শৈলেন ঘোষ

আমি ইস্কুলে পড়াই। কিছুদিন হল চাকরি পেয়েছি। আমার বিষয় বাংলা। এমন নয় যে আমার অনেক বয়স হয়েছে। আমি সবে বি এ পাস করেছি। বাড়িতে ছোট ভাইটার সঙ্গে এখনও খুনসুটি করি। টানামানি খামচাখামচি লেগেই আছে। ছোট বলতে, আমার ভাই আমার থেকে বেশ ছোট। তা, বছর আটেক হবে। এখন সে ক্লাস এইট-এ পড়ে। আমি তার দিদি যেমন, তার বন্ধুও তেমন।
ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল, আমি টিচার হব। ইচ্ছেটা ভাগ্যের জোরে হাসিল হয়েছে, এমন যেন মনে করো না। আমাকে দস্তুর মতো পরীক্ষা দিয়ে পঞ্চাশজনকে টপকে ঢুকতে হয়েছে। সবচেয়ে ভাল কী, ইস্কুলটা আমাদের বাড়ির একেবারেই কাছে। ট্রাম-বাসের ঝক্কি সামলাতে হয় না। ক’পা হাঁটলেই ইস্কুল। আমি মেয়ে। সুতরাং আমার সুবিধেই হল।
ইস্কুল-বাড়িটা বেশ বড়। অনেকখানি জায়গা জুড়ে তৈরি হয়েছে। বেশি দিনের নয়। খুব বেশি হলে বছর দশেক হবে। হাই-ইস্কুল নয়, প্রাথমিক। বেশ ছিমছাম। সামনে তিনটে কদমগাছ। ফুল ফুটলে গন্ধে ম-ম করে। তেমনই পেছনেও বাগান। বাচ্চাগুলো সেই বাগানে যখন ছুটে ছুটে খেলা করে কী চমৎকার দেখতে লাগে।
ইস্কুলের প্রথমদিনটা আমার সবার সঙ্গে আলাপ-সালাপেই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিনে ক্লাস শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা সবাই আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে লাগল। আমাকে ইশারায় দেখিয়ে বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস শুরু করে দিল। ফিসফাস করতে করতে তারা যে আমাকে নিয়ে কী আলোচনা করছে, খানিকটা বুঝতেই পারলুম। তবে, এই ফাঁকে তোমাদেরও চুপিচুপি বলে রাখি, আমি দেখতে নেহাত খারাপ নই। আর আমার গলার স্বরটাও কারও কান ফুটো করে দেবার মতো নয়। ছোটদের মন জয় করার জন্যে এই গুণ দুটো অনেকটাই কাজে লাগে।
অবশ্য প্রথম প্রথম আমার মনে হত, আমি পারব তো! তবে, পারব না ভেবে ভয়ে হাত গুটিয়ে বসেও থাকিনি। ক্লাসে পড়ানো এই প্রথম হলেও, আমি তো এতদিন ইস্কুল-কলেজে পড়ে এসেছি! সুতরাং মাস্টারমশাইরা কেমন করে পড়ান সে তো আমার জানাই আছে। কাজেই মানিয়ে নিতে আমার অসুবিধে হল না। আমার সঙ্গে পড়ুয়াদের আপনজনের সম্পর্ক গড়ে উঠল। আমি পারলুম। খুদে ছাত্রছাত্রীরা আমার বন্ধু হয়ে গেল কয়েকদিনের মধ্যেই। পড়ানো কাজটাও আমার ধাতে সয়ে গেল।
ভালই চলছিল আমার। হঠাৎ একদিন বাধ সাধল একটা রাস্তার ছেলে। বেশি বয়স নয়। খুব বেশি হলে ন’-দশ বছরের হবে। দেখলেই মনে হবে হা-ঘরে। যেমন চেহারার ছিরি, তেমনই নোংরা পোশাক, প্যান্ট-জামা। ইস্কুলের ছুটির পর আমি যখন বাড়ি ফিরি, তখন সে রোজ আমার পিছু পিছু হাঁটে। এটা আমি প্রথম প্রথম খেয়াল করিনি। একদিন হঠাৎই আমি আচমকা মুখ ফেরাতেই তাকে দেখতে পেলুম। আশ্চর্য, আমার মুখের দিকে চেয়ে সে মুচকি-মুচকি হেসে উঠল। আমি থতমত খেয়ে গেলুম। মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। যেমন করে হাঁটছিলুম, তেমন করেই বাড়ি ফিরে এলুম। বলতে কী, ছেলেটার কথা ভুলেই গেলুম। বাড়িতে ফিরে এটা ওটা কাজ সেরে, যেমন রোজ করি, আজও তেমন গান সাধতে বসলুম।
আজ আমি ছেলেটাকে ভুলে গেলুম বটে, কিন্তু পরের দিনও দেখি একই কাণ্ড। ছেলেটা কোত্থেকে দুম করে বেরিয়ে এসে আমার পেছনে হাঁটতে শুরু করেছে। আমি মুখ ফিরিয়ে দেখতেই সে ঠিক আগের দিনের মতো ফিক করে হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে কেমন একটা খটকা লাগল। লাগলেও আমি কোনও সাড়াশব্দ করলুম না। চুপচাপ বাড়ি ফিরে এলুম।
কিন্তু, আজ শুরু হল উলটো বিপত্তি। কাল যেমন ছেলেটার কথা একেবারেই ভুলে গেছলুম, আজ তেমনই থেকে থেকেই ছেলেটার হাসিমাখা মুখখানা আমার চোখে ভাসতে লাগল। মনে মনে ভাবছি, ছেলেটা কি ভিক্ষুক! সে কি পয়সা চায়! চাইতে লজ্জা পাচ্ছে! আবার মনে হচ্ছে, অন্য কিছু মতলবও তো থাকতে পারে! ছেলেটার কোনও বদ-চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ নেই তো! দেখি তো কাল কী করে!
পরের দিনও সে যথারীতি আমার পিছু নিল। তবে, সেদিন আমি তার দিকে ফিরেই তাকালুম না। নিজের মনে হেঁটেই চললুম। কিন্তু অবাক কাণ্ড, হঠাৎ সে-ই বলে উঠল, “দিদি, আজ ফিরে দেখলে না যে! একটা কথা শুনবে?”
আমি পাত্তাই দিলুম না।
সে আমার পেছনে হাঁটতে হাঁটতেই বলল, “শুনবে না?”
তার গলায় অদ্ভুত আকুতি! আমি না দাঁড়িয়ে পারলুম না। ফিরে তাকালুম তার দিকে। রাগের ভান করে ধমক দিয়ে বললুম, “কে রে তুই? রোজ আমার পিছু-পিছু হাঁটিস?”
ছেলেটা ধমক খেলো, অথচ ভয় পেল না। হাসতে হাসতে বলল, “কেউ আমায় বকলে আমার হাসি পায়। তুমি আমায় বকছ, আমার হাসি পাচ্ছে। আর আমার হাসি দেখে, তোমারও নিশ্চয়ই রাগ বাড়ছে। একদিন কী হয়েছিল জানো, একজন আমার হাসি দেখে রেগে এমন কাঁই হয়ে গেছল যে, আমার গালে দিয়েছিল কষে এক চড়। আমার লেগেছিল খুব। কিন্তু আমি কাঁদিনি। সেদিনও আমি হেসে ফেলেছিলুম।”
আমার অবাক লাগল ছেলেটার কথা শুনে। বুঝতে পারলুম, একে বকাবকি করা মানে, নিজের মনকেই কষ্ট দেওয়া। তার চে বরং একটা টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ির পথ দেখি। তাই, আমি আর দেরি না করে, আমার ব্যাগ খুলে টাকা বার করলুম। বললুম, “আর বেশি বকবক করতে হবে না। এই নে! নিয়ে সরে পড়!” বলে, হাত বাড়িয়ে তাকে টাকাটা দিতে গেলুম।
সে কিন্তু টাকাটা নেবার জন্যে হাত বাড়াল। আবার সে হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি আমাকে ভিখারি ঠাউরেছ। না, না, আমি ভিক্ষে চাইছি না। বরং বলতে পারো, ভিখারির কষ্ট দেখলে আমি দেখতে পারি না। পালাই।”
আমি বললুম, “তুই তো ভারী আশ্চর্য আশ্চর্য কথা বলছিস! কেউ বকলে তোর হাসি পায়! ভিখারি দেখলে তুই পালাস! তার মানে তুই পাগল?”
ছেলেটা তেমনই হাসি মুখে বলল, “তুমি ঠিক বলেছ, আমি পাগল। তুমি কেমন করে জানলে বলো তো?”
আমি এবার সত্যিই রেগে উত্তর দিলুম, “আমি বারণ করে দিচ্ছি! ফের যদি তুই আমার পেছনে পেছনে হাঁটিস, আমি পুলিশ ডাকব!”
ছেলেটা ভয় পেল কিনা বুঝতে পারলুম না। তবে তার মুখের হাসিটা একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তখনই আমার সন্দেহ হল, তবে কি ছেলেটা চোর! পুলিশের নামে ভয় পেল!
তারপরেই আমার মুখের ওপর একটা জব্বর জবাব দিল ছেলেটা। বলল, “জানো, আমার খুব ইস্কুলে পড়তে ইচ্ছে করে।” তারপর দোনোমনা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের ইস্কুলে আমাকে নেবে?”
আচমকা আমার চোখ ছেলেটার আগাপাছতলা ঘুরপাক খেয়ে গেল। আমি কোনও উত্তর দিলুম না। মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে হনহন করে হাঁটা দিলুম।
এবার ছেলেটা কিন্তু আমার পিছু নিল না। সে কোথায় গেল, কী করল, জানতেও পারলুম না। আমি বাড়ি ফিরে এলুম।
ফিরে এলাম বটে, কিন্ত স্থির হয়ে কোনও কাজও করতে পারলাম না। মনটা কেমন খুঁতখুঁত করতে লাগল। আজ গানেও মন বসল না। কেবলই ছেলেটার মুখখানা মনে পড়ে যাচ্ছিল। হাসিমাখা মুখ। কে ছেলেটা? জানার জন্যে মন ছটফট করছিল। ছেলেটা কি সত্যিই পাগল? পাগল কি অমন সহজে বলতে পারে, ‘আমার খুব ইস্কুলে পড়তে ইচ্ছে করে?’ ঠিক আছে কাল খুঁটিয়ে সব জানতে হবে।
কিন্তু পরের দিন ছেলেটা বেমালুম বেপাত্তা হয়ে গেল! এদিন ছেলেটা এলই না। তবে কি আমায় চোটপাট করতে দেখে সে কষ্ট পেল। নাকি, তার কথার উত্তর দিইনি বলে সে রাগ করল! মনটা ভার হয়ে গেল আমার।
তা, কত মানুষেরই তো জীবনে এমনতর ঘটনা নিত্যদিন ঘটে। সেসব নিয়ে কে আর সর্বক্ষণ মাথা ঘামায়। কাজেই পরের পরের দিনও যখন ছেলেটাকে আর দেখা গেল না, ভাবলুম তা হলে এ তল্লাটে সে বোধহয় আর নেই। হয়তো অন্য কোথাও আর কারও পেছনে ঘুরঘুর করছে। এদের দস্তুরই এইরকম। রাস্তার ছেলে তো!
বুকটা চমকে ওঠে। ছেলেটার মুখখানা মনে পড়ে যায়! মন বলে, ছেলেটা সত্যিই কি রাস্তার? এমনই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি অস্থির হয়ে উঠি। আর পারি না। ভাবি, ছেলেটার কথা মন থেকে মুছে ফেলতে পারলে বাঁচা যায়। আর, সত্যি বলতে কী, ধীরে ধীরে আমি তার কথা ভুলেই গেলুম। এখন আমি নিশ্চিন্তে ইস্কুলে যাতায়াত করতে পারি। বাড়িতে মায়ের ঘরকন্নার কাজে একটু-আধটু সাহায্য করি। ভাইটাকে যতটুকু পারি পড়া দেখিয়ে দিই। নিজে একটু এ-বইটা সে-বইটা ঘাঁটাঘাঁটি করি। বাবাকে চা করে দিই। আর, গান গাই। এ আমার নিত্যদিনের কাজ। মা অবশ্য মাঝে মাঝে বলেন, “গানটা ভাল করে শিখলেই তো পারিস।” বাবাও মায়ের কথায় সায় দেন।
আমি উত্তর দিই, “চিরদিন ভেবে এসেছি ইস্কুলের টিচার হব, হয়েছি। গানটা আমার শুধুই তোমাদের জন্যে। তোমরাই আমার গানের শ্রোতা। আমি তো কোনওদিন ভাবিনি, আশা ভোঁসলে হব, কিংবা আজকের শ্রেয়া। আর, তা হব বললেই তো আর হওয়া যায় না। দস্তুর মতো ক্ষমতা থাকা চাই।”
মা, বাবা দু’জনেই হাসেন।
সেদিন একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। আকাশবাণীতে একটা গান শুনেছিলুম, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না, কার। কিন্তু গানটা দারুণ ভাল লেগে গেছিল। গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মুখস্থও করে ফেলেছিলুম। তবে সুরটা তো আর চটজলদি নিখুঁত তোলা যায় না গলায়। তবু, ভুলভাল যা তুলতে পেরেছিলুম, সেইটুকুই যথেষ্ট। বাবা, মাকে শুনিয়ে খুব বাহবা পেয়েছিলুম। সেদিন রাত্রে এই গানটা নিয়েই ঘসামাজা করছি, এমন সময় শুনতে পেলুম, বাইরে কাছাকাছি কে যেন আমার গলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছে। আমি থামলুম। কিন্তু সে থামল না। গেয়েই চলল। গলার স্বরটা নেহাত মন্দ নয়। আমি জানলায় মুখ বাড়িয়ে দেখবার চেষ্টা করলুম। এই রাতের অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। ভীষণ ধন্দে মনটা ছটফট করতে লাগল। মনে হচ্ছে কম বয়সি কেউ গাইছে। গান শুনতে পেয়ে আমার ভাইটা পর্যন্ত জানলার ধারে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, “কে গাচ্ছে রে দিদি?”
“কী জানি বুঝতে পারছি না।” আমি জবাব দিলুম।

সে রাতে যতক্ষণ চোখে ঘুম আসেনি, ততক্ষণ কেমন যেন একটা ধাঁধায় আচ্ছন্ন হয়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠেও তার রেশ কাটেনি।
তা, সে যাই হোক, সময় হল। ইস্কুলে গেলুম। ছুটি হল, বাড়িও ফিরে এলুম। কিন্তু আজ বাড়ি ফেরাটা একেবারেই নির্ঝঞ্ঝাট হল না আমার। আশ্চর্য, রাস্তায় দু’পা হাঁটতেই আমার পেছনে কে যেন আবার গেয়ে উঠল, আমার নিজের গাওয়া সেই গান। আমি চট করে মুখ ফেরাতেই দেখি, সেই মূর্তিমান। হাসিমুখে গাইছে। আমি হতবাক হয়ে শুনতে লাগলুম। তখন তার ওই নোংরা জামাপ্যান্ট, পা ভর্তি ধুলো, কিংবা মাথার উশকো-খুশকো চুল দেখে ঘেন্নায় আমার গা রি-রি করে উঠল না। মনে হল, ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। আমি পারলুম না দাঁড়িয়ে থাকতে। সত্যিই ছুটে গেলুম। তাকে জড়িয়ে ধরলুম। আমার ধোপদুরস্ত পোশাকের অহংকার তার ওই নোংরা পোশাকের জলুসে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হল, আমি যেন আকাশের লক্ষ তারার ঝাঁক থেকে একটি তারাকে ছিনিয়ে এনে গায়ে মেখেছি তার আলো। এমন সময় আচমকা সে বলে উঠল, “আমাকে তুমি ছেড়ে দাও, আমার গায়ে ধুলো।”
আমি ছাড়লুম না। তাকে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলুম, “তুই কে?”
সে-কথার সে উত্তর দিল না। উলটে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে তোমার ঘেন্না করছে না? আমায় ছেড়ে দাও!”
আমি আদর করতে করতেই তাকে ছেড়ে দিলুম।
সে বলল, “ছি ছি, দ্যাখো তো আমার গায়ের নোংরা তোমার জামা-কাপড়ে লেগে গেল।”
না, আমি একবারের জন্যেও আমার জামা-কাপড়ের দিকে ফিরে তাকালুম না। তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম অবাক হয়ে। এদিন সে হাসছে না আর সেদিনের মতো তেমন করে!
সেও তাকিয়ে রইল আমার দিকে এক দৃষ্টিতে। কী জানি, কী যে মনে হল আমার, আমি তার হাত ধরে বলে ফেললুম, “আয় আমার সঙ্গে!”
“কোথায়?”
“আমাদের বাড়িতে।”
“কেন?”
“তোকে আমি গান শেখাব।”
হঠাৎ যেন ছেলেটার চোখের দৃষ্টি খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বলে উঠল, “আমি তো তোমাদের বাড়ি চিনি। ওই তো দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। তোমাদের বাড়িটা খুব সুন্দর। তেমনই বিচ্ছিরি আমার চেহারা। আমাকে দেখলে তোমাদের বাড়ির সবাই ঘেন্না করবে। আমি যাব না।”
“তুই যে সেদিন বললি তোর ইস্কুলে পড়তে ইচ্ছে করে?”
“সে তো এমনি এমনি বলেছিলুম।” উত্তর দিল ছেলেটা।
আমি বললুম, “আমি যদি সত্যি-সত্যিই তোকে ইস্কুলে নিয়ে যাই?”
সে উত্তর দিল, “ধ্যাৎ, তাই আবার হয়? এই নোংরা জামাপ্যান্ট পরে কেউ আবার ইস্কুলে যায়? তার ওপর আমার ব্যাগ নেই, বই নেই। আমায় ইস্কুলে ঢুকতেই দেবে না।”
আমি বললুম, “তোর সব হবে।”
“কে দেবে?”
“আমি দেব।”
“তুমি কেন দেবে?”
“আমি যে তোর দিদি।”
আমার কথা শুনে হঠাৎ যে কী হল, ছেলেটার মুখখানা থমথম করে উঠল। আমি স্পষ্ট দেখলুম, যে-ছেলের মুখে সবসময়ে হাসি, আজ তার চোখে জল। সে কেঁদে ফেলল। তার কান্না দেখে আমি কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “কী হয়েছে?”
সে এবার নিজেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরল। জিজ্ঞেস করল, “সত্যি বলছ, তুমি আমার দিদি?”
আমি তাকে আদর করলুম চিবুক ছুঁয়ে।
সে বলল, “একদিন সত্যিই আমার দিদি ছিল। আমার মা, বাবা সবাই ছিল। আমি একদিন সত্যিই ইস্কুলে পড়তুম। গঙ্গার পাড়ে ছিল আমাদের বাড়ি। একদিন গভীর রাতে, আমরা তখন ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ গঙ্গার পাড় ভেঙে আমাদের বাড়িটা হুড়মুড় করে তলিয়ে গেল গঙ্গার জলে। বাড়ির ভাঙা চালে চাপা পড়ে আমার মা, বাবা আর দিদি উঠতে পারল না জল থেকে। ভেসে গেল স্রোতে। আমি বেঁচে গেলুম কেমন করে, নিজেই জানি না। আমি সেই থেকে একা হয়ে গেলুম। আমি একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। আহার জোটে না। সত্যি বলতে কী, খিদে তেষ্টার কথা ভুলেই গেলুম। আমি অসহায়। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ঠিক তখনই একটি ভাল মানুষের নজরে পড়ে গেলুম। তিনি আমার জন্যে যথেষ্ট করলেন। বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমাকে যত্ন করে খাওয়ালেন। নতুন জামা-প্যান্ট দিলেন। সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে এলেন। একটা অনাথ আশ্রমে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু আমার থাকা হল না।
“এই অনাথ আশ্রমের মানুষজনের কাছে আমি যত্ন পেলুম না। ভীষণ নির্দয়। দুটো খেতে দিত আর আমার ক্ষমতায় কুলোত না, এমন সব কাজ করতে দিত। না-করলে মারত, অকথা-কুকথা বলত, আর আমি কাঁদতুম। একদিন এমন একটা কাজ দিল, সত্যিই আমার সাধ্যে কুলোল না। আমাকে বেধড়ক পিটুনি দিয়ে অনাথ আশ্রম থেকে বার করে দিল। সেই থেকে আমি একা। রাস্তার ছেলে। রাস্তার ছেলে যেমন কুড়িয়ে খায়, আমারও তেমন করেই খাবার জোটে।”
ছেলেটার এই মন কেমন করা ঘটনা শুনে আমার ভীষণ মায়া লাগল। অস্থির হয়ে উঠল মন। কোনও কথা সরল না মুখ দিয়ে।
আমায় এমনভাবে চুপ থাকতে দেখে সে হঠাৎ বলে উঠল, “তুমি যে চুপ করে গেলে?”
আমি থতমত খেয়ে গেছি।
সে আবার জিজ্ঞেস করল, “আমায় তুমি নিয়ে যাবে না তোমাদের বাড়িতে?”
এমন আকুল সেই গলার স্বর, আমি অন্য আর কোনও কথা মুখে আনতে পারলুম না। তার হাত ধরলুম। বললুম, “চ।”
নিয়ে এলুম আমাদের বাড়িতে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এ কে? কাকে আনলি?”
আমি উত্তর দিলুম, “মা, ছেলেটি অনাথ।”
মা আঁতকে উঠলেন, “বাচ্চাটা অনাথ! আহা রে!”
বাবাও শুনলেন, “অনাথ।”
বাবা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিল?”
আমার ভাইও শুনল, ছেলেটা অনাথ। অনাথ কাদের বলে আমার ভাই সেটি বিলক্ষণ জানে। তাই সে অনাথ কথাটায় আপত্তি জানিয়ে বলল, “অনাথ কেন বলছিস দিদি, আমরা তো সবাই আছি। আমাদের বাড়িতে থাকবে ও। আজ থেকে ও অনাথ নয়, আমার ভাই।” বলে, আমার ভাই তার হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। ভাইয়ের নিজের পোশাক তাকে পরিয়ে দিয়েছিল।
মা তার জন্যে খাবার রান্না করতে বসল।
বাবা কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম কী রে?”
সে বলল, “খেলনা।”
বাবা তার নাম শুনে হেসে ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, “নামটা তোর কে রেখেছে?”
“আমার দিদি।”
বললেন, “কেন রে, খেলনা আবার কারও নাম হয় নাকি?”
সে উত্তর দিল, “কেন হবে না? আমি যখন খুব ছোট্ট ছিলুম, তখন দিদিরও তো কম বয়েস। কম বয়সে সবাই যেমন খেলনা নিয়ে খেলা করে, তেমনই দিদিও আমাকে নিয়ে খেলা করত। আমাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে হাত ধরে নাচাত। কোলে শুইয়ে, গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াত। এই দেখে কেউ হাসাহাসি করলে, দিদি বলত, ‘আমি আমার খেলনা নিয়ে খেলা করছি, তোমরা হাসছ কেন? সেই থেকে নামটাও আমার খেলনা হয়ে গেল।”
সেইদিন থেকে খেলনা আমাদের বাড়িতে আছে। খেলনা এখন ইস্কুলে যায় আমার সঙ্গে। আমার কাছে গান শেখে। খেলনা এখন ফেলনা নয়। পড়াশোনায় যেমন ভাল, তেমনই তার গলার গান শুনেও তোমরা চমকে উঠবে। হয়তো একদিন সে জলসায় গান গাইবে। তোমরা যদি শোনো, আমায় এসে বলো কেমন লাগল। তার হাসিটা মুখে ঝলকে উঠলে, এখন আরও মিষ্টি লাগে দেখলে। মিষ্টি একটা খেলনা-পুতুলের মতো।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন