শৈলেন ঘোষ

ঘরের এই জানলাটা এখন আমার বন্ধু। কবে, আর কেমন করে যে তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, সেই গল্পই বলতে বসেছি তোমাদের। আমরা যে-বাড়িতে থাকি, সেটা অনেক পুরনো না-হলেও, নতুনের মতো ঝকঝকে নয়। কিন্তু জায়গাটা খুব ভাল। যেমন খোলামেলা, তেমনই আলো-ঝলমলে। কাজেই ঘরের জানলাটা খুললেই অনেকখানি আকাশ স্পষ্ট চোখের ওপর ভেসে ওঠে।
বাড়ির একটু দূরেই একটা ঝিল। আর ঝিলের চারপাশ ঘিরে অসংখ্য গাছ। কী সুন্দর দেখতে লাগে! পাখির শেষ নেই। ডাকছে, উড়ছে। খাবার খুঁজছে। জলে সাঁতার কাটছে। সাঁতার কাটছে অবশ্য হাঁসের ঝাঁক। তাদের সঙ্গে পানকৌড়িও দেখা যায়, সারস আর বকও। সারা বছর এই চলছে। কিন্তু শীতকালটা হয়ে ওঠে আরও জমজমাট। তখন কত যে পরদেশি পাখি এখানে হাজির হয়, বলে শেষ করা যায় না। সেই সব উড়ন্ত পাখির দল, আকাশ ছেয়ে যখন ঘুরপাক খায় তখন দারুণ দেখতে লাগে।
দিনের আকাশ যেমন পাখির দখলে, আর আলোয় ঝলকানো, তেমনই রাতের আকাশ একেবারে অন্য। চাঁদনিরাতে জ্যোৎস্নায় উছল, নয়তো, অমানিশিতে তারায় ঝিকমিক।
আসলে, এত কথা বলার পরেও আমার নিজের কথাই বলা হয়নি। তোমাদের তো জানতে ইচ্ছে করবেই, এত যে বকবক করছে সে কে?
আমি সাগর। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। অবশ্য এখন আমার ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ। বলতে পারো এখন আমি ঘরে বন্দি। আমার অসুখ। কেমন অসুখ, কী অসুখ আমি জানি না। হঠাৎই হয়েছে অসুখটা। ক’দিন যমে-মানুষে লড়াই করে এখন আমি খানিকটা সুস্থ। কিন্তু আমি হাঁটতে-চলতে পারি না। আমার কোমর থেকে পা অবধি অবশ। ডাক্তারবাবু আমাকে যেদিনই দেখতে আসেন সেদিনই বলেন, ভাল হয়ে যাব আমি। কিন্তু ডাক্তারবাবু আমার বাবা-মাকে কী বলেন, জানি না আমি। অথচ অনেকদিন হয়ে গেল। যে-কে সেই! নড়তেও পারি না, চড়তেও পারি না। আর যখনই বাবা-মা’র মুখ দেখি, কেমন যেন ভয় লাগে। সে-মুখে হাসি দেখি না। হাসলেও মনে হয়, যেন সে-হাসিতে প্রাণ নেই।
এখন আমার আস্তানা বিছানা। কখনও শুচ্ছি, কখনও বসছি। আর, এই বিছানার ধারেই যে জানলাটা সেটাই এখন আমার বন্ধু। চোখ মেলে দেখি। দেখতে দেখতে কত দিন যে হয়ে গেল!
তা আর কী করা যাবে। আমার একদম একঘেয়ে লাগে না। বলতে কী, এই আকাশ যেমন, তেমনই ওই জল-ঝলমল ঝিল, গাছগাছালি, আর ওই অসংখ্য পাখিদেরও আমি যেন কেমন ভালবেসে ফেলেছি।
সত্যিই, শীতকালে ঝিলের ধারটা দারুণ জমজমাট হয়ে ওঠে ওই পরদেশি পাখিদের হাজিরায়। মানে, পুজোর পর থেকেই পাখিরা আসতে শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে গাছ তো ভরে যায়-ই, ঝিলের জলেও তাদের তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। কী চমৎকার দেখতে লাগে সেই দৃশ্য।
তবে, একটা কথা মানতেই হবে, আগে যত পাখি শীতের সময়ে এখানে বাসা বাঁধতে আসত, এখন তত আসে না। এই এখন, যেমন এ বছরে, আমি জানলায় চোখ রেখে বুঝতে পারছি, ঝিলের জলেও যেমন, গাছের ডালেও তেমন পাখির ভিড় কম। কেন কে জানে! সবাই বলে এখন আমাদের দেশের জল-বাতাস নাকি পরিচ্ছন্ন নয়। তাই তারা এ-দেশে না এসে অন্য দেশে চলে যায়!
হবেও বা। কিন্তু তাই বলে যেন মনে কোরো না, আমাদের ঝিলের ধারটা একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে। একটু ভিড় কমেছে বটে, তবে তুমি যদি দ্যাখ বুঝতে পারবে না। কমছে, না বেড়েছে। আমরা বলতে পারি। কারণ, আমরা বছর বছর দেখি। তোমার তো আর সে সুযোগ নেই।
এ বছর পুজো শেষ হয়েছে এই সবে। এরই মধ্যে একটু একটু হিমেল বাতাসও গা ছুঁই-ছুঁই করছে। দু’-একটা ছোট-ছোট ভিনদেশি পাখির দলও আসতে শুরু করেছে। বন্দি আমি, জানলায় মুখ রেখে উড়ন্ত পাখির দিকে তাকাই, আর খুঁজি নতুন কেউ এল কি না! না, এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু নজরে পড়ছে না। অবশ্য বলতে পারি নতুন তারাই, গত বছরে ডিম ফুটে যারা জন্মেছে এখানে। হয়তো তারাই আবার কেউ কেউ এসেছে মায়ের সঙ্গে। হয়তো আরও আসবে অনেকে।
বাবার কাছে শুনেছি, যে দেশে শীতের সময় খুব শীত পড়ে, বরফে ঢেকে যায় সব কিছু, সেই শীত পাখিরা সহ্য করতে পরে না। তার ওপর চারদিক বরফে ঢেকে যায় বলে পাখির খাবারও জোটে না। অগত্যা তাদের নিজের দেশ ছেড়ে উড়ে যেতে হয় সেই সব দেশে যেখানে কম শীত। যেখানে বরফ পড়ে না। খাবার পাওয়া যায় অঢেল। খাবার আর আরামের খোঁজে তারা উড়ে আসে হাজার-হাজার মাইল। পথে যেতে-আসতে কত পাখির যে প্রাণ যায়!
এ বছর পাখিদের আসা শুরু হতেই একটা আশ্চর্য ঘটনা চোখে পড়ছে। দেখছি, অজানা একজন মানুষ ঝিলের ধারে প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে পাখিদের দেখেন। পরনে তাঁর প্যান্ট-শার্ট। মাথায় টুপিও দেখি। কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগ। মনে হয়, ব্যাগের ভেতরে ক্যামেরা। এমন কাউকে দেখলে পরদেশি ছাড়া আর কী-ই বা ভাবা যায়!
আসলে মানুষটি যে প্রতিদিন ঝিলের ধারে ঘুরে ঘুরে পাখিই দেখেন, তা কিন্তু নয়। আমাকেও দেখেন, সেটা কিন্তু আমার নজরে পড়েনি একেবারেই। জানতে পারলুম হঠাৎ সেদিন, আচমকাই।
সেদিন হয়েছে কী, রোজকার মতো জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে দেখছিলুম, পাখি। দেখছিলুম, ঝিলের জলে আকাশের ছায়া, আর গাছের ডালে পাখিদের হুটোপাটি। শুনছিলুম, তাদের কারও গলায় কাকলি, নয়তো কারও গলায় প্যাঁক-প্যাঁক। দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম জানলার কোলে, একদমই খেয়াল নেই। অন্য দিন তো এমন হয় না। তবে সেদিন কেন হল?
যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম নিজের অজান্তে, তেমনই ঘুমটা ভেঙেও গেছল আচমকা। কে যেন আলতো ছোঁয়ায় ঠেলা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। আমি ধড়ফড় করে জানলার কোল থেকে মাথা সরিয়ে নিয়েছি। জানলার বাইরে চোখ পড়তেই দেখি, সেই অজানা মানুষটি। হাসি হাসি মুখ। আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই, তিনি বলে উঠলেন, “পাখি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”
আমি অবাক হয়ে গেছি তাঁর মুখে বাংলা কথা শুনে। কেন না, এতদিন দূর থেকে তার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে আমার মনে হত লোকটি ভিনদেশি। পাখি দেখার নেশায় বুঝি ঝিলের ধারে ঘুরে বেড়ান। তাই তাঁর কথা শুনে সে-ভুল আমার ভাঙল। আমি খানিকটা লজ্জাছোঁয়া স্বরে উত্তর দিলুম, “আনমনা হয়ে পাখি দেখছিলুম। কোন ফাঁকে চোখ জড়িয়ে এসেছিল খেয়াল করতে পারিনি।”
তিনি বললেন, “আমি তোমাকে রোজ দেখি, জানলার ধারে বসে বসে তুমি পাখি দ্যাখ। বাইরে আস না কেন?”
উত্তর দিলুম, “আমি হাঁটতে পারি না। অসুখ করেছিল। সেই থেকে অবশ হয়ে গেছে আমার পা।”
আমার উত্তর শুনে তার হাসি হাসি মুখখানা নিমেষে কেমন যেন ভার হয়ে গেল। তিনি বলে উঠলেন, “সে কী!”
আমার আর অন্য কোনও উত্তর দেওয়ার ছিল না। আমি তাকে বললুম, “আসুন না আমাদের বাড়িতে। পাশেই আমাদের বাড়ির বাগানের গেট। গেটের সামনেই এই ঘর। গেট খুললেই আমাকে দেখতে পাবেন।”
তিনি মুখ ঘোরালেন। দেখতে পেলেন গেটটা। জিজ্ঞেস করলেন, “ওইটা?”
আমি ‘হ্যাঁ’ বলার আগেই তিনি গেটের কাছে পৌঁছে গেছেন। গেট ঠেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন।
বললুম, “বসুন।”
অপরিচিত জনের ঘরে ঢুকে হঠাৎ কোনও মানুষ যেমন ঘরের ভেতরটা ক্ষণিক চোখ বুলিয়ে দেখে নেন, তিনিও তেমন করলেন। অবিশ্যি আমার ঘরে দেখার মতো তেমন কিছুই ছিল না। বিছানার ওপর শুধুই ছড়ানো-ছিটানো ছিল আমার পড়ার বই-খাতা। আমি তাঁকে সামনের চেয়ারটায় বসতে বললুম।
তিনি বসলেন। অবাক হয়ে আমায় দেখতে থাকলেন। আমি তাঁকে অন্য আর-কিছু বলতে না-পেরে, বলে ফেললুম, “আমার মা খুব ভাল চা করতে পারেন। মাকে বলি।”
তিনি বললেন, “না, না, তাঁকে আবার ব্যস্ত করা কেন!”
আমি উত্তর দিলুম, “মা ব্যস্ত হন না। এককাপ চা, সে আর এমন কী।”
আমি মাকে ডাকি, “মা-আ-আ!”
মা ভেতর থেকে সাড়া দিলেন।
আমি বললুম, “দেখে যাও, আমাদের বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছেন।”
মা এলেন। মায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও হল। মায়ের হাতের চা-ও তিনি খেলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি আমার মুখ থেকে জেনে ফেললেন, আমার বাবা শিক্ষক। স্কুলে পড়ান। অবিশ্যি, সেদিন বাবার সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। কেন না, তিনি আসার আগেই বাবা স্কুলে চলে গেছেন। তবে, অন্য আর-একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হল। সে অবশ্য তেমন কেউ নয়, তার নাম বিট্টু। আমাদের পোষা বেড়াল। যখন অন্য কেউ থাকে না আমার কাছে, তখন বিট্টুই আমার সঙ্গী। আমার সঙ্গে খেলা করে সে। সে খেলে বিছানার ওপর। সে কখনও লাফিয়ে পড়ে আমার কোলে। না-হয় লাফিয়ে ওঠে কাঁধে। কখনও ছুট দেয় ঘরের মেঝে এ-কোণ থেকে সে-কোণে। আমার তো সাধ্যি নেই ছোটার। তাই বিছানায় বসে বসেই তার কাণ্ডকারখানা দেখি, আর হাসি। তবে, যখনই কোলের ওপর লাফিয়ে বসে, তখন দুষ্টুটাকে ধরে খুব আদর করি।
বিট্টু অবশ্য এই নতুন মানুষটিকে দেখে আজ আর তেমন হুটোপাটি কিংবা ছুটোছুটি কিছুই করল না। অনেকটা যেন অবাক হয়ে তাঁকে দেখল, তারপর সুড়সুড় করে আমার কোলে এসে বসল।
তিনি দেখে বললেন, “বেড়ালটা তো বেশ শান্ত।”
আমি হেসে ফেললুম। বললুম, “শান্ত বইকী। এক নম্বরের বিচ্ছু। আপনাকে এই প্রথম দেখছে তো, নতুন মানুষ, তাই লক্ষ্মী সেজে আছে। নইলে, এতক্ষণে তুর্কিনাচন শুরু হয়ে যেত। একদণ্ড চুপ করে বসে না। নয় ছুটছে, নয় বসছে, নয় লাফাচ্ছে। সারাদিনই হুলুস্থুলু করে বেড়াচ্ছে। পাখি দেখলে আর রক্ষে নেই। এমন তেড়ে যাবে। পাখি উড়ে পালাতে পথ পায় না। আমার ভয় করে। কত পাখি আমাদের বাগানের গাছে এসে বসে। বেড়ালটার খপ্পরে যদি পড়ে যায়!”

তিনি বললেন, “সে তো হতেই পারে। ইঁদুর দেখলে বেড়ালের নোলায় যেমন জল ঝরে, পাখি দেখলেও তা-ই। ধরার সুযোগ পেলে হয় একবার, ছেড়ে কথা বলবে না।”
“সেই তো আমার ভাবনা।” আমি উত্তর দিলুম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কখনও ধরেছে নাকি?”
আমি বললুম, “এখনও তো দেখিনি। তবে একবার একটা পাখিকে তাক করেছিল। তখন তো আমি সুস্থ ছিলুম, ছুটতে-খেলতে পারতুম। তাই, পড়িমরি করে ছুটে বেড়ালটাকে ধরে ফেলেছিলুম। সেই পাখিটা বাচ্চা। কেমন করে যেন আমাদের বাগানের আমগাছের বাসা থেকে পড়ে গেছল। তারপর সেই ছানাকে ঘরে এনে, তার মুখে মাথায় জল দিয়ে গাছের নীচে শুইয়ে রাখলুম। অন্য পাখিদের তখন সে কী চেঁচামেচি। খানিক পরেই তার মা, ছানাটাকে মুখে নিয়ে বাসায় গিয়ে বসল। সে একটা দিন গেছে বটে!”
তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি খুব পাখি ভালবাস না?”
আমি উত্তর দিলুম, “পাখি সবাই ভালবাসে। এই যে আপনি, পাখি ভালবাসেন বলেই তো, এই রোদে রোদে ঝিলের ধারে ঘুরে বেড়ান।”
“তোমার যেতে ইচ্ছে করে না ঝিলের ধারে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
আমি বললুম, “আগে তো যেতুম যখন-তখন। এখনই যেতে পারি না।”
“তাই বুঝি জানলার ধারে বসে দ্যাখ?”
“তা ছাড়া আর কী করব বলুন?”
আশ্চর্য, আমার এই দুর্দশা দেখে তিনি আহা-উহু কিছু করলেন না। আমার অবশ পাদুটো তিনি চেয়ারে বসেই লক্ষ করলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “অনেকক্ষণ তোমার সঙ্গে গল্প হল। এবার উঠি।”
“আবার আসবেন তো?”
“নিশ্চয়ই। কিছু না-হোক তোমার মায়ের হাতে চা তো খাওয়া যাবে।” বলে তিনি হেসে উঠলেন। আমি হাঁক পেড়ে মাকে ডাক দিলুম।
মাকে দেখে তিনি বললেন, “আজ আসি।”
মা বললেন, “আবার আসবেন! ছেলেটার ওই অবস্থা। একা থাকে। কেউ এলে ছাড়তে চায় না।”
“না, আমি আসব। নিশ্চয়ই আসব।” বলে তিনি যাবার সময় আমায় সান্ত্বনা দিয়ে গেলেন, “কিছু ভেবো না, তুমি ভাল হয়ে যাবে।” বলতে বলতে তিনি পা বাড়ালেন। পরক্ষণেই কী মনে হল চট করে ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “দেখছ, তোমার নামটাই জিজ্ঞেস করা হয়নি!”
“সাগর।” বলেই আমার চোখে জল এসে গেল। তিনি অবশ্য দেখতে পেলেন না। তার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। আমি মনে মনে ভাবলুম, সবাই একই কথা বলেন, ভাল হয়ে যাব। কিন্তু কই ভাল তো হচ্ছি না। তবে এ কি শুধুই সান্ত্বনা!
পরের দিনে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। তিনি সেদিন কখন ঝিলের ধারে এসেছিলেন আমি দেখিনি। কিন্তু হঠাৎ যখন আমার জানলার ধারে এসে দাঁড়ালেন, আমি দেখতে পেয়েছি। তখন সকাল। আমি ইংরেজি বইটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। আমার কোলে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল বিট্টু। তিনি আচমকা ডাক দিলেন, “সাগর!”
আমি চমকে তাঁর দিকে তাকিয়েছি। তিনি হাসছেন। আমি দেখি, তাঁর হাতে একটা পাখি। দোয়েল।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, “এ কী, পাখি কোত্থেকে ধরলেন?”
তিনি বললেন, “না, ধরিনি। বেচারা জঙ্গলে পড়েছিল। আহত বোধহয়।”
আমি ব্যস্ত হয়ে বললুম, “আসুন, আসুন ভেতরে আসুন!”
তিনি আহত দোয়েলকে হাতের মুঠিতে আলতো ধরে আমার ঘরে এলেন।
আমি তাঁর হাত থেকে পাখিটাকে নেবার জন্যে হাত বাড়াতেই বিট্টুর ঘুম ভেঙে গেছে। আমার কোল থেকে উঠে পড়েছে। পাখিটাকে আমি হাতে পেলুম না। তার আগেই পাখিটাকে ধরার জন্যে বিট্টু এমন জোরে আমার হাতের ওপর লাফিয়ে উঠল! ঠিক তখনই আমার অচল পাদুটো কোথা থেকে যে শক্তি পেল, আমি বুঝতে পারলুম না। আমি বিট্টুকে ছুট্টে ধরতে গেলুম। ছুটতে আমি পারলুম না। কিন্তু টলমল করে উঠে দাঁড়াতে পারলুম। তার আগেই সেই মানুষটিই বিট্টুকে জাপটে ধরেছেন।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াতে পেরেছি। তারপরে নিজেই বসে পড়েছি বিছানার ওপর। দেখতে পেয়েছি পাখিটা ঘরের এককোণে লুকিয়ে পড়ে তিরতির করে কাঁপছে। আমিও নিজে নিজে উঠে দাঁড়ানোর উত্তেজনায় কাঁপছি। সেই অপরিচিত মানুষটি আমার সেই প্রিয় বেড়ালটাকে একহাতে জাপটে ধরে, অন্য হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি চিৎকার করে উঠলুম, “মা-আ-আ, বাবা-আ-আ!”
তখন আর একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। আমার চিৎকার শুনে, মা-বাবা তো ছুটে এলেনই, কিন্তু চোখের পলকে সেই দোয়েল পাখিটাও ডানা ঝাপটে খোলা জানলা দিয়ে উড়ে পালাল!
তারপরের ঘটনা, পাখি উড়ে যেতেই সেই মানুষটিও বিট্টুকে ছেড়ে দিলেন। তাঁর পরিচয়ও হল বাবার সঙ্গে। তাঁর মুখে জানা গেল, দোয়েল পাখিটা আহত ছিল না। তিনি ধরে এনেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমি খুব পাখি ভালবাসি। তাদের কষ্ট দেখতে পারি না। বুঝতে পেরেছিলেন, আমার চোখের সামনে কোনও পাখি বিপদে পড়লে, হয়তো তাকে বাঁচাবার জন্যে আমি অস্থির হয়ে উঠব। তার ফলে হয়তো আমার অবশ পাদুটো উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াবার শক্তি পেয়ে যেতে পারে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। ঘটল আচমকাই।
আর, সত্যি বলতে কী, ক’দিন হল আমি হাঁটতে পারছি একটু একটু। যদিও বাইরে, ঝিলের ধারে যেতে পারি না, কিন্তু ঝিলের ধারের সেই মানুষটি আসেন আমাদের বাড়িতে। তিনি এখন বাবার বন্ধু। মায়ের হাতের এককাপ চা রোজ তাঁর চাই-ই চাই। আমার আনন্দের শেষ নেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন