শৈলেন ঘোষ

তার নাম ছিল তাক্কাদুম। তাক্কাদুম একজন সেপাই। এইসা মোটা গোঁফ তার। ভাঁটার মতো চোখ তার। ইয়া পেল্লাই পেটখানা। হাঁড়ির মতো মুখখানা। তাকে দেখলে তুমি হাসতেও পারবে না, কাঁদতেও পারবে না। দেখলেই থমকে থমথম করবে তোমার চোখ। তাক্কাদুম সেপাই বলে বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করত গুড়ুম-গুড়ুম! আর বুঝতেই পারছ, যুদ্ধ করলে যা হয়, তাক্কাদুম যেন সবসময়ে রেগে আগুন, তেলে বেগুন। চোখ পাকিয়েই আছে। হাসির নাম যেন জন্মেও শোনেনি।
হল কী, এই গাবদা-গাবুস সেপাই একবার যুদ্ধ করতে গিয়ে, প্রাণের ভয়ে, এমন কাণ্ড করে বসল যে, বলতে আমারই গা শিরশির করছে! সেবার যুদ্ধ হচ্ছিল একটা জঙ্গলঘেরা পাহাড়ের গায়ে। আকাশ থেকে বোমা পড়ছে, বুম-বুম, কামান ছুটছে দ্রুম-দ্রুম। আর তাক্কাদুম করেছে কী, বোমা কামানের ভয়ে দে চম্পট। যেখানে যুদ্ধ হচ্ছিল সেখান থেকে এর চোখে ধুলো দিয়ে, ওর চোখে ধোঁকা দিয়ে সেই পাহাড়টার উলটো দিকে একটা ঝোপের মধ্যে ঘাপটি মেরে চুপটি করে লুকিয়ে রইল। ও বাবা, এ কী সেপাই রে! এ যে এক্কেবারে ভিতুরাম ছিঃ! ছিঃ! রাম! রাম!
ভিতুরাম তাক্কাদুম, ঝোপের মধ্যেই বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর যুদ্ধটা যখন একটু ঠান্ডা হয়ে এল, মানে যখন আর দুম-দাম, গুডুম-গুডুম শব্দ শোনা গেল না, তখন নিশ্চিন্তি। তখন কেমন যেন খিদে-খিদে পেতে লাগল তাক্কাদুমের! আচ্ছা পেটুক তো! এ-পকেট হাতড়ে, ও-পকেট থাবড়ে ক’টা চিনে বাদাম বেরোল। তাক্কাদুম কডুম-কুড়ুম করে সেই বাদাম খেতে শুরু করে দিল। খেয়ে-দেয়ে বন্দুকটা কাঁধ থেকে নামিয়ে, পাশে রেখে, ঝোপের মধ্যেই গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। এ কী রে, শুয়েই দিব্যি যে নাক ডাকতে শুরু করে দিল। ভাবো তো, এই সময়ে একটা যদি বোমা আকাশ থেকে সটান তাক্কাদুমের পেটে এসে পড়ে তা হলে বাছাধনের কী হয়? একদম পটকা পটাস!
চুপ, চুপ, চুপ! দেখতে পাচ্ছ?
কী?
তাক্কাদুম যেখানটায় শুয়ে আছে সেই ঝোপের আশপাশটা কেমন ঝুপঝুপ করে নড়ছে!
হ্যাঁ তো রে। কীরে বাবা, তাক্কাদুমকে কেউ দেখতে পেল নাকি! এইবার বুঝবে! যুদ্ধ করতে এসে বাদাম খেয়ে ঘুমনো বেরিয়ে যাবে!
দেখতে পাচ্ছ, ঝোপটা এখন কেমন জোরে জোরে নড়ছে! এই বুঝি কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাক্কাদুমের ঘাড়ের ওপর। এই বুঝি তাক্কাদুম পড়ল ধরা।
ই-ই-ই!
কী-ই-ই?
দেখতে পাচ্ছ না!
কই না!
ওমা, ওই তো!
কই তো?
একদম ল্যাবাকান্ত। ওই তো গোঁফ দেখা যাচ্ছে!
হ্যাঁ-তো-রে! কার গোঁফ?
ওই তো চোখ দেখা যাচ্ছে!
তাই-তো-রে! কার চোখ?
ল্যাজ দেখছ?
ওরে বাবা রে মানুষ নয় রে, মানুষ নয়, এ যে বেড়াল! বেড়াল, বেড়াল রে! বনবেড়াল একটা, দুটো, তিনটে!
কী হবে?
এবার বাছাধনের কম্ম শেষ হবে। দেখেছ দেখেছ বেড়ালের নোখগুলো। উরি বাবা! কেমন ওত পেতে বসেছে। এই বুঝি পড়ল ঝাঁপিয়ে! না! ওই দ্যাখো একটা ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে শুট করে তাক্কাদুমের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল। এ ম্যা! কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! বেড়ালটা তাক্কাদুমের গাল চাটতে শুরু করে দিল! ওই দ্যাখো আর একটা বেড়াল! তাক্কাদুমের জামাটা কামড়ে ধরে এই দিল টান! যাঃ! তাক্কাদুমের ঘুম গেছে ছিটকে। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে! চোখ খুলে তাকাতে না-তাকাতে একটা বেড়াল তাক্কাদুমের পেটের ওপর লাফিয়ে উঠে তাকদুমাদুম নাচতে শুরু করে দিল। তাক্কাদুমের তাই না দেখে চক্ষু কপালে। ‘ওরে বাবা রে’ বলে চেঁচাতেই তিনটে বেড়াল তাক্কাদুমকে জাপটে ধরে লাগিয়ে দিল ঝটাপটি! ঝোপের ভেতর সে কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড। কোনওরকমে ছাড়িয়ে-ছুড়িয়ে তাক্কাদুম ঝোপ ডিঙিয়ে মারল ছুট। আরে করছ কী? করছ কী? বন্দুকটা যে পড়ে রইল। আর বন্দুক? ছুট ছুট। ছুটতে ছুটতে হোঁচট খাচ্ছে, টাল সামলাচ্ছে। পড়ছে, উঠছে, কাটছে, ছিঁড়ছে! শেষে ঘেমে-নেয়ে একাক্কার! আরে বাবা একটু থামলেই তো হয়। কী উদো দেখেছ! বেড়ালের ভয়ে একেবারে চোখ-কান বুজে ছুট! চোখ খুলে দ্যাখো না একবার—তোমার পেছনে বেড়ালও নেই, কিচ্ছু নেই। ফক্কা!

তুমি বললেই কী আর থামবে তাক্কাদুম! না, থামবে না! তাক্কাদুম তো আর মোটরগাড়িও নয়, উড়োজাহাজও নয় যে, ছুটলে দম ফুরোবে না, কি উড়লে হাঁফ ধরবে না। বাছাধন ছুটতে ছুটতে নাস্তানাবুদ। দমও গেছে, হাঁফও ধরেছে। না থেমে উপায় আছে। বলতে বলতেই থামল তাক্কাদুম।
উঃ বাবা, যেখানে থামল সেখানটা কী নিরিবিলি। এখানে যুদ্ধও নেই, জনমনিষ্যির গন্ধও নেই। থমথমে জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে একটা মস্ত গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল তাক্কাদুম। তারপর গাছটাকে আঁকড়ে ধরে ফুস-ফাস, ফুস-ফাস করে নিশ্বাস ফেলতে লাগল। একটু পরে যখন বুকের ধুকপুকুনিটা একটু কমল, যখন তার মনে হল, ভয় পাবার মতো তেমন আর কিছু নেই, তখনই বন্দুকের কথা মনে পড়ে গেছে। মনে পড়তেই তার মাথা ঘুরে গেছে! এই রে। বন্দুক কই? সেটা যে সে ফেলে এসেছে! আর যায় কোথায়! তাক্কাদুম আঁকপাক করে একবার বসে, একবার ওঠে। একবার ভাবে বন্দুকটা আনতে যাই। আবার ভাবে যদি বিপদ হয়! এই করতে করতে তাক্কাদুমের আবার খিদে পেয়ে গেল। কী খাই, কী খাই করে তাক্কাদুম আবার যেই পকেটে হাত পুরেছে, আর একেবারে ঠিক তক্ষুনি সেই বেড়াল! সেই মস্ত গাছটার মগডাল থেকে একটা বেড়াল মেরেছে এক লাফ একেবারে তাক্কাদুমের কাঁধের ওপর—ঝপাং। মেরেই তাক্কাদুমের মাথায় তবলা বাজাতে শুরু করে দিলে। ‘ওরে বাবা রে’ বলে তাক্কাদুম যেই না পালাতে গেছে আর একটা বেড়াল কোত্থেকে ছুটে এসে একেবারে সটান তাক্কাদুমের পিঠের ওপর ড্রাম পেটাতে শুরু করলে। আর শেষ বেড়ালটা ঝোপের ভেতর থেকে ধাঁ করে বেরিয়ে এসে তাক্কাদুমের পেটের ওপর তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে এমন কাতুকুতু দিতে লাগল যে, বেচারা হাসতে হাসতে দম আটকে মরে বুঝি। হাসতে হাসতে কী লম্ফ-ঝম্ফ। লম্ফ-ঝম্ফ করতে করতে যখন আর পারল না, মারল ছুট। তখনও তার কাঁধে বেড়াল, পিঠে বেড়াল, বুকে বেড়াল। ওঃ ছোটাছুটির সে কী আজগুবি দৃশ্য।
ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের মাথায় উঠে পড়ল তাক্কাদুম। কাতুকুতুর ঠেলায় ওপর থেকে আবার নামতে লাগল। আবার উঠতে লাগল। শেষমেশ মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে এমন শ্লিপ কাটল যে, আর সামলানো গেল না। হল কী, পাহাড়ের ঠিক নীচেই ছিল একটা ঝিল। জল একেবারে থই থই করছে। পড়বি-তো-পড় ঝপাং! সেই ঝিলের জলে! পড়েই নাকে জল, মুখে জল। জল খেয়ে আই-ঢাই। এদিকে এ কী কাণ্ড! বেড়াল তিনটে কোথা গেল? এ যে দেখি ফুস! মানে হাওয়া!
তাক্কাদুমের দফা তো একেবারে রফা। ঠান্ডা জলে নাকানি-চোবানি খেয়ে, হি-হি করে কাঁপতে লাগল। আর একগলা জলে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক জুলক জুলক দেখতে লাগল।
দেখতে দেখতে হঠাৎ চমকে উঠেছে তাক্কাদুম। এ কী রে, তার সামনে যে একটা ছেলে! শুধু ছেলে নয়, তার পেছনে একটা ঘোড়া। ছেলেটা ঘোড়ার লাগাম ধরে ঝিলের ধারে বসে আছে। বসে বসে তাক্কাদুমের দুর্দশা দেখে ফিক ফিক করে হাসছে। তাকে দেখে তো তাক্কাদুমের লজ্জার একশেষ। লজ্জা যত পাচ্ছে, তার হাসি দেখে রাগও তত ধরছে। কোনও কথা না-বলে তাক্কাদুম ঝিল থেকে ওপরে উঠে এল। চোখ পাকিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়াল। ছেলেটা আরও জোরে হেসে উঠল।
“এই!” তাক্কাদুম মারল এক ধমক।
“কে-ই?” ছেলেটা হাসতে হাসতে উত্তর দিল।
“ঘুষি মেরে তোর নাকটা চ্যাপটা করে দেব!” রেগে একেবারে কাঁই কাঁই করছে তাক্কাদুম।
ছেলেটা এবার হাসি থামিয়ে ঠোঁট উলটিয়ে জবাব দিল, “উঃ! বেড়াল দেখেই অক্কা যায়, আবার নাক চ্যাপটা করবে।”
একেই জলে পড়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল তাক্কাদুম। তার ওপর ছেলেটার মুখে এই কথা যেই না শোনা অপমানে তখন যেন ঠকঠকানি আরও বেড়ে গেল। ছেলেটাকে খপ করে খামচে ধরে কড়কে উঠল, “বেড়াল কোথায় দেখলি রে পুঁচকে ছেলে! বাঘ! বাঘ! বাঘকে বলিস বেড়াল!”
ছেলেটা ওর সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন। তাই তার সঙ্গে ধামসা-ধামসি না করে হি-হি করে হেসে উঠে বলে ফেলল, “কী হাঁদারাম লোক রে! বেড়ালকে বলে বাঘ! হি-হি-হি!”
তাক্কাদুম ছেলেটার কান পাকড়িয়ে ভেংচিয়ে উঠল, “হি-হি-হি। ফুক্কুড়ি হচ্ছে। দেখবি একবার, এই-ই-ই—”
তাক্কাদুমের কথা শেষ হল না। ছেলেটা তাক্কাদুমের পেছনে হাত দেখিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওই-ই-ই দ্যাখো!”
বলতেই তাক্কাদুম পিছন ফিরেছে। ফিরেই তো তার চক্ষু চড়কগাছ। দ্যাখে সেই তিনটে বেড়াল। ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাজ নাড়ছে!
তাক্কাদুম ছেলেটার কান ছেড়ে, ছেলেটার হাত থেকে ঘোড়ার লাগামটা ছিনিয়ে নিয়ে একেবারে ঘোড়ার পিঠে বসে পড়েছে। যেই না বসা, অমনি ঘোড়া চার-পা তুলে ধাঁই-ধপাধপ লাগিয়ে দিলে। তাক্কাদুম চেঁচায় হ্যা-ট-হ্যাট। ঘোড়া হাঁটেও না, ছোটেও না। শুধু লাফায়! তাই দেখে ছেলেটার মজা দেখে কে! হেসে গড়িয়ে একেবারে লুটোপুটি। ছুটতে ছুটতে বেড়াল তিনটেও চোখের পলকে হাজির সেখানে। বেড়াল দেখে ভীষণ ভয়ে তাক্কাদুম ঘোড়ার পেটে যেই ক্যাঁত করে মেরেছে লাথি, ব্যাস! ঘোড়া এমন লাফান লাফাল যে, তাক্কাদুম ঘোড়ার পিঠ থেকে ধপাস—একেবারে চিতপটাং। উ-হু-হু-হু। তাক্কাদুমের পেটটা গেল বোধ হয় ফেঁসে! নাক টিপে চিঁ চিঁ করতে লাগল। ছেলেটা তেমনই হাসতে হাসতেই বলল, “থাকো। শাস্তি।” বলে নিজের ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল ছেলেটা। ওমা। সঙ্গে সঙ্গে ওই দ্যাখো, তিনটে বেড়ালও যে লাফ দিল তিড়িং! একেবারে ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়াটা অমনই ছুট দিল টগবগ, টগবগ।
আর তাক্কাদুম হাঁদারামের মতো সেই দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগল, আচ্ছা অভদ্র ছেলে তো। ছেলে নয়তো, ভেলভেলে! ধুস!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন