আলোর সন্ধান

শৈলেন ঘোষ

এখন রাত। নিথর। নির্জন।

এ ছিল এক শহর। ছিমছাম। সাজানো। এখন সাড়া নেই। কেননা, এ শহর এখন যুদ্ধের আগুনে ঝলসে গেছে। যেটুকু সাড়া আছে, সে ওই নদীর না-হয় বাতাসের। বাতাস দোলা দেয় নদীর বুকে। ঢেউ ওঠে। ছলাৎ ছলাৎ। সে শুধু জলের শব্দ। আর কিছু নয়। কে জানে নদী কথা বলতে পারে কি না। যদি পারত, তবে হয়তো তোমার কানে কানে সে বলত, “দ্যাখো, দ্যাখো আমার জলের নীচে ডুব দিয়ে কে লুকিয়ে আছে।”

সত্যি নাকি! কে লুকিয়ে আছে!

এখনই যদি চোখ তুলে চাও আকাশে, দেখবে, এ আকাশ এখন চাঁদের দখলে। খানিকটা ভাঙা সেই চাঁদ। ভাঙা চাঁদের ভাঙা আলো আবছা আবছা ছড়িয়ে পড়েছে শহরের চারদিকে। যুদ্ধে চুরমার ধ্বংসস্তূপের ওপর। কোথাও ডাঁই হয়ে আছে সেই স্তূপ। কোথাও ছত্রাকার হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ধ্বংসের এপাশ যদি মরা আলোয় চোখ ধাঁধায়, তবে ওপাশ কালো ছায়ায় বুক কাঁপায়। এই আলোছায়ায় কেমন যেন গা-ছমছম রহস্য ছড়ানো। সবখানে।

না, এমন জনমানবহীন ঝিমধরা ছিল না এ শহর কোনওদিনই। ছিল যেমন মানুষের কোলাহল, তেমনই গাড়িঘোড়ার হুটোপাটি। ছিল বড় বড় ঘর-বাড়ি, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, কলকারখানা, অফিস-কাছারি, বাজারহাট, দোকানপাট—একেবারে হইহই ব্যাপার। এখন আর কিছুই নেই। আকাশ কাঁপিয়ে ধেয়ে এসেছে বিধ্বংসী রকেট। না-হয় পড়েছে বোমা। নয়তো মাটি কাঁপিয়ে তেড়ে এসেছে রাক্ষুসে ট্যাঙ্ক। গুঁড়িয়ে দিয়েছে সামনে যা দেখেছে তা-ই। এখন খুঁজতে খুঁজতে তোমার চোখ হয়রান হয়ে গেলেও দেখা পাবে না একটি প্রাণীরও। থমথমে নিঃসাড় দিকবিদিক। চাঁদের ওই আলোও যেন আবছায়ায় ভয় দেখাচ্ছে। চোখ মটকিয়ে।

কিন্তু এ কী! হঠাৎ এমন চমকে উঠলে কেন?

ওঠারই তো কথা। হঠাৎ যদি এই চুর্ণ-বিচূর্ণ শহরের স্তূপাকারের আড়াল থেকে ভেসে আসে রবাবের মিষ্টি সুর, তবে কে না চমকায়!

বটেই তো! ওই তো শোনা যায়, তারে-বাঁধা বাজনাটার মিষ্টি সুর কেমন নিস্তব্ধতা ভেঙে মৃদুমৃদু কানে আসে! কে বাজায় এমন সুর এই ভয়ংকর রাতে?

ও বাবা, সত্যিই তো, ওই দ্যাখো ওই নদীর ডুবন্ত জলের তল থেকে কে যেন হঠাৎ হঠাৎ মাথা তুলছে! কী আশ্চর্য, একটি ছেলে! কে জানে তোমার মতো কি না! ওই ছেলেটিও কি তবে শুনতে পেয়েছে ওই রবাবের সুর! ওর নাম কি আমিন?

ঠিক ধরেছ। ইস্কুলের লাগোয়া ওই যে বোর্ডিং বাড়িটা জ্বলন্ত রকেটের গোঁত্তায় গুঁড়িয়ে গেছে, ওই বোর্ডিং বাড়িতেই থাকত আমিন। ওই ইস্কুলেই পড়ত। যুদ্ধের হাওয়া হু হু করে বইতে শুরু করল যখন, তখন ইস্কুলও হল বন্ধ। বোর্ডিংও ফঁকা। খুদে-পড়ুয়ার দল চলে গেল বাবা-কাকার হাত ধরে বাড়িতে, নিরাপদ আস্তানায়। কথা ছিল আমিনেরও বাবা আসবেন। বাবার সঙ্গে আমিনও বাড়ি যাবে। কিন্তু একে একে আমিনের সব সঙ্গীই চলে গেল। পড়ে রইল আমিন একা পথ চেয়ে। তার বাবা এলেন না। যুদ্ধের বিপদ যখন ঘাড়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তখন কে আর কাকে দেখে! যে পালায়, সে বাঁচে। সবাই পালাল। আমিন যে একা পড়ে রইল, কার নজর যাবে সেদিকে!

ছেলেটার কপাল বলতে হয়, বোর্ডিং বাড়িটার ওপর যখন সর্বনাশা রকেটটা ছিটকে পড়ল, তার খানিক আগেই সে বেরিয়ে পড়েছিল বাইরে। বাইরে তখন শত্রুসেনার তাণ্ডব চলছে। সৈন্যদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে লুকোবার জায়গা কোথায় তার! তাই সে নদীর জলেই ডুব দিয়েছে। অবিশ্যি, নদীর জলের নীচে কার সাধ্যি সারাক্ষণ দম আটকে লুকিয়ে থাকে। সুতরাং, যতক্ষণ সে ডুবে থাকে, তার চেয়ে বেশিক্ষণ তাকে মুখ তুলে দম নিতে হয়। তখনই তার কানে আসে রাবাবের সেই আলতো সুরের ঝংকার। চমকে ওঠে সে। মনে মনে ভাবে, এ কী অবাক কাণ্ড! এই খানিক আগে কানফাটানো বোমার শব্দে চারদিক থরথর করে কাঁপছিল, এখন শোনা যায় বাজনা! কে বাজায় এমন সুর। যে বাজায় তার ভয়ডর নেই!

না, আর জলে ডুবে থাকল না আমিন। বুক ছমছম ভয়টা এখনও তার বুকে আটকে আছে। তবু সে উঠে এল জল থেকে। ভিজে ঢোল। ভিজে যেমন সপসপ করছে জামা-প্যান্ট, তেমনই জলে জবজব করছে মাথা থেকে পা অবধি। মাথার চুল এলোমেলো হয়ে নেতিয়ে পড়েছে কপালের ওপর। চেনাই যায় না ছেলেটাকে।

ছলাৎ ছলাৎ করে নদীর পাড় ডিঙিয়ে সে অনেকটা এগিয়ে এল ভয়ে ভয়ে। ত্রস্ত চোখে সে দেখতে লাগল চারদিক। জ্যোৎস্নার আধো-আলোয় ধ্বংসের জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। নেই মানুষ। তাই নেই কোনও হাঁকডাক। শুধুই শোনা যায় সেই সুর। কোন দূর থেকে যেন ভেসে আসছে।

কী করবে এখন আমিন? কেমন করে কোথায় যাবে এই ধ্বংসস্তূপের পাহাড় ডিঙিয়ে? কাকে বলবে, তাকে একটু আশ্রয় দেওয়ার জন্যে? চতুর্দিক শূন্য। মনে হচ্ছে, সে যেন একাই বেঁচে আছে এই শহরে। না, বোধহয় বেঁচে আছে আরও একটি মানুষ, যে রবাব বাজায়!

কেমন অদ্ভুত মানুষ সে! বোধহয় পাগল। নইলে এই ভীষণ দুঃসময়ে কেউ মনের আনন্দে বাজনা বাজায়? কোথায় বাজায় সে?

তবু ভাল বলতে হয়, ওই বাজনার শব্দই যেন খানিক সাহস জোগায় আমিনকে। সে কান পাতে। তবু বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক কোনদিক থেকে ভেসে আসছে সুরের ঝংকার। তাই সে ধসেপড়া ঘর-বাড়ি ইট-পাটকেলের ওপর পা ফেলে এগিয়ে যায়। খুঁজতে থাকে সেই বাজনদারকে। সে যতটা এগোয়, হয়তো পিছিয়ে পড়ে ততটাই। তখন সে দাঁড়ায়। চমকে তাকায়। সামনে, না-হয় পেছনে।

কিন্তু কই? পেছনে-সামনে, ডাইনে-বাঁয়ে কেউ নেই তো। শুধু একা আমিন ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় এই রাতের আলো-আঁধারের ছায়ায় ভাঙাচোরা পথ ধরে। তবু শব্দ শোনা যায়। যদি মনে হয়, এই বুঝি সুরের কাছাকাছি চলে এসেছে সে, পরক্ষণেই মনে হয়, না তো, সুর তো দূরেই বাজছে! সত্যি বলতে কী, ছেলেটা যেন ধাঁধায় পড়ে চরকি খাচ্ছে। এ কী আজব কাণ্ড! ভাবলে থরথর করে কেঁপে ওঠে বুক!

ছেলেটা একনাগাড়ে অনেকক্ষণ এমনই করে এগিয়ে পিছিয়ে হাঁপিয়ে পড়ল। শেষমেশ পা যেন আর চলতে চায় না। এখন যদিও তার প্যান্ট-জামা থেকে ঝরঝর করে জল ঝরছে না, তবুও বলা যাবে না, গায়ের পোশাক তার শুকিয়ে খটখট করছে। অবশ্য সেদিকে তার মন নেই। মন তার শব্দের খোঁজে আকুল এখন। কোন পথ ধরে হাঁটলে যে সে বাজনদারের কাছে পৌঁছতে পারে তার হদিস সে কিছুতেই করতে পারছে না। তবু হাল ছাড়ল না। হোঁচট খেতে খেতে সে এদিক ওদিক হাতড়াতে লাগল। তারপর পা যখন তার সত্যিই বেঁকে বসল, তখন তাকে থামতেই হল। বসে পড়ল সামনে, ছড়িয়ে-পড়া জঞ্জালের ওপর। আঃ!

না, আরাম করে তার জিরিয়ে নেওয়া হল না। সামনে চোখ পড়তেই সে থতমত খেয়ে গেছে। ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ক্ষয়া চাঁদের আবছা আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল সামনেই পড়ে আছে এক সৈনিক। প্রাণহীন। তার হাতের মুঠি আলগা। হাতের সেই আলগা মুঠিতে কী ওটা?

একটা কাগজ।

ভাবো একবার সেই দৃশ্যটা! এদিকে ওদিকে পড়ে আছে ধ্বংসের চাঙড়। সেই চাঙড়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে আছে এক মৃত মানুষ। কেউ কোত্থাও নেই। সুনসান চারদিক। এমন দৃশ্য দেখলে শুধু আমিন কেন আচ্ছা-আচ্ছা জাঁদরেল মানুষেরও ধাত ছেড়ে যাবে। আমিন তো কালকের ছেলে। ভয় তো সে পাবেই।

কিন্তু ভয় পেলেও সে পালাল না। মৃত সৈনিকের হাতে-ধরা ওই কাগজখানা নেওয়ার জন্যে তার মন উশখুশ করতে লাগল। দোনোমনা করতে করতে একবার সে এগোচ্ছে, একবার পেছোচ্ছে। আর মনে মনে ভাবছে কী আছে ওই কাগজে।

শেষমেশ সে আর থাকতে পারল না। চোখের পলকে সে কাগজখানা ছোঁ মেরে তুলে নিল সৈনিকের হাত থেকে। তুলে নিয়েই দে ছুট।

অনেকটা ছুটে এল সে। গাদা গাদা ছাইপাঁশ টপকে সে অনেকটা রাস্তা পার হয়ে এসেছে। হাঁপাচ্ছে। বসে পড়ল সে। সেই বাজনা কিন্তু এখনও থামেনি। তার অবশ্য বাজনার দিকে কান নেই এখন। মন এখন তার হাতের ওই কাগজটার দিকে। কাগজটা ভাঁজ করা। ঝটপট খুলে ফেলল। কিন্তু পড়তে পারল না। চাঁদের এই আবছা আলোয় লেখার অক্ষরগুলো ভীষণ ঝাপসা লাগছে। পড়ে কার সাধ্যি। অথচ পড়ার জন্যে মন এমন অস্থির হচ্ছে যে, সে বসতে পারল না একদণ্ড। আলোর খোঁজে সে ব্যস্ত হয়ে এধার-ওধার করতে লাগল।

আলো আর কই? গোটা শহরটাই তো অন্ধকারে ডুবে আছে। যেটুকু আলো দেখা যায়, সেটুকু ওই চাঁদই যা ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা হচ্ছে, সেই বাজনা একটানা বেজেই চলেছে। এমন যে ভয়ংকর যুদ্ধের আঘাতে শহরটা ভেঙে তছনছ হয়ে গেল, সেদিকে খেয়াল নেই বাজনদারের। কে এই মানুষটা?

আবার কান চলে যায় আমিনের ওই সুরের দিকে। এই বিপদকালে একটা মানুষই বাজনা বাজিয়ে জানান দিচ্ছে, সে বেঁচে আছে। আমিন ভাবল, ওই মানুষটার কাছে পৌঁছতে পারলে নিশ্চয়ই আলোর সন্ধান পাবে সে। তখন পড়েও ফেলতে পারবে কাগজের লেখা।

সে তো সবাই জানে, আলো ছাড়া পড়া যাবে না এই কাগজ। কিন্তু অবাক কথা হচ্ছে, তখন থেকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও যে আমিন মানুষটার দিশা পাচ্ছে না। জঞ্জাল ধামসাতে ধামসাতে পায়ের ছালচামড়া আর আস্ত নেই। জ্বালা করছে। আর কত আঁতিপাতি করবে!

হঠাৎ যেন আমিন শুনতে পেল একসঙ্গে অনেক মানুষের গলার স্বর! পায়ের শব্দ। কারা যেন এদিকেই আসছে! মনে যেন খানিক বল পেল আমিন। ভাবল, এবার বোধহয় অসময়ের সঙ্গীর খোঁজ পাবে সে। তাই সে অতি উৎসাহে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু তাদের দিকে নজর পড়তেই ধক করে উঠেছে তার বুকের ভেতরটা! কারণ তার স্পষ্ট মনে হল, তাকে তাক করে তেড়ে আসছে ক’জন শত্রুসেনা। ভীষণ ভড়কে গেল আমিন। আর কিছু ভেবে না-পেয়ে সে মারল ছুট।

তাকে ছুটতে দেখে সৈনিকের রুক্ষ গলা গর্জে উঠল, “হল্‌ট!”

“হল্‌ট” মানেটা যে কী সেটা আমিনের ভালই জানা। না, সে দাঁড়াল না। সে ইট-পাথরে হুমড়ি খায়। না-হয় ঠোক্কর। তবু সে ছোটে।

কিন্তু আবার তার কানে এল সৈনিকের কর্কশ গলার হুকুম, “ফায়ার!”

অমনই রাইফেল থেকে কড়কড় করে শব্দ তুলে আগুনঝরা গুলি ঝাঁক বেঁধে উড়ে এল আমিনের দিকে। কিন্তু মরবার যার সময় হয়নি এখনও, তাকে মারবে কে? ছেলেটা ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁক নিয়ে একটা ভাঙা বাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

সেনারাও ধেয়ে এসেছে।

ততক্ষণে আমিনও একটা গর্ত খুঁজে পেয়েছে। লুকিয়ে পড়ল তার ভেতরে। সেনারাও নাছোড়। হামলে পড়ল। কিন্তু তাকে পাবে কোথায়! সেনারা অনেকক্ষণ ধরে তল্লাশি চালাল। অনেকক্ষণ ধরে এদিকে ওদিকে টর্চ ফেলল। কিন্তু সেই গর্তের খোঁজ তারা পেল না। শেষমেশ ছেলেটার আশা ছেড়ে তারা অন্য পথে পাড়ি দিল।

আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। কিন্তু বাজনা বেজেই চলেছে।

অবশ্য, সেনাদের চলন-বলন থিতিয়ে গেলেও আমিন তক্ষুনি-তক্ষুনি গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল না। আরও কিছুক্ষণ গর্তের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে রইল। যখন স্পষ্ট মনে হল কাছেপিঠে আর কেউ নেই, তখনই খুব হুঁশিয়ার হয়ে বেরিয়ে এল গর্ত থেকে। বেরিয়েই, আগেপিছে ঝাঁকি দিয়ে মারল দৌড়।

কিন্তু পারল না। ক’পা ছুটেই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এ কী! সামনে কাকে দেখছে সে! কে দাঁড়িয়ে আছে! তারই মতো ছোট্ট! নাকি একটু বড়! এ যে একটি মেয়ে!

“কে!” তাকে দেখে আচমকা চেঁচিয়ে উঠেছে আমিন।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছে মেয়েটি। একেবারে আমিনের কাছে। আমিনের হাতটা দুম করে ধরে টানতে টানতে ছুট দিল সে পেছনে।

হতভম্ব হয়ে আমিন চেঁচাল, “কে তুমি?”

মেয়েটি ছুটতে ছুটতে চাপা গলায় উত্তর দিল, “বাঁচতে যদি চাও, তবে অমন করে চেঁচিয়ে কথা বোলো না। আমাদের চারপাশে সেনা টহল দিচ্ছে। আমাদের গলা শুনতে পেলে আর রক্ষে নেই, ওদের হাতের রাইফেল দিয়ে, আমাদের বুকের পাঁজর চুরমার করে দেবে। শুধু শুনে রাখো, তুমিও যা আমিও তা-ই। যুদ্ধে গুঁড়িয়ে যাওয়া এই শহরে আমরা দু’জনেই হারিয়ে গেছি। মনে হয়, একটি মানুষও আর বেঁচে নেই এই শহরে। ভাগ্যের জোরে আমরা বেঁচে আছি। আর বোধহয় বেঁচে আছে একটি মানুষ, যে রবাব বাজায়। ওর কাছে আশ্রয় নেব বলে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি। কিন্তু কোথায় আছে মানুষটা কিছুতেই হদিস করতে পারছি না।”

“আশ্চর্য!” আচম্বিতে আমিনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা।

মেয়েটা ছুটতে ছুটতে হোঁচট খেল। লাগল বোধহয়। থমকে দাঁড়াল। আমিনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আশ্চর্য বলছ কেন?”

আমিন উত্তর দিল, “আমিও যে ওকে খুঁজছি। আমিও যে খুঁজতে খুঁজতে দমসম হয়ে যাচ্ছি। তবু খুঁজে পাচ্ছি না।”

মেয়েটি বলল, “তা হলে ভালই হল। এখন আর আমরা একা নই। দু’জনে একসঙ্গে খোঁজ করব। নিশ্চয়ই তার সন্ধান পেয়ে যাব!”

আমিন উত্তর দিল, “আজকের রাতটার জন্যেই আমাদের যত ভাবনা। একটা আস্তানা পেতেই হবে।”

মেয়েটি বেশ আশ্বস্ত গলায় জবাব দিল, “তাকে আমরা আজ রাতেই খুঁজে বার করব। আজ রাতে তারই আস্তানায় আমরা থাকব। তবে, সেনাদের হাতে যদি ধরা পড়ে যাই, তখন অন্য কথা।” বলতে বলতে মেয়েটির চোখ পড়ে গেল আমিনের হাতের দিকে। জিজ্ঞেস করল, “তোমার হাতের ওই কাগজটা কীসের?”

আমিন উত্তর দিল, “একজন মৃত সৈনিকের হাতে ছিল। মনে হয় দরকারি কিছু লেখা আছে। জ্যোৎস্নার এই আলোয় পড়া যাচ্ছে না।”

“কই দেখি!” মেয়েটি হাত বাড়াল। কাগজটা হাতে নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও পড়তে পারল না। আবছা আলোয় চোখ আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। বলল, “এই আলোয় পড়া যাচ্ছে না।”

আমিন উত্তর দিল, “আমার মনে হয় আলো পাওয়া যাবে বাজনদারের কাছে।”

মেয়েটি বলল, “ঠিক বলেছ। এগিয়ে চলো। দেখি, কোথায় তার দেখা পাই। এখানে বেশিক্ষণ ঘুরঘুর না করাই ভাল।”

আমিন হতাশ গলায় উত্তর দিল, “আমি কিন্তু অনেকক্ষণ ধরেই চেষ্টা করছি। কিছুতেই দিক ঠিক করতে পারছি না।”

আমিনের হাতে কাগজটি ফিরিয়ে দিয়ে মেয়েটি উত্তর দিল, “এবার হয়তো খুঁজে পাব।”

হ্যাঁ, এবার তারা দু’জন। ভয় কেটে গেছে অনেকটা। এখন শক্ত পায়ে হাঁটছে আমিন। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ইস্কুলে পড়?”

“পড়ি।”

আমিন বলল, “আমাদের ইস্কুলটা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে।”

মেয়েটি উত্তর দিল, “সেই দশা আমাদের ইস্কুলেরও।”

“এরপর কী হবে?”

আমিনের এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে পারল না মেয়েটি। মনে হল তার বুক কেঁপে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

ঠিক এই সময়ে হঠাৎ আমিনের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনের আঙুল তুলে উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, “ওই দ্যাখো, একটা ঘোড়া।”

সেইদিকে চমকে চোখ রেখে মেয়েটি সায় দিল, “তাই তো।”

“মনে হয় আমাদের মতো বেঁচে গেছে।”

“চলো দেখি।” বলে, মেয়েটি আমিনের হাত ধরে দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলল।

“কার ঘোড়া?”

মেয়েটি উত্তর দিল, “কার ঘোড়া এখন কে বলবে। দেখি, আমাদের যদি সঙ্গী করতে পারি।”

“তা হলে তো ভালই হয়।”

“আমরাও দলে ভারী হই।”

“চলো, পা চালিয়ে।”

না, অনেকটা হাঁটতে হল না তাদের। ক’কদম হেঁটেই পেয়ে গেল ঘোড়ার নাগাল। কাছ থেকে বোঝা গেল ঘোড়ার গায়ের রংটা কালো। সারা গায়ে এলোমেলো ছড়ানো খানিক সাদা। চাঁদের আলোয় অদ্ভুত দেখতে লাগছে। মুখের কাছে এগিয়ে গেল মেয়েটি। পেছনে পেছনে আমিনও। প্রথমটা দু’জনেই ঘোড়ার গায়ে হাত দিতে দোনোমনো করছিল। তারপরেই দু’জনে মুখে শব্দ তুলল চুক চুক করে। ঘোড়াও ফরফরিয়ে নাক ডাকাল। পা ঠুকল। মেয়েটি হাত ঠেকাল আলতো আলতো ঘোড়ার পিঠে। আমিনও। ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদর করতে লাগল।

আদর করতে করতে মেয়েটি বলল, “ঘোড়াটা শান্ত।”

আমিন বলল, “মনে হচ্ছে।”

“ঘোড়াটারও আমাদের মতো দুর্দশা। এখন সর্বস্ব খুইয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

আমিন খুব উৎসাহের সঙ্গে বলল, “চড়বে?”

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “তুমি পারো?”

“একবার-দু’বার চড়েছি।” উত্তর দিল আমিন।

“আমি একদম না।” মেয়েটির জবাব।

আমিন তেমনই উৎসাহের সঙ্গে বলল, “খুব সহজ। এই দ্যাখো আমি চড়ছি।” বলে, আমিন একটা ভাঙা পাথরের ওপর দাঁড়াল। ঘোড়ার পিঠের নাগাল পেয়েই লাফ মারল। সিধে ঘোড়ার পিঠে। বলতে নেই, ঘোড়া টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না।

পিঠে বসেই আমিন মেয়েটিকেও ডাক দিল, “তুমিও এসো, কিচ্ছু বলবে না।”

আমিনের কথা শুনে মেয়েটিও সেই পাথরের ওপর পা রেখে বলে উঠল, “আমরা এমনিতেই তো আধমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন ঘোড়া যদি মারে, মারবে। বরং ঘোড়ার পিঠে বসে, খুঁজতে খুঁজতে যদি বাজনদারের ঠিকানা পেয়ে যাই, তবে বেঁচেও তো যেতে পারি।” বলে মেয়েটিও মারল লাফ। ধরে ফেলল আমিনের হাত। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াও হাঁটতে শুরু করল। আশ্চর্য তো!

আহ্! ঘোড়ার পিঠে বসতেই কী আরাম! এতক্ষণে ছুটি পেল দু’জনের দু’জোড়া পা। চলুক ঘোড়া। যতক্ষণ না বাজনদারের খোঁজ পাওয়া যায়, ততক্ষণ ঘোড়াই ভরসা।

ভারী আশ্চর্য তো! মনে হচ্ছে, ঘোড়া যেন ওই বাজনার শব্দের দিকেই এগিয়ে চলেছে। যতই এগোচ্ছে, শব্দ ততই দূর থেকে কাছে আসছে। কীরে বাবা, ঘোড়াটা জাদু জানে নাকি! নইলে কেমন করে খবর পেল এদের মনের!

আরও খানিকটা এগিয়ে আসার পর আমিনই কথাটা পাড়ল, “এতখানি পথ পেরিয়ে এলুম, অথচ একজন মানুষও চোখে পড়ল না। শুধু আমরা দু’জনেই বেঁচে আছি।”

মেয়েটি উত্তর দিল, “তা কেন বলছ! যার পিঠে বসে আছি সে-ও তো বেঁচে আছে।”

মেয়েটির কথা শুনে এত কষ্টের মধ্যেও আমিনের ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, “সত্যি বটে, ভুলেই গেছলুম ঘোড়াটার কথা!”।

মেয়েটি আবার বলল, “আর একজনের কথাও তো ভুলে বসেছ!”

“কে বলো তো?”

“কেন যিনি রবাব বাজাচ্ছেন!” উত্তর দিল মেয়েটি, তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “সেই কাগজটা কোথায় ফেললে?”

আমিন উত্তর দিল, “না, ফেলিনি। জামার পকেটে রেখেছি।”

মেয়েটি নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “দেখো হারিয়ে না যায়! হয়তো ওই কাগজে এমন কিছু লেখা আছে যা খুব দরকারি।”

আমিন জামার বুকপকেট থেকে কাগজটা বার করে মেয়েটিকে দেখাল। বলল, “এই তো!”

বাজনার সুর আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। মেয়েটি বলল, “শুনতে পাচ্ছ?”

আমিন উত্তর দিল, “প্রায় এসেই পড়েছি।”

কী আশ্চর্য, আমিনের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়াটা এখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল! হ্যাঁ, বাজনাটা এখন খুবই স্পষ্ট। একটানা বেজে চলেছে। বাজনা যে কাছেপিঠেই বাজছে, সে নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। লাফিয়ে নেমে পড়ল তারা। ঘোড়ার পিঠ থেকে।

কিন্তু এখানে তো কোনও ঘর-বাড়ি দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ। তবে কি শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে তারা? এ কি কোনও বনপাহাড়ের সীমানা? এখানে কে বাজনা বাজায়? যে বাজায়, সে কি তবে বনের ভেতরে বাস করে?

কয়েক পা এগিয়ে গেল আমিন আর মেয়েটি।

মেয়েটি বলল, “এ তো গহন বন।”

আমিন উত্তর দিল, “অন্ধকার।”

“তোমার ভয় করছে?” জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।

“ভয় করলেই বা কী।” উত্তর দিল আমিন।

মেয়েটি বলল, “চলো তবে ফিরে যাই।” বলে সে মুখ ফেরাল। ঘুরে দাঁড়াল। ঘুরে দাঁড়াতেই তার চমক ভাঙল। “আরে, ঘোড়াটা কোথায় গেল!”

শিউরে উঠল আমিনও, “তাই তো, পালাল নাকি!”

মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে বলল, “এসো তো, দেখি!”

তা, দেখলে কী হবে? দেখতে দেখতে হয়রান হয়ে গেল। তবু পাত্তা পেল না ঘোড়ার। কী হবে এখন?

আমিন এবার রেগেমেগে বলে উঠল, “ঘোড়াটা পাজি।”

মেয়েটি উত্তর দিল, “ঠিক বলেছ। আগে বুঝতে পারিনি।”

“এবার কী করবে!” আমিনের গলার স্বরে যেন ভয় আর হতাশা জড়ানো।

মেয়েটি উত্তর দিল, “অত হতাশ হলে চলবে কেমন করে! বাজনার সুর যখন এত কাছ থেকে কানে আসছে, তখন আর অতটা ভয় পাবার কিছু নেই। চলো, বনের ভেতরে ঢুকি।” বলতে বলতে এগিয়ে চলল মেয়েটি। আমিনও তার পিছু নিল। বেশ কিছুক্ষণ বন-ছমছম অন্ধকারে তারা আনিমানি করে পাক খেল। কিন্তু এখানেও সেই একই রহস্য। শব্দ শোনা যায়, তাকে দেখা যায় না।

মেয়েটিও এবার সাহস হারাল মনে হয়। বলল, “না, বনের আর ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই। এসো এখান থেকেই ডাক দিই!”

বনের এই ঘন অন্ধকারে আমিনের মুখখানা যদি তখন ঢাকা না-পড়ত, তবে, সে-মুখ দেখলে কে না-বুঝত, শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে! সুতরাং ভয়েময়ে সে-ই প্রথম হাঁক পেড়ে ডেকে উঠল, “বনের মধ্যে কে বাজনা বাজান? আমরা বিপদে পড়েছি! আমাদের বাঁচান!”

কোনও সাড়া নেই। অগত্যা দুটো আতঙ্কে অস্থির ছেলেমেয়ে চিৎকার করতে লাগল, “বাঁচান!”

“এখানে কে আছেন?”

“আমরা বিপদে পড়েছি!”

“আমাদের একটু আশ্রয় দিন!”

চিৎকার করতে করতে দুটো অসহায় ছেলেমেয়ের গলা ভাঙল। আর ঠিক তারপরেই আচমকা ভেসে এল এক কণ্ঠস্বর, “বাজনা শোনাই আমি।”

বিপদে ধ্বস্ত ছেলেমেয়ে দুটো সেই কণ্ঠস্বর শুনে চমকে ওঠে। তারা পেয়েছে, সাড়া পেয়েছে! উত্তেজনায় আনচান করে আমিন চেঁচিয়ে ওঠে, “আপনি কে?”

মেয়েটি চেঁচায়, “আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”

উত্তর এল, “আমাকে দেখা যায় না। আমি বাতাস।”

থতমত খেয়ে গেল সেই মেয়ে আর আমিন। বনের অন্ধকারে দু’জনে অবাক হয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগল।

বনভর্তি গাছের পাতায় ঝুমঝুমি বাজাতে বাজাতে বাতাস বলল, “বুঝতে পেরেছি, আমার কথা শুনে তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ, এমন উদ্ভট কাণ্ড আবার হয় নাকি। সত্যি তো, কে আর কবে শুনেছে বাতাস কথা কয়! তবে শোনো বন্ধু বলি, আমি শব্দের দোসর। আমি না থাকলে এই বাজনার সুর তোমাদের কানে কে ছড়িয়ে দিত? তোমরা যখন আকুল হয়ে ‘মা’ বলে ডাক দাও, তখন সেই ডাক আমিই তো পৌঁছে দিই মায়ের কানে। এখন এই যে শুনতে পাচ্ছ রবাবের সুর, ওই সুর বাজায় পাহাড় থেকে উছলেপড়া একটি ছোট্ট নদী তার জলের তরঙ্গে। ওই সুর লুটোপুটি খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়ছে আমার বুকে। আমি ভাসিয়ে দিই ওই সুরের ঝনাৎকার পৃথিবীর আনাচে-কানাচে।

বাতাসের কথা শুনে ছেলেমেয়ে দুটো থ। যেন নিশ্চল দুটো পাথরের মূর্তি। তাদের ঘিরে বাতাস বইতে লাগল শনশন করে। আর সব নিস্তব্ধ।

এমন সময়ে হঠাৎ একটি পাখি ডেকে উঠল বনের গাছে। একটি ডাকল মানে, একে একে আরও অসংখ্য পাখি ডেকে উঠল। সেই পাখির ডাকে ধন্দ কেটে যায় আমিন আর সেই মেয়েটির। তারা অবাক চোখে তাকায় চারদিকে। বাতাস বলল, “ভোরের আলো ফুটছে আকাশে।”

আমিন শান্ত গলায় উত্তর দিল, “আশ্রয়ের আশায় এখানে এসেছি আমরা। যুদ্ধের ভয়ংকর দাপটে আমাদের সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা অসহায়। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।”

বাতাস বলল, “কে বলেছে তোমরা অসহায়? কে বলেছে তোমরা পথ হারিয়ে ফেলেছ? তোমার জামার পকেটে যে-কাগজটা রেখেছ, ওই কাগজটাই তোমাদের সহায়। এই ভোরের আলোয় পড়ে ফেলো ওই কাগজের লেখা। দেখবে পথের সন্ধান ওই কাগজেই লেখা আছে।”

আর দেরি করল না তারা। আমিনের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে মেয়েটি পড়তে শুরু করল। দেখি, এ যে একটা চিঠি! কী লেখা চিঠিতে? তাতে লেখা:

আমার মিষ্টি মেয়ে সায়রা,

তুমি তো জানো এখন আমাদের দেশের কী ভয়ানক বিপদ। বিদেশি শত্রু যুদ্ধ বাধিয়েছে দেশটাকে দখল করার জন্যে।

আমি সৈনিক। জন্মভূমিকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করা আমার কাজ। কিন্তু শত্রুর ক্ষমতা দুর্বার। তাদের আছে ভয়ংকর মারণ-অস্ত্র। তবু, সৈনিকের বুকে প্রাণ যতক্ষণ, ততক্ষণ সে স্বপ্ন দেখে জয়ের। ওরে মেয়ে, এই জয় ছিনিয়ে আনতে সৈনিকের প্রাণ যেতে পারে যখন তখন। তাই মনে হল, প্রাণের যখন ভরসা নেই, তখন দুটো জরুরি কথা লিখে যাই আমার মেয়ে সায়রার জন্যে। যদিও জানি অলৌকিক ঘটনা ছাড়া এ চিঠি তোমার হাতে পৌঁছতে পারে না। তবু মানুষ আশা রাখে। বলা তো যায় না, ভাগ্যক্রমে পেয়েও তো যেতে পারো। সায়রা, একদিন যদি সত্যিই আমি না থাকি, যুদ্ধক্ষেত্রে সত্যিই যদি শত্রুর হাতে প্রাণ যায়, তবে বলি ভেঙে পড়ো না। মনে রেখো, যেদিন প্রথম এই পৃথিবীর বাতাসে মানুষ নিশ্বাস ফেলেছিল, সেইদিন থেকেই ‘হিংসা’ আর ‘শত্রু’ নামের এই ভীষণ শব্দ দুটোও জন্ম নিয়েছিল। সেই থেকে কত রক্ত ঝরেছে পৃথিবীর বুকে। আজও শেষ নেই তার। তোমারও এই রক্তঝরা পৃথিবীতেই জন্ম। তোমার মতো এখন আরও যে নতুন প্রাণ এসেছে এই পৃথিবীতে তাদের জন্যে শান্তির কোনও সন্ধানই আমরা দিতে পারিনি। সে কাজ যে করতে হবে তোমাদেরই। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বুক থেকে রক্ত ঝরার হিংসা মুছে ফেলতে হবে তোমাদেরই। শত্রুর মুখের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে হবে, ওহে স্বার্থপর, লোভী, নির্দয় মানুষের দল, এ পৃথিবী এখন আর তোমাদের নয়। এতদিন অনেক হয়েছে, অনেক নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছ। এবার এসো, আমাদের হাতে হাত মেলাও। গড়ে তুলি নতুন এক পৃথিবী, যেখানে থাকবে না হিংসা, শত্রুতা। থাকবে মমতা আর ভালবাসা।

বাবা

চিঠিটা পড়তে পড়তে কেঁদে ফেলেছে মেয়েটি। তার চোখে জল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। দেখে ফেলেছে আমিন। অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাঁদছ?”

মেয়েটি উত্তর দিল, “এ যে আমারই বাবার চিঠি।”

চমকে উঠল আমিন। চেপে ধরল সায়রার হাত। মনে মনে ভাবল, এ তো ভারী আশ্চর্য ঘটনা। তারপর সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “কেঁদো না দিদি। ওই দ্যাখো, ভোরের আকাশে নতুন সূর্য আলো ছড়িয়ে দিয়েছে আমাদের জন্যে। এবার আমরা নিশ্চয়ই খুঁজে পাব মমতা আর ভালবাসা। চলো এগিয়ে যাই।”

তারপর দু’জনে দৃঢ়পায়ে এগিয়ে চলল ধ্বংসস্তূপ দলতে দলতে।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%