শৈলেন ঘোষ

তুতুদের সিঁড়ির ঘরে একটা মাচা ছিল। সেই মাচার ওপর হেঁজিপেঁজি আর পাঁচটা ফেলনা জিনিসের সঙ্গে একপাটি ফাটাফুটো জুতো পড়েছিল। সেই জুতোর ভেতরে বাসা বেধেছিল একটা নেংটি। নেংটিটা থেকে থেকেই হু-ই-ই-ই মাচার ওপর থেকে উঁকি মারত। উঁকি মেরে দেখত তুতুর পোষা কুকুরটার দিকে। তুতু ছোট্ট মেয়ে। তার কুকুরটা আরও ছোট্ট। রোজ বিকেলে ঝকঝকে ফ্রক পরত তুতু। মাথায় রিবনের ফুল এঁটে, সেজেগুজে বেড়াতে যেত কুকুরটাকে নিয়ে। কুকুরের সঙ্গে তুতুর ভারী ভাব। কুকুরটা তুতুকে তাড়া করে না। কামড়ায় না। কিচ্ছু বলে না। গায়ে পড়ে লাফায়, না-হয় আদর করে। অথচ সেদিন নেংটিটা একটিবার মাত্তর মাচার থেকে নেমেছিল। নেমে খাবার খুঁজছিল। তখন হঠাৎ কুকুরটা তাকে দেখতে পেয়ে এমন তাড়া লাগাল! উরি বাবা, কোনওরকমে পড়িমরি করে ছুট দিয়ে, তবে সে-যাত্রা প্রাণটা রক্ষে পেল!
আচ্ছা, এ তো ভারী আশ্চর্য ব্যাপার, কুকুরটা তুতুকে ভালবাসে, অথচ নেংটিকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। কেন রে বাবা! নেংটি তো তোমার বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে না। নেংটির সঙ্গে তুমিও তো একটু খেলা করতে পারো!
তবেই হয়েছে! আরে বাবা, তুমি তো তুতু নও, তুমি নেংটি। তোমার মাথায় চুল নেই। চুলে সাজানো ফুল নেই। গায়ে ঝলমল ফ্রক নেই। পায়ে খচমচ জুতো নেই। তুতু কেমন সাজে বলো! তা, তুতুর সঙ্গে কুকুর খেলা করবে না তো কি নেংটির সঙ্গে দোস্তি করবে?
নেংটি ভাবল, আচ্ছা ঠিক আছে, সে-ও সাজবে। তার মাথায় নাই থাক চুল। নাই বা আঁটল ফুল, সে তো তুতুর মতো একটা ফ্রক পরতে পারে! হ্যাঁ, সে ফ্রক পরবে। ফ্রক পরে রাস্তায় বেড়ু করতে যাবে। রাস্তায় কুকুরের অভাব? একটা-না-একটার সঙ্গে ঠিক ভাব করে ফেলবে। তুতুর কুকুর তার সঙ্গে না খেললে বয়েই গেল!
কিন্তু সে তো হল, এখন ফ্রক পাওয়া যাবে কোথায়? নেংটির গায়ের ফ্রক?
কেন পাওয়া যাবে না? দুপুর হোক তারপর দ্যাখো কী হয়।
সকাল গড়ালে গুটিগুটি দুপুর তো আসবেই। দুপুর এলে গরমে আইঢাই করতে করতে সবাই গড়াবে। গড়িয়ে গড়িয়ে নাক ডাকাবে—ফুররর-ফুররর!
হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি এখন ঘুমোচ্ছে সবাই। নেংটিটা করল কী, তুতুর খেলাঘরে গিয়ে ঢুকল। খেলাঘরে খেলনার বাকসে একটা-দুটো-তিনটে-চারটে কত ফ্রক। একটা ফ্রক বাগিয়ে নিয়ে মার ছুট! তারপর সেই ফ্রক গায়ে গলিয়ে লুকিয়ে-ছাপিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

অনেকটা রাস্তা তাকে যেতে হল না। ক’পা যেতেই মনে হল সামনে ওই একটা কুকুর। অবশ্য এ কুকুরটা তুতুর কুকুরের মতো দেখতে নয়। এটা কেমন কালো মতন। হোঁতকা-হোঁতকা। তা হোক গে! সব কুকুরকে যে একরকম দেখতে হবে তার কী মানে! কুকুর সে কুকুরই। ভাব করে খেলা করতে পারলেই হল।
একটা মস্ত গাছ। গাছের তলায় একটা লোক ঘুমোচ্ছে। তারপাশে একটা পুঁটলি। হাতের কাছে ডুগডুগি। একটা ছোট্ট মতো লাঠি। তারপাশে কুকুরটা বসে বসে কেমন জুলুক-জুলুক তাকাচ্ছে! এদিক তাকাচ্ছে, ওদিক তাকাচ্ছে। তাকাতে তাকাতে হঠাৎ নেংটিটার দিকে তার নজর পড়ে গেল। পড়ে যেতেই সেই হোঁতকা মতো দেখতে কুকুরটা এমন খি-খি-খি-খি করে হেসে উঠল যে কী বলব!
নেংটি কিন্তু ভয় পেল না। হাসি শুনে ভাবল, কুকুরটার সঙ্গে ভাব জমবে ভাল। তাই নেংটিটা তার আরও খানিক কাছে এগিয়ে আ-আ তুং তুং, তুং তুং করে ডাকতে লাগল। নেংটি যতই তুং তুং করতে লাগল, সেই কুকুরটাও তত খি-খি করে হাসতে লাগল।
নেংটিটা তার একটু কাছ থেকে আরও একটু কাছে এসে যেই ঠ্যাং বাড়িয়ে তার কপালে চুমো খেতে গেছে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে খি-খি হাসিটা থমকে গেছে। কুকুরের সারা শরীর ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। সে মাটির ওপর গড়িয়ে পড়ে কোঁ কোঁ করতে লাগল।
দেখেশুনে নেংটির চক্ষু কপালে। ভয়েময়ে দে ছুট! ছুটতে ছুটতে ফ্রকট্রক খুলে একাক্কার! নাও এবার বোঝো ঠেলা। আরে বুদ্ধু নেংটি, তুই যাকে কুকুর ভেবেছিস, সেটা যে একটা ভালুক! থেকে থেকেই যে ভালুকের জ্বর হয়, তা আর তুই জানবি কেমন করে! এই বুঝি তোর প্রথম ভালুকদর্শন? তাই ভালুকের ঠকঠকানি জ্বরের কাঁপুনি দেখে, দিলি ছুট? গায়ের ফ্রক খুলে তুই যে এখন ছিঃ—কী লজ্জা!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন