শৈলেন ঘোষ

একটি নদী। ছোট্ট। কেমন বয়ে চলেছে তির তির করে। একা একা। ছোট্ট নদীর ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ। ছলাৎ ছলাৎ উপচে পড়ছে তীরে। না-হয় নদীর বুকেই উছলে উঠে হারিয়ে যাচ্ছে। কী সুন্দর দেখতে লাগে!
ছোট্ট নদীর ছিল একটি ছোট্ট বন্ধু। একটি ছেলে। নদী যেমন একলাটি বয়ে যায়, তেমনি তার ছোট্ট বন্ধুটিও একলাটি হাঁটে। নদীর সঙ্গে। নদীর তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে। অবশ্য, নদীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার আগে ছেলেটি জানত না, সে যখন হাঁটে, নদী তাকে দেখে। জানত না, নদী অবাক হয়ে ভাবে, কেন সে হাঁটে! একা একা। কেন তার মুখখানি অমন ফ্যাকাশে! কোথায় সে যায় এমন করে পায়ে পায়ে।
একবার এমনি করে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটি আর পারছিল না। থামল। নদীর কিনারে হেঁট হয়ে বসল। নদীর জল দু’হাত ভরে তুলে নিয়ে চোখেমুখে ছড়িয়ে দিল। অমনি একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল। দ্যাখো, জায়গাটা কেমন নির্জন। কারও সাড়াও নেই, শব্দও নেই। অথচ কে যেন কথা কয়ে উঠল আচমকা। কে যেন বলল, “এত কষ্ট করে তুমি কোথায় হেঁটে যাও? রোজ? একা একা?”
ছেলেটি থতমত খেয়ে গেল। দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে খুঁজতে লাগল। কিন্তু অবাক কথা, সে কাউকে দেখতে পেল না। তবে কি সে ভুল শুনল?
না, ভুল না। সেই গলার স্বর সে আবার শুনতে পেল। সে যেন বলল, তুমি ব্যস্ত হয়ে যতই খোঁজাখুঁজি করো, আমায় দেখতে পাবে না। অথচ আমি তোমার চোখের সামনেই আছি। আমার পাশে পাশে তুমি রোজ হাঁটো। আমিও তোমার সঙ্গে সঙ্গে বয়ে যাই। এবার বুঝতে পেরেছ, আমি কে? আমি নদী।
“নদী!” ছেলেটি অবাক চোখে নদীর দিকে তাকাল।
নদী উত্তর দিল, “হ্যাঁ, আমি!” তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি এমন করে হাঁটো কেন? তোমার কী হয়েছে? কীসের দুঃখ?”
ছেলেটি উত্তর দেয় না। শুধু অবাক চোখে তাকিয়েই থাকে।
নদী বলল, “তোমার কোনও ভয় নেই। তোমার দুঃখের কথা আমায় বললে, কে জানে, আমি হয়তো তোমায় সাহায্যও করতে পারি। বলো, কী হয়েছে তোমার? কোথায় যাচ্ছ?”
এবার আর ছেলেটি চুপ করে থাকল না। উত্তর দিল, “আমি স্বর্গে যাচ্ছি।”
“স্বর্গে? কেন?” যেন অবাক হল নদী।
ছেলেটি উত্তর দিল, “সবাই বলে আমি খুব দস্যি ছেলে। আমার কোনও দয়া-মায়া নেই। গাছে পাখি দেখলে আমি গুলতি মারি। নদীতে হাঁস দেখলে আমি ইট ছুড়ি। পথে কুকুর দেখলে আমি লাঠি নিয়ে তাড়া করি। এমনকী গরিব মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে আমি জঞ্জালে ফেলে দিই। মজা পাই। সবাই বলে আমি মানুষ নই। নির্দয় পিশাচ। আমার জ্বালায় অস্থির হয়ে মা কাঁদেন। তবুও মন আমার দয়ায় ভরে না। আমার দস্যিপনা থামে না। সবাই বলে, স্বর্গে নাকি দয়া-মায়া এইসব পাওয়া যায়। আমি সেই দয়া আর মায়ার খোঁজে স্বর্গে যাচ্ছি।”
ছেলেটির কথা শুনে নদী তার বুকের ঢেউ উথাল-পাথাল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “হায়! হায়! একথা তোমায় কারা বলল! দয়ার খোঁজে কে কবে স্বর্গে গেছে! আর তা ছাড়া আমার তীর ছুঁয়ে হাঁটলেই কি স্বর্গের রাস্তা খুঁজে পাবে? স্বর্গের রাস্তা কোনদিকে আছে, সেটাই বা জানে কে? এখান থেকে তোমার মতো কে কবে দয়ার খোঁজে স্বর্গে পাড়ি দিয়েছে, তাও তো জানি না। দয়া, মায়া, মমতা, ভালবাসা এসব পাবার জন্যে স্বর্গে যাবারই বা দরকার কী। সবই তো এখানেই আছে। মিথ্যে মিথ্যে স্বর্গে যাবার পথ তোমায় খুঁজতে হবে কেন?”
ছেলেটি থতমত খেয়ে বলল, “সে কী! দয়া-মায়া এখানেই আছে? তবে আমি দেখতে পাই না কেন?”
আবার হাসল নদী। বলল, “দয়া-মায়া কি দেখা যায়? সে যে থাকে মানুষের বুকের ভেতরে।”
“তবে আমার কেন নেই?” ছেলেটি উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল।
নদী উত্তর দিল, “কে বলল নেই, আছে। তবে তা অনেকের বুকের ভেতরে বন্ধ হয়ে থাকে। চাবি আঁটা।”
ছেলেটি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমারও কি তবে সেই দয়া-মায়া বুকের ভেতরে চাবি এঁটে বন্ধ হয়ে আছে?”
“তাই তো মনে হয়।” উত্তর দিল নদী।
ছেলেটি খুবই ব্যস্ত হয়ে তখন জিজ্ঞেস করল, “তা হলে কী হবে? আমি কেমন করে খুলব আমার বুকের চাবি? আমি সেই চাবি পাব কোথায়?”
নদী বলল, “হ্যাঁ, মুশকিল তো এই চাবি নিয়েই। খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন কাজ। কখন যে কোথায় সে-চাবি পাওয়া যায়, সে-খবর কারও জানা নেই। যার চাবির দরকার, তাকে নিজেই খুঁজে বার করতে হয়। এই যে এখন, তুমি আমার সঙ্গে যেখানে এসেছ, কে বলতে পারে এখানেই হয়তো সেই চাবি আছে।”
নদীর কথা শুনে ছেলেটি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার চারদিকটা ঘুরে ফিরে দেখতে লাগল। আহা! ভারী সুন্দর দেখতে জায়গাটা। সবুজ গাছ-গাছালি। নদীর বুকে ছায়া ছড়িয়ে দুলছে। কত কাঠবিড়ালি। তুড়ুক-তুড়ুক গাছে উঠছে। নামছে। কত পাখি ডাকছে। উড়ছে। না-হয় ডালে ডালে নাচছে।

ছেলেটির মন আজ আর এইসবের দিকে নেই। হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা ধসে পড়া মস্ত বাড়ির দিকে। সেটা দেখতে দেখতে সে নদীকে জিজ্ঞেস করল, “কী করে বলছ তুমি এখানেই সেই চাবি থাকতে পারে? এখানে তো দেখা যাচ্ছে একটা ভাঙা বাড়ি। শুধু জঞ্জাল, জঞ্জাল! চারদিকে ছড়িয়ে-মড়িয়ে একাক্কার হয়ে আছে।”
নদী উত্তর দিল, “তা ঠিকই বলেছ। ওই দিকটা জঞ্জালে ভরা। হ্যাঁ, ওই যে দেখছ ধসে-পড়া বাড়িটা, ওটা এককালে রাজার বাড়ি ছিল। আমি তখন দেখেছি, কাকে বলে রাজার ধন-দৌলত। দেখেছি, কী জাঁকজমক রাজবাড়ির। কত সৈন্য-সামন্ত। কত অস্ত্রশস্ত্র। হাতি, ঘোড়া, উট কত যে, গোনা যায় না। এই আমার জলে নৌকো ভাসিয়ে রাজা বিহার করতেন। তারপর একদিন আমারই জলে যুদ্ধতরী ভাসিয়ে রাজা দেশ জয় করতে চললেন। যুদ্ধের রক্তে লাল হয়ে গেল আমার জল। রাজা আর ফিরলেন না। তারপর আস্তে আস্তে শেষ হয়ে গেল রাজবাড়ির রমরমা। রাজবাড়ি ভেঙে পড়ল একটু একটু করে মাটিতে। মিশে গেল ধুলোয়। আমি সব দেখেছি। আমারও তো বয়েস কম হল না। আমি কি আজকের নদী! হাজার বছর ধরে চলেছি।”
“হাজার বছর!” চমকে উঠল ছেলেটি।
“হ্যাঁ, হাজার বছর। আমি কত কী দেখেছি। কত কী শুনেছি। আমার জানার শেষ নেই। তাই বলছি, তুমি যাকে জঞ্জাল বলছ, এক সময় সেই জঞ্জালই ছিল, রত্ন-ভাণ্ডারের দেওয়াল, পাঁচিল। কে বলতে পারে, এই জঞ্জালের মধ্যেই সেই চাবি লুকিয়ে আছে কি না!”
ছেলেটি নদীর কথা শুনে নিরাশ হয়ে উত্তর দিল, “ওই জঞ্জাল তো প্রায় পাহাড়ের স্তূপ হয়ে আছে। ওই স্তূপের ভেতর থেকে চাবি খোঁজা কি সহজ কথা!”
নদী বলল, “না, মোটেই সহজ নয় সেটা আমিও জানি। কিন্তু চাবি খোঁজার কাজটা তো কোথাও না-কোথাও শুরু করতে হবে। আর তা করতে হবে তোমাকেই। কেউ তো আর সেই চাবি সেধে তোমার হাতে তুলে দেবে না। দেখতে দোষ কী! বলা তো যায় না, ওই স্তূপের মধ্যে সেই চাবি পেয়ে যেতেও তো পারো!”
ছেলেটি উত্তর দিল, “ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ, আমি খুঁজতে যাচ্ছি। তবে জঞ্জালের মধ্যে আমি নিজেই যদি হারিয়ে যাই, তখন কী হবে? আমি যদি আর পথ খুঁজে না পাই, কী করব তখন?”
নদী বলল, “কাজ করার আগেই কেন অমন কথা মুখে আনছ? চেষ্টা করতে দোষ কী!”
নদীর এই কথা শুনে ছেলেটি সেই নদীর কিনারা থেকে ধসে পড়া রাজবাড়ির স্তূপের দিকে এগিয়ে গেল। এদিক ওদিক চারদিক দেখতে দেখতে তার নজরে পড়ল ভেঙে পড়া মস্ত বাড়ির একদিকে হেলে-পড়া গম্বুজ। ছেলেটি গম্বুজের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ভাবছিল সে যাবে কোনদিকে। চাবি খুঁজবে কোথায়। এমন সময় কোথাও কিচ্ছু নেই, আচমকা ঝাঁক-ঝাঁক মৌমাছি সেই গম্বুজের ভেতর থেকে উড়ে এসে ধেয়ে এল ছেলেটির দিকে। ছেলেটি সেই স্তূপের ওপর হোঁচট খেতে খেতে ছুট দিল। ছুটল সে যেদিকে চোখ যায়। ছুটতে ছুটতে সে পৌঁছে গেছে আবার সেই নদীর তীরে। রক্ষে, সে বেঁচে গেছে!
নদী জিজ্ঞেস করল, “কী হল, অমন ছুটতে ছুটতে পালিয়ে এলে কেন?”
ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ঝাঁক ঝাঁক মৌমাছি আমাকে তাড়া করল। আমায় ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঢুকতে দিল না।”
নদী উত্তর দিল, “ঠিক আছে এখন তবে থাক। সন্ধে হলে যেয়ো। সন্ধেবেলায় মৌমাছিরা ঘুমিয়ে পড়বে।”
অবশ্য সন্ধের তখন একটা খুব দেরিও ছিল না। যেটুকু রোদ তখনও আকাশে ছিল, খানিক পরে সেটুকুও মিলিয়ে গেল। সন্ধের ছায়া নেমে এল আকাশ থেকে।
নদী বলল, “এখন যেতে পারো।”
ছেলেটি নদীর কথা শুনে আবার গেল সেই হেলে-পড়া গম্বুজটার কাছে। এবার হল আর-এক বিপত্তি। এবার ঝাঁক ঝাঁক বাদুড় সেই গম্বুজের ভেতর থেকে উড়তে উড়তে ছেলেটির মুখে-চোখে ঝাপটা দিয়ে এমন ব্যতিব্যস্ত করে তুলল যে, বেচারা পালাতে পথ পায় না। আবার ছুটল ছেলেটি নদীর কাছে।
“আবার কী হল?” জিজ্ঞেস করল নদী।
“এবার বাধা দিল ঝাঁক ঝাঁক বাদুড়।” ছেলেটি হতাশ হয়ে উত্তর দিল।
নদী তখন তাকে অমন হতাশ হতে দেখে উৎসাহ দিয়ে বলল, “এত বাধা দেখে আমার মনে হচ্ছে, তোমার সেই চাবি এখানেই আছে। খুঁজলে নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে। তোমাকে এই বাধা অগ্রাহ্য করে স্তূপের ভেতরে যেতে হবে। ঠিক আছে এখন থাক। আজ রাতটা তুমি গাছের নীচে বিশ্রাম নাও! কাল খুব ভোরে যখন কারও ঘুম ভাঙবে না, তখন তুমি ওখানে যেয়ো!”
ছেলেটি খুব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমি যদি গভীর রাতে যাই?”
নদী বলল, “গভীর রাতের অন্ধকারে কোথায় তুমি খুঁজবে চাবি?”
“হ্যাঁ, তা-ও তো বটে।” ছেলেটি ভাবল, তারপর নদীকে বলল, “সেই ভাল। আজ রাতটা গাছের নীচেই শুয়ে থাকি। কাল ভোর হলে আমায় তুমি জাগিয়ে দিয়ো।
খুব ভোরেই নদী ঘুম ভাঙিয়ে দিল ছেলেটির। উঠেই সে নদীর জলে মুখ-চোখ ধুলো। নদী জিজ্ঞেস করল, “কাল রাতে ঘুম হয়েছিল তো?”
“হ্যাঁ।” উত্তর দিল ছেলেটি মুখ মুছতে মুছতে।
নদী বলল, “আর দেরি কোরো না। মনে হয় এখনও মৌমাছিদের ঘুম ভাঙেনি। মনে হয় বাদুড়ের দলও গম্বুজের ভেতরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ঝুলছে। এই সুযোগ। ছুটে চলে যাও!”
ছেলেটি ছুটল। সত্যিই, এখন আর কোনও বাধা সে পেল না। নির্বিঘ্নেই সে ভাঙা রাজবাড়ির জঞ্জাল ডিঙিয়ে পৌঁছে গেল গম্বুজের নীচে। যাই বলো আর তাই বলো এই ডাঁই-ডাঁই জঞ্জালের মধ্যে চাবি খোঁজা মুখের কথা নয়! সেই ভোর থেকে সে খুঁজতে শুরু করেছে। এখন এই দুপুর পর্যন্ত সে নাগাড়ে জঞ্জাল ঘাঁটল। হায় রে, চাবি কই? খুঁজতে খুঁজতে ছেলেটি ঘেমে-নেয়ে একশা। আর পারা যায় না। অগত্যা সে একটু বসল। আঃ! কী আরাম! নাহ্ এই জঞ্জালে চাবি খুঁজে পাওয়া এক অসম্ভব কাজ। নদীর কাছে ফিরে যাওয়াই ভাল।
যখন সে সত্যিই যাব-যাব করছে, ঠিক তখনই তার নজরে পড়ে গেল একটা পাথরের মূর্তির দিকে। কার মূর্তি ওটা? জঞ্জালে চাপা পড়ে আছে! চেনা যায় না। ওটা কি এই রাজবাড়ির রাজার মূর্তি? নাকি রানির? কী মনে করে ছেলেটি ছুটল সেই মূর্তির দিকে। জঞ্জালের স্তূপের ওপরে দাঁড়াল। ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করতে লাগল সেই মূর্তির। একটু করে ধুলো সরে মূর্তির গা থেকে, অমনি একটু-একটু বেরিয়ে পড়ে মূর্তির রূপ। না, না, এ রাজার মূর্তি নয়। এ মূর্তি রানিরও নয়। এ যে এক রাজকন্যার মূর্তি। ছেলেটির হাত যতই ধুলো সরায় মূর্তির, মূর্তি যেন ততই সুন্দর হয়ে ওঠে। সুন্দর, আরও সুন্দর।
দেখতে দেখতে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় ছেলেটি। তার চোখের পাতা পড়ে না। একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সেই মূর্তির দিকে। রাজকন্যার কী অপরূপ রূপের বাহার! চোখদুটি কেমন নরম! মুখে হাসি। ভারী মিষ্টি। ছেলেটি থাকতে পারে না। সে আনন্দে তালি দিয়ে চিৎকার করে শুধোয়, “রাজকন্যে, কী সুন্দর তুমি! রাজকন্যা, রাজকন্যা, তুমি সত্যি হতে পারো না, আমি যেমন সত্যি? তুমি কি পারো না কথা বলতে, আমি যেমন পারি? তুমি কি পারো না আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আমার গলাটি জড়িয়ে ধরতে? রাজকন্যা, রাজকন্যা, কে তোমায় অমন পাথর করে রেখেছে? কে সে? সে কী নিষ্ঠুর!”
কিন্তু পাথরের তৈরি সেই রাজকন্যার মুখ থেকে একটি কথাও ফুটল না। নাই ফুটুক। তবু নিজের অনেক কথাই বলে গেল ছেলেটি আপন মনে রাজকন্যাকে।
রাজবাড়ির সেই ধ্বংসস্তূপের আড়ালে-আড়ালে কত বুনোগাছ। কত বুনোফুল। ছেলেটি তুলে আনল সেই ফুল। সেই ফুলের সঙ্গে ফুল গেঁথে ছেলেটি সাজিয়ে দিল রাজকন্যাকে। নিজের হাতে। যতই সে ফুলের সাজে সাজিয়ে দেয় রাজকন্যাকে, ততই যেন আরও সুন্দর হয়, আরও, সেই রাজকন্যা। তার রূপের ছটায় ঝলসে ওঠে চারদিক। আহ্! বুঝি চোখ ফেরাতে পারে না ছেলেটি। সে সারাটাদিন সেই ধুলো-জঞ্জালে আনন্দে ঘুরপাক খায়, নয়তো রাজকন্যাকে দেখে হাসে, না-হয় নাচে। চিৎকার করে আকাশ ফাটিয়ে।
সন্ধে হয়ে এল। এবার ছেলেটিকে যেতে হবে। যেতে হবে নদীর কাছে। কিন্তু মন তার সায় দেয় না। তবু যেতে হবে। নদীকে যে বলতে হবে, সে এখনও চাবি খুঁজে পায়নি। যতদিন না সে চাবি খুঁজে পায়, ততদিন সে এখানেই থাকবে। খুঁজবে। আর রাজকন্যাকে দেখবে। যাবে না কোথাও!
হ্যাঁ, রাজকন্যাকে একা ফেলে সত্যিই সে চলে গেল নদীর কাছে। যাবার আগে পাথরের সেই রাজকন্যাকে বলে গেল, “রাজকন্যা, আজ আমি যাই। আমি আবার কাল আসব। আমি খুঁজতে এসেছি চাবি। কিন্তু খুঁজে পেয়েছি তোমাকে। তুমি আমার বন্ধু।”
বিদায় নিল ছেলেটি রাজকন্যার কাছ থেকে। সে আবার পৌঁছে গেল নদীর কাছে।
“কী, চাবি খুঁজে পেয়েছ?” জিজ্ঞেস করল নদী।
ছেলেটি আনন্দে নদীর জল দু’হাত দিয়ে তুলে ছড়িয়ে দিল দিকবিদিকে। চিৎকার করে বলে উঠল, “না নদী, চাবি আমি পাইনি। আমি খুঁজে পেয়েছি রাজকন্যাকে।”
“সে-রাজকন্যা কি পাথরের তৈরি?” জিজ্ঞেস করল নদী।
ছেলেটি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ।”
সেই কথা শুনে নদী তখন ছেলেটিকে বলল, “তবে শোনো হে আমার পথের বন্ধু, তোমার সেই চাবি ওই পাথরের তৈরি রাজকন্যার বুকের ভেতরে লুকনো আছে। সেই চাবি পেতে হলে তোমাকে ভেঙে ফেলতে হবে পাথরের তৈরি রাজকন্যার বুক।”
“না-আ-আ!” তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল ছেলেটি। “না, আমি তা পারব না। কিছুতেই পারব না। আমি চাই না চাবি।”
“তুমি চাও না দয়া-মায়া?” জিজ্ঞেস করল নদী।
“না, আমি পারব না রাজকন্যাকে আঘাত করতে, কিছুতেই না।”
“দয়া-মায়ার দরকার নেই তোমার?”
“না।”
“তোমার মা যে কাঁদেন। তোমার মায়ের কান্না ঘোচাতে রাজকন্যাকে তুমি যদি আঘাত না-করো, তবে আঘাত আমায় করতে হবে। আমি স্রোতের তোড়ে রাজকন্যার বুক দু’টুকরো করে ফেলব। আমি সেই চাবি তোমার মায়ের হাতে তুলে দেব।” বলতে বলতে নদী ছুটল। ছুটল সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে।
নদীকে বাধা দিয়ে আর্তনাদ করে ছুটল সেই ছেলেটিও।
নদীর আগেই সে পৌঁছে গেল পাথরের গড়া রাজকন্যার কাছে।
নদীও ধেয়ে এসেছে। চেঁচিয়ে উঠেছে, “সরে যাও আমার পথের ছোট্ট বন্ধু, আমি আঘাত করব রাজকন্যাকে। ওর বুকের ভেতরে লুকনো সেই চাবি উদ্ধার করে তোমার মায়ের হাতে পৌঁছে দেব।”
“না-আ-আ! আমি আঘাত করতে দেব না রাজকন্যাকে। আঘাত করতে হয়, তুমি আমাকে করো। এই আমি রাজকন্যাকে জড়িয়ে আছি, দেখি নদী তোমার কত শক্তি!”
বলতে না-বলতেই এ কী কাণ্ড! রাজকন্যাকে যেই না ছেলেটি জড়িয়ে ধরেছে, চোখের পলকে অমনি পাথরের তৈরি অমন অপরূপ রাজকন্যা ঝরে পড়ল ধুলোর মতো ঝুরঝুর করে। মিশে গেল ধ্বংসস্তূপের জঞ্জালের সঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে দু’চোখ উপচে জল গড়িয়ে পড়ল ছেলেটির। সে-ও লুটিয়ে পড়ল জঞ্জালে।
না, আঘাত করল না নদী। নদী তার শান্ত স্রোতের দোলায় ছেলেটিকে তুলে নিল। আদর করল ঢেউয়ের দোলনায়। তারপর ছেলেটির কানে কানে বলল, “বন্ধু, তোমার এই চোখের জলের সঙ্গে সঙ্গে তোমার বুকের বন্ধ চাবি খুলে গেছে। তুমি ফিরে পেয়েছ দয়া, মায়া সব। আর মা তোমার জন্যে দুঃখ পাবেন না। আর মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়াবে না। আজ তুমি দয়াবান। চলো, তোমায় মায়ের কাছে পৌঁছে দিই।” বলতে বলতে নদী উজানে বয়ে চলল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন