তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে উঠছে। তারপর বিরাট একটা বাজখাঁই গলায় ‘উফ’ করে হাঁক পেড়ে ওই বিছানার ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল। আমার নজর কিন্তু ওর হাতে ওই প্রদীপটার ওপর। ওটি কিন্তু সাহেব হাতছাড়া করেনি। হয়তো হাতছাড়া করবেও না। তখন কিন্তু আমার মুশকিল। হাতছাড়া না করলে আমি প্রদীপটা হাতাব কী করে!

বিছানার ওপর সাহেবের গড়গড়ানি থেমে গেল। আমি স্পষ্ট দেখলুম, সাহেব হাতের ছড়িটা মাথার কাছে রেখে দিলে। আর প্রদীপটা বালিশের নীচে রেখে ঘুমোবার জন্যে চোখ বুজলে। আমি ভাবলুম, যাক ঘুমোলে তবু ভাল। আমি নড়লুম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলুম, আর একটু দেখি।

সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল সাহেব। কেননা, নাক ডাকাচ্ছে। আমি জানালার পাল্লাদুটো এবার আর একটু ফাঁক করে মাথাটা গলিয়ে দিলুম। রক্ষে এই, জানলার গরাদ নেই। হয়তো এককালে ছিল। এখন ভেঙে গেছে। সুতরাং জানলা গলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়তে আমার অসুবিধে নেই।

সাহস যে আমার কেমন করে হল জানি না। আমি জানলা গলে ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়লুম। জানলাটা খুব উঁচু না। লাফাতে গিয়ে যেটুকু শব্দ হল, তাতে সাহেবের ঘুম ভাঙবার কথা নয়। ঘরের মধ্যে ঢুকেই আমি ঘরের চারপাশটা ভাল করে দেখে নিলুম। ঘরের একদিকে একটা ভাঙাচোরা দেরাজ। একটা দরজা হুড়কো লাগানো। খুলে দরকার নেই। এখন ভগবানের দয়ায় প্রদীপটা হাতাতে পারলেই হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে লোকটার মাথার নীচে বালিশ। বালিশের নীচে প্রদীপ। ওখান থেকে বার করা তো সহজ কাজ নয়। সাহেবের ঘুম ভেঙে গেলে! অবশ্য ঘুম ভাঙলেই বা কী! আমি দেব ছুট। আমায় ধরবে এই বুড়ো সাহেব! হুঁ! তবেই হয়েছে!

সেই ঘোড়ার মুন্ডু-আঁটা ছড়িটার গায়ে হাতে দেবার লোভ সামলাতে পারলুম না। তুলে দেখি, বেশ ভারী। দরকার নেই। যেখানকার জিনিস সেখানেই থাক। লম্ফের আলোটা জ্বালাতন করছে। আমার ছাপ পড়েছে দেওয়ালের গায়ে। যদিও তেমন বাতাস নেই, তবু লম্ফের আলোর সঙ্গে আমার ছায়াটা কাঁপছে। নিভিয়ে দিই আলোটা।

সাহেব পাশ ফিরল। আমি ঝটপট সরে গেলুম। ভাগ্যিস আলো নেভাইনি! সাহেব পাশ ফিরতেই দেখি, বালিশের নীচ থেকে প্রদীপটা উঁকি মারছে। এর নাম বরাত। আলো নিভলে দেখতে পেতুম না। আর লোভ সামলাতে পারলুম না। খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেলুম সাহেবের মাথার কাছে। হাত বাড়ালুম। এই সেই আলাদিনের প্রদীপ! উত্তেজনায় খামচে ধরলুম প্রদীপটা। যাঃ! সাহেবের গায়ে হাত লেগে গেল! ঘুম ভেঙে গেল সাহেবের। ধড়মড় করে উঠে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল, “হু ইজ দেয়ার?”

আমি ভয়ে ছিটকে গেলুম। প্রদীপটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে সট করে খাটের নীচে সেঁদিয়ে লুকিয়ে পড়লুম। সাহেব আবার চেঁচিয়ে উঠল, “হু ইজ দেয়ার? অন্দর মে কোন আছে?” বিছানা থেকে তড়বড়িয়ে নেমে পড়ল। লাঠিটা গড়িয়ে গেল। তুলে নিল সাহেব। তারপর দেখলুম, সেই লাঠিটা হাতে নিয়ে সাহেব খাটের নীচে উঁকি মারছে। সাহেবের চোখদুটো জ্বলছে। আমি খাটের নীচে থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গেলুম। বেরোতে গিয়ে কানাভাঙা কলসিটার গায়ে ধাক্কা মারলুম। কলসিটা ফটাস! জল গড়িয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। জলের ওপর হড়কাতে হড়কাতে আমি এবার ভাঙা দেরাজের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছি। সাহেবও ঠিক দেখে ফেলেছে। লাঠিটা উঁচিয়ে তেড়ে এল। আমি দেরাজের পেছন থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে গিয়ে লম্ফটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লুম। মাটিতে ছিটকে পড়ে লম্ফটা দপ করে নিভে গেল। ঘরের মধ্যে জমাট অন্ধকার। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। হয়তো সাহেবও আমায় দেখতে পাচ্ছে না। এখন জল থইথই অন্ধকার ঘরের মধ্যে সাহেব আর আমি। বিপদের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমার দম আটকে আসছে।

হঠাৎ কোথাও কিছু নেই সাহেব হাতের ছড়িটা আনি-মানি বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁক পাড়লে “ইউ নটি বয়।” আমি জানি, আর আমায় কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তাই প্রাণের দায়ে হাতড়ে হাতড়ে জানলাটা খুঁজতে লাগলুম। ওটাই আমার পালাবার পথ।

ভাগ্য কাকে বলে! আমি জানলাটা খুঁজে পেয়েছি। মেরেছি লাফ। একেবারে বাইরে। পেছন ফিরে দেখি, সাহেবও জানলা টপকেছে। আমি ছুটতে গেলুম। তার আগেই সাহেব ঘোড়ার মুন্ডুআঁটা ছড়িটা দিয়ে আমার মাথায় টেনে এক ঘা কষিয়ে দিলে। আমি, মানে আমি, মানে গণেশচন্দ্র, সঙ্গে সঙ্গে একটি ঘোড়া হয়ে গেলুম! অন্ধকারে আমার হাত থেকে প্রদীপটা ছিটকে পড়ল, ঝন-ঝন-ঝন। আমি চিৎকার করে উঠলুম, চিঁ হিঁ হিঁ! তারপর চার-পা তুলে লাফাতে লাগলুম।

আমি জানতুম না পালাবার পথ নেই। লাফাতে লাফাতে সুড়ঙ্গের ভেতরে ওই মস্ত ভাঙা গেটটায় আমার মাথা ঠুকে গেল। গেটে তালা ঝোলানো। আমি তালার ওপর মাথা গুঁজে গোত্তা মারলুম। তালা খুলল না। ততক্ষণে সাহেব এসে আমার পিঠে আরও ক’ ঘা বসিয়ে দিলে। আমি সামনের দু’ পা তুলে তুর্কি নাচ শুরু করে দিলুম। সাহেবও মার থামাল না, আমিও নাচ থামালুম না। শেষে নাচতে নাচতে সাহেবের ঘাড়ে পা তুলে দিয়েছি। সাহেব ‘মাই গড’ বলে চেঁচিয়ে উঠে মাটিতে চিতপটাং। হাতের ছড়িটা হাত ফসকে ছিটকে গেল। সেই তক্কে আমি চার পা তুলে সাহেবের পেটের ওপর লাফালাফি শুরু করে দিলুম। সাহেব কোঁতাতে লাগল, “সেভ মি, সেভ মি।”

আমি সে-কথারও মানে বুঝলুম না, নাচানাচিও থামালুম না। আমার ঠ্যাং-এর ঠেলায় সাহেব পাশ বালিশের মতো গড়াগড়ি খেতে লাগল। শেষমেশ সাহেবের মুখে ফেনা উঠল। সাহেব ঠান্ডা মেরে গেল।

এই রে, শেষে আমি সাহেব খুন করে বসলুম! এবার তো তা হলে আমার নিস্তার নেই! আমি পালাবার জন্যে ওই তালা-আঁটা গেটটায় তেড়ে-মেড়ে ধাক্কা দিতে লাগলুম। দেওয়ালের এধার ওধার থেকে ধুলোবালি ঝরঝরিয়ে খসে পড়ছে। কিন্তু গেট খুলছেও না, ভাঙছেও না। হঠাৎ দেখি কী, অন্ধকারে যেন একটা আলোর ফুলকি ছুটতে ছুটতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি স্থির হয়ে গেলুম। তারপর দেখি, হাতে লম্ফ নিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে। আমার সামনে এসে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে খুব চাপা গলায় বলল, “গেটে তালা আঁটা, পেছনের রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।”

আমি অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলুম, এখানে এ আবার কে? ভারী মিষ্টি। এর আবার কী মতলব! এই কি তবে খিলখিলিয়ে হাসছিল!

মেয়েটি বলল, “বাঁচতে হলে পালাতে হবে। নইলে সাহেব আবার এক্ষুনি জেগে উঠবে। ভেবো না, সাহেব মরেছে। এ সাহেব মরে না। এর নাম সলোমন সাহেব। ম্যাজিক জানে। এসো, আমার সঙ্গে।”

ওর হাতে আলো ছিল, তাই দেখেশুনে পেছনের রাস্তায় পৌঁছে গেলুম। এদিকেও একটা গেট খোলা। মেয়েটি বলল, “এই রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।”

আমি দেখলুম, এটা ভাঙা-বাড়ির পেছনদিক। বাইরে সেই চেনা জঙ্গল। সেইরকম গভীর আর সেইরকম থমথমে। অবিশ্যি তখন ছিল দিন, এখন রাত। তাই অন্ধকারটাও এখন জমাট।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, “আমি যাব কী করে?”

মেয়েটি বলল, “আমার সঙ্গে।”

আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি কে?”

সে বলল, “লক্ষ্মী।”

আমি বললুম, “আমি গণেশ।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি তো লক্ষ্মী, সাহেবের বাড়িতে এলে কী করে?”

লক্ষ্মী বলল, “সাহেব আমায় ধরে এনেছে। আমি ওই জঙ্গলের ধারে রোজ ছাগল চরাতে আসতুম। একদিন সন্ধে হয়ে গেছল। হঠাৎ ওই জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা বাঘ বেরিয়ে এল। আমি ছুটতে গেলুম, আমায় থাবা মারল। পড়ে গেলুম। বাঘটা আমায় টানতে টানতে জঙ্গলের মধ্যে এই ভাঙা-বাড়িটায় ধরে এনে বন্দি করে রাখল। তারপর তুমি যেমন দেখলে, একটা শকুনি প্রদীপের জল খেয়ে সাহেব হয়ে গেল, আমিও তেমনই দেখলুম, একটা ডোরাকাটা বাঘ, ওই প্রদীপের জল খেয়ে, সলোমন হয়ে গেছে। যে সাহেব, সেই সলোমন। তাই নাম সলোমন সাহেব।

“প্রদীপটা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ?” আমি লক্ষ্মীকে জিজ্ঞেস করলুম।

লক্ষ্মী বলল, “না, আলাদিনের নয়। সলোমনের আশ্চর্য প্রদীপ।”

আমি বললুম, “প্রদীপটা খুঁজতেই তো আমি এখানে এসেছিলুম। পেয়েও গেছলুম। কিন্তু সাহেব যেই লাঠি মারল, আমি ঘোড়া হয়ে গেলুম, আর আমার হাত থেকে প্রদীপটাও ছিটকে পড়ে হারিয়ে গেল। আচ্ছা, আমি আর মানুষ হতে পারব না?”

হঠাৎ লক্ষ্মীর হাতের সেই লম্ফটা দপ করে নিভে গেল। লক্ষ্মী চেঁচিয়ে উঠল, “সলোমন সাহেব, সলোমন সাহেব! পালাও, পালাও!”

আমি বললুম, “তোমায় নিয়ে যাব। তোমার মায়ের কাছে পৌঁছে দেব। আমার পিঠের ওপর তাড়াতাড়ি লাফিয়ে ওঠো।”

লক্ষ্মী জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”

আমি বললুম, “হ্যাঁ। তুমি আমার বোন।”

লক্ষ্মী আমার পিঠের ওপর বসতে না-বসতে সলোমন সাহেব “পাকড়ো, পাকড়ো” করে চিৎকার করে উঠল। ততক্ষণে লক্ষ্মীকে পিঠে নিয়ে আমি ছুট দিয়েছি।

কানে তখন অস্পষ্ট কান্নায় সলোমনের গলার চিৎকার ভেসে আসছে, “মাই ল্যাম্প, মাই ল্যাম্প।” সেই চিৎকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

আমি লক্ষ্মীকে জিজ্ঞেস করলুম, “সাহেব ‘ল্যাম্প ল্যাম্প’ করে কী বলছিল? কী মানে?”

লক্ষ্মী বলল, “তুমি জানো না?”

আমি বললুম, “না।”

“ও।” চুপ করে গেল লক্ষ্মী।

খানিকক্ষণ চুপচাপ ছুটলুম। তারপর আমিই কথা বললুম, “আমি ঘোড়া।”

লক্ষ্মী উত্তর দিল, “লেখাপড়া না শিখলে মুখ্যু লোকে ঘোড়াই হয়।”

“ও, তাই বুঝি। তবে যে বলে গাধা হয়।”

লক্ষ্মী বলল, “হ্যাঁ। ওই একই কথা। দুটোই মুখ্যু!”

“তা হলে?”

“তা হলে তোমায় মুখ্যু থাকলে চলবে না! সবকিছু জানতে হবে, শিখতে হবে।”

আমি বললুম, “আমি জানব, আমি শিখব।”

লক্ষ্মী জিজ্ঞেস করল, “ঠিক?”

আমি উত্তর দিলুম, “ঠিক, ঠিক, ঠিক।”

দূরে একটা ঝিলের ওপর চাঁদের ছায়া পড়েছে। লক্ষ্মী বলল, “দাঁড়াও, আমি নামব।”

আমি ছুটতে ছুটতে দাঁড়িয়ে বললুম, “কেন?”

লক্ষ্মী আমার পিঠ থেকে লাফিয়ে বলল, “আসছি।”

লক্ষ্মী ঝিলের কাছে চলে গেল। আমি দেখলুম লক্ষ্মী তার আঁচল থেকে সেই প্রদীপটা বার করে প্রদীপে জল নিল। আমার কাছে এল। মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “জলটা খেয়ে নাও।”

আমি জিজ্ঞেস করলুম, “এটা সলোমনের প্রদীপ?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি পেলে কী করে?”

“তোমার হাত থেকে ছিটকে গেছল, আমি কুড়িয়ে রেখেছিলুম।”

আমি চোখ বুজে জলটা গিলে ফেললুম। সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথামুন্ডু সব একাকার হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। আমি এত বড় একটা ঘোড়া, চক্ষের পলকে আবার গণেশ হয়ে গেলুম।

আমি বললুম, “প্রদীপটা তো সাংঘাতিক জাদু জানে।”

লক্ষ্মী বলল, “প্রদীপও না, জাদুও না। ওই যে তুমি বললে, জানবে, শিখবে, তাই তুমি আবার ঘোড়া থেকে মানুষ হলে।”

আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তা-ই বুঝি?”

লক্ষ্মী বলল, “তা-ই।”

আমি হাত বাড়ালুম, “দেখি প্রদীপটা।”

লক্ষ্মী প্রদীপটা আমার হাতে দিল। আমি লক্ষ্মীর মুখের দিকে তাকালুম। লক্ষ্মী অবাক চোখে আমায় দেখল। আমি প্রদীপটা ঝিলের জলে ছুড়ে দিলুম। জলে ঢেউ খেলে গেল। আকাশের চাঁদটা জলের ছায়ায়, ঢেউয়ের দোলায় নেচে উঠল।

লক্ষ্মী বলল, “এ কী, ফেলে দিলে?”

আমি বললুম, “ওর কাজ শেষ হয়ে গেছে। প্রদীপ কী হবে? আমি তো আমার বোনকে পেয়েছি।”

লক্ষ্মীর মুখটা হাসিতে উছলে গেল। আবার তেমনি হি-হি-হি করে হেসে উঠল।

আমিও হাসতে হাসতে, লক্ষ্মীর হাত ধরে, চাঁদের আলোয় ছুটতে ছুটতে বাড়ি চললুম।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%