গল্পের নাম ফিক

শৈলেন ঘোষ

রাজা কাক্কাবোক্কার রাজসভায় একঘর লোকের সামনে ঘটে গেল সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটা। বলতে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়। কী ঘটল? ব্যাপার কী?

আর ব্যাপার কী! ব্যাপার ভীষণরকমের গুরুতর। রাজা কাক্কাবোক্কা এইমাত্র একঘর লোকের সামনে একটি ডিগবাজি খেলেন।

বলেন কী মশাই!

তবে আর বলছি কী! রাজা না হয়ে ঝড়তি-পড়তি অন্য কারও যদি ডিগবাজি খাওয়ার ইচ্ছে মাথায় চাগাড় দিত, তবে অন্য কথা। তাতে আমাদের কিছু বলার থাকত না। কিন্তু রাজসভায় একঘর লোকের সামনে ডিগবাজি খাওয়া মানে সারা রাজ্যে ঢিঢি পড়ে যাওয়া। এখন সেই হ্যাপা কে সামলায় বলো তো! কে বলতে পারে, কোন দেশের কোন রাজা কবে কোথায় ডিগবাজি খেয়েছে! তেমন কোনও সংবাদ কোনও বিদ্বান ব্যক্তির জানা আছে কি না হলপ করে বলা শক্ত। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে রাজা কাক্কাবোক্কাই যদি এই কৃতিত্বের প্রথম দাবিদার হন, তবে মানতেই হবে, এটা একটা মস্ত গৌরবের ব্যাপার।

তা বটে। এই বয়সে ওই রকম একজন ওজনদার রাজার ডিগবাজি খাওয়া কি লাড্ডু খাওয়ার মতো সোজা যে, হাত পাতলুম আর গালে ফেললুম। হ্যাঁ, একটা বাচ্চা ছেলে হলে অন্য কথা। সে তো চোপর দিন ডিগবাজিই খাচ্ছে। কিন্তু রাজার ডিগবাজি সে কি ফেলনা?

আরে মশাই, এ আবার কী?

কেন, আবার কী হল?

রাজা কাক্কাবোক্কা ডিগবাজি খেয়েই হাসতে শুরু করে দিলেন যে, হো-হো-হো। এও তো এক আশ্চর্য ঘটনা! রাজার মুখে এমন দিলখুশ হাসি কবে মানুষে শেষ দেখেছে, তার সঠিক খবর পেতে হলে, মন্ত্রীমশাইয়ের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা নেই। কিন্তু দুঃখের কথা এই, আজ এমন একটা জমজমাট ঘটনার সাক্ষী হয়েও থাকতে পারলেন না তিনি। মন্ত্রীমশাই কেন এখনও রাজসভায় এসে পৌঁছননি সেও এক ভাবনার কথা!

কিন্তু এ কী! রাজা সেই যে হাসতে শুরু করেছেন, আর যে থামেন না। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে হাত-পা ঝেড়ে অমন করে হাসতে দেখলে কারও যদি মনে হয় লোকটা পাগল হয়ে গেছে, তবে তাকে দোষ দিতে পারো না। রাজা বলে কথা। তাঁর কি অমন হুট বলতেই লাগাম ছেড়ে হাসা সাজে? না, মানায়? এখন তাঁর এই হাসি দেখে কেউ যদি ফিক করে হেসে ফেলে, তবে তাকে মোটেই অসভ্য বলা যাবে না। অবিশ্যি রাজার সামনে হাসাহাসি করাটা যে ভয়ংকর অসভ্যতার শামিল, সে আর কে না জানে। সুতরাং রাজা হাসবেন যেমন খুশি। আর সেই হাসি দেখে কারও যদি হাসি পায়, সর্বনাশ, একদম হাসতে পারবে না। মুখ টিপে বসে থাকো! হেসেছ কী গেছ! উঠে পালিয়ে বাইরে গিয়ে যে একটু হেসে আসবে, তারও জো নেই। উঠতে দিচ্ছে কে তোমায়?

ওমা! হাসতে হাসতে রাজা কাক্কাবোক্কা হঠাৎ থামলেন কেন? তিনি চোখ পাকালেন। মুখ বেঁকালেন। আচমকা হুংকার ছেড়ে ধমকে উঠলেন, “আমি হাসছি আর তোমরা সবাই গোমড়া মুখে বসে আছ? রাজার আনন্দ হলে প্রজাদেরও যে আনন্দ হয়, এ কথাটা কি শিখিয়ে দিতে হবে?”

আর দেখতে হয়, রাজার ধমক খেয়ে একঘর লোক আনন্দে হা-হা-হা করে হেসে উঠল।

কিন্তু রাজা কাক্কাবোক্কা আবার রেগেমেগে চিৎকার করে উঠলেন, “তোমরা তো আচ্ছা! আমি এখন তোমাদের ধমকাচ্ছি আর তোমরা হাসছ? আমার ধমকানি খেয়ে কোথায় তোমরা ভয় পাবে, না, হ্যা-হ্যা করে দাঁত বার করে হাসছ?”

কোথায় হাসি আর কোথায় কী! সঙ্গে সঙ্গে গোটা রাজসভা ভয়ে থরহরি কম্পমান। ফ্যালফ্যাল করে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে রাজার ধমক খেতে লাগল। ধমকাতে ধমকাতে তিনি বলে উঠলেন, “এখন আমি হাসলে সবাই হাসবে। আমি কাঁদ—না, না, আমি কাঁদতে যাব কোন দুঃখে! আমি গান ধরলে সবাই গান ধরবে। আর আমি ডিগবা—” এইটুকু বলেই রাজা কাক্কাবোক্কা নিজের কোমরটা একটু টিপে মুখটা খিঁচিয়ে উঠলেন। বোঝা গেল, ডিগবাজি খেয়ে রাজার কোমরটি জখম হয়েছে। সুতরাং তিনি এখন নিজের কোমর নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নিজেই নিজের কোমর টিপতে লাগলেন। অমনই সভার মধ্যিখান থেকে কে একজন চাপা গলায় বলে উঠল, “টেপ, টেপ, নিজের নিজের কোমর টেপ। রাজামশাইয়ের হুকুম, তিনি যা করবেন সবাইকে তা-ই করতে হবে।”

কথাটা মুখ থেকে পড়তে না-পড়তেই সভাসুদ্ধু মানুষ রাজার মতো নিজের নিজের কোমর টিপতে লাগল। সে কী মজাদার দৃশ্য। এ-দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখা যায় না। দেখা গেলও না। কেন না, সেই দৃশ্য দেখে রাজা কাক্কাবোক্কার নিজেরই এমন হাসি পেয়ে গেল যে, তিনি কোমর ছেড়ে নিজেই হো-হো করে হেসে কুটিপাটি হলেন। আর তিনি যেই হেসেছেন, একঘর লোকও অমনই হাসতে হাসতে হো-হো শুরু করে দিল।

তা ধরো অত লোক যদি একসঙ্গে হো-হো করে হেসে রাজসভা কাঁপায়, তবে কালা ছাড়া কার না কানে তালা লাগে!

সুতরাং এমন একটা হাসির অট্টরোল মন্ত্রীমশাইয়ের কানে পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজসভায় ছুটে এসেছেন। এসেই দাবড়ি দিয়ে কড়কে উঠলেন, “চোপরাও! থামাও হাসি। এটা রাজসভা। আস্তাবল নয়।” তিনি এমনই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন, সভার মধ্যে যে স্বয়ং রাজা আছেন, হাসির পান্ডা যে রাজা নিজে, সেটি তিনি একেবারেই নজর করেননি। কিন্তু অতবড় রাজসভা মন্ত্রীমশায়ের এক ধমকেই ঠান্ডা। এমনকী রাজা কাক্কাবোক্কা নিজেও মন্ত্রীমশায়ের মূর্তি দেখে এমন ঘাবড়ে গেলেন যে, তিনিও স্পিকটি নট। কী জানি, ঘাবড়ে গেলেন বলেই বোধহয় তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এবং রাজা কাক্কাবোক্কার দীর্ঘশ্বাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজসভাতেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল। আর ঠিক তখনই মন্ত্রীমশায়ের চোখ পড়ে গেল রাজা কাক্কাবোক্কার দিকে। পড়তেই, তিনি ভয়ে এতখানি জিব বার করে ফেললেন। সেখান থেকে ঝটপট কেটে পড়ার জন্যে পা বাড়াতেই, রাজা কাক্কাবোক্কা খপাত করে মন্ত্রীমশাইকে ধরে ফেললেন। তারপর ধমকে উঠলেন, “আমাকে ঘোড়া বলে পালানো হচ্ছে?”

মন্ত্রীমশায়ের শিরদাঁড়ার ভেতর কে যেন একচাঁই বরফ চেপে ধরে ঠান্ডায় অস্থির করে তুলল। তিনি যে এমন আচমকা রাজার হাতে ধরা পড়বেন, এটা আদপেই ভাবতে পারেননি। কে জানত, রাজা কাক্কাবোক্কা নিজেই একঘর লোকের সঙ্গে হো-হো করে হাসছেন! ভাবা যায়! কে, কবে এমন একটা চোখধাঁধানো ঘটনা দেখেছে! আরে মশাই, যে লোক অষ্টপ্রহর ভেটকি মাছের মতো মুখ ভেঙিয়ে লঙ্কাকাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন, তাঁর মুখে হাসি দেখা মানে তো, বাদামগাছে কদম ফুলের শোভা দেখা।

হঠাৎ রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে ঠেস দিয়ে কড়কে উঠলেন, “আর যে মুখে কথা নেই? নিজে ভেড়া কিনা, তাই আমাকে ঘোড়া বলা হচ্ছে!”

মন্ত্রীমশাই খানিকটা অবাক চোখে রাজার দিকে তাকিয়ে খুবই নরম গলায় বললেন, “কই, আমি তো আপনাকে ঘোড়া বলিনি মহারাজ।”

রাজা কাক্কাবোক্কা আবার ধমকে উঠলেন, “আপনি তো আচ্ছা মিথ্যে কথা বলেন মশাই! এই বললেন ঘোড়া, আবার এই বলছেন বলিনি!”

এবার মন্ত্রীমশাই খুবই কাকুতি-মিনতি করে বললেন, “আপনাকে ঘোড়া বলা দূরে থাক, আজ্ঞে, আমি ঘোড়ার ‘ঘো’ পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করিনি।”

রাজা কাক্কাবোক্কা এবার ভয়ানক রেগে বলে উঠলেন, “ঘোড়ার ‘ঘো’ উচ্চারণ করেননি তো কী হয়েছে! আরে মশাই, আস্তাবলে ঘোড়ার ‘ঘো’ থাকে না তো কি ভেড়ার ‘ভে’ থাকে?” বলতে না-বলতেই হঠাৎ দেখা গেল, কাক্কাবোক্কার রাগ-রাগ মুখখানা কেমন হাসি হাসি হয়ে ‘ফিক’ করে শব্দ করে উঠল। উঠেই মিলিয়ে গেল।

মন্ত্রীমশাই থতমত খেয়ে গেলেন। হঠাৎ রাজা ‘ফিক’ করে উঠলেন কেন? মন্ত্রীমশাই দোনোমনো ভাবে রাজার মুখের দিকে তাকালেন।

রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীমশায়ের হাতটা আরও একটু বাগিয়ে ধরে রাজসভার লোকজনদের হুকুম করলেন, “আজকের রাজসভায় আর কোনও কাজ হবে না। আপনারা আজ আসতে পারেন।” বলেই আবার রাজা ‘ফিক’ করে উঠলেন। হ্যাঁ, এবার মন্ত্রীমশাই স্পষ্ট দেখে ফেলেছেন। এক টুকরো হাসি রাজার মুখ থেকে টসকে পড়ল। তিনি দেখলেন। দেখতে দেখতে হাঁদা হয়ে গেলেন।

“অমন হাঁ করে কী দেখছেন?” রাজা কাক্কাবোক্কা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন। জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীমশায়ের পেঁচিয়ে ধরা হাতটি ছেড়ে দিলেন।

মন্ত্রী খুব নরম গলায় উত্তর দিলেন, “রোজ যা দেখি না।”

“রোজ যা দেখি না মানে?” রাজা অবাক হলেন।

মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে, খোলসা করে বলব?”

রাজা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমি কি আপনাকে খোলসা না করে বলতে বলেছি?”

“আজ্ঞে তা হলে রোজ যা দেখি তা-ই আগে বলি।” মন্ত্রী উত্তর দিলেন।

“রোজ কী দেখেন?”

মন্ত্রী বলতে শুরু করলেন, “আজ্ঞে, আপনাকে দেখি। ওই আপনার মাথা দেখি। আপনার চোখ দেখি। চোখের পাশে নাক দেখি। নাকের নীচে গোঁফ দেখি। গোঁফের ফাঁকে নাকের গর্ত দেখি। গর্তের নীচে আবার গোঁফ। আবার গর্ত... আবার গোঁফ... আবার গর্ত...”

রাজা কাক্কাবোক্কা চোখ পাকালেন।

মন্ত্রীমশাই থমকে থামলেন।

কাক্কাবোক্কা মুখ নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বেশ তো হচ্ছিল, থামলেন কেন?”

মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন, “আর বলা যায় না বলে।”

রাজার চক্ষু রক্তবর্ণ হল, “আপনি কি আমার সঙ্গে রগড় করছেন?”

“ছিঃ, এ কী বলছেন আপনি! আমি কি আপনার সঙ্গে রগড় করতে পারি!” মৃদুকণ্ঠে উত্তর দিলেন মন্ত্রীমশাই।

রাজা কাক্কাবোক্কা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “একে রগড় বলে না তো কী বলে? গোঁফের ফাঁকে নাকের গর্ত, নাকের গর্তের নীচে আবার গোঁফ, আবার গর্ত... আবার গোঁফ... আমাকে বোকা ঠাউরেছেন? আমার গোঁফের নীচে আপনি আর কিছু দেখেন না?”

মন্ত্রীমশাই ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ দেখি! কিন্তু আজ যা দেখছি তা রোজ দেখি না!”

রাজা গলা চড়ালেন, “আপনি রোজ আমার গোঁফের নীচে ঠোঁট দেখেন না? মুখের হাঁ দেখেন না? হাঁ-এর পাশে দুটো কান দেখেন না? কানের গর্ত দেখেন না?”

মন্ত্রীমশাই আলতো গলায় সায় দিলেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ, দেখি। কিন্তু ওই যে বলছি, আজ যা দেখছি, তা রোজ দেখি না!”

রাজা হতভম্বের মতো হাত তুলে নিজের গোঁফে তা দিতে লাগলেন।

মন্ত্রীমশায়ের ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। হাসি পাওয়া এক জিনিস, আর হেসে ফেলা আর-এক জিনিস। এমন একটা তর্ক-বিতর্কের মাঝখানে হেসে ফেললে মন্ত্রীমশায়ের রক্ষে থাকবে না। তাই তিনি হাসিটা প্রাণপণে সামলে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে গোঁফে তা দিচ্ছেন কেন? আমি আপনার গোঁফের ওপরে কিছু দেখার কথা বলছি না। গোঁফের নীচে দেখার কথা বলছি।”

রাজা কাক্কাবোক্কা ঝট করে নিজের গোঁফের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “গোঁফের নীচে আপনি কী দেখছেন?”

“ফিক!” মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন।

রাজা কাক্কাবোক্কা অবাক হলেন, “ফিক? সে-জিনিসটা কী?”

“সে-জিনিসটা এমন, রোজ যে-জিনিসটা আপনার গোঁফের নীচে দেখা যায় না।” মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন।

রাজা কাক্কাবোক্কা নেহাতই হাঁদার মতো মন্ত্রীমশায়ের মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ফিক জিনিসটা কি সবারই গোঁফের নীচে দেখা যায়?”

মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে সময় হলেই দেখা যায়।”

রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “আপনারও দেখা যায়?”

“আজ্ঞে যায়।”

“তবে দেখছি না কেন?”

“আজ্ঞে দেখবেন কী করে? আমার ‘ফিক’ হাওয়া হয়ে গেছে।”

রাজা অবাক হলেন, “হাওয়া হয়ে গেছে?”

মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“কেন?”

“ভয়ে।”

“কার ভয়ে?”

“আজ্ঞে, আপনার ভয়ে।”

“আমার ভয়ে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। অবিশ্যি আপনি সাহস দিলে আমার ‘ফিক’কে ধরে আনতে বেশি সময় লাগবে না।” মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন।

রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “ঠিক আছে আমি সাহস দিলে যদি তাকে ধরে আনতে পারেন, তবে, আমি সাহস দিচ্ছি, এক্ষুনি তাকে ধরে আনুন।”

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে গাঁক গাঁক করে চেঁচামেচি করবেন না তো?”

রাজা চাপা গলায় ধমকে উঠলেন, “আপনার মশাই বুদ্ধিশুদ্ধি কবে হবে? আমি কি গোরু, না ষাঁড়? আমি রাজা। আমি চেঁচালে তাকে বলে গর্জন। ঠিক আছে, আমি চুপটি করে দেখব। ধরে আনুন আপনার ‘ফিক’কে।”

রাজা কাক্কাবোক্কা সাহস দিতেই মন্ত্রীমশাই উঠেছেন ফিক করে হেসে।

“হাসছেন যে?” রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন, “হাসিই তো! আপনার গোঁফের নীচে, ঠোঁটের ফাঁকে হাসি যেমন ফিক ফিক করে হেসে উঠছিল, আমিও তেমনই—”

“তার মানে আপনি আমাকে ভেংচি কাটলেন?” এই বুঝি রাজা রেগে টং হলেন! মন্ত্রীমশাইও ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন।

না, রাজা কাক্কাবোক্কা রাগলেন না। বললেন, “অন্যদিন হলে আমি আপনাকে দেখে নিতুম। ভেংচি কাটা বার করে দিতুম। এমন একখানি লাফ মেরে ঘাড়ে পড়তুম—” বলেই তিনি সত্যি-সত্যিই লাফিয়ে উঠলেন। মন্ত্রীমশায়ের ঘাড়ে অবিশ্যি পড়লেন না। কিন্তু মন্ত্রীমশাই রাজার লাফ দেখে এমন ভয় পেয়ে গেলেন যে তিনি আঁতকে উঠে হাঁক পাড়লেন, “কী করছেন? কী করছেন?”

রাজা বললেন, “তবে?” বলেই তিনি এবার ফিক ফিক করে নয়, হো-হো করে হেসে উঠলেন।

মন্ত্রীমশাই কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে রাজা কাক্কাবোক্কার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রাজা হাসতে হাসতেই মন্ত্রীমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝছেন?”

মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে কিছুই বুঝতে পারছি না!”

“আপনি আমার কেমন মন্ত্রী?”

“আজ্ঞে যেমন রাজা, তেমন মন্ত্রী।” বলে একটু থেমে মন্ত্রীমশাই রাজা কাক্কাবোক্কাকে বললেন, “আজ্ঞে যদি সাহস দেন, তা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”

“করুন। আজ আপনি যা খুশি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।” রাজা হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন।

মন্ত্রী আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে, আজ আপনার এত আহ্লাদের কারণ?”

রাজা কাক্কাবোক্কা হাসতে হাসতেই মন্ত্রীকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। নিজের মুখখানি মন্ত্রীর কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বললেন, “কথাটা খুবই গোপন। কাউকে বলবেন না তো?”

“আপনি এ কী বলছেন? রাজার গোপন কথা মন্ত্রী কখনও কাউকে বলে!”

“তবে শুনুন, আজ একটা খুবই আনন্দের কথা শোনা গেল। মহারানি নিজের মুখে আজ আমায় বলেছেন, আমার গায়ের রং মহারানির চেয়েও ফর্সা।” বলেই রাজা কাক্কাবোক্কা হো-হো-হো করে অট্টহাসি হেসে উঠলেন।

রাজার সঙ্গে মন্ত্রীও হেসে উঠলেন, হো-হো-হো!

রাজা আর মন্ত্রীর এমন দোকলা-হাসি বারবার দেখা যায় না। সুতরাং তাঁরা হাসুন। আমরা দেখি। রানির চেয়ে রাজার গায়ের রং ফর্সা, এ-কথা স্বয়ং রানিই যদি রাজাকে বলেন, তবে কোন রাজার হাসি উপচে পড়ে না শুনি? আর সেই হাসি শুনে, কোন রাজার কোন মন্ত্রী না-হেসে থাকতে পারেন?

হাসতে হাসতে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে বললেন, “এখন এ-কথাটা চাউর না-করাই ভাল, কী বলেন?”

মন্ত্রীমশাইও হাসতে হাসতে বললেন, “না, না, একদম না, একদম না। এই যে অনেকে বলে, আমার গায়ের রং আপনার চেয়েও উজ্জ্বল, তা সে-কথা কি আমি পাঁচকান করেছি? পাগল!”

ব্যাস! একনিমিষে সব গুবলেট। মুহূর্তের মধ্যে রাজা কাক্কাবোক্কার হাসি মুখ চুপসে আমচুর হয়ে গেল। কোথায় হাসি! রেগে তিনি ফোঁসফোঁস করতে লাগলেন! তিনি বুঝি এখনই একটা কিছু কাণ্ড করে বসেন! সেই মূর্তি দেখে মন্ত্রীমশায়ের ধাত ছেড়ে যাওয়ার গোত্তর। আর মন্ত্রীমশাইকেও বলি, আপনি তো মশাই রাজাকে নিয়ে এতদিন ঘর করছেন। কোন কথাটা বললে রাজা চটবেন, আর কোন কথাটা বললে রাজা আহ্লাদে আটখানা হবেন, এ-কথাটা এখনও পর্যন্ত আন্দাজ করতে পারেন না? কোন মন্ত্রী রাজাকে বলেন, “আপনার চেয়ে আমার গায়ের রং উজ্জ্বল?” ছিঃ! কথাটি বলে তিনি তো বুঝতেই পেরেছেন আর দেরি নেই, কোপ পড়ল বলে! সুতরাং যে পালায়, সে-ই বাঁচে, এই সোজা কথাটা মাথায় রেখে তিনি বললেন, “আমি তা হলে আসি মহারাজ?” বলেই তিনি পা বাড়ালেন।

রাজা কাক্কাবোক্কা খপাত করে ধরে ফেললেন মন্ত্রীকে। কড়কে উঠলেন, “আসি মানে?”

মন্ত্রীমশাই চুপ করে থাকলে ল্যাঠা চুকে যেত, তা নয় তিনি বলে ফেললেন, “আসি মানে এখন যাচ্ছি, পরে আসছি।”

রাজা কাক্কাবোক্কা তেমনই ধমক দিয়ে বললেন, “যাওয়া-আসাটা কি আপনার ইচ্ছের ওপর নির্ভর করছে? যেতে হয় চিরদিনের মতো যান। কিন্তু যাবার আগে প্রমাণ করে যান, আপনার গায়ের রং আমার চেয়ে উজ্জ্বল।”

আরে বাবা বলুন না, ভুল করে বলেছি!

না, মন্ত্রীমশাই তা বলবেন না। তিনি বললেন, “এতে প্রমাণ দেওয়ার কিছু নেই তো মহারাজ। সবাই বলে। নিশ্চয়ই আপনিও জানেন।”

রাজা কাক্কাবোক্কা ভীষণ জোরে ধাতিয়ে উঠলেন, “কেরমে কেরমে আপনার সাহস বেড়ে যাচ্ছে! আপনি আমাকে মিত্থুক বলছেন?”

মন্ত্রী যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “যাঃ বাবা! আপনাকে আবার মিত্থুক বললুম কখন?”

“এইমাত্তর বলেছেন, আপনার গায়ের রং আমার চেয়ে উজ্জ্বল, এটা সবাই বলে, এমনকী আমিও জানি। বলতে চান, আমি জেনেও না-জানার ভান করছি। আমি মিথ্যুক!” বলে রাজা গজরাতে লাগলেন।

মন্ত্রীমশাই ভয়ে-ময়ে কুঁকড়ে বলে উঠলেন, “ছিঃ, এ-কথা আমি বলতে পারি আপনাকে? আপনি শুধুমুধু আমার গায়ে পড়ে ঝগড়া করছেন মহারাজ।”

আচ্ছা, মন্ত্রীমশায়েরও কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল! কোন কথার কী মানে, তিনিও কি ভুলে বসলেন! রাজাকে কোন দেশের মন্ত্রী বলেন, গায়ে পড়ে ঝগড়া করছেন!

কিন্তু রাজা কাক্কাবোক্কা সত্যিই যে এবার মন্ত্রীর গায়ের ওপর তেড়েমেড়ে জাপটে পড়বেন, এ-কথা ঘুণাক্ষরেও বোঝা যায়নি। তিনি বেদম রেগেছেন। এই বুঝি তুলোধোনা করে ছাড়েন মন্ত্রীকে! শুরু হয়ে গেল টানামানি। এক্ষুনি কোস্তাকুস্তি লাগল বলে! এই বুঝি রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে পটকে ফেলেন মাটিতে। মন্ত্রীমশাইও কম যান না। তিনিও জানেন কেমন করে হ্যাঁচকা মেরে রাজাকে কাবু করতে হয়। তিনি মারলেন হ্যাঁচকা। মেরেই ছুট। রাজাও ছোটেন। মস্ত সেই রাজসভার ঘরে শুরু হয়ে গেল চোর-পুলিশ খেলা। ইনি ধরতে যান তো উনি পালান। উনি ধরতে যান তো তিনি পালান।

শেষে ফাঁক পেয়ে সত্যি-সত্যি মন্ত্রী পালালেন। দে লম্বা।

কাক্কাবোক্কাও ছাড়বার পাত্র নাকি! তিনিও দিলেন তাড়া।

মন্ত্রী ছোটেন, রাজাও ছোটেন। রাজবাড়ির অগুনতি লোক তা-ই দেখে একেবারে ভ্যাবাচাকা-হাম্বা।

রাজবাড়ির দরদালান দিয়ে ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি টপকে ওপরতলায় পৌঁছে গেলেন মন্ত্রী। পেছনে রাজা। মন্ত্রীও হাঁপান, রাজাও হাঁপান। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে অলিন্দ পেরিয়ে মন্ত্রীমশাই ঢুকে পড়েন নিজের ঘরে। হুড়োহুড়ির শব্দ শুনে মহারানি ছুটে এসেছেন। রাজা কাক্কাবোক্কা পড়বি তো পড় একেবারে তাঁর মুখের সামনে। রাজা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাঁপাচ্ছেন তিনি।

“কী ব্যাপার?” অবাক হলেন মহারানি, “ছুটছেন কেন?”

এমন করে রানির সামনে যে তিনি অপ্রস্তুতে পড়ে যাবেন, এ-কথা একেবারেই ভাবতে পারেননি। তাই তিনি কী উত্তর দেবেন ভেবে না পেয়ে বলে ফেললেন, “আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।”

মন্ত্রীমশাইও কম যান না, তিনি নিজের ঘরের দরজা ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “খিদে আমারও পেয়েছে।”

ফিক করে হেসে ফেললেন রানি। মনে মনে ভাবলেন, ওঃ, ওদের খুনসুটি আর থামবে না কোনওদিন! ভাবতে ভাবতে তিনি খাবারের তোড়জোড় করতে চললেন। অবিশ্যি সেদিনের ভোজটা কেমন জমেছিল সেটা আমরা জানতে পারিনি।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%