শৈলেন ঘোষ

কে জানত, একদিন হঠাৎ ওদের দেখা হবে। ওদের বন্ধুত্ব হবে। ওদের আকাশে উড়িয়ে যুদ্ধ হবে প্যাঁচখেলার। একটা আর-একটার ঘাড়ে গোত মেরে যখন সুতোয় জড়িয়ে লাট খাবে, তখন চিৎকার করবে মানুষ আনন্দে! হ্যাঁ, ওরা দুটি ঘুড়ি। একটার নাম চাঁদিয়াল। আর-একটা পেটকাটা।
কে না দেখেছে, একটি বীজ মাটিতে পুঁতলে, তার থেকে কেমন করে গাছ জন্ম নেয়। গাছটি ধীরে ধীরে সবুজ পাতা ছড়িয়ে হাওয়ায় দোলে। ফুলের কুঁড়ি উঁকি মারে। ফুল ফোটে।
আবার দ্যাখো, ওই যে গাছে পাখির বাসা, মা-পাখি বাসায় বসে তার ডিমে কেমন তা দিচ্ছে! দিতে দিতে ফুট করে যেই ডিম ফুটছে, ছানাপোনা কিচির মিচির ডাক দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। বেরিয়েই হাঁ করে মুখ তুলছে আকাশে। খাবার চাইছে মায়ের কাছে। তারা বড় হবে। একদিন আকাশে ডানা মেলে তারা উড়বে। কী সুন্দর দেখতে সেই পাখি! বাহার-ছড়ানো কী তাদের গায়ের রং। আমরা চোখ মেলে দেখব, আর মনে মনে বলব, বাঃ!
এমনি করে রোজ পৃথিবী নতুন হচ্ছে। জন্ম নিচ্ছে রোজ অসংখ্য প্রাণ। গড়ে উঠছে ভালবাসা। আর বন্ধুত্ব। নতুন! নতুন!
কিন্তু ওই দুটো ঘুড়ি? ওরা তো আর গাছও নয়, পাখিও নয়। ওদের প্রাণও নেই ভালবাসাও নেই। হাতে গড়া দুটো খেলনা। কাগজের। কে তাদের বানিয়েছে, সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না! কে ছিল কোথায় তার কে হিসেব রাখে! ওদের কিনে আনা হয়েছে দোকান থেকে। উৎসবের দিনে উড়বে ওই দুটো ঘুড়ি। তারপরে লাট খেতে খেতে ওরা লড়াই করবে আকাশে। কে যে ভোঁকাট্টা হয়ে কোথায় পড়বে, কেউ জানে না। কেউ গড়িয়ে পড়তে পারে গাছে, কিংবা ইলেকট্রিক তারে। লুটিয়ে পড়তে পারে কারও ছাদে, নয়তো নদীর জলে। নদীর জলে নাকানিচোবানি খেয়ে তার বুকের কাঁপকাঠি ছিটকে গেলে, সে তখন কেবলই একটা ফাটা কাগজের টুকরো। তখন কেউ চোখ ফিরিয়ে দেখবে না তাকে। আহাও করবে না, উহুও করবে না। সে তখন একটা আবর্জনা। আবর্জনা নিয়ে কে আর দয়া দেখায়!
কিন্তু একদিন উৎসব আসেই। বাজনা বাজে। মাঠে, ছাদে, পথেপ্রান্তরে ঘুড়ির উৎসবে আকাশ উপচে পড়ে। উল্লাসে ভরে যায় চারদিক। আর সেই উৎসবে ওই দুটো ঘুড়ি পাক খায় আকাশে। একটা চাঁদিয়াল, অন্যটা পেটকাটা। এ-বাড়ির ছাদ, ও-বাড়ির একফালি ফাঁকা জমি থেকে ওদের ওড়ানো হচ্ছে। ওদের বুকফুটো কলে সুতো বাঁধা হয়েছে। সেই বাঁধা সুতো লাটাই ঘুরে খুলছে ওদের হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। ভাসতে ভাসতে উড়ে যায়। উড়তে উড়তে চাঁদিয়াল যেন আড়চোখে তাকিয়ে দেখে পেটকাটাকে। পেটকাটাও দেখে যেন পিটপিটিয়ে চাঁদিয়ালকে। এবার বোধহয় প্যাঁচের খেলা শুরু হবে।

না তো! এখনও তো দুই ঘুড়ির দুই মালিকের সুতো ছাড়ার খেলা চলছে। আরও ওপরে উঠছে ওরা। উঠতে উঠতে দুই ঘুড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে একে ওকে। দেখতে দেখতে দুলছে আর ভাবছে, তারা যেন কতদিনের বন্ধু। দুলতে দুলতে হঠাৎ যেন চাঁদিয়াল কথা বলল, এই আকাশ থেকে ওই নীচের নদীটা কী—সুন্দর দেখতে লাগছে! কেমন এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে!
পেটকাটা যেন তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, আমাদের এক-একজন বন্ধু-ঘুড়ির ল্যাজও এমনি করে হাওয়ায় ভাসে এঁকেবেঁকে।
চাঁদিয়ালটা বোধহয় একটু মুচকি হাসল। হাসতে হাসতে বলল, ঘুড়ির ল্যাজের সঙ্গে তুলনা করছিস নদীর? ঘুড়ির ল্যাজ তো এইটুকুস। আর নদী দ্যাখ কত বড়! জানিস নদীর চেয়েও বড় সাগর!
তুই কেমন করে জানলি? জিজ্ঞেস করল পেটকাটা।
চাঁদিয়াল উত্তর দিল, ওই যে দেখছিস ছেলেটি আমায় ওড়াচ্ছে, ও কাল আমায় কিনে আনে। ওর পাশে ওই যে দেখছিস আর-একটি ছোট্ট ছেলে লাটাই ধরে ওকে সাহায্য করছে, ওই ছেলেটি ওর ভাই। কাল সন্ধেবেলা ভাই যখন মাস্টারমশায়ের কাছে পড়ছিল, তখন এইসব কথা শুনেছি। ওরা বলাবলি করছিল, পৃথিবীটা নাকি খুব সুন্দর। নাকি অনেক পাহাড় আছে, ঝরনা আছে। গাছ আছে, ফুল আছে। আবার কোথাও নাকি বরফ আছে, শুধুই বরফ। বরফ নাকি খুব ঠান্ডা!
পেটকাটা চাঁদিয়ালের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, তোর শোনাই সার, দেখা তো আর হচ্ছে না।
চাঁদিয়াল উত্তর দিল, ঠিক বলেছিস। একটু পরেই তোর সঙ্গে আমার প্যাঁচের লড়াই হবে। কেউ তো একজন ভোঁকাট্টা হয়ে হারিয়ে যাব। তখন কে যে কোথায় কোন বিপদে পড়ব কে জানে। আকাশটা যদি আমাদের ঘর-বাড়ি হত! আমরা যদি শুধুই আকাশে উড়তে পারতুম!
পেটকাটা বলল, আমরা বড় অসহায় না রে? মানুষের হাতের ওই সুতো যেমন করে আমাদের চালায়, আমরা তেমন করে চলি। আমরা তো ওদের হাতের গোলাম।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, জবাব দিল চাঁদিয়াল, ওদের হাতের ওই সুতো আমাদের ভাগ্য। ওই সুতো যদি প্যাঁচের সময় আমরা দু’জনেই ছিঁড়ে ফেলতে পারি জট পাকিয়ে, তবে হয়তো রক্ষা পেতে পারি আমরা। উপড়ে যেতে পারি একসঙ্গে আকাশে। তখন আর আমাদের ধরার সাধ্য থাকবে না কারও। আমরা তখন আর অসহায় থাকব না। আমরা তখন দুই বন্ধু মুক্ত। আকাশ আমাদের সহায়। বলতে না-বলতেই হল্লা উঠল মানুষের গলায়। দুই ঘুড়ির প্যাঁচের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। বলতে-না-বলতেই আচমকা পেটকাটার সুতোয় টান পড়ল। তিরবেগে সে ধেয়ে এল চাঁদিয়ালের দিকে। চাঁদিয়ালও ঝাঁপিয়ে পড়ল পেটকাটার সুতো জড়িয়ে। চেঁচিয়ে উঠল, ভয় পাস না পেটকাটা, আমি তোর সুতোয় আমার সুতো জড়িয়ে দিচ্ছি। আমাদের প্যাঁচে ফেলেছে ওরা। আয়, প্রাণপণে টান মারি দু’জনে। হয় মরব। না হয় জিতব।
পেটকাটাও চেঁচিয়ে উঠল, ঠিক বলেছিস চাঁদিয়াল, বিপদ এলে এমনি করে একসঙ্গে লড়াই না করলে কেউ বোধহয় নিস্তার পায় না। আমি ভয় পাচ্ছি না। একটুও না। আমিও লড়াই করছি।
আকাশ থেকে নীচে তাকা। দ্যাখ, নীচের মানুষগুলো কেমন উল্লাস করছে! কে জিতবে কে হারবে। সেই নিয়ে ওরা গলা ফাটাচ্ছে। আমরা দু’জনে কেউ কাউকে ছাড়ব না। আয় আমরা আরও ঘুরপাক খেয়ে আমাদের বাঁধন শক্ত করি। বলল চাঁদিয়াল।
তারপরেই সেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। সুতো ছিঁড়ে সত্যি সত্যি উপড়ে গেল একসঙ্গে সেই দুটো ঘুড়ি, চাঁদিয়াল আর পেটকাটা। খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে দুই বন্ধু যখন উড়ে যায়, তখন মাটির মানুষগুলোর উল্লাস থেমে গেছে। দু’দলই তখন হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। আর হয়তো ভাবে, এ কেমন করে হয়! দু’দলই হেরে গেল!
হ্যাঁ, হেরে গেল। আর দ্যাখো, ওই যারা জিতল, ওই দুই বন্ধু, পেটকাটা আর চাঁদিয়াল, কেমন আকাশে ভেসে যাচ্ছে, আনন্দে একসঙ্গে! ভাসতে ভাসতে কোথায় যে হারিয়ে যাবে ওরা, আমরাও জানি না। জানে শুধু আকাশ। কেন না, আকাশ যে ওদেরও বন্ধু!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন