শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল ছাগল। পেট ড্যাংরা। বুড়ো। নড়বড়ে। সে মাঠের ঘাস খেতে বেরিয়েছিল। কচি কচি ঘাস। আহা, ভারী মিষ্টি! তো, মিষ্টি ঘাস খেতে খেতে বুড়ো ছাগল এমন আনমনা হয়ে গেল যে, কী বলব। আনমনে কখন যে সে একটা বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল, সেটি পর্যন্ত খেয়াল করল না।
বন তো বন! গা-ছমছম গভীর বন। বনের মধ্যে ঢুকে ছাগলটা ভাবল, এটা বুঝি একটা মস্ত বাগান। তাই, মনে মনে বলল, যাচ্চলে! এত বড় একটা ছায়া-ঘেরা বাগান বেমালুম ফাঁকা পড়ে আছে! না আছে মালিক, না আছে মালী! আশ্চর্য! নাই থাক! সে ব্যা-হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠল। তারপর ছাগুলে গলায় হেঁকে উঠল, “এটা আমার বাগান। না, এটা হবে আমার খেলার মাঠ! না, না, খেলার মাঠ নয়। ধুত! এই বুড়ো বয়সে খেলা করলে লোকে বলবে কী! তার চেয়ে বরং এটা হবে আমার বৈঠকখানা!” এইসব ভাবতে ভাবতে তার এমন আনন্দ হল যে, তার গলায় একটা গান সুর সুরিয়ে উঠল। সে গেয়ে উঠল:
ছুটে আয় শুনতে এমন
আমি গাই গানটা কেমন।
ব্যা-ব্যা রাগ গাইতে পারিস?
গলাটা সামলে ঝাড়িস!
অত নয় সাপটা-সোজা
ডেকে আন সাপের ওঝা!
আমাকে ভেংচি কাটিস!
দাড়িতে টুসকি মারিস!
দাঁড়া তুই হতচ্ছাড়া,
ও কে রে সামনে খাড়া!
গেল তাল ফসকে গানে,
কেটে পড় সসম্মানে!
হ্যাঁ, ছাগলের গলায় তাল ফসকে গেল বটে, কিন্তু কাটতে আর হল না তাকে। কেন না, তার সামনে খাড়া একটি বাঘ! বাবা রে! ডোরা-ডোরা দাগ! গা-ভর্তি! হালুম করে সে ডাক ছাড়ল। ভয়ে তার বুক কাঁপল। পেট ড্যাংরা বুড়ো-ছাগল বোকারামের মতো বাঘটাকে দেখতে লাগল।

বাঘ গাঁক গাঁক করে গর্জে উঠে ধমক মারল, “কী হে ছাগলমশাই, মেজাজ যে দেখি খুব শরিফ! এ্যাঁ! সাতসকালেই নাচা-গানা হচ্ছে, কী ব্যাপার?”
ছাগল তো ধরেই নিয়েছে এবার তার নির্ঘাত মরণ! শুধু মরণটা যে কেমনতর সেটাই তার জানা নেই। তাই সে ভাবল, মরার আগে ভয় না-পেয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা তো একটা করা যেতেই পারে। ছুটে পালাতে গেলে একটা দেড়-আঙুলে টিকটিকি পর্যন্ত হেসে উঠতে পারে! সে ভারী অপমানের! কারণ, বাঘের সঙ্গে ছাগলের ছোটাছুটির ব্যাপারটা নেহাতই বোকা-বুদ্ধির কাজ। কাজেই, বোকা ভেবে টিকটিকি টিটকিরি কাটলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না! সেই কারণেই ছাগলমশাই ভয়টাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখল। মনে সাহস আনার চেষ্টা করল। গলাটা একটু চেপে চেপে বলল, “আজ্ঞে বাঘমশাই, আপনি কি আমায় চিনতে পারছেন?”
বাঘ তেমনি হেঁড়ে গলায় হাঁকার দিলে, “ছাগলকে আবার চেনার কী আছে? তোমার একটু বয়েস হয়েছে এই যা! মাংসটা তেমন জুতসই না হলেও বুড়ো হাড় চিবোতে মজা।”
বাঘের কথা শুনে ছাগলের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল বটে, তবে কথা তার গলায় আটকে গেল না। ছাগল বললে, “আজ্ঞে, আপনাকে কিন্তু আমার চেনা চেনা লাগছে।”
“আমাকে?” বাঘ যেন একটু অবাক হল। “কীরকম?”
“আপনাকে যেন কোথায় দেখেছি, কোথায় যেন আপনার সঙ্গে অনেক খেলাধুলো করেছি। কোথায় কোথায় কো—ও, হ্যাঁ হ্যাঁ আমার মনে পড়েছে। মনে পড়েছে— আমার মামার বাড়িতে।” বলতে বলতে থামল ছাগল। তারপর আরও খানিক বাঘের দিকে চোখ রেখে ভাল করে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ আবার বলে উঠল, “আচ্ছা বাঘমশাই, আর জন্মে কি আপনি ছাগল ছিলেন?”
“তার মানে!” বাঘটা গাঁক করে উঠল।
ভয়ে একটুও টসকাল না ছাগল। বাঁচি, না হয় মরি, এই ভেবে সে গড়গড় করে বলে গেল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার ঠিক মনে পড়ছে, ওই নাক, ওই চোখ, ওই দাঁত, এক্কেবারে আমার স্বর্গে যাওয়া মামার মতো! ঠিক, ঠিক, আর জন্মে আপনি ঠিক আমার মামা ছিলেন! বিশ্বাস না হয় আপনি নিজের গা নিজে শুঁকে দেখুন, আপনার গায়ে নিশ্চয়ই ছাগলের গন্ধ আছে!” বলেই ছাগলটা মরা-কান্না কেঁদে উঠল, “ওগো মামা গো, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে গো!”
বাঘটাও তেমনই, কেমন ভ্যাবাচাকা হাম্বা হয়ে নিজের গা শুঁকতে লাগল।
আর ছাগলটাও তাই দেখে কেমন ছাগুলে গলায় ব্যা-ব্যা করে কাঁদতে লাগল! থেকে থেকে চোরাচোখে বাঘকে কেমন দেখতে লাগল।
অনেক সময় যেমন মিথ্যেকথা শুনতে শুনতে মিথ্যেকথাটা সত্যিকথা বলে মনে হয়, তেমনই বাঘেরও সেই দশা হল। ছাগলের কান্না শুনতে শুনতে, আর নিজের গা শুঁকতে শুঁকতে হঠাৎ যেন তার মনে হল, সত্যিই তো তার গা দিয়ে ছাগল ছাগল গন্ধ বেরোচ্ছে! তাই তো, তা হলে তো ওই বুড়ো ছাগলটা তার ভাগনে হতেই পারে! যেই না এই কথা তার মনে এল, অমনি বাঘ লাফালাফি আর হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিল, “আমি ছাগল, আমি ছাগল।” সে কী বন কাঁপানো হুহুংকার। সবাই তো তাই দেখে একেবারে ভয়ে থরহরি।
ঠিক সেই তক্কে বুড়ো পেট ড্যাংরা ছাগলও দে লম্বা!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন