শৈলেন ঘোষ

সকাল হতে-না-হতেই লোটন-লোটন ঝোটন-চাচার ঘুম ভেঙে গেল। ভেঙে যেতেই পচা-বাঁশের মাচাটার ওপর উড়ে বসল। বসে গান জুড়ে দিল:
কোঁকর কঁই—কঁক কঁক কঁক?
মটর কঁই—কঁক কঁক কঁক?
ঝটর পটর মটর খাঁই,
তাক তুড়-তুড় নাচছি তাই।
বাব্বা! গান তো নয়, গলায় যেন খাঁই-খাঁই করে কাঁসর বাজছে। কানে তালা লেগে যাওয়ার গোত্তর।
সকালবেলায় ফুরফুরে হাওয়ায় যে শেষঘুমটা একটু শান্তিতে শেষ করবে, তার জো নেই। কাকে দোষ দেবে তুমি। সব মোরগের এক রা। এমনকী আমাদের এই ঝোটন-ঝোটন মোরগ পর্যন্ত। গান গাইতে গাইতে এমন মশগুল হয়ে পড়েছেন, কখন যে একটি কচ্ছপছানা এসে তাঁর সামনে হাজির হয়েছে, সেটি তাঁর খেয়ালই হয়নি। গুটি গুটি এসে ছানা ডাক দিয়ে বলে, “ও মোরগ-চাচা, চেঁচিয়ে-মেচিয়ে হচ্ছেটা কী?”
কচ্ছপের কথা তার কানেই ঢুকল না। ঢুকবে কেমন করে! এখন আকাশ-ভরা আলো আর সেই আলোয় ভেসে নরম বাতাস তার গলায় এমন সুড়সুড়ি দিচ্ছে, গান না গেয়ে থাকা যায়! চাচা-মিয়াঁর এখন একেবারে শরিফ মেজাজ। গান গাইতে গাইতে তার চোখ কপালে উঠল। কচ্ছপছানার দিকে তার নজরই গেল না চাচা গাইতেই থাকল:
নাচতে-নাচতে যেই না হাঁচি
কোথায় ছিল একটা মাছি,
নাকের ভেতর সুড়ুত—
হাসতে হাসতে উড়ুত।
কচ্ছপছানাটার মেজাজ গেল বিগড়ে। সে চোটপাট শুরু করে দিয়ে বললে, “বলি ও মিয়াঁ, গান থামাবে, না জান ছোটাবে? আমার দাদার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। বাড়াবাড়ি। তোমার চিৎকারে তার কষ্ট হচ্ছে।”

বাবা এর নাম গান। মেজাজ একবার এলে রক্ষে নেই। ইনফ্লুয়েঞ্জা-টিনফ্লুয়েঞ্জা ওসব কথা কানেই ঢোকে না। তাই মোরগ-চাচার গানও থামল না, নাচও ছাড়ল না। সে কোঁকর কঁই করে গেয়েই চলল:
উড়তে উড়তে কদম ডালে,
দেখছি বসে সামনে খালে,
সাঁতার কাটে হাঁসের ছানা,
ডুববাজি খায় উলটে ডানা।
এবার আর রাগ সামলাতে পারল না কচ্ছপছানা। সে মুখঝামটা দিয়ে কড়কে উঠল, “বলি এটা কী হচ্ছে? এর নাম কি গান? না কি গানের বদনাম? যেন লাঠালাঠি, ফাটাফাটি শুরু করে দিয়েছ! ধুত্তোর গানের নিয়ে কিছু করেছে।” বলে মুখ বেঁকিয়ে ভেংচি দিলে।
মোরগ-চাচার কানে কচ্ছপছানার কথা পৌঁছলই না, চাচা গান গেয়েই চলল।
কচ্ছপছানাটা আর থাকতে পারল না। রাগে জ্বলে গেল সে। বলল, “দাঁড়াও, তোমার গান বার করছি।” বলে সুড়সুড় করে পা চালিয়ে এগিয়ে গেল। মোরগ-চাচা বাঁশ-বাঁধা যে খুঁটিটার ওপর পা রেখে এতক্ষণ নেচেকুঁদে গান গাইছিল, তার গায়ে দিল ধাঁই করে এক ধাক্কা। ওমা। খুঁটিটা একদম পচা-পলকা! কচ্ছপের এক ধাক্কাতেই মড়াত করে পড়াত। মোরগ-চাচার তখন কোথায় গান, আর কোথায় কী। আচমকা ধাক্কা খেয়েই মাটির ওপর সড়াত! মস্ত এক ডিগবাজি!
তাই দেখে কচ্ছপছানাটার তখন সে কী কোচ্ছুপে হাসি। হেসে একেবারে কুটোকুটি।
হাসি শুনে ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে মোরগ-চাচা। ধমক দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কে র্যা?”
কচ্ছপছানাটা নাক বাড়িয়ে ঠাট্টা করল, “আমি র্যা”
বলতেই, মুখ ফিরিয়েছে মোরগ-চাচা। ফেরাতেই দেখে, একটা কচ্ছপ! “আরে তোবা, তোবা! সক্কালবেলাতেই অযাত্রার মুখ!”
অযাত্রা বলতেই কচ্ছপের কালো মতো মুখটা রেগে ফ্যাকাশে মতো হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, আমায় অযাত্রা বলা! দাঁড়াও দেখাচ্ছি। ভেবে, মোরগের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই দিলে ফ্যাঁচ-চ-চ করে হেঁচে। একেবারে তার মুখের ওপর। হেঁচে দিয়ে বলল, “কেমন লাগল অযাত্রার হাঁচিটা? মিষ্টি, না টক? আমার নাম বাগুম-বাগুম কাচ্চু। আর একবার বলো অযাত্রা, আবার দেব হাঁচ্চু! আ গেল্ল যাঃ! বেআক্কেলে কোথাকার! বলছি আমার দাদার অসুখ, বাড়াবাড়ি, তা, ওনার কানে ঢুকছে না। ফের যদি করো চিল্লাচিল্লি লেলিয়ে দেব হুল্লোবিল্লি! আমাকে চেনেন না।” বলে এমন তড়পে উঠল যে, মোরগ-চাচা চুপ! মুখ চুন করে দেখতে লাগল, গুট-গুট করে কচ্ছপছানাটা ফিরে যাচ্ছে। মুখে তার তখনও শোনা যাচ্ছে। গজগজানি।
বাবা, যাকে-তাকে অযাত্রা না বলাই ভাল। কে আবার মুখে হেঁচে দেয় কে জানে! ঘেন্না! ঘেন্না!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন