শৈলেন ঘোষ

আমার এই ভালবাসার পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে যত ছোট্ট বন্ধু তারা শোনো, আমার নাম মামুন। ঠিক এই মুহূর্তে আমি খুব বিপন্ন। কেন না, আমার জন্মভূমির বুকের ওপর ঘাতকের ছোরা, জ্বলন্ত আগুনে-অস্ত্র আছড়ে পড়ছে একের পর এক। যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি গনগন করছে আগুন, দাউদাউ করে জ্বলছে ঘরবাড়ি। আকাশে ধোঁয়ার জাল ছড়িয়ে ছুটে আসছে ক্ষেপণাস্ত্র। চুরমার হয়ে যাচ্ছে মস্ত মস্ত ইমারত। অসহায় মানুষের দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। হ্যাঁ বন্ধু, আমার দেশ এখন আক্রান্ত। যাদের গায়ের জোর বেশি, দেমাক দেখিয়ে তারাই বলে এর নাম যুদ্ধ। আর যুদ্ধ এমনই ভয়ংকর যে তার নৃশংস হাত থেকে নিস্তার নেই কারও। তোমাদের কান্নার জলে মাটি ভেসে গেলেও, সেদিকে তাকিয়ে দেখবে না কেউ। আগুনের গোলা উড়বে, ছুটবে, সামনে যা পাবে, ধ্বংস করে দেবে। সে-আঘাতে তোমাদের যদি প্রাণ যায়, কেউ ফিরেও তাকাবে না। আশ্চর্য, এখনও আমার প্রাণ যায়নি। যে-কোনও মুহূর্তে আমারও জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে। তার আগে, তোমাদের দুটো কথা বলে যাওয়ার জন্যে তোলপাড় করছে আমার মন। জানি না আমার কথা শেষ করতে পারব কি না। নাকি তার আগে যুদ্ধের আঘাতে আমিও শেষ হয়ে যাব।
আমি মামুন। এই পৃথিবীর আরও অনেক মামুনের মতো আমিও কিশোর। আমি মায়ের মুখে শুনেছি, আমার নাম রেখেছিলেন আমার বাবা। মায়েরও খুব পছন্দ হয়েছিল আমার নাম। এখন বড় হয়ে আমিও বুঝতে পারি, নামটা আমার ভালই। মায়ের মতো আমারও ভাল লাগার এই নাম, মামুন।
হ্যাঁ, আমি, এখন তোমাদেরই মতো কিশোর। চোদ্দো বছর আগে এক রোদ ঝলমলে সকালে আমার জন্ম হয়েছিল এই দেশে। কী ভাগ্য আমার। তখন কে জানত, যে দেশে জন্মালুম আমি সে-দেশ পৃথিবীর এক প্রাচীন সভ্য দেশ। এ দেশের নাম ছিল মেসোপটেমিয়া, এখন ইরাক।
এখন, এই ভয়ংকর যুদ্ধ লাগার আগে তোমাদের যদি আমাদের এই দেশে আসার সুযোগ হত, তবে আমাদের দেশ দেখে তোমাদের প্রথমেই মনে হত দেশটা কী শুকনো খটখটে। কী বিচ্ছিরি! কিন্তু ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারতে তোমাদের ধারণা একদম ভুল। দেখতে কত তার রূপের বাহার। এদেশে যেমন দেখতে উড়ন্ত বালির মরুভূমি, তেমনই তোমার চোখে পড়ত অনেক অনেক জলাভূমি। দেখতে পাহাড়, পাহাড়তলি। হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে চলা বিশ্ববিখ্যাত দুটি নদী ইউফ্রেটিস আর টাইগ্রিস। দেখতে কত গ্রাম, কত নামকরা শহর। শয়ে শয়ে খেজুরগাছ। ফুলের বাগান। আর তেলের খনি।
আমি যখন আরও ছোট, যখন একটু চিনতে শিখেছি আমার জন্মভূমিকে, তখন আমি একদমই জানতুম না যুদ্ধ কেন হয়। কেন যে শত্রু আকাশ থেকে বোমা ছুড়ে গুঁড়িয়ে দেয় মানুষের আশ্রয়। কেন যে অসহায় মানুষকে মারে তারা তা-ও আমার জানা ছিল না। আসলে শত্রু কাদের বলে তা-ই আমি জানতুম না। জানার কথাও নয়। তখন তো আমি ছুটছি, খেলছি, হাসছি। রঙিন বইয়ের পাতা খুলে দেখছি উড়ন্ত পাখির ছবি। আর মনে মনে ভাবছি পাখিরা আকাশে ওড়ে কেমন করে। আমি কেন পারি না? কিংবা মুখস্থ করছি বইয়ের পাতার অজানা শব্দ। মাকে বলছি, “মা, তুমি ধরো, আমি বলি।”
আমরা তখন তিনটি প্রাণী। মা, আমি আমার বাবার উট—বাহাদুর। আমার বাবা নেই। আমার বাবা বাহাদুরের পিঠে অন্যের সওদা বোঝাই করে শহরের আর এক সওদাগরকে পৌঁছে দিতেন মেরু পেরিয়ে। পয়সা পেতেন। তাতেই চলত আমাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু একবার তিনি যখন বাহাদুরের পিঠে সওদা নিয়ে মেরু পেরোচ্ছিলেন, তখন উঠল ভীষণ মরুঝড়। আরও পাঁচটা মরুঝড়ের চেয়েও তার ছিল আরও সাংঘাতিক মূর্তি। বাবা পারেননি সেই ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াই করতে। তিনি হেরে যান। তারপর থেকে আমাদের দুঃখের দিন শুরু হয়। আমি তখন পড়তে শিখেছি মন দিয়ে। বাগিচা মানে যে বাগান, সেটাও তখন আমি শিখে ফেলেছি। কিন্তু আর বোধহয় পড়া হল না আমার। কেন না, বাবার কাজটা এবার আমায় করতে হবে। আমাকেই, বাহাদুরের পিঠে সওদা বোঝাই করে পৌঁছে দিতে হবে বেসাতির কাছে পয়সা উপায় করার জন্য। সুতরাং যতটুকু পড়া শিখেছি সেই নিয়েই তুষ্ট থাকি। বাগিচার বেশি আর কিছু হল না আমার। তার চেয়ে বেশি যেটুকু হল, সে-ও এক আশ্চর্য ঘটনা। আমার দোসর হলেন এক ফুলবাগিচার বুড়ো মালী। এমন নয় যে তিনি আমায় চিনতেন না। শহরে থাকলে একরকম। এ-পাড়ার লোক, ও-পাড়ার লোককে চেনে না। কিন্তু আমরা থাকি গ্রামে। সবাই সবাইকে চিনি। আর জানি মানুষের দুঃখে মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা। বড় দোসর। আমার বাবা চলে যাবার পর, ওই বুড়ো মালীর সঙ্গে আমার দস্তুর মতো দোস্তি হয়ে গেল। তিনি দেখভাল করতেন একটা মস্ত গোলাপবাগ। তোমাদের যদি সে গোলাপবাগ দেখাবার সুযোগ ঘটত আমার, দেখলে চমকে যেতে। অসংখ্য গাছ, অগুনতি গোলাপ। কত রং! কোনওটা নীল, কোনওটা লাল, নয়তো সাদা। দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যেত। মনে মনে ভাবতে, যদি পাই তো নিয়ে যাই একটি একটি তুলে সবক’টি। সত্যি বলতে কী, সারাদিন ধরে একটি একটি তুললেও শেষ হত না তোমাদের সব ক’টি তোলা। এত বড় সেই বাগিচা।
সেই বাগিচার বুড়ো মালীকে আমি আদর করে ডাকতুম ‘দাদা’ বলে। হ্যাঁ, আমাদের দাদা, অনেকের দাদু। তাঁর অনেক বয়স। মাথার চুল, দাড়ি সাদা ধবধব করছে। অথচ সকাল থেকে সন্ধে অবধি ফুলের সেবাযত্ন করছেন অকাতরে। বড্ড ভালবাসতেন তিনি আমাকে। রোজ একটি করে ফুল তিনি আমায় উপহার দিতেন। বলতেন, “মামুন, যে-গোলাপটা রোজ বড় হয়ে ফুটবে, সেটা তোর জন্যে। তুই তুলে নিয়ে যাস।”
বলো, অত বড় বাগানে, অগুনতি গোলাপের ঝাঁক থেকে বড় গোলাপটা খুঁজে বার করা সহজ কাজ! সে-যাই হোক, আমার চোখে যেটা বড় ঠেকত, সেটা তুলে নিয়ে আমি বাড়ি যেতুম। সেই ফুলটি মায়ের হাতে দিয়ে বলতুম, “মা, আজকের গোলাপটা কালকের চেয়ে বড়, তাই না?”
মা হাসতেন। ফুলটি হাতে নিয়ে বাবার ছবির পায়ে সাজিয়ে দিতেন। আমি চোখ মেলে দেখতুম আর মনে মনে ভাবতুম, কবে যে বড় হব বাবার মতো।
ওই মালীদাদা কত গল্প বলতেন আমাকে। তাঁর কাছেই শুনেছি আমাদের দেশে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য ‘ঝুলন্ত বাগান’ গড়েছিলেন নেবুচাদনেজ্জার নামে এক রাজা বাগদাদের কাছাকাছি। তাঁর মুখেই শুনেছি পৃথিবীর প্রথম বই লেখা হয়েছিল মাটির ফলকে এই দেশেই। প্রায় ছ’হাজার বছর আগে প্রথম লাঙলে জমি চষে ফসল এদেশে ফলিয়েছিলেন সুমেরিয়ানরা। তাঁরাই শিখিয়েছিলেন অঙ্ক কষতে। বইয়ের হরফ চিনতে। এখন এই যে আমরা সময়ের হিসাব করি ষাট সেকেন্ড, ষাট মিনিট ধরে, সেটাও পৃথিবী শিখেছে এদেশ থেকেই। বলি, আলিবাবা আর চল্লিশ চোরের গল্প কোন দেশের ছোট্টবন্ধুরা জানে না? সেই গল্প তো আমাদেরই দেশের সৃষ্টি।
হ্যাঁ, বন্ধুরা এই দেশেই এখন পড়ছে বোমা। বোমার আগুনের আড়ালে আড়ালে বন্দুক হাতে বিদেশি সেনারা আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছে। ঢুকে পড়েছে ট্যাংক। গুঁড়িয়ে চুরমার করে দিচ্ছে সামনে যা পাচ্ছে তা-ই। শুনলে হয়তো আঁতকে উঠবে আমাদেরও তারা রেহাই দেয়নি। আমাদের ঘরখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। শুধু আমরাই নই, আমাদের মতো মাটিতে মিশে গেছে আরও কতজনের ঘর। আমরা যেমন অসহায়, তেমনি অসহায় অসংখ্য মানুষও। আরও শোনো বন্ধু, আমাদের একমাত্র সম্বল, আমাদের উটটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আমার মা যুদ্ধে আহত। আমি আরও অসংখ্য মানুষের মতো, ঘুরপাক খাচ্ছি আমার আহত মাকে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো। আমাদের মাথার ওপর তো ক্ষেপণাস্ত্রের উড়ন্ত আগুন আর বোমারু বিমান, মাটিতে বন্দুক হাতে হিংস্র সৈনিক, সঙ্গে বিকট বিকট মারণ ট্যাংক আমাদের তেড়ে আসছে। আমরা যে-যেদিকে পারছি পালাচ্ছি। বন্ধুরা, কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজতে পারো। একবার চোখ বুজে ভাবো তো সেই ভয়াবহ দৃশ্যের ছবিটা।
আহত মা আমার। হাঁটতে পারেন না। আমার আহত মায়ের হাঁটুর ওপরে গুলি লেগেছে, না কি বোমার টুকরো কে বলবে! আমি এখন একাই মাকে নিয়ে আশ্রয় খুঁজছি। বুঝতে পারছি মা হাঁটতে পারছেন না। তবু উপায় নেই। কিন্তু কোথায় আশ্রয়? বাংকারগুলো অনেক আগেই ভর্তি হয়ে গেছে। ভয়ে কুঁকড়ে আছে বিপদগ্রস্ত মানুষেরা সেই বাংকার নামের অন্ধকূপে। সেখানে যে মায়ের জন্যে একটু আশ্রয় চাইব, কে দেবে? এখন আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আমার বিপদের কথা বললেও, কারও কানে পৌঁছবে না। কেউ আসবে না এগিয়ে আমাকে সাহায্য করতে। কারণ সবাই যে মৃত্যুর মুখোমুখি। সুতরাং মা আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খান। হাঁপান। কখনও দাঁড়িয়ে পড়েন। নয়তো একটু বসেন। বলেন, “মামুন, বাবা, একটু জল পাওয়া যাবে?” হ্যাঁ, আমার মা’র গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। শুধু জল কেন, মাকে দু’দিন কিছু খাবারও এনে দিতে পারিনি। মা’র যে শুধু গলায় দেবার জন্য একটু জলেরই দরকার তা যেন ভেবো না। মা’র পেটে দু’-দিন কিছু পড়েনি। মায়ের শুকনো মুখখানা দেখে আমি বুঝতে পারছি সে-মুখে খিদের ছায়া পড়েছে। এমন নয় যে, দু’-দিন ধরে মাকে উপোসি রেখে আমি নিজে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলছি। না, দু’-দিন কিছু পড়েনি আমার পেটেও। না খেয়ে আমার মুখের ছিরি এ দু’-দিনে কেমন হয়েছে, সে তো আর আমি দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মায়ের মুখখানা দেখতে দেখতে আমি ভয়ে কুঁচকে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি খিদের সঙ্গে আঘাতের মারাত্মক যন্ত্রণাটা কেমন নিঃশব্দে মা সহ্য করছেন। যখন পারছেন না, আচমকা উপচে ফেটে পড়ছে দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুকের ভেতর থেকে। আমার চোখ ছলছল করে উঠছে।
জল কে দেবে আমায়, মায়ের জন্য একটু জল? একটা খেজুর বাগানের ছায়ায় মায়ের জন্য একটু আশ্রয় খুঁজে পেলুম। মাকে বললুম, “মা, তুমি এখানে একটু বসো, আমি আসছি। দেখি জল পাই কি না।”
মা ভয় পান। বলেন, “না বাবা, আমার চোখের আড়ালে যাস না। কোথা থেকে কখন শত্রুর গোলা এসে পড়ে ঠিক নেই। আমার ভয় করে।”
“মা, আমি দূরে কোথাও যাচ্ছি না। দেখি, কাছে কোথাও জল আছে কি না।”
আমি উত্তর দিলুম। মা সায় দিলেন। বললেন, “তবে দ্যাখ।” আমি মায়ের তেষ্টার জলের জন্যে এধার ওধার দেখতে শুরু করলুম। আমি তোমাদের আগেই বলেছি আমাদের দেশটা মরুঘেরা হলেও এখানে অনেক জলাশয় আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, এখান থেকে দু’পা গেলেই বুঝি আমি জলের দেখা পাব। যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আসলে আমরা এখন যেখানে পৌঁছেছি, সেখানটা একেবারেই চেনা নয়। সুতরাং, এখানে কাছে পিঠে কোথায় জলের সন্ধান পাব, আমার জানা নেই। অবিশ্যি, যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আরও অসংখ্য মানুষ আমাদের মতো এই পথেই হাঁকপাক করে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। সে দলে যেমন আছেন অনেক বুড়ো-মানুষ, তেমনই কাচ্চাবাচ্চাও অসংখ্য। কারও সঙ্গে ঘর-গেরস্থালির দু’-একটা আসবাব, দু’-একটা বালিশ-বিছানা, জামা-কাপড়। আমাদের সঙ্গে কিছুই নেই। আমাদের মতো আরও অনেকেরও কিছু নেই। হয় আগুনে ছাই হয়ে গেছে, না হয় ধ্বংসস্তূপের মতো ছিটকে ছড়িয়ে গাদা হয়ে আছে চারদিকে। এদের কারও কাছে মায়ের জন্যে একটু জল চাইবার হিম্মত আমার হল না। মানুষগুলোর মুখের চেহারা দেখে আমার নিজেরই কেমন কষ্টে ভরে গেল বুকের ভেতরটা। মনে হল, এদেরই পেটে হয়তো দানাপানি পড়েনি কতদিন।
ঠিক এই সময়েই হঠাৎ ওই দিশেহারা মানুষগুলো চিৎকার করে ছুটতে লাগল, “খাবার দিচ্ছে! খাবার দিচ্ছে!”
আমি চমকে গেলুম। মনে মনে অবাক হলুম। ভাবলুম, এই দুর্যোগের সময় কে সে দয়াবান, কার ঘরে খাবার আছে!
আমিও ছুটলুম তাদের সঙ্গে। অবিশ্যি আমার ছোটাটা ঠিক ছোটা নয়। ওই টলমল করে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা। খিদে-তেষ্টায় মানুষ ছুটতে পারে!
হ্যাঁ, সত্যিই তো দলে দলে মানুষ হাত বাড়াচ্ছে। ওই তো তাদের হাতে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে যাচ্ছে। পৌঁছে যাচ্ছে জলের বোতল। সামনে একটা পেল্লাই ট্রাক। ট্রাকভর্তি খাবার। খিদেয় কাতর মানুষগুলোর হাতে খাবার যারা তুলে দিচ্ছে, তারা বিদেশি সৈনিক। আশ্চর্য, এরাই তো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে! নিরীহ মানুষ মেরেছে। আমার জন্মভূমিকে আঘাত করেছে। এরাই আবার খাবার দিচ্ছে!
আমি হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ালুম। নিজের মনকে নিজেই যেন নাড়া দিয়ে বলে উঠলুম, “মামুন, ওদের দেওয়া খাবার, জল তুমি মায়ের জন্যে নিয়ে যাবে? ভাব একবার। নিরীহ মানুষকে মারতে যারা পিছপা হয় না, তাদের খাবার তুমি মায়ের হাতে তুলে দেবে কেমন করে?” না, আমি পারলুম না হাত পাততে ওদের কাছে। আমি শূন্য হাতে ফিরে এলুম মায়ের কাছে।
এ কী! এইটুকু সময়ের মধ্যে মা এমন নিঃঝুম হয়ে গেলেন কেন! মা চোখ বুজে শুয়ে পড়েছেন। আমার পায়ের শব্দ মা শুনতে পেয়েছেন। আমি তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসতেই তিনি চোখ খুললেন। আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “মা, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?”
মা হাসলেন। ভারী মৃদু সে হাসি।
আমি নিরাশ গলায় আবার বললুম, “মা, কোথাও জল নেই। কী হবে মা?”
মা, আমার মুখের দিকে স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে অস্পষ্ট গলায় উত্তর দিলেন, “কী আর করা যাবে।”

মায়ের গলার স্বর শুনে আমার বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। আমার মনে হল, যেমন করে হোক মায়ের জন্যে এখনই একটু জল যেখান থেকে হোক আমাকে জোগাড় করে আনতে হবে। নইলে…।
নইলে যে কী ঘটতে পারে, সেই কথা ভেবে শিউরে উঠি। আমি ব্যস্ত হয়ে বলি, “মা, তুমি একটু শুয়ে থাকো এখানে চুপটি করে। আমি এখনই জল আনছি।”
আমার কথা শুনে মায়ের একটা হাত একটু আলতো উঠে আমায় যেন ছুঁতে চাইল। আমি তাড়াতাড়ি মায়ের কাছে আমার মুখখানা নামিয়ে এনে জিজ্ঞেস করি, “কী বলছ?”
মায়ের নিস্তেজ গলা দিয়ে একটি শব্দ অনেক কষ্টে বেরিয়ে আমার কানে পৌঁছে গেল, “গোলাপ।”
আমি চমকে উঠলুম। সত্যিই তো এই যুদ্ধের তাণ্ডবে আমি একেবারেই ভুলে বসে আছি সেই ফুলবাগিচার বুড়ো মালীদাদার কথা। ভুলে বসে আছি ফুলের কথা।
মা কি তবে এখন একটি গোলাপ তুলে আনতে বলছেন সেই বাগিচা থেকে? আমার মন ভীষণ আনচান করে উঠল। আমি থাকতে পারলুম না। মাকে বললুম, “মা, তুমি এখানে একটু অপেক্ষা করো, আমি তোমার জন্যে জল আর গোলাপ নিয়ে খুব জলদি ফিরে আসছি।” এবার, মা আমার কথা শুনে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই রইলেন। কোনও কথা বললেন না। আমি ক্লান্ত পাদুটোকে যত জোরে পারি টানতে টানতে গোলাপ আনতে এগিয়ে চলি।
কিন্তু কোথায় যাব, কোনদিকে যাব। সেই ফুলবাগিচা ফেলে যে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি। তার ওপর চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। আগুন। শব্দ। সৈনিকের হুংকার। যেখানে-সেখানে দেহ। সব কিছু ডিঙিয়ে আমাকে খুঁজতে হবে সেই পথ। সেই গোলাপবাগের পথ। এত বিপদ, এত কানফাটা শব্দ, এত আগুনের হলকা, আকাশপথে ছুটন্ত ক্ষেপণাস্ত্র সব কিছু তুচ্ছ করে আমি এগিয়ে চলি। হারিয়ে যাওয়া পথটাকে চেনার চেষ্টা করি।
মিথ্যে চেষ্টা করা। পথঘাট বোমার আঘাতে চূর্ণবিচুর্ণ হয়ে খানাখন্দে ভরে গেছে। আমাকে এই ভয়ংকর এবড়ো-খেবড়ো পথ ডিঙোতে হচ্ছে পায়ে পায়ে টপকে, না-হয় কখনও হামাগুড়ি দিয়ে। তবুও, সে যেন আনিমানি করে খুঁজে বেড়ানো। হাল ছাড়লে চলবে না। আমাকে একটি ফুল নিয়েই যেতে হবে মায়ের জন্যে, সেই বাগিচা থেকে।
আশ্চর্য কী, এই ছত্রাকার অবস্থা সামলাবার আগেই, এখন আমি যেখানে হাজির হয়েছি, হঠাৎ জায়গাটা আমি চিনে ফেলেছি। এই যে ভাঙাচোরা রাস্তাটা, এই রাস্তা ধরেই তো আমি ফুলবাগিচায় সেই মালীদাদার কাছে যাই। এত কষ্টের মধ্যেও অদ্ভুত একটা আনন্দ চমকে উঠল আমার বুকের মধ্যে। এতক্ষণ যে-পায়ে আমি ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে হাঁটছিলুম। সেই পায়ে দ্রুত হাঁটার শক্তি পেলুম। ছুটতে পারলুম না বটে, তবে হাঁটতে পারলুম পা চালিয়ে। বলব কী, কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি পৌঁছে গেলুম আমার সেই মালীদাদার ফুলবাগিচার দোরগোড়ায়!
কিন্তু হায় এ কী! কোথায় গেলেন আমার সেই মালীদাদা! কী অবস্থা হয়েছে গোলাপবাগের! অত বড় বাগানে যে অত গাছ, সেসব গেল কোথায়! গাছগুলো সব দুমড়েমুচড়ে মাটির ওপর গড়িয়ে পড়েছে। মালীদাদার ছোট্ট ঘরখানা গুঁড়িয়ে ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। আমি চিৎকার করে হাঁক দিলুম, “মালীদাদা!” একবার নয়, অন্তত দশবার এমনই করে ডাকলুম। শেষবার হাঁক পেড়ে আমার দম আটকে এল, তবু আমি সাড়া পেলুম না।
হায়, হায়, যেখানে একটি গাছও আর বেঁচে নেই, সেখানে কোথায় খুঁজব মায়ের জন্যে একটি গোলাপ! আমার চোখের জল বাগ মানল না। সেই ছলছল চোখেই আমি আঁতিপাতি করে খুঁজে বেড়াই। যদি পাই একটি গোলাপ মায়ের জন্যে। আমার মন কেন যে বারবার বলে উঠছে, একটি গোলাপ যদি মায়ের হাতে দিতে পারি তবে বুঝি মা’র সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। বুঝতে পারি যুদ্ধের আঘাত পড়েছে ফুলের ওপরেও। আহা!
ওই লুটিয়ে-পড়া গাছের ভাঙা ডালে কাঁটা। খুঁজতে খুঁজতে পায়ে ফোটে, না-হয় হাতে। রক্ত যদি ঝরে, ঝরুক। হায় রে, একটিও কি ফুল খুঁজে পাব না। যদি পাই!
হ্যাঁ, বন্ধুরা শোনো, বাগানের এককোণে একটি গাছ, কেবল একটিই গাছ, জীবন্ত দাঁড়িয়ে আছে। আরও শোনো, তার ডালে একটি ফুল, কেবল একটিই ফুল, লালগোলাপ ফুটে আছে। আমি তুলে নিলুম। প্রিয় বন্ধুরা শুনলে অবাক হয়ে যাবে, ফুলটি হাতে নিয়ে এবার আমি ছুটতে পারলুম। আমি ছুটছি। সামনে এক বিদেশি সৈনিক। সে আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “হলট!” আমি তার কথা শুনলুম না। তার হাতে বন্দুক ছিল না, ছিল জলের বোতল। আমি ছোঁ মারলুম সেই বোতলে। সেই সৈনিক থতমত খেয়ে গেল। সে হাতে রাইফেল তুলল কি তুলল না জানি না। আমি তার হাত থেকে জলের বোতল ছিনিয়ে নিয়ে যেমন ছুটছিলুম, তেমনই ছুটতে থাকলুম। রাইফেলের শব্দ শুনতে পেলুম না। বুঝতে পারলুম, সে আমায় মারল না। আমি সৈনিকের জলের বোতল ছিনতাই করেও বেঁচে গেছি। তবে কি সৈনিক আমাকে মারল না এই কারণে, যে তারও একটি ছেলে আছে বাড়িতে! ছেলের কথা কি মনে পড়ে গেল আমাকে দেখে তার হঠাৎ! কে জানে? কী জানি কেন যে আমারও আর মনে হল না জলের ওই বোতলটা শত্রুর। মনে হল ওই বোতলটাকে আমি জয় করেছি মায়ের জন্যে।
খেজুরগাছের বাগানটা ওই দেখা যাচ্ছে। আমি ছুটতে ছুটতে হাঁক পাড়লুম, “মা-আ-আ।”
হাঁকতে হাঁকতে পৌঁছে গেলুম মায়ের কাছে। মা শুয়ে আছেন। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, “মা, এই যে গোলাপ এনেছি!” হাত বাড়ালুম।
মা কোনও সাড়া দিলেন না। হাত বাড়ালেন না।
আমি থমকে গেলুম। অস্পষ্ট গলায় বলে উঠলুম, “মা, তোমার জন্যে জল এনেছি।”
মা নিশ্চুপ।
আমিও নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম।
তারপর বুকের ভেতরটা আমার কেমন করে কাঁপতে লাগল। আমার হাতের গোলাপটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
আমিও লুটিয়ে পড়লুম মায়ের পায়ের ওপর। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে ফেললুম। আর কিছু জানি না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন