শৈলেন ঘোষ

আমি এক ডাকাতদলের খুদে ডাকাত। আমরা দলে আছি সাতজন। দলের সর্দারকে আমার খুব ভাল লাগে। কেন না, সর্দার এক দুর্দান্ত সাহসী মানুষ। এই বয়সে আমারও দারুণ সাহস। অবশ্য আমার সাহস আমার সর্দারেরই জন্যে। কারণ, সর্দার আমাকে নিজের হাতে গড়ে তুলেছে। শুনলে অবাক হবে, আমি এখন জানি, একটা মস্ত বাড়ির মস্ত পাঁচিল কেমন করে ডিঙোতে হয়। আমি জানি, শত্তুরের মুখোমুখি পড়লে কেমন করে তাকে ঘায়েল করতে হয়। বাড়ির অন্দরে ঢুকে, ঘাপটি মেরে কেমন করে গোয়েন্দাগিরি করতে হয়। গোয়েন্দাগিরি মানে তো সে এক সাংঘাতিক সাহসের কাজ। কারণ সবার অজান্তে, সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তোমাকে খবরাখবর জোগাড় করতে হবে। তোমায় ঠিক-ঠিক বলতে হবে, কোন বাড়ির কোন ঘরের কোথায় সোনার গয়না আছে, কিংবা টাকার বান্ডিল কোন বিছানার নীচে লুকনো আছে। এই খবরের ঠিকানাটা যদি একটু বেঠিক হয়ে যায়, তা হলে যে কী ভয়ানক কাণ্ড ঘটে যেতে পারে, সে তো বুঝতেই পারছ!
বেঠিক আমার কোনওদিনই হয়নি। কারণ, যখন আমি গোয়েন্দা তখন আমায় কে বলবে ডাকাত! তখন আমি ছেঁড়া ফাটা কাপড় পরে অন্ধ সাজব, নয়তো খোঁড়া। মিথ্যে মিথ্যে অন্ধের মতো ঠোক্কর খেতে খেতে আমি হাঁটব, নয়তো খোঁড়াব।
আমি দেখেছি, অন্ধ দেখলেই যেন মানুষের দয়া-মায়া সবচেয়ে বেশি উথলে ওঠে। অবিশ্যি সব মানুষের কি আর! যারা ফন্দিফিকির খাটিয়ে মানুষ ঠকায়, তারাই যেন বেশি দয়ালু। বলতে কী একদিন এমন এক ফন্দিবাজ লোক আমাকে সত্যি-সত্যি অন্ধ ভেবে, আমার হাত ধরে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। আমাকে খুব যত্ন-আত্তি করে খাওয়াল। আর বিদায় দেবার সময় আমার হাতে একটা টাকা গুঁজে দিল। আমি তো সারাক্ষণ অন্ধ সেজে বসে ছিলুম। আর সুযোগ পেলেই চোখ পিটপিট করে কোথায় কী আছে দেখে নিচ্ছিলুম। আলমারি খুলে যখন টাকাটি আমায় বার করে দিল, আমি স্পষ্ট দেখলুম টাকা আর সোনাদানায় আলমারি একেবারে ঠাসা। আর কী। আমার কাজ সারা!
আমার এই সাহস আর বুদ্ধির জন্যেই সর্দারও আমায় খুব ভালবাসত। বলত, বড় হলে আমি একজন পাকা ডাকু হয়ে উঠব।
আমাদের লুটের মালগুলো সাতজনের মধ্যে ভাগাভাগি হলে সর্দার পেত বেশি। আর আমার ভাগে কম। কারণ, আমি তো ছোট। তা ছাড়া ওদের ঘর-সংসার আছে। বাড়িতে ছেলে-বউ আছে। টাকা-পয়সা নিয়ে মাঝে মাঝে ওরা বাড়ি যায়। ওদের দেখে আসে। আর আমার টাকা-পয়সা এই সর্দারের কাছেই থাকে। আমি নিয়ে কী করব? আমার তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি যখন আরও ছোট ছিলাম, তখন ঘর-বাড়ির কথা আমার মনেই হত না। জানতুম, এই আমার ঘর, সর্দারই আমার সব। কিন্তু এখন কাউকে বাড়ি যেতে দেখলে, আমার কেমন মন-কেমন করে। আমারও ইচ্ছে হয় বাড়ি যেতে। এক-একদিন রাতটা যখন নিঃঝুম হয়ে যায়, তখন যেন রাতের অন্ধকারটা মুখখানা ভীষণ ভেংচিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করে, “তোর মা কই রে?”
আমি চমকে উঠি, আর মনে মনে ভাবি, তাই তো, আমার মা কই?
আমাদের দলের সবচেয়ে পুরনো যে লোকটা, তাকেও আমার খুব ভাল লাগে। ফস করে একদিন তাকেই আমি জিজ্ঞেস করে বসি, “আচ্ছা, তোমরা তো সময় হলেই বাড়ি যাও। আমার বাড়ি কোথায়?”
আমি যে আচমকা লোকটাকে এতদিন পরে এমন একটা প্রশ্ন করে বসব, সে বুঝবে কেমন করে! তাই যেন থতমত খেয়ে গেল। আমার মুখের দিকে চাইল, দেখলুম, তারও চোখদুটো সন্দেহে চমকে-চমকে ছটফট করছে। সে কোনও কথা বলল না বলে আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলুম, “বলো না, তোমাদের মতো আমিও বাড়ি যাই না কেন?”
এবার সে উত্তর দিল। বলল, “তোমার তো বাড়ি নেই।”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “সবার আছে, আমার নেই কেন?”
সে বললে, “তা আমি জানি না।”
“তবে কে জানে?”
“হয়তো সর্দার জানে।”
আমার আর তর সইল না। আমি তক্ষুনি সর্দারের কাছে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “সর্দার, আমার বাড়ি নেই কেন?”
আচমকা বাজ পড়লে মানুষ যেমন চমকে যায়, সর্দার যেন তেমনই করে চমকে উঠল। তারপর নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে হো-হো করে হেসে উঠে বলল, “এই তো তোর বাড়ি।”
“এইটা? তবে কেন এখানে আমার মা-বাবা নেই?”
সর্দার যেমন হঠাৎ হাসতে শুরু করেছিল, ঠিক তেমনি হঠাৎ থমকে গেল। কোনও উত্তর দিল না।
আমি আবার আবদার করলুম, “আমার মা-বাবা কোথায় সর্দার?”
সর্দার গম্ভীর গলায় বললে, “আমি জানি না।”
“কেন?”
আমার এই প্রশ্ন শুনে হঠাৎ যেন রেগে ঝলসে উঠল সর্দারের চোখদুটো। গলার স্বরটা বেশ কর্কশ করেই সর্দার বলল, “কেনর উত্তর আমি দিতে পারব না।”
আমি কিন্তু ভয় পেলুম না। আমি বললুম, “তোমরা তো সময় হলেই বাড়ি যাও। কত কী কিনে নিয়ে যাও। আমাকে তোমরা ছুটি দাও না কেন? আমার কি ইচ্ছে করে না মা-বাবাকে দেখতে! বলো, আমার মা-বাবা কোথায় থাকে?”
“চোপ!” হঠাৎ বাজখাঁই গলায় ধমক দিল সর্দার।
আমিও গলা উঁচিয়ে উত্তর দিলুম, “কেন চুপ করব?”
বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে উঠে সর্দারের হাতটা আমার গালের ওপর প্রচণ্ড আঘাত করল। তারপর ধমক মেরে চেঁচিয়ে উঠল, “আমার মুখের ওপর কথা!”
আমার ভীষণ লেগেছিল। আমি আহত গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে সর্দারের মুখের দিকে তাকালুম। বিশ্বাস করতে পারছি না, সর্দার আমায় মারল। আমি চোখের জল সামলাতে পারলুম না। কেঁদে ফেললুম। সর্দার ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি তখন একা। নিঃসহায়!
কাঁদতে কাঁদতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম রাত্তিরবেলা। আমি জানতে পারিনি, আজকের এখন এই রাতটা কত গভীর। হয়তো আমি এমনই, নিশ্চিন্তেই ঘুমিয়ে থাকতুম। কিন্তু হঠাৎ যেন কার হাতের ছোঁয়া আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। আমি চোখ চাইলুম। এ কী। এ যে সর্দার। যে-গালে আমায় আঘাত করেছিল, আমার সেই গালে সে হাত বুলোচ্ছে। আমি চেয়ে আছি অবাক চোখে। সর্দার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, “জ্বলে উঠতে পারলি না? আমি যখন মারলুম, বসিয়ে দিলি না কেন আমার বুকে একটা ছুরি?”
আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। সর্দার উঠে দাঁড়াল। ওই দরজার এক কোণে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার কী ভয়ংকর নিস্তব্ধ। হঠাৎ সর্দার কথা কইল। প্রচণ্ড চাপা আর ভাঙা গলার স্বর। বলল, “তোর বাড়ি আমি জানি না। কেন না, তোকে আমি রাস্তা থেকে চুরি করে এনেছি।”
সে-কথা শোনা মাত্রই যেন চমকে থেমে গেল আমার বুকের প্রাণটা। আমি উঠে বসে পড়লুম।
সর্দার বলল, “তুই তখন অনেক ছোট। রাস্তার ধারে বসে বসে খেলা করছিলি। তোর মা-বাবা হয়তো কাছেই ছিল। আমি তোর মুখখানা কাপড়ে ঢেকে ছুট দিয়েছিলুম, তাই তখন তোর কান্নাটাও বোবা হয়ে গেছল। কেউ টেরও পায়নি। তখন থেকে কাছে কাছে রেখে তোকে বড় করেছি। ডাকাত বানিয়েছি।” বলতে বলতে সর্দার থামল। মনটা ঘৃণায় বিষিয়ে গেল আমার। আমি অন্ধকারের মধ্যে তীক্ষ দৃষ্টিতে সর্দারের মুখের দিকে চাইলুম। তারপর বিছানায় মুখ গুঁজে আমার মা আর বাবার মুখদুটি ভাবতে লাগলুম। কিন্তু কিছুই ভেবে পাই না আমি, কিছু না।
আমি শেষ রাত্রের অন্ধকারেই লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলুম রাস্তায়, কেন না, এখানে আমার আর একদণ্ডও থাকতে ইচ্ছে করছিল না। টের পেল না কেউ। এমনকী, সর্দারও না। আমি জানি না কোথায় যাব। শুধু জানি ডাকাতদলের এই আস্তানাটা আজ আমার কাছে অন্ধকূপের মতো ভয়ংকর। আমি যেন পালাতে পারলেই বাঁচি।
আমি বাঁচিনি। কারণ, রাত কেটে কখন সকাল হয়েছিল, আমার খেয়াল ছিল না। আমি আনমনে হাঁটছিলুম। এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন আমার ঘাড়টা খপাত করে খামচে ধরলে। আমি চমকে পিছনে ফিরেছি। দেখি, সেই লোকটা। অন্ধ ভেবে যে আমাকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। লোকটা হয়তো এক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠবে। কিন্তু কে দেবে চেঁচাতে! তার আগেই, তার পেটে মেরেছি এক ঘুষি। সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘাড় ছেড়ে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়েছে লোকটা। সেই তালে দে ছুট! কিন্তু লোকটা নিমেষে নিজে সামলে নিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল, “চোর, চোর।”
কেউ কিছু বোঝার আগেই, আমি এমন জোরে ছুট দিয়েছি যে, আর আমায় ধরতে হচ্ছে না। তবু তারা আমার পেছনে ছুটল। কিন্তু তখন তাদের নাগালের অনেক বাইরে আমি। আমি লুকিয়ে পড়েছিলুম। ওরা আমায় খুঁজে পেল না। লুকিয়ে পড়েছিলুম সামনে বেড়া দেওয়া মস্ত বাগানের মধ্যে। বাগানটার ভেতরেই একটু দূরে একটা ছোট্ট বাড়ি। আমার মনে হল, জায়গাটা নিরাপদ। এখানেই আমি চুপটি মেরে ঝোপের মধ্যে গা-ঢাকা দিলুম।
আশ্চর্য। চারদিক খুব নিঃঝুম হলেও বাগানের ভেতর থেকে একটা খসখসানি আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমি ঘাবড়ে গেলুম তাই তো! কেউ দেখতে পেল নাকি! লুকিয়ে লুকিয়ে অনেকক্ষণ পরেও যখন কাউকে দেখতে পেলুম না, তখন চুপিসারে ঝোপ সরিয়ে উঁকি মারলুম। এক-পা, এক-পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। দেখছি। হঠাৎ আমার চোখটা ধাঁধিয়ে গেল। দেখি কী, বাগানের মধ্যে একটা শিংওলা হরিণ। গাছের সঙ্গে বাঁধা। বাঁধন খোলার জন্যে যতই সে পা ঠুকে ছটফট করছে, ততই গাছের শুকনো পাতায় খসখসানি আওয়াজ উঠছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। ভাবলুম, সেখানে যখন হরিণ আছে, তখন নিশ্চয়ই কাছে-পিঠে হরিণের মালিকও আছে। কিন্তু হরিণটাকে দেখতে দেখতে আমি মালিকের কথা ভুলেই বসেছি। সত্যি, কী সুন্দর দেখতে হরিণটাকে! হলুদ গায়ে ছোপ-ছোপ রং-বাহারি! চোখদুটো টানা-টানা। শিংদুটো গাছের ডালের মতো আঁকা-বাঁকা। আমি অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলুম। আমার এত ভাল লেগে গেল। আমি এবার এগিয়ে গেলুম। একেবারে হরিণটার কাছাকাছি। কেউ দেখতে পেলে আমায় যে শেষ করে ছাড়বে, এ-কথাটা আমার আর মনেই এল না। হরিণটাও আমায় দেখে কেমন যেন থ হয়ে গেল। ছটফটানি থামিয়ে আমার মুখের দিকে ঠায় চেয়ে রইল!

আমার সাহস বেড়ে গেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলুম হরিণটার দিকে। তবে হরিণটার একেবারে কাছে যেতে গা ছমছম করছে। ওই মাথার শিং যদি আমার পেটে বসিয়ে দেয়! তবে তো গেছি!
কিন্তু কই, হরিণটা তো শিং নেড়ে ভয় দেখাচ্ছে না। আমার দিকে চেয়ে চেয়ে খালি পা ঠুকছে। যেন ডাকছে আমায়। আমি আরও একটু এগিয়ে গেলুম। হাত বাড়ালুম। আমার হাতটা চেটে দিল। হরিণটা কি তবে আমার সঙ্গে ভাব করতে চাইছে? আমি হরিণটার কপালে হাত দিলুম। কিচ্ছু বলল না। গলাটা জড়িয়ে ধরলুম। হরিণটা আনন্দে ঘাড় দোলাল। আমি হরিণটার বাঁধন খুলে দিলুম। হরিণটা প্রথমে থমকে গেল। তারপর বাগানের মধ্যে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে লাগল। আমি ধরতে গেলুম। পালিয়ে গেল হরিণটা। আমিও পিছু নিলুম। হরিণটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। আমিও চুপি চুপি ঝোপের কাছে এসে লাফিয়ে পড়লুম। হরিণটা চোখের পলকে ভোঁ-কাট্টা। যেন সে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিল। আমার কী মজাই না লেগে গেল। আমি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলুম। হরিণটাও আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আমি আনন্দে ফুলের গাছগুলো মাড়িয়ে-মুড়িয়ে শেষ করে ফেললুম। তবু হরিণটাকে ধরতে পারলুম না। তখন আমি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিলুম, “আঃ আঃ।” আশ্চর্য, হরিণটা ভয় পেল না। আমার কাছেই এল। আমার পেটের মধ্যে মুখটা গুঁজে আমায় আদর করতে লাগল। আমার কাতুকুতু লেগে গেল। আমি খিলখিল করে হেসে ফেললুম। আমি হাসছি আর হাসছি। কখন যে হরিণের মালিক বাগানের গেট খুলে ভেতরে ঢুকেছিল, আমার নজর পড়েনি। কতক্ষণ যে সে আমার দিকে চেয়ে আমার হাসি শুনেছিল, তাও আমি জানি না। হঠাৎ দেখতে পেয়েছি। তাকে দেখেই চুপসে গেল আমার হাসি। দেখি, লোকটার মাথায় একটা তালপাতার টুপি। কাঁধে একটা তির-ধনুক। খালি গা। কাপড়টা হাঁটু পর্যন্ত উঁচু। মালকোঁচা মারা। আমার দিকে কটমট করে চেয়ে আছে। লোকটা হঠাৎ গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল, “কে?”
বলব কী, সঙ্গে সঙ্গে হরিণটা তিরবেগে ছুট দিল। ছুটতে ছুটতে বাগানের বেড়া টপকে একেবারে বাগানের বাইরে। আমিও তাই দেখে মার ছুট। সটান হরিণটার পেছনে। লোকটা এবার ব্যস্ত হয়ে হেঁকে উঠল, “চোর চোর।” আমার বুকটা ধক করে উঠল। লোকটা আমায় চোর বলল কেন? তবে কি আমায় চিনে ফেলেছে? না, ভাবছে হরিণটাকে আমি চুরি করে পালাচ্ছি? এবার আমার শেষ। তবু রক্ষে, কাছে-পিঠে কেউ ছিল না। আমায় ছুটতে দেখে কেউ আমায় ধরতে এল না। কিন্তু লোকটার হাত থেকে ছুটে এল ধনুকের ছিলা ছিটকে একটা ফলা-আঁটা তির। একেবারে আমার পায়ের গোড়ালির মধ্যে বিঁধে গেল। আমি টাল সামলাতে পারলুম না। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলুম। যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে পেছন ফিরে দেখি, পায়ের ভেতর তিরটা আটকে আছে। টেনে খুলে ফেলতেই ঝরঝর করে রক্ত বেরিয়ে এল। আমি উঠে পড়লুম। দেখতে পেলুম হরিণটাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। লোকটাও ছুটে আসছে। আমি পালাতে গেলুম। পারলুম না। ভীষণ যন্ত্রণায় খোঁড়াতে-খোঁড়াতে ঘুরপাক খাচ্ছি। লোকটা ছুটতে ছুটতে কাছে এসে গেল। আমি বোধহয় ধরা পড়ে গেলুম। কিন্তু আশ্চর্য, আমায় ধরার আগেই, হরিণটা তিরের মতো লাফিয়ে এসে লোকটার পেটে মেরেছে এক ঢুঁ। সে একেবারে মাটির ওপর চিতপটাং। হকচকিয়ে গেছে। তড়বড়িয়ে উঠতে গেছে যেই, হরিণটা আবার দিয়েছে এক গোত্তা। আবার মেরেছে। লোকটা মাটির ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল। এই রে। হরিণটা বুঝি ওকে মেরেই ফেলে। না, কোনওরকমে সামলে নিয়ে লোকটা উঠে দাঁড়িয়েই মার ছুট। মাটিতে যে মাথার টুপিটা পড়ে রইল সেদিকে তার খেয়াল নেই। হরিণটাও ছাড়বে না। পেছনে তাড়া দিয়ে এমন গুঁতিয়ে মারলে, যে লোকটা জেরবার।
এখানে আমার আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। এই ফুরসতে পালাতে হবে। আমি মাটিতে পড়ে-থাকা টুপিটা তুলে নিয়ে মাথায় দিলুম। কেউ দেখলে চট করে আমায় চিনতে পারবে না। মাথায় তালপাতার টুপি পরে আমি ভারী কষ্ট করে দ্রুত হাঁটতে লাগলুম। আমি দেখছি, আমার পায়ের ক্ষত দিয়ে রক্তের ফোঁটাগুলি মাটির ওপরে গড়িয়ে পড়ছে। এই রক্তের ফোঁটাগুলি দেখে দেখে কেউ যে আমার হদিশ পেয়ে যেতে পারে, এ-কথা মনে হতেই আমার বুকটা ভয়ে শুকিয়ে গেল।
কিন্তু এই ভয়ের চেয়ে এখন পায়ের যন্ত্রণাটাই আমায় অসহ্য কষ্ট দিচ্ছে। কষ্ট নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমি আর কোথাও যেতে পারলুম না। নিজেদের আস্তানাতেই ফিরে এলুম। বাঁচতে হলে এই আস্তানাতেই ফিরে আসতে হয়। অন্তত লুকিয়ে তো থাকতে পারব। কিন্তু আশ্চর্য, আস্তানাতে কেউ নেই। কাউকে তো দেখতে পেলুম না। না আছে সর্দার, না অন্য কেউ। এমনকী, কোনও জিনিস-পত্তরও তো দেখছি না। তবে কি আস্তানা ছেড়ে সবাই পালিয়েছে। নাকি ধরা পড়েছে। তা হলে তো আমারও বিপদ। কিন্তু এখন আর আমি বিপদের কথা ভাবতে পারছি না। পায়ের প্রচণ্ড ব্যথায় আমি আর দাঁড়াতে পারলুম না। মাটির ওপরই বসে পড়লুম। তারপর পায়ে হাত দিয়ে ছটফট করতে করতে মুখ গুঁজে এলিয়ে পড়লুম।
আমি যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলুম আর মনে মনে ভাবছিলুম, এখন আমি কী করব। এত কষ্টেও হরিণের কথাটা আমার বার-বার মনে পড়ছিল। নিজেকে নিজেই আমি ঘৃণায় ধিক্কার দিয়ে উঠলুম। ছিঃ ছিঃ। আমি ডাকাত। আর ওই একটা ছোট্ট প্রাণী কত সুন্দর।
আঃ! চমকে উঠলাম। আমার পায়ের ক্ষতটা কে যে চেটে দিচ্ছে। পা সরাতে গিয়ে দেখি, এ কী। এ যে সেই হরিণটা। কোথা থেকে এল। তবে কি ও পথের ওপর আমার পায়ের রক্তের চিহ্ন দেখে দেখে এসেছে এখানে। আমি ওর গলাটা জড়িয়ে ধরলুম। আমার চোখের দু’ ফোঁটা জল মাটিতে পড়ার আগেই ও যেন মাথা পেতে দিল। কী জানি কেন, তখন যেন আমার মনে হল, আমি আবার দাঁড়াতে পারব। আমি দাঁড়ালুম। আমার মনে হল, তির-বেঁধা আমার পায়ের ক্ষতের যন্ত্রণা হরিণের মুখের ছোঁয়া পেয়ে যেন জুড়িয়ে আসছে। আমি পা ছুড়ে লাফ দিলুম। আমার লাগল না। আমি চরকি খেতে খেতে ছুটতে লাগলুম। কষ্ট হল না। তবে কি বনের কোনও ওষুধ মুখে এনে হরিণটা আমার পায়ে লাগিয়ে দিল। আমি হরিণের গলাটা জড়িয়ে ধরে চুমু খেলুম। হরিণটা বসে পড়ল। যেন বলছে, আমার পিঠে বোসো। আমি হরিণের পিঠে লাফিয়ে বসলুম। আমার মাথায় সেই তালপাতার টুপি। আমাকে পিঠে নিয়ে তিরবেগে ছুটল হরিণটা। আমি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে হেসে উঠলুম।
ছুটতে ছুটতে এ কোথায় নিয়ে এল হরিণটা আমায়। এদিকে তো আমি কোনওদিন আসিনি। হরিণের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে ছুট দিলুম। সবুজ ঘাস। কখনও দেখি, ঝাউগাছের ফাঁকে ফাঁকে অনেক পাখির নাচ। কখনও দেখি, অনেক ফুলে অনেক ফড়িং দোল খাচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঝরনা যেন জলতরঙ্গের বাজনা বাজাচ্ছে। ঝরনার জল ছড়িয়ে ছড়িয়ে গায়ে মাখলুম। মুখে ছিটোলুম। আঃ কী, ভাল লাগছে। তারপর শুয়ে পড়লুম পাথরের গায়ে। শুয়ে শুয়ে আকাশের ছায়া দেখতে লাগলুম। আকাশের গায়ে গায়ে মেঘ ভেসে যায়। কখনও সে-মেঘ আকাশের গায়ে হাঁসের ছবি এঁকে দিচ্ছে। উড়তে উড়তে সে-হাঁস কখনও বাঘ, কখনও হাতি, নয়তো মস্ত একটা দানব। তারপর চেয়ে দেখি, মস্ত দানবের পেছনে পেছনে জুড়ি-ঘোড়ার রথ ছুটিয়ে ধেয়ে আসছে এক বীরপুরুষ। হাতে তার বর্শা। তার পেছনে এক বীর নারী। ওরা বুঝি মারবে দানবটাকে ওই বর্শার ঘা দিয়ে? হয়তো তাই। কেন না, ওই দানব যে ওদের ছেলেকে চুরি করে পালিয়েছিল। আজ ধরা পড়েছে।
চমক ভাঙল আমার। ভাবলুম, আমিই কি ওদের সেই ছেলে? ওই বীরনারী আর ওই বীরপুরুষ, ওরাই কি আমার মা আর বাবা? হাওয়া উঠল। এলোমেলো হয়ে গেল মেঘের ছায়া। হারিয়ে গেল আমার মায়ের ছবি। আমার চোখ উপচে জল নামল। আমি কেঁদে ফেললুম।
হঠাৎ হরিণটা কাছে এল। আমার পাশে পাথরের ওপর বসল সে। আমার গায়ে মাথা ঠেকাল। কান্না-চোখে তার দিকে তাকালুম একবার। তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলুম। আদর করতে করতে ক্লান্ত চোখদুটি আমার বুজে এল। আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন