শৈলেন ঘোষ

রাজা কাক্কাবোক্কা একটি মাছি ধরেছেন।
মাছি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
রাজবাড়িতে মাছি! চারদিকে এত পাহারাদার, সান্ত্রি, সেপাই, তাদের সকলের চোখে ধুলো দিয়ে রাজবাড়িতে মাছি ঢোকে কেমন করে! এ তো এক ভয়ংকর ঘটনা। আজ একটা ঢুকেছে, কাল দুটো ঢুকবে। পরশু হাজার হাজার মাছি ঢুকে যে তুলকালাম শুরু করে দেবে না, সে কথা কে বলতে পারে। চাই কী, রাজার সিংহাসনটা পর্যন্ত মাছিরা দখল করে নিলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। ঠিক আছে, তুমি সকলকে ফাঁকি দিয়ে রাজপ্রাসাদে ঢুকেছ, বেশ করেছ। কিন্তু তুমি কী বলে সটান রাজার নাকে গিয়ে বসলে! নাকের গর্তে মুখ সেঁদিয়ে খোঁটাখুঁটি করাটা যে ভীষণ রকমের বেআদপি কাজ, এ কি তোমার জানা নেই! নিদেন গোঁফের ওপর বসলেও কথা ছিল। যদিও রাজার গোঁফের ওপর বসে মাছির নাচানাচি করাটাও খুব একটা সম্মানজনক ব্যাপার নয়। হুঁ হুঁ বাবা-তিনিও কমতি যান না। তুমি মাছি, তিনি রাজা। তিনি নাকের ওপর মারলেন এক ঝটকা। খপাত! মাছি রাজার হাতের মুঠোয়। যাকে বলে বন্দি। এবার?
এবারই তো লাগ বঙাবঙ। ডাকো সেনাপতিকে। সেনাপতি পড়িমরি করে ছুটে এলেন। রাজা কাক্কাবোক্কা কটমট করে তার মুখের দিকে দেখলেন। তারপর নিজের বাঁ হাতের মুঠি তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, “টোক্কা, না ফক্কা?”
সেনাপতি বোকার মতো রাজার বাঁ হাতের মুঠির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কোঁত পাড়তে লাগলেন।
“আমার কথার উত্তর নেই কেন?” ধমকে উঠলেন রাজা।
সেনাপতি ভয়ে ভয়ে মুখ ফসকে বলে ফেললেন, “আজ্ঞে ফক্কা!”
“আপনার মুন্ডু।” কাক্কাবোক্কার গলায় যেন মেঘ ডাকল, “আপনার চাকরিও ফক্কা!”
চমকে উঠলেন সেনাপতি, “আজ্ঞে!”
“আপনার চাকরি ফক্কা—খতম!”
“আজ্ঞে, আমি তো কাজে কোনও গাফিলতি করিনি।” সেনাপতি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল।
“কে বলল আপনি গাফিলতি করেননি? আপনি যে গাফিলতি করেছেন, তার প্রমাণ আমার এই হাতের মুঠো। শত্রুরা নিঃসাড়ে আমার রাজ্যে ঢুকে আমার নাকের ডগায় নৃত্য শুরু করে দিলে তখনও যে আপনাদের ঘুম ভাঙবে না, এ আমার জানা আছে। যান, আমার এক কথা, আজ থেকে আপনার চাকরি ফক্কা!”
সেনাপতির কম্ম সারা। তিনি এখন কী করবেন কিছুই ভেবে না পেয়ে ফট করে বলে বসলেন, “আজ্ঞে টোক্কা ফক্কা খেলাটা আমি ভাল খেলতে জানি না। রাজপুরোহিতের ছেলেটা খুব ভাল খেলতে জানে। সে আজ্ঞে হাতের মুঠো দেখেই বলে দিতে পারে টোক্কা, না ফক্কা।”
“তাই নাকি। তাকে ডাকুন তো!”
রাজার যেমন ডাক পড়া, পুরোহিতের ছেলেও তেমনই উপস্থিত।
তার পা থেকে মাথা অবধি চোখ বুলিয়ে দেখে রাজা কাক্কাবোক্কা জিজ্ঞেস করলেন, “এই, তোর নাম কী রে?”
“ব্রহ্মানন্দ।”
“বাব্বা, নামটা তত বেড়ে বাগিয়েছিস।” বলে, ব্রহ্মানন্দের মুখের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “এতক্ষণ ধরে বসে বসে কী করছিলি?”
“বাবার পেটে তেল মালিশ করছিলুম।”
“কেন, তোর বাবার পেটে আবার কী হল?”
“কিছু হয়নি। এমনি। আমি রোজ মালিশ করি।”
“তা হলে বল তোর বাবা বেশ আরামেই আছে।” বলে রাজা তাচ্ছিল্যের সুরে ‘হুঁ’ করে উঠলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুই টোক্কা ফক্কা খেলতে জানিস?”
“খুব জানি। খুব সোজা।”
রাজা নিজের বাঁ হাতের মুঠিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বল দিকিনি টোক্কা, না ফক্কা?”
“টোক্কা।” এক নিমিষে উত্তর দিয়ে রাজার মুখের দিকে তাকাল ব্রহ্মানন্দ। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনিও বুঝি খেলেন? আমার বাবাও খেলে। এমনকী, বাবা হাতের মুঠো দেখে বলে দিতে পারে মুঠোর ভেতরে কী আছে।”
“বলিস কী!” বলে রাজা মুহূর্তের জন্যে কী ভাবলেন, তারপর বললেন, “যা তোর বাবাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দে!”
রাজপুরোহিত ছেলের মুখে রাজার আদেশ শুনে পড়িমরি করে ছুটে এলেন। এসেই গদগদ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুরের হুকুম?”
রাজা কাক্কাবোক্কা একবার তেরছা চোখে তাঁকে দেখে নিয়ে ঠাট্টার ছলে বললেন, “পুরোহিতমশাই আজকাল তা হলে টোক্কা ফক্কা খেলেন।”
পুরোহিতমশাই কেমন যেন একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। কোনও কথা তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল না। ঠোঁটও খালি “কী যে বলি, কী যে বলি” করতে করতে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল।
রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “না, না, এত ঘাবড়াবার কিছু নেই। আপনার ছেলের মুখে শুনলুম, আপনি ছেলের সঙ্গে টোক্কা ফক্কা খেলেন। শুনে আমারও আপনার সঙ্গে একটু টোক্কা ফক্কা খেলার ইচ্ছে হল।” বলে রাজা বাঁ হাতটা রাজপুরোহিতকে দেখিয়ে বললেন, “এই যে দেখুন, আমার বাঁ হাতের মুঠি বন্ধ। বলুন, টোক্কা, না ফক্কা?”
রাজপুরোহিত একটু মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “টোক্কা।”
“বাঃ! ঠিক বলেছেন তো! বলুন তো মুঠির মধ্যে কী আছে?”
রাজপুরোহিত আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে, শুঁকতে হবে?”
রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী শুঁকতে হবে?”
“আজ্ঞে আপনার হাতের মুঠো।”
“কেন?”
“আজ্ঞে না শুঁকলে বলা শক্ত।”
“শুঁকুন।” বলে রাজা বাঁ হাতের মুঠোঁটা রাজপুরোহিতের নাকের কাছে এগিয়ে দিলেন।
রাজপুরোহিত শুঁকতে শুঁকতে বললেন, “আজ্ঞে হাতটা আপনার বাঁ হাত, তাই একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমার গুরুদেবকে ডেকে আনব হুজুর।”
রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার গুরুদেব? তিনি আবার কে?”
“আজ্ঞে রাজজ্যোতিষী। আমার শেখা তাঁর কাছে।”
রাজা আরও অবাক হলেন। “বলেন কী! তিনিও টোক্কা ফক্কা খেলেন? তা হলে ডাকুন তাঁকে।”
রাজার হুকুম মুখ থেকে পড়তে যতক্ষণ। রাজজ্যোতিষী পুরোহিতমশায়ের সঙ্গে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন, “আজ্ঞে কী আদেশ?”
রাজা জ্যোতিষমশাইকে চোখ টেরিয়ে দেখলেন, তারপর মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “অভ্যেসটা তা হলে এখনও যথাসাধ্য বজায় রেখেছেন।”
“আজ্ঞে কীসের অভ্যেস?”
“টোক্কা ফক্কার।”
রাজজ্যোতিষী হেসে ফেললেন। অবিশ্যি রাজার সামনে যেমন করে হাসা উচিত তেমন করেই হাসলেন তিনি। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “হঠাৎ একথা কেন বলছেন হুজুর?”

“বলছি কারণ, পুরোহিতমশাই নাকি আপনার কাছে টোক্কা ফক্কা খেলাটি শিখেছেন?”
রাজজ্যোতিষী উত্তর দিলেন, “বিশ্বাস করুন আমি শেখাতে চাইনি। আমি বারবার বললুম নেশা ধরে যাবে। কিন্তু পুরোহিতমশাই শুনলেন না। এমনভাবে ধরলেন, না শিখিয়ে উপায় থাকল না। তারপর থেকে সময় পেলেই দু’জনে একটু বসে যাই। আপনাকেও যদি শিখিয়ে দিই, আমি হলপ করে বলতে পারি আপনারও নেশা ধরে যাবে।”
রাজা বললেন, “হ্যাঁ, আমি খেলব বলেই তো আপনাকে ডেকেছি। এই দেখুন আমার বাঁ হাতের মুঠি। বলুন তো টোক্কা, না ফক্কা?”
রাজজ্যোতিষী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “টোক্কা।”
অমনি পুরোহিতমশাই ঘাড় নেড়ে বলে ফেললেন, “দেখলেন হুজুর, আমার কথা টায়ে টায়ে মিলে গেল।”
রাজা চোখ পাকিয়ে রাজপুরোহিতের মুখের দিকে তাকাতেই তিনি গোঁত্তা খেয়ে চুপ করে গেলেন।
“ঠিক আছে,” কাক্কাবোক্কা রাজজ্যোতিষীকে বললেন, “টোক্কা তো হল, এবার বলুন দেখি আমার মুঠোর ভেতরে কী আছে?”
“আপনার হাতটা একটু বাড়াবেন হুজুর? আমি শুঁকব।”
“শুঁকুন,” বলে রাজা হাত বাড়িয়ে দিলেন।
শুঁকতে শুঁকতে তিনি বললেন, “খুব মুশকিল হয়ে গেল।”
“কেন?”
“আপনার হাতটা বাঁ হাত বলে গন্ধটা নাকে ঠিক ঢুকছে না।”
“আর ঢুকবেও না,” ধমকে উঠলেন রাজা। তারপর বললেন, “আপনাকে রাজবাড়িতে রাখা হয়েছে কি পুরোহিতমশায়ের সঙ্গে টোক্কা ফক্কা খেলার জন্যে?”
রাজার ধমকানি খেয়ে জ্যোতিষমশায়ের এই বুঝি দম আটকে যায়। দু’বার তিনি বিষম খেয়ে তিনবারের বার বলে ফেললেন, “আজ্ঞে না হুজুর, এই তো আমি কালকেই মন্ত্রীমশাইকে বলেছি, আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা না থাকলেও আপনার ওপর শত্রুর আক্রমণের একটা যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।”
“আমার ওপর। তাই নাকি! কই, মন্ত্রীমশাই তো আমাকে সে-কথা বলেননি! ডাকুন তো তাঁকে।”
মন্ত্রীমশাই হাজির।
তাঁকে দেখেই রাজা কাক্কাবোক্কা তড়পে উঠলেন, “বলেননি কেন?”
মন্ত্রীমশাই ঘাবড়ে গেলেন, “আজ্ঞে।”
কাক্কাবোক্কা আরও গলা চড়ালেন, “বলেননি কেন?”
মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে কী বলব? বলার কথা তো তেমন কিছু ছিল না।”
রাজা কাক্কাবোক্কা চিৎকার করে উঠলেন, “ছিল না?” বলে বাঁ হাতের মুঠি তুলে দেখালেন, “দেখতে পাচ্ছেন?”
মন্ত্রীমশাই রাজার মুঠিটা ঘুষি ভেবে “বাবা রে” বলে মারলেন ছুট। কিন্তু পারলেন না। রাজা ‘ধরো’ বলে হাঁক পাড়তেই জ্যোতিষমশাই মন্ত্রীকে জাপটে ধরে ফেললেন। মন্ত্রীমশাই প্রাণের দায়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমায় ঘুষি মারবেন না হুজুর। সত্যি বলছি মরে যাব।”
রাজা কাক্কাবোক্কা ধমক মারলেন, “আপনাকে মারাই উচিত। আপনি কী বলে আমার এই মুঠিটাকে ঘুষি ভেবে পালান? আপনি কী করে ভাবলেন পুরোহিতমশাই আর জ্যোতিষমশায়ের মতো ভদ্রলোকদের সামনে আমি আপনাকে ঘুষি মারব? আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি, আমার ওপর যে আক্রমণ হবে, এ কথা জ্যোতিষমশাই বলা সত্ত্বেও আপনি আমাকে না বলে কেন চেপে গেছেন। জ্যোতিষমশাই যে খবরটা ঠিক ঠিক বলেছিলেন, আমার এই হাতের মুঠোর মধ্যেই তার প্রমাণ আছে। আমি শত্রুকে ধরে ফেলেছি। সে আমার নাক আক্রমণ করেছিল।”
মন্ত্রীমশাই কান্নার মতো চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হুজুর, বিশ্বাস করুন, এ-ব্যাপারে আমার কোনওই হাত নেই।”
“আপনার হাত নেই তো কার হাত আছে? এত লোকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে যাতে কোনও শত্রু রাজবাড়িতে ঢুকতে না পারে, তার বিধিব্যবস্থার পরামর্শ মন্ত্রী ছাড়া কে দেবে? একটা মানুষ-শত্রু ঢুকলে তাকে গ্রেপ্তার করা এমন কিছু নয়। একটা ছাগল ঢুকলেও বুঝতে পারি, ব্যাটার মাথা মোটা। কিন্তু একটা মাছি যদি সবার চোখে ধুলো দিয়ে রাজার নাকে বসে চাটাচাটি করে, তবে তাকে কী বলবে লোকে? রাজার নাকে মাছি বসলে, সে ব্যাটা বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারে। কিন্তু তাতে কি রাজার মান-সম্মান বলে কিছু থাকে! আমিও কমতি যাই না মশাই, আমি শত্ৰুটিকে ধরে ফেলেছি। সে আমার হাতের মুঠোয় বন্দি।”
রাজজ্যোতিষী ভীষণ আনন্দে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন, “দেখলেন তো হুজুর, আমার গণনা কেমন নির্ভুল।
মন্ত্রীমশায়ের মুখের দিকে আড়চোখে তাকালেন রাজা কাক্কাবোক্কা, তারপর ঠেস দিয়ে বললেন, “আপনার মুখে যে আর ট্যাঁ-ফুঁ শুনি না মন্ত্রীমশাই। এখন আমার এই হাতের মাছিটা যদি আপনার নাকের গর্তে গুঁজে দিই, তা হলে কেমন হয়?” বলে মন্ত্রীর দিকে তিনি তেড়ে গেলেন।
মন্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন, “রাজামশাই, করছেন কী, করছেন কী? এমন একটা দামি শত্রুকে আমার নাকে ঢুকিয়ে দিলে যে একটা মস্ত সুযোগ আপনি হাতছাড়া করবেন।”
“কীসের সুযোগ?”
“আজ্ঞে, রাজার নাকে যে-মাছি বসে তার বাজারদর কত, তা আপনার জানা আছে? ওই মাছিটা বিক্রি করলে অন্ততপক্ষে...”
রাজার মুখখানা কেমন যেন চকচক করে উঠল মন্ত্রীর কথা শুনে। তাঁর ঠোঁটে যেন মুচকি হাসির ঢেউ উঠল। তিনি ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “থামলেন কেন? বলুন অন্ততপক্ষে...”
মন্ত্রীমশাই বললেন, “রাজার নাকে বসা একটা মাছি যদি পাঁচ লাখ স্বর্ণমুদ্রায় বিকিয়ে যায়, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।”
রাজা কাক্কাবোক্কা আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। চেঁচালেন, “লাগাও ভোজ। লাগাও গড়াগড়ি।”
মন্ত্রী রাজাকে থামিয়ে বললেন, “আজ্ঞে হুজুর আগেই নাচ, আগেই ভোজ লাগানোটা বোধহয় যুক্তিযুক্ত হবে না। আগে আমাদের যা দরকার তা হল আপনার হাতের মাছিটি যাতে ফসকে উড়ে না পালায়, তা দেখা। তারপর এখনই ঢেঁড়া পিটিয়ে রাজ্যের মানুষকে জানিয়ে দেওয়া, রাজার নাকে-বসা একটি মাছি নিলাম হবে। যারা কিনতে ইচ্ছুক তারা যেন বিলম্ব না করে রাজবাড়িতে উপস্থিত থাকেন।”
মন্ত্রীর কথামতো ঢেঁড়া পেটাবার হুকুম দিলেন রাজা। রাজার নাকে-বসা মাছি কেনার জন্যে হাজারে হাজারে লোক উপস্থিত। যেমন নিয়ম, তেমনই নিলামে হাঁকডাকও হল। লাফিয়ে লাফিয়ে একলাখ, দু’লাখ ছাড়িয়ে দর উঠল একেবারে ছ’লাখে। সুতরাং এবার ফেলো কড়ি, নাও মাছি!
এবারেই রাজা কাক্কাবোক্কা ভীষণ ভাবনায় পড়লেন। তিনি ইশারায় মন্ত্রীকে কাছে ডাকলেন। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, “মন্ত্রীমশাই আমার ভীষণ ভয় করছে।”
“কেন হুজুর?”
“হাত খুললেই যদি মাছিটা পালায়!”
মন্ত্রী বললেন, “আপনার মুঠোর চাপে এতক্ষণে মাছিটা কি আর প্রাণে বেঁচে আছে। কবেই অক্কা পেয়েছে।”
রাজা আরও ভয় পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তা হলে কী হবে? মরা মাছি যদি নিতে না চায়।”
মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে, মাছি মরা কি জ্যান্ত এ নিয়ে তো নিলামের কোনও শর্তই ছিল না। সুতরাং ভাবনার কিছু নেই। আপনি বরঞ্চ মুঠোঁটাকে আরও একটু শক্ত করে মাছিটাকে চটকে ফেলন। তা হলে আর চিন্তার কিছু থাকে না।”
যা বলা কাক্কাবোক্কা ঠিক তাই করলেন।
এদিকে রাজবাড়ির কোষাগারের কোষাধ্যক্ষ মুদ্রা গুনতে গুনতে যেই ছ’লাখ গোনা শেষ করলেন, অমনি রাজাও খদ্দেরের মুখের কাছে বাঁ হাতটি এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাও তোমার মাছি।” বলেই মুঠো খুলে ফেলেছেন। যাচ্চলে! কোথায় মাছি, আর কোথায় কী! হাতের ভেতর চটকাবেন কী, মাছিটাকে তিনি ধরতেই পারেননি। কী লজ্জা! কী লজ্জা! এত কাণ্ড করে শেষে এই। যেমনকে তেমন। এত কষ্ট করে ছ’লাখ স্বর্ণমুদ্রা গুনে এবার দাও ফেরত! যত লোক জমায়েত হয়েছিল ফিকফিক করে তাদের সে কী হাসি! অত লোকের একসঙ্গে অত ফিকফিক! রাজা তো আর কালা নন, যে শুনতে পাবেন না। রাজা কাক্কাবোক্কা মুখখানা ওলঝুড়ির মতো গোবদা করে বলে উঠলেন, “মন্ত্রীমশাই, ওরা হাসছে কেন?”
মন্ত্রীমশাই বললেন, “ওদের কথা ছেড়ে দিন।”
“কেন, ছাড়ব কেন? আমিও ওদের সঙ্গে হাসব।”
মন্ত্রী বললেন, “সেটা কি আপনার মতো একজন রাজাকে ভাল দেখায়!”
“তবে আমি কাঁদি!”
“ছিঃ! রাজা কখনও কাঁদে না।”
“তবে বলুন আমি কী করব?”
“আজ্ঞে, আপনি বরং ঘুমিয়ে পড়ুন, সব ল্যাঠা চুকে যাবে।”
রাজা কাক্কাবোক্কা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কি না, সেটা অবশ্য জানা যায়নি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন