শৈলেন ঘোষ

আমার ঠাকুমা থেকে থেকেই একটা ছড়া আউড়াতেন। আমি তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতুম না। কারণ, তখন আমার সেই ছড়ার মানে বোঝার বয়েসও হয়নি, বোঝবার চেষ্টাও ছিল না। ছড়াটা ছিল এই রকম:
নীল সাগরে ঢেউ,
ঢেউ ভাঙছে পাথর,
ভাঙতে ভাঙতে বালি,
বালির কোলে ঝিনুক,
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
যে পারে সে চিনুক।
আমি জানি না আমার ঠাকুমা এখনও বেঁচে আছেন কি না। কেন না, বেশ ক’বছর হল, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ নেই। কারণ আমি চুরির দায়ে ধরা পড়ে হোমে বন্দি আছি। এইসব হোমে বদছেলেদের বদ-অভ্যাস শোধরানোর জন্যে আটকে রাখা হয়। যে-ছেলে চুরির দায়ে ধরা পড়ে, সেই ছেলের জন্যে কোনও বাপ-মা লোকের কাছে মুখ দেখায়! এমনকী, রাগে দুঃখে তাঁরা আমাকেও দেখতে আসেন না। ছেলে চোর! ছিঃ!
অবিশ্যি আমার চুরিটা অন্যরকম। আমাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি ছিল রেল লাইন। আমি সুযোগ পেলেই ওই লাইন-এর ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতুম। দেখতুম, চোখের ওপর দিয়ে কু ঝিক-ঝিক করতে করতে রেলগাড়ি ছুটে যাচ্ছে, কোথায়, কত দূরে যাচ্ছে কে জানে! গাড়ির ভেতর কত মানুষ! তাদের দেখতে দেখতে আমারও মনে হত, আহা, আমিও যদি ওদের মতো রেলগাড়িতে চেপে দূর দেশে যেতে পারতুম! তা, তোমাদের বলে রাখি, রেলগাড়ি চেপে দূরদেশে যাওয়ার মতো আমাদের অবস্থা ছিল না। আমরা ছিলুম খুবই গরিব। আমরা বলতে আমি, আমার ছোট ভাই, এক বোন, মা, বাবা আর ঠাকুমা। তার মানে ছ’টি প্রাণী। বাবা বাজারে আনাজপাতি বিক্রি করতেন। তাতে আর ক’পয়সা হয়? ওই কাজ করে ছ’জনের খাবার জোগাড় করা কী চাট্টিখানি কথা! তার ওপর দু’বেলা পেট ভরে খেতেই পায়ই না, তাদের কি আর লেখাপড়া হয়। আমাদের এখানে অবশ্য একটা প্রাথমিক ইস্কুল আছে। ইস্কুলে পড়তে মাইনে দিতে হয় না। আমি সেখানে বছর খানেক যাতায়াতও করেছি। যা শিখেছি, তা না-বলাই ভাল। একে লেখাপড়ায় আমার মন ছিল না, তার ওপর মাস্টারমশাইরাও ইচ্ছেমতো ইস্কুলে আসতেন, চলে যেতেন। আমি মজা পেয়ে যেতুম। ইস্কুল পালাতুম। এইভাবে ইস্কুল পালাতে পালাতে আমি একটা আস্ত গর্ধভ হয়ে উঠলুম। গাধা-ছেলেকে কেমন করে মানুষ করবেন, এই চিন্তায় বাবা পড়লেন বিষম মুশকিলে। শেষমেশ ঠিক করে ফেললেন, আমার মাথায় আনাজের ঝুড়ি চাপাবেন। আমাকে বাজারে আনাজ বিক্রি করতে শেখাবেন। তা-ই সই। কিন্তু ক’দিন পরে তাতেও মন বসল না। বাজার ফেলে পালাবার জন্যে মন ছোঁক ছোঁক করতে লাগল। অগত্যা ঠাকুমাকে গিয়ে ধরি। ঠাকুমার আমি আদরের নাতি। আদরের নাতি যে খাটতে খাটতে আধমরা হয়ে যাচ্ছে, সেটাও যথাসম্ভব বানিয়ে বলি। এমনকী, খেটে খেটে আমার হাড়পাঁজরা যে সব বেরিয়ে গেল, সেটা দেখাবার জন্যে বুকের জামাটা তুলে ধরি।
তাতে যা হবার তা-ই হল। ঠাকুমা বাবাকে আচ্ছা করে বকে দিলেন। আর সেইদিন থেকে আলু-পটলের বোঝাও আমার মাথা থেকে নামল। আমি একটি পুরোদস্তুর অকর্মের ধাড়ি হয়ে উঠলুম। তবে, এই ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি, আমার ইস্কুল ভাল না লাগলেও ওই যে এক বছর যাতায়াত করেছি, তাতে খানিকটা উপকার আমার হয়েছিল। নিজের নামটা লিখতে শিখেছিলুম। পড়তে শিখেছিলুম। অবশ্য বানান করে। গুনতেও শিখেছিলুম। কিন্তু ওস্তাদ হয়ে উঠলুম অন্যসব কাজে। শিখলুম মারামারি করতে। গুন্ডামি করতে। কেউ আমার ওপর দোষ চাপিয়ে নালিশ করলেই ঠাকুমা আমার মুশকিল আসান হয়ে ওঠেন। আমিও ঠাকুমার আঁচলের আড়ালে বসে বসে যত রাজ্যের নষ্টামি করে বেড়াতে লাগলুম।
তো, এমনই করতে করতে কেমন করে যে হঠাৎ আমি রেলগাড়িকে ভালবেসে ফেললুম, তা আমি মনে করতে পারছি না। রেলগাড়িকে ভালবেসে ফেললে, সেই গাড়ি যে আমাকে এমন করে ব্যতিব্যস্ত করে মারবে, কে জানত! না, অন্য কিছু নয়, সে যেন বলত, দিল্লি যাচ্ছি, মুম্বাই যাচ্ছি, যাবে তো এসো! সত্যি বলতে কী, রেলগাড়ির এই ডাকের লোভ আমি বেশি দিন মনের ভেতর সামলে রাখতে পারলুম না। অগত্যা ঠিক করলুম, আমি ইস্টিশানে যাব। কিছু না-হোক, গেলে অন্তত কাছ থেকে গাড়ির চেহারাটা তো দেখা যাবে।
রেললাইনটা আমাদের বাড়ির কাছাকাছি হলেও, ইস্টিশানটা ছিল একটু দূরেই। তা, হেঁটে গেলে এক ঘণ্টা তো লাগবেই। এক ঘণ্টা এমন কিছু নয়। সুতরাং আমি কাউকে কিছু না-বলে, ওই এক ঘণ্টা হেঁটে ইস্টিশানে পৌঁছে গেলুম। ইস্টিশানে এর আগেও আমি বার দুয়েক এসেছি। কাজেই ইস্টিশান আমার কাছে নতুন কিছু নয়। আমি জানতুম, ওই কালো কালো কোট পরে যারা গেট পাহারা দেয়, তাদের বলে চেকার। ওদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেই কেল্লা ফতে! তুমি বিনা টিকিটে গাড়িতে বসতে পারবে। গাড়িতে চেপে যত দূর ইচ্ছে চলে যেতে পারবে। তোমরা তো বুঝতেই পারছ, টিকিট কেটে রেলগাড়িতে ঘুরে বেড়াবার মতো আমার পয়সা নেই। দু’-চারটে পয়সা যা পকেটে পড়ে আছে তা দিয়ে টেনেটুনে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি হতে পারে। কাজেই চেকারবাবুদের চোখ এড়িয়েই আমি ঢুকে পড়লুম ইস্টিশানের প্ল্যাটফর্মে। ভাগ্য ভাল বলতে হবে, ঢুকেই দেখি একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনেক লোক। গাড়িটা কোথায় যাচ্ছে কে জানে! যেখানেই যাক, আমি মনে মনে স্থির করলুম, এই গাড়িতে চেপেই খানিক ঘুরে আসি। এই ভেবে ঢুকে পড়লুম। উত্তেজনায় আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। উত্তেজনা তো হবেই, কারণ আমি এই প্রথম রেলগাড়িতে পা দিলুম। এতদিন দূর থেকে দেখেছি গাড়ির দৌড়। দেখেছি গাড়ির ভেতর কত যাত্রী। আজ আমি নিজেই যাত্রীদের একজন। এখন গাড়ি ছেড়ে দিলেই আমার মনের সাধ পূর্ণ হয়।
বলতে-না-বলতেই গাড়ির ভোঁ বেজে উঠল। ধীরেতালে গাড়ি গড়িয়ে চলল। ধীর তালে চলতে চলতে গাড়ি তিরবেগে ছুটতে লাগল। কী আশ্চর্য এক অনুভূতি তখন আমার। গাড়ির ছোটার সঙ্গে দেখি, দূরের মাঠ, জমি, গাছ-পালা কাছ থেকে দূরে ছুটে ছুটে ঘুরছে। সেইসঙ্গে আমার মন দুলছে, শরীর দুলছে। মনে হচ্ছে, গাড়ি যেন আকাশটাকে গোত্তা মারার জন্যে তেড়ে যাচ্ছে। হুস করে গাড়ি একটি ইস্টিশান পেরিয়ে গেল। আমি বসার জায়গা পাইনি বলে জানলার দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে দেখছিলুম। আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি! গাড়ি দাঁড়াল না তো! এই সেরেছে! রেলের ড্রাইভার কি তবে দাঁড়াতে ভুলে গেল! বুঝতে পারলুম না। বুঝতে পারলুম না বলে মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত করলুম না। আশ্চর্য কী, এককামরা লোক, তারাও কেউ রা কাড়ল না! তবে?
কিন্তু না, পরের ইস্টিশানেও একই কাণ্ড। গাড়ি হুস-স-স! আমার ভয় ধরে গেল। কী রে বাবা, গাড়ি কি তবে কোথাও দাঁড়াবে না? না দাঁড়ালে আমি বাড়ি ফিরব কেমন করে! আমি তো কাউকে বলে আসিনি। ভয়ে শুকিয়ে আমি আমসি হয়ে গেলুম। আসলে আমি বিনা টিকিটে গাড়িতে চড়েছি। ষোলো আনা ভয় ধরা পড়ার। কাজেই কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। কিন্তু তিন নম্বর ইস্টিশানেও গাড়ি দাঁড়াল না, তখন আর আমার মনকে ধরে রাখতে পারি না। আমি আর দোনোমনা না করে একজনকে জিজ্ঞেস করে বসলুম, “আচ্ছা দাদা, এই গাড়িটা কত দূর যাবে?”
“দিল্লি।”
উত্তর শুনে আমায় ঢোঁক গিলতে হল। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলুম, “দাঁড়াবে না কোথাও?”
লোকটি উত্তর দিল, “দাঁড়াবে। পরের ইস্টিশানে তিন ঘণ্টা পরে দাঁড়াব।”
শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল।
লোকটি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথায় যাবে?”
আমি জানতুম ঘাবড়ালেই বিপদ। তাই বললুম, “আমার নামার কথা যে ইস্টিশান সে তো পেরিয়ে গেল।”
লোকটি বলল, “তুমি ভুল গাড়িতে চড়েছ। এটা লোকাল গাড়ি নয়। এটা মেল। চেকার জানতে পারলে তোমার ফাইন হবে। ফাইন না দিতে পারলে রেল-পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।”
সর্বনাশ! মাত্তর এক ঠোঙা মুড়ি কেনার পয়সা আমার পকেটে পড়ে আছে। সুতরাং চেকারের হাতে ধরা পড়লে বাঁচার রাস্তা নেই। নির্ঘাত পুলিশের হাতে তুলে দেবে। তখন কী হবে! আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। বললে বিশ্বাস করবে না, আমার তখন দু’হাতের দশটা আঙুল থর থর করে কাঁপতে লাগল! মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল! তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেল! মনে হল, কোথাও বসে পড়ি!
না, বসা আমার হল না। লোকটা যাতে বুঝতে না-পারে আমি ভয় পেয়েছি, আমি বিনা টিকিটের যাত্রী, তাই মনকে শক্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলুম। কিন্তু তবু ধরা পড়ে গেলুম। লোকটি জিজ্ঞেস করে বসল, “খুব ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে।”
আমার তখন থতমত অবস্থা। কী উত্তর দেব ভেবে না-পেয়ে বলে বসলুম, “আসলে কী জানেন, ফাইন করে দিলেই মুশকিল। আমার সঙ্গে তো অনেক টাকা পয়সা নেই, মুড়ি কিনে খাবার মতো ক’টা পয়সা সঙ্গে এনেছি। পুলিশে ধরলে কী করব আমি?”
লোকটি উত্তর দিল, “সে আর আমি কী বলব! ঘর থেকে দূরে যাচ্ছ, পকেটে পয়সা নিয়ে বেরোতে হয়, এটা জানো না? এখন চেকারের হাতে যদি ধরা না পড়, সে তোমার ভাগ্য। দ্যাখো কী হয়!”
তার কথা শুনে আমার তখন বোধবুদ্ধি হারিয়ে গেছে। কী করব, না করব ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়লুম। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার চোখের দৃষ্টি পড়ে গেল, গাড়ি ভর্তি মানুষের স্যুটকেশ, বাক্স, পেটরার দিকে। এরপরেই মনের ভেতর শুরু হয়ে গেল একটা স্যুটকেশ হাতিয়ে নেওয়ার মারাত্মক ভাবনা। ভয় যে মানুষকে এমন করে পাপের পথে ঠেলে দেয়, এ-ধারণা আমার একেবারেই ছিল না। আসলে, বিনা টিকিটে রেলে চড়াটাই তো একটা কুকাজ। বুঝতে পারলুম, এই একটা কুকাজ করেছি বলেই তো, আরও একটা কুকাজ করার কুচিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তোমরা শুনলে অবাক হয়ে যাবে, আমি সত্যি সত্যি একটা স্যুটকেশ হাতাবার জন্যে ভিড়ের মধ্যে তাল খুঁজতে লাগলুম।
বলতে ভয়ে শিউরে উঠি, তিন ঘণ্টা কেটে গেল। নিয়ম মতো পরের ইস্টিশানে ট্রেনও থামল। আমিও ফাঁক বুঝে একটা স্যুটকেশ গায়েব করে দে ছুট! সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার শুরু হয়ে গেল, “চোর! চোর! চোর!” আমার মতো কম বয়সি একটা ছেলেকে অমন একটা ঢাউস স্যুটকেশ নিয়ে পালাতে দেখলে, চোরকে চিনতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। সুতরাং আমি ধরা পড়ে গেলুম। শুধু ধরা পড়লে অন্য কথা। ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চতুর্দিক থেকে মাথায়, পিঠে, গালে, ঘাড়ে পড়তে লাগল, কিল, ঘুষি, চড়, চাপড়। শেষমেশ পুলিশের জিম্মায়। খবর গেল আমার বাড়িতে। আমার বাবা এলেন। ছেলের কীর্তির কথা শুনলেন। ফিরে গেলেন। আমার সঙ্গে কথাও বললেন না। আমিও সেই থেকে আটকে থাকলুম ছোটদের বদ-অভ্যেস শোধরানোর এই হোমে। এই হল, হোমে বন্দি থাকার ইতিহাস।
জেলখানা কেমন, আমি জানি না। চুরির দায়ে বড়দের জেল হলে তাদের কী শাস্তি ভোগ করতে হয়, তাও আমার জানা নেই। কিন্তু এখানে, এই হোমের চারদিকে উঁচু পাঁচিল। এত উঁচু যে, এই পাঁচিল টপকে পালায় কার সাধ্যি। নিয়ম মেনে তুমি পাঁচিলের বন্দিশালায় ঘোরাফেরা করো, কেউ তোমায় কিছু বলবে না। কিন্তু পাঁচিলের ওদিকে কী হচ্ছে, সে-খবর ঘুণাক্ষরেও জানা যাবে না। তার ওপর এই বন্দিশালায় তোমায় শেখানো হচ্ছে লেখাপড়া, খেলাধুলো, চাই কী গান শেখো, ছবি আঁকো, পুতুল বানাও, মূর্তি গড়ো, যা খুশি সব, কিন্তু পাঁচিলের ওদিকে যাওয়ার জো নেই। হুকুম। ওদিকে আমার মতো চোর নেই। ওদিকটা মুক্ত।
হোমের বন্দিশালায় আমার ক’দিন খুব কষ্টে কাটল। যখন বুঝলুম, এখনই আমায় এরা ছাড়ছে না, তখন জানি কেঁদেও লাভ নেই। এদের কথা মতোই আমায় চলতে হবে। কাজেই এদের কথা মতোই চলি-ফিরি, খেলি, পড়াশোনা করি, ছবি আঁকি, মাটির পুতুল গড়ি, পাথর খুদে গাছ, পাতাফুল বানাই। এই পাথরে খুদে গাছ পাতা বানাতে আমার খুব ভাল লাগত। আর সত্যি বলছি, এই ভাল লাগতে লাগতে আমার পাথরের কাজেই মন বসে গেল। আর ঠিক তখন থেকেই ঠাকুমাকে দেখবার জন্যে আমার মনও ছটফট করতে লাগল। সবাই আমায় ছ্যা ছ্যা করে, অন্তত একটা মানুষ তো আমাকে ভালবাসেন। আমি যে পাথর খুদে ফুল পাতা বানাতে পারি, এটা শুনলে কী খুশিই না হবেন ঠাকুমা। কিন্তু কবে যে আমি আবার ঠাকুমার কাছে যেতে পারব, কে জানে! ঠাকুমার কথা ভাবতে ভাবতে আমি ছটফট করি।
এমন সময় হঠাৎ একদিন আমার গা-টা কেমন যেন একটু ছ্যাঁক ছ্যাঁক করতে লাগল। জ্বর হল নাকি? না, না, মনে হয় না তেমন কিছু। তাই, আমি আর এ নিয়ে কাউকে কিছু বললুমও না। বললেই মুশকিল। থাকো বিছানায় বন্দি হয়ে। চান-খাওয়া বন্ধ। উপোস। খুব বেশি হলে, এক আধটা বিস্কুট। বলো তাতে পেট ভরে?
হ্যাঁ, এই পেট ভরাতে গিয়েই আমি বিপদ ডেকে আনলুম। আমি জ্বর গায়ে চান করলুম, ভাতও খেলুম। ব্যাস! হু হু করে জ্বর চেপে ধরল। আমি একদম কুপোকাত।

তো, একদিন গেল, দু’দিন গেল, তিন দিনও গেল জ্বর ছাড়ল না। উলটে গতিক খারাপ হল। আমায় যেতে হল হাসপাতালে। আমি জ্বরের তাড়সে ছটফট করে ঠাকুমাকে খুঁজি। কাঁদি! আমার বাড়িতেও খবর গেল। তা, কে এল, না এল আমি কিছুই জানতে পারলুম না। কারণ, আমার জ্বরের ঘোরে জ্ঞান ছিল না। আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি বাঁচব কি না তা-ই দ্যাখো!
সুখের কথা আমি মরিনি। প্রায় পনেরো-কুড়ি দিন পর আমার জ্বর ছাড়ল। ধীরে ধীরে আমি নিজে নিজে উঠে বসতে পারলুম। এটা-ওটা খেতেও পারলুম। শরীরটা জ্বরের ঠেলায় হাড্ডিসার হয়ে গেলেও, একটু একটু জোর পাচ্ছিলুম। কানে আসছিল, আর ক’দিন পরে আমায় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারপর আমায় আবার ঢুকতে হবে হোমে। যতদিন না হোমে বন্দি থাকার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, ততদিন আমায় আটকে রাখা হবে।
হাসপাতালে আমার এই বিছানাটার ঠিক গায়েই একটা মস্ত জানলা। যেমন আলো-হাওয়া, তেমনই জানলায় চোখ রাখলে বাইরেটা স্পষ্ট দেখা যায়। সবুজ মাঠ, গাছগাছালি, নদী, পাহাড় আর লোকজন। সবাই কেমন নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করছে। এই দেখে, আমার মাথায় বদ মতলবের পোকাগুলো কিলবিল করে উঠল। হাসপাতালে ডাক্তারবাবু থেকে শুরু করে নার্স, কাজের লোকজন সবাই সব সময় খুব ব্যস্ত। এই দেখে, আমার মনে হল, এদের চোখ এড়িয়ে তো পালানো যায়! যেই না এই সর্বনাশা মতলবটা মাথায় ঢুকল, সেই শুরু হয়ে গেল পালাবার ফাঁক খোঁজা। খুঁজতে খুঁজতে সত্যিই আমি সুযোগ পেয়ে গেলুম। একফাঁকে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে হাসপাতাল থেকে আমি ফুড়ুত হয়ে গেলুম। কেউ টেরটি পর্যন্ত পেল না। কিন্তু অন্য কেউ টের না পেলেও আমি কিন্তু সাংঘাতিক টের পাচ্ছি। পালানো মানে তো ছোটা। আমি একেবারেই ছুটতে পারছি না। ছোটার কথা ছেড়ে দাও, আদপে পা চালিয়ে হাঁটতেই পারছি না। রোগে ভুগে পা আমার চলতেই চায় না যেন। একটুতেই হাঁপিয়ে পড়ি। উত্তেজনায় বুকে ধুকপুকুনি লেগে যায়।
যাই হোক, সেই অবস্থাতেই আমি লুকিয়ে-ছাপিয়ে পথ হাঁটতে লাগলুম। কিন্তু যাব কোথায়? খাব কী? দুর তোর খাওয়া! এখনই কোথাও লুকিয়ে পড়তে না পারলে যে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাব। বলতে কী, আমায় দেখতে না-পেলে এতক্ষণে যে হাসপাতালে খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেছে, সে আর কে না জানে! জায়গাটা আমার কাছে একেবারেই যে অজানা। এখন কাউকে জিজ্ঞেসও করা যায় না। সন্দেহ করতে পারে। বরং এখন একটা লুকোবার মতো ঠাঁই খুঁজে বার করার কথাই ভাবা উচিত।
কিন্তু আমার পা? সে যে শোনে না। সবে রোগ থেকে উঠেছি, ধুঁকতে ধুঁকতে মরে যাই। আর কত হাঁটব! সে যে কী কষ্ট কাকে বলি? হাসপাতালের খোলা জানলা দিয়ে এতদিন সবুজ মাঠ আর গাছপালার ফাঁকে যে পাহাড় দেখেছি, মনে হল ওই দিকে যেতে পারলে লুকনোর মতো একটা জায়গা পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং পাহাড়ের পথেই পা বাড়ালুম।
খানিকটা যেতেই দেখি, একটা লোক একটা ঝাঁকড়া মতো গাছের ছায়ায় বসে আছে। তার একমুখ দাড়ি! আর মাথাভর্তি উসকো-খুসকো চুল। পোশাকেরও ছিরি তেমনই। লোকটা চোখ ড্যাব ড্যাব করে দেখছে আমায়। আমি ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও, মনকে শক্ত করলুম। আমি তাকে পাত্তা না দিয়ে আপন মনে হেঁটে চললুম। কিন্তু কে হাঁটতে দেবে? লোকটার কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলুম, লোকটার মুখে মুচকি মুচকি হাসি। আরও কাছে আসতেই লোকটা একটা অদ্ভুত গলায় জিজ্ঞেস করে বসল, “কোথায় যাচ্ছিস রে ছেলে?”
আমি হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দিলুম, “এই দিকেই।”
“শোন, শোন,” লোকটা ডাকল। “একটু দাঁড়া। ওদিকে কোথায় যাবি? রাস্তা নেই। ওদিকে পাহাড়।”
আমি মুহূর্ত দাঁড়ালুম। পাহাড়টার দিকে তাকালুম। তারপর উত্তর দিলুম, “আমি পাহাড়ের দিকেই যাচ্ছি।” আবার হাঁটলুম।
তারপর লোকটা আর ডাকাডাকি করল না। আমি নিশ্চিন্তে হাঁটতে থাকলুম।
পাহাড়টার নাগাল পেতে আমায় আর খুব বেশি মেহনত করতে হল না। আমি লুকিয়ে থাকার মতো একটা ফাঁক-ফোকর খুঁজতে লাগলুম। কাজটা খুব শক্ত নয়। তবে আমার মতো রুগ্ণ ছেলের পাহাড়ে উঠে জায়গা খোঁজা তো সম্ভব নয়। কাজেই পাহাড়ের নীচের দিকে একটা গহ্বর মতো দেখতে পেলুম। সুড়ুত করে তার ভেতরেই ঢুকে পড়লুম। আঃ নিশ্চিন্ত!
না, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না, কেন না, গহ্বরের ভেতরে ঢুকেই দেখি, কার যেন সব বিছানা-পত্তর। লন্ডভন্ড করে ছড়ানো। এককোণে একটা পুঁটলি। এদিকে-ওদিকে হাবিজাবি যতরাজ্যের ফেলনা জিনিস। তা থাক। এখন আর ওসব নিয়ে খুঁত খুঁত করে লাভ নেই। আরে বাবা, এখানে যে পালিয়ে আসতে পেরেছি, এই যথেষ্ট। এখন তো ঘাপটি মেরে বসে থাকা যাক, তারপর যা হবার হবে।
হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আমি ঘাপটি মেরেই বসে রইলুম। তারপর শুয়ে পড়লুম। ক্লান্ত চোখে ঘুম জড়িয়ে এল।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলুম কে জানে! আচম্বিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই থতমত খেয়ে গেছি। ধড়ফড় করে উঠে বসেছি। না, আমি নির্বিঘ্নেই আছি। কিন্তু এবার আমি কী করব? সবে আমি জ্বর থেকে উঠেছি। না-হয় ক’দিন এখানে লুকিয়ে থাকা যাবে। কিন্তু খাব কী? এমনই সময়ে হঠাৎ আবার সেই নোংরা পুঁটলিটার দিকে নজর পড়ে গেল। কার পুঁটলি, কে ফেলে রেখে গেছে কে জানে! এখনও যখন কেউ আসেনি, তখন আর কেউ আসবে বলে মনে হয় না। পুঁটলিটা খুলে দেখব না কি? ভেতরে কী আছে? কী আর থাকবে? ছেঁড়াখোঁড়া জামা-প্যান্ট ছাড়া? কিন্তু কে বলতে পারে, পয়সা-কড়িও তো থাকতে পারে! বলা যায় না খুলেই ফেলি।
শেষমেশ খুলেই ফেললুম। ঘেঁটেঘুঁটে তছনছ করে ফেললুম। কোথায় পয়সা! তার বদলে কাপড়-চোপড়ের ফাঁকে দেখি একটি ছেনি আর হাতুড়ি। আমি শিউরে উঠেছি। মনে হল, এমনই হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে আমি পাথর খুদে গাছ-পাতা, ফুল বানাতে শিখেছি। এখনও তো আমি এই ছেনির ওপর হাতুড়ি ঠুকে গাছ-পাতা, ফুল বানাতে পারি। বিক্রি করতে পারি। তখন তো আর উপোস করে থাকতে হবে না। হ্যাঁ, দু’-তিন দিন একটু কষ্ট করতে হবে। হয়তো পেটে কিছু পড়বে না। না-ই পড়ুক। দু’দিন না-খেয়ে থাকতে পারব। সুতরাং, আর দেরি না করে একটা পাথর নিয়ে বসে পড়লুম। শুরু হয়ে গেল ছেনির ওপর হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ। গাছ-পাতা-ফুল বানাই।
সেই তখন থেকে যতক্ষণ না অন্ধকার নামল, পাহাড়ের সেই গহ্বরে পাথর খুদি ঠুকঠাক। আশ্চর্য, কেউ এল না। সারাদিন খেটেছি। পেটে কিছু পড়েনি। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। তবে অনেকটাই হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, আরও একটা পুরোদিন লাগবে। সুতরাং সেই অন্ধকার গহ্বরে আমি শুয়ে পড়লুম। কার-না-কার ময়লা-ছেঁড়া বিছানা তারই ওপর। সকালটা তাড়াতাড়ি হলে বাঁচি।
পরের দিন সকালটা তাড়াতাড়ি হল কি না জানি না। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই বড্ড ক্লান্তি লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আবার শুয়ে পড়ি। কিন্তু না, মনে জোর আনলুম। মাথাটা খুবই ঝিমঝিম করছে। তবু কাছেপিঠে জলের সন্ধান করে, মুখ-চোখ ধুয়ে ফেললুম। একটুতেই হাঁপিয়ে পড়ছি। কাজেই, যত তাড়াতাড়ি পারি হাত চালিয়ে পাথর খুদি। কিন্তু হাত যেন আর চলে না। চোখ যেন থেকে থেকেই মুদে আসে, ততবার আমার হাত থমকে থামে। হাতুড়ি ছেনি ফসকে যায়। আবার ধড়ফড় করে বাগিয়ে ধরি। আবার দেখতে পাই আলো। আবার ফুলের পাপড়ি ফোটাই পাথরের ওপর।
এবার আর পারলুম না। আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমার চোখে ঘন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল। আমি কিছুই বুঝতে পারি না। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লুম। আর কিছুই জানি না।
আমার যখন জ্ঞান হল, আমি প্রথমটা বুঝতেই পারিনি আমি কোথায় আছি। খানিক পরেই একটা চেনা মুখ আমার চোখে পড়তেই আমি ধড়ফড়িয়ে উঠতে গেছি। পারলুম না। বুঝতে দেরি হল না, আমি আবার সেই হাসপাতালেই এসেছি। ওই চেনা মুখটা নার্সের। আমি বুঝতে পারলুম, পাহাড়ের সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে, কেউ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কে নিয়ে এল? কে পেল আমার লুকিয়ে থাকার ওই অন্ধকার গহ্বরের খবর? আমার ভয় করতে লাগল। কেন না, কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে আবার ধরা পড়েছি। আমার শাস্তিটা যে কী ভয়ংকর হবে, বুঝতেই পারছি।
আমি আরও ক’টা দিন হাসপাতালে ছিলুম, গুনে রাখিনি। এই ক’টা দিনে আমি কতবার বকাঝকা খেয়েছি, তারও হিসেব বলতে পারব না। কিন্তু মোটামুটি সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর যখন শুনলুম, আমায় আবার হোমে যেতে হবে, তখন আমি ভয়ে আধখানা হয়ে গেলুম। ঠিক এই সময়ে, আমি যা ভাবতে পারিনি, তেমনই একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল। হাসপাতালে আমার যিনি ডাক্তারবাব ছিলেন, তিনি হঠাৎ সেদিন পাথরে খোদা আমার সেই গাছ-পাতা-ফুলটি আমায় দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কে করেছে?”
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। আমি অবাক চোখে একবার সেই ফুলটির দিকে তাকাই, আর একবার তাকাই ডাক্তারবাবুর দিকে। দেখি, ডাক্তারবাবুর মুখে আলতো হাসি। এমনকী, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নার্সও মুচকি মুচকি হাসছেন। আমি কোনও উত্তর দিতে পারলুম না। তখন ডাক্তারবাবু নিজেই বললেন, “তোকে যেখান থেকে আনা হয়েছে, এটা পাওয়া গেছে সেখানেই। তোর লুকিয়ে থাকার খবর যার কাছে পাওয়া গেছে, তারই মুখে শোনা, এটা তুই করেছিস। কথাটা সত্যিই। কারণ, তোর অজ্ঞান অবস্থায় পাথরটা পাওয়া গেছে তোর হাতের কাছেই। আর তোর হাতের আলগা মুঠোয় পাওয়া গেছে একটা হাতুড়ি আর ছেনি। তুই এ-কাজ কোথায় শিখেছিস?”
এবার আমি ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিলুম, “হোমে।”
“এখন তুই ভাল হয়ে গেছিস। আজ তোর ছুটি হয়ে যাবে। ওঁরা আজ হোম থেকে আসবেন। আবার তোকে ফিরে যেতে হবে হোমে। পাথরে এত ভাল ফুল বানাতে পারিস তুই, দুষ্টুমি করিস কেন?” বলতে বলতে ডাক্তারবাবু আমার কপালে হাত রাখলেন। আমি কেঁদে ফেললুম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললুম, “আমি আর দুষ্টুমি করব না ডাক্তারবাবু। আমি আর হোমে যাব না। আমি বাড়ি যাব। বাড়ির জন্যে আমার মন কেমন করছে।”
“এখন একথা বললে কী হবে? কেউ শোনে? তুই এত দুষ্টু হাসপাতাল থেকেও পালিয়েছিলি। জানিস তোর যদি কিছু হয়ে যেত, আমরা সবাই বিপদে পড়তুম।”
ডাক্তারবাবুর কথা শুনে এবার আর আমার কান্না বাগ মানল না। আমি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলুম। আমার সেই কান্না দেখে ডাক্তারবাবুর বোধহয় দয়া হল। তিনি বললেন, “ঠিক আছে, আর তোকে কাঁদতে হবে না। এর পর আর যদি তুই দুষ্টুমি না করিস, আমি ওঁদের বলব, হোম থেকে তোকে ছেড়ে দেবার জন্যে। বল আর কোনও দিন অন্যায় কাজ করবি না।”
আমি কাঁদতে কাঁদতেই উত্তর দিলুম, “সত্যি বলছি আমি ভাল হব।”
“বেশ, তবে কান্না থামা!” বলে, ডাক্তারবাবু আর একবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে পাথরের সেই ফুলটি নিয়ে চলে গেলেন।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলুম।
হোমের গাড়ি এল বিকেলে। হাসপাতাল থেকে আমার ছুটি হয়ে গেল। আমি যখন গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, আমার হাতে তুলে দেওয়া হল, সেই পাথরের ফুলটি। পাথরের ফুলটি হাতে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে গেটের বাইরে আসতেই আমি থমকে গেছি। দেখি, সেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল আর দাড়িওলা লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। আমি তাকে দেখতে দেখতে ক্ষণেক দাঁড়িয়েই গাড়িতে উঠে পড়লুম। বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল আমার মন। মনে হল, তবে কি এরই দয়ায় আমি বেঁচে উঠেছি! এই মানুষটিই কি তবে পাহাড়ের গহ্বর থেকে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে! আমার গাড়ি ছুটল। লোকটি আমার চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
ক’দিন পরে হোম থেকেও আমার ছুটি হয়ে গেল। ছুটি হবার আগে আমার সেই হাতে গড়া পাথরের গাছ-পাতা-ফুলটি নিয়ে কত হইহই করলেন হোমের কর্তারা। আমার কত প্রশংসা করলেন। কত আনন্দ। তারপর একদিন আমার বাবা এলেন। আমাকে নিতে। আমি লক্ষ্মী ছেলের মতো বাবার সঙ্গে বাড়ি চললুম। সে আর এক আনন্দ। সঙ্গে চলল, আমার পাথরে খোদা গাছ-পাতা-ফুলটিও।
হ্যাঁ, বাড়ি ফিরে আমি খুব খুশি, তেমন আমায় দেখে খুশি সক্কলে। সবচেয়ে খুশি কিন্তু আমার ঠাকুমা। আমাকে কাছে পেয়ে আবার আমায় সেই ছড়াটি শোনালেন:
নীল সাগরে ঢেউ,
ঢেউ ভাঙছে পাথর,
ভাঙতে ভাঙতে বালি,
বালির কোলে ঝিনুক,
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
যে পারে সে চিনুক।
এবার কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলুম ছড়াটার মানে। বুঝতে পেরেছিলুম ঠাকুমা কী বলতে চান। তোমরাও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন