শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে

শৈলেন ঘোষ

ছেলেটা একা। হাঁটছে। অনেকক্ষণ হেঁটেছে সে। অনেকটা লম্বা পথ পেরিয়েছে সে। অনেকটা মাঠ। এবড়ো-খেবড়ো। সামনে পড়ল একটা জলা। এপার-ওপার চওড়া বটে! এটা পার হতে হবে। সে দাঁড়াল। জলে তার ছায়া। পা ডোবাল। মুখে-চোখে ছেটাল। আঃ! অনেক হাঁস। সাঁতার কাটছে। অনেক বক। মাছ খুঁজছে। নয়তো চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পা জলে নামানো। একটি পা বুকে গোটানো। না, জলার জল তেমন অতল নয়। বেশি হলে হাঁটু ডুববে। ছেলেটা জলের ভেতর পা টানল। ছলাৎ-ছলাৎ। তাকে দেখে ক’টা বক উড়ে পালাল। ক’টা হাঁস দূরে পালাল। হাঁসফাঁস।

ছেলেটার পরনে ইজের। গায়ে জামা। পুরনো-পুরনো। হয়তো, যখন নতুন ছিল, তখন রঙিন ছিল। এখন ফ্যাকাশে। ফ্যারফেরে। টানলেই বুঝি ছিঁড়ে যায়, ফড়াৎ! তবু আস্ত আছে। এখনও। অথচ যে-কাপড়টা মা পরেন? ছেঁড়া। ছেলেটা দেখতে পেয়েছে। মাকে বলল, “মা, তোমার যে কাপড় ছেঁড়া!”

মায়ের মুখ শুকনো। বললেন, “কী আর করি। নতুন কাপড় পাই কোথা? কে দেবে?”

ছেলেটার মন দুঃখে ভরে যায়। ছেলে ছাড়া মা’র যে আর কেউ নেই। সে ছাড়া মাকে কাপড় আর কে দেবে। সেই কথাটা সে একলা একলা সারাদিন ভাবল। ভাবল সারারাত। আহা! মায়ের কী কষ্ট! মা কাজ করেন এর বাড়ি, তার বাড়ি। পয়সা পান। সে-পয়সা আর ক’টা। তাতে পেটই ভরে না তো, কাপড়! ছেলেটা আনমনে ভাবতে লাগল, সে কি পারে না মায়ের দুঃখ ঘোচাতে! একখানা কাপড় কিনে দিতে!

নিশ্চয়ই পারে, একশোবার পারে। কিন্তু পয়সা কোথায়? সে কোথায় কাপড় কেনার পয়সা পাবে!

পয়সা পাবে শহরে। এই কথাটা মনে হতেই সে চনমন করে উঠল। হ্যাঁ, সে শহরে যাবে। সে শুনেছে, শহরে পয়সা পাওয়া যায় কাজ করে। তাই বুঝি সে শহরে যাওয়ার পথ ধরে এই জলা পার হচ্ছে!

হ্যাঁ। কাউকে সে কিচ্ছুটি বলেনি। এমনকী মা-ও জানেন না। সে চলেছে একা। না, সে ছেঁড়া কাপড় পরতে দেবে না মাকে। কিছুতেই না। এমন ছেলে থাকতে মা ছেঁড়া কাপড় পরে লোকের সামনে যান! ছিঃ! কী লজ্জা! শহরে গিয়ে কাজ করে সে পয়সা উপায় করবে। শহর থেকেই মায়ের জন্য সে রং-ঝলমল কাপড় কিনে আনবে।

কিন্তু, শহর তো অনেক দূরে। শহরে গেলেই কি কাজ জুটবে সঙ্গে সঙ্গে? নিজেরও তো সঙ্গে পয়সা-কড়ি কিচ্ছু নেই। খাবে কী? থাকবে কোথায়?

সেসব কথা সে জানে না। তার চোখে শুধু ভেসে ওঠে মায়ের মুখখানি। আহা! ভারী দুঃখী সেই মুখ।

শেষমেশ জলা পেরিয়ে ছেলেটা আরও হাঁটল। অনেকটা। হায়! হায়! কোথায়, শহর! এ যে সামনে একটা বন! তবে কি শহরে যেতে বনও পেরোতে হয়! এমন তো সে শোনেনি কোনওদিন। তবে?

সে বনের মধ্যেই হাঁটা দিল। ভাবল, বনটা বুঝি ক’পা হাঁটলেই পার হয়ে যাবে। হায় কপাল! ফুরনো তো দূরের কথা, বন যে আরও গভীর হয়, গাছের গায়ে গাছ হেলেছে। আকাশ ঢেকে ছায়া নেমেছে। ছমছমে বন বুকটা যেন চেপে ধরেছে।

ছেলেটা থমকে দাঁড়ায়। বুঝি ভয় পায়। নিজের মনেই ভাবে, তবে কি শহর এদিকে নয়, ওইদিকে! ভাবতে ভাবতে সে ওইদিকেই পা ফেলে।

ওইদিকেও যে বন এমনই গভীর। এমনই গাছে গাছে ছায়া। এমনই ছমছমে।

ছেলেটার বুক ঢিপঢিপ করে। সে কি তবে পথ গুলিয়ে ফেলেছে! হঠাৎ যেন আঁতকে উঠে সে দৌড় দেয়! কোথায় যায়?

জানে না সে। যেদিকে সে ফোকর দেখে, সেইদিকেই সে দৌড় দেয়। থামে না সে। কিন্তু এ কী বিপদ! বন পেরোনোর পথ কই! এ যে চারদিক থেকে বুক কাঁপানো ঘন বনের নিশ্বাস ভেসে আসছে। ছেলেটার চোখে মায়ের মুখখানি জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে থাকতে পারে না। চেঁচিয়ে ওঠে, “আমাকে বাঁচাও! বাঁচাও!”

কিন্তু কে আসবে বাঁচাতে! যদিওবা কেউ আসে, সে আসবে তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে তাকে শেষ করে ফেলতে। সে বাঘও হতে পারে, না হয় ভালুক। নয়তো হিংস্র আর কোনও জন্তু!

হঠাৎ তার চোখদুটো যেন ধাঁধিয়ে যায়! ওটা কী! সামনে একটা ভাঙা পাঁচিল। ইটগুলো খসে পড়েছে। পাঁচিলের ওপাশে একটা যেন অট্টালিকা। ধ্বংসস্তূপের মতো মাথা গুঁজে পড়ে আছে।

ছেলেটা আশ্রয়ের আশায় ছুটে যায় ওই ধ্বংসস্তূপের দিকেই। তার চোখ পথ খোঁজে এপাশে-ওপাশে। ভয়ে ভয়ে। পা ফেলে ঢিপির ওপর। ইটের ঢিপি। সে মুখোমুখি দাঁড়াল। অট্টালিকার সামনেই ফটক। ভেঙে হেলে পড়েছে। কেউ কি নেই এখানে! কোনও মানুষ! কেঁপে ওঠে বুকের ভেতরটা। গায়ে কাঁটা দেয়! কী করবে সে? হাঁক পেড়ে ডাক দেবে?

সে আরও খানিক এগিয়ে যায়। উঁকি মারে। কান পাতে। সুনসান। সাড়া নেই। শব্দও নেই। সে এগোয় আরও। হেলে-পড়া ফটকের দিকে পা বাড়ায়। এমন সময়ে কে যেন ভাঙা গলায় হাঁক পাড়ল,“ভেতরে কে যায়?”

ধড়ফড় করে ওঠে ছেলেটার বুক। চমকে চোখের পলকে সে মারল ছুট। পারল না। একটা পাথরে ঠোক্কর খেল। ছিটকে পড়ল। তার জামাটা আটকে গেল পাথরের নীচে। টানাটানি করার আগেই, “হা-হা-হা,” কে যেন হেসে উঠল। খুব কাছে। যেন তার গায়ের ওপর সেই হাসি আছড়ে পড়ে। ছেলেটা হকচকিয়ে চারদিক চোখ ঘোরায়। কিছুই চোখে পড়ে না। তার কানে আসে আবার সেই ভাঙা গলার স্বর, “কে তুই?”

ছেলেটা হতভম্ব। এ কী, এ কার গলার স্বর শুনছে সে! এ যে কথা বলে এই পাথরটাই! এই পাথরেই যে তার জামাটা আটকে আছে। দেখে তার চোখও আটকে যায়! কেন না, সেটা শুধুই পাথর নয়। পাথরে খোদাই করা একটা ভাঙা মুন্ডু। ছেলেটা টানাহ্যাঁচড়া লাগিয়ে দেয় জামাটা ধরে। গেল! গেল! এই বুঝি ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই হয়ে যায় জামা।

“না, তোকে ছাড়ব না। বল তুই কে?” ভাঙা মুন্ডু ধমক মারে ভাঙা গলায়।

ছেলেটার গলা শুকিয়ে যায়। শব্দ নেই। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ে বুক উপচে।

মুন্ডু বলল, “মনে হচ্ছে, তুই খুবই ভয় পেয়েছিস। পেতেই পারিস। কে আর কবে পাথরের ভাঙা মুন্ডুকে কথা বলতে শুনেছে। এমন কাণ্ড দেখলে অনেক শক্তিমানেরও ভিরমি লেগে যাবে। তুই তো নেহাতই ছোট। তবে বাবু, তোকে আমি এতটা মুখ্যু ভাবিনি। আরে ছ্যা-ছ্যা, তুই পাথরের কথা শুনে ভয় পেলি। কথা আমি বলছি ঠিকই, কিন্তু কারও ক্ষতি করার ক্ষমতা কি আমার আছে! ছিল এক সময়ে, যখন আমি রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলুম। তখন ওই অট্টালিকার মালিক ছিলুম আমি। অট্টালিকা তখন ছিল মানুষে মানুষে জমজমাট। আমার হুকুমে তারা উঠত-বসত। আমাকে ভয় পেত যমের মতো। এখন মরে গিয়ে আমি পাথর। কত বছর যে আমি পাথর হয়ে আছি বলতে পারব না। তা, দু’-তিনশো বছর তো হবেই। দু’-তিনশো বছরে ওই অট্টালিকার এমন হাল হওয়ার কথা ছিল না। এখন তুই যেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছিস, এক সময়ে এটা ছিল ওই অট্টালিকার বাগান। আমি মরে যাওয়ার পর আমার একটা পাথরের মূর্তি গড়ে এই বাগানে সাজিয়ে রাখল সবাই। ওই দ্যাখ, তোর পাশেই আমার মুন্ডুভাঙা ধড়টা দাঁড়িয়ে আছে।”

ছেলেটা মুখ ঘোরাল পাশে। তাই তো বটে, একটা মুন্ডুভাঙা মানুষের মূর্তি ওই তো দাঁড়িয়ে আছে!

মুন্ডুটা আবার কথা বলল, “তোকে আমি জিজ্ঞেস করেছি তুই কে, উত্তর দিসনি। তুই যতক্ষণ না উত্তর দিস, ততক্ষণ তোর ছাড়ান নেই। আমার মুন্ডুর নীচে তোর জামা আটকে থাকবে। বল তুই কে, আমি তোর কোনও ক্ষতি করব না।”

ছেলেটা এবার উত্তর দিল, ভয়ে ভয়ে, অস্ফুট গলায়, “আমার নাম শম্ভু।”

“বলিস কী রে, আমি যখন মানুষ ছিলুম তখন যে আমারও নাম ছিল শম্ভু! শম্ভুনাথ সান্যাল। আর ওই অট্টালিকার নাম ছিল, সান্যাল-সৌধ। এখন এই যে মস্ত বনটা দেখছিস, তখন এখানে কোনও বন ছিল না। ছিল একটা ছোট্ট শহর। লোকজন, গাড়িঘোড়া, বাজারহাট ছিল সব কিছুই। একবার ভয়ংকর ভূমিকম্প হল। ছোট্ট শহরটা ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। কত মানুষ যে প্রাণ হারাল, তার হিসেব নেই। কত বাড়ি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেল। ভেঙে গেল আমাদের এই সান্যাল-সৌধও। আমার এই মুন্ডুটাও তখন আমার ওই পাথরে-গড়া ধড় থেকে খসে পড়ে। সেই থেকে আমার মুন্ডু এখানে পড়ে আছে। পড়ে পড়ে দেখতে লাগলুম, ভূমিকম্পের পর কেমন করে ভাঙা শহরটা ফাঁকা হয়ে গেল। যেসব মানুষ বেঁচে ছিল, তারা সবাই শহর ছেড়ে পালাল। রাস্তা-ঘাট সব ভেঙে তুবড়ে, খানাখন্দে ভরে গেল। মানুষের বাস করার মতো আর রইল না কিছুই। গজিয়ে উঠল বুনোগাছের ঝোপ। সেই ঝোপের সঙ্গে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠল বড় বড় গাছের ঝাড়। ঝড়জল, রোদবাতাস গায়ে মেখে গড়ে উঠল এই বন। এখন এটা একটা গভীর অরণ্য। আমি সব দেখেছি এইখানে পড়ে পড়ে। শহর সেই যে ধ্বংস হল, তারপর থেকে এদিকে আর একটি মানুষকেও আসতে দেখিনি। মনে হয় এই গভীর বন ডিঙিয়ে এদিকে কেউ আসতে পারে না। আসতে গেলেই পথ হারায়। ঘুরে মরে। আমি বুঝতে পারছি, তোরও সেই দশা হয়েছে। বুঝতে পারছি, তুইও মরবি।”

“না-আ-আ!” ছেলেটা আঁতকে উঠল।

ভাঙা মুন্ডুটা হেসে উঠল।

ছেলেটা চেঁচাল, “আমায় তুমি ছেড়ে দাও! আমি পথ খুঁজে বাড়ি যাব।”

“কোথায় বাড়ি তোর?” মুন্ডুটা জিজ্ঞেস করল।

“নয়নতলি।”

“নামটা শোনা। তা, তুই বনে ঢুকলি কেন?” মুন্ডুটা আবার জিজ্ঞেস করল।

“শহরে যাচ্ছিলুম।”

“শহরে কেন? তোর তো এখন শহরে যাওয়ার বয়েস নয়। বাড়ির কারও ওপরে রাগ করে পালাচ্ছিলি বুঝি?”

ছেলেটা এবার সত্যিই রেগে গেল। অবিশ্যি সেটা প্রকাশ করল না। সোজাসাপটা উত্তর দিল, “পালাব কেন। শহরে কাজ করব বলে যাচ্ছিলুম।”

মুন্ডু বলল, “কাজ! তোর মতো পুঁচকে ছেলেকে কাজ কে দেবে! কাজ করা কি তোর সাজে! এই বয়সে কাজ করার এত তাড়াই বা কীসের? পড়াশোনা করিস না?”

“কেন করব না?”

“সে তো ভাল কথা। তবে সেইটা আগে শেষ কর। বড় হ। তারপর তো কাজ।”

“না, আমায় এখনই কাজ করতে হবে। আমরা গরিব। আমার মা ছেঁড়া কাপড় কেন পরবে! আমি কাজ করে মাকে নতুন কাপড় কিনে দেব। আমায় ছেড়ে দাও! তোমার মুন্ডুটা আমার জামা চেপে আছে। ছিঁড়ে গেলে আমি ছেঁড়া জামা পরে শহরে যাব কী করে। ছেঁড়া জামা ছেড়ে আর একটা যে অন্য জামা পরব, তা-ও নেই।”

“তুই ভীষণ বোকা,” বলে মুন্ডুটা হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, “ওরে হাঁদা, তুই হাত দিয়ে ঠেলা মারলেই তো আমার মুন্ডু গড়িয়ে সরে যায়। তুই ঠোক্কর খেয়ে ছিটকে পড়তেই আমার মুন্ডুতে তোর জামাটা আটকে গেছে। আমি কিছুই করিনি। তা ছাড়া আমার কিছু করার ক্ষমতা আছে কি? আমি তো নিরেট পাথর।”

মুন্ডুর কথা শুনে ছেলেটা সত্যি ঠেলা দিল। সঙ্গে সঙ্গে মুন্ডুটা গড়িয়ে গেল খানিকটা। আটকানো জামাটা ছেড়ে গেল। খুব রক্ষে, ছেঁড়েনি! ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। মুন্ডুটাকে অবাক চোখে দেখতে দেখতে ক’পা পিছিয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, এ কেমন করে হয়! পাথরের মুণ্ডু কথা বলে কেমন করে! এ তো ভারী আশ্চর্য ব্যাপার!

এমন সময় আবার মুন্ডুর মুখে কথা ফুটল। সে বলল, “শোন শম্ভু, তোকে শহরে যেতে হবে না। আমি তোর সব ব্যবস্থা করে দেব। তার আগে আমার জন্যে তোকে একটা কাজ করে দিতে হবে। আমার এই মুন্ডুটা আমার ভাঙা ধড়ে বসিয়ে দিতে হবে। দেখতেই তো পাচ্ছিস, তোর পাশেই আমার মূর্তিটা স্কন্ধকাটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মাথাভাঙা দেহটা যেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তেমনই আমার মুন্ডুটাও পড়ে পড়ে জেরবার হয়ে যাচ্ছে। তুই যদি আমার মাথাটা এই মাটি থেকে তুলে আমার ধড়ে বসিয়ে দিস, তা হলে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। হাঁটতে না পারলেও চোখ তুলে তো দেখতে পাব চারপাশটা। সেটাও কি কম কথা! এটা করলেই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তোর মনস্কামনা পূর্ণ করে দেব আমি।”

ছেলেটা ভাঙা মুন্ডুর কথা শুনে, তার স্কন্ধকাটা মূর্তিটার দিকে তাকাল। হায় কপাল! এই পেল্লাই উঁচু মূর্তিটার গলার দিকে তার হাত যাবে কী করে! তাই ছেলেটা একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল, “অত উঁচুতে তো আমার হাতটা যাবে না।”

মুন্ডুটা বলল, “ও, হ্যাঁ, তা-ও তো একটা কথা!” বলে, নিমেষ চুপ করে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল, “তুই মই-এ চড়তে পারিস?”

ছেলেটা উত্তর দিল, “হ্যাঁ, তা অবশ্য পারি। কিন্তু এখানে তো আর মই নেই।”

মুন্ডুটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে বোধহয় কিছু ভাবল। তারপরে বলল, “তা হলে তুই এক কাজ কর, যতদূর মনে পড়ছে, আমার ওই অট্টালিকার ভেতরে একটা মই ছিল। জানি না, সেটা এখনও আছে কি না। থাকলেও জানি না, সেটা এখনও আস্ত আছে কি না! তুই খুঁজে দেখতে পারিস। চলে যা জঞ্জালের স্তূপ পেরিয়ে অট্টালিকার ভেতরে। মই পেলে ভাল, নইলে অন্য কোনও মতলব ভাবা যাবে। যা তাড়াতাড়ি। কোনও ভয় নেই। মনে হচ্ছে সন্ধে এগিয়ে আসছে। তখন বন পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে তোর খুব মুশকিল হয়ে যাবে।”

না, ছেলেটা দেরি করল না। আসলে সে তো তখন অট্টালিকার ভেতরে ঢুকতেই যাচ্ছিল। কিন্তু ভাঙা মুন্ডুটাই তো তাকে ডাকল। যাক, এখন ভালয়-ভালয় মইটা পেয়ে গেলে ছেলেটার মনস্কামনা পূর্ণ হয়। অন্তত, শহরে যাওয়ার ঝক্কি পোয়াতে হয় না। অবিশ্যি একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। মইটা খুঁজে পাওয়া যাবে তো! খুঁজে পেলে যদি আস্ত না থাকে! না, না, এসব কুচিন্তা এখন করার মানে হয়! এমনিতেই বলে:

কাজটা যদি করতেই হয়

খুঁতখুঁতুনি বাতিল দাও,

বিঘ্ন-বাধা হেলায় ঠেলে

কোমর বেঁধে এগিয়ে যাও!

কাজেই, ছেলেটা এগিয়েই গেল। এগিয়ে গেল ভাঙা অট্টালিকার অন্দরে।

সবই তো ধসে গেছে। তবে খানিক খানিক দেখা যাচ্ছে আভাঙা এখানে ওখানে। তা, সেটাও কম নয়। দেখা যাচ্ছে একটা দালান। বেশ লম্বা। গায়ে গায়ে অনেক ঘর। টুটা-ফাটা হলেও এখনও দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে দেখছে ছেলেটা। দালান ধরে হাঁটছে। ভাঙা বাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে দিনের আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

“অ্যাই, কে রে তুই?”

যাচ্চলে! এখানে আবার কে ডাকল! দ্যাখো, আবার বুঝি বিপাকে পড়ল ছেলেটা! থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চমকে তাকাল। ভোঁ-ভাঁ! কেউ তো নেই! তবে কি সে ভুল শুনেছে! তাই-ই হবে। সে আবার পা ফেলল। সামনে। মইটার হদিস করতে লাগল আঁতিপাতি করে।

“এই ছেলে, তুই তো ভারী অবাধ্য। আমার কথার উত্তর না দিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?” তার গলা যেন কড়কে উঠল।

না, এবার আর কোনও সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই কেউ কাছেপিঠে আছে। ছেলেটা ভয়েময়ে দিল ছুট! যে পালায় সে বাঁচে! দরকার নেই বাবা! পালিয়ে বাঁচাই ভাল!

সঙ্গে সঙ্গে হাসি। তারস্বরে। হা-হা-হা।

ছেলেটা যতই ছোটে, হাসিও ততই গলা ফাটায়।

ছুটতে ছুটতে ছেলেটা বেরিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজে।

হাসিটা ততই হা-হা করে।

যাঃ! ছেলেটা পথ গুলিয়ে ফেলেছে যে! সে তো খালি আনামানি করে ছুটছে! দ্যাখো, হাঁফাচ্ছে। এই সর্বনাশ, সে যে হোঁচট খেল। গর্তে।

হাসিটা থামল। যে হাসছিল সে বেশ তেড়ে-তেড়েই বলল, “তুই দু’ নম্বরের চোর! এক নম্বরের চোরও তোর মতো চুরি করতে এসে মরেছে। তুইও মরবি। তুই এখন এই বাড়ির ভেতর বন্দি। তুই আর পথ খুঁজে পাবি না। হা-হা-হা!” আবার হাসি।

ছেলেটা এবার চিৎকার করে উঠল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “আমি চোর নই।”

সে উত্তর দিল, “যে চোর সে কখনও নিজেকে চোর বলে না। যে চোর সে সব সময় মিথ্যে বলে। তুইও মিথ্যে বলছিস। কী নাম তোর?”

“শম্ভু।” গলা যেন ধরে যায় ছেলেটার।

“অ্যাঁ! বলিস কী রে! আমার নামও যে শম্ভু।”

ছেলেটা বিষম অবাক হয়ে চারদিক দেখতে লাগল।

সে জিজ্ঞেস করল, “তুই শম্ভু দাস, না বোস?”

“শম্ভু সরকার।” উত্তর দিল ছেলেটা।

“আমি শম্ভু সান্যাল।” সেই না-দেখা মানুষটা জবাব দিল। তারপর বলল, “দেওয়ালের দিকে তাকালেই আমাকে দেখতে পাবি।”

ছেলেটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল। কিন্তু মানুষ কই। দেখতে পেল একটা লম্বা ফ্রেমে টাঙানো মানুষের ছবি। তেড়াবেঁকা হয়ে ঝুলছে। ছিঁড়েও গেছে। ধুলো ভর্তি। ছেলেটা মনে মনে ভাবল, তবে কি ছবিটাই কথা বলছে! ছবি আবার কথা বলে নাকি! তা, যদি ভাঙা পাথরের মুণ্ডু কথা বলতে পারে, তবে ছবি কথা বললে আশ্চর্যের কী আছে। কিন্তু অবাক কথা হল, ভাঙা মুন্ডুটাও বলল, তার নাম শম্ভু সান্যাল, আবার ছবিটাও বলল একই নাম। তবে কি মুন্ডুটা আর ছবিটা এক!

“দেখতে পেয়েছিস আমায়?” স্বরটা আবার ভেসে এল।

“না।” উত্তর দিল ছেলেটা।

“তুই কি কানা! আমার ছবিটা তোর চোখের সামনেই ঝুলছে, অথচ দেখতে পাচ্ছিস না? এই ছবিটার নামই শম্ভুনাথ সান্যাল।”

ছবির দিকে তাকিয়ে ছেলেটা এবার হাঁ।

অমনি ছবিটা বলে উঠল, “আমাকে অমন হাঁ করে দেখছিস কেন? গিলে খাবি নাকি আমাকে? জানিস, যখন আমি বেঁচে ছিলুম, তখন আমার দিকে তোর মতো কেউ ড্যাবড্যাব করে তাকাতে সাহসই করত না! তাকালেই দিতুম চোখ কানা করে! তবে এখন আমি ছবি। কাপড়ে আঁকা। ঝুলছি তেড়াবেঁকা হয়ে। কোমরে ব্যথা ধরে গেছে ঝুলতে ঝুলতে। কাকে বলব সিধে করে দিতে! কেউ শোনার নেই। ছিল বটে সেইসব দিন। হুকুম করতে হত না। আমার চোখের চাউনি দেখলেই, ত্রিভুবন অন্ধকার। সেই সুখের দিন কোথায় গেল! ধ্বংস হয়ে গেল সান্যাল-সৌধ। ভূমিকম্প সব গ্রাস করে নিল।”

“হ্যাঁ, ভূমিকম্পের কথা আমি শুনেছি।” ছেলেটা এতক্ষণে কথা বলল।

“কার কাছে শুনলি?”

“ওই যে বাইরে একটা পাথরে গড়া ভাঙা মূর্তির মুন্ডু পড়ে আছে, সে বলল। আশ্চর্য কথা কী, সে-ও তার নাম বলল, শম্ভুনাথ সান্যাল।”

ছবিটা যেন খেপে গেল। বলে উঠল, “মিথ্যে কথা।”

“না আজ্ঞে, মিথ্যে কথা নয়। সেই মুন্ডুর ছাঁদটা অবিকল আপনার মুখের মতন। সে এ-কথাও বলল, তার ভাঙা মুন্ডুটা আবার যদি তার গলায় বসিয়ে দিতে পারি, তা হলে সে আমার মনস্কামনা পূর্ণ করে দেবে।”

“তোর মনস্কামনাটা কী শুনি?”

“একটি শাড়ির।”

“শাড়ির!”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার মায়ের শাড়িটা ছিঁড়ে গেছে। আমি সেই শাড়ির জোগাড়ে শহরে যাচ্ছিলুম। যেতে যেতে এই বনে পথ হারিয়ে ফেলেছি।”

ছবিটা ছেলেটার কথা শুনেটুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর বলল, “এবার বুঝতে পেরেছি।”

“আজ্ঞে, কী বুঝতে পেরেছেন?” ছেলেটা উদ্‌গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“তুমি একটি আকাট মুখ্যু। একটা ভাঙা মুন্ডু তোকে কেমন করে শাড়ি দেবে রে?” ছবিটা যেন রেগে গজগজিয়ে উঠল।

ছেলেটাও ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “আজ্ঞে, তা তো জানি না। তবে মুশকিল কী, ভাঙা মুন্ডুর দেহটা এত উঁচু যে, তার গলার কাছে আমার হাতই যাবে না। তাই সেই মুন্ডুটা বলল, “এই সান্যাল-সৌধের ভেতর একটা মই আছে। তাতে উঠে আমি মুণ্ডুটা তার ধড়ে বসাতে পারব। সেই মইটা খুঁজতেই আমি এখানে ঢুকেছি।”

ছবিটা সাংঘাতিক রেগে গেল। বলল, “ওটা আমি নই, ওটা একটা চোর। আমার মুখটা চুরি করে ওর মুন্ডুটা গড়েছে। ওটা আমার চুরি করা মুখ। ওকে তুই একদম বিশ্বাস করিস না। ব্যাটা মরুক পড়ে পড়ে।”

ছেলেটা তো হতবাক! খানিক থমকে রইল। তারপর বলল, “আজ্ঞে, উনিও যে লোক, আপনিও তো সেই লোক। ওঁর নামও শম্ভুনাথ সান্যাল, আপনারও তা-ই। আপনারা দু’জনেই তো একজন। উনি যদি চোর হন, তবে আপনিও তো—”

“চোপ!” ছবিটা ধমক দিল তেড়েমেড়ে। তারপর বলল, “এই বয়সেই এঁচড়ে পাকার মতো কথাবার্তা বলতে শিখে ফেলেছিস! আমাকে তুই ওর সঙ্গে তুলনা করিস! আমি কি ওর মতো পাষাণ! আমি ছবি। রঙিন। দেখতে পাচ্ছিস না!”

“আজ্ঞে, দেখব কেমন করে,” ছেলেটা আমতা আমতা করে উত্তর দিল। “আপনার তো সারা গা ধুলোয় ভর্তি। আপনি তো ঝুলছেন। বিচ্ছিরি লাগছে।”

“মুখ সামলে কথা বলবি,” ছবি রেগে কাঁই, “আমাকে বিচ্ছিরি বলতে তোর মুখে আটকাল না! হতচ্ছাড়া, তুই তো নুলো নোস। হাত বাড়িয়ে ঝেড়ে-পুঁছে দ্যাখ, আমি বিচ্ছিরি, না সুচ্ছিরি।”

ছেলেটা ভয় পেলেও, উত্তরটা সে বুদ্ধিমানের মতোই দিল। বলল, “আজ্ঞে, আপনি যেখানে ঝুলছেন সেখানে আমার হাত যাবে কী করে? আমি তো খুবই ছোট। আপনাকেও ঝেড়ে-পুঁছে সুচ্ছিরি করতে গেলে, মইয়ে উঠেই তা করতে হবে। মই না পেলে কেমন করে সুচ্ছিরি করব?”

ছবির মানুষটা পলক চুপ করে রইল। মনে হয়, কিছু ভাবল। ভেবে বলল, “ঠিক আছে, মইয়ের হদিস আমি তোকে দিতে পারি, তবে এক শর্তে, ওই পাথরের ভাঙা মুন্ডুটি তুমি মইয়ে চড়ে ওই চোট্টার গলায় বসাতে পারবে না।”

ছেলেটা উত্তর দিল, “কিন্তু উনি যে আমার মনস্কামনা পূর্ণ করবেন বলেছেন!”

ছবিটা তখন মুখ ভেংচিয়ে বলে উঠল, “ভারী তো মনস্কামনা, মাত্র একটা শাড়ি। ফুস-স! সে মনস্কামনা আমিই তোর পূর্ণ করব। তোর মা’র জন্য আমি একখানা কেন, দশখানা নতুন শাড়ি দেব।”

“আজ্ঞে, আপনি কেমন করে দেবেন, আপনি তো ছবি?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।

“আর ওই মুন্ডুভাঙা মূর্তিটাই বা কেমন করে দেবে ওটা তো একটা পাথর।”ছবিটা উত্তর দিল।

ছেলেটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল।

ছবিটা এবার খুব বিরক্ত গলায় বলল, “দ্যাখ, আমি আর তোর সঙ্গে বেশি বকবক করতে পারছি না। কথা বললে কথা বাড়ে। তুই এখন বিপদে পড়েছিস। এই বাড়ির গোলকধাঁধায় তোর এখন বাঁচা-মরার অবস্থা। আমার কথা যদি শুনিস, তোর মা’র শাড়িও দেব, সেইসঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথও বাতলে দেব। বেশি বেগড়বাঁই করলে গোলকধাঁধায় চরকি খেতে খেতে যমের কাছে পৌঁছে যাবি। ভেবে দ্যাখ, কী করবি।”

ছেলেটা এবার সত্যিই ফাঁপরে পড়ল। তবে না-ঘাবড়ে মনে মনে ভাবল, যা করার সে পরে করা যাবে। এখন মইটা তো হাতে আসুক। এই ভেবেই সে বলে উঠল, “ঠিক আছে, আপনার কথাই সই। মইটা তা হলে আমি কোথায় পাব?”

“বাঃ! এই তো বুদ্ধিমান ছেলের কথা! শোন, মইটা তুই পাবি এই দালান ধরে সটান ওইদিকে গেলে শেষ বরাবর একটা ঘরে। ঘরের দরজায় কিন্তু চাবি আঁটা। খোলা কিন্তু খুব সোজা। অবশ্য, আমি ছাড়া সেটি খোলার কায়দা আর কেউ জানে না। দেখবি দরজার ঠিক মাঝখানে একটা গোলমতো চাকতি আঁটা। ওই চাকতিটা সাড়ে তিনবার ডানদিকে আর আড়াইবার বাঁদিকে ঘোরালেই দরজা খুলে যাবে। হিসেবের গোলমাল হলেই কিন্তু মুশকিল। তুই হিসেব জানিস তো?”

ছেলেটা বলল, “তা জানি।”

“তবে চলে যা।”

ছেলেটা দেরি না করে দালান ধরে সিধে পৌঁছে গেল ঘরটার সামনে। ঘরের দরজায় আঁটা চাকতি সে হাত ঘুরিয়ে খুলে ফেলল। দরজা খুলতেই কী বিটকেল একটা ভ্যাপসা গন্ধ ঘর থেকে হুশ করে বেরিয়ে এল। একেবারে ছেলেটার নাকে। ছেলেটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “অ্যাঃ!”

আর যায় কোথায়, ঘরের ভেতর থেকে কে যেন চিনচিনে গলায় তেড়ে উঠল, “অ্যাঃ বলে কে নাক সিটকোয় রে?”

ছেলেটা থতমত খেয়ে গেছে।

সে আবার কড়কে উঠল, “কে দরজা খুলল? কে? কে?”

ছেলেটার মুখে কথা নেই। বুকে ঢিপঢিপুনি।

“কে চুপ করে আছে?” সে তেমনই তিরিক্ষি মেজাজে জিজ্ঞেস করল। তারপর বলল, “চোর, না ছ্যাঁচড়?”

এইবার ছেলেটা কথা বলল, “আজ্ঞে, আমি চোর নই, আমি শম্ভু।”

সে বলে উঠল, “তুই কেন শম্ভু হবি! শম্ভ তো আমি। আমার নাম শম্ভুনাথ সান্যাল।”

ছেলেটা এবার সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেল। এ কী রে বাবা, যারই গলা শোনা যায় সে-ই বলে তার নাম শম্ভুনাথ সান্যাল!

সে বলল, “ভেতরে আয় তো, দেখি, শম্ভুকে কেমন দেখতে!”

ছেলেটা ভেতরে ঢুকতে সাহস করল না। কিন্তু আশ্চর্য, যে ডাকছে তাকে সে ঘরের মধ্যে দেখতেও পাচ্ছে না।

“কী, আমার কথা কি কানে ঢুকছে না?”

তবুও ছেলেটার পা নড়ল না।

এতক্ষণ যে গলার স্বর তিরিক্ষি-তিরিক্ষি লাগছিল, এবার যেন সেই স্বর কাকুতি-মিনতি করে কয়ে উঠল, “আয় বাবা, আয়! বেশিক্ষণ দরজা খোলা রাখলে আমার ঠান্ডা লেগে যাবে। দেখছিস না, খাটের নীচে বসে আমি ঠকঠক করে কাপছি!”

ছেলেটা দরজার চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়েই উঁকি মারল। খাটের নীচে আলো-আঁধারিতে স্পষ্ট কিছু দেখা না গেলেও মনে হল, একটা যেন বুড়ো লোক, হাড় জিরজিরে, দলা পাকিয়ে খাটের নীচে বসে আছে।

লোকটা বলে উঠল, “অমন উঁকিঝুঁকি মারছিস কেন? আমি যে বলছি বেশিক্ষণ দরজা খোলা রাখলে আমার ঠান্ডা লেগে যাবে! কথাটা তোর কানে ঢুকছে না? হয় তুই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ কর, না হয় এখান থেকে বিদেয় হ’!”

এবার ছেলেটা দোনোমনা না-করে ঘরে ঢুকেই পড়ল। দরজাটা বন্ধ করে দিল। ইস! কী ভ্যাপসা গন্ধ ঘরের ভেতরে! গা গুলিয়ে ওঠে।

“কী মতলব বল তো তোর?” সে জিজ্ঞেস করল।

কিছু উত্তর দেওয়ার আগে ছেলেটা অ্যাত্ত বড় বড় চোখ করে তাকে দেখতে লাগল। বাস রে বাস! কী চেহারা লোকটার! যেমন বুড়ো, তেমনই রোগা-প্যাংলা। মাথা উপচে চুল পড়েছে মাটিতে। গড়াগড়ি খাচ্ছে। গালভর্তি দাড়ি। গায়ের চামড়া আছে কি নেই, ঠাওর করে কার সাধ্যি। পাতলা ফিনফিন করছে।

“কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে অমন ড্যাবড্যাব করে দেখছিস কেন রে ছাউলে? এই ঘরের দরজা খোলার কায়দা কেউ জানে না, তুই কেমন করে জানলি?”

ছেলেটা এবার উত্তর দিল, “আজ্ঞে, দালানের দেওয়ালে একটা ছবি টাঙানো আছে, সে-ই কায়দা বলে দিয়েছে।”

“ভারী শয়তান তো!” লোকটা রাগ দেখাল। তারপর বলল, “ছবিটা আমার ছবি। আর, বাইরে নিশ্চয়ই একটা পাথরের মূর্তিও দেখেছিস, মূর্তিটাও আমার মূর্তি।”

ছেলেটা তো থ। মূর্তিটা যে বলল, সে শম্ভুনাথ সান্যালের মূর্তি। সে তো দুশো-তিনশো বছর আগে মরে গেছে।

“তা কী কারণে আমার ছবিটা তোকে এই ঘর খোলার গুপ্ত হদিস বলে দিল শুনি?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটা উত্তর দিল, “আজ্ঞে, এই ঘরে একটা মই আছে। সেই মইটা আমার দরকার।”

“মই নিয়ে তুই কী করবি?”

“ছবিটা ধুলো-ময়লায় নোংরা হয়ে গেছে। তেড়াবেঁকা হয়ে ঝুলছে। আমাকে সেটা ঠিক করতে হবে। করলে, সে আমার মায়ের জন্য একখানা শাড়ি দেবে। আমরা তো খুব গরিব। মায়ের শাড়িটা ছিঁড়ে গেছে। কেনার পয়সা নেই। তাই কাজ করে পয়সা রোজগার করার জন্য আমি শহরে যাচ্ছিলুম। পথ ভুল করে এই বনে ঢুকে পড়ি! বনে ঢুকে এই ভাঙা মস্ত বাড়িটা দেখতে পাই। বাড়ির ভেতরে ঢুকে গোলকধাঁধায় আমি পথ গুলিয়ে ফেলি। কিছুতেই আর বেরোতে পারি না। ছবিটা বলেছে, তার গায়ের ময়লা-ধুলো পরিষ্কার করে দিলে, সে আমাকে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথও বলে দেবে।” কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে গেল ছেলেটা।

“ওঃ! মিথ্যেবাদী কাকে বলে! ছবিটা তোকে এইসব কথা বলেছে? তুই বিশ্বাস করলি? এখানে কোনও মই নেই। এখানে আছে সোনাদানা, হিরে-জহরত, রুপোর বাসনপত্তর। আর আছে দামি দামি কাপড়চোপড়। আমি আগলে আছি। এ সব আমার। বাইরের ওই মূর্তিটা আর দালানের ওই ছবিটা, দুটোই পাজির-পাঝাড়া। আমি যে এত সোনাদানার মালিক, ওই পাজিদুটো একদম সহ্য করতে পারে না। ও দুটো নড়তে পারে না তো, ঘরে চোর-ছ্যাঁচড় ঢুকিয়ে আমার এই শেষ সম্বলটুকুও লুঠ করাতে চায়। হিংসে, হিংসে, বুঝলি না, হিংসেয় মরে যাচ্ছে। খুব সাবধান! ওদের কথায় কান দিয়েছিস কী মরেছিস! পাথরের মূর্তিটা পড়ে থাক যেখানে আছে সেখানে। ছবিটা ঝুলে থাক দালানের দেওয়ালে। বরঞ্চ তুই থাক আমার কাছে। আমি তোকে সোনাদানা, হিরে-জহরত সব দিয়ে দেব। বল, থাকবি?” এত কথা একসঙ্গে বলতে বলতে লোকটা হাঁফাতে লাগল।

ছেলেটা বুড়োর কথা শুনে একেবারে তাজ্জব। ভাবল, আশ্চর্য তো, যে মানুষটার মূর্তি, যে-মানুষটার ছবি, সেই মানুষটাই তার মূর্তিটাকে আর ছবিটাকে বলছে, পাজির পাঝাড়া!

হঠাৎ লোকটা আবার চিনচিনে গলায় জিজ্ঞেস করল, “থাকবি কি না বললি না তো?”

ছেলেটা উত্তর দিল, “আজ্ঞে, আমি তো আপনার কাছে থাকতে পারব না। বাড়িতে আমার মা যে একা আছেন।”

লোকটা এবার খাটের নীচের থেকে পা ঘষটে ঘষটে বেরিয়ে এল। সে ছেলেটার সামনেই থুপসি মেরে বসল। বসে বসে বলল, “অ্যাই, অ্যাই হচ্ছে কথা। মা একা আছেন তো কী হয়েছে। তিনি একাই থাকুন। তুই এখন বল, মাকে চাস, না আমার এইসব ধনদৌলত চাস! তুই আমার কাছে থাকলে তোর সব হবে।”

ছেলেটার মুখে কথা নেই। যেন একেবারে বোবা। মায়ের মুখখানি ছলছলিয়ে উঠল তার চোখের ওপর। সে তো মায়ের দুঃখ ঘোচানোর জন্যেই শহরে পাড়ি দিয়েছে। মনে হল, সোনার চেয়ে মায়ের আদরে-জড়ানো মুখখানি যে আরও ঝলমলে। না, না, সে এখানে থাকবে না। সে মায়ের কাছেই যাবে।

লোকটা বলল, “শোন তা হলে, এই যে ভাঙা বাড়িটা দেখছিস, এটা আমার। ওই যে দেখতে পাচ্ছিস, ঘরের দেওয়ালে সারি সারি সাজানো আলমারি, ওতে আছে থাকে থাকে সাজানো কাপড়, জামা। আর ওই যে বড় বড় সিন্দুক, ওতে আছে সোনা-জহরত। এখন তুই বল, এসব চাস, না মাকে চাস?”

ছেলেটা এবার দৃঢ় গলায় জবাব দিল, “না, আজ্ঞে, এসব আমি চাই না। আমি শহর থেকে একখানি কাপড় কিনে মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই।”

লোকটা নাছোড়বান্দা। সে বলল, “ঠিক আছে। আমি যদি তোর মাকে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করি?”

ছেলেটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজ্ঞে, আপনি কেমন করে ব্যবস্থা করবেন? এ বাড়িতে কোনও লোকই তো নেই।”

লোকটা উত্তর দিল, “নাই থাক। আমি নিজে যাব।”

“আপনি কেমন করে যাবেন? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, আপনি অসুস্থ।”

লোকটা বলল, ‘দুর, আমি মোটেই অসুস্থ নই। আমি ঠিক পারব।”

ছেলেটা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, “এই অবস্থায় গেলে আপনি রাস্তা-ঘাটে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন। সে তো হবে আর এক বিপদ।”

“আরে বাবা, বিপদ যা হওয়ার সে দুশো বছর আগেই হয়ে গেছে।”

ছেলেটা চমকে উঠল, “মানে?”

“মানে, শুনবি?” লোকটা ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল খানিক। তারপর জিজ্ঞেস করল, “শুনলে ভয় পাবি না তো?”

“ভয় কেন পাব?”

“তবে শোন,” লোকটা বলল, “দুশো বছর আগে আমি পাহাড়ে উঠতে গিয়ে খাদে পড়ে যাই।”

ভয়ে ছেলেটার বুক ধড়াস করে ওঠে। মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। বুঝতে পারে, যার সামনে সে এখন দাঁড়িয়ে আছে, সে বেঁচে নেই। এই কথাটাই তো ভাঙা মুন্ডুটা বলল।

লোকটা জিজ্ঞেস করল, “ভয় পেলি তো? না, না, আমাকে তোর ভয়ের কিছু নেই। আরও শোন, সেই দুশো বছর ধরে এই ঘরে বাসা বেঁধে আমি যক্ষের মতো এই ধনরত্ন আগলে আছি। আমি বড্ড একা। একা থাকা যে কী কষ্টের, তোকে কেমন করে বোঝাব! তুই আমার কাছে থাক। আমি তোর কোনও দুঃখই রাখব না।”

“না-আ-আ-আ।” আঁতকে উঠল ছেলেটা। চোখের পলকে সে ধেয়ে গেল দরজাটার দিকে। ঝাঁপিয়ে পড়ল দরজার ওপর। দু’ হাত দিয়ে টান মারল দরজার পাল্লায়। যাঃ! দরজা খুলল না। বন্ধ হয়ে গেছে! কে বন্ধ করল! অমনই সারা ঘর কেঁপে উঠল ভয়ংকর হাসির শব্দে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে নেমে এল নিকষ কালো অন্ধকার। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। দেখা যায় শুধুই সেই হাড়-জিরজিরে লোকটার জ্বলন্ত দুটো চোখ! কী ভয়ংকর!

“বাঁচাও-ও-ও!” ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে ছেলেটা। তারপরেই সে লুটিয়ে পড়ে মেঝের ওপর। নিশ্চল হয়ে। চোখ বুজে গেল তার।

সে হয়তো অনেকক্ষণ পড়ে ছিল অমন নিশ্চল হয়ে। হঠাৎ যখন সে চোখ চাইল, দেখল, সারা ঘর আলোয় ঝলমল করছে। ঘরের জানলা খোলা। দরজা খোলা। সকালের রোদ ছড়িয়ে পড়েছে ঘর উপচে। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। কী হয়েছিল তার? ভাবে অবাক হয়ে। সে কি জ্ঞান হারিয়েছিল?

ছেলেটা খাটের নীচে উঁকি দিল। কই, সেই লোকটা তো নেই! সেই রোগা-প্যাংলা লোকটা। অন্ধকারে তার চোখদুটো কী ভয়ংকর জ্বলছিল! এখন তার সাড়াও নেই, দেখাও নেই! গেল কোথায়!

এবার ছেলেটা দরজায় মাথা গলিয়ে উঁকি দিল। তাই তো, বন্ধ দরজাটা কে খুলে রাখল। কে খুলেছে ওই পেল্লাই জানলাগুলো!

ছেলেটা খুব আলতো পায়ে ডিঙি মেরে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। দালানটা দেখছে সে সতর্ক চোখে। চোখে পড়ে গেল সেই ছবিটা ঝুলছে। এখন ছবিটা নির্বাক। সে দাঁড়াল না। সে খুঁজে পেয়েছে দালান পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার পথটা। সে বেরিয়ে পড়ল দালান থেকে। দেখল, সেই মুন্ডুটা, সেই মূর্তিটা। তারও মুখে কথা নেই। মুন্ডুটা যেমন পড়েছিল ধড় থেকে ভেঙে, তেমনই পড়ে আছে। সে দাঁড়াল না। না, আর শহরে যাবে না সে। মায়ের কাছেই ফিরে যাবে।

আশ্চর্য, এবার ছেলেটা সব চিনতে পারছে! চিনতে পারছে বনের রাস্তা। দেখতে পেল সেই জলা। সেই বক, সেই হাঁস। আর দেখতে পেল তার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে সে পৌঁছে গেল বাড়িতে। মায়ের কাছে।

মা ছুটে এলেন। আশ্চর্য, রাগ করলেন না। উলটে আদর করলেন তাঁর শম্ভুকে। তারপর বললেন, “ভোরবেলায় একটি লোক এসে তোর পাঠানো গয়না, শাড়ি দিয়ে গেল। সব পেয়েছি।”

ছেলেটা অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, “তার মানে?”

মা বললেন, “মানে তো তুই নিজেই জানিস। এই বয়সে আমার শম্ভু যে এমন রোজগেরে ছেলে হয়ে উঠবে, আগে কে জানত!”

ছেলে বলল, “মা, তুমি যে কী বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!”

মা ছেলেকে আদর করে ডাক দিলেন, “আয়, দেখবি আয় সব ঠিক আছে কি না!”

মা’র সঙ্গে সে প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। দেখতে পেল, রুপোর তৈরি একটি মস্ত থালা। তাতে সাজানো দুটি রং-ঝলমলে শাড়ি। আর মুঠোভর্তি সোনা-জহরতের গয়না। দেখতে দেখতে মা’র চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। কোনও কথা বলতে পারল না। দেখতে পেল মা’র মুখে হাসি যেন ঝরে পড়ছে আলোর মতন।

আর ছেলেটা ভাবছে, এ কেমন করে হল! কে দিয়ে গেল এত রুপোর থালায় সাজিয়ে মাকে! সে কি তবে—

ভাবতে পারে না ছেলেটা। শুধু ভাবে, এ বুঝি এক গল্প। শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%