শৈলেন ঘোষ

কে আর জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে বলতে পারে, আমাদের মাথার ওপর যে নীল ছাদটা দেখা যাচ্ছে, ওটার নাম আকাশ! আর তার গায়ে যে অসংখ্য আলোর ফুল ঝলমল করছে, সেই আলোর ফুলকে বলে তারা আসলে, একটু একটু বড়ো না হলে তো আর একটু একটু চেনা যায় না সবকিছু। জানাও যায় না এটা ওটা।
তাই, আমার চোখ যখন প্রথম চিনতে শিখল, তখন আমি বুঝতে পারলুম, যে ঠোঁটদুটি আমার কপাল ছুঁয়ে দুলে উঠল, খুশিতে হাসিতে, সেই ঠোঁটদুটি আমার মায়ের। টলমলে ওই যে চোখদুটি আদরে-মায়াতে তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে, ওই চোখদুটিও আমার মায়ের। আর এই যে ছোট্ট ঘরখানার আবছায়ায় আমি বড়ো হয়ে উঠছি, এ ঘরটা আমাদের। আদর করতে করতে যেদিন মায়ের মুখের ‘আহা’ ডাকটা স্পষ্ট হয়ে আমার কানে বেজে উঠল, সেদিনই আমি প্রথম জানলুম আমার নাম ‘আহা’। বলো কেমন অদ্ভুত নামটা! শুনলেই যেন মন কেমন করে! তবে, আমি বলতে পারব না, কবে প্রথম আমার মাকে আমি “মা” বলে ডেকেছি।
সেই কথাটা বলতে না-পারলেও একথাটা আমি ঠিক ঠিক বলতে পারি, এঘরটা যতটা মায়ের, ততটাই আমার। আমি জানি, এঘরে আর কারও অধিকার নেই। তাই কোনওদিন এঘরে কাউকে আসতে-যেতেও দেখিনি। এই কারণেই কেমন করে যে অন্যের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে হয়, তা আমি জানতুম না।
আমার মা ফুল বেচেন। রোজ সকালবেলা বেরিয়ে যেতেন মা। যাবার আগে আমাকে খাইয়েদাইয়ে আমার হাতে খেলনা দিয়ে বলে যেতেন, “কান্নাকাটি কোরো না যেন। লক্ষ্মীটি হয়ে থেকো। আমার কাজ চুকে গেলেই ফিরে আসব।”
তা বলতে নেই, আমি কান্নাকাটি কোনওদিনই করিনি। কেমন একটা অভ্যেস হয়ে গেছল। মা সক্কালবেলা শূন্য ডালা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। তারপর এ বাগান, সে বাগানের মালীর কাছে ডালাভর্তি ফুল কিনতেন। এর বাড়ি, তার বাড়ি পুজোর ফুল বেচে, বাকি ফুল মন্দিরে, মসজিদে এমনকী গির্জাতেও বেচে আসতেন। অবশ্য, এসব আমি জেনেছি তখনই, যখন আমি বুঝতে শিখেছি ধীরে ধীরে অনেকটা।
অনেকটা যখন বুঝতে শিখেছি, তখনই মা আমায় বললেন, ওই যে ঘণ্টার শব্দটা অনেকদূর থেকে ভেসে আসে রোজ, ওটা গির্জার ঘণ্টা। কিংবা ওই যে মানুষের গলায় সুরের রেশ ধরে যে শব্দ শোনা যায়, তার নাম আজান। নয়তো কাঁসর ঘন্টা একাকার হয়ে যে শব্দ বেজে ওঠে মন্দিরে, সকালে অথবা সন্ধেবেলায়, তাকে বলে আরতির ধ্বনি। মায়ের যেদিন দু’-একটা ফুল বিক্রি হত না, ডালায় পড়ে থাকত, সে ফুলগুলি মা আমায় দিতেন। বলতেন, “তোমার জন্যে।” একদিন মায়ের ডালায় একটিমাত্র ফুল পড়েছিল। সেটি গোলাপ। মা যখন সেটি হাতে নিয়ে আমায় দিচ্ছিলেন, তখন সেই গোলাপ হাতে মায়ের হাসিমুখখানি কী সুন্দর লাগছিল।
আমার মা যখন রোজ সকালে বেরিয়ে যেতেন, তখন আমি একা ঘরের মধ্যে একরকম বন্দি হয়েই থাকতুম। আমি যাতে একা একা বেরিয়ে না যাই, তাই মা ঘরে তালা দিয়ে যেতেন। আমি যখন আরও ছোট ছিলুম তখন তেমন কিছু মনে হত না। খেলনাপাতি নিয়ে নিশ্চিন্তে সময় কেটে যেত। মায়ের তো কাজ ওই সকালটুকুই। মা ঘরে ফিরলেই ব্যাস, কাজ শেষ। সারাদিন আর ঘরের বাইরে যেতেন না। ফেরার সময়ই মা বাজারহাট করে আনতেন। তবে হ্যাঁ, হঠাৎ যদি কোনও কিছুর দরকার পড়ে যেত, তবে অন্যকথা। তখন বাইরে যেতেই হত। তা মিথ্যে বলব না, রোজ সকালে ফেরার সময় মা আমার জন্যে কিছু-না-কিছু মনের মতো খাবার কিনে আনতেন। আর হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করতেন, “কে বলতে পারে আহা-র জন্যে আমি আজ কী এনেছি?”
‘কে বলতে পারে’ মানে, মা যে মজা করে আমাকেই জিজ্ঞেস করতেন, এ তো তোমরাও বুঝতে পারছ। আমার উত্তরটা এক-একদিন ঠিক হত। আবার এক-একদিন হত একদম উলটো। হয়তো মা একদিন নিয়ে এলেন জিলিপি, আমি বলে বসলুম ভেলপুরি। আমার উত্তরটা ঠিক ঠিক না মিললে মায়ের সে কী হাসি। হাসতে হাসতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদরের আর শেষ হয় না মায়ের।
আমাদের ঘরটা অন্ধকার না-হলেও বলা যাবে না আলোয় ঝলমলে। একটা জানলা। ওই জানলা দিয়েই রোদ আসে, বাতাস ঢোকে। ওই জানলা দিয়েই আমি আকাশ দেখি। না হয় গাছপালা। অনেকদূরে একটা ঝিল আছে। সেটাও দেখতে পাই। তবে খুব স্পষ্ট নয়। ঝিলের জলে যখন সাদা হাঁসের ঝাঁক দলবেঁধে সাঁতার কাটে, তখন দূর থেকে আমার মনে হয়, যেন থোকা থোকা সাদা গোলাপ জলের ওপর দোল খাচ্ছে। তাই দেখে আমারও খুব জলে দোল খেতে ইচ্ছে করত। হায় রে, আমি যদি ওখানে যেতে পারতুম।
আমাদের এখানে পাখি আছে। সারাদিন তারা যে কোথায় থাকে, কী করে, কে জানে! ভোরের আকাশে আলো দেখা দিলেই তাদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেল। তারপর আকাশে ওড়াউড়ি। বেশ আছে। ওদের কেউ মানাও করে না, বকেও না। যে যেখানে পারো ডানা মেলে উড়ে যাও। আবার সাঁঝের বেলা সূর্য ডুবু-ডুবু হলে ফিরে এসো যে-যার গাছে। বাসায়। তখন গাছভর্তি পাখিরা এমন কিচিরমিচির শুরু করে দেবে যে, কী বলব।
আমাদের ঘরের এই জানলায় দাঁড়ালে সাঁঝের বেলা ডুবন্ত সূর্যটা আমি দেখতে পাই না। কিন্তু সেই সময়ে নীল আকাশের রংটা যে লাল টুকটুকে হয়ে যায়, তা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। ওই টুকটুকে লাল আকাশ, আর ওই গাছের বাসায় পাখির কলকলানির সঙ্গে যখন দূর থেকে আজানের সুরটা ভেসে আসে, তখন কেমন অদ্ভুত লাগে শুনতে। আমি একমনে শুনি। আর ভাবি, মা কি আমায় চিরকাল ঘরে বন্দি করে রাখবেন? আমি কি এখনও বড় হইনি? কত বড় হলে আমি যে বড় হয়েছি বলে মা মানবেন, তা আমার জানা নেই।
আমার ভারী ইচ্ছে করে সকালবেলা মায়ের সঙ্গে আমিও বেরিয়ে পড়ি। ফুলের ডালাটা মাথায় নিয়ে আমিও ফুল বেচে বেড়াই মায়ের সঙ্গে। আমার এই ইচ্ছের কথাটা একদিন আমি মাকে বলেও ফেললুম। মা বললেন, “সে কী কথা! তুই ফুল বেচতে যাবি কোন দুঃখে? আমি কি ঠুঁটো হয়ে গেছি, না পঙ্গু? আমার ছেলেকে আমি জজ-ব্যারিস্টোর করব। এত এত পয়সা রোজগার করবে আমার ছেলে। মস্ত বড় বাড়ি করবে। কত লোকজন আসবে। লোকের মুখে মুখে আমার ছেলের গুণপনা ছড়িয়ে পড়বে। সে কী আনন্দের দিন হবে বলতো আমার?”
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম মায়ের কথা শুনে! জজ-ব্যারিস্টোর সে আবার কী জিনিস? পৃথিবীতে ফুল বেচার চেয়ে ভাল কাজ আর-যে কিছু আছে, এতদিন ঘুণাক্ষরেও আমি তা জানতুম না। তাই মায়ের মুখের ওই শব্দদুটো আমার কানে অদ্ভুত শোনাল। আমি মাকে না জিজ্ঞেস করে পারলুম না, “মা জজ ব্যারিস্টোর কী কাজ?”
“সে অনেক নামীদামি কাজ।” মা উত্তর দিলেন হাসিমুখে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, “সেই কাজটা তোমার ফুল বেচার চেয়েও দামি কাজ?”
মা এবার হি-হি করে হেসে উঠলেন। বললেন, “দুর বোকা ছেলে! কোথায় ফুল বেচা, আর কোথায় জজ-ব্যারিস্টোরি করা। সে কাজ করতে গেলে কোট-প্যান্টুলুন পরতে হবে!”
মায়ের মখে কোট-প্যান্টুলুন পরার কথা শুনে আমার মনটা আনন্দে এমন ছটফট করে উঠল যে আমি আর থাকতে পারলুম না। জিজ্ঞেস করে বসলুম, “তা হলে কবে থেকে সে কাজটা করব আমি?”
“সে এখন কোথায়, এখনও ঢের দেরি! ইস্কুলে যেতে হবে। লেখাপড়া না শিখলে সে কাজ করবি কেমন করে?”
মায়ের মুখে ইস্কুলের নাম শুনে আমার মনটা আরও চনমন করে উঠল। আমি আর তর সইতে পারলুম না। জিজ্ঞেস করলুম, “তা হলে কবে ইস্কুলে যাব?”
মা বললেন, “এখনও ইস্কুলে যাবার বয়েস হয়নি তোর। আর একটু বড় হ, তার পরে।”
জজ-ব্যারিস্টোর, কোট-প্যান্টুলুন, ইস্কুল, লেখাপড়া, মায়ের মুখে এইসব মনকাড়া কথা শুনে কী দারুণ উত্তেজনায় সেদিনটা আমার কেটে গেল। যত দিন যায়, সেই উত্তেজনা ততই যেন বেড়ে চলে। আরও একটু বড় আমি হচ্ছি কি না, এটা যে কেমন করে পরখ করি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলুম না। একটা করে রাত কাটে, আর অস্থির হয়ে আমার হাত-পাগুলো আমি লক্ষ করি। কিছুতেই বুঝতে পারছি না, আমি বড় হচ্ছি কি না!
এমন সময় একদিন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। সেদিন ফুল বেচে ফেরার সময় মা একজন বুড়িমানুষকে আমাদের ঘরে নিয়ে এলেন। আমার জ্ঞান হওয়া ইস্তক যে ঘটনা কোনওদিনও আমি চোখে দেখিনি, আজ তা-ই দেখে তাজ্জব হয়ে গেলুম। আমি এই বুড়িমানুষটিকে দেখিনি বলেই চিনিও না। কিন্তু তিনি আমায় দেখে অবাক হয়ে বলে উঠলেন, “তোর আঁস্তাকুড়ের ছেলে কত বড় হয়ে গেছে রে, বউ!”
আঁস্তাকুড় কথাটা এর আগে আমি আর কখনও শুনিনি। কাজেই বুড়ির কথার মানে বুঝতে না পেরে আমি একবার বুড়ির মুখের দিকে আর একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাই, ফ্যালফ্যাল করে। আমি বুড়ির মুখে হাসি দেখলেও মায়ের মুখখানা দেখলুম, কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সেই ফ্যাকাশে মুখে মা মুহূর্তের মধ্যে বুড়ির চোখে চোখ রেখে নিজের চোখ মটকালেন। আমার ধাঁধা লেগে গেল। ভাবি, মা চোখ মটকান কেন!
বুড়িমানুষটি অবশ্য বেশিক্ষণ আমাদের ঘরে ছিলেন না। তিনি চলে যেতেই আমি মাকে জিজ্ঞেস করলুম, “আঁস্তাকুড় কাকে বলে মা?”
আমি স্পষ্ট দেখলুম, আমার কথা শুনে মা চমকে আমার মুখের দিকে তাকালেন। তিনি হাসলেন। কিন্তু মা যেমন করে রোজ হাসেন, আজ যেন মায়ের মুখে তেমন হাসি দেখলুম না। তিনি যেন কী বলবেন, না-বলবেন ভেবে পেলেন না। অথচ চুপ করেও থাকলেন না। আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন, “বুড়ি কী বলতে, কী বলল আমিও কি ছাই বুঝতে পারলুম। বয়েস হলে মানুষ এক বলতে আর এক বলে। এলোমেলো হয়ে যায় বুদ্ধিটা।”
মায়ের কথায় আমার কিন্তু মন সায় দিল না। আমি গোঁ ধরেই থাকলুম। আবার জিজ্ঞেস করলুম, “বুড়ি যখন আমাকে আঁস্তাকুড়ের ছেলে বলল, তখন তুমি বুড়িকে চোখ টিপলে কেন?”
আমার কথা শুনে এবার বুঝি মায়েরই বুদ্ধি এলোমেলো হয়ে যায়। মায়ের মুখে যেটুকু হাসি তখনও ছুঁয়ে ছিল, আমার ওই কথা শুনে নিমেষে তা উবে গেল। মায়ের মুখখানা সাংঘাতিক গম্ভীর হয়ে গেল। আমি ভয় পেয়ে গেলুম। কেন না, মায়ের এমন মুখ আমি আর কখনও দেখিনি। আমারও যেন কেমন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি চুপ করে গেলুম। আমার মাথার ভেতর শুধু ‘আঁস্তাকুড়’ কথাটা ঘুরঘুর করে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করতে লাগল।
সেদিনটা আমার খুব খারাপ গেল। পরের ক’টা দিনও যে খুব ভাল গেছে তেমন না। একলা ঘরে কখনও শুই। কখনও বসি। মন চাইলেই জানলায় দাঁড়াই। বুঝতেই পারছ, জানলাটাই একমাত্র বন্ধু আমার।
তো, একদিন সকালে একা ঘরে জানলায় দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ দেখি সেই বুড়িমানুষটি। একা একা দূরের পথ দিয়ে যাচ্ছেন। দেখেই আমার মন আনচান করে উঠল। আমার গলা যেন আপনা আপনিই চিৎকার করে উঠল, “ও বুড়িমা, বুড়িমা!”
আমার এই তীক্ষ্ণ সরুগলায় শব্দ বুড়িমানুষটির কানে পৌঁছতে একটুও দেরি হল না। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। এদিকে ওদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি খুঁজতে লাগলেন—কে ডাকল। আমি জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে নেড়ে নেড়ে চেঁচালুম, “এদিকে, এদিকে!”
তিনি দেখতে পেয়েছেন। হনহন করে তো আর বুড়িমানুষ হাঁটতে পারেন না। তাই ঠুকঠুক করেই এগিয়ে এলেন। একটু কাছে আসতেই আমি দেখলুম, তাঁর মুখে হাসি। হাসিমুখেই তিনি আমার জানলার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “ও, তুই ডাকছিস? মা কই?”
“মা এখনও আসেনি?”
“ঘরে তুই একা আছিস?”
“একাই তো থাকি।”
“আমি যাব?”
“আসবে কেমন করে, ঘর তো তালাবন্ধ।”
“ওমা!”
“আচ্ছা বুড়িমা, তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কী কথা?”
“আচ্ছা, তুমি আমায় সেদিন আঁস্তাকুড়ের ছেলে বললে কেন গো? মায়ের কোলকে আঁস্তাকুড় বলে বুঝি?”
বুড়িমানুষটি আমার কথা শুনে কেমন খিলখিল করে হেসে উঠলেন। বললেন, “দুর বোকা, মায়ের কোল কখনও আঁস্তাকুড় হয়। আঁস্তাকুড়ে তো জঞ্জাল ফেলে।”
“তবে তুমি কেন ওই কথা বললে?”
বুড়িমানুষটি উত্তর দিলেন, “সে আর তোকে শুনতে হবে না। শুধু শুনে রাখ, তোর মায়ের মতো মানুষ হয় না।”
বুড়ির কথা শুনে আমার কেমন আশ্চর্য লাগল। তাই আমি জিজ্ঞেস করলুম, “একথা কেন বলছ? আমার মা যেমন আমাকে ভালবাসে, অন্য মায়েরা কি তাদের ছেলেদের তেমন ভালবাসে না?”

বুড়িমানুষটি আমার কথা শুনে ফোকলা মুখে চুকচুক করে উঠলেন। তারপর বললেন, “দুর ছাই, আমি কি সেকথা বলছি। সব মা-ই তাদের ছেলেমেয়েদের মন উজাড় করে ভালবাসে। কিন্তু তোর মা যে অন্যরকম মা।”
আমি থতমত খেয়ে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “অন্যরকম মানে?”
বুড়ি বললেন, “যাক সে আর তোকে শুনতে হবে না।”
এবার আমিও নাছোড়বান্দা। না-শুনে ছাড়ব না। কিন্তু আমি যতই সাধাসাধি করি, বুড়িমানুষটি ততই কথা ঘোরান। কিছুতেই বলেন না। আমিও ছাড়ি না।
এমনই করে অনেকক্ষণ ধরে ‘না-হ্যাঁ’ করে কথা কাটাকাটির পর বুড়ি বলতে রাজি হলেন। বললেন, “বলতে পারি একশর্তে, কিন্তু আমার কথা তোর মা যেন ঘুণাক্ষরে না জানতে পারে।”
আমি বুড়িমানুষটিকে আশ্বাস দিয়ে বললুম, “না, না, আমি কক্ষনও বলব না।”
“তবে শোন,” বলে বুড়িমানুষটি তাঁর গলার স্বর খুব নিচু করে ফিসফিসিয়ে বললেন, “ওই মা তোর আসল মা নয়। তুই জন্মাবার পর কেউ তোকে ফেলে দিয়ে গেছল আঁস্তাকুড়ে। তুই পড়ে পড়ে কাঁদছিলি। কাঁদতে কাঁদতে তুই হয়তো মরেই যেতিস। তোর এই মা দেখতে পেয়ে তোকে বুকে তুলে নেয়। সেই থেকে তুই এখানে আছিস। আসলে কী জানিস, তোর এই মায়ের মতো মানুষ না হয়ে অন্য কেউ হলে তোকে কি নিজের ঘরে নিয়ে আসত? জাত-ধম্ম বলে তো একটা কথা আছে! তোর জাত-ধম্ম বিচার না করেই এই মা তোকে বড়ো করে তুলেছে। বড্ড দয়ার শরীর তোর মায়ের। এমন মানুষ হয় না রে।”
বুড়িমানুষটির কথা শেষ হয়েছে, কী হয়নি, এমন সময় গুড়ুম-ম-ম, গুড়ুম-ম-ম করে দুটো বোমা ফাটার ভীষণ শব্দ শোনা গেল। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, তিনি, “সর্বনাশ শয়তানগুলো সত্যি-সত্যি মারদাঙ্গা শুরু করে দিয়েছে। জানলা বন্ধ করে দে, বন্ধ করে দে!” বলতে বলতে বুড়িমানুষটি এদিক ওদিক পা ফেলে কোথায় যে লুকিয়ে পড়লেন আমি আর দেখতে পেলুম না। ভেবে পাই না, বুড়ি কেন লুকোলেন। তবে, সেই ভীষণ শব্দে ঘরের দরজা-জানলাগুলো যেমন কেঁপে উঠল, তেমনই কেঁপে উঠল আমার বুক। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল “বাঁচাও, বাঁচাও” আর্তনাদ। আমি ভয়ে আঁতকে উঠলুম। আর ঠিক তখনই মায়ের মুখখানা আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল। আমি কেঁদে ফেললুম।
আমি যে কতক্ষণ ধরে কেঁদেছি জানি না। আমি যতক্ষণ কেঁদেছি, ততক্ষণ আমি মানুষের চিৎকার শুনেছি। আর শুনেছি, ঘর কাঁপানো ভয়ংকর শব্দের গুড়ুম-গুড়ুম। আমি কখনও ছুটে গেছি জানলায়, কখনও ছুটে এসেছি তালাবন্ধ ঘরের দরজার কাছে। তারস্বরে চেঁচিয়েছি, মা, মা বলে। কিন্তু দরজাও খোলেনি, মা-ও আসেননি।
দরজা ছেড়ে আবার আমি জানলায় এসে দাঁড়িয়েছি। বাইরে দেখি, দলে দলে লোক ছোটাছুটি করছে। কেউ মারছে। কেউ পালাচ্ছে। কারও হাতে ডান্ডা, কারও হাতে আগুন।
ঠিক এই সময়ে মায়ের পায়ের শব্দ শুনতে পেলুম আমি। ঘরের তালা খুলে মা ঘরে ঢুকে পড়লেন। কোনও কথা না-বলেই তিনি ঘরের দরজায় খিল দিয়ে দিলেন। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি, কী চেহারা হয়েছে মায়ের! হাঁপাচ্ছেন মা। সারা মুখে ঘাম। কপাল বেয়ে ঘাম টসটস করে ঝরে পড়ছে। মাকে অমন হাঁপাতে দেখে আমি মাকে জড়িয়ে ধরলুম। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কী হয়েছে মা?”
“আমি গির্জায় ফুল বেচতে যাই বলে, ওরা আমায় মারবে।” বলতে বলতে মায়ের গলা কেঁপে উঠল। কী ভীষণ উত্তেজনা।
আমি মায়ের গলাটি জড়িয়ে ধরার জন্যে হাত বাড়ালুম। কিন্তু পৌঁছল না আমার হাত অত উঁচুতে। উলটে মা নিচুতে মুখ বাড়িয়ে আমার গালে গাল ঠেকিয়ে কাঁপতে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলুম, “কারা মারবে মা তোমায়?”
“যারা মানুষ নয়!” মায়ের গলা যেন কেমন কঠিন স্বরে গর্জে উঠল।
মায়ের কথার আমি কিছুই মানে বুঝলুম না। তাই বোকার মতো জিজ্ঞেস করে বসলুম, “যারা মানুষ নয়, তারা কারা মা?”
মায়ের গলা রাগে গরগর করে উঠল, “তাদেরও আমাদের মতো দুটো হাত আছে, দুটো পা আছে, বুকের ভেতর প্রাণ আছে। সেই প্রাণ অন্যের প্রাণ নেয় রক্ত ঝরিয়ে। না-হয়, আগুনে ঝলসিয়ে। এই নৃশংস হত্যাকে ওরা বলে ধর্মযুদ্ধ।”
আমি মায়ের এত কথার একটা কথারও মানে বুঝলুম না। বাইরে তখনও চলছে চিৎকার। মারামারি। শব্দের কানফাটানো গর্জন। তারই মধ্যে মায়ের মুখের ওই ধর্ম কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমি অন্য কিছু না ভেবে মাকে জিজ্ঞেস করে ফেললুম, “মা, তোমার জাতধর্ম নেই?”
আমার কথা শুনে মা চমকে চাইলেন আমার দিকে। কেমন যেন চোখদুটো তাঁর সন্দেহে আমার মুখখানা দেখতে লাগল। আবছা গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “জাতধর্মের কথাটা তুই কার কাছে শুনলি?”
আমি কোনওদিনও মাকে মিথ্যে বলিনি। তাই আজও মিথ্যে বললুম না। আমি স্পষ্ট গলায় সত্যিকথাটা বলে দিলুম, “তুমি কাল যে বুড়িমানুষটিকে সঙ্গে এনেছিলে, তিনি বলেছেন।”
আবার গুড়ুম-ম-ম! একবার নয়, অগুনতিবার সেই শব্দ আমাদের ঘর কাঁপাল।
মা কানে আঙুল দিলেন শব্দের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে। তারপর সেই শব্দ যখন নিঝুম হয়ে এল, তখন মা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “সে তোকে আর কী বলেছে?”
“তুমি আমায় আঁস্তাকুড় থেকে কুড়িয়ে পেয়েছ। তুমি আমার কেউ নও। আমার কোনও জাতধর্ম নেই।”
আমার কথা শুনে মা থমকে গেলেন। আমার মুখের দিকে চাইলেন। চুপচাপ দেখলেন মুহূর্ত। তারপর বললেন, “তবে শোনরে ছেলে, আমারও কোনও জাতধর্ম নেই।” যেন কেমন একটা ভয় পাওয়া গা-ছমছম মায়ের গলার স্বর। দেখলুম, মায়ের মুখের চেহারাটাও পালটে গেছে ভীষণ রকম। আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দেখতে লাগলুম মাকে। আমার মুখে কথা এল না। মা-ই আবার বললেন, “সেই বুড়ি তোকে একটুও মিথ্যে বলেনি। আমি তোকে কুড়িয়ে পেয়েছি। তোর কী জাতধর্ম আমার জানবার দরকার পড়েনি সেদিন। দরকার পড়েছিল তোর মা হওয়ার। যে মা তোর প্রাণ বাঁচাবে। আমি সেই থেকে তোকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। তোর যাতে কোনও কষ্ট না হয়, সেইদিকে নজর রেখেছি সকাল-সন্ধে। কোনও দিনও ভাবিনি তুই আমার ছেলে নোস। আমিও তোর মা নই।” বলতে বলতে মায়ের কঠিন স্বরটা কেমন যেন নরম হয়ে গেল। মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল। আমিও ফুঁপিয়ে উঠলুম।
মা আমার কান্না দেখে তাড়াতাড়ি নিজের চোখের জল মুছে ফেলে আমায় আদরে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর এমন একটা কথা বললেন যা আমি কেন পৃথিবীর কোনও মানুষেরই আগেভাগে আঁচ করার সাধ্যি নেই। আমার মা আচমকা বলে উঠলেন, “কাঁদছিস কেন আহা শোন, শোন! বললে অবাক হয়ে যাবি আমারও মা আমাকে আঁস্তাকুড় থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। আমি যেমন বুকে জড়িয়ে তোকে মানুষ করেছি, তিনিও আমাকে তেমনই করে মানুষ করেছিলেন। তিনি কোনওদিনই বলেননি, তাঁর কী জাত, কী ধর্ম। আমারও জানা নেই আমার কী জাত, কিংবা কী ধর্ম। ওরে আহা, তুই আর আমি, দু’জনেই এই পৃথিবীর দুই জাত হারানো, ধর্ম হারানো মানুষ। শুধুই মানুষ। আমাদের জাত নেই, ধর্ম নেই বলে পৃথিবীর কোনওই ক্ষতি হয়নি। কিন্তু আমি গির্জায় ফুল বেচতে যাই বলে নাকি ক্ষতি হয়েছে ধর্মের। কোন ধর্মের ক্ষতি হয়েছে আমি জানি না। কিন্তু যারা ভাবছে ক্ষতি হয়েছে, তারাই রক্ত ঝরাচ্ছে খুনোখুনি করে।”
ঠিক সেই সময় একটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল আমাদের এই ঘরখানা। চমকে আমার চোখ পড়ে গেল জানলার দিকে। দেখি আগুন। সঙ্গে সঙ্গে মা-ও চিৎকার করে উঠেছেন, “আগুন! ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারবে।”
আমি আতঙ্কে অস্থির হয়ে বলে উঠলুম, “চলো মা, ঘর থেকে পালাই।”
মা ঘরের দরজার খিল খুলে ফেললেন চট করে। আমাকে আগলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন বাইরে। আমি দেখতে পাচ্ছি আগুনের ওপারে একদল লোক দাঁড়িয়ে আছে আমাদের মারবে বলে। আগুনের আভায় তাদের মুখগুলো কী বীভৎস দেখতে লাগছে। তারা আমাদের দেখতে পেয়েই চিৎকার করে উঠল, “মার, মার!”
মা আমাকে নিয়ে আগুন টপকাতে লাগলেন। আবার শব্দ উঠল, ‘গুড়ুম! গুড়ুম!
মা আমায় লুকিয়ে ফেললেন, তাঁর কাপড়ের আঁচল দিয়ে। তারপর আগুন টপকে বেরিয়ে এলেন বাইরে। আমাকে নিয়ে ছুট দিলেন।
একদল লোক ছুটে আসছে তাড়া করে।
আমরা ছুটছি প্রাণপণে।
শব্দ উঠছে গুড়ুম—গুড়ুম।
আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলুম, “ওগো তোমরা আমার মাকে মেরো না। আমাদের কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই। মা বলেছেন, আমরা শুধুই মানুষ। আমরা মরতে চাই না। আমাদের মেরো না, মেরো না, মেরো না।”
চিৎকার করে প্রাণপণে ছুটতে ছুটতে আমরা হারিয়ে দিলুম সেই শয়তান মানুষগুলোকে। তারা পিছিয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে আমরাও তাদের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলুম। কোথায় হারালুম জানি না। কিন্তু ভয়ে আমরা এখনও ছুটছি মা আর ছেলে। আর চেঁচাচ্ছি, “আমাদের মেরো না। আমরা বাঁচতে চাই! বাঁচতে চাই! বাঁচতে দাও!”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন