সুন্দর যাকে বলি

শৈলেন ঘোষ

ডালিমগাছের ওই-ই উঁচু ফাঁকে, সবুজপাতার দোলনায় কী ওটা টলমল করছে? সূর্যিমামার সোনার আলোয় দুলদুল দুলছে? ঠিক যেন দুধের মতো সাদা, মুক্তোর মতো ফুটফুটে!

ওমা, ওটা যে একটা ছোট্টমতো ডিম!

ডিমের দিকে চোখ পড়তেই সূর্যিমামা আরও একটু আলো পাতার ওপর ছড়িয়ে দিল। তারপর ঝুরঝুর-হাওয়ার কানে ফিসফিস করে বলল, “আমার মনে হচ্ছে, ডিম ফুটে একটা সুন্দর কিছু জন্ম নেবে। আমার আলো দিয়ে আমি বাঁচিয়ে রাখব তাকে। এই পৃথিবী সুন্দরে উছলে উঠলে, পৃথিবী সুখের হবে।”

হাওয়া-ঝুরঝুর বলল, “ঠিক বলেছ! আমারও এখন দুরন্ত হাওয়ার তুফান ছুটিয়ে ছোটাছুটি করা ঠিক হবে না। আমাকেও ধীরে ধীরে বইতে হবে।” বলে, যেমন করে মা দোলনা ঠেলে, ঠিক তেমনই করে গাছের পাতায় হাওয়ায় দোল দিতে লাগল।

একটি একটি দিন কাটে। সূর্যিমামা আর হাওয়া-ঝুরঝুর ডিমের দিকে তাকিয়ে থাকে। সূর্যিমামা আলো দেয়, হাওয়া দোলা দেয়। আর ভাবে, কবে ডিম ফুটবে!

ফুট! একদিন সত্যিই ডিম ফুট করে ফেটে গেল! কিন্তু কই, সূর্যিমামা হাসল কই? হাওয়া-ঝুরঝুর নাচল না তো!

নাচবে কী! ছিঃ-ছিঃ ডিম ফুটে যে বেরিয়ে এল একটা বিচ্ছিরি, হতকুচ্ছিত পোকা! ইস, কেমন কিলবিল করছে! তবে কি ওটা শুঁয়োপোকা!

তাই না-দেখে সূর্যিমামা মেঘের ফাঁকে লুকিয়ে পড়ল। হাওয়া-ঝুরঝুর রেগেমেগে এমন বইতে শুরু করল, গাছের ডাল ভাঙল মড়মড় করে। পাতা উড়ল হুসহুস করে। ছোট্ট শুঁয়োপোকা হাওয়ার ধাক্কায় পড়ে গেল চিতপটাং হয়ে।

“মরো আর বাঁচো বয়েই গেল। থাকো মাটিতে পড়ে! এমন কুচ্ছিত যার রূপ তার বাঁচার দরকার কী!” বলতে বলতে হাওয়া ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

কথাটা কানে গেল শুঁয়োপোকার। ভারী মন খারাপ হয়ে গেল তার। আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে সে হাঁটতে লাগল। আবার এল ডালিমগাছের গোড়ায়। আবার পা টেনে টেনে উঠে পড়ল গাছের ওপর। একটা মস্ত বড় পাতার ওপর গা এলিয়ে বসে রইল। একটু জিরিয়ে নিল। তারপর তার খিদে পেয়ে গেল। কুর-কুর, কুর-কুর করে পাতা খেয়ে পেট ভরাতে লাগল। একপেট পাতা খেয়ে ঘুম-ঘুম! তার চোখের পাতায় ঘুম আসছে। সে ঘুমিয়ে পড়ল।

তারপর আরও কতদিন চলে গেল। সেই ছোট্ট শুঁয়োপোকার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আর কচি-পাতা খেয়ে খেয়ে দিন কাটতে লাগল।

এমন সময় একদিন সেই ডালিমগাছের তলায় কারা যেন এল! তাদের হাতে খুন্তি-হাঁড়ি, কড়া-থালা।

ওহো। ও যে রুমু আর তার বন্ধুরা। ওরা বুঝি এখানে আজ চড়ুইভাতি করবে?

শুঁয়োপোকা তাই না-দেখে, সুড়সুড় করে গাছ থেকে নেমে এল। নেমে সেইখানে হাজির। মুখ তুলে রুমু আর তার বন্ধুদের বলল, “আমায় তোমরা দলে নেবে?”

শুঁয়োপোকার কথা কে আর শুনতে পায়? শুনতে পেল না বটে, কিন্তু দেখতে তো পেল। দেখতে পেয়েই নাক সিঁটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “শুঁয়োপোকা! শুঁয়োপোকা! ছিঃ-ছিঃ হ্যাট-হ্যাট!” বলে চেঁচাতে চেঁচাতে একটা পুঁচকে মতো ছেলে এগিয়ে এল। একটা কাঠি নিল। কাঠি দিয়ে তুলে শুঁয়োপোকাটাকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল।

ছোট্ট শুঁয়োপোকা মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়ল। আহা! খুব লেগেছে।

ভারী দুঃখ হল শুঁয়োপোকার। অভিমানে তার মুখটি ভার। ভাবছে, “আমার বিচ্ছিরি চেহারা দেখে সবাই আমাকে ঘেন্না করে। এই পৃথিবীতে অনেক বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি জিনিস আছে। তার মধ্যে আমিও একটা। আমার বেঁচে লাভ কী!” ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফেলল।

সবুজঘাস তার কান্না শুনতে পেল। ঘাস বলল, “ছিঃ, ছিঃ কাঁদে নাকি! আমি বলছি তুমি সুখী হবে। সবাই তোমায় ভালবাসবে!”

শুঁয়োপোকা চোখের জল মুছে ফেলল। আবার কচিপাতার খাবার খেতে লাগল।

দিন যায়। সে ডাগর-ডোগর হয়। গায়ে-গতরে কুঁদো হয়ে হাঁসফাঁস করে ঘুরে বেড়ায়।

তারপর?

একদিন ফট করে ছিঁড়ে গেল তার গায়ের চামড়া। ছিঁড়ে গিয়ে খসে গেল। শুঁয়োপোকা থতমত খেয়ে গেল। ভাবল, “বুঝি তার কুচ্ছিতরূপ সুন্দর হল।”

কিন্তু কই সুন্দর হল! সে যেমন তেমনই তো রয়ে গেছে। তবে কটা হলুদ-হলুদ দাগ তার গায়ে ধরেছে।

হ্যাঁ, আবার তাকে সূর্যিমামা দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়ে বলল, “কুচ্ছিত পোকাটার গায়ে কটা হলুদ রং-এর দাগ দেখা যাচ্ছে না? মন্দ না। রংটা ভাল। ওই রং আমার গায়েও আছে।”

সূর্যিমামার কথা শুনতে পেয়েছে শুঁয়োপোকা। মনটি তার খুশিতে ভরে গেল। সেদিন থেকে সে শুধু পেট ভরে এটা-ওটা খায় আর দিনভর ঘুমোয়।

একদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখল শুঁয়োপাকো। দেখল, যেন সে হাওয়ায় ভেসে ভেসে উড়ে চলেছে। সকলে চোখ মেলে দেখছে তাকে, আর বলছে, “আহা, কী সুন্দর!”

একদিন হল কী ডালিমগাছে একটা মস্ত পাতার একেবারে ধারে এসে, মাথা নিচু করে সে ঝুলে পড়ল। ঝুলতে ঝুলতে হঠাৎ তার বুকের চামড়াটা গেল ছিঁড়ে। চামড়ার ভেতর থেকে টুক করে বেরিয়ে এল সে। নিজের দেহটা অবাক চোখে দেখতে দেখতে সে বলে উঠল, “আমি যেন সবুজ হয়ে যাচ্ছি! কচিপাতার মতো সবুজ!”

আবার ঘুমিয়ে পড়ল শুঁয়োপোকা।

শেষমেশ আরও ক’দিন পর গাছের সবচেয়ে উঁচুডালে উঠে পড়ল সে। সেখানে বসে বসে নিজেকে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে আনন্দে উছলে উঠল তার মন। দ্যাখো, দ্যাখো, তার যেন ডানা হয়েছে! কী সুন্দর রং! বাদামি! আর ডানার চারপাশে যেন হলুদ রং-এর পাড় বসানো!

ধীরে ধীরে সে তার ডানা একবার সামনে মেলে ধরল, আর একবার পিছনে ছড়িয়ে দিল। তারপর ফুরফুর করে হাওয়ায় ভেসে উড়ে গেল।

সূর্যিমামার চোখ পড়ল তার দিকে। বলে উঠল, “দ্যাখো, দ্যাখো, কী সুন্দর প্রজাপতি!”

“সুন্দর!” হাওয়া ঝুরঝুর উত্তর দিলে।

সবুজ গাছ আনন্দে দুলতে লাগল। আর মনে মনে বলতে লাগল, “সুন্দর, সুন্দর, চারদিক সুন্দর।”

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%