শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট নদীর ছোট্ট ঢেউ। ঝিরঝির দোল খায় জলের ওপর।
তেমনই ছোট্ট মেয়ে টুক্কির ছোট্ট পা। ঝুমঝুম। নাচে ঘাসের ওপর। বাগানভর্তি ঘাস। সবুজ গাছভর্তি ফুল। টকটকে লাল। নয়তো হলুদ। কিংবা সাদা।
বাগানে টুক্কির বন্ধু অনেক। ফুল তার বন্ধু তো, মৌমাছিও। মৌমাছি তার বন্ধু তো, কাঠবিড়ালিও। না-হয়, বুলবুলি, কি টিয়া। মৌটুসি, না-হয় পাপিয়া।
তবে হ্যাঁ, টুক্কির এ বন্ধুরা তো আর তেমন বন্ধু নয়। টুক্কির সঙ্গে তারা তো কথা বলতে পারে না। কিংবা হাসতে পারে না। কিন্তু টুক্কি যখন বাগানে আসবে, তখন কী আনন্দ তাদের! পাখিরা উড়বে এগাছ-ওগাছ। কাঠবিড়ালি ছুটবে এদিক ওদিক। মৌমাছি খুঁজবে এ-ফুল ও-ফুল।
কিন্তু ফুলেরা? তারা কী করবে?
কী আর করবে! তারা তো উড়তেও পারে না, ছুটতেও পারে না। খালি চুপচাপ ফুটতে পারে। আর টুক্কির মুখখানি দেখতে পারে।
তা বটে, দেখার মতোই মুখখানি টুক্কির। বাবা বলেন, মেয়ে আমার সীতার মতো সুন্দরী।
মা বলেন, সীতা বড় দুঃখী। মেয়ে আমার লক্ষ্মীর মতো সুরূপা।
তা বলতে নেই, মায়ের কথাটাই সত্যি। টুক্কির চোখদুটি দ্যাখো, কেমন টলটলে। আবার ঠোঁটদুটি দ্যাখো কেমন টুকটুকে, হাসলে কী সুন্দর লাগে!
আর, কাঁদলে কেমন লাগে?
কেমন লাগে কেউ বলতেই পারে না। কেমন করে বলবে? কেউ কি তাকে কোনওদিন কাঁদতে দেখেছে?
কিন্তু একদিন কেঁদেছিল টুক্কি।
কেন?
আর কেন! সেই নিয়েই তো সাতকাণ্ড!
কীরকম? কেমন শুনি সেই সাতকাণ্ড?
বলি তা হলে। আসলে, তুমি তো কোনওদিন টুক্কিদের বাগানটা দেখইনি। বাগানে আছে হরেক ফুলের গাছ। তারই মাঝখানে আছে একটা ঝাঁকড়া মতো জামরুল গাছ। গরমের দিনে যখন ফলে ভরে যায় গাছটা, তখন কত পাখি আসে। আসে, এখান থেকে, ওখান থেকে, যেখান থেকে, যত খুশি। জামরুল খেতে। ওই গাছেরই কোটরে থাকত একটা কাঠবিড়ালি। সে তো ইচ্ছে হলেই খাচ্ছে। না-হয় ছড়াচ্ছে। ভারী মজা তার।
একদিন হয়েছে কী, জামরুল খেতে খেতে কাঠবিড়ালির মুখে অরুচি ধরে গেল। আর খেতে ভাল লাগছিল না তার। মনে হচ্ছিল, ছুটে ছুটে খেলা করে সে। না হয় ঘাসের ওপর লুটোপুটি করে ডিগবাজি খায়। আর, শেষমেশ সে সত্যি-সত্যিই ডিগবাজি খেতে লাগল মনের আনন্দে।
কিন্তু একফাঁকে টুক্কি যে কখন বাগানে ঢুকে পড়েছে, সেটা তার চোখেই পড়েনি। টুক্কি কিন্তু ঠিক দেখে ফেলেছে! দেখতে পেয়েই ধরতে গেছে কাঠবিড়ালিটাকে। আর দেখতে, কাঠবিড়ালি ল্যাজ তুলে দে ছুট!
ছুটল টুক্কিও। তাকে ধরবে।
তারপর দুটিতে শুরু হয়ে গেল ছুটোছুটি খেলা। টুক্কি ছুটতে ছুটতে হাসে। কাঠবিড়ালি ছুটতে ছুটতে চিকচিক করে ডাকে। খেলাটা তখন দারুণ জমে উঠল।
ওমা! তারপর হঠাৎ চোখের পলকে কাঠবিড়ালিটা যে কোথায় লুকিয়ে পড়ল, আর দেখাই গেল না।
কিন্তু টুক্কিও ছাড়বে না। সে-ও খুঁজতে লাগল আঁতিপাতি করে। আর এই খুঁজতে খুঁজতেই হল আর এক কাণ্ড! কী, না বাগানের একেবারে শেষে, যেখানে বাগানের পাঁচিল, সেখানে একটা গোলাপগাছ। দাঁড়িয়ে আছে শুকনো-মুকনো হয়ে। টুক্কি ভাবল, তাই তো গাছটার এমন কেন দশা! যত্ন নেই, আত্তি নেই! একা একা দাঁড়িয়ে আছে রুখুশুকু হয়ে! ফুল ফোটেনি। পাতা নেতিয়ে আছে। বুঝি মরে যায়!
দেখে আর থাকতে পারল না টুক্কি। ছুটল জল আনতে। জল এনে খুঁড়ল গাছের গোড়া। জল দিল। নেতিয়ে পড়া পাতার ময়লা ধুয়ে দিল। তারপর ভাবল, দেখি আজকের গাছ কালকে কেমন থাকে! ভাবতে ভাবতে সে ঘরে গেল।
পরের দিন সকাল হতে না হতেই ছুটে এসেছে টুক্কি বাগানে। দাঁড়াল সেই গোলাপগাছের সামনে। তাই তো, গাছটা যেন একটু ঝরঝরে দেখাচ্ছে। গাছের সেই জিয়ন্ত রূপ দেখে মনটা তার খুশিতে চনমন করে উঠল। কাজেই, আবার সে গাছের গোড়ায় জল দিল। গাছের শুকনো পাতাগুলো ছিঁড়ে তুলে ফেলল। আর, মনে মনে ভাবল, তা হলে বোধহয় গাছটা বাঁচল।
সত্যিই! ক’দিন ধরে এমনই যত্ন করতে করতে একদিন গাছের আগায় একটি কুঁড়ি দেখা দিল। সেদিন আর থাকতে পারল না টুক্কি। আনন্দে নেচে উঠল। সারা বন মাতিয়ে গেয়ে উঠল:

এইখেলা সেইখেলার মতো
ফুল ফোটানোর খেলা,
ইচ্ছে হলে খেলতে পারো
যে কেউ একেলা।
ফুটলে সে ফুল কী আনন্দ
বুঝবে তখন তুমি,
শুনতে পাবে হাওয়ার দোলায়
কার বাজে ঝুমঝুমি।
বলতে-না-বলতেই একদিন সত্যিই ফুল ফুটল। আহ্! একটি সাদা ধবধবে গোলাপ। না, না, এ ফুল টুক্কি গাছ থেকে তুলবে না। কাউকে তুলতেও দেবে না। এ ফুল গাছেই থাকবে। দিনভর আলো ছড়াবে।
তা, টুক্কি বললে কী হবে। কে শুনছে তার কথা! শুনতে বয়ে গেছে! ফুল-চোরের তো আর অভাব নেই। আর হলও ঠিক তা-ই। পরের দিন টুক্কি বাগানে গিয়ে দেখে, নেই! গোলাপগাছে গোলাপ নেই! কোথায় গেল?
আর কোথায় গেল! যিনি নেবার তিনি নিয়েছেন!
ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল টুক্কির। ইস! এত কষ্ট করে গাছটাকে বাঁচাল টুক্কি। এত চেষ্টা করে একটি ফুল ফোটাল। আর সেই ফুলটা চোরে নিয়ে গেল! মনের কষ্টে কেঁদেই ফেলল টুক্কি। তার কান্নার জল গাল দিয়ে গড়াতে গড়াতে একটি ফোঁটা গোলাপগাছের পাতায় পড়ল টুপ করে। পড়েই টুলটুল করে দুলতে লাগল।
তা, এমন তো কতই হয়। গাছের পাতায় শিশির ফোঁটাও পড়ছে, বৃষ্টিও ঝরছে। সে নিয়ে কেউ কি মাথা ঘামায়? কাজেই, টুক্কির চোখের জলের একটি ফোঁটা যে গোলাপগাছের পাতায় পড়ে টুলটুল করছে, সেদিকে আর কার চোখ যায়! সেদিকে টুক্কিরও চোখ গেল না। উলটে, চোখের জল মুছতে মুছতে সে বাগান থেকে বেরিয়ে গেল। আর, তখনই শুরু হল সেই আশ্চর্য ঘটনা!
কী সেই ঘটনা?
রোদ উঠেছে তো! রোদ তো আর কারও কথা শোনে না। সে তুমি কান্নার ফোঁটা হও, কি শিশির ফোঁটা, তোমাকে ঠিক শুষে নেবে! আর তাই, রোদের তেজে কান্নার ফোঁটাও ছটফটাতে লাগল। সে ভাবল, আবার যদি কারও চোখের পাতায় ঢুকে পড়তে পারি, তা হলে বেঁচে যাই! আর, এই কথা ভাবতেই সে সামনে দেখল, মৌমাছি উড়ে যাচ্ছে। ডাক দিল, “মৌমাছিভাই, মৌমাছি, একটা কথা শুনবে?”
উড়তে উড়তে মৌমাছি থমকে গেল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তাই জিজ্ঞেস করল, “কে ডাকে রে?”
কান্নার ফোঁটা বলল, “এই যে আমি, গাছের পাতায় বসে আছি। দ্যাখো!”
তা, মৌমাছি একটু এদিক ওদিক করতেই তাকে দেখতে পেল। তার পাশের একটি পাতায় গিয়ে বসল। জিজ্ঞেস করল, “কে তুমি?”
“আমি টুক্কির কান্নার ফোঁটা।”
মৌমাছি যেন একটু অবাক হল। বলল, “সে কী কথা! টুক্কি তো কাঁদে না কোনওদিন। তার চোখে কান্নার ফোঁটা আসবে কোত্থেকে?”
কান্নার ফোঁটা উত্তর দিল, “তুমি ঠিকই বলেছ। সে কোনওদিনই কাঁদে না। কিন্তু আজ সে কেঁদেছে। এই গোলাপগাছটি এইখানে শুকিয়ে হেলাফেলায় পড়ে ছিল। হঠাৎ সেদিন নজরে পড়ে যায় টুক্কির। তারপর অনেক যত্ন করে তাকে সে বাঁচায়। একটি ফুলও ফোটে। ফুল দেখে কী আনন্দ তার। কিন্তু হঠাৎ কে যে ফুলটা চুরি করে নিয়ে গেল! ভীষণ দুঃখ হল টুক্কির। আর সেই দুঃখেই তার চোখ জলে ভেসে গেল। সেই চোখের জলের একটি ফোঁটা আমি। পড়েছি এই গোলাপগাছের পাতায়। এখন রোদের তাপে আমি জ্বলে যাচ্ছি। তোমার চোখের পাতায় আমায় যদি একটু আশ্রয় দাও, আমি রক্ষে পাই।”
কান্না-ফোঁটার কথা খুব মন দিয়ে শুনল মৌমাছি, তারপর বলল, “অত আর নয়! আমি বেশ আছি। হাওয়ায় উড়ছি, গাইছি, নাচছি। কত আনন্দ আমার। তোমার মতো কান্নার ফোঁটাকে আমার চোখে আশ্রয় দিতে যাব কোন দুঃখে। কে জানে বাবা, তোমাকে আমার চোখে আশ্রয় দিলে আমি যদি আনন্দ করতে ভুলে যাই! শুধুই কাঁদি! তার চেয়ে যেমন আছি তেমনই থাকতে দাও!” বলতে বলতে মৌমাছি ফুড়ুত হয়ে গেল। আর কান্নার ফোঁটা রোদের তাপে জ্বলতে লাগল। একটু একটু ক্ষয় হতেও লাগল।
তারপর কান্নার ফোঁটা একটি মৌটুসি পাখিকে দেখতে পেল। তাকেও ডাক দিল। তাকেও সব কথা বলল। কিন্তু সেও রাজি হল না। বলল, “না বাছা, আমার চোখে তোমায় আশ্রয় দিয়ে আমি কেন দুঃখকে ডাকি! তার চেয়ে যেমনই আছি তেমনই ভাল।” বলে সেও ফুড়ুত হয়ে গেল।
তারপর সে ডাক দিল পাপিয়াকে।
সেও রাজি হল না।
বুলবুলি?
সেও না।
শেষমেশ যখন কাঠবিড়ালিকে ডাকল, তখন রোদের তাপ তাকে প্রায় শুষেই নিয়েছে। তার গলা চিনচিন করছে। কথাই বেরোয় না।
দেখতে দেখতে রোদের তাপে সে সত্যিই উবে গেল। তার আর কোনও চিহ্নই থাকল না।
অবশ্য, পরের দিন আবার দেখা গেল টুক্কিকে বাগানে। যেমন রোজ সকালে দেখা যায় তেমনই। আজ আর তার চোখে জল নেই। তবু ভাবনায় ভরে আছে মুখখানা। দেখতে ইচ্ছে করছে গোলাপগাছটাকে। ফুল-চোর গাছটাকে উপড়ে চুরি করে নিয়ে যায়নি তো!
না, ওই তো গাছ। দাঁড়িয়ে আছে। টুক্কি তার পাশে গিয়েই দাঁড়াল। আজ আর গাছের একটি পাতাও শুকনো নেই। সবুজ। সতেজ। শুধু নেই সেই ফুলটি। আহা রে, আবার যদি একটি কুঁড়ি দেখা দেয়। আবার যদি একটি ফুল ফোটে!
ওমা! সে কী কথা! তুমি এখনও দেখতে পাওনি? ওই তো দেখা যাচ্ছে একটি কুঁড়ি!
হ্যাঁ, সত্যিই তো! ওই তো টুক্কিও দেখতে পেয়েছে! আনন্দে তালি দিয়ে উঠেছে সে। নেচে উঠেছে! গেয়ে উঠেছে!
আচ্ছা, দ্যাখো তো, মনে হয় কি কান্নার ফোঁটা এই ডালে, এই পাতার ওপর দোল খাচ্ছিল! মনে হয় কি, এখান থেকেই সে ডাক দিচ্ছিল, মৌমাছি, পাপিয়া, কাঠবিড়ালিকে? ঠিক এখানেই কি একটি কুঁড়ি আবার উঁকি দিচ্ছে! এ কি তবে সেই কান্নার ফোঁটাই গোলাপকুঁড়ি। কেউ দেয়নি তাকে আশ্রয়। তবে কি গোলাপগাছই তাকে আশ্রয় দিয়েছে! সেই কি কুঁড়ি হয়ে দেখা দিয়েছে!
হবে হয়তো।
কিন্তু একথাটা তো টুক্কি জানে না। জানতে পারবেও না কোনওদিন। শুধু তোমরাই জানো। সেই ভাল। আর কেউ না-ই বা জানল!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন