পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি

শৈলেন ঘোষ

আজ আবার কী হল রাজা কাক্কাবোক্কার? ঘুম থেকে উঠেই মুখখানা অমন ভোঁতা হয়ে গেল কেন তাঁর? মাথার ভেতর আবার কোনও ফন্দিফিকির উঁকি মারছে নাকি? বলা যায় না। বিশেষ করে মাথাটা যখন রাজা কাক্কাবোক্কার। কখন মাথা যে তাঁর উদ্ভট ভাবনায় উথলে উঠবে, কেউ জানে না। এক্ষুনি তিনি যদি বলেন, “বন থেকে একটা জ্যান্ত বাঘ ধরে আনো, আমি বাঘের পিঠে বসে হাওয়া খাব”—তবে তুমি গেছ! সে হুকুম তামিল না-করে নিস্তার আছে! আরে বাবা বন থেকে জ্যান্ত বাঘ ধরে আনা কি মুখের কথা! একবার জ্যান্ত বাঘের সামনে যাও দেখি, দেখি কেমন তোমার বুকের পাটা! মারবে লাফ। পড়বে ঘাড়ে। খপাত করে ধরে কড়মড় করে মুন্ডুটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! বাঘের সঙ্গে চালাকি নয়! হুঁ-হুঁ বাবা!

যাক গে যাক, বাঘের কথা ছেড়ে দাও। এখন কীসের জন্যে রাজা কাক্কাবোক্কার মুখখানা এমন ভোঁতা হয়ে আছে, সেইটাই জানার কথা। কিন্তু মুশকিল কী, তিনি নিজের মুখে যতক্ষণ না সে-কথাটি বলছেন, ততক্ষণ তোমায় হাঁ করে বসে থাকতে হবে। জিজ্ঞেস করলেই এমন ফোঁস করে উঠবেন, তুমি পালাতে পথ পাবে না।

তা, কতক্ষণ আর হাঁ করে বসে থাকবে তুমি? রাজার ভোঁতা মুখ আর বেশিক্ষণ থোঁতা হয়ে থাকলে রাজ্যপাট যে লাটে উঠবে, সে কে না জানে। সুতরাং ডাক ডাক মন্ত্রীমশাইকে। এই দ্যাখো, আবার বুঝি গাড্ডায় পড়েন মন্ত্রীমশাই। সত্যি, লোকটারও নাকালের শেষ নেই। যত ঝক্কি কি তাঁর ঘাড়ে!

ছুটে এলেন মন্ত্রীমশাই। রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবং তিনি দাঁড়াতেই রাজার চক্ষু কটমট করে উঠল তাঁকে দেখে। মন্ত্রীমশাই রাজার সেই ভয়ংকর চক্ষু আড়চোখে দেখেই ঝট করে নিজের চোখ ঘুরিয়ে দিলেন। বাব্বা, কে কথা বলবে সে-চোখ দেখে! কথা বলা যায় না বলেই মন্ত্রীমশাই স্পিকটি নট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু তাঁকে দাঁড়াতে দিচ্ছে কে! আচমকা রাজা কাক্কাবোক্কা ঝলসে উঠে ধমক মারলেন, “আপনার চোখে কি ছানি পড়েছে?”

রাজার মুখে হঠাৎ এমন একটা কড়কানি শুনলে, কার না ভড়কানি লাগে! মন্ত্রীমশাই এমনিতেই তো রাজার চক্ষু দেখে ভড়কে ছিলেন। সুতরাং আশা করা গেছল, তিনি আরও কিছুক্ষণ নির্বাক থাকবেন। রাজার রাগ যতক্ষণ না পড়ছে, ততক্ষণ তিনি কথাই বলবেন না। তা নয়, তিনি মুখ ফসকালেন। মুখ ফসকে বলে ফেললেন, “ছানি পড়লেই বা দেখছে কে? যে রাজা সকাল থেকে ঝুটমুট মুখ ভোঁতা করে ঘরের কোণে বসে থাকেন, তাঁর সময় কোথায় কার চোখে ছানি পড়েছে, না-পড়েছে দেখার?”

ব্যাস! মৌচাকে ঢিল পড়ল। রাজা কাক্কাবোক্কা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, “কী, আমি ঝুটমুট মুখ ভোঁতা করে ঘরের কোণে বসে আছি? তার মানে আমি ঘরকুনো? আমি ঠুঁটো? আমি অকম্মা? ফাঁকিবাজ? আমি কাউকে দেখি না? আপনার আস্পদ্দা তো কম নয় মশাই! দিনকের-দিন আপনি পেয়ে বসছেন! কী ভেবেছেন আমাকে?”

মন্ত্রীমশায়ের উচিত ছিল এরপর আর কথা না-বাড়ানো। এখন বরং তিনি জিজ্ঞেস করতেই পারতেন, “মহারাজ, আপনার মন খারাপের কারণ কী? আপনি কি ঘুমের ঘোরে কোনও অলক্ষুনে স্বপ্ন দেখেছেন?” তা নয়, তিনি ঠেস দিয়ে বলে বসলেন, “আমি এক বললে, আপনি আর-এক ঠাউরে বসেন। আমি কথা বলব কী, বলার আগেই আপনি চোটপাট শুরু করে দেন। আপনি বড্ড হাঁ—” কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। থতমত খেয়ে জিব কেটে ফেললেন।

“কী মশাই, থামলেন কেন?” রাজা কাক্কাবোক্কা ট্যারা চোখে মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন, “আমি বড্ড ‘হাঁ’ মানে? মনে করছেন আপনি কী বলতে চান আমি বুঝতে পারিনি? আমাকে হাঁদা বলা হচ্ছে!”

মন্ত্রীমশাই এবার সত্যিই ধরা পড়ে গেলেন। সুতরাং বাঁচবার জন্যে তিনি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন, “আমি মহারাজকে এমন কথা বলতে পারি? আমি কি এতই নিরেট!”

“তবে আপনি কী বলতে গিয়ে থমকে গেলেন?” রাজা গর্জে উঠলেন।

“সে একটা কথা।” মন্ত্রী উত্তর দিলেন।

রাজাও নট ছাড়ান-ছোড়ন, “সে একটা কথা মানে?”

মন্ত্রীমশাই আবার বিপদ ডাকলেন, বললেন, “সে একটা কথা মানে, সে একটা কথা। সব কথা সব সময় সবাইকে বলা যায় না।”

মন্ত্রীর কথা শুনে রাজার চোখ কটমট করে উঠল। তিনিও ছাড়বার পাত্র নন। তিনি নাছোড়বান্দা। জেদ ধরলেন, “আপনি যাবেন কোথায়! আপনাকে বলতেই হবে। রাজাকে উত্তর দিতে আপনি বাধ্য। যদি উত্তর না-দেন—”

রাজার কথা শেষ না-করতে দিয়ে মন্ত্রীমশাই চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমার চাকরিটা খাবেন না মহারাজ।”

রাজা হাসলেন বেঁকা ঠোঁটে। তারপর একটা ভয়ানক কথা বললেন, “চাকরি খাওয়া তো একটা তুচ্ছ ব্যাপার। চাকরি তো আমি যখন-তখন খেতে পারি। আপনার চাকরি আমি খাব না। আপনাকে বিক্রি করে দেব!”

মন্ত্রীমশাই ভয়ে আঁতকে উঠলেন, “মানে?”

“মানে, আপনাকে আলুর দরে বাজারে বেচে দেব!”

রাজা কাক্কাবোক্কার মুখে এমন একটা বুক কাঁপানো কথা শোনার জন্যে মন্ত্রীমশাই একেবারেই তৈরি ছিলেন না। তাই রাজার মুখ থেকে ওই সর্বনেশে কথাটি শোনামাত্রই তিনি বলে উঠলেন, “মন্ত্রী হিসেবে আমার যেটুকু জানা আছে, আমি রাজি না-থাকলে আমাকে বেচে দেওয়ার অধিকারই আপনার নেই।”

রাজা কাক্কাবোক্কাও তেমনই গলা চড়িয়ে উত্তর দিলেন, “রাজা হিসেবে আমার যেটুকু জানা আছে, আমার হুকুমই আমার আইন। সেই আইন অনুযায়ী আপনাকে বেচবার অধিকার আমার আছে।”

“ঠিক আছে, আমিও দেখে নেব।” বেশ রেগেমেগেই মন্ত্রী উত্তর দিলেন।

রাগে রাজা কাক্কাবোক্কার মাথার চাঁদি গরম। তিনি হুংকার দিলেন, “দেখে নেব মানে? আপনি আমাকে হাঁদাও বলবেন, আবার দেখে নেব বলে চোখও রাঙাবেন?”

মন্ত্রীমশাই রাজার গলার ওপর গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, “আমি আপনাকে হাঁদা বলিনি।”

“তবে কী বলেছেন? আমি বড্ড ‘হাঁ’ বলে কী বলতে চেয়েছেন? জানেন, কাল সারারাত আমি একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি! জানেন, কাল সারারাত আমি পিঠ চুলকে মরেছি। চুলকানির ঠেলায় রাজার যদি সারারাত ঘুম না-হয় তো তার জন্যে দায়ী কে? আপনাকে মন্ত্রী করা হয়েছে কেন? এটা দেখার দায়িত্ব কি আপনার নয়?” রাজা চোখ পাকালেন।

মন্ত্রীমশাই জবাব দিলেন, “আজ্ঞে মহারাজ, কার কোথায়, কখন পিঠ চুলকোবে, ঘাড় টনটন করবে, কি পেট কামড়াবে, তার খবর আমি কী করে রাখি বলুন?”

রাজা তড়পে উঠলেন, “কার কোথায় মানে? আমি রাজা আমার শরীরের খবর আপনি রাখবেন না? রাজার পিঠ চুলকোয় কেন, রাজবাড়িতে চুলকানি ঢোকে কেন, এসব কাজের তদারকি করার দায়িত্ব কি মন্ত্রীর নয়? যাক গে, আমি আর আপনার সঙ্গে বেশি বকবক করতে চাই না। আমি চাই, পিঠ চুলকোতে চুলকোতে সারারাত আমায় আর না ছটফট করতে হয়। তার ব্যবস্থা আজই আপনাকে করতে হবে। এখন আপনি আসতে পারেন।”

মন্ত্রীমশাই চলেই যাচ্ছিলেন কিন্তু রাজা কাক্কাবোক্কা হাঁক দিলেন, “আর শুনুন, ভবিষ্যতে আমার পিঠ যাতে আর না চুলকোয় তা-ও আপনাকে দেখতে হবে, যান!”

এ তো আচ্ছা ঝামেলায় পড়লেন মন্ত্রীমশাই। আরে বাবা, ভবিষ্যতে রাজার পিঠ যে আর কোনওদিন চুলকোবে না, এ-কথা কি কেউ হলপ করে বলতে পারে! পিঠ থাকলেই পিঠ চুলকোয়। তা সে রাজার পিঠই হোক, কি একটা ভেড়ার পিঠ। রাজার পিঠ বলে আলাদা কিছু আছে নাকি! তা ধরো, একটা ফুসকুড়ি, সে গোরুর পিঠেও হতে পারে, রাজার পিঠেও হতে পারে। তা, ফুসকুড়ি হলে না-চুলকে থাকতে পারবে? হোক না ঘামাচি। দেখি, কেমন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারো! মশা আর ছারপোকার কথা ছেড়েই দাও! একটা খুদে পিঁপড়ের কি কম ক্ষমতা? ওরা ওসব রাজা-টাজার থোড়াই তোয়াক্কা করে। ভবিষ্যতে এদের হামলা থেকে রাজার পিঠ সামলানোর ঝক্কি কেউ নিতে পারে? তা সে-কথা কে বলবে রাজাকে! অগত্যা মন্ত্রীর ঘাড়েই চাপল সেই ঝক্কি। এ যে সেই, সব খোকাকে ছেড়ে এবার ধেড়ে খোকাকেই ধর।

তো, ধেড়ে খোকা মানে মন্ত্রীমশাই। এখন তিনি যারপরনাই বিপদে পড়েছেন। এ-যাত্রায় রাজার হাত থেকে কেমন করে নিষ্কৃতি পাবেন সেই ভাবনায় অস্থির হলেন। বটেই তো, বার বার আর কত নাকাল হবেন মানুষটা রাজার হাতে। না, এবার একটা হেস্তনেস্ত না-করলেই নয়। আরে বাবা, পিঠ তোমার। সে-পিঠ চুলকোলে তাতে মন্ত্রীর কী দোষ! আচ্ছা বলো, একে কি গায়ে পড়ে ঝগড়া করা বলে না? এমন কুঁদুলে রাজা জন্মে দেখিনি বাবা!

তা, খবরটা যখন রাজার পিঠ চুলকোনোর, তখন সে-খবর কি-আর চাপা থাকে! মস্ত রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে কানাঘুসো শুরু হয়ে গেল। হয়ছে কী, রাজবাড়ির যে রসুইকর তার ছিল এক ছেলে। রাজবাড়ির কোপ্তাকালিয়া খেয়ে বাবা যেমন হোঁতকা-কেঁদো, ছেলেও তেমনি হোঁদল কুতকুত। কতই বা বয়েস হবে, মেরে কেটে নয় কি দশ। তো, রাজবাড়িতে থেকেই হোক, কি ভাল-মন্দ খেয়েই হোক, ছেলেটার পেটে পেটে দুষ্টবুদ্ধি সবসময়ে ভুড়ভুড়ি কাটত। সে রাজাকে প্রায়ই দেখত। আর যতই দেখত ততই ভাবত, আহা রে, একবার যদি রাজার—না, সে কী ভাবত, সে-কথা কাউকে ঘুণাক্ষরেও বলত না। বলা যায় না। কারণ, মুখ উপচে সে-কথা একবার উথলে পড়লে আর দেখতে হবে না, হুলুস্থূল কাণ্ড বেধে যাবে। কাজেই যেদিন সে শুনল রাজার পিঠে চুলকানি হয়েছে আর সেই চুলকানি সারাবার জন্যে মন্ত্রীমশাই নাকানি-চোবানি খাচ্ছেন, তখন সে ভাবল, এই তাল। সে চুপি চুপি মন্ত্রীমশায়ের ডেরায় গেল। ডাক দিল, “মন্ত্রীমশাই, মন্ত্রীমশাই, ঘরে আছেন নাকি!”

মন্ত্রীমশাই সাড়া দিলেন, “কে করছে ডাকাডাকি?”

রসুইকরের ছেলে উত্তর দিল:

“আমি আজ্ঞে আমি, রসুইকরের ছেলে,

আমার নাম কালোবরণ, সবাই ডাকে কেলে।”

মন্ত্রীমশাই বেরিয়ে এলেন। টেরিয়ে দেখলেন। তারপর গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী তোর নাম বললি, কেলে?”

“আজ্ঞা।”

“তুই তো আচ্ছা পাজি ছেলে।”

ছেলেটা উত্তর দিল, “আজ্ঞা হুজুর, আমি পাজি হতে যাব কোন কারণে? আমি একটা কাজে রাজি বলেই, আপনার কাছে হাজির হয়েছি।”

“কী কাজ?”

ছেলেটা বলল, “আজ্ঞা, শুন্‌নু রাজামশায়ের পিঠে চুলকানি হয়েছে। ভাল হচ্ছে না। তাই—”

ছেলেটার কথা শেষ করতে না-দিয়েই মন্ত্রীমশাই বললেন, “কথাটা তোর কানেও গেছে?”

ছেলেটার উত্তর দিতে তর সইল না। বলল, “আজ্ঞা, কান আছে, তাই গেছে।”

মন্ত্রীমশাই থমকে গেলেন। বললেন, “তুই তো ভারী ডেঁপো। তোর কান মলে দিলে কথাটা আর কানে যাবে না।”

ছেলেটাও ছাড়বার পাত্তর নয়। বলল, “আজ্ঞা, কান মলতে চান মলুন। কিন্তু তাতে রাজামশায়ের চুলকানি তো আর ভাল হচ্ছে না।”

মন্ত্রীমশাই চটিতং, “দেখি তোর কোনও ভয়ডর নেই। সমানে মুখে খই ফুটছে। ফুক্কুড়ি, না?”

“আজ্ঞে ফুক্কুড়ি করব কেনে? আমাকে রাজামশায়ের কাছে নিয়ে চলেন। আমি কথা দিচ্ছি, আমি রাজামশায়ের চুলকানি ভাল করে দেব।”

মন্ত্রীমশাই থতমত খেয়ে গেলেন। যাবারই কথা। কেননা, রাজার পিঠের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি কূল-কিনারা কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কাজেই ছেলেটার হঠাৎ এমন একটা কথা শুনে তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন, কী বলে ছেলেটা! অবশ্য বেশিক্ষণ তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন না। গলার স্বরটা ননির মতো নরম করে বললেন, “কেমন করে পারবি?”

ছেলেটা উত্তর দিল, “আমি কেমন করে পারব, সেই কথাটি আগেই কেন বলব?”

“যদি না পারিস?” জিজ্ঞেস করলেন মন্ত্রীমশাই।

“না পারলে আপনারা তো আর ছেড়ে দেবেন না আমাকে। যা মনে হয় শাস্তি দেবেন।”

মন্ত্রীমশাই খানিক দোনোমনো করলেন। তারপর কী মনে হল, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা শিকেয় তুলে ঝট করে রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, যা থাকে কুলকপালে, একটা চেষ্টা করে দেখাই যাক না। অবশ্য ছেলেটাকে বলতে ভুললেন না, “দেখিস বাবা, পথে বসাস না!”

তা, শেষমেশ রসুইকরের সেই ছেলে কালোবরণকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রীমশাই রাজা কাক্কাবোক্কার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাজা কিছু বলার আগেই মন্ত্রীমশাই গড়গড় করে বলে গেলেন, “এই যে ছেলেটিকে আপনার সামনে হাজির করেছি, এ রাজবাড়ির রসুইকরের ছেলে, নাম কালোবরণ, ওরফে কেলে। ছেলেটি আপনার চুলকানির খবর পেয়ে আমার ডেরায় এসে বলল, সুযোগ দিলে সে আপনার চুলকানি ভাল করে দিতে পারবে। সেই ইচ্ছা জানিয়ে আপনার কাছে আসার জন্য আমাকে ধরাধরি করায় আমি তাকে আপনার সম্মুখে নিয়ে এসেছি।”

মন্ত্রীমশাই থামলে রাজা কাক্কাবোক্কা খেঁকিয়ে উঠলেন, “আপনি কি মশাই পাঠশালার পড়া মুখস্থ বলছেন? গড় গড় করে কী যে বললেন ছাই কিছুই বুঝলুম না।”

রাজার কথা শুনে কালোবরণ তখন রাজাকে সাষ্টাঙ্গে পেন্নাম করে বলল, “যা বলেছেন মহারাজ। মন্ত্রীমশায়ের হুড়মুড় করে কথা বলার ধরন দেখে আমার এমন হাসি পাচ্ছে। আমি ভারী কষ্ট করে হাসি সামলে রেখেছি। শুনেছি, রাজার সামনে হাসতে নেই। রাগ করেন। অথচ না-হেসে আমি ভেতরে ভেতরে ভীষণ কোঁকাচ্ছি। মহারাজ, আপনি যদি অপরাধ না নেন, আমি কি একটু হেসে নেব?”

“না-আ-আ।” রাজা কাক্কাবোক্কা রেগে গর্জন করে উঠলেন, “মাথাটা দেব ঠুকে দেওয়ালে! রাজার সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় জানিস না? বাচাল কোথাকার!”

তো, কালোবরণও তেমনই ত্যাঁদড়। রাজামশায়ের ধমকানি খেয়ে একটুও ভয় পেল না। বলে উঠল, “ভাল রে, ভাল! এলুম মহারাজের চুলকানি সারাতে, এসে খেলুম তাড়া! দরকার নেই বাবা! ও মন্ত্রীমশাই, আমি চলি!”

মন্ত্রীমশাই ঘাবড়ে গিয়ে ছেলেটাকে জাপটে ধরলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন, “যাবি কোথায়? দাঁড়া!” তারপর রাজাকে বললেন, “মহারাজ, ছেলেটা নেহাতই কুঁচো। কিন্তু মহারাজ, কুঁচো হলেও কাঁচা নয়।”

রাজা তেমনই গলা চড়িয়ে উত্তর দিলেন, “কাঁচা, কি ডাঁসা, সে আমার দেখবার দরকার নেই। চুলকানি সারাতে এসে তাই বলে রাজার সামনে হাসতে চাইবে ওই পুঁচকে!”

“যাক গে, যাক গে, যা হবার হয়ে গেছে। এখন যা করার ছেলেটাকে করতে দিন।” মন্ত্রীমশাই খুবই নরম গলায় রাজাকে অনুরোধ করলেন। তারপর ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এবার কী করতে হবে বাপধন?”

কালোবরণ উত্তর দিলেন, “মন্ত্রীমশাই, এবার আপনাকে এখান থেকে যেতে হবে। পাঁচজনের সামনে আমার যা করার তা করা যাবে না।”

“বেশ, আমি যাচ্ছি,” বলে মন্ত্রীমশাই সেখান থেকে চলে গেলেন।

মন্ত্রীমশাই চলে গেলে কালোবরণ রাজার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনার ইজের আছে, মহারাজ?”

রাজা কাক্কাবোক্কা চমকে উঠলেন, “ইজের! ইজের কী হবে?”

কালোবরণ উত্তর দিল, “আপনার গায়ের সমস্ত জামাকাপড় খুলে ফেলতে হবে। পরতে হবে ইজেরটি। কারণ, আপনার পিঠের চুলকানি শরীরের অন্য কোথাও গেড়ে বসেছে কিনা সেটাও তো দেখতে হবে! চুলকানি ভারী বেয়াড়া রোগ। শরীরের কোন জায়গাটিতে লুকিয়ে বসে সে যে জ্বালাতন করবে, কেউ জানে না। সুতরাং মহারাজ, আপনার আগাপাছতলা ঝেড়ে তাকে নিকেশ করতে হবে।”

অগত্যা রাজা কাক্কাবোক্কা সত্যি-সত্যি রাজপোশাক খুলে, ইজের পরে, আদুল গায়ে কালোবরণের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কালোবরণ ইজের পরা রাজার সেই নাদুস-নুদুস মূর্তিটি দেখে আর একটু হলেই হেসে ফেলেছিল। রক্ষে খুব সামলে গেছে। নিজেকে সামলে রাজাকে বলল, “এবার মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন মহারাজ!”

মহারাজ বাধ্য ছেলের মতো মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন।

কালোবরণ ঢেঁকির ওপর বসার মতো রাজার পিঠের ওপর বসে পড়ল। তারপর দুই হাতের নখ দিয়ে হাঁচড়-পাঁচড় করে রাজার পিঠ চুলকোতে লাগল।

রাজার তখন আরাম দেখে কে! রাজা ‘আ-উ, হা-উ, বাহ্-বাহ্, আ-হা, আ-হা’ করে মুখে আয়েশের শব্দ করতে লাগলেন।

কালোবরণ জিজ্ঞেস করল, “মহারাজ, ভাল লাগছে?”

মহারাজ উত্তর দিলেন, “ভারী আরাম লাগছে।”

কালোবরণ বলল, “এবার মহারাজ আমাকে পিঠে নিয়ে আপনাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। আমি আপনার পিঠ জড়িয়ে ধরছি, আপনি উঠে পড়ুন।”

হ্যাঁ, যেমন বলা তেমন কাজ, রাজা কাক্কাবোক্কা কালোবরণকে পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

কালোবরণ রাজার পিঠে বসে চিৎকার করে উঠল, “মন্ত্র বলুন মহারাজ।”

“কী মন্ত্র?” রাজাও চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি বলছি, আপনি আউড়ান,” বলে কালোবরণ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল আর রাজা আউড়ে আউড়ে লাফাতে লাগলেন:

ভাজা লুচি ফুলকো,

খুব কষে চুলকো।

দুমদাম পটকা,

হরদম চটকা।

যা না পাজি সটকে,

না তো দেব পটকে।

পাবি মজা তখনই,

কেটে পড় এখনই।

ঘরের ভেতরে মন্ত্রের হাঁকাহাঁকি আর রাজার লাফালাফির গণ্ডগোল সে কি আর চাপা থাকে! যে যেখানে ছিল কাজকম্ম ফেলে ছুটে এল। এ কীরে! তারা দেখে, শুধুমাত্র একটা ইজের পরেছেন রাজা। খালি গা। রসুইকরের ছেলেকে পিঠে নিয়ে রাজা মন্ত্র পড়ছেন আর লাফাচ্ছেন। আর নাদুস-নুদুস ছেলেটা রাজার পিঠে চড়ে দিব্যি মুচকি মুচকি হাসছে! তা, অমন দৃশ্য দেখলে কতক্ষণই বা অন্য মানুষ না-হেসে থাকতে পারে! সুতরাং শুরু হয়ে গেল হাসাহাসি। প্রথমে ফিকফিক করে শুরু হল। তারপর হি-হি, হো-হো, হা-হা করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সেই হাসি। তা সে-হাসির রেশ কি আর রানির কানে পৌঁছতে সময় নেয়! ছুটে এসেছেন রানি। তিনি পর্যন্ত রাজার কাণ্ড দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হেসে ফেললেন, হি-হি-হি।

ব্যাস! রানির হাসির শব্দ রাজার কানে যেতেই রাজা ফুস-স-স। ফোলা বেলুন যেন চুপসে গেল! কোথায় তাঁর লাফালাফি, কোথায় তাঁর মন্ত্র পড়া। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন রাজা। চমকে লাফিয়ে পড়ল ছেলেটা রাজার পিঠ থেকে। মারল ছুট। কোথায় যে ভিড়ের ফাঁক দিয়ে কেটে পড়ল আর দেখা গেল না। অবাক বটে কাণ্ড সেই ছেলের! সেদিকে আর খেয়াল নেই রাজার। লজ্জায় তাঁর মাথা হেঁট। আদুল গায়ে, এই ইজের পরে আর দাঁড়ানো যায় রানির সামনে! তিনি আর কিছু ভেবে না-পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “আমার চুলকানি ভাল হয়ে গেছে, ভাল হয়ে গেছে”, বলে তিনিও দিলেন ছুট। সটান তাঁর সাজঘরে। সাজঘরে তিনি অনেকক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে হাঁপালেন। তারপর মনে মনে ভাবলেন, “রানি দেখল তো বড় বয়েই গেল। আমার চুলকানি তো ভাল হয়ে গেছে!”

মন্ত্রীমশাই তো দেখেশুনে থ। এ তো বড় আশ্চর্য ঘটনা! রসুইকরের ছেলেকে পিঠে নিয়ে রাজা লাফিয়ে লাফিয়ে নাচেন! ছেলেটা চড়ল কেমন করে রাজার পিঠে! ছেলেটা কি জাদু জানে? ছুটলেন মন্ত্রী ছেলেটার খোঁজে। অবশ্য তাকে খুঁজতে হল না। তাদের ঘরেই তাকে পেয়ে গেলেন মন্ত্রীমশাই। জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাপার কীরে? রাজার পিঠে চড়লি কেমন করে?”

ছেলেটা উত্তর দিল, “ব্যাপারটা অন্য কিছু নয় মন্ত্রীমশাই। আমি যখনই রাজামশাইকে দেখতুম, আমার মনে হত, রাজামশায়ের পিঠটি বেশ ঢোসকা পারা। আহা রে, কোনওদিন যদি ওই পিঠে চড়তে পারি! তা, কে না জানে, এমন কথা ভাবাই সার! কার সাধ্যি রাজার পিঠে চড়ে! কিন্তু যখন শুনলুম, রাজার পিঠে চুলকানি হয়েছে, ভাল হচ্ছে না, তখন ভাবলুম, এই একটা সুযোগ এসেছে। দেখি, সুযোগটা কাজে লাগে কি না। তা, লেগে গেল। তবে আপনাকে বলব কী, পিঠ বটে রাজার, একেবারে রেশমের মতো তুলতুলে। চড়ে কী আরাম।”

মন্ত্রীমশাই কালোবরণের কথা শুনে হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “সাংঘাতিক বিচ্ছু তো তুই।”

কালোবরণও হেসে ফেলল।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%