শৈলেন ঘোষ

রোদ-ছোঁয়া সকালগুলো তিতিরের চোখে আর যেন তেমন করে ঝলমলিয়ে ওঠে না। মনটাও যেন চায় না সকাল-নরম আলোর রোদে উথাল পাথাল ছুটোছুটি করতে। হঠাৎ যে এমন করে খুশির দিনগুলো হারিয়ে যাবে, সে তো জানা ছিল না তিতিরের। গোনাগুনতি ঠিক সাতদিন আগে দিদির বিয়ে হয়েছে। সাতদিন তো এই সেদিনের কথা। বিয়ের দু’দিন আগেও তো সে গেছল দিদির সঙ্গে জঙ্গলে শুকনো-কাঠ কুড়োতে। বেশ মনে আছে, সেদিনও তিতির আদুলগায়ে মালকোঁচা মেরে কাপড় পরে ছিল। দিদির পরনে ছিল লাল ডুরে শাড়ি। গাছ-কোমর করে আঁটসাঁট বাঁধা। দিদির মাথায় ছিল বন-কুড়নো শুকনো কাঠ-কুটোর বোঝা। কিন্তু যেদিন বিয়ে হল দিদির, সেদিন দিদির কপালজোড়া চন্দনের ফোঁটা, ফুলের টোপর আর রক্তরং-এ-বোনা চিকন শাড়ি। সাজগোজ করে কী সুন্দর দেখতে লাগছিল দিদিকে। তার ওপর নাকে একটা নাকছাবি। দেখতে দেখতে তিতিরের চোখ জুড়িয়ে যায়। বিয়ের পরের দিন দিদি যখন সিঁথিভর্তি সিঁদুর নিয়ে পরের ঘরে চলে গেল, মায়ের সে কী কান্না! কিন্তু তিতির কাঁদেনি এক ফোঁটাও। সেদিনও তিতির জানত না, দিদি আর তিতিরকে নিয়ে কাঠ কুড়োতে যাবে না জঙ্গলে কোনওদিন। জঙ্গলের সেই ছোট্ট আমলকী গাছের নীচে বসে মুড়ি খেতে খেতে দিদি আর গল্প বলবে না। কিংবা আমলকী কামড়াতে কামড়াতে তিতির জিজ্ঞেস করবে না, “তারপর… তারপর?”
কিন্তু একটি একটি করে সাতটি রাত কেটেছে। মায়ের পাশে রাতের অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে তিতির ছটফট করেছে আর দিদির মুখখানি বারবার মনে করে মায়ের মুখের দিকে চেয়েছে। অন্ধকারটা যদি এতটা অন্ধকার না হয়, তবে মায়ের মুখটি হয়তো আরও একটু স্পষ্ট দেখা যেত। কিন্তু তা কেমন করে হবে! ঘুমের রাতে চাঁদ না উঠলে অন্ধকার হালকা হবে কেমন করে।
শুয়ে শুয়ে মা হঠাৎ তিতিরের গায়ে হাত দিয়েছিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তিতির, ঘুম আসছে না? ছটফট করছিস কেন বাবা?”
তিতির একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে উত্তর দিয়েছিল, “তুমিও তো জেগে আছ মা।”
মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমার ঘুম আসছে না বাবা।”
“কেন?” জিজ্ঞেস করল তিতির।
মা জবাব দিলেন, “তুই যে এখনও ঘুমোসনি। আমি বুঝতে পারছি, দিদির জন্যে তোর মন কেমন করছে। তাই জেগে জেগে ছটফট করছিস।”
যেন লজ্জা পেল তিতির মায়ের কথা শুনে। মা যে তার মনের কথাটা জানতে পেরেছেন এ কথা আর গোপন করা যাবে না। তাই সে আর কথা বাড়াল না, চুপ করে গেল।
মা এবার আদর মেশানো নরম গলায় তিতিরকে জিজ্ঞেস করলেন, “দিদির জন্যে খুব মন কেমন করছে?”
তিতির মায়ের এ কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বলল, “দিদি আর আসবে না মা?”
“আসবে।”
“কবে?”
“যেদিন তোর জন্যে তার মন কেমন করবে,” মা উত্তর দিয়েছিলেন।
চমকে গেল তিতির মায়ের কথা শুনে। তারপর মনে মনে ভাবল, দিদির শুধু তার জন্যেই মন কেমন করবে! মায়ের জন্যে করবে না?
হঠাৎ মা আবার বললেন, “তিতির তুই পারবি না?”
মায়ের মখে আচমকা এমন একটা কথা শুনে তিতির কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। মা কী পারার কথা বলছেন, তিতির বুঝতেই পারল না। তাই অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “কী পারার কথা বলছ মা?”
মা বললেন, “জঙ্গল থেকে একা একা কাঠ কুড়িয়ে আনার কথা বলছি। তুই পারবি না?”
মায়ের কথা শুনে তিতির খুশিতেই মাথার বালিশ সরিয়ে উছলে উঠে বসে পড়ল। তার পর বলল, “পারব মা, খুব পারব। আমি অনেক কাঠ কুড়িয়ে আনতে পারব।”
“জঙ্গলে যদি হারিয়ে যাস?”
তিতির হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “তুমি আমাকে বুঝি খুব বোকা ভাব? জানো, একদিন জঙ্গলের ভেতর দিদিই পথ হারিয়ে ফেলেছিল। আমি খুঁজে দিয়েছিলুম।”
“তাই নাকি?” মা আদর করলেন তিতিরকে। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, জঙ্গলে যেতে হলে কাল সকাল সকাল উঠতে হবে। এখন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়।”
হ্যাঁ, পরের দিন খুব সকাল সকালই উঠেছিল তিতির। হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে মালকোঁচা মেরেছিল। মাথায় গামছার পাগড়ি বেঁধে, কোঁচড়ভর্তি মুড়ি নিয়ে জঙ্গলে চলল তিতির একা একা, কাঠ কুড়োতে।
মা বললেন, “তাড়াতাড়ি আসবি বাবা, নইলে বড্ড ভাবনা হবে।”

তিতির বলেছিল, “কিচ্ছু ভেবো না মা, কাঠ কুড়োতে যতক্ষণ। তারপর একটুও দেরি করব না। তোমার ভাবনার আগেই আমি ফিরে আসব।”
তিতির জঙ্গলের পথে হাঁটা দিল।
মুখে বললেই তো আর জঙ্গলে পৌঁছতে পারছ না। বেলা তো একটু গড়াবেই। সকালের নরম-রোদ গড়িয়ে গায়ে একটু ছেঁকা দেবেই। অবিশ্যি তিতিরের এসব গা-সওয়া। তিতির রোদের তাপ মাথায় নিয়েই জঙ্গলে ঢুকল। আঃ! জঙ্গলের এখানে ছায়া, ওখানে ছায়া। রোদ যতটুকু আছে, ছায়া তার চেয়ে অনেক। আরও অনেক।
কিন্তু জঙ্গলে ঢুকতেই হঠাৎ মনটা তার কেমন অস্থির হয়ে উঠল। হঠাৎ তিতিরের মনে পড়ে গেল দিদির কথা! জঙ্গলে দিদি নেই, এ যে ভাবতেই পারে না তিতির। চারদিক সুনসান। যেদিকেই চোখ মেলে শূন্য, দিদি নেই। এই ঘন-জঙ্গলের ঝরাপাতার ওপর দিদির পায়ের শব্দ আজ আর শুনতে পায় না তিতির। আজ আর কাঠ কুড়োতে কুড়োতে দিদির গানের শব্দ গুনগুন করে ভেসে আসে না তিতিরের কানে। কিংবা দিদি চাপা গলায় ডাক দেয় না, “তিতির এদিকে আয়!” বলে না, “চ, আমলকীতলায় বসে একটু জিরিয়ে নিই।”
না। এত কথা এখন আর ভাবলে চলবে না। মা বলেছেন তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে। সুতরাং জলদি-জলদি কাঠ কুড়িয়ে ঘরে ফেরাই ভাল। অবিশ্যি মা যদি তিতিরের সঙ্গে আসতেন, তবে কাউকেই ভাবতে হত না। কিন্তু মা যে এতখানি পথ হাঁটতে পারেন না। সে বছর বর্ষায় মা পা পিছলে পড়ে গেলেন খানার ভেতর। পা ভেঙে গেল। তারপর কত কাণ্ড করে মা হাঁটতে পারলেন। কিন্তু এখনও মায়ের কষ্ট হয়। আর বাবা তো সেই সারা বছরই মুনিশ খাটছেন। হয় এ-গাঁয়ে, নয়তো অন্য কোথাও। দিদির বিয়েতে এলেন বটে, কিন্তু কাজ চুকে যেতেই আবার ছোটো। বাবারও কি কষ্টের শেষ আছে।
অনেকক্ষণ ধরে জঙ্গলের এপার-ওধার করল তিতির। অনেক কাঠ জড়ো করে ফেলেছে। গামছাটা মাথা থেকে খুলে বেঁধে ফেলল কাঠগুলো। তারপর ভাবল একটু জিরিয়ে না নিলে ঠা-ঠা রোদে পথ চলতে কষ্ট হবে। যেমনই জিরিয়ে নেবার কথা ভাবা, অমনই তার মনে পড়ে গেল, সেই আমলকী গাছ। সেই ছায়া। সেই ছায়ার নীচে দিদির সঙ্গে গল্প। সামনেই ছুটে গেল তিতির। সামনেই সেই গাছ। থমকে দাঁড়িয়ে। পড়ল গাছের সামনে এসে। এখনও কি খুঁজলে দিদির পায়ের চিহ্ন দেখতে পাবে তিতির এই গাছের তলায়? ঠিক এইখানে শুয়ে শুয়ে শুকনো পাতার ওপর গড়াগড়ি খেতে তিতিরের কী মজাই না লাগত! খড়মড় খড়মড় করে একবার এপাশ, একবার ওপাশ। দিদি তাই দেখে হেসে কুটিপাটি। দিদির হাসির সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিতিরও হাসত। দিদি হাসলে, দিদির দাঁতগুলো ঝলসে উঠত। দেখতে কী সুন্দর!
আজ এই আমলকীতলা ছমছম নির্জন। দিদি নেই। দিদির হাসি নেই। দিদির সেই মুক্তো ঝলমল দাঁতগুলি আজ আর দেখতে পায় না তিতির। মনটা যেন কেমন করে ওঠে। ভার হয়ে আসে তিতিরের বুকের ভেতরটা। কেন হঠাৎ জঙ্গলের সব ছাপিয়ে দিদির হাসির শব্দ শোনার জন্যে তিতিরের মনটা তোলপাড় করে উঠল?
আচমকা “দিদি” বলে ডুকরে ওঠে তিতির। যে ছেলে কাঁদে না কখনও, সে আজ কেঁদে ফেলে। তার চোখের পাতা উপচে পড়ে কান্নার ফোঁটায়। একটি ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে তার বুকের ওপর। তারপর হারিয়ে যায়। কোনওটা পড়ে মাটির ওপর। মিলিয়ে যায়। শুধু একটি ফোঁটা হঠাৎ কখন ঝরে পড়ে আমলকীর ঝরাপাতার ওপর। পাতার ওপর সেই ফোঁটাটি দোল খায়! আনমনা তিতির চেয়ে চেয়ে দ্যাখে।
হঠাৎ চমক ভাঙল তিতিরের। হঠাৎ যেন তার মনে হল, চোখের জলের সেই ফেঁটাটি পাতার ওপর দোল খেতে খেতে মুক্তোর মতো টলমল করছে! অবাক হয়ে ঝুঁকে পড়ে তিতির। তাকিয়ে দেখে, না এ তো মুক্তো নয়। তার চোখের জলে এ যে দিদির মুখের আদল দেখছে সে। জঙ্গলের নির্জনতা ভেঙে খানখান করে চিৎকার করে উঠল তিতির, “দিদি-ই-ই-ই।” অমনই একটা দমকা বাতাস কোথা থেকে ছুটে এল! আছড়ে পড়ে উড়িয়ে দিল আমলকী পাতার ওপর মুক্তো-আঁকা তার দিদির মুখখানি! থতমত খেয়ে গেল তিতির! হাত বাড়াল। ধরতে গেল। কিন্তু হায় রে, সে কী আর ধরা যায়! নিমেষের মধ্যে সব যেন ওলট-পালট হয়ে গেল তিতিরের। সে আর দাঁড়াল না মুহূর্তের জন্যেও। কুড়নো কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে ছুটল। ছুটল ঘরে, মায়ের কাছে।
জঙ্গলে যাবার সময়ে যতটা হেঁটেছিল, ঠিক ততটাই ছুটল তিতির। তখন সূর্য আকাশের পুবে যতটা ঝুঁকে ছিল, এখন সেখান থেকে আরও ওপরে ছড়িয়ে পড়েছে। তার কিরণ। তিতিরের মাথায় এখন কাঠের বোঝা। তবু ছুটতে তার কষ্ট হচ্ছে না। কষ্ট হলেও একটু যে দাঁড়িয়ে দম ফেলবে, সে ফুরসতও তার নেই! কেন না, এখনই মায়ের কাছে পৌঁছতে হবে। এখনই মাকে গিয়ে বলতে হবে সেই কথাটা, সেই একফোঁটা কান্নার জলে ভেসে ওঠা একটি মুখের কথা। তিতির জানে সে-মুখটি তার দিদির। দিদির এমন স্পষ্ট মুখ সে আর কোনওদিন দেখেনি, কোনওদিনই না। বোধহয় মা-ও দেখেননি কোনওদিন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন