শৈলেন ঘোষ

ক’দিন ধরে রাজা কাক্কাবোক্কার পেটে পেটে যে একটা কিছু মতলব দানা বাঁধছিল, সেটি অন্য কেউ বুঝতে না-পারলেও যিনি বোঝার সেই মন্ত্রীমশাই ঠিকই বুঝতে পারছিলেন। বুঝতে পারছিলেন বলেই, তিনি যেন মাঝে মধ্যেই হাত-পায়ের সান হারিয়ে ফেলছিলেন। তাঁর বুকের ‘ধুকধুকিটা’ থেকে থেকেই যেন কেমন বেতালে লাফালাফি করছিল। আর যখনই তাঁর চোখের দৃষ্টি রাজা কাক্কাবোক্কার চোখের ওপর ঝাঁকি মারছিল, তখনই তাঁর বুকের রক্ত ঠান্ডায় হিম হয়ে যাচ্ছিল। আসলে ওই চোখ। রাজা কাক্কাবোক্কার ওই চোখ দেখলেই একমাত্র মন্ত্রীমশাই ঠাওর করতে পারেন, কখন রাজা হাসবেন কিংবা হাই তুলবেন। কখন রাজা গোমরাবেন নয়তো গোঁফে তা দেবেন। কিংবা হাঁচবেন, না হয় নাচবেন। অবিশ্যি নাচা মানে সে-নাচা নয়। তিনি যখন নাচেন তখন কেউ গানও গায় না, কোনও বাজনাও বাজে না। কেউ তালও ঠোকে না, মাথাও নাড়ে না। নাড়বে কী, তাঁর নাচা মানে ভয়ংকর কাণ্ড! এই তিনি লম্ফ মারেন তো, এই বুঝি গুঁতিয়ে দেন। এই তিনি দিলেন খামচে, না-হয় ধরেন টুঁটি। গেল! গেল! প্রাণটাই বুঝি বেঘোরে গেল! অবিশ্যি কাক্কাবোক্কার যত রবরবা ওই বেচারা মন্ত্রীর ওপর। মন্ত্রিত্ব দিয়েছ বলে কি তুমি মাথা কিনে নিয়েছ! মন্ত্রীমশায়ের একটু অন্যমনস্ক হবার জো নেই। হলেই, হয় তিনি টুক করে মাথায় দিলেন টোকা। না হয় ট্যাঁকে চিমটি। ছিঃ! ছিঃ! মন্ত্রীর সঙ্গে ছেলেমানুষের মতো কোন দেশের রাজা এমন খুনসুটি করে। রাজা না তো, চানাচুর-র-র-র গরম ভাজা।
যাক গে, যাক গে! ওসব কথা নিয়ে পাঁচকান না করাই ভাল। কথায় বলে, নিন্দে-মন্দ সর্বনেশে, ঘুরে বেড়ায় ছদ্মবেশে। সুতরাং ওসব কথা না-ভেবে, মুখে কুলুপ এঁটে মানে মানে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কী দরকার বাবা অন্যের মাথায় দই ঢালার!
সে না হয় ঠিক আছে, তুমি না হয় কাটলে, কিন্তু মন্ত্রীমশাই কাটেন কেমন করে? যাই হোক না কেন, ঝক্কি তাঁকে পোয়াতেই হবে। কাজেই কাক্কাবোক্কার পেটে পেটে এখন যে-মতলব দানা বেঁধেছে সেটি জানার ইচ্ছে তাঁর থাকলেও শোনার ইচ্ছে একটুসও ছিল না। সুতরাং রাজার চোখের ওপর যখনই তাঁর দৃষ্টি পড়ে যাচ্ছিল, তখনই তিনি আঁকপাঁক করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু কতবার রাজার চোখকে এমন করে এড়িয়ে যাবেন তিনি। একবার না একবার ধরা তাঁকে পড়তেই হবে। আর বলতে না-বলতেই ধরা পড়লেনও। রাজার গোঁফের ফাঁকে একটা বিচ্ছিরি হাসি এমনভাবে ভেংচে উঠল যে, মন্ত্রীমশায়ের চোখের দৃষ্টিও রাজার চোখের ওপর থেকে নড়েও না সরেও না। এক্কেবারে স্থির হয়ে থিরথির করে কাঁপতে লাগল। আচমকা রাজা মন্ত্রীকে হাঁকার দিলেন, “খুব মজা এ্যাঁ! বারবার চোখ টেরিয়ে দেখতে দেখতে চোখ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, বাহ্! খুব কেরদানি শিখেছেন তো! বলি বয়েসটা বাড়ছে, না কমছে?”
রাজার হাঁকার শুনে মন্ত্রীমশাই থতমত খেয়ে চুপ মেরে যান। এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং তিনি থমথমে মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। কথা কইলেন না।
কিন্তু একবার যখন ধরা পড়েছেন তখন কি আর নিস্তার আছে! রাজা কাক্কাবোক্কা তড়পে উঠলেন, “আমি রাজা। আমি জিজ্ঞেস করছি, আপনার বয়েস বাড়ছে না কমছে?”
সত্যি বলতে কী মন্ত্রীমশাই কী উত্তর দেবেন সেটি সঠিকভাবে ভেবে ওঠার আগেই যেন তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, “আজ্ঞে বাড়ছেও না, কমছেও না, থির হয়ে আছে।”
হঠাৎ মন্ত্রীমশায়ের মুখে এমন কথা শুনে রাজা কাক্কাবোক্কা চোখ মটকে ভুরু কোঁচকালেন। তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে এমন একখানি ভড়কি দিলেন যে, ভয়ে-ময়ে মন্ত্রীমশাই দিলেন ছুট! অমনি খপাত! রাজা কাক্কাবোক্কা দু’হাত দিয়ে মন্ত্রীমশায়ের পেটটি জড়িয়ে ধরলেন। বলব কী, সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীমশাই চিলচেঁচিয়ে উঠলেন, “ছাড়ুন! ছাড়ুন! আমার পেট ফেটে গেল! আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। হা-হা!”
মন্ত্রীমশাই যতই হাসেন, রাজামশাই ততই চাপেন। বলতে নেই, হাসতে হাসতে বুঝি সত্যিই ফাটল পেট। একটা অঘটন না-ঘটে যায়! অগত্যা মন্ত্রীমশাইও জুড়ে দিলেন টানামানি। কিন্তু এমন বেকায়দায় পড়ে গেছেন যে, রাজার জাঁতাকল থেকে ছাড়ান পাওয়া এই মুহূর্তে খুবই দুষ্কর। সুতরাং তিনি হাত-পা ছুড়ে লম্ফ-ঝম্ফ শুরু করে দিলেন। মন্ত্রীমশাই হাসছেন, লাফাচ্ছেন। নাচছেন, কোঁকাচ্ছেন। আর রাজামশাই ততই পেঁচিয়ে ধরছেন।
মন্ত্রীমশায়ের এমন হাসি আর লাফালাফির হট্টগোলটা কতক্ষণ আর চাপা থাকে! যতই হোক রাজবাড়ি বলে কথা। এ-মহল, সে-মহল, লোকে লোকে লোকারণ্য। দৃশ্যটা নজরে না পড়ে যায়! আর এমন একটা দৃশ্য নজরে পড়লে কার সাধ্যি হাসি চেপে রাখে! কিন্তু তবু চেপে রাখতেই হবে। একবার মুখ ফসকে হাসি টসকেছে কী গেছ! তখন যে কী হবে কেউ জানে না। বাঁচা কিংবা মরা সব তাঁর হাতে। সে তুমি রাজার সেপাই হও, কি প্রহরী, পেয়াদা হও, কি পাইক, কারও নিস্তার নেই।
এমনই সময়ে আচমকা বুক যেন চমকে ওঠে! ওই শোনো রাজা আর মন্ত্রীর এমন কস্তাকস্তি দেখে হি-হি করে কে যেন হেসে উঠল। ওমা! হাসিটা যে মেয়ে-হাসি। এই সর্বনাশ! হাসির শব্দ কানে আসতেই রাজা কাক্কাবোক্কা থতমত খেয়ে গেছেন। তিনি চোখের পলক পড়ার আগেই মন্ত্রীমশাইকে ছেড়ে দিলেন। তাঁর মনে হল, তিনি এখনই এখান থেকে পালান। কিন্তু ছিঃ ছিঃ, মেয়েমানুষের হাসি শুনে একজন পুরুষমানুষের কি পালানো উচিত! আর সে পুরুষমানুষ যদি রাজার মতো একজন মহামান্য ব্যক্তি হন তবে তো কথাই নেই। মান-সম্মান বলে তো একটা দস্তুর আছে। পালালে সেটার কী হবে? সুতরাং তিনি ঝটপট অলিন্দে মুখ বাড়িয়ে কিছুই জানেন না এমন ভঙ্গিতে গুনগুন করে গান জুড়ে দিলেন। আর মন্ত্রীমশাই রাজা কাক্কাবোক্কার হাতে খোঁচা-খাওয়া পেটে হাত দিয়ে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, হাসতে হাসতে রানি ঢুকছেন। সুতরাং এতক্ষণ যে-হাসি শোনা যাচ্ছিল বোঝা গেল সেটি রানির। আর রানির হাসি শুনেই যে মন্ত্রীমশাই এ যাত্রায় পেট ফাটার হাত থেকে বাঁচলেন, সে আর নতুন করে বলতে হয় না।
রানিমা কিছুই বললেন না। তিনি শুধু হাসতে হাসতে মন্ত্রীমশায়ের কাঁচুমাচু মুখখানা দেখতে লাগলেন। মন্ত্রীমশাই প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে রানিমা—”
মন্ত্রীকে কথা শেষ করতে হল না! রাজামশাই গানের গুনগুনানি থামিয়ে হঠাৎ ধমকে উঠলেন, “চোপ!”
মন্ত্রী রাজার ধমক শুনে চমকে উঠলেন। রানি হাসতে হাসতে থমকে থামলেন। আসলে রাজা কাক্কাবোক্কা যে কাকে ধমকালেন সেটা মন্ত্রীও বোঝেন না, রানিও বোঝেন না। কাজেই দু’জনেই ঠোঁট চেপে রাজার দিকে তাকালেন। কিন্তু রাজা যেমন ছিলেন তখন তেমনই হলেন এখন। আবার গুনগুনিয়ে গানের সুর ভাঁজতে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে রানিমা আবার হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ, কী বলছিলেন?”
মন্ত্রীও রাজার গুনগুনানি শুনে ভাবলেন, গান গাইতে গাইতে “চোপ” কথাটা সুর ফসকে রাজার মুখ দিয়ে ফট করে বেরিয়ে পড়েছে। এটা ধমক নয়, মনে হয়, গানের ঠমক। তাই মন্ত্রীমশাই রানিমার কথা শুনে আবার বলে উঠলেন, “আজ্ঞে রানিমা—”
ব্যাস! আবার রাজার গলায় খ্যাঁকানি, “দেব কামড়ে!”
অমনই রানির আবার হাসি থামল। মন্ত্রীরও বুক কাঁপল। দু’জনেই চমকে রাজাকে ফিরে দেখলেন। রাজা যেমনকে তেমন। আবার গুনগুন শুরু করে দিলেন অলিন্দের ফঁকে মুখ ঠেকিয়ে।
এ তো বড় আশ্চর্য ব্যাপার। রাজা রাগছেন, অথচ গান গাচ্ছেন। অলিন্দে দাঁড়িয়ে এমন তাল ঠুকছেন, যেন কিচ্ছুটি জানেন না। একেবারে গুড বয়।
এবার আর রানি হাসলেন না। মন্ত্রীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, “আমি হাসছি বলে বোধহয় রাজামশায়ের গানের ব্যাঘাত হচ্ছে।”

মন্ত্রী বললেন, “না রানিমা, আমি কথা বলছি বলে বোধহয় রাজামশাই রাগ করছেন।”
রানিমা তেমনই অস্ফুট স্বরে বললেন, “আপনি বরং আমাকে চুপিচুপি বলুন কী হয়েছে।”
মন্ত্রীমশাই এবার খুবই চাপা স্বরে বললেন, “আজ্ঞে—” ব্যাস! ওই পর্যন্ত। রাজা গান থামিয়ে অমনি কড়কে উঠলেন, “কথা কানে ঢুকছে না! দেব পেট ফাটিয়ে।”
আর কথা নয় মন্ত্রীর। হাসিও নয় রানির। দু’জনেই রাজার দিকে মুখ ফিরিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেন, রাজা আবার গান জুড়েছেন। এ কী বেয়াড়াপনা রাজার! এই গান গাইছেন আবার এই ধমকে উঠছেন। যতই হোক রানি বলে কথা। তাঁর একটা মান-সম্মান আছে। ধমকানির চোটটা যে তাঁর ওপরেও পড়ছে, এ বোঝার বুদ্ধি রানির যথেষ্ট আছে। সুতরাং তাঁরও রাগ হতে পারে। এবং তাঁর রাগ হলও। তিনি গটগট করে রাজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ফোঁস করে উঠলেন, “কোন দেশের রাজা বকুনি দিয়েই গান গায় শুনি! এ আপনার কেমন ধারা রকমসকম! আমি কি কচি খুকি!”
রাজা কাক্কাবোক্কা চাপা গলায় খেঁকিয়ে উঠলেন, “হাসাহাসি আমি পছন্দ করি না।”
“বেশ তো, সে-কথাটা মুখে বললেই পারতেন। গান গাইবার তো দরকার ছিল না। ঠিক আছে, আজ থেকে আমার মুখে আর হাসাহাসি শুনতে পাবেন না। আপনি যত পারেন গুনগুন করুন।” বলে রানি রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রানিকে অমন করে রেগেমেগে বেরিয়ে যেতে দেখে রাজা হা-হা করে উঠলেন। কিন্তু ততক্ষণে রাজার ঘরের দোর পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছেন রানি। রাজা কাক্কাবোক্কা চিৎকার করে ডাক দিলেন, “শোনো, শোনো রানি।”
শুনতে বয়ে গেছে। নিজের ঘরের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছেন রানি। এবার বোঝো!
তা, বুঝবে কে? রাজার রোখটা যে এখন কার ঘাড়ে গিয়ে পড়বে, সেটা কে না জানে। সুতরাং মন্ত্রীমশাই ভয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তিনিও পালাবেন, না থাকবেন সেই ধন্দে পড়ে হাঁকপাঁক করতে লাগলেন। ব্যাপারটা যে খুবই গুরুতর, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কেন না, রাগ করেছেন স্বয়ং রানি। করেছেন করুন, রানির যে রাগ করার হক নেই এ-কথা কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু তাঁর রাগ করার সমস্ত দায়টা যে এখন মন্ত্রীমশাইকে বইতে হবে! এটা কেমনতর নিয়ম! সুতরাং এখন তাঁকে এক বিপদ থেকে আর এক বিপদে পড়তে হল। সত্যি বলতে কী, এতে মন্ত্রীমশায়ের যে কোনও দোষ নেই, সেটা তোমরাও তো নিজের চোখে দেখলে। ব্যাপারটা রাজার সঙ্গে রানির মন কষাকষি। এটা নিজেরাই তো মিটিয়ে নিতে পারে।না, তা হবে না। এই দ্যাখো কেমন মুখ ব্যাজার করে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর দিকেই এগিয়ে আসছেন! আবার বুঝি তিনি ধরলেন মন্ত্রীকে। এই দিলেন বুঝি পেট খামচে!
না, এবার তিনি খামচালেন না, গর্জে উঠলেন, “চোখের সামনে দিয়ে রানি রাগ করে চলে গেলেন, আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন?”
মন্ত্রীমশাই বুঝতে পারলেন না কী উত্তর দেবেন। কেন না, ভাল কথা বললেও রাজা উলটো কথা বোঝেন। কাজেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া অন্য কিছু না বলাই ভাল।
রাজার মাথায় আবার রক্ত চড়ল। তিনি আবার হাঁকরে উঠলেন, “এই আপনার এক মস্ত দোষ। কথার উত্তর দেন না।”
মন্ত্রীমশাই এবার খুব কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “আজ্ঞে আপনি আমার পেটে তখন এমন খোঁচা মেরেছেন যে, এখন কথা বলতে গেলেই খিদে পেয়ে যাচ্ছে!”
“বটে!” রাজা চটলেন। কিন্তু তত জোর চটলেন না। বললেন, “তখন তো রানির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খিদের কথা বলেননি। তখন তো খোশমেজাজে রানির কাছে আমার নিন্দে করার জন্যে উঁচিয়ে ছিলেন। আমি ধমকে থামিয়ে না-দিলে আপনি কি রানির কাছে আমার নামে বানিয়ে-বুনিয়ে নালিশ না করে ছাড়তেন?”
“দেখুন, তখন যে আপনি আমাকে জাপটে ধরে পেটে কাতুকুতু দিয়েছেন, এ-কথাটা তো মিথ্যে নয়। আর এই কাতুকুতু দিতে গিয়ে আপনি যে আমার পেটে খামচা-খামচি করেছেন, এটাও কি আপনি অস্বীকার করতে পারেন?” বলতে বলতে মন্ত্রীমশাই ভয়ে হাঁপিয়ে গেলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার ঠোঁট বেঁকিয়ে ফুট কাটলেন, “এই তো কথার ফুলঝুরি ফুরফুর করে ছড়িয়ে পড়ছে! এখন খিদে পাচ্ছে না?”
“পেলেও দিচ্ছে কে?” মন্ত্রীমশায়ের মুখ দিয়ে কথাটা আলটপকা টপকে পড়ল।
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার ভয়ানক চটলেন। বললেন, “আপনার মতো অকৃতজ্ঞ মন্ত্রী আমার দরকার নেই। ‘দিচ্ছে কে’ মানে? আপনি কি আমার মন্ত্রিত্ব করছেন শুকনো পেটে? আপনাকে দেখে কি কেউ বলবে, খেতে না-পেয়ে দিন দিন আপনি প্যাঁকাটি হচ্ছেন? এই তো কিছুক্ষণ আগেও আপনার পেটটি আমি জাপটে ধরেছিলুম। আমার কি মালুম হয়নি, বেশ নাদুস-নুদুস সেটি? ঘি-দুধ যথেষ্ট না-পড়লে যে এমন হয় না, এ কে না-জানে? ছ্যাঃ ছ্যাঃ, রাজাকে মিথ্যে বলতে আপনার মুখে আটকাল না! আমি ছাড়া কে দিচ্ছে মশাই আপনাকে ঘি-দুধ? তবে কি খিড়কির দরজা দিয়ে কেউ আপনাকে গব্যঘৃত আর গো দুগ্ধ জোগান দিচ্ছে?” বলতে বলতে রাজা আবার তেড়ে গেলেন। এই বুঝি আবার জাপটে ধরেন।
না, তিনি ধরলেন না। মন্ত্রীও নড়লেন না। মন্ত্রী শুধু বললেন, “আমার খিড়কির দরজাই নেই।”
“খিড়কির দরজা নেই তো কী হয়েছে! যে খাবে, তার কাছে খিড়কির দরজা যা, সদর দরজাও তাই।” কাক্কাবোক্কার মুখের থেকে এই কথাটি যেই না বেরোনো, অমনি মন্ত্রীমশাই মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন, “আপনিও তো খান।”
ব্যাস! এই বুঝি লাগল তুলকালাম! দ্যাখো, দ্যাখো, রাজার চোখদুটো যেন ভাঁটার মতো জ্বলছে! তিনি ভীষণ রেগেছেন মুখখানা দেখলেই বুঝতে পারবে! থমথম করছে মুখ! রাগে ঠকঠক করছে হাত! এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়েন মন্ত্রীর ওপর! এই বুঝি সত্যি-সত্যি দিলেন কামড়ে!
না, রাজা কামড়ালেন না। মন্ত্রীর ঘাড়ে ঝাঁপিয়েও পড়লেন না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “আমিও তো খাই মানে?”
“আপনি তো আমাদের চেয়েও ভাল ভাল জিনিস খান।” একেবারে বেপরোয়া হয়ে উত্তর দিলেন মন্ত্রীমশাই।
“চোপ!” রাজা কাক্কাবোক্কা হঠাৎ এমন চিৎকার করে মন্ত্রীকে ধমক মারলেন যে সারাঘর গমগম করে কাঁপতে লাগল। তিনি রেগে মেগে বলে উঠলেন, “মন্ত্রীমশাই, আপনি মনে করবেন না আমি রাগছি না। আপনি এমন চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছেন শুনেও আমি এখনও কিছু বলছি না বলে মনে করবেন না, কখনও কিছু বলব না। হ্যাঁ, আমি খাই। বেশ করি খাই। আলবত আমার খিদে পায়। কিন্তু এখন কে আমায় খেতে দেবে? যে আমায় খেতে দেবে সে আমার ওপর রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। সে বলেছে, আর হাসবে না। তার হাসি-মুখ না দেখলে যে আমার খিদে পায় না। কী বিপদেই না পড়লুম। আমার কী হবে?”
মন্ত্রী বললেন, “কিছু হবে না। আপনি এমন করে যত চেঁচাবেন বিপদ আপনাকে ততই জড়িয়ে ধরবে। মাথা ঠান্ডা রাখুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“বটে! আমায় উপদেশ দেওয়া হচ্ছে।” রাজা কাক্কাবোক্কা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না।
মন্ত্রী তো বুঝতেই পেরেছেন এখন তিনি রাজাকে বাগে পেয়েছেন। রাজা কাক্কাবোক্কা যে রানির সঙ্গে চটামটি করে একটা ভয়ংকর রকম ভুল কাজ করে বসেছেন সেটি বুঝতে মন্ত্রীর একদম ভুল হয়নি। তাই তিনি এখন বেশ স্বচ্ছন্দে বলে বসলেন, “আপনার এখন যা ইচ্ছে তাই মনে করুন, আমার কিছু বলবার নেই। আমি চললুম।”
মন্ত্রী চলেই যাচ্ছিলেন। রাজা কাক্কাবোক্কা ছাড়বেন কেন! তিনি খপ করে তাঁর হাতটা ধরে ফেলে বলে উঠলেন, “এখন আমাকে বিপদে ফেলে কেটে পড়া হচ্ছে! না, আপনাকে আমি ছাড়ব না।”
মন্ত্রীও বলে উঠলেন, “না, আমি থাকব না।”
রাজা আরও জোরে মন্ত্রীর হাত পাকড়ে বলে উঠলেন, “না, আপনাকে থাকতেই হবে।”
মন্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমার হাতে লাগছে। ভেঙে গেলে ভাল হবে না বলে দিচ্ছি! ছাড়ুন!”
“ছাড়ুন বললেই হল!” রাজা দাবড়ি দিলেন, “কোন দেশের মন্ত্রী বিপদের সময় রাজাকে বিপাকে ফেলে কেটে পড়ে মশাই? আপনাকে ছেড়ে দিলে আমি একা কী করব?”
মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “যা করছিলেন, তাই করবেন।”
“যা করছিলুম মানে? কী করছিলুম?”
“কেন, গান গাইছিলেন!”
“হিংসুটে, নিজে গাইতে পারে না, তাই আমার ওপর হিংসে!”
“আহা রে, কী আমার হিংসে করার গাইয়ে রে! গলা নয়তো ব্যা-এ্যা-এ্যা! সুর নয়তো চিঁ-হিঁ-হিঁ! কী ছিরি গানের। আমার হাত ছাড়ুন!”
“না, ছাড়ব না।”
“কেন ছাড়বেন না?”
“আমার ইচ্ছে, তাই ছাড়ব না।”
“ইচ্ছেটা আপনার। হাতটা আমার।”
“বাহ্! আপনার হাত! মাসে মাসে এই হাত পেতে যখন আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তখন মনে ছিল না, এ-হাত কার? এই হাত আমার কেনা হয়ে গেছে।”
“আহা! কী আবদার! ছাড়ুন।” বলে মন্ত্রী দিলেন এক ঝাঁকুনি।
“না, ছাড়ব না।” এই রে, আবার বোধহয় লেগে গেল! কথা কাটাকাটি থেকে ফাটাফাটি হল বলে!
মন্ত্রীমশাই এবার চেঁচিয়ে উঠলেন, “লজ্জা করে না আপনার, রাজা হয়ে অন্যের জিনিস হরণ করতে?”
“কার কী জিনিস আমি হরণ করেছি?”
“এই তো, আমার হাতটা হরণ করার জন্যে গা-জোয়ারি করছেন।”
“আপনার গায়ে জোর থাকে তো আপনিও গা-জোয়ারি করুন!”
“বটে।” বলেই মন্ত্রী রাজার পেটে মাথা দিয়ে এক গোত্তা মারলেন।
আশ্চর্য! এক গোত্তাতেই রাজা কুপোকাত! নাক টিপে রাজা বসে পড়লেন মেঝের ওপর। এই তাল! রাজা উঠতে পারেন না। তাই সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীমশাই রাজা কাক্কাবোক্কার কাঁধে চেপে রাজাকে কাত করতে গেলেন। কিন্তু পারবেন কেন! রাজা সে রাজাই। তাঁর গায়ে জোর কত! তুমি যতই ঘি-দুধ খাও, রাজা ঠিক তোমাকে পটকে দেবেন। হলও তাই। রাজা কাক্কাবোক্কা অবশ্য সুযোগ পেয়েও মন্ত্রীকে পটকালেন না। উলটে যেই না মন্ত্রী তাঁর কাঁধে চেপেছেন, অমনি তিনি সটান দাঁড়িয়ে উঠেছেন। দ্যাখো, দ্যাখো, রাজার কাঁধে মন্ত্রী! রাজার কাঁধে বসে মন্ত্রী টাল খাচ্ছেন। এই বুঝি পড়েন রাজার কাঁধ থেকে। মন্ত্রী চেঁচান, “রাজামশাই, পড়ে যাব, পড়ে যাব, নামিয়ে দিন।”
আর নামিয়ে দিন! রাজামশাই মন্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে তুলকালাম শুরু করে দিলেন। কখনও তিনি নাচেন। কখনও তিনি হাসেন। কখনও তিনি ফুট কাটেন, “আমার গান নিয়ে ঠাট্টা করা। বলা হল, গলা নয়তো ব্যা-এ্যা-এ্যা! সুর নয়তো চিঁ-হিঁ-হিঁ! আমি ছাগল-ঘোড়া! চলো যুদ্ধে।” বলতে বলতে তিনি মন্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
মন্ত্রী চেঁচান। রাজা হাসেন।
রাজা হাসতে হাসতে দরদালান পেরোলেন। মন্ত্রী চেঁচাতে চেঁচাতে দেখতে পেলেন, তাঁদের দেখে কেউ ছুটে বেরিয়ে আসে পাকশাল থেকে। কেউ আসে ভাঁড়ার ঘর থেকে। কেউ ছোটে চাতাল দিয়ে। কেউ উঁকি দেয় জাফরির পর্দা তুলে। রাজার হাসির সঙ্গে, মন্ত্রীর চেঁচানির সঙ্গে সারা রাজবাড়িতে হই-হল্লার হাট বসে গেল। সেই বিচিত্তির দৃশ্য দেখে কেউ লাফায়, কেউ হাসে, কেউ তালি বাজায়, কেউ নাচে। বাবা রে বাবা, সে কী কাণ্ড! কেউ আর ঘরে বসে নেই। এত বড় রাজবাড়ির যতরকম কাজকর্ম সব ফেলে রেখে যে-যার বেরিয়ে এসেছে হই হই করে! কিন্তু রানিমা কোথায় গেলেন, রানিমা তাঁকে তো দেখা যাচ্ছে না!
কে বলেছে দেখা যাচ্ছে না! দেখতে পাচ্ছ না? ওই তো ওই ঝরোকার ঝিলিমিলির দিকে তাকাও! দেখতে পাচ্ছ, তিনি উঁকি মারছেন? আরও একটু ভাল করে দ্যাখো, দেখতে পাচ্ছ, তাঁর রাঙা টুকটুকে ঠোঁট দুটি হাসছে?
হ্যাঁ-হ্যাঁ, যাঁর দেখার কথা, মন্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে নাচতে নাচতে তিনিও দেখতে পেয়েছেন! ওমা, সত্যিই তো রানি হাসছেন! যেই না দেখা, অমনি রাজা চিৎকার করে উঠলেন, “ওই তো রানি হেসেছে। আমারও তো খিদে পেয়েছে। আমাকে খেতে দাও, খেতে দাও!” বলেই তিনি করলেন কী, মন্ত্রীকে আচমকা কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে রানির ঘরে ছুটলেন। চেঁচালেন, “খেতে দাও, খেতে দাও!”
“উঃ হু হু হু!” রাজার কাঁধ থেকে ছিটকে পড়েই আর্তনাদ করে উঠলেন মন্ত্রীমশাই। “ওরে বাবা রে, কোমরে লেগে গেল রে!”
সত্যি, বড্ড লেগেছে।
আর লাগলে কী হবে! ততক্ষণে রাজা কাক্কাবোক্কা হাওয়া। একেবারে রানির ঘরে। এতক্ষণে হয়তো তিনি ভালমন্দ খেতে বসে গেছেন। রানির হাতে সে-খাবার না জানি কত মিষ্টি!
এদিকে মন্ত্রী তখন নিজে নিজেই কোমরে মালিশ করছেন আর মনে মনে ভাবছেন, তবে কি রাজা তখন এমনই একটা ফন্দি আঁটছিলেন তাঁকে কাবু করার জন্যে! কাণ্ড বটে একটা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন