শৈলেন ঘোষ

এ সেই মেয়েটির গল্প। না, তোমার দৃষ্টি পাবে না তার দিশা। তাকে ধরা যাবে না তোমার হাতের ছোঁয়ায়।
সে হাসে। শুনতে পাবে না সে হাসি। যদি সে কখনও কাঁদে, সে কান্নাও কানে আসে না।
সে গান গায়। তাকে কাছে ডাকা যায় না। বলা যায় না, আর একটা গাও, শুনি! কেননা, সে থাকে অনেক দূরে। কত দূরে?
রুক্ষ, নির্জন, সীমাহীন প্রান্তর। প্রান্তরে পিরামিড। সবাই বলে চাঁদের আবাস এই পিরামিড। কতদিন, কতকাল কেটে গেছে। কতদিন, কতকাল কত ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে।
ক্ষয়ে-ক্ষয়ে এখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সেই পিরামিড। মেয়েটি থাকে এই পিরামিডের অন্দরে। চাঁদকে খুঁজে বেড়ায়। পায় না।
আকাশ ছাড়া সে আর দেখে না চাঁদকে কোথাও! তাই সে আকাশে যেতে চায়! পিরামিডের চুড়োয় সে উঠে হাত বাড়ায়। আকাশের নাগাল খোঁজে। যেদিন চাঁদকে বলি পূর্ণিমা, সেদিন সে চাঁদের আলোয় উছলে ওঠে। পিরামিডের চুড়োয় দাঁড়িয়ে চেয়ে দেখে, আলোর জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চরাচর। রুক্ষ প্রান্তর কেমন ঝলমল করছে! দেখেছ তুমি কি মেয়ের মুখখানি? সেই আলোয়?
না, তুমি দেখতে পাবে না। আমিও না, তুমিও না, কেউ না। শুধু দেখতে পায় একজন। এই নির্জন পিরামিডের প্রান্তরে কে সে জন? একটি পাথরের মূর্তি, বয়স কি তার হাজার বছর? হতে পারে। বেশিও বলতে পারি। তবু জানি, পাথরের যতই বাড়ুক বয়স, মূর্তির পালটায় না আদল।
এ মূর্তি যে একটি কিশোর ছেলের। পিরামিডের সোপানের নীচে ঠায় দাঁড়িয়ে সে। মাথায় তার টুপি পাথরের। পরনে তার জামা পাথরের।
আঁকিবুকি কত কী খোদাই করা জামায়।
সে দ্যাখে। হয়তো দ্যাখে, মেয়েটির মুখখানি। সে শোনে। হয়তো শোনে, তার গানের মূৰ্ছনা। সে বলে। হয়তো বলে, আর একটা গান গাও! শোনা যায় না সে-কথা।
মেয়েটি ভালবাসে। ভালবাসে চাঁদকে যেমন, মেয়েটি ভালবাসে মূর্তিটি তেমন। মেয়েটি আদর করে মূর্তিকে। জড়িয়ে ধরে। তার চোখের দিকে তাকায়। বলে, আহা রে! তুই যদি আমার ভাই হতিস! কে তোকে এমন করে বানিয়েছে, এমন মূর্তি? পাথরে?
যত কথা একাই বলে মেয়েটি। যত আদর একাই করে সে।
তারপর?
একাই পায়ে-পায়ে ঘুরে বেড়ায়। পিরামিডের অন্দরে। নয়তো সীমাহীন প্রান্তরে। প্রান্তরে বাতাস। ছুটে বেড়ায় বাতাসে-বাতাসে। হাসে। না-হয় গান গায়।
এমনই সময় একদিন...
শুনতে পেয়েছিল কার যেন আতঙ্কের চিৎকার:
“অমন করে ছুটো না, ছুটো না পড়ে যাবে!” মেয়েটি থমকে দাঁড়ায়। চমকে তাকায় এদিক ওদিক। প্রান্তর শূন্য। কেউ কোত্থাও নেই।
তবে কি সে ভুল শুনল! দেখি তো আবার! ক্ষণিক দাঁড়ায়। পরক্ষণেই ছোটে আবার।
পরক্ষণেই সে শুনতে পায় আবার সেই কণ্ঠ: “আমার কথা শুনছ না কেন? পড়ে গেলে তখন? কে দেখবে তোমায়?”
কার এ কণ্ঠস্বর? কে এমন করে মানা করে? মেয়েটি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। হতভম্ব হয়ে দেখে প্রান্তরটা। যতদূর চোখ যায়। কিছুই নজরে পড়ে না। ধু ধু।
মেয়েটি তখন চিৎকার করে ওঠে: “কে তুমি?”
বাতাসে ভেসে যায়: কে তুমি... তুমি... মি-ই...!
উত্তর আসে: “আমি-ই!”
সেই ‘আমি’কে আঁতিপাতি খোঁজে মেয়েটি। সেই ‘আমি’ দূর থেকে স্থির চোখে দেখে।
সেই ‘আমি’ বলে, “অমন করে খুঁজো না। কষ্ট হবে তোমার। পাবে না আমায়।”
মেয়েটি অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে: “তুমি কি বাতাস?”
সে উত্তর দেয়: “আমি পাথর। বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছি আমার কণ্ঠ। শুধু তোমারই জন্যে।”
পাথর! মেয়েটি চমকে ওঠে। বলে: “পাথর কি কথা কয়? কখনও?”
সে উত্তর দেয়, “না, কয় না।”
“তবে?”
“আমি কই।” তার গলা শোনা যায়, “কেননা, আমি পাথরে গড়া মানুষ। তোমার মতো আমার মুখ-চোখ-কপাল। তোমার মতো হাত-পা। কিন্তু মন নেই তোমার মতো আমার। পারি না হাসতে তোমার মতো। কিংবা গান গাইতে। তাই যখন আদর করো। আমাকে, পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, শুধুই পাথর। তুমি যখন ছুটে ছুটে খেলা করো, আমি পারি না ছুটতে। কেননা তখনও আমি পাথর।”
এবার বুঝতে পেরেছে মেয়েটি! ওই যে সোপানের নীচে দাঁড়িয়ে কিশোর-মূর্তি প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে, ওই যে মূর্তিটি— যাকে সে বলেছে ভাই, তবে বুঝি সে কথা বলেছে! ছুটল মেয়েটি তার কাছেই।
সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার চোখের দিকে তার গায়ে-মাথায় হাত বোলায়। তারপর শুধায়, “তুই সাড়া দিস?”
সে বলে ওঠে “হ্যাঁ, আমি।”
“কেমন করে পাথর তুই কথা বলিস?”
মূর্তি বলে, “তুমি আমাকে যেমন করে আদর করো। কেউ তো কখনও তোমার মতো ভাই বলে ডাকেনি আমাকে। দিদির সঙ্গে কথা না-বলে থাকা যায়?”
মেয়েটি বলে, “হায় রে তোকে কেন ভাই বলেছি, তুই তো পাথর! না-পারিস হাসতে, না-পারিস ছুটতে। না-পারিস খেলতে! না-পারিস গাইতে।”
মূর্তি উত্তর দিল, “আমিও ভাবি তা-ই, কেন তুমি আমায় ভাই বললে? তুমি আমায় ভালবাস, আমি পারি না। তুমি আমায় আদর করো, আমি টলি না। আমি পাষাণ। আমার যদি মন থাকত তোমার মতো! আমার যদি তোমার মতো চোখের তারাদুটি ঘুরেফিরে দেখতে পেত এদিক ওদিক! তোমার মতো ঠোঁটদুটি হাসত আমার, কিংবা গাইত! তোমার মতো আমার হাতের আঙুলগুলি যদি তোমাকে ছুঁতে পারত! নয়তো আমার পাদুটি ছুটে ছুটে যদি খেলা করত তোমার সঙ্গে! তবে কী মজা হত বলো! আমি ঠাই দাঁড়িয়ে আছি এখানে। কতদিন জানি না। কত প্রখর রোদের তাপ সহ্য করেছি। কত বর্ষায় ভিজেছি আমি অসহায়ের মতো। দুরন্ত শীতে নিঃশব্দে কুয়াশা গায়ে মেখেছি। তবু কেউ এসে আমাকে বলেনি ‘ভাই’। কেউ এসে তোমার মতো করেনি আদর। মুছিয়ে দেয়নি আমার গায়ের ধুলো। তোমার ওই ‘ভাই’ ডাক আমাকে অস্থির করেছে। আমি আর এখানে থাকতে পারছি না— এমন অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে। তুমি আমাকে ভেঙে ফেলো। তুমি আমাকে ভেঙে টুকরো করে, ধুলোর সঙ্গে ধুলো করে দাও! ওগো দিদি, তোমার পাথরের ভাই হয়ে থাকতে আমার যে কষ্ট হয়।”
মেয়েটি আঁতকে ওঠে। ধমক দিয়ে বলে, “ছি-ছি, এ কী বলছিস তুই! ভাইকে আমি টুকরো করে ফেলব ভেঙে? কোন দিদি কোন ভাইকে এমন করে ভাঙে বল? কোন দিদি এমন নিষ্ঠুর হতে পারে! যে-হাত দিয়ে এতদিন তোকে আদর করেছি, সেই হাত দিয়ে তোকে আমি ধুলোর সঙ্গে ধুলো করে দেব? না রে না, তা হতে পারে না। আমি খুঁজে আনব প্রাণ তোর জন্যে। খুঁজে আনব মন, যেখান থেকে পারি। আর যদি না পারি...” বলতে বলতে থামল দিদি।
শুনতে শুনতে বলল ভাই, “থামলে কেন?”
দিদি বলল, “থামলুম, এবার প্রাণের খোঁজে যাব বলে।”
ভাই জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানো প্রাণ কোথায় পাওয়া যায়?”

“না।”
“তবে?”
“পৃথিবীটা ছোট নয় আমার কাছে। প্রাণের অভাব নেই পৃথিবীতে। আমি খুঁজব।”
“যদি না পাও?”
মেয়ে উত্তর দেয়, “সে ভাবনা আমার। তোর না।” এই বলে সেই মেয়ে বেরিয়ে পড়ল পৃথিবীতে প্রাণ খুঁজতে। ভায়ের জন্যে। যে-ভাই পাথর।
কী সুন্দর এই পৃথিবী। যেমন এই প্রান্তর রুক্ষ, তেমনই অরণ্য সবুজ। কোথাও সমুদ্র ভয়ংকর, কোথাও শান্ত নদীর স্রোত। কোথাও পাহাড় আকাশছোঁয়া, কোথাও পাহাড়চূড়ায় তুষার। কোথাও মরুর দেশ, কোথাও বা ঝরনার ঝরঝরানি। এদের কি সবারই প্রাণ আছে? ভাবে মেয়েটি।
সে অরণ্যকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, “হে অরণ্য, তুমি কি বলতে পারো কোথায় প্রাণ পাওয়া যায়?” বাতাস বয়ে যায় অরণ্যের গাছে গাছে। পাখি ডাকে গাছের ডালে ডালে।
কেউ উত্তর দেয় না। উত্তর দেয় না ভয়ংকর সমুদ্র, অথবা শান্ত নদী।
উত্তর দেয় না আকাশছোঁয়া পাহাড়, নয়তো ঝরনার ঝরঝরানি।
কিন্তু মরুর দেশে মেয়েটি দেখতে পায় হঠাৎ, এক বৃদ্ধ মানুষকে। বৃদ্ধ মানুষটির মুখোমুখি হতেই মানুষটি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “এমন তপ্ত-বালির ওপর পা ফেলে, ও মেয়ে আনমনা, কোথা যাস তুই?”
মেয়ে বলে, “আমি যাই প্রাণের খোঁজে।”
অবাক হন বৃদ্ধ। বলেন, “সে কেমন কথা?”
মেয়ে বলে, “ওগো বৃদ্ধ, আমি সাতসুমুদ্দুর পারাপার করেছি, তেরো-নদীর পাড়ে পাড়ে নিজের ছায়া দেখেছি, পাহাড়-অরণ্য তোলপাড় করেছি, কেউ আমায় সাড়া দেয়নি। তুমি কি বলতে পারো, প্রাণ পাওয়া যায় কোথায়? কে আমাদের প্রাণ দেয়?”
“মা।” উত্তর দিল বৃদ্ধ।
“মা?” চমকে ওঠে সেই মেয়ে।
“হ্যাঁ, মায়ের পেটে মায়ের শ্বাস নিয়ে প্রাণ পেয়েছিস তুই, জন্মেছিস মাটিতে। বড় হয়েছিস। মা ছাড়া তো প্রাণের খবর আর কারও কাছে নেই। যা, মা’র কাছে যা!”
“কিন্তু আমি যার প্রাণ চাই সে যে আমার ভাই। পাথরের। তার যে মা নেই!” নিরাশ গলা মেয়েটির।
বৃদ্ধ বলেন, “তুই কি পাগল! পাথরের প্রাণ চাস!”
মেয়ে উত্তর দেয়, “ওগো বৃদ্ধ, সে যে আমার মতো। তার দুটি চোখ আমার মতো। ঠোঁটদুটি তার আমার মতো। আমার মতো দুটি হাত, দুটি পা। কিন্তু সে পাথরের। আমি বলেছি তার জন্যে প্রাণ খুঁজে আনব।”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “ওরে বোকা মেয়ে, সে যে পাথরের তৈরি পুতুল! পুতুলের জন্যে প্রাণ খুঁজে বেড়াচ্ছিস তুই?” বলেই হেসে উঠলেন সেই বৃদ্ধ, হো-হো-হো! সে হাসি থামে না যেন! হা-হা-হা, হো-হো-হো!
সেই হাসির শব্দে আচমকা মরুর বাতাসও যেন দুরন্ত হয়ে ওঠে। বাতাসে ঝঞ্ঝার দামামা বেজে উঠল। ছুটল বাতাস ঝঞ্ঝার তোড়ে। উড়ল বালি আকাশ ছেয়ে। নেমে এল আঁধার।
মরুর বুকে বালির আঁধার! চিৎকার করে ওঠে সেই মেয়ে! সেই চিৎকারে কেউ সাড়া দেয় না। কান্না শোনা যায় সেই মেয়ের গলায়। সে-কান্না শোনে না মরুর ঝঞ্ঝা। বালি তার চোখে-মুখে ঝাপটা মারে। ঝঞ্ঝা তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়! সে চেঁচিয়ে ওঠে, বাঁচাও!
কেউ আসে না বাঁচাতে তাকে।
সে জেরবার হয়ে হাঁপায়। পারে না আর ঝঞ্ঝার সঙ্গে লড়াই করতে। হেরে যায়। তারপর সে হারিয়ে যায়!
ঝঞ্ঝা থামল। শান্ত, নিস্তব্ধ চারদিক। বালির স্তূপ জমেছে পাহাড়-উঁচু এধারে-ওধারে। দেখা নেই সেই বৃদ্ধ মানুষটিরও।
দূর থেকে বাতাসে যেন ভেসে আসছে সেই মেয়ের গলার স্বর অস্পষ্ট, “প্রাণ দাও! প্রাণ দাও! আমার পাথরে-গড়া ভাইয়ের জন্যে একটু প্রাণ!”
খানিক পরে তা-ও আর শোনা গেল না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন