শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট কুকুরছানাটা এধার-ওধার দেখছিল।
কী দেখছিল?
ঘাস দেখছিল। গাছ দেখছিল। পাখি দেখছিল। পাখির নাচ দেখছিল। গোরু দেখছিল। ঘোড়া দেখছিল। হাঁস দেখছিল। হাঁসের ছানা দেখছিল। দেখতে দেখতে ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে মন বলল: “যাই, হাঁসছানাদের সঙ্গে ভাব করিগে যাই।”
ছোট্ট কুকুরছানাটা দৌড় দিল। মা-হাঁসকে ডাকল:
“কী গো হাঁসগিন্নি, কী করছ?”
প্যাঁক-প্যাঁক করে ডেকে উঠল হাঁসগিন্নি। বলল: “ছানা গুনছি। একটাকে খুঁজে পাচ্ছি না:।
এ্যাঁক আর এ্যাঁকে দুই
কলাপাতায় শুই।
দুই আর এ্যাঁকে তিন
পা করে ঝিনঝিন।
তিন আর এ্যাঁকে চার
গুনছি বারবার।
পাই না খুঁজে পাঁচকে
কোথায় গেল সেই ছানাটা
করতে পারো আঁচ কে?”
কুকুরছানাটা জিজ্ঞেস করল, “কত বড় সেটা?”
হাঁস-মা বলল, “সবচেয়ে ছোট, ছুটকো।”
“দাঁড়াও, আমি খুঁজে দিচ্ছি!” বলে কুকুরছানাটা ছুটল।
ছুটতে ছুটতে কুকুরছানাটার সামনে পড়ল একটা গোরু। গোরু বললে, “কী রে কুক্কু, ছুটছিস কোথায়?”
“হাঁস-মায়ের পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা হারিয়ে গেছে।”
“তা, তুই কোথা যাচ্ছিস?”
কুকুরটা ছুটতে ছুটতে বলল, “তাকে খুঁজতে যাচ্ছি।”
ছুটতে ছুটতে কুকুরছানা ঘোড়ামশাই-এর সামনে পড়ল। ঘোড়া বললে, “কী রে কুক্কু, কোথায় ছুটছিস?”
“হাঁসগিন্নির পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা হারিয়ে গেছে।”
ঘোড়া বলল, “থাকলেই হারায়। তা তুই যাস কোথা?”
কুকুরছানা বলল, “তাকে খুঁজতে যাচ্ছি” বলেই ছুটল।
ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়ায় কেন কুকুরছানা!
চোখ পড়ে যায় খড়ের গাদায়।
ওটা যেন কী নড়ছে খড়ের গাদায়!
ওটা যেন কী একটা উঁকি মারছে টুকি দিয়ে!
ওমা! ওই তো! ওইটাই তো পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা। কুকুরছানা ছুটে গেল হাঁসের দিকে।
ঘেউ ঘেউ করে ডাক ছাড়ল। বলল, “চলো, মায়ের কাছে!”
হাঁসছানা যায় গুটিগুটি মায়ের কাছে, কাকুরছানা আগলে রাখে, পালায় পাছে।
কুকুরছানা হাঁসগিন্নির কাছে হাঁসছানাকে পৌঁছে দিল। হাঁসগিন্নি বলল, “তুই তো ভারী লক্ষ্মী কুক্কু।”
কুক্কু বলল, “আজ থেকে তোমার ছানার আমি দেখাশোনা করব। ছানার সঙ্গে খেলাধুলো করব। ছানাকে গান শোনাব”!
একদিন কী হল হাঁসছানাটা কুকুরছানার চোখকে ফাঁকি দিল। ছুটল।
ছুটতে ছুটতে করেছে কী, পুকুরপাড়ে হাজির হয়েছে।
কুকুরছানা তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।
এদিক যায়, ওদিক যায়, হায় রে! হাঁসছানা কোথাও নাই। এধার দ্যাখে, ওধার দ্যাখে। দেখতে দেখতে চমকে ওঠে। দ্যাখে কী হাঁসছানাটা পুকুরপাড়ে।
যেই না দ্যাখা, অমনি ছোটা। ছুটতে ছুটতে হাঁক ছাড়ে, “এই পাঁচ নম্বর, ইদিক আয়! মা ডাকছে।”
শুনছে কে! হাঁসছানার বয়েই গেছে।
ছুটতে ছুটতে কাছে এসে যেই না কুক্কু হাঁসছানাকে ধরতে গেছে, অমনি জলে ঝপাং!
হাঁসছানাটা জলে ডুব মারল।
কুকুরছানাটার বুক শুকিয়ে গেল। ভাবলে বুঝি পাঁচনম্বর ডুবে গেল।
ছুটল কুক্কু হাঁসমায়ের কাছে।
রাস্তায় দেখতে পেল ঘোড়ামশাইকে।
ঘোড়ামশাই ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল:

“কী রে কুক্কু, অমন হাঁকপাকিয়ে কোথায় যাস?”
কুক্কু বলল, “ঘোড়ামশাই, ঘোড়ামশাই, পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা পুকুরে ডুবে গেছে। ওকে বাঁচাবে চলো না!”
ঘোড়ামশাই হেসে উঠল, চিঁহিঁ-হিঁ!
কুকুরছানাটা ভাবল, তাই তো কী হল! ঘোড়ামশাই হাসেন কেন!
কুকুরছানাটা দাঁড়াল না। আবার ছুটল।
ঝুঁটি-ঝটপট মোরগের সঙ্গে দেখা হল।
“মোরগমশাই, মোরগমশাই, পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা ডুবে গেছে।”
“তাতে তোর কী? কঁক-কঁক।”
“ওকে বাঁচাবে চলো না!”
মোরগমশাই কথার উত্তর না দিয়ে কোঁকর-কোঁ বলে হেসে উঠল!
কুকুরছানাটা ভ্যাবচাকা খেয়ে গেল। হাসে কেন সবাই।
তারপর হাঁসগিন্নির মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল।
“হাঁসগিন্নি, গিন্নিমা, তোমার পাঁচ নম্বর ছানা, পুকুরে ডুবে গেছে! তুমি জলদি জলদি এসো! দেখি, আমি বাঁচাতে পারি কি না!” বলে, কুকুরছানা ছুটল।
হাঁসগিন্নি হাসল।
ছুটতে ছুটতে কুকুরছানা পুকুরপাড়ে হাজির।
চমকে তাকায় পুকুরজলে।
তার অবাক চোখ। দেখে আর দেখে।
কী কাণ্ড, পাঁচ নম্বর হাঁসছানাটা ডোবেনি তো!
তবে?
জলে জলে সাঁতার কাটছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক দেখছে, ওদিক দেখছে। কী খুশি।
কুক্কুছানা তক্ষুনি বলে উঠল, “ওহো, বুঝতে পেরেছি!”
“কী বুঝতে পেরেছ?”
“হাঁসছানারা সাঁতার জানে।”
তারপর কুক্কুছানা নিজেও হেসে উঠল, “ঘেউ-উ-উ।”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন