শৈলেন ঘোষ

সকালবেলা আজও রোদ উঠল না। কিন্তু রতনের মুখখানা খুশিতে ভরে গেল। কেন , কাল রেস্টহাউসের পাঁচ নম্বর ঘরে তারই মতো একটি ছোট্ট মেয়ে এসেছে মা আর বাবার সঙ্গে। অন্তত যে ক’টাদিন ওরা এখানে থাকবে, তবু তো রতন মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পারবে। রতন কথা বলতে ভীষণ ভালবাসে। ওর মুখে এমন মিষ্টি মিষ্টি শোনায় সেই অনেক—অ নে ক কথা!
এই রেস্টহাউসের মালীর ছেলে রতন। নামেই মালী। কিন্তু কাজ তো করতে হয় হাজার রকম। বাগান দ্যাখো, ঘর-দোর সাফ-সুতরো রাখো, বাজার করো, বাবুদের ভোরবেলা ঘুমভাঙার চা করে দাও। ফাইফরমাস লেগেই আছে। অবিশ্যি রতনও এখন বাবার কাছে এটা ওটা করতে শিখে ফেলেছে।
ওর বাবা যখন প্রথম এই রেস্টহাউসে কাজ নিয়ে আসে, তখন কত ছোট রতন। এখন তো সে ন’ বছরে পড়েছে। এখন সে একা-একাই বাগানের গাছে গাছে জল ছিটিয়ে দিতে পারে, আগাছাগুলো কেটে ফেলে দিতে পারে। এতে তার একটুও কষ্ট হয় না। চাই কী, এর ঘরে, ওর ঘরে, ঘুরে ঘুরে সকালের চা পৌঁছে দিতে বললে, খুশিতে ওর মুখখানা উছলে ওঠে।
আজও খুশিতে উছলে উঠল রতন। আজ সে নিজেই সকালবেলা চায়ের ট্রে সাজাল। নিজেই চায়ের ট্রে নিয়ে পাঁচ-নম্বর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় টোকা মেরে ডাক দিল, “চা।”
দরজা খুলে গেল। সামনে মেয়েটির মা। রতন একমুখ হাসি ছড়িয়ে বলল, “বেরোচ্ছেন বুঝি? আমি ভাবলুম, এখনও ঘুম ভাঙেনি।” এমনভাবে বলল যেন কত চেনা!
মা বললেন, “হাঁ, বেরোব।”
রতন টেবিলে চায়ের ট্রেটা রাখতে রাখতে বলল, “বাইরে কিন্তু খুব ঠান্ডা। ভাল করে চাদর মুড়ি দিয়ে যাবেন। দেখুন না, আজও রোদ উঠল না। ক’দিন ধরে রোদের দেখাই নেই। কী কুয়াশা!”
মেয়েটির বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “রোজই এমনই কুয়াশা হয়?”
রতন চায়ের কাপ হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, “কিছু ঠিক নেই। এই তো দেখুন না, তিনদিন ধরে একই রকম চলছে।” বলতে বলতে তিন-নম্বর চায়ের কাপটি মেয়েটিকে দেবার জন্য হাত বাড়াল। বাড়িয়েই থমকে গেল। মেয়েটিকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ কী কমফটার গলায় জড়াওনি কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে যে।”
মেয়েটি কথা বলল না। হাত বাড়াল না। মুখ ঘুরিয়ে নিল।
মেয়েটিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে দেখে, রতন জিজ্ঞেস করল, “চা খাবে না?”
মা বললেন, “মিমি চা খায় না।”
“ও, তাই বুঝি?” ব্যস্ত হল রতন, “তবে দুধ এনে দিই?” বলে রতন ব্যস্তপায়ে দরজা ডিঙোতে যাবে, অমনই মা বললেন, “না, না, দুধ লাগবে না।”
“কেন?”
“মিমি দুধ খায় না।”
“দুধ খায় না?” হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল রতন, “তবে কী খাবে?”
মা বললেন, “খেয়েছে। সকালবেলা ও বিস্কুট খায়।”
রতন তেমনই ব্যস্ত হয়ে বললে, “বিস্কুটও তো আছে। এনে দিচ্ছি।”
মা বললেন, “তুমি ব্যস্ত হয়ো না। ও খেয়েছে। বিস্কুট আমরা সঙ্গে এনেছি।”
রতন যেন একটু মুষড়ে গেল। একটু হতাশ হল। বলল, “বিস্কুটই যদি আনলেন, তবে রেস্টহাউসে উঠলেন কেন? জানেন না, আমাদের রেস্টহাউসে সব পাওয়া যায়?”
মিমির বাবা এতক্ষণ ধরে চুপটি করে দেখছিলেন রতনকে। এমন একটি চটপটে হাসি-খুশি ছেলেকে দেখে মিমির বাবার হয়তো ভাল লেগে গেছল। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”
“রতন।”
“এখানে চাকরি কর?”
“আমি না, বাবা। আমার বাবা রেস্টহাউসের মালী।”
মিমি মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিরক্ত হয়ে বলল, “মা, তোমাদের এখনও চা খাওয়া হল না? কখন যাবে? বেলা হয়ে যাচ্ছে না?”
মা চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “এই তো হয়ে গেল!”
মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিতে নিতে রতন বলল, “বেলা হলেও ক্ষতি নেই। আর একটু পরে কুয়াশা কেটে যাবে তো, তখন পাইন আর উইলোগাছের ফাঁক দিয়ে ছোট্ট শহরটা কী সুন্দর দেখতে লাগবে।”
মিমি রতনের দিকে ফিরে তাকালই না।
রতন চায়ের খালি কাপগুলো ট্রেতে রাখতে রাখতে বলল, “আপনারা কলকাতা থেকে এসেছেন বুঝি?”
“হ্যাঁ।”
“আমি কখনও কলকাতা দেখিনি। শুনেছি কলকাতায় চাঁদ ওঠে না?”
“তোমায় কে বলল?”
“বলবার লোকের অভাব আছে। নিত্য কত লোক আসছে। তারা বলে, কলকাতার মস্ত মস্ত বাড়িগুলো আকাশটাকে গিলে খেয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে চাঁদকেও!”
একেবারে আচমকাই মিমি খিল খিল করে হেসে উঠল। চমকে গেছল রতন। মিমির বাবা, মা-ও পারলেন না ঠোঁটের হাসিটাকে চেপে রাখতে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রতন। কিন্তু নিমেষেই নিজেকে সামলে নিয়ে রতন হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মিমির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “বিশ্বাস আমিও করিনি। ধ্যাত! তাই আবার হয় কখনও! অত বড় আকাশটাকে কেউ আবার গিলতে পারে?”
মিমি হাসতে হাসতে থমকে গেল। রেগে চেঁচিয়ে উঠল, “দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারিস না? মালীর ছেলের সাহস দ্যাখো! বুদ্ধু, কোথাকার!”
বাবা ধমকে উঠলেন, “আঃ! মিমি, ও কী কথা?”
মিমি বলল, “দেখতে পাচ্ছ না, গায়ে পড়ে কথা বলছে?”
একটু যেন থতমত খেয়ে গেল রতন। তারপর এমন চোখের পলকে নিজেকে সামলে নিলে যে, দেখেই অবাক হতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে রতন বলল, “দেখেছেন গল্প করতে করতে আপনাদের দেরি করে দিচ্ছি। হ্যাঁ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে আসুন। আবার ন’টার সময় ব্রেক ফাস্ট। দেরি হলে এমন হুড়োহুড়ি লেগে যায়!” বলে রতন চায়ের ট্রে-টা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রতন ফিরে এল বাবার কাছে। ট্রে-টা রাখতে রাখতে বলল, “জানো বাবা, পাঁচ নম্বর ঘরে যে ছোট্ট মেয়েটা এসেছে, অর নাম মিমি।”
“বন্ধু পাতিয়ে ফেললি বুঝি?” বাবা জিজ্ঞেস করল।
রতন বলল, “খুব হাসে।”
“তোকে দেখেও নিশ্চয়ই হেসেছে। যেরকম পোশাক তোর।”
“আমাকে দেখে হাসল। আমার কথা শুনে হাসল। শেষকালে আমাকে বলল বুদ্ধু!” বলেই রতন হি-হি-হি করে হেসে উঠল।
রতনের হাসি দেখে বাবাও হাসে। হাসতে হাসতে বলে, “সত্যিই তুই বুদ্ধু।”
ছেলের মতো বাবাও হাসি-খুশি মানুষটি। যখন প্রথম রেস্টহাউসে আসে, তখন রতন খুব ছোট্ট। এখন রতন জানে, এই রেস্টহাউসে আসার আগে, তার বাবা ছিল গ্রামে। জমি চষে ফসল ফলাতে ওর বাবা। একদিন ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় উঠল। যে-মাটির বাড়িতে ওরা থাকত, ঝড়ে ধসে গেল সেই মাটির বাড়ি। ভাঙা বাড়ির নীচে, রতনের মা এমন চাপা পড়ল যে, আর বেরিয়ে আসতে পারল না। সুতরাং মা কেমন, সে জানে না। কিন্তু জানে, সেই ভয়ংকর ঝড়ের পরেই রতনকে নিয়ে বাবা এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরে চলে এসেছে। এই রেস্টহাউসে কাজ পেয়েছে। রেস্টহাউসের পেছনদিকে যে-ঘরটায় ওরা থাকে, এখন সেই ঘরটাই ওদের ঘর। খুব ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠে রতন। যেদিন ভোরে সূর্য ওঠে, সূর্যের আলো যেদিন উইলো আর পাইনগাছের আড়াল ডিঙিয়ে এই পাথর-ভাঙা ছোট্ট রেস্টহাউসটার মাথায় এসে পড়ে সেদিন দু’চোখ ভরে দেখে রতন। এই পাহাড় আর পাথর, এই উইলো আর পাইন, কিংবা ওই আকাশ আর এই ছোট্ট রেস্টহাউস সব মিলিয়ে তার মনে হয়, যেন তার বাবার মুখে শোনা রূপকথার দেশের মতো এও এক আশ্চর্য-দেশ।
রতনের বাবার বুকভর্তি অফুরন্ত দম। তুমি কখনও বসে থাকতে দেখবে না মানুষটাকে। কাজের হাতদুটি সবসময় ব্যস্ত। কষ্ট নেই একফোঁটা। যখনই দেখবে, মুখে হাসি। হাসি দেখলেই মনে হবে, যেন কত আপন। এই তো রোজই নানান মানুষ আসছে রেস্টহাউসে নানান দেশ থেকে। ও সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে যখন বলে, সেলাম সাব, তখন মনে হবে, এইমাত্তর যে লোকটি এল সে যেন কতকালের চেনা তার।
হ্যাঁ, সত্যিই, এই মাত্তর একটি লোক এল রেস্টহাউসে।
“সেলাম সাব।” লোকটিকে দেখে রতনের বাবা কপালে হাত ঠেকাল।”
লোকটি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “ঘর খালি আছে?”
“আছে সাব।” লোকটির হাত থেকে স্যুটকেশটি নিয়ে ছ’ নম্বর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল রতনের বাবা।
কিন্তু রতনের বুকটা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। ওর মনে হল, লোকটার মুখখানা যেন ভীষণ রকমের কুচুটে! তার কুতকুতে চোখদুটোর ওপরে মাথার টুপিটা তেরচা হয়ে ঝলে এমন ছায়া ফেলেছে যে, দেখলেই গায়ে কাটা দেয়! লোকটার পরনে কোট-প্যান্ট। তার বাবার সঙ্গে গটমট করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর খানিক বাদে রতনের বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেই, লোকটাকে দেখার জন্যে রতনের মনটা ছটফট করে উঠল। রতন, এর ঘরে, ওর ঘরে যাওয়ার ছলে, ঘুরছে-ফিরছে আর আড়চোখে দেখছে। কিন্তু পর্দা ফেলা তো! তাই দেখতেও পাচ্ছে না। অবিশ্যি রতন ইচ্ছে করলে এখনই ছ’ নম্বর ঘরে টোকা মেরে জিজ্ঞেস করতে পারে, “কিছু লাগবে সাব?” আর সেই তক্কে দেখেও নিতে পারে।
না, জিজ্ঞেস করতে হয়নি! কারণ, লোকটাই আচমকা পর্দা ঠেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। রতনকে দেখতে পেয়ে ডাক দিল, “বয়।”
অন্য কেউ হলে এতক্ষণে রতন উত্তর দিয়ে দিত, “আমি বয় নই, রতন।” কিন্তু এখন সে কিছু বলতেই পারল না। শুধু ঘুরে দাঁড়াতেই লোকটা বলল, “চা লে আও!”
এই ক্ষণেক সময়টুকুর মধ্যেই তাকে আর-এক পলক দেখে নিল রতন। তারপর ছুটে গেল বাবার কাছে। বাবাকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ছ’নম্বরে চা!” আর দাঁড়াল না রতন। কেন না অন্য কেউ হলে রতন নিজেই চায়ের কাপ পৌঁছে দিত। কিন্তু এই লোকটার সামনে যেতে একদম ইচ্ছে করল না রতনের।
ন’টা প্রায় বাজে, অথচ মিমিরা এখনও এল না। আর একটু পরেই ব্রেকফাস্ট। ভাবনা হওয়ার কথা নয়, তবুও রতন ভাবল। রেস্টহাউসের কে কখন কোথায় যাচ্ছে, কখন আসছে কেউ খবর রাখে না। রতনেরও এসব দেখে দেখে অভ্যেস হয়ে গেছে। কিন্তু মিমিদের কথা যে কেন তার হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যাচ্ছে, কে জানে! তার সঙ্গে এই ছ’নম্বর ঘরের নতুন লোকটার কথা মনে পড়ে তার যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে ভাল না লাগার যে কী কারণ থাকতে পারে, সেটাও রতন এই মুহূর্তে খুঁজেও পাচ্ছে না। লোকটাকে অমন দেখতে বলেই যে খারাপ হবে, তার কোনও মানে নেই। তবু তার মনটা কেমন খুঁতখুঁত করছে।
মিমিরা এখনও এল না বলে, রতন এই টিলার ওপর দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চেয়েছিল ওই নীচে, সামনের রাস্তাটার দিকে। বেলা বেড়েছে, তাই এখন অনেকটা কুয়াশা কেটে গেছে। রাস্তার বেশ খানিকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওপর থেকে এমন সুন্দর লাগে দেখতে। কত লোক চলেছে। কত রকমের পোশাক তাদের গায়ে। পোশাকের রং ছড়িয়ে পড়েছে সবুজ গাছের ফাঁকে ফাঁকে। সে-যেন এক অদ্ভুত চোখ জুড়নো ছবি। এই রঙের ভেতর থেকেই রতনের চোখদুটি মিমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। রতনের ঠিক মনে আছে, মিমি একটা বাদামি ফ্রকের সঙ্গে জলপাই সবুজ সোয়েটার গায়ে দিয়েছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও, ওই রং তার নজরে এল না। অগত্যা রতন ভাবল, একবার রাস্তাটা দেখে এলে হয় না? যদি ওরা ব্রেকফাস্টের কথা ভুলে গিয়ে থাকে। তা ছাড়া মিমি বেড়াতে যাবার আগে খালি বিস্কুট খেয়ে গেছে। এখনও কি আর সে পেটে আছে। ঠিক বটে মিমি তাকে বুদ্ধু বলেছে। রতন ছাড়া অন্য কেউ হলে মিমিকে ছেড়ে দিত না নিশ্চয়ই। কিন্তু রতন ভাবল, বলুক। মানুষের একটু রাগ হলে এমন কথা বলেই থাকে। তাই বলে ওই কথা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সে না হয় রাগ করল, তাই বলে তো আর রতন তার ওপর রাগ করতে পারে না! এতক্ষণে তার যে নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে, এ কথাটা তো আর মিথ্যে নয়।
রতন দাঁড়াল না আর। রেস্টহাউসের গেট পেরিয়ে, ওই টিলার গায়ে পাথর সাজানো সিঁড়ির ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে সে নীচে নামল। চেঁচাল, “বাবা, আমি আসছি এখুনি।”
বাবা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রাস্তায় নেমে পড়েছে রতন। এপার, ওপার রাস্তাটার কোন পারে যে মিমিরা গেছে, সে তো দেখেনি। কোনদিকে যাবে সে বুঝে উঠতে পারল না। তাই দোনোমনো করে বাজারের রাস্তাটাই ধরল।
ছোট্ট এই পাহাড়ি শহরের ছোট্ট বাজারটা খুব যে দূরে, তা নয়। তবু রতন ছুটল। উঁচু নিচু রাস্তাটার চড়াই-উতরাই ভেঙে ছুটতে রতনের একটুও কষ্ট হয় না। অভ্যেস আছে। কত ছুটেছে। দম ফুরোলেই হাঁটে, আবার ছোটে।
অবিশ্যি ছুটতে তাকে বেশিক্ষণ হল না। একটু ছুটেই বাজারে পৌঁছে গেল। বাজারে এখন বেশ ভিড়। সেই ভিড়ের এ-ফাঁক, ও-ফাঁক দিয়ে রতনের চোখদুটি খুঁজতে লাগল মিমিদের। কিন্তু আসলে মিমিরা যে এদিকে আসেনি, সে তো আর রতন জানে না। সুতরাং খোঁজাই সার। খুঁজে না-পেয়ে রতন ভাবল, তা হলে ওরা নিশ্চয়ই ফলস এর ধারে গেছে। ফলস বলতে মনে কোরো না, খুব বিরাট জলপ্রপাত। ছোট্ট পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসছে ঝুর-ঝুর করে। আর চারপাশটা এত সুন্দর। চারদিকে পাথর। সেই পাথরে বসে বসে, চেয়ে থাকো যতক্ষণ ইচ্ছে। ভীষণ ভাল লাগবে। এই বাজার থেকে সেটা আর একটু ওপরে। রতন যখন চড়াই ভাঙতে ভাঙতে সেখানে এসে পৌঁছল, তখন রোদ উঠে গেছে। ঠিক রুপোর মতো রোদের আলো ঝলমল করছে চারদিকে। এত শীতেও রতনের কপালে ঘামের বিন্দুগুলি চিকচিক করে উঠল। কিন্তু মুখ শুকিয়ে গেল রতনের। এখানেও তো নেই মিমিরা। সামনে ওই যে দেবদারুগাছের বন, তার নীচে ওই যে সবুজ ঘাসের মখমল বিছানো, যেখানে সবাই পিকনিক করে, সব দেখল রতন। কিন্তু ভোঁ-ভাঁ! সুতরাং এখান থেকে সে আবার নামতে শুরু করল। না, আর ছুটল না। নেমে এল আবার সেই বাজারের কাছে। সে দ্রুত হাঁটতে লাগল। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না তাদের। অগত্যা ফিরতে হল। সত্যিই, তো আর কতক্ষণ খুঁজবে বলো? রেস্টহাউসের গেটের কাছে এসে দাঁড়াল রতন। আর একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। তারপর গেটে ঠেলা দিল। রতন চমকে যায়। একটা স্পষ্ট হাসির শব্দ যেন শুনতে পেল রতন। একটি ছোট্ট মেয়ের গলার স্বর! আরে! এ তো মিমিরই হাসি! তবে কি মিমিরা ফিরে এসেছে? হ্যাঁ, মিমিই তো হাসছে। পেছনের বাগানে ছুটে গেল রতন। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, মিমি সেই ছ’ নম্বর ঘরের লোকটার সঙ্গে ছুটে ছুটে খেলা করছে আর হাসছে। লোকটা মিমিকে চোর-পুলিশ খেলার মতো ধরতে যাচ্ছে আর মিমি হাসতে হাসতে পালাচ্ছে। লোকটাকে তখন যে-পোশাকে দেখেছিল রতন, এখন তার অন্য পোশাক। প্যান্টের বদলে পাজামা। টুপির বদলে খালি মাথা। লোকটাকে তখনও যেমন ভাল লাগেনি, এখনও তেমনই ভাল লাগল না রতনের। কিন্তু মিমির সঙ্গে রতনও হেসে উঠল। সেও ছুটল। ছুটল মিমির পেছনে। ছুটতে ছুটতে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, “মিমিকে আমিও ধরতে পারি।”
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মিমি। রতন সত্যিই ওকে গিয়ে ধরে ফেলল। মিমির হাসি থেমে গেছে। টেনে একঝটকা মারল রতনের হাতে। মেরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “এই তোর সঙ্গে কে খেলছে?” বলেই নাকি সুরে কেঁদে উঠল, “দ্যাখো না মা, ছেলেটা আমাদের খেলতে দিচ্ছে না!”

রতন বলল, “না না। চোর-পুলিশ আমিও খেলতে পারি।”
“কে খেলবে তোর সঙ্গে? সরে যা আমার সামনে থেকে। গায়ে পড়ে খেলতে আসে। হ্যাংলা।” খেঁকিয়ে উঠল মিমি।
মিমির কথাগুলো যেন রতনের কানেই ঢুকল না। রতন তেমনই হাসতে হাসতে বলল, “তোমরা কোথায় গেছলে? আমি তোমাদের কত খোঁজাখুঁজি করে এলুম। আমি সেই একেবারে দেবদারু বন—”
কথা বলা শেষ হল না রতনের। সেই লোকটা এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল। হঠাৎ সে ডাকল, “মিমি চলে এসো। আমরা ঘরে গিয়ে গল্প করব।”
মিমি ছুটে গেল সেই লোকটার কাছে। বলল, “সেই ভাল। মালীর ছেলেটার জন্যে একটু খেলতেও পারব না। কী জ্বালাতন!” বলতে বলতে মিমি লোকটার হাত ধরে রতনের সামনে দিয়ে চলে গেল। রতনের মনটা কেমন মুষড়ে গেল। ওই লোকটার সঙ্গে মিমির কখন যে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, ভাবতে গিয়ে অবাক হয়ে যায় রতন। না, না, এ হতে পারে না। মিমির বন্ধু ওই লোকটা কখনওই না। রতন তাই থাকতে পারল না। ডাক দিল, “মিমি যেয়ো না, আমিও গল্প জানি। তোমায় শোনাব।”
মিমি সত্যিই চলে গেল লোকটার সঙ্গে! রতন কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সেইদিকে। মনের ভেতরটা তার এমন ছটফটিয়ে উঠল যে, কিছুতেই স্থির থাকতে পারল না। ওর মন বারবার বলে উঠছে, না, ওই লোকটার সঙ্গে মিমিকে খেলতে দেব না। কেন যে এটা মনে হচ্ছে, সে-ই জানে।
সত্যিই রতন ছাড়ল না। ওর মনের মধ্যে কেমন যেন একটা সন্দেহের ভাব চেপে বসেছে। সত্যিই লোকটা গল্প বলছে কি না তাই দেখতে, রতন ছ’ নম্বর ঘরের বাগানের দিকে যে জানলাটা আছে, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জানলায় পর্দা ঝোলানো। যদিও একটু উঁচু, তবু ইচ্ছে করলে রতন উঁকি মেরে দেখতে পারে। না, থাক বলা যায় না, লোকটা দেখে ফেলতে পারে। সে জানলার নীচে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে রইল। কই গল্প? রতন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনতে পেল, লোকটা মিমিকে বানিয়ে বানিয়ে একঝুড়ি মিথ্যে বলছে তার নামে। বলছে, “ছেলেটার সঙ্গে একদম কথা বলো না। এইসব রেস্টহাউসের মালীর ছেলেগুলো হয় এক নম্বরের বজ্জাত। এরা চোখের সামনে যা দেখে, ফাঁক পেলে তা-ই পকেটে পুরে ফেলে।” এইকথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মিমি তার গলায় ঝোলানো সোনার হারটা ঝট করে জামার ভেতরে লুকিয়ে ফেললে। তারপর রতন আবার শুনতে পেল লোকটা বলছে, “মিমি আজ বিকেলে আমরা দেবদারু বনে যাব। ওখানে খুব মজা করে খেলা করব। মালীর ছেলেটা জানতেই পারবে না।”
সায় দিল মিমি। বলল, “হ্যাঁ, সেই ভাল। আমরা ওখানে গেলে আর বিরক্ত করতে হচ্ছে না বাছাধনকে! যা মজা হবে না!”
“মিমি, মিমি!” রতন শুনতে পেল মিমির মা ডাকছে।
“আমি এখানে মা।” বলতে বলতে মিমি ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
“কী করছিস?”
“এই যে, আমি এই নতুন কাকুর সঙ্গে গল্প করছি।”
লোকটাও মিমির সঙ্গে বেরিয়ে এসেছে। মিমির মাকে দেখে হেসে হেসে বলল, “বউদি, মিমি আমার এখানে।”
মা বলল, “ও! আপনার সঙ্গে এরই মধ্যে ভাব করে ফেলেছে? খুব বকাচ্ছে তো?”
লোকটা বলল, “না, না। মিমি খুব ভাল মেয়ে।”
মিমি মায়ের কাছে গিয়ে বললে, “জানো মা, কাকু না আজ বিকেলবেলা আমাকে দেবদারু বনে নিয়ে যাবে।”
“তাই নাকি! বেশ তো! এখন চলো চানটান করে নেবে।” তারপর লোকটাকে বলল, “আপনিও আসুন না, ওর বাবা ঘরেই আছে।”
লোকটা দ্বিগুণ উৎসাহে বললে, “ও তাই নাকি! চলুন আলাপ করে আসি।”
অমন হাসি-খুশি রতনের মুখখানা শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রতনের মনে হচ্ছিল, এখনই সে ছুটে মিমিদের ঘরে ঢুকে বারণ করে আসে। বলে আসে “লোকটার সঙ্গে যেয়ো না মিমি। আমি তোমার সঙ্গে খেলা করব। আমি তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যাব।” কিন্তু যেতে পারেনি রতন।
বিকেলবেলা মিমিদের আগেই দেবদারু বনে হাজির হয়েছিল রতন। কাউকে কিছু বলেনি। এমনকী, ওর বাবাকেও না। রতন জানে, এই বনে কোনখানে লুকিয়ে থাকলে ওকে কেউ দেখতে পাবে না। তাই সত্যিই যখন মিমি সেই লোকটার সঙ্গে এই দেবদারু বনে এল, রতনকে দেখতেই পেল না। কিন্তু রতন আড়াল থেকে দেখল মিমির মুখখানা ভয়ে যেন শুকিয়ে গেছে। হবেই তো! একেই বন, তার ওপর নিঃঝুম, নিশ্চুপ। কেউ কোত্থাও নেই। যখন-তখন তো আর এখানে কেউ আসে না। লোকটাই প্রথম কথা বলল, “কী সুন্দর জায়গাটা!”
মিমি তার কথায় সায় না দিয়ে বলল, “বাড়ি চলো।”
লোকটা থমকে গেল। বলল, “সে কী!”
“হুঁ, আমার ভয় করছে!”
“কেন?”
“একটাও লোক নেই এখানে।”
“তাতে কী হয়েছে। আমি তো আছি। এসো খেলা করি।”
এবার যেন মিমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “না, আমি বাড়ি যাব।”
হঠাৎ লোকটা মিমির একটা হাত ধরে অনেকটা টানতে টানতেই এগিয়ে গেল। বলল, “এদিকে দেখবে এসো মিমি আকাশ কেমন পাহাড়ের গায়ে মিশে গেছে!”
মিমি বলল, “না, এখন ভাল লাগছে না।”
লোকটা হঠাৎ মিমির হাতটা ছেড়ে ছুটতে ছুটতে বলল, “মিমি আমায় ধরতে পারে না।”
মিমি ছুটল না। সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি খেলব না। আমি বাড়ি যাব।”
লোকটা বোধহয় বুঝতে পারল মিমি আর কিছুতেই থাকবে না এখানে। রতন তখন লুকিয়ে লুকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেল, লোকটা পকেট থেকে একটা গলার হার বার করল। পড়ন্ত রোদের আলোয় সেটা এমন ঝকঝক করে উঠল! রতন ভাবল, মিমিকে বুঝি ভোলাবার জন্যেই হারটা বার করল। হারটা দেখিয়ে লোকটা মিমিকে বলল, “এই দ্যাখো মিমি, তোমার জন্যে কী এনেছি।”
হার দেখে মন ভোলে না মিমির। সে আবার বলল, “ফিরে চলো এখান থেকে।”
লোকটা বলল, “ফিরে তো যাবই। আগে এটা তোমার গলায় পরিয়ে দিই।” বলে লোকটা প্রথমটা আদর করে, তারপর যেন অনেকটা জোর করেই তার হাতের হারটা মিমির গলায় পরিয়ে দিল। কিন্তু এ কী! রতন দেখল, লোকটা অত্যন্ত সাবধানী হাতে মিমির গলায় যে সোনার হারটা ছিল সেটা খুলে নিল। মিমি জানতেই পারল না। সেটা খুলে পকেটে পুরে ফেলার আগেই আড়াল থেকে চেঁচিয়ে উঠল রতন, “মিমি তোমার সোনার হারটা নিয়ে নিল।” বলেই আচম্বিতেই সেই আড়াল থেকে বেরিয়ে এল রতন। চমকে উঠেছে মিমি। থমকে চেয়ে দেখছে লোকটা। ততক্ষণে রতন এগিয়ে এসেছে, লোকটার কাছে। চেঁচিয়ে উঠল, “হার দিয়ে দাও!”
মিমি নিজের গলায় হাত দিয়ে আঁতকে উঠেছে তাই তো, তার সোনার হারটা তো নেই!
রতন ছুটে গিয়ে লোকটার হাতটা খামচে ধরল। লোকটা শক্ত মুঠোয় হারটা চেপে ধরল। রতনের সাধ্যি কী, সেই মুঠো খোলে। রতন চিৎকার করে উঠল, “হার চুরি করেছে, হার চুরি করেছে!”
মিমি থ। না-পারে চিৎকার করতে, না-পারে কিছু বলতে। শুধু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দেখলে, রতন সেই অতবড় লোকটার সঙ্গে হাত ধরে ধস্তাধস্তি করছে। মিমির কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। মিমি বিশ্বাসই করতে পারছে না, যে-লোকটা তাকে এত আদর করে, এত ভালবেসে এখানে নিয়ে এল, তার গলায় এমন একটা সুন্দর ঝলমলে হার পরিয়ে দিল, সে তার হার চুরি করবে। এটা বিশ্বাস করা যায় কেমন করে! অমন একটা ভাল লোক, হট করে তো আর খারাপ হয়ে যায় না! কিন্তু তার গলার সোনার হারটাই বা তবে গেল কোথায়? হারটা তো তার গলাতেই ছিল।
এবার সত্যি-সত্যি লোকটা রতনের চুলের মুঠিটা একহাত দিয়ে চেপে ধরল। রতনের মুখে টেনে একটা ঘুষো চালিয়ে দিলে। রতন ছিটকে পড়ে গেল। লোকটা এবার মিমির হাতটা চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “চলো এখান থেকে।”
সঙ্গে সঙ্গে আবার উঠে এসেছে রতন। আবার খামচে ধরল লোকটাকে। বলল, “হার দাও!” এবার লোকটা সত্যিই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চট করে হারটা পকেটে পুরে ফেলে, দু’ হাত দিয়ে রতনের গলাটা টিপে ধরল। ছটফটিয়ে উঠল রতন। তার মুখ-চোখ লাল হয়ে দম আটকে আসছে। লোকটা বুঝি তাকে মেরেই ফেলে! থাকতে পারল না মিমি! তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চিৎকার করে উঠল, “ছেড়ে দাও!”
লোকটা ছাড়বে না। যেন তার মাথায় খুন চেপে গেছে। প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারল রতনকে। রতন সাংঘাতিক একটা ঝাপটা খেয়ে মাটিতে ছিটকে গড়িয়ে গেল একটা খাদের কিনারায়। সামলাতে পারল না রতন। খাদের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। মিমি তাই দেখে ভয়ে আঁতকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “না—আ—আ!”
ছুটে গেল মিমি খাদের কিনারায়। হেঁট হয়ে মুখ বাড়াল। সে দেখল একটা পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে আটকে আছে রতন। ওই পাথরটা যদি না-থাকত, তবে রতন নির্ঘাত গভীর খাদের মধ্যে হারিয়ে যেত। মিমি চেঁচিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিল, “কে কোথায় আছ রতনকে বাঁচাও। রতনকে বাঁচাও!” কিন্তু এখান থেকে কে শুনতে পাবে তার কথা?
ফাঁক বুঝে লোকটা যে কোথায় গা ঢাকা দিল মিমি দেখতে পেলে না। মিমি দেববারু বন থেকে চেঁচাতে-চেঁচাতে বেশ কিছুটা নেমে এল। যে দু’চারজন লোক সেখান দিয়ে চলাফেরা করছিল, তারা মিমির চিৎকার শুনে ছুটে গেল খাদের কাছে। দেখতে-দেখতে অসংখ্য লোক জড়ো হয়ে গেল। তারা তুলে আনল রতনকে খাদের ভেতর থেকে। রতন তখন অচৈতন্য। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার সারা শরীর।
ছোট্ট পাহাড়ি শহরের ছোট্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল রতনকে। ছুটে এল রতনের বাবা। ছুটে এল মিমির মা-বাবা। এখন এই মুহূর্তে তাদের আর কিছুই করার নেই। রতনের বাবা উৎকণ্ঠায় ঠকঠক করে কাঁপছে! এর-ওর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছে আর আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করছে, “আমার ছেলের কী হবে বাবু?”
কেউ উত্তর দিতে পারছে না।
হাসপাতাল থেকে খবর এল রক্ত চাই। রতনকে বাঁচাতে হলে এক্ষুনি ওর শরীরে রক্ত দিতে হবে। এমন রক্ত চাই, যে-রক্ত রতনের রক্তের সঙ্গে মেলে।
রতনের বাবাই ডাক্তারবাবুর কাছে ছুটে গেল। কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলল, “ডাক্তারবাবু, আমি ওর বাবা। আমার রক্তে হবে না? যতখানি নিলে আমার ছেলে বাঁচে, ততখানি বার করে নিন।”
হাসপাতালের ডাক্তারবাবু রতনের বাবার রক্ত পরীক্ষা করলেন। কিন্তু এ-রক্ত রতনের রক্তের সঙ্গে মিলল না।
রতনের বাবা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলে, “তবে কী হবে বাবু?”
ডাক্তার বললেন, “দ্যাখো, অন্য কেউ যদি থাকে।”
রতনের বাবা বললেন, “কাকে বলব? কে দেবে একটু রক্ত?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “এ-ছাড়া আমাদেরও তো কিছু করার নেই।”
রতনের বাবা ভেবে পায় না, এখন সে কী করবে। তার তো সবই গেছে। এই ছেলেকে বুকে নিয়েই সে বেঁচে আছে। এখন ছেলেটাকে সে যদি বাঁচাতে না পারে, কী নিয়ে থাকবে সে?”
রক্ত দিতে কেউ এগিয়ে এল না।
কিন্তু রাত এগিয়ে এল। রাতের অন্ধকারে চোর-লোকটা যে কোথায় পালাল, তাকে ধরা গেল না।
সেই শীত-নিঃঝুম অন্ধকার রাতে, হাসপাতালের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল রতনের বাবা।
সেই অন্ধকার রাতে ঘুম আসেনি মিমির চোখে। সে ছটফট করছিল শুয়ে শুয়ে। মা জিজ্ঞেস করল, “মিমি, ঘুম পাচ্ছে না?”
“না মা।”
“কেন? ঘুমিয়ে পড়।”
সারারাত মিমির চোখে ঘুম আসেনি। খুব সকালে সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছিল। আশ্চর্য! এই সকালে সে কুয়াশা-ঢাকা পথ ধরে একা একা কোথা যায়?
ছোট সেই হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল মিমি। ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছিল সে। তারপর হাসপাতালের গেট পেরিয়ে সে ভেতরে চলে গেল। এই সকালে যে-ডাক্তারবাবু তখন হাসপাতালে ছিলেন, তাঁর সামনে গিয়ে দাড়াল মিমি। ডাক্তারবাবুর ছোট্ট-মেয়েটিকে এ-সময়ে হাসপাতালে দেখে অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
মিমির চোখে জল।
“কী কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
মিমি কোনও কথাই বলতে পারল না। তার নিজের হাতটা শুধু ডাক্তারবাবুর দিকে এগিয়ে দিল।
ডাক্তারবাবু মিমির হাতটা চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাও তুমি?”
“ডাক্তারবাবু, আমি রতনের জন্যে রক্ত দেব। আমার রক্তে রতন ভাল হবে না?” বলতে বলতে মিমি হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।
ডাক্তারবাবু মিমিকে জড়িয়ে ধরে হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “ও, এই জন্যে।” বলতে বলতে মিমিকে এত আদর করলেন, মিমির নিজেরই কেমন অবাক লাগল। তারপর বললেন, “তোমার রক্ত আর লাগবে না মিমি। রতন ভাল আছে। ওর বাবা যখন চেষ্টা করেও কোথাও রক্ত পেল না, তখন ওই ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে আমার বড় কষ্ট হল। আমি নিজেই রক্ত দিলুম রতনের জন্যে। আমার রক্ত আর রতনের রক্ত এক। ছেলেটা বোধহয় এ-যাত্রা বেঁচে গেল। ওর জ্ঞান ফিরেছে। দেখবে?” ডাক্তারবাবু মিমিকে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর মিমির হাত ধরে নিয়ে গেলেন রতনের বেডের সামনে।
রতনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মিমি। রতনের সারা মাথা আর হাত-পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। চোখদুটি তার স্থির হয়ে চেয়ে আছে। মিমিকে দেখে সে-চোখদুটি যেন ভ্রমরের পাখার মতো চঞ্চল হয়ে উঠল। মিমি রতনের বুকে হাত রাখল। নরম সুরে ডাকল, “রতন, আমি মিমি!”
রতন চেষ্টা করল, মিমির হাতটি নিজের হাত দিয়ে ছুঁয়ে ধরতে। পারল না। কিন্তু মিমি স্পষ্ট দেখতে পেল, রতনের ঠোঁটদুটিতে এক-টুকরো হাসির ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে-হাসি যেন বলছে, আমি জিতেছি। আমার বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি। সে বন্ধুর নাম মিমি!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন