শৈলেন ঘোষ

আমারও ঘাড় আছে, তোমারও ঘাড় আছে। আরে মশাই ঘাড় তো বিশ্বসুদ্ধ সবারই আছে। মাথা নাড়লেই তিনি সামাল দেন! এ আর এমনকী নতুন কথা! সবাই জানে।
ঠিক বটে, কথাটা নতুন নয়, সবাই জানে। কিন্তু ভূত নামের একটি আজব চিজ যে কখন কার ঘাড়ে চাপবে, সেটি কিন্তু কেউ জানে না। শুধু ঘাড়ে চাপাই নয়, তার ঠেলায় কখন যে কার মতিচ্ছন্ন হবে, সেটা বলাও সহজ নয়।
তা বাপু, তোমার-আমার মতো হেঁজিপেঁজি মানুষের মতিচ্ছন্ন ধরলে সে একরকম। তখন তাকে পাগলও বলা যায়, নয়তো ছাগল। ব্যাস, এই পর্যন্ত বলে শেষ! কিন্তু রাজা-রাজড়ার মতো কোনও মহামান্য ব্যক্তির ঘাড়ে যদি ভূত চাপে, তবে? তবে, সে যে ভীষণ ফ্যাসাদের কথা। তার ওপর সেই ঘাড়টি যদি আবার রাজা কাক্কাবোক্কার হয়, তা হলে তো আর কথাই নেই!
তবে, তুমি বলতেই পারো, সারা রাজবাড়ি ঘিরে যেখানে এত পাহারাদার, এত সৈন্য-সামন্ত, নিরাপত্তার এমন বজ্র আঁটুনি, সে সবের ফাঁক গলে ভূত ঢোকে কেমন করে? কেমন করে সব ছেড়ে রাজার ঘাড়ে চাপে?
এই তো ভুল করলে! আরে বাবা, ভূতটা যদি প্রথম থেকেই রাজবাড়ির ভেতরে বাসা বেঁধে থাকে, তবে ঢোকার কথা ওঠে কেমন করে! হ্যাঁ, তুমি অবশ্য জিজ্ঞেস করতেই পারো, তবে কি রাজবাড়িটাই ভূতের বাড়ি?
জিজ্ঞেস করাটা খুবই ন্যায্য। তবে সেই ভূতটা যে কেমন ভূত, কেমন করে রাজার ঘাড়ে চাপল, আর তার চাপের ঠেলায় রাজা কাক্কাবোক্কা যে কেমন করে কাণ্ডজ্ঞান হারালেন, সেই রহস্যের সন্ধান করা যেতেই পারে। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, রহস্য সন্ধানের সেই বিপদসংকুল ঝুঁকিটা নেবে কে?
যে-ঘটনা নিয়ে ভূতের নামে এত ধানাই-পানাই, আর রাজার ঘাড়ে চাপার অপবাদ দেওয়া, সেটা কিন্তু নেহাতই একটা তুচ্ছ ঘটনা। হয়েছে কী, রাজা কাক্কাবোক্কা সেদিন বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন। ফুরফুরে মেজাজেই তিনি এদিক ওদিক ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। আর গায়ে ফুরফুরে হাওয়া লাগাচ্ছিলেন। কিন্তু বিপদ ঘটল রানির সাজঘরের পাশ দিয়ে যখন তিনি আসছিলেন, তখনই। তখনই ভূতটা তাঁর ঘাড়ে চাপল।
রানির সাজঘরের দরজা অবশ্য আঁটোসাঁটো করে বন্ধই ছিল। থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেটা স্বাভাবিক নয় সেটা হল কী, ঘরের ভেতর থেকে গুনগুন করে গানের সুর ভেসে আসছিল। মানে, রানি যখন মুখে পমেটম, চোখে কাজল আর কপালে টিপ পরে সাজুগুজু করছিলেন, তখন আপন মনে গুনগুন করে তিনি গানও গাইছিলেন। ব্যাস! রাজার কানে সুরের সেই গুনগুনানি পৌঁছে গেছে! অমনই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এদিক ওদিক চতুর্দিক ভাল করে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলেন। না, কাছেপিঠে কেউ নেই। আর দেরি না করে সাজঘরের বন্ধ দরজায় কান পাতলেন। বোঝো একবার! রাজা বলে কথা, তিনি চোরের মতো আড়িপেতে রানির গলার গুনগুনানি শুনছেন! আর ঠিক তখনই তাঁর ফুরফুরে মেজাজ গেল বিগড়ে। তিনি দরজা থেকে কান সরিয়ে দুমদুম করে পা ঠুকতে ঠুকতে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। তিনি এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর চোখেই পড়ল না, রানির সাজঘরের দরজায় তাঁর আড়িপাতার দৃশ্যটা একজন দেখে ফেলেছে! সে অন্য আর কেউ নয়, রাজারই নিজের পরিচারক। রাজার অমন গম্ভীর মুখ দেখে পরিচারক কোথায় ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে, তা নয়, দ্যাখো, কেমন খিকখিক করে হাসছে! কী আকাট লোক রে বাবা! তোমার ওই হাসিমুখ রাজা যদি একবার দেখে ফেলেন, তবে যে তোমার ভুষ্টিনাশ করে ছাড়বেন, সেটা কি তোমার জানা নেই!
ওমা, লোকটা যে দেখি মুচকি হাসতে হাসতেই রাজা কাক্কাবোক্কার কাছে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যেই রাজা বিছানা নিয়েছেন। লোকটা কথা নেই, বার্তা নেই হি-হি করে হেসেও উঠেছে! রাজা কাক্কাবোক্কা তার হাসি শুনে চমকে তাকালেন লোকটার দিকে। তারপর তেড়ে ধমক দিয়ে বললেন, “হাসছিস কেন রে?”
এক ধমকেই লোকটার আত্মারাম খাঁচাছাড়া! তার মুখের হাসি মুখেই চুপসে ফুস! ফস করে রাজার কোমরটা ধরে দলতে লাগল!
লোকটার ব্যাপার-স্যাপার দেখে রাজা তো হতবাক! কী রে বাবা, ধমক খেয়ে লোকটা পাগল হয়ে গেল নাকি? তিনি হাঁক ছেড়ে বললেন, “এই ঢেঁকি, কে তোকে আমার কোমর দলতে বলেছে?”
লোকটা উত্তর দিল, “কেন হুজুর, আপনিই তো কাল বলেছিলেন। আপনার হুকুমেই তো কাল আপনার কোমর দলছিলুম। সেই সময় রানিমা হঠাৎ ঘরে ঢুকতে কাল আধখানা দলে ছেড়ে দিতে হল। আজ বাকি আধখানা সেরে নিচ্ছি।”
রাজার রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। বললেন, “তুই তো আচ্ছা গবেট! কাল আধখানা বাকি ছিল বলে সেই আধখানা আজ সারছিস! তোকে পাগলাগারদে পাঠাব।”
লোকটা ভয়ে কাঁচুমাচু। রাজার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে ককিয়ে উঠল, “আজ্ঞে হুজুর, আমি একদম পাগল হইনি। আমাকে পাগলাগারদে দেবেন না হুজুর।”
“তুই আলবত পাগল হয়ে গেছিস,” রাজা কড়কে উঠলেন তাকে, “আমি নিজের চোখে দেখছি, তুই তখন পাগলের মতো নিজের মনে হাসছিলি।”
উত্তরে সে বলল, “আমিও তো নিজের চোখে দেখেছি।”
রাজা চমকে উঠলেন, “কী দেখেছিস?”
সে জবাব দিল, “না হুজুর, তা আমি বলতে পারব না। আমার মুখে সে-কথা সাজে না।”
রাজা কাক্কাবোক্কা ধাতানি দিয়ে বললেন, “হুজুরের সামনে হাসতে তোমার মুখে সাজে, অথচ সেটি এমন কী কথা, বলতে তোমার মুখে সাজে না?”
তবু সে রাজি হল না। বলল, “না হুজুর, সে-কথাটি আমি বলতে পারব না। আমায় মাপ করুন।”
রাজা বললেন, “না বললে মাপ তো করবই না, উলটে তোকে কয়েদ করব।”
এবার পরিচারক ভীষণ ভয়ে আঁতকে উঠল। সে মুহূর্ত যেন কী ভাবল। তারপর আচমকা বলল, “হুজুর, আমি যদি সত্যি কথা বলি আমায় কয়েদ করবেন না তো?”
রাজা গম্ভীর স্বরে বললেন, “সত্যি কথা বললে আমি সাতখুন মাপ করে দিই।”
সে বলল, “আজ্ঞে হুজুর, আমি খুনটুন কিছু করিনি। আমি একটা ইয়ে দেখে ফেলেছি।”
রাজা অবাক হলেন, “ইয়েটা কী?”
“ইয়েটা একটা মজার জিনিস।” সে মাথা চুলকোতে চুলকোতে জবাব দিল।
রাজা আরও অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “মজার জিনিস? সেটা আবার কী?”
লোকটা কাঁচুমাচু গলায় উত্তর দিল, “বলতে কী রকম লজ্জা লজ্জা করছে। তবু মহারাজ যদি সাহস দেন তো বলেই ফেলি!”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার ভীষণ বিরক্ত হলেন। বললেন, “তুই বড্ড বেশি ধানাই-পানাই করছিস। বলতে হয় বল, নইলে কয়েদখানায় চ।”
লোকটা আর কোনও কথাই বলল না। ভয়েময়ে আসল কথাটাই বলে ফেলল। বলল, “রানিমার সাজঘরের দোরে তখন আপনি কান পেতে গান শুনছিলেন বলেই—”
লোকটার কথা শেষ হল না। কিন্তু রাজা কাক্কাবোক্কার মুখখানা ভাদ্রমাসের তালের মতো নীলচে হয়ে গেল।
লোকটা রাজার সেই মূর্তি দেখে তখন এমনই ঘাবড়ে গেল যে, তার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল, রানিমার গান সে প্রায়ই শোনে। একদিন একটা গোটা গান সে দোরে আড়ি-পেতে শুনেছে!
রাজা চমকে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “গোটা গান শুনেছিস?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“বলছিস কী! তুই নিজের কানে শুনেছিস?”
লোকটা নরম গলায় উত্তর দিল, “আপনাকে মিথ্যে কেন বলব হুজুর!”
“সেই গানটা গাইতে পারবি?”
লোকটা হেসে ফেলল। বলল, “গান কি-আর গাইতে পারি আমি? গানের দু’-একটা কথা মনে আছে বলতে পারি।”
“দু’-একটা কথাই বল তো শুনি।”
লোকটা একটু ভাবল। মনে মনে বিড়বিড় করে একবার আউড়ে নিল। তারপর বলল:
বোম্বাগড়ের রাজার নাকি
পাঁচটি মাথা ঘাড়ে,
পাঁচটি মাথার পাঁচটি মুখে
কী গান আহা রে!
আমার উনি একটি মাথাই
নিয়ে ব্যতিব্যস্ত,
গানের নামে অষ্টরম্ভা,
খ্যাঁটের বেলায় চোস্ত!
“ব্যাস! হুজুর, এই পর্যন্ত মনে আছে। বাকিটা আর মনে করতে পারছি না।” বলে লোকটা ফ্যালফ্যাল করে কাক্কাবোক্কার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
গানের কথাগুলো শুনে রাজা থম মেরে দেখতে লাগলেন লোকটার মুখখানা। তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ হয়ে গেল নিমেষে। সেই রক্তবর্ণ চক্ষু দেখে লোকটা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে যেন এখনই পালাতে পারলে বেঁচে যায়!
কিন্তু না, সে পালাতে পারল না। কেননা, রাজা আচম্বিতে চিৎকার করে উঠলেন, “এ গান তুই নিজের কানে শুনেছিস?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর।” লোকটার যেন ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল।
“তবে ডাক মন্ত্রীমশাইকে!” রাজার গলায় যেন বাজের শব্দ।
মহারাজের জরুরি তলব। মন্ত্রীমশায়ের সাধ্যি কী, দেরি করেন! তৎক্ষণাৎ এমন ছুট দিলেন যে, তাঁর কাঁচা-কোঁচা খুলে একাক্কার! সেই অবস্থাতেই তিনি হাজির। রাজার ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছেন। ঢুকতেই চক্ষু কপালে। তিনি চট করে কোঁচাটা সামলে নিয়ে ফট করে বলে বসলেন, “মহারাজ কি অসুস্থ বোধ করছেন?”
মন্ত্রীকে দেখে মহারাজের রক্তচক্ষু আরও রক্তিম হয়ে উঠল। তিনি মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। চোখ কটমট করে মন্ত্রীকে শুধু দেখতেই থাকলেন।
মন্ত্রীও রাজার সেই অগ্নিমূর্তি দেখে ভয়ে বোবা হয়ে গেলেন।
দু’জনের এই দুই অবস্থা দেখে পরিচারকের তো চক্ষু ছানাবড়া! সে বেচারি কিছু ভেবে না-পেয়ে রাজাকে বলে উঠল, “মহারাজ, মন্ত্রীমশাই এসেছেন!”
রাজা লোকটার কথা শুনে হঠাৎ বাজখাঁই গলায় ধমক দিয়ে উঠলেন, “আমি অন্ধ নই! তুমি এবার মন্ত্রীমশাইকে গানটা শুনিয়ে দাও!”
পরিচারক মহারাজের মূর্তি দেখে আর্তস্বরে ‘আম্মা-আম্মা’ করে বলে উঠল, “আজ্ঞে হুজুর, আমি তো গান জানি না।”
রাজা দাবড়ি দিলেন, “এই তো একটু আগে আমাকে শোনালি!”
“আজ্ঞে, সে তো গান নয়, গানের পদ্য।”
রাজা তেমনই চড়া গলায় বললেন, “হ্যাঁ, আমি গানের পদ্যটাই শোনাতে বলছি তোকে!”
তখন পরিচারক গানের পদ্যটা আর একবার আউড়ে মন্ত্রীকে শোনাল:
বোম্বাগড়ের রাজার নাকি
পাঁচটি মাথা ঘাড়ে,
পাঁচটি মাথার পাঁচটি মুখে
কী গান আহা রে!
আমার উনি একটি মাথাই
নিয়ে ব্যতিব্যস্ত,
গানের নামে অষ্টরম্ভা,
খ্যাঁটের বেলায় চোস্ত!
এইটুকু বলেই পরিচারক আগের মতোই আবার বলল, “আর জানি না।”
মন্ত্রীমশাই গানের পদ্য শুনে ভ্যাবাচাকা খেয়ে এমন নড়েচড়ে উঠলেন, মনে হল যেন লাউমাচায় লাউ দুলছে!
মন্ত্রীমশাইকে অমন করে নড়তে দেখে রাজা কাক্কাবোক্কা রেগে আগুন। তেড়েমেড়ে খেঁকিয়ে উঠলেন, “কিছু বুঝলেন?”
মন্ত্রীমশাই থতমত খেয়ে বলে ফেললেন, “মহারাজ, যতটা বুঝতে পেরেছি, ঠিক ততটাই বুঝতে পারিনি।”
“আর কোনও দিন বুঝতে পারবেনও না,” রাজা ধাতিয়ে উঠলেন, “আপনি যে একটি অবুঝ মন্ত্রী, সেটা আমার জানা বাকি নেই। আমি যে গান জানি না, ভূভারতে এটা সবাই জানে। কিন্তু ‘খ্যাঁটের বেলায় চোস্ত’ বলে আমার রানিই যদি আমার নামে গান গেয়ে খোঁটা দেন, তবে সেটা কি খুব সমীচীন কাজ বলে আপনার মনে হয়? আমি কি রাজকার্য ফেলে শুধুই খেয়ে বেড়াচ্ছি? আপনি ব্যবস্থা করুন, নইলে আজ থেকে আমি অনশন করব।”

মন্ত্রী ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কীসের ব্যবস্থা হুজুর?”
“বোম্বাগড়ের রাজার যদি পাঁচটা মাথা হয়, তবে আমার দশটা মাথা চাই। আমি গান শিখে দশটা মাথায় গান গাইব। দেখি, কে ভাল গাইতে পারে, বোম্বাগড়ের ওই পাঁচমাথার রাজা, না আমি এই দশমাথার কাক্কাবোক্কা!”
মন্ত্রী বিপদ গনলেন। এই রে, মহারাজ খেপে গেছেন! মন্ত্রী কী উত্তর দেবেন ভেবে না-পেয়ে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে হুজুর, এ বোধহয় কোনও পাগল কবির আক্কেলগুড়ুম বুদ্ধি! তাই এমন একটা আজগুবি পদ্য লিখেছেন। এসব কথা গায়ে মাখতে নেই মহারাজ। মানুষের কখনও পাঁচটা মাথা হয়!”
রাজা মন্ত্রীমশায়ের কথা কানে নিলেন না। বললেন, “আপনি সেই পাগলা কবিটাকে ধরে আনুন আমার কাছে। বোম্বাগড়ের রাজার পাঁচটা মাথা নিয়ে তিনি পদ্য লিখেছেন। এবার আমার দশটা মাথা নিয়ে তাঁকে পদ্য লিখতে হবে। পাঁচটা মাথার গান শুনে যদি লোকে ‘আহা রে, বাহা রে’ করে, তবে আমার দশটা মাথার গান শুনিয়ে তাদের আমি ‘যাহা রে নয় তাহা রে’ করে ছাড়ব। ডাকুন আপনি কবিকে। যতক্ষণ না আপনি ডেকে আনছেন কবিকে, ততক্ষণ আমি কিছু খাচ্ছি না। আমার অনশন শুরু।”
মন্ত্রী ভয়ে কোঁত পাড়লেন। খুবই আলতো গলায় বললেন, “কাজটা কি ভাল হচ্ছে মহারাজ?”
“আমার ভালমন্দ আপনাকে দেখতে হবে না। শুধু জেনে রাখুন, এ আমার আমরণ অনশন।”
এই দ্যাখো, সেই যে ঘাড়ে ভূতচাপা নিয়ে কথা উঠেছিল, এখন রাজা কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে সেই ভূত চেপে বসেছে। বটেই তো, একটা তুচ্ছ গান ছাড়া ব্যাপারটা তো আর অন্য কিছু নয়! তা, একজন কবি তাঁর গানের পদ্যে যা খুশি তা-ই লিখতে পারেন। তিনি রাজার পাঁচটা মাথাও লিখতে পারেন, আবার খ্যাঁটোনবাজও বলতে পারেন। পাগলে কী না বলে! এতে এত চটাচটির কী আছে! ঠিক আছে সে-ও সই! কিন্তু মানুষটা চটাচটি করে এই যে আমরণ অনশন শুরু করলেন, এটা কেমন করে তুচ্ছ ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়! অনশন করে রাজা যদি সত্যি মারা পড়েন, তবে সে যে সব্বনেশে কাণ্ড! অগত্যা মন্ত্রীমশাই সেই অগতির গতি রানির ঘরেই ছুটলেন।
“রানিমা গো, রানিমা!” মন্ত্রী মৃদুস্বরে ডাক দিয়ে রানির ঘরের দরজায় টোকা দিলেন।
“কে?” রানি দরজা খুলে মুখ বাড়ালেন। মন্ত্রীকে দেখে অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “এ কী, মন্ত্রীমশাই, অসময়ে আপনি। আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন!”
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে রানিমা কী করব, অসময়েই আসতে হল। উপায় ছিল না।”
“কেন, কী হয়েছে?”
“ভয়ানক বিপদ হয়েছে!”
“কীসের বিপদ?”
“মহারাজ আমরণ অনশন শুরু করেছেন।”
“অনশন কেন? কী হল আবার?”
“রানিমা, মহারাজ বললেন, আপনি নাকি তাঁকে ‘খ্যাঁটের বেলায় চোস্ত’ বলে গান গেয়েছেন।”
মন্ত্রীমশায়ের কথা শুনে রানিমা তো হেসে কুটোকুটি। হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলেন, “এ গান তিনি শুনলেন কোত্থেকে?”
মন্ত্রীমশাই কাঁচুমাচু গলায় উত্তর দিলেন, “এ গান রাজামশাই নিজে শোনেননি। তাঁর পরিচারকটা কেমন করে যেন শুনে ফেলেছে। সে-ই মহারাজকে বলেছে। মহারাজ তো শুনে বেদম খাপ্পা। তিনি আমায় হুকুম করেছেন, যে এ-গান লিখেছে তাকে ধরে আনতে। যতক্ষণ না তাকে ধরে মহারাজের সামনে হাজির করতে পারছি, ততক্ষণ তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। এখন, আপনি দয়া করে বলুন সেই গানের লেখক কে? আমি তাকে কোথায় পাব? তাকে মহারাজের সামনে হাজির করতে না পারলে, রানিমা, জলজ্যান্ত লোকটা না-খেয়ে অঘোরে মারা পড়বেন। আর, এইভাবে তাঁর মারা যাওয়ার খবরটা ইতিহাস হয়ে লোকের মুখে মুখে ঘুরবে, এটাও যে ভীষণ লজ্জার কথা! দুর্নামটা যে আমাদের ঘাড়েই পড়বে!”
মন্ত্রীমশায়ের মুখে এমন একটা মারাত্মক ঘটনা শোনার পরেও রানিমার চোখে-মুখে কোনওই হেলদোল লক্ষ করা গেল না। তিনি তখন যেমন করে হাসছিলেন, এখন তেমন করে না হাসলেও ঠোঁটে ফিকফিক করতে ছাড়লেন না। তিনি ফিকফিক করতে করতেই বললেন “মন্ত্রীমশাই, আপনাকে কিছুই করতে হবে না। এ-গান আমি নিজে নিজে বানিয়েছি। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার কাজ করে যান। যা করার আমি করছি। আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
রানিমার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে মন্ত্রীমশাই নিমেষে মাথা হেঁট করে দাঁড়ালেন। তারপর খুবই ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি বুঝি গান বানাতে পারেন?”
রানিমা উত্তর দিলেন, “না, না, তেমন কিছু না।”
মন্ত্রীমশাই তেমনই দোনোমনো করে বললেন, “তবে আমারও আপনার কাছে, তেমন কিছু নয়, একটা অনুরোধ করতে ইচ্ছে করছে।”
“কী অনুরোধ?” রানিমা অবাক হলেন।
মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন, “আমার মেয়েটার বিয়ের ঠিক করে ফেলেছি। পাত্রটি ভাল। আপনি যদি তাদের বিয়ের একটা পদ্য লিখে দেন!”
রানি উত্তর দিলেন, “আমি তো এর আগে কোনওদিন বিয়ের পদ্য-টদ্য লিখিনি। আর তা ছাড়া আমার তেমন অভ্যেসও নেই। তবে বিয়ে যখন আপনার মেয়ের, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। কিন্তু তার আগে রাজামশায়ের অনশনটা তো ভাঙা দরকার। নইলে, আপনার মেয়ের বিয়েটাই তো পণ্ড হয়ে যাবে!”
“সত্যি, কী গণ্ডগোলে কাণ্ড!” বলতে বলতে রানিকে জোড় হস্তে নমস্কার করে মন্ত্রী বিদায় নিলেন।
না, চুপচাপ বসে থাকলেন না রানিমা। তাঁরও তো মনে ভয় আছে! যতই হোক, কাক্কাবোক্কা নামের মানুষটি যতই জেদি হোন, আসলে তিনি তো তাঁর আপনজন, স্বামী। তিনি অনশন করেছেন। তাঁকে দেখা দরকার। তাই তিনি আর অপেক্ষা না করে হন্তদন্ত হয়ে পৌঁছে গেলেন রাজার শয়নঘরে।
এমনিতেই তো রাজা রেগে টং হয়ে ছিলেন। তার ওপর হঠাৎ রানিকে দেখে, সড়াত করে তাঁর মাথায় রক্ত উঠে গেল। মাত্র একবারই রানির মুখের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বিছানায় পাশ ফিরে শুলেন।
রানি হাসলেন, কিন্তু মুখে হাসির শব্দ করলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজের কি শরীর ঠিক নেই?”
মহারাজের মুখ দিয়ে একটি শব্দও বেরোল না। বা, বলা যায় তিনি রানিকে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করলেন না।
রানি আচমকা মহারাজের কপালে হাত ঠেকালেন। বলে উঠলেন, “না, না, মহারাজ, আপনার জ্বরজ্বালার তো কোনও লক্ষণ নেই। তবে কি পেট ব্যথা করছে?”
রাজা রেগেমেগে রানির হাতটা তাঁর কপাল থেকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলেন।
রানি এবার মুখ টিপে নয়, মুখ খুলে খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বকা দিলেন, “আমার ঘরে কেউ খিলখিল করে হাসে, এটা আমি পছন্দ করি না!”
রানি বকা খেয়ে একটুও ভয় পেলেন না। উলটে বললেন, “কেন মহারাজ, এই ঘরে আপনিও তো রোজ হাসেন। আর, আপনার হাসি শুনে আমিও তো রোজ হাসি।”
রাজা বলে উঠলেন, “আজকের রোজ, আর অন্যদিনের রোজ এক নয়।”
“কেন মহারাজ?”
“আজ আমার কানে একটি কথা এসেছে।”
“কী কথা মহারাজ?”
“অনেকে নাকি গান গেয়ে বলে বেড়াচ্ছে, আমি নাকি খ্যাঁটের বেলায় চোস্ত, গানের বেলায় অষ্টরম্ভা। এ অপবাদ আমি মেনে নেব না। তাই আমি আমরণ অনশন শুরু করেছি। আমি না-খেয়ে আমার প্রজাদের দেখিয়ে দিয়ে যাব, খ্যাঁটকে আমি থোড়াই কেয়ার করি!”
রাজাকে দেখানোর জন্যে রানি ছল করে চমকে উঠলেন। তারপর ধরা ধরা গলায় বললেন, “সে কী মহারাজ, আপনি অমন কথা বললে আমি দাঁড়াই কোথায়? আজ আমি কত খাটাখাটুনি করে আপনার জন্যে যে এত কোপ্তা-কালিয়া, দোরমা-দুইমাছ রসুইকরকে দিয়ে রাঁধাবাড়া করিয়ে রাখলুম, সেসব যে জলে যাবে!”
কেউ দেখতে না-পেলেও রানি দেখতে পেলেন দোরমা-কালিয়ার নাম কানে ঢুকতেই মহারাজের নোলা টসটস করে উঠেছে। তবু তিনি ভাঙেন তো মচকান না। নোলার জল সামলে নিয়ে তিনি রেগেমেগেই বলে উঠলেন, “থামো, ওইসব খাদ্য আর আমি কোনওদিন মুখে দেব না। যতই লোভ দেখাও, অনশন আমি আর ভাঙছি না। আমি মরে দেখিয়ে দেব, আমার নামে ‘খ্যাঁট’ তুলে খোঁটা দিলে কী হয়! এখন তুমি যেতে পারো। আমায় নিশ্চিন্তে মরতে দাও!”
রানি বলে উঠলেন, “আপনি মরব বললেই তো আমরা আপনাকে মরতে দিতে পারি না। আপনাকে খেতেই হবে।”
রাজাও গোঁ ধরলেন, “দেখি কে আমাকে খাওয়াতে পারে!”
রানি বললেন, “ঠিক আছে। আপনিও যতক্ষণ না খাচ্ছেন, আমিও ততক্ষণ উপোস করে থাকব।” বলতে বলতে তিনি রাজার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মনে হল, তিনি তখনও যেন মুচকি মুচকি হাসছেন!
জানা গেল না সেদিন রানিমা সত্যি-সত্যি উপবাস করে থাকলেন কি না। কিন্তু শত চেষ্টা করেও রাজা কাক্কাবোক্কাকে কেউ কিছুই খাওয়াতে পারল না। অনেক রাত অবধি রাজবাড়িতে টানাহ্যাঁচড়া চলল। শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে যে যার ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ল। রাজবাড়ি নিঃঝুম হয়ে গেল ধীরে ধীরে। শুধু একা জেগে বসে রইলেন রানিমা ঠায় ঝরোকার দিকে চোখ রেখে। কী যে তাঁর মতলব কে জানে!
অনেকক্ষণ তিনি এইভাবে বসেছিলেন চুপচাপ ঘরে, ঝরোকার দিকে চোখ রেখে। চোখকে তিনি ছুঁতেই দিলেন না ঘুম। নিশুতি রাত। সুনসান রাজবাড়ি। বাইরে একটানা ঝিঁঝির ডাক। আর থেকে থেকে গাছের ডালে ঘুমন্ত পাখির ডানার শব্দ। নয়তো, হঠাৎ হঠাৎ রাতের নজরদার প্রহরীর জুতোর খটখটানি। এছাড়া আর সব নিস্তব্ধ।
এমন সময়ে হঠাৎ রানি ধড়ফড় করে উঠলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হল, এতক্ষণ যেটি দেখার জন্যে তাঁর জেগে বসে থাকা, বুঝি সেটিই ঘটতে চলেছে! কেননা, তিনি ঝরোকা দিয়ে ঝাঁকি মেরে দেখলেন, রাজবাড়ির মালিক তাঁর নিজের বাড়িতেই চোরের মতো পা টিপে টিপে হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে উঠোন পেরিয়ে পাকশালার দিকে যাচ্ছেন। রাতের প্রহরীরা এদিক ওদিক নজর রেখে টহল দিচ্ছে বটে, কিন্তু রাজা তাদের চোখে ধুলো দিয়ে এমন লুকোচুরি খেলছেন যে, সেই দৃশ্য দেখলে কার সাধ্যি না-হেসে থাকতে পারে! রানিমারও খুব হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু, কী কষ্ট করে তিনি যে মুখ টিপে হাসি সামলেছেন, সে কহতব্য নয়।
না, রানিমা এবার আর ঝরোকায় উঁকি দিলেন না। তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। তিনিও প্রহরীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে দ্বিতল থেকে নীচতলায় নেমে পাকশালার দিকে গুটিগুটি হাঁটা দিলেন।
তিনি যা ভেবেছেন, ঘটেছে ঠিক তা-ই। রানিমা দেখেন ইতিমধ্যেই মহারাজ চুপিসারে পাকশালের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। অর্ধেক আলোয় আর অর্ধেক অন্ধকারে খুঁজেখাঁজে দইমাছের পাত্রটা বার করেছেন। শুরু করে দিয়েছেন মুখে পুরতে!
ওঃ! সেই দৃশ্য দেখে রানিমার হাসিতে পেট ফেটে যাবার গোত্তর। কোনওরকমে লুকিয়ে-ছাপিয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসি সামলেছেন! আর মনে মনে ভেবেছেন, আহা, খান খান, মানুষটা সারাদিন না-খেয়ে আছেন, খিদে তো পাবেই।
রাজা কাক্কাবোক্কা বোধহয় পাত্রে রাখা দইমাছের সবটাই সাবাড় করে ফেলেছেন তখন। রানিমার মনে ভয় ঢুকে গেল! মনে মনে ভাবলেন, এই মাঝরাতে আর বেশি খেলে হজম করবেন কখন! তিনি থাকতে পারলেন না। লাজলজ্জা ভুলে পাকশালের জানলায় উঁকি মারলেন। আচমকা বলে উঠলেন, “থাক, থাক, মহারাজ! আর খাবেন না। অনেক রাত হয়েছে। হজম করতে পারবেন না।”
ইস, কী লজ্জা, কী লজ্জা! শেষকালে তিনি কিনা সেই রানির হাতেই ধরা পড়ে গেলেন! তিনি আর মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। পাকশাল থেকে প্রায় দৌড় মেরে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। নিজের ঘরও তো সেই ওপরতলায়। কাজেই দু’একবার যে হোঁচট খেলেন না, তেমন না। ঢুকে, নিজেই দরজায় আগল দিয়ে হাঁপাতে লাগলেন। তিনি জানতেও পারলেন না, রানিমা তখন তাঁর নিজের ঘরে হাসছেন মুচকি মুচকি, আর ভাবছেন, যাক বাবা, মানুষটার ঘাড় থেকে শেষমেশ অনশনের ভূতটা তো নামল। মানুষটা দুইমাছের ভীষণ ভক্ত। সেই দইমাছ খেয়েই তিনি অনশন ভাঙলেন। এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে।
হ্যাঁ, রাজা কাক্কাবোক্কা এমন লজ্জা পেয়েছিলেন, দইমাখা মুখটা পর্যন্ত ধুতে পারেননি। লজ্জায় দইমাখা মুখ নিয়েই তিনি বিছানায় লুকিয়ে পড়েছিলেন! ব্যাস! বাধিয়ে বসলেন আর এক কাণ্ড! সারা বিছানায় দই-এ মাখামাখি!
কাজেই বুঝলে তো ঘাড়ে ভূত চাপলে মানুষকে কেমন নাকাল করে ছাড়ে! বাব্বা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন