শৈলেন ঘোষ

এ তো আচ্ছা তাজ্জব কাণ্ড! ইতিমিচিসাহেব নাচছেন! কী নাচ! কী নাচ! নাচের ঠেলায় সাহেবের টুপিটি মাথা ছিটকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাথার মস্ত টাকটি বেরিয়ে পড়ে ঝিলিক মারছে। অথচ টাকের ইদিক উদিক ছিটেফোঁটা দু’-এক গাছা চুল উঁকি মেরে জানান দিচ্ছে, সাহেবের নাচার বয়েসটি অনেক কাল আগেই খতম হয়ে গেছে।
এই সর্বনাশ! ইতিমিচিসাহেব যে নাচতে নাচতে গান জুড়ে দিয়েছেন। গানের ছিরি দ্যাখো:
কী করি রে মই ধরি রে উঠে পড়ি আকাশে,
টাক ঝকঝক মাথা আমার চাঁচা-পোঁছা ফাঁকা সে।
আচ্ছা, লোকটার হল কী বলত? ক’দিন ধরেই তিনি ঘরের মধ্যে খিল এঁটে, নাচতে নাচতে, যেন গানের সঙ্গে কুস্তি লড়ছেন!
আমি বলি, খিল এঁটে তিনি ভালই করেছেন। কারণ, এই নাচা-গানার কারণটা এতই ভয়ংকর যে, কেউ টের পেলেই সব গুবলেট। আমি অবশ্য টের পেয়েছি, কিন্তু উঁ-হুঁ বলব না। আহা বলছি তো বলব না! আচ্ছা, এত করে অনুরোধ করছ কেন বল তো! আরে বাবা বলা ঠিক নয়, কেউ শুনে ফেলবে! আচ্ছা বাবা আচ্ছা, বলছি। কথা দাও তুমি কাউকে বলবে না! ঠিক বলছ তো, কাউকে বলবে না! তবে এসো, আমার কাছে এসো আর একটু। হ্যাঁ চুপিচুপি বলছি শোনো: ইতিমিচিসাহেব না, সেদিন রাস্তা থেকে একটা নেকলেস কুড়িয়ে পেয়েছেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, নেকলেস, নেকলেস। গলার হার। সোনা তো বটেই। তাতে আবার দামি দামি পাথর বসানো। হিরে-জহরত! উঃ চোখ ঝলসে যায়। শুনে ইস্তক আমারই বুকের ভেতরটা এমনই আই ঢাই শুরু করে দিয়েছে, কী বলব! একবার লাফাচ্ছে তো, একবার হাঁপাচ্ছে। একবার ছুটছে তো, তিনবার থেমে পড়ছে। আচ্ছা, ওই নেকলেসটার কত দাম হবে বলো তো? একশো দুশো! ধ্যাত এক লাখ, দু’লাখ, পাঁচ লাখ, দশ লাখ! উফ! আমি ভাবতে পারছি না। আমার মাথা ঘুরছে!
চুপ! চুপ! চুপ! ইতিমিচিসাহেবের যে নাচাগানা বন্ধ হয়ে গেল। হ্যাঁ, ওই তো তিনি দিব্যি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। কী ব্যাপার! মুখখানি হাসিতে অমন মাখামাখি কেন? দরজায় তালা এঁটে তিনি কোথায় হাঁটলেন? শুধু হাঁটলেন না, হনহন করে হাঁটলেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে ফেললেন। এই যাঃ! মাথার টুপিটি তিনি ঘরে ফেলে এসেছেন। কী লজ্জা! কী লজ্জা! গড়ের মাঠের মতো টাকটি রাজ্যের লোক দেখে ফেলল! ছোট ছোট, টুপি আনতে ঘরে ছোট।
যাক বাবা! ঘরে ফিরে, মাথার টুপি মাথায় চাপিয়ে নিশ্চিন্ত। তিনি আবার হাঁটলেন। কোথা যাবেন বলো তো! কে জানে। সে-কথা জানতে ইতিমিচিসাহেবের পেটের মধ্যে সাঁতার কাটতে হয়। সাহেবের পেটে কী মতলব কিলবিল করছে, সে তিনি ছাড়া আর কে জানবে!
এই সেরেছে! দ্যাখো, দ্যাখো সাহেব হাঁটতে হাঁটতে আবার থমকে দাঁড়ান। চমকে পিছু ফিরে পাঁই পাঁই—দে ছুট! কী হল? আবার কেন ঘরের দিকে ছোটেন? ছুটতে ছুটতে এই বুঝি হুমড়ি খান! এই বুঝি ঠ্যাং ভাঙেন! এই বুঝি মাথার টুপি উড়ে যায়! না, টুপি উড়ল না। উলটে ছুটতে ছুটতে সাহেবের একপাটি জুতো ফস করে খুলে রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। থাক পড়ে! সেদিকে নজর দেবার সময় নেই সাহেবের এখন। তিনি এখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটবেন।
ও হরি! দেখেছ আক্কেল! ইতিমিচিসাহেব যে আসল জিনিসটাই ঘরে ফেলে এসেছেন! নেকলেস, নেকলেসটা তো নেওয়া হয়নি। সেটি তো ঘরেই পড়ে আছে। এইরে, ঘরের তালা ভেঙে কেউ নিল বুঝি হাতিয়ে!
উফ! খুব রক্ষে! আছে! আছে! এই তো বালিশের নীচে। সাহেবের ধড়ে যেন প্রাণ এল। একটা বাচ্চা ছেলে যদি এমন কাজ করত, তা হলে না-হয় ক্ষমা-ঘেন্না করে নেওয়া যেত। কিন্তু অমন বুড়ো, ধুমসো লোক যদি এমন কাণ্ড করে, তাকে নিয়ে কী করবে বলো তো? ছিঃ ছিঃ। অমন একটা মহা মূল্যবান নেক—না বাবা, থাক! কেউ শুনে ফেলবে। দেওয়ালেরও কান আছে। দেওয়ালের যেমন কান আছে, তেমনই আবার চোর বাবাজিদেরও নাক আছে। যে বাড়িতে সোনাদানা ভরতি সেই বাড়ির পাশ দিয়ে একবার গেলেই হয়। অমনই সোনার গন্ধ ভুর ভুর করে চোরের নাকে সুড়সুড়ি দেবে। সুতরাং থাক। কথাটা নিয়ে আর বেশি কচকচানি না করাই ভাল।
কিন্তু ব্যাপারটা কী? ইতিমিচিসাহেব নেকলেসটি ট্যাঁকে গুঁজে যান কোথা এই রোদ ঝাঁ ঝাঁ ভরদুপুরে? হায় কপাল! তোমাদেরও বলিহারি! সাহেবের এখন কি আর এইসব দুপুর-টুপুর গায়ে লাগে! এখন দিনদুপুরই হোক, কি রাতদুপুর, সাহেবের ট্যাঁকে যখন নেকলেস, তখন কুছ নেহি মাঙতা! তিনি এখন লক্ষ লক্ষ লক্ষপতি। বুকখানা তিনি তিনহাত চিতিয়ে, মাথাটা তিন চার হাত উঁচিয়ে হাঁটবেন। বেশ করবেন। লক্ষপতিরা এমনি করেই হাঁটে। এখন তিনিই বা কে, আর সম্রাট শেরশাহ-ই বা কে! ইচ্ছে করলে এক্ষুনি তিনি এই শহরটা কিনে ফেলতে পারেন। এক্ষুনি তিনি হুকুম ছাড়তে পারেন, গাড়ি ঘোড়া থামাও। থেমে যাবে। ঘর-বাড়ি ভাঙো। ভেঙে যাবে। হাট-বাজার বন্ধ করো! অমনই বন্ধ হয়ে যাবে। হুঁ হুঁ, ইতিমিচিসাহেবের ট্যাঁকে এখন একটি গোটা টাঁকশাল গোঁজা আছে। তিনি এখন কাকে পরোয়া করেন এ্যাঁঃ!

এ রাম! এ কী কাণ্ড ইতিমিচিসাহেবের! তাঁর পায়ে যে একপাটি জুতো। একপায়ে জুতো পরে, টেকো মাথায় টুপি এঁটে তিনি এই লোক গিজগিজ পথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন! খেয়াল নেই, কখন ছুটতে ছুটতে পা থেকে জুতোটি খুলে রাস্তায় গড়াচ্ছে!
তাই তো! ইস, লজ্জার একশেষ। সাহেবের মুখের জিবটি প্রায় আধহাত লম্বা হয়ে ঝুলে পড়ল। তিনি চোখ টেরিয়ে এদিক ওদিক দেখলেন। না, বোধহয় কারও নজর পড়েনি। তিনি তাল কষতে কষতে ফট করে একপায়ের জুতো খুলে ফেললেন। রাস্তার যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঝট করে সেখানে বসে পড়লেন। খোলা জুতোটি হাতে নিয়ে সুট করে জামার নীচে পাচার করে বগলে লুকিয়ে ফেললেন! আঃ শান্তি! খালি পা তবু ভাল! কিন্তু একপায়ে জুতো! দেখলে লোকে ঠিক পাগল ঠাউরাত।
হাসি পেয়ে গেল ইতিমিচিসাহেবের। হাসতে হাসতে তিনি ভাবতে লাগলেন, কী ঠকান ঠকেছে রাস্তার লোকগুলো। কেউ দেখতে পায়নি। হা-হা-হা! তিনি আবার হাঁটলেন। এবং এবার খালি পায়ে হাঁটি-হাঁটি করে এগিয়ে চললেন। সত্যি, কী কিম্ভূতকিমাকার দেখতে লাগছে ইতিমিচিসাহেবকে। প্যান্ট জামা গায়েতে/ জুতো নেই পায়েতে/ টুপি ঢাকা টাকটি/ হেঁচে দিল কাকটি/ ইঃ যাঃ!
তাই তো, ওই গাছের ডালে বসে বসে একটি কাক কী কম্ম করছে! হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নজরে পড়ে গেল ইতিমিচিসাহেবের। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। চোখের পাতা নট পড়ে, নট চড়ে! কাকটা কী যেন ঠোকরাচ্ছে! হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই। সেই যে জুতোটা ছুটতে গিয়ে ইতিমিচিসাহেবের পা থেকে খুলে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল, সেইটি তিনি গাছে তুলেছেন, তুলে জুতোর সুকতলাটি ঠুকরে ঠুকরে গিলে খাচ্ছেন। আর দেখতে হয়! অ্যাই—অ্যাই করে একেবারে আঁকপাঁকিয়ে উঠলেন ইতিমিচিসাহেব। হুস হুস হ্যা হ্যা করে তাড়া মারলেন তিনি। গ্রাহ্যি নেই কাকের। তিনি দেখেন চাক্ষুস/ সেই কেলে কাক্কুস/ জুতো চাটে রাক্ষুস/ ইতিমিচিসাহেব রেগে টং! কী, তাঁর ট্যাঁকভর্তি এত সম্পত্তি, তাঁকে কিনা অগ্রাহ্যি। দাঁড়াও, আগে শহরটা কিনুন ইতিমিচিসাহেব, তারপর যত কাক আছে, তাদের সব ভুষ্টিনাশ করে ছাড়বেন। একটা করে কাক ধরবেন, আর কচকচ করে তাদের ডানা কাটবেন।
কিন্তু সে তো পরের কথা, এখন যে জুতোর দফারফা! মার ইট। ফস করে রাস্তা থেকে একটা ইট তুলে, ঠকাস করে ছুড়ে মারলেন কাকের ঘাড়ে। কাক সে তোমার চেয়েও চালাক। তুমি ইট তুলবে, আর সে ঘাড় পেতে তোমায় সেলাম করবে, সে বান্দা কাক নয়। সে আগেই হাওয়া। কিন্তু যাঃ চলে! কাক উড়ে হাওয়া হল, অথচ গাছ থেকে জুতোটি মাটিতে পড়ল না তো! এই যাঃ! ডালের খাঁজে আটকে গেছে। কী হবে তা হলে? কী আর হবে, গাছের ডালে উঠতে হবে। কী ফ্যাসাদ! তিনি তো কোনওদিন গাছে চড়েননি। তার ওপর তিনি সাহেব। সাহেবকে কেউ কখনও গাছে চড়তে দেখেছে! এখন সাহেবই হও, কি নায়েবই হও, গাছে চড়তে হবেই। নইলে জুতো ফক্কা। অগত্যা সেই বগলে লুকিয়ে রাখা জুতোটি গাছের নীচে রেখে, গাছে আটকানো জুতোটি উদ্ধার করতে তিনি গাছে চড়লেন। উঃ! সে কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড! গাছের গুঁড়ি জাপটে তিনি একফুট ওঠেন, তো—দু’ফুট পিছলে নামেন। আবার দু’ফুট নামেন, তো তিনফুট ওঠেন। যেন সেই অঙ্কের বানর! তারপর নামতে উঠতে, উঠতে নামতে তিনি যখন জুতোটি খামচে ধরলেন, তখন ঝাঁক ঝাঁক কাকের হুলুস্থূল কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। কা-কা-কা। কাকের দল ইতিমিচিসাহেবের সঙ্গে ফাটাফাটি শুরু করে দিল। কেউ ঠোক্কর মারে। কেউ ঝাপট দেয়। কেউ নাক খামচায়। ইতিমিচিসাহেবের বুঝি গাছের ডালেই প্রাণটি যায়। ইতিমিচিসাহেব মাথা লুকান, জামা গুটান। হাত নাড়েন, পা ছোড়েন—এই যাঃ, ঝনাত! কী পড়ল? ইতিমিচিসাহেবের প্যান্টের দড়ি আলগা হয়ে, কোমর থেকে নেকলেসটি মাটিতে ছিটকে পড়েছে! আর কী, ইতিমিচিসাহেবই গাছের ডাল আঁকড়ে হু-ই-ই-ই, ওপর থেকে আঁই-আঁই করে চিল্লিয়ে উঠলেন। নেকলেস! নেকলেস! এই সেরেছে, সর্বনাশ! একটা কাক দেখতে পেয়েছে নেকলেসটা। মেরেছে ছোঁ! নেকলেসটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে কাক দে হাওয়া। তাই না দেখে, ‘ও গড’ বলে ইতিমিচিসাহেব গাছের ওপর থেকে মেরেছে লাফ। বাপরে বাপ! কী লাফ! মাথার টুপি মাথায় নাই। গায়ের জামা ফর্দাফাঁই। তেলেবেগুনে রেগে কাঁই। তিনি চেঁচালেন, এই ব্যাটা কাক, কোথায় পালাবি তুই! বলে দু’হাত তুলে কাকের পিছু ছুটলেন। আর হাঁকলেন, আয়!
আর আয়। কাক তখন নেকলেসটি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আকাশে উড়ছে। নেকলেসের হিরে-জহরত রোদের আলোয় ঝিলিক মারছে। ইস! ইতিমিচিসাহেবের সব মতলব মাঠে মারা গেল। কত ইচ্ছে, ওই নেকলেস দিয়ে শহর কিনবেন, হায় হায়, তাও বুঝি ফক্কা! সাহেবের ট্যাঁক যে ফাঁকা করে কাকমশাই আকাশে খাসা উড়ছেন।
অগত্যা আর কী করা। সাহেব রাস্তা থেকে ঢিল তোলেন, কাকের দিকে সাঁই-সাঁই ছোড়েন। একটা দুটো তিনটে চারটে। আর ব্যাস! অমনি কাকের কাকা-কাকি, মেসো-মাসি, পিসে-পিসি উড়ে এসে আবার লাগিয়ে দিলে ধুন্ধুমার কাণ্ড! টেকো মাথায় ঠোঁটের ঠোক্কর খেতে খেতে ইতিমিচিসাহেবের মাথা ঝনঝন ঝনাতকার। তিনি দু’হাত মাথায় জাপটে, খানিকটা নেচে, খানিকটা হেঁকে কাকের পেছনে ছুটতে লাগলেন। ছুটছেন তো ছুটছেন, এখনও ছুটছেন। আর ঠোঁটে নেকলেস নিয়ে সেই কাকটা উড়ছে তো উড়ছে, এখনও উড়ছে। সাহেব পারে না ধরতে, কাক দেয় না ধরা। কাকটা ভাবে, ধরা দিলেই সর্বনাশ। ঠোঁটের নেকলেস সাহেবের হাতে গেলেই তিনি শহরটা কিনে ফেলতে পারেন। কিনে ফেলেই কাকেদের ডানাগুলো কচাং কচাং কচকচ করে কেটে দিলে, তখন? যতই হোক সাহেব বলে কথা! হলেই বা দিশি! মেজাজটা তো আর এদেশি নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন