শৈলেন ঘোষ

আজ কী কুক্ষণেই না কলম ধরেছিলেন ইতিমিচিসাহেব। কী কুক্ষণেই না সেই পদ্য লেখার রোগে ধরেছিল তাঁকে আবার। আগে যেমন চাঁদ দেখলে মন হু হু করে উঠত, এখন তেমনই ঘোড়া দেখলে, মনটা পদ্য লেখার জন্যে চাগাড় দিয়ে ওঠে। তিনি কলম ধরেন।
কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার কী, আজ তিনি ঘোড়া দেখে কলম ধরেননি। ধরেছেন একটা বিল্লি দেখে। বিল্লি দেখে হঠাৎ তাঁর মনটা এমন ডগমগিয়ে উঠল যে, তিনি থাকতে পারলেন না। অবিশ্যি এই বিল্লিটা কিন্তু সেই সাদা ধবধবে বিল্লি নয়। বলতে কী, এই বিল্লিটার ছিরি দেখলে কারও মন যে ডগমগ করে উঠতে পারে, এ যেন বিশ্বাসই করা যায় না। কেন না, যেমন কেলেকিস্টি দেখতে বিল্লিটাকে, তেমনই মুখখানাও ফাঁপা কুমড়োর মতো ধুমসো। তবু তো চোখের কথা এখনও বলিনি। যেন দু’ চোখের দু’ কোটরে দুটো এমনি বড় কাবলিছোলা ঘুরপাক খাচ্ছে। আরি ব্যাস! কী সাহস! বিল্লিটা বাইরে থেকে লাফিয়ে উঠে ঘরের জানলা দিয়ে কেমন উঁকি মারল দ্যাখো!
ইতিমিচিসাহেব তখন কোট-প্যান্ট পরে সবে মাথায় টুপি দিয়েছেন, তখনই তাঁর চোখ পড়ে গেছে জানলার দিকে। দেখে ফেলেছেন বিল্লিটাকে। দেখে ফেলতেই বিল্লিটা তিড়িং। আর না তাকায় ফিরিং। মারল ছুট। ছুটছে চোঁ, নয়তো চাঁ। তারপরেই ফাঁ—কা! অবশ্য সাহেবের বরাত ভাল এই যে, ছুটে গিয়ে শেষমেশ বিল্লির ল্যাজটি তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। দেখে তাঁর মনে হল, ল্যাজ নয়তো, যেন গোছাবাঁধা ফুলঝাড়ু।
ইস, হুড়োহুড়িতে ওই দ্যাখো ইতিমিচিসাহেবের মাথার টুপিটা টুক করে খুলে পড়ে গেল! তিনি সেটা তোলার জন্যে তড়বড় করে যেই হেঁট হয়েছেন, অমনই তাঁর মাথার মধ্যে একটা পদ্য খামচাতে শুরু করে দিয়েছে। তিনি থাকতে পারলেন না। বসে পড়লেন খাতা-কলম নিয়ে। লিখে ফেললেন বিল্লি নামের একখানা পদ্য:
মিম্মি মুম্মা আম্মা বিল্লি,
জানলায় ঝুঁকি দিয়ে কেন উঁকি দিল্লি?
শুনি কোথা যাবি তুই মক্কা না অক্কা,
বুঝি তোর ট্যাঁকে নেই টুংটাং ফক্কা?
তাই বুঝি ঝাঁকি দিস খুঁজে পেতে টংকা,
ওরে চোর নাকে তোর দিই ঘষে লংকা।
আয়ারাম গায়ারাম কটাচোখ বিল্লি,
আজ চুরি করে ক’টা ল্যাজা-মুড়ো গিল্লি?
ইস ছি ছি গায়ে তোর বিটকেল গন্ধ,
পদ্যের খাতাখানা তাই করি বন্ধ!
দারুণ! দারুণ! নিজে লিখে নিজেই মশগুল হয়ে ইতিমিচিসাহেব গুনগুন করতে লাগলেন। অবশ্য তাঁর পাদুটোও ধিনধিন করার জন্যে অস্থির হয়ে উঠছিল। সত্যি বলতে কী, তিনি সামলাতেও পারছিলেন না। তাই থেকে থেকেই তিনি নেচে ফেলছিলেন। ঘরের ভেতর তাই রক্ষে। নইলে তাঁর মতো একজন জাঁদরেল সাহেবকে রাস্তাঘাটে এমন করে নাচতে দেখলে যে মানুষের হল্লাগুল্লা শুরু হয়ে যেত, একথা হলপ করে বলা যায়!
আরে বাবা থামো-থামো! হল্লা কি শুধু রাস্তাঘাটেই হয়? বাড়ির অন্দরমহলে হয় না?
খুব হয়। আকছার হচ্ছে। ঘরের ভেতর যদি টিভি থাকে সামনে বসে পড়ো, দেখবে হল্লা কাকে বলে। গানের হল্লা, নাচের হল্লা, মেলার হল্লা, খেলার হল্লা, বড় বড় লোকের তক্কোবিতক্কের হল্লা, এ তো লেগেই আছে। সুতরাং হল্লা নিয়ে বেশি হল্লাহল্লি না-করাই ভাল। আর কথা যখন ইতিমিচিসাহেবকে নিয়ে, তখন বলতেই হয় হল্লা নিয়ে তাঁর তেমন কোনও দুরদুরোনিও নেই। কেন না মানুষটা একা। বিবি নেই, বউ নেই। ছানা নেই, পোনা নেই। হল্লাটা করবে কে? হাত-পা ঝাড়া এক সাহেব, দিব্যি নিশ্চিন্ত। খাও-দাও, রাস্তাঘাটে টোটো করো, রং-বেরঙের মজা দ্যাখো, আর সময় হলেই আরামসে শুয়ে পড়ো, ঘুমোও। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নাকের বাজনা বাজাও। ভুড়ত-ত-ত, ফুস-স-স! ভুড়ুত-ত-ত, ফুস-স-স! বাপ-ঠাকুরদাদা পয়সা রেখে গেলে এই এক মস্ত সুবিধে।
দ্যাখো বাপু, তুমি তো অনেক কথাই গড়গড় করে বলে গেলে। কথা বলতে তো আর ট্যাকসো লাগছে না। তুমি মুখে ফুসও বলতে পারো, ফাসও বলতে পারো। কিন্তু ঘুম-নাকের ওই ফুসফাস থেকেই যে এমন একটা ভয়ংকর কাণ্ড ফোঁস করে উঠবে সেকথা কি ভাবতে পারো?
কেউই ভাবতে পারে না, তো, তুমি আমি!
হয়েছে কী, তখন সত্যিই গভীর রাত। তখন ইতিমিচিসাহেব সত্যিই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নাকের বাজনা বাজাচ্ছিলেন। ঘুমের ঘোরে যখন বাজনা বাজে নাকে, তখন কার আর খেয়াল থাকে। কখনও তিনি চিত, কখনও উপুড়। কখনও মুখ হাঁ, কখনও পেট হাপুস-হুপুস! কখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন, নয়তো, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হেসে ফেলেন।

কিন্তু অবাক কাণ্ড কী, আজ তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসলেন না। ঘুমের ঘোরে হেঁচে বসলেন। কী ব্যাপার! এ সময়ে তো তাঁর হাঁচার কথা নয়। স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেউ হাঁচে, এমন কথা তো বাবা জন্মে শুনিনি! হতে পারে হয়তো, ঠান্ডা লেগে গেছে সাহেবের। এখন তো দিন বদলের পালা। গরম থেকে বর্ষা এসেছে। একটু-আধটু ঠান্ডায় একটা-আধটা হাঁচি নাকে খুসখুসিয়ে ঝাপটা দিতেই পারে!
কিন্তু না, তা তো নয়, কথা নেই, বার্তা নেই তাঁর বাঁ-পাটা যেন সড়াত করে বুকের কাছে উঠে এল! তিনি চমকে গেলেন যেন! যেন তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। ওই তো তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন। ওই তো তিনি অন্ধকার ঘরে এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কী একটা খুঁজছেন! এ কী! খুঁজতে খুঁজতে তাঁর চোখের দৃষ্টি থমকে গেল কেন? তিনি কী দেখলেন?
আয়ি ব্যাস! অন্ধকারে ওদুটো কী জ্বলছে ভাটার মতো ড্যাবড্যাব করে।
কী আবার! দুটো চোখ!
চোখ দেখে সাহেব যেন এখন একটা নট নড়ন-চড়ন গাছের গুঁড়ি। নিথর।
ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ যেন ইতিমিচিসাহেবের মনের মধ্যে ঝড় উঠল। গাছের ডালপালাগুলো যেমন হঠাৎ ঝড়ে তোলপাড় করে, তেমনই ইতিমিচিসাহেবের সারা শরীর তোলপাড় করতে লাগল। তিনি চোখের পলকে লাফ মেরে খাটের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লেন।
কী সব্বনাশ, বলব কী সেই জ্বলজ্বলে চোখদুটোও খাটের ওপর লাফিয়ে উঠল!
ইতিমিচিসাহেব আঁতকে উঠে খাট থেকে ঝাঁপ মেরে এক্কেবারে নীচে।
‘ফ্যাঁস-স-স!’ ওরে বাবা এ কী ভয়ানক বুক শুকনো করা শব্দ। শব্দ করেই চোখদুটোও তেড়ে এল!
এবার ইতিমিচিসাহেব ঠাওর করতে পেরেছেন। ফ্যাঁস-স-স করে নাক ঝাড়তেই তাঁর মালুম হয়ে গেছে, এটা সেই কেলেকিস্টি বিল্লি! বিল্লির কালো কুচকুচে দেহটা এতক্ষণ অন্ধকারে ঢাকা পড়ে ছিল। শুধু চোখদুটোই জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। কিন্তু পাজিটা রাতদুপুরে তাঁর ঘরে ঢুকে এমন ঠেঁটামি শুরু করে দিল কেন, সেটাই তো তাজ্জব ঘটনা!
বেচারা ইতিমিচিসাহেব অন্ধকারে বন্ধ ঘরে বিল্লির তাড়া খেয়ে অন্ধের মতো ঘুরপাক খেতে লাগলেন! ‘কী করেন, কী ধরেন’, করতে করতে তিনি কানামাছির মতো এদিক-ওদিক হাতড়াতে লাগলেন। বিল্লিও পেছনে ফ্যাঁস-ফ্যাঁস করে তেড়ে যায়।
এমন সময়ে হঠাৎ তাঁর ঘরের আলমারিতে হাত ঠেকে গেল। তিনি টিকটিকির মতো হামা দিয়ে তরতর করে আলমারির মাথার ওপর উঠে পড়লেন।
উঠলে কী হবে। বিল্লিও দিল লম্ফ।
ইতিমিচিসাহেবও “ওরে বাপরে” বলে দিলেন ঝম্প। আলমারির মাথা থেকে সিধে টেবিলের ওপর। গেল উলটে টেবিল। বইপত্তর, কাগজ-কলম, ছড়িয়ে-মড়িয়ে নৈরেকার কাণ্ড!
ওরে বাবা রে, আলমারির মাথা থেকে তিড়িং করে বিল্লিও যে নেমে সাহেবকে ধরেছে ঘিরিং! এই বুঝি ইতিমিচিসাহেবের নাকটা উপড়ে নেয়।
ইতিমিচিসাহেব সড়াত করে লুকিয়ে পড়লেন খাটের নীচে। কিন্তু বরাত এমন বিল্লির চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। সে দেখে ফেলেছে! বিল্লিও হুড়মুড়িয়ে খাটের নীচে ঢুকে পড়েছে। তারপর খাটের নীচে সে এক ফাটাফাটি কাণ্ড। কোনওরকমে ছাড়ান পেয়ে তিনি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার দরজাটার হদিস পেলেন, তখন আর তাঁর দম নেই। তবু তিনি মরি-বাঁচি করে দরজার আগলটা খুলে রাস্তায় মারলেন ছুট।
কথায় বলে, কপালে থাকলে বাঁচার লক্ষণ, কার সাধ্যি করে তাকে ভক্ষণ। ইতিমিচিসাহেব সেই কপালের জোরেই বেঁচে গেলেন। সামনেই দেখতে পেলেন একটা তালগাছ। ভাগ্য ভাল সাহেব গাছে উঠতে জানতেন। তাই বিল্লি আসার আগেই তিনি হাঁকপাঁকিয়ে উঠে পড়লেন গাছে। দু’ হাত দিয়ে গাছের গা আঁকড়ে ধরে হাঁপাতে লাগলেন। আর কে ধরে তাঁকে! বিল্লি? ফুঃ!
‘ফুঃ’ বলছ কেন? বিল্লি তো এদিকে আসেনি।
যেথায় যাক, আর সেথায় থাক, এখন আর সাহেব নামছেন না তালগাছ থেকে। বাকি রাতটা তিনি ঝুলেই থাকলেন তালগাছে। তারপর সকালবেলা যখন রোদ উঠল, রোদ দেখে যখন মনে সাহস জাগল তখন তিনি নামলেন। উফ! ঝকমারি কাকে বলে!
তিনি ভয়ে ভয়ে আবার ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।
বলতে বলতে তিনি ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছেও গেলেন। না, ঝট করে ঘরে ঢুকলেন না। উঁকিঝুঁকি মেরে একটু এ-ফাঁক-ও-ফাঁক দেখে নিলেন। বলা যায় না। বিল্লিটা যদি ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকে! যদি ফস করে গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে!
হ্যাঁ, উঁকিঝুঁকি মেরে তিনি বুঝতে পারলেন পাজিটা ভেগেছে। তিনি ঘরে ঢুকে পড়লেন। ইস! কী দশা হয়েছে ঘরটার! টেবিল উলটে বইপত্তর ছড়িয়ে-মড়িয়ে, বিছানা-বালিশ ধামসে-ধুমসে একশা। শুধু পদ্যের খাতাটাই যা পড়ে আছে চোখের সামনে। কিন্তু খাতার পাতাগুলো অমন ছেঁড়াখোঁড়া কেন? তবে কি বিল্লির সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে পদ্যের খাতাটাই ছিঁড়ল। তিনি ঝটপট তুলে নিলেন খাতাটা। এপাতায় ওপাতায় চোখ বোলাতে গিয়ে তিনি দেখেন, আরে বিল্লি নামের সেই পদ্যটা তো নেই! মনে হচ্ছে পাতা ছিঁড়ে উড়ে গেছে কোথাও। আহা অমন লাগসই পদ্যটাই হাওয়া হয়ে গেল। তিনি খুঁজতে শুরু করলেন। কিন্তু পেলেন না।
পাবেন কেমন করে? সেই পদ্যটির জন্যেই তো অমন রণক্ষেত্র! সাহেব পদ্যটি লিখে যখন উচ্চ গলায় পাঠ করছিলেন, তখন যে বিল্লি সেটি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছে, সে তো আর ইতিমিচিসাহেব জানেন না। সত্যিই তো, বিনা কারণে কাউকে চোর-ছ্যাঁচড় বললে কে মেজাজ ঠিক রাখতে পারে! তাও না-হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু সাহেব কী বলে তার নাকে লংকা ঘষে দেবার কথা লেখেন। বলি, সাহেবের নাকে যদি কেউ লংকা ঘষে দেয় তখন? জ্বালা করবে না? তোমার নাকটা নাক, আর বিল্লির নাকটা বুঝি আলুর বড়া! লংকা ঘষলে স্বাদ বাড়বে। কী একলসেঁড়ে লোক রে বাবা। ছিঃ!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন