শৈলেন ঘোষ

তার নাম সুলতান। একটি বাহাদুর ছেলে। সুলতানকে যদি দেখতে চাও, তোমাকে যেতে হবে অনেকদূরে। অনেকটা পথ রেলগাড়ি চেপে। অনেক নদী ডিঙিয়ে, পাহাড়ে পাহাড়ে। সেই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চিনার গাছের আড়াল থেকে তুমি যদি চোখ মেলে ওই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাক, তোমার তখন ঠিক নজরে পড়বে সেই বরফের ওপর। বরফ, পাহাড়ের মাথায়। সূর্যের আলো পড়েছে। বরফ গলছে। নেমে আসছে নীচে। কোথাও সে নদী। কোথাও বা ঝরনা। চলো না, ওই ঝরনার ধারে যাই। উঁহুঁ! বললেই তো আর ওখানে যেতে পারবে না। পাহাড়ের উঁচু-নিচু পাথর ডিঙিয়ে অনেকখানি চড়াই-উতরাই করতে হবে তোমাকে। তারপর তুমি পাহাড়ের গায়ে দেখতে পাবে কত কুঁড়েঘর। ওইখানেই সুলতান থাকে। থাকে সুলতান, সুলতানের আম্মা, আব্বা। ওদের একটা ঘোড়াও আছে। সুলতানের আব্বা রোজ ঘোড়া নিয়ে শহরে যায়। এই পাহাড়ি-দেশে দূর দূর দেশ থেকে কত মানুষ বেড়াতে আসে। পাহাড়ের ওপরে একটা নীলহ্রদ আছে। তারা দেখতে যায় সেই হ্রদ। ঘোড়া ছাড়া সেখানে তো যাওয়া যায় না। আরও অনেক ঘোড়াওয়ালার মতো সুলতানের আব্বাও দূর দেশের যাত্রীদের নীলহ্রদের দৃশ্য দেখাতে নিয়ে যায় তার ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে। পয়সা পায়। তাতেই তাদের চলে যায়।
সুলতানকে কী সুন্দর দেখতে। ডাগর ডাগর চোখ। তেমনি গায়ের রং। গালদুটি পাকা আপেলের মতো। টুকটুক করছে। ঠোঁট দুটিতে হাসি উপচে পড়ছে। কিন্তু এই দুরন্ত শীতে বেচারির যে-জামাটা গায়ে আছে, তাতে যে শীত কতটা মানছে, তা সে ওই-ই জানে। তা হোক, তবু শীতকে সুলতান একটুও ভয় পায় না। এই শীতের সকালেও সুলতান রোজ পাহাড়ের পাথরে পাথরে লাফ দিয়ে ওই ওপর থেকে নেমে আসে নীচে। ফারগাছের বনে। আনন্দে চিৎকার করে গান গায়। তারপর হাওয়ায়-দোলা ফারগাছের পাতার মতো ছটফটিয়ে ঝরনার ধারে ছুটে যায়। সেখানে ওর বন্ধু কাশিম ভেড়া চরায়। তার সঙ্গে কত গল্প করে। আর যে-ভেড়াটা এইটুকুনি ছোট্ট, তাকে কোলে নিয়ে এমন আদর করে যে, সে আর কোল থেকে নামতেই চায় না।
একদিন হল কী, সুলতানের আব্বাজানের খুব জ্বর হল। জ্বরের আর দোষ কী! সেই কোন সকালে উঠবে মানুষটা। ঘোড়াকে ছোলা-দানা খাইয়ে বেরিয়ে পড়বে শহরে। ফিরবে সেই সাঁঝের বেলা। হল-হল, তা এমন হল জ্বর, ছাড়তেই চায় না। ঘরে যা পয়সা ছিল, তা-ও প্রায় শেষ। অগত্যা ডাক পড়ল সুলতানের।
“সুলতান!” আব্বাজান জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে ডাক দিল সুলতানকে।
“কী?” সুলতান ছুটে এল আব্বাজানের কাছে।
“তোকে শহরে যেতে হবে। আমার মতো ঘোড়ার পিঠে যাত্রী নিয়ে তোকে পয়সা উপায় করে আনতে হবে। পারবি না?”
সুলতানের গায়ে কাঁটা দিল। এ যে স্বপ্ন। সে যে কতদিন এই স্বপ্নই দেখেছে। সে যে কতদিন শহরে যেতে চেয়েছে। কিন্তু পারেনি। আব্বা তাকে নিয়ে যায়নি। আর আজ আব্বাই তাকে শহরে যেতে বলছে! আনন্দে সুলতান চিৎকার করে উঠল, “আব্বাজান, আমি পারব, নিশ্চয়ই পারব।”
সুলতানের খুশি-ঝলমল মুখখানি দেখে আব্বার চোখদুটি ছলছল করে উঠল। ছেলের চিবুকটি একটু ছুঁয়ে আদর করে বলল, “আমি জানি তুই পারবি। তুই যে আমার ছেলে।”
পরের দিন আব্বার মতো খুব সকাল সকাল উঠল সুলতান। ঘোড়াকে ছোলা-দানা খাওয়াল। গায়ে সেই ছেঁড়া পশমি কোটটা চড়িয়ে, ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটা দিল। পিঠে চাপল না। কষ্ট হবে যে ঘোড়ার। সে কোনওদিন তার আব্বাজানকেও দেখেনি ঘোড়াকে কষ্ট দিতে। সুলতানের আম্মা ছেলের জন্য ক’টা রুটি, একটু তরকারি করে রেখেছিল। রুটি-তরকারি সঙ্গে নিল সুলতান। তারপর আম্মার বুকে মাথা রেখে, একটু আদর করে হাঁটা দিল।
অনেকটা হাঁটার পর শহরের পথে পা দিল সুলতান। আকাশে এখন রোদের ছড়াছড়ি। রোদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি-দুটি মানুষও এবার নজরে পড়ছে। কেউ সুলতানকে দেখে অবাক হচ্ছে। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছে। হাসবারই কথা। ওইটুকু একটা পুঁচকে ছেলে অত বড় একটা ঘোড়া নিয়ে কেমন গুটি গুটি হেঁটে চলেছে!
হাঁটতে হাঁটতে শহর এসেই পড়ল। পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট শহর। এখানে কত মানুষ। কত দোকান। কত রকমের পসরা! চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তার ধারে একটা উইলো গাছের নীচে একটু বসল সুলতান। তার বাড়ির থেকে শহর তিন ঘণ্টার পথ। একটু তো কষ্ট হবেই। আম্মা যে রুটি ক’টা দিয়েছিল, খেয়ে নিল। ঘোড়াটাও আপনমনে ঘাস চিবুতে শুরু করে দিয়েছে। খাওয়া শেষ হতেই সুলতানের মনে হল, তাই তো, এবার সে কী করবে! সেই নীলহ্রদ কোন পথ দিয়ে যেতে হয়, কোথায় নীলহ্রদের যাত্রী মিলবে, সে তো কিছুই জানে না। তাই বলে এমনই করে বসে থাকলে তো চলবে না। সে উঠে দাঁড়াল। ঘোড়ার লাগাম ধরে বেশ খানিকটা হাঁটতেই কেমন যেন শোরগোল শুনতে পেল সুলতান। কোনদিক থেকে আসছে গোলমালটা। মনে হচ্ছে ওইদিক থেকে আসছে। সেইদিকেই পা চালাল।

ঠিক তাই। একটু যেতেই চৌরাস্তার মোড়। হ্যাঁ সামনেই বাজার। আর ওই দ্যাখো, ওইদিকে তারই মতো কত লোক ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁক দিচ্ছে, “নীল হ্রদ যাবে, নীল হ্রদ।”
আর দেখতে হয়, সুলতান কী খুশি! সে ঠিক বুঝতে পেরেছে, ওইখানে দাঁড়িয়ে তাকেও ওদের মতো ডাক দিতে হবে। ঠিক তাই, সে-ও ওইখানে পৌঁছে হাঁকতে শুরু করে দিল, “নীল হ্রদ যাবে, নীল হ্রদ।”
আর যায় কোথা! ওখানে ঘোড়া নিয়ে ওই যে লোকগুলো যাত্রী খুঁজছিল, একটা বাচ্চা ছেলের গলা শুনে চমকে তাকাল তার দিকে। সুলতানকে দেখে তারা যেন জ্বলে উঠল। ভাবল, ছেলেটা কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল! তাদের খদ্দের ভাঙিয়ে নিচ্ছে! একজন তেড়েমেড়ে এগিয়ে এসে কড়কে উঠল, “এই পুঁচকে, এখানে কী করছিস? হাট এখান থেকে!”
সুলতান দেখল সবাই তার চেয়ে বড়। তাই হাসিমুখে নরম গলায় উত্তর দিল, “আমার আব্বাজান এখানে রোজ আসে। খুব অসুখ আমার আব্বাজানের। আজ আসতে পারেনি। তার বদলে আমি এসেছি। আমার আব্বাজানের নাম ওসমান।”
অন্য আর একটা লোক খেঁকিয়ে উঠল, “আমরা ওসব ওসমান-টোসমান কাউকে চিনি না। এটা মগের মুল্লুক নাকি! যে আসবে সে-ই কারবার চালু করে দেবে! যা ভাগ এখান থেকে! বেশি ঝামেলা করিস না। কথা না শুনলে এই দেখছিস।” বলে লোকটা ঘোড়া ঠেঙাবার চাবুকটা ওর দিকে তুলে দেখাল।
চাবুক দেখেই সুলতানের মেজাজ গেল বিগড়ে। কী, তাকে চাবুক দেখিয়ে শাসানো! থাকতে পারল না সুলতান। সে-ও তেমনই চড়া-গলায় বলে উঠল, “এটা কি তোমাদের কেনা কাজের জায়গা? আমি যাব না এখান থেকে। আমিও এখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকব। দেখি আমাকে কেমন করে চাবুক মারো!” বলে সুলতান খুব জোরে জোরে হাঁক দিতে লাগল, “নীল হ্রদ যাবে, নীল হ্রদ।”
সঙ্গে সঙ্গে সুলতানকে এক ধাক্কা মেরেছে সেই লোকটা। সুলতান অতবড় একটা ধুমসো লোকের ধাক্কা কখনও সামলাতে পারে? ছিটকে পড়ে গেল। পড়েই মুহূর্তে উঠে পড়েছে! ছুটে গিয়ে একেবারে লোকটার বুকের ওপর ধাঁই করে একখানা ঘুঁষি চালিয়ে দিয়েছে। লোকটা ঘুঁষি খেয়েই সুলতানের গলাটা টিপে ধরল। এই বুঝি সুলতানের দম আটকে যায়! অমনই তার সঙ্গীরা হম্বিতম্বি লাগিয়ে দিল “মার, মার!”
ঠিক সেই সময়, তাই দেখে, একজন ভিনদেশি যাত্রী ছুটে এসে সুলতানকে ছাড়িয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আচ্ছা লোক তো তোমরা, বাচ্ছাটাকে মেরে ফেলবে নাকি।”
লোকটা উত্তেজনায় হাঁফাতে হাঁফাতে চেঁচিয়ে উঠল, “মারব, আলবত মারব! কালকের ছেলে আমার গায়ে হাত তোলে! একদম খতম করে ফেলব।”
যাত্রীটি বললেন, “আরে ভাই তুমিই তো একে আগে ঠেলে ফেলে দিলে।”
“ও এখানে দাঁড়াবে কেন?” লোকটা রাগে গর্জে উঠল।
“বেশ করব।” সুলতানও চেঁচিয়ে উঠেছে, “আমার আব্বাজান রোজ এখানে ঘোড়া নিয়ে আসে। আমার আব্বাজানের অসুখ করেছে বলে আমি এসেছি। আমি এখানে দাঁড়াব, আলবত দাঁড়াব।”
না, তোমাকে বলতেই হবে সুলতানের সাহস আছে। হয়তো সুলতানের সাহস দেখে সেই ভিনদেশি যাত্রীটির তাকে ভাল লেগে গেল। তাই তিনি বললেন, “ঠিক আছে, চলো, তোমার ঘোড়ার পিঠে চেপে আমি নীল হ্রদে যাব।”
অন্য ঘোড়াওলারা সঙ্গে সঙ্গে হাঁ-হাঁ করে উঠল, “না সাব, ওর ঘোড়ায় নীলহ্রদে যাবেন না। বে-আইনি হবে। আমাদের ঘোড়া নিন।”
“বে-আইনি কেন?”
“ওকে আমরা চিনি না।”
ভিনদেশি বললেন, “ঠিক আছে আমি নীলহ্রদে যাব না। আমি ওর ঘোড়ায় চড়ে শহরে ঘুরব।”
ভিনদেশির এই কথা শুনে অন্য ঘোড়াওয়ালারা আর কথা বলতে পারল না। তাদের চোখের সামনেই সুলতানের ঘোড়ার পিঠে চেপে ভিনদেশি যাত্রীটি শহরে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লেন। সেই লোকগুলো এখন কিছু করতে না-পারলেও ওদের মুখে-চোখে যে রাগ ফেটে পড়ছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না।
সেই তখন থেকে যতক্ষণ না শহর ঘোরা শেষ হয় ভিনদেশি যাত্রীটি ততক্ষণ সুলতানের ঘোড়ার পিঠে হাঁটলেন। হাঁটতে হাঁটতে কত গল্প হল সুলতানের সঙ্গে। তার ঘরের কথা। তার বাবার কথা, মায়ের কথা। আরও কত কী। শেষমেশ, যখন বেড়ানো শেষ হল, ভিনদেশি যাত্রীটি সুলতানের হাতে একটা অনেক টাকার বান্ডিল দিয়ে বললেন, “এটা তোমার আব্বাজানকে দিয়ো!”
সুলতান যে কী খুশি, কী বলব। কোটের পকেটে টাকার বান্ডিলটা পুরে ফেলে বারবার সেলাম করতে লাগল সেই যাত্রীটিকে। তারপর প্রায় লাফাতে লাফাতে ছোটা দিল ঘরের দিকে।
কিন্তু সুলতানের পিছু নিয়েছে দুশমন। সেই অন্যদের ঘোড়াওলারা প্রতিশোধ নেবার জন্যে ওত পেতে বসেছিল এতক্ষণ। আর তাই সুলতান ঘরের দিকে পা বাড়াতেই তারাও নিঃসাড়ে সুলতানের পিছু পিছু এগিয়ে চলল। যে-পথ ধরে এসেছিল সুলতান, সেই পথ ধরেই আবার ফিরে চলল। এবার তাকে একটু পা চালিয়েই হাঁটতে হবে। একটু পরেই সন্ধে নেমে আসবে। সন্ধের আগেই ঘরে পৌঁছতে না-পারলে, পাহাড়ি-পথে কোথায় কী বিপদ হয়, কে বলতে পারে। কিন্তু সুলতান তাড়াতাড়ি হাঁটবে কী, বেচারি যে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! সেই কোন সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছে। তারপর থেকে হাঁটছে তো হাঁটছেই। এখন যেন আর পা চলতেই চাইছে না। তবু খানিকটা হেঁটে এল সে। তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। আর বলব কী, অমনই সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া পাহাড়-ভাঙা পথের ওপর ছোটা দিল।
কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ছুটতে হল না। শহর পেরিয়ে একটা নির্জন ঘুপচিমতো জায়গায় পৌঁছতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সুলতান। দেখে তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকগুলো। তাদের চোখে ঝলসে উঠছে হিংসার আগুন। সুলতানের চোখ বিস্ফারিত। তাদের মুখে ভয়ংকর হাসি। সুলতানের বুকখানা সাহসে ফুলে ওঠে।
“কী চাই তোমাদের?” ঘোড়ার পিঠে বসে স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করল সুলতান।
“হা-হা-হা!” তারা বিকট স্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, ‘টাকাগুলো কোথায়?”
“টাকা আমার। আমি রোজগার করেছি! দেব না।” চড়াগলায় উত্তর দিল সুলতান।
তারা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “খুদে শয়তান, বেশি বাড়াবাড়ি করলে, ওই খাদে ছুড়ে ফেলে দেব। ভালয়-ভালয় টাকাগুলো বার করে দে।”
“যাও যাও! ভয় দেখাবে অন্যলোককে!” বুক ফুলিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে রইল সুলতান।
“এ্যাঁ! রোখ দেখাচ্ছিস!” বলে একটা লোক চকিতে সুলতানের ঘাড়টা থাবড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠ থেকে ওকে নামাবার জন্যে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিল। আর ওই দ্যাখো, ঘোড়াটা চিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠেছে। মেরেছে লাফ, একেবারে লোকগুলোর ঘাড়ের ওপর। তারপর সে কী চিৎকার তার। কী লাফালাফি। দেখে মনে হচ্ছে, খেপেছে ঘোড়া! আর কে দাঁড়ায় ওখানে। পালা, পালা। যে যেদিকে পারল মারল ছুট। এই রে! ওই দ্যাখো একটা লোক ছুটতে গিয়ে পা ফসকাল। মারল ডিগবাজি। বে-টাল হয়ে পড়ল গিয়ে এক্কেবারে খাদের নীচে, “আ-আ-আ-আ!” যাঃ! কী হবে!
এবার কিন্তু সুলতানও ভয় পেয়ে গেছে। সে তো এমন করে কোনও মানুষকে কোনওদিন খাদে পড়ে যেতে দেখেনি। তার ওপর তার ঘোড়ার জন্যেই তো এই কাণ্ড! লোকটা যদি না বাঁচে!
সুলতানের ঘোড়া পাহাড়ি-রাস্তায় তিরবেগে ছুটতে লাগল। যেন বোবা হয়ে গেছে সুলতান। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে সুলতান হাঁফাচ্ছে যেন!
ঘরের কাছাকাছি এসে পড়েছে সুলতান। যতই সে এগিয়ে আসছে, ভয়ে যেন ততই কুঁকড়ে যাচ্ছে। কী বলবে সে আব্বাজানকে। উফ! তার চোখের সামনে একটা জীবন্ত মানুষ একটা গভীর খাদে পড়ে গেল! কী ভয়ংকর!
ঘরের সামনে এসে ঘোড়া থামল। নামল সুলতান। হুমড়ি খেতে খেতে ছুটে গেল ঘরের ভেতর।
“সুলতান!” বিছানায় শুয়ে শুয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল তার আব্বাজান।
“আব্বাজান।” ভীষণ ভয়ে আঁতকে উঠে সুলতান আব্বাজানের বুকের ওপর ছিটকে পড়ল।
সুলতানের আম্মাও ছুটে এল, “কী হল?”
সুলতান কোনও কথা বলতে পারল না। তার কোটের পকেট থেকে টাকার বান্ডিলটা বার করে সে আম্মার দিকে হাত বাড়াল। আম্মা টাকাটা হাতে নিতেই কেঁদে উঠল সুলতান। মনে হল, সেই ক’টা হিংসুটে মানুষ যেন এখনও তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে, “হা-হা-হা!”
আম্মা তাকে টেনে নিল নিজের কোলে। আদর করল। চোখের জল মুছে দিল। তবুও কেমন যেন তির তির করে কাঁপতে লাগল তার বুকের ভেতরটা। সে আম্মাকে জড়িয়ে ধরল জোরে, আরও জোরে। তারপর বোবা হয়ে চেয়ে রইল আম্মার মুখের দিকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন