আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে

শৈলেন ঘোষ

মাঝে মাঝে এমন সব আজগুবি ভাবনা হুটহাট যে রাজা কাক্কাবোক্কার মাথায় কোথা থেকে আসে, কে জানে! আসুক, বার বার আসুক, তাতে তোমার-আমার বলার কিছু নেই। কারণ মাথাটা তো তোমার-আমার নয়, স্বয়ং কাক্কাবোক্কার। সুতরাং তাঁর মাথায় আজগুবি ভাবনা না-এলেই আশ্চর্য হতে হয়। ঠিক আছে, তোমার ভাবনা তোমার মাথায় এল, তুমি নিজেই তার হিল্লে করলে, না-হয় মাথার ভাবনা মাথার ভেতরেই মিলিয়ে গেল, এই তো সার কথা। তা নয়, তোমার ভাবনা নিয়ে তুমি এমন তুলকালাম শুরু করে দিলে যে, সবাই ভয়ে একেবারে থরহরি। এমনকী, অমন যে মন্ত্রীমশাই তাঁকে পর্যন্ত এমন তুর্কি নাচান নাচিয়ে ছাড়ে না যে দেখলে মায়া হয়। এই যে আজ যেমন তুমি হুট করে বলে বসলে, “আমি দুটো হব।”

দুটো হব মানে!

মানেটা জলের মতো সোজা। তুমি রোজ আয়নায় মুখ দেখে চুল আঁচড়াও। মুখের চেহারাটা ভাল করে দেখে ফিটফাট হয়ে বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাও। তেমনই আজ রাজামশাই আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতে ফিটফাট হচ্ছিলেন। তবে, বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার জন্যে নয়। রাজার মতো সাজার জন্যে। তা, রাজাকে তো রাজার মতো সাজতেই হয়। নইলে, রাজাকে রাজা বলে মানবে কেন লোকে। মাথার পাগড়িটা মাথায় ঠিক ঠিক আছে কি না, সোনার ভারী কাজ করা জামাটা গায়ে ফিটফাট হল কি না, হিরে বসানো গয়নাগুলো গলায় ঝিলিক দিয়ে ঝলমল করছে কি না, এ তো একবার দেখে নিতেই হয়। এমনকী, গোঁফটা পর্যন্ত দু’বার মোচড় দিয়ে দেখে নিতে হয়, রাজকীয় হল কি না। এ তো তাঁর নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু আজ হঠাৎ তাঁর মনে হল, তিনি যদি আয়নায় দেখার মতন অমন আর একটা হতে পারেন! মানে দু’-দুটো রাজা, একেবারে দু’-দুটো কাক্কাবোক্কা! তা হলে তো বেশ হয়! একজন কাক্কাবোক্কা যখন ঘুমোবে আর একজন কাক্কাবোক্কা তখন জেগে জেগে রাজকার্য দেখাশোনা করবে। একজন যখন রানির সঙ্গে গল্প করবে, অন্যজন তখন জলসা ঘরে নাচ দেখবেন। উফ! কী মজা! ভাবতে ভাবতে রাজা কাক্কাবোক্কার গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে! কিন্তু একটা মানুষ যে কী করে দুটো হবে সেটা তো তিনি জানেন না। কী দরকার তাঁর নিজের জানার! যাঁর জানার তিনি জানবেন। তিনি শুধু হুকুম করবেন। তাঁর হুকুম মতো ঠিকঠাক কাজ হচ্ছে কি না এটা দেখাই তাঁর কাজ। সুতরাং ডাক ডাক মন্ত্রীমশাইকে ডাক। মন্ত্রী ছাড়া তাঁর এমন একটা আজগুবি আবদারের হিল্লে আর কে করবে? না-পারলে যাও, মন্ত্রিত্ব ছেড়ে মানে মানে পথ দ্যাখো! তা বলো, মন্ত্রিত্ব ছেড়ে কে আর পথে বসতে চায়? তাই ডাক পড়তেই মন্ত্রীমশাইও সুড়সুড় করে রাজার সামনে হাজির। দ্যাখো আবার, কী বলতে কী বলেন রাজা কাক্কাবোক্কা! কী হুকুম করেন!

না, কাক্কাবোক্কা কোনও হুকুম করলেন না। শুধুই জিজ্ঞেস করলেন, “কাল রাতে আপনার ঘুম হয়েছে?”

মন্ত্রী চমকে উঠলেন। অবাক-চাউনি ঝলসে উঠল তাঁর চোখে। মনে মনে ভাবলেন, কী রে বাবা, ঘুমের কথা জিজ্ঞেস করেন কেন রাজামশাই! কী মতলব! কোনও প্যাঁচে-ট্যাঁচে ফেলবেন নাকি!

“কী মশাই, উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”

মন্ত্রী থতমত খেয়ে বলে ফেললেন, “আমি ভাবছি।”

“ভাবছি মানে?” কড়কে উঠলেন রাজা, “এই সোজা কথাটার উত্তর দিতে ভাবতে হচ্ছে আপনাকে? আশ্চর্য! রাতে আপনার ঘুম হয়েছে কি হয়নি, এর উত্তরে হয় বলবেন, ‘হ্যাঁ’ না-হয় বলবেন, ‘না।’ এতে ভাববার কী আছে?”

মন্ত্রীমশাই আমতা আমতা করতে লাগলেন রাজামশায়ের কথা শুনে। তারপর থমকে থমকে বললেন, “আসলে কী জানেন মহারাজ, ঘুম পেলে মানুষ ঘুমোয়, না পেলে জেগে থাকে।”

রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর জবাব শুনে যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আমি তো দেখছি দিনকে-দিন আপনার মগজখানি পাকা তালশাঁস হয়ে উঠছে। আমি জিজ্ঞেস করছি এক কথা, আপনি উত্তর দিচ্ছেন আর-এক কথার। আমি জিজ্ঞেস করছি, কাল রাতে আপনার ঘুম হয়েছে কি না? কী হলে মানুষে ঘুমোয়, আর কী হলে মানুষ ঘুমোয় না, সে-কথা কি জিজ্ঞেস করছি মশাই?”

মন্ত্রীমশাই ভাবলেন দরকার নেই বাবা আর কথা বাড়িয়ে। রাজামশাই থেকে থেকে এমন খেপে খেপে উঠছেন! শেষকালে কী করতে কী করে বসেন ঠিক নেই। তার চেয়ে বরং সোজাসুজি বলে দেওয়াই ভাল। তাই তিনি বলেই দিলেন, “মহারাজ, রাতে আমার ঘুম তেমন কোনওদিনই হয় না। হলেও তা হয় ফসকে ফসকে।”

“ফসকে ফসকে?” রাজা অবাক হলেন।

“আজ্ঞে!” মন্ত্রী উত্তর দিলেন।

“সেটা কী ধরনের ঘুম?” রাজা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।

“সেটা ওই রকমের। মানে ধরুন, যখন চোখে এই ঘুম ছুঁই ছুঁই করছে, তখন অমনই মাথায় এমন দুম করে দুশ্চিন্তা গেড়ে বসে যে, কার সাধ্যি ঘুমোয়। তখন চোখের ঘুম ফসকে উধাও।”

“বাহ্! আপনি তো বেশ বানিয়ে কথা বলতে পারেন।” রাজার কথায় ঠাট্টার সুর।

ভয় পেলেন মন্ত্রী, “কেন মহারাজ, ‘বানিয়ে’ বলছি, বলছেন কেন? আমি যা সত্যি তা-ই তো বলছি।” উত্তর দিলেন তিনি আড়ষ্ট গলায়।

রাজা ধাতিয়ে উঠলেন, “হুঁঃ, সত্যি! যে সত্যি বলে সে কখনও এত ধানাই-পানাই করে কথা বলে না।”

“কেন মহারাজ এ-কথা কেন বলছেন?” জিজ্ঞেস করলেন মন্ত্রী।

“জানতে পারি কি কাল আপনার ঘুম ভেঙে ছিল কি না?”

“হ্যাঁ হুজুর ভেঙেছিল।”

“ভেঙেছিল তো কী করছিলেন তখন?”

মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে প্রথমটা তখন বিছানায় শুয়ে শুয়েই এপাশ-ওপাশ করলুম। যখন আর কিছুতেই চোখে ঘুম এল না, তখন অলিন্দে এসে দাঁড়ালুম। মুখ বাড়িয়ে আকাশ দেখতে লাগলুম।”

“আপনার ঘরের থেকে আমার ঘরের অলিন্দটা কত দূরে?” রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

“আজ্ঞে এপার আর ওপার।”

“দেখা যায়?”

“আজ্ঞে স্পষ্ট দেখা যায়।”

“তো, কাল রাত্রে অলিন্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনি আকাশ দেখলেন আর আমায় দেখতে পেলেন না?”

“কেন হুজুর, কাল রাত্রে আপনিও ঘুমোননি?” মন্ত্রী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“কেন, আমার মুখ দেখে কি সেটা বোঝা যাচ্ছে না?” রাজা কাক্কাবোক্কা বেশ তিরিক্ষি মেজাজেই জিজ্ঞেস করলেন।

“আজ্ঞে মহারাজ, রাজার মুখ দেখে সব সময় সবকিছু বোঝা যায় কি?” উত্তর দিলেন মন্ত্রী।

ব্যাস! মন্ত্রীমশায়ের মুখ থেকে যেই না ওই কথা শোনা, রাজা রেগে আগুন, বললেন, “রাজার মুখ দেখে সবকিছু বোঝা যায় না যখন, তখন আপনার মতো মন্ত্রীর দরকার নেই আমার।”

রাজার মুখে এমন কথা শুনতে শুনতে মন্ত্রীমশায়ের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। এতদিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন, ওসব রাজার ভয় দেখানো কথা। তাঁকে ছাড়া রাজা একপাও চলতে পারবেন না। তাই তিনি এবার একটুও ভয় না-পেয়েই বলে উঠলেন, “তার মানে আপনি বলতে চান, আপনি কখন ঘুমোন, না-ঘুমোন, কখন খিদে পায়, না-পায়, কখন কাশবেন, না-কাশবেন, সব খবর আমায় জানতে হবে আপনার মুখ দেখে?”

“আলবাত!” রাজার গলা ধমকে উঠল, “এই যে আমি কাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি, এই যে আমি কাল সারারাত ধরে ঘর-বার করেছি, এই যে সারারাত ধরে আমি ‘দুটো হব, দুটো হব’ করে ছটফট করেছি, সব খবর আমার মুখ দেখেই আপনার বোঝা উচিত ছিল।”

মন্ত্রীমশাই আঁতকে উঠলেন রাজা কাক্কাবোক্কার কথা শুনে। কী রে বাবা, ‘দুটো হব, দুটো হব’ বলে রাজা সারারাত ঘর-বার করেন কেন? ‘দুটো হব’ মানে! আবার কী আজগুবি খেয়াল চাপল রাজার মাথায়! তিনি ভীষণ ধন্দে পড়ে হাঁসফাস করতে লাগলেন।

“কী মশাই, আমার কথার উত্তর না দিয়ে অমন হাঁসফাঁস করছেন কেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?” বলতে বলতে রাজা কাক্কাবোক্কা চোখ টেরিয়ে দেখলেন মন্ত্রীকে। দেখতে দেখতে বললেন, “যত দিন যাচ্ছে আপনার বুদ্ধিটাও তত ভোঁতা হচ্ছে।”

মন্ত্রীমশাই আনমনে আঁক করে উঠলেন। তারপর ধড়ফড় করে বলে ফেললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, বুঝতে পারলুম না।”

“কী বুঝতে পারলেন না?”

“মহারাজ, আপনার কথার ঠিক মানে বুঝতে পারলুম না?”

“কোন কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারলেন না?”

“ওই যে বললেন, ‘দুটো হব’ ওই কথাটার মানে!”

এবার সত্যি তুঙ্গে উঠল রাজা কাক্কাবোক্কার মেজাজ। তিনি তেড়ে একখানা দাবড়ি মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আপনি ঘোড়ার ডিমের মন্ত্রী। ‘আমি দুটো হব’ এই সোজা কথাটার মানে বোঝেন না মশাই? আপনি কি আয়নায় নিজের চেহারা দেখেননি কোনওদিন? যখন আয়নায় আপনার নিজের চেহারা ঝলসে ওঠে, তখন কি আপনি একটা থাকেন, না, দুটো হয়ে যান? এ্যাঁ?”

মন্ত্রীমশাই আর থাকতে পারলেন না। হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “ও হরি, আপনি এরকম দুটো হতে চান? সে আর এমনকী কথা। সে তো আয়নার সামনে দাঁড়ালেই হতে পারেন!”

“আপনার মুন্ডু!” কী জোর বকা দিলেন রাজা কাক্কাবোক্কা।

বকা শুনে মন্ত্রীমশায়ের হাসি, মুখেই আটকে গেল।

রেগে রাজার চক্ষু লাল। বললেন, “আপনার মশাই বুদ্ধিশুদ্ধি কবে হবে? আমি কি আপনার ঠাট্টার পাত্তর? আমার সামনে হো-হো করে হাসছেন! যান ব্যবস্থা করুন এক্ষুনি!”

“আজ্ঞে কীসের ব্যবস্থা?” কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মন্ত্রীমশাই।

“আমাকে দুটো করার ব্যবস্থা করুন। আয়নায় দুটো সবাই তো হয়। সে তো মশাই ছায়া। আমি হতে চাই দুটো রাজা। দুটো জ্যান্ত মানুষ। আমি একটা ঘুমোব যখন, অন্য একটা ঘোড়ায় চড়ে ঘুরব তখন।”

রাজামশায়ের কথা শুনে মন্ত্রীমশায়ের পিলে চমকে উঠল। তিনি চক্ষু কপালে তুলে চিৎকার করে উঠলেন, “অসম্ভব, এ আবার হয় নাকি? একটা মানুষ কখনও দুটো হয়?”

“হয় না মানে?” রাজার চক্ষু কটমট করে উঠল। কটমটে চক্ষু তাঁর মন্ত্রীর মুখের ওপর গিয়ে পড়ল। তেড়েমেড়ে আবার বলে উঠলেন, “হয় না মানে? রাজার কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। রাজার মুখ থেকে একবার যা বেরোয়, তা হতেই হবে। যান, আমাকে দুটো করার জন্যে যা করার দরকার করুন গে যান।”

মন্ত্রী খানিক হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর ভাবলেন, এই অবুঝ রাজার সঙ্গে তর্ক করলে কথাই বাড়বে, কাজ কিছু হবে না। তার চেয়ে বরং মানে মানে কেটে পড়াই ভাল। এই কথা ভাবতে ভাবতে তিনি তখনকার মতো সরে পড়লেন।

কিন্তু সরে পড়লে কী হবে, ভাবনা তো আর পিছু ছাড়ে না। রাজার এই এমন একটা উদ্ভট আবদারের হাত থেকে কেমন করে যে নিষ্কৃতি পাবেন, সেই চিন্তায় তিনি জেরবার হয়ে গেলেন। শেষমেশ কোনও উপায়ই খুঁজে বার করতে না-পেরে তিনি ছুটলেন জ্যোতিষমশায়ের কাছে। দেখা যাক তিনি কী বলেন!

এমন অসময়ে মন্ত্রীমশাইকে তাঁর ঘরে আসতে দেখে অবাকই হলেন জ্যোতিষমশাই। ভাবনায় অস্থির হয়ে মন্ত্রীমশায়ের মুখখানা শুকিয়ে যে এইটুকু হয়ে গেছে, সেটাও তাঁর চোখ এড়াল না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল মন্ত্রীমশাই, এমন অসময়ে আমার কাছে?”

“আর বলেন কেন,” মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন, “রাজামশাই আমাকে ভীষণ বিপদে ফেলেছেন!”

“কীসের বিপদ?”

“দেখুন দিকিনি, রাজামশাই আবদার ধরেছেন, তিনি দুটো হবেন, জ্যান্ত মানুষের মতো দুটো! আর এই জ্যান্ত দুটো মানুষ হওয়ার ব্যবস্থা আমাকেই করে দিতে হবে। বলুন তো, কী অসম্ভব ব্যাপার।”

জ্যোতিষমশাই হো-হো করে হেসে উঠলেন, মন্ত্রীমশায়ের কথা শুনে। তারপর বললেন, “যাই বলুন রাজামশায়ের মাথা আছে। দেখুন এই উদ্ভট চিন্তাটা মাথায় এসেছে তো! এমন চিন্তা ক’টা লোকের মাথায় আসে বলুন?”

“আরে মশাই, আপনি রাজার মাথার তারিফ করছেন, এদিকে আমার মাথায় যে গোলমাল বাধে। আমি যে পাগল হতে বসেছি মশাই!”

জ্যোতিষ বললেন, “আরে মশাই আপনি পাগল হবেন কেন, আপনি যদি আমার বুদ্ধি নেন, রাজামশায়ের মাথা থেকে ‘দুটো’ হওয়ার ভাবনা চিরদিনের মতো মুছে যাবে।”

খুব আগ্রহের সঙ্গে মন্ত্রীমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “কী রকম, কী রকম?”

জ্যোতিষমশাই বললেন, “গাছে তো এখন আম পেকেছে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। এ বছর ফলনও হয়েছে যথেষ্ট।” মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন।

“তা হলে একটা যদি কাজ করতে পারেন।”

“কী কাজ মশাই?”

“কাজটা শক্ত। রাজামশাইকে বলুন, আমগাছে আম পেকেছে। আপনাকে গাছে উঠে সবচেয়ে বড় পাকা আমটি খুঁজে বার করতে হবে। সেটি পেড়ে গাছে বসে খেলেই আপনি দুটো হয়ে যাবেন।”

মন্ত্রী বললেন, “বুদ্ধিটা আপনি মন্দ বলেননি। কিন্তু রাজামশাইকে গাছে তোলা যাবে কী করে?”

“আরে মশাই, এটাও বলে দিতে হবে? মই, মই। মই বেয়ে রাজামশাইকে গাছে উঠতে বলবেন। তিনি মই বেয়ে গাছে ওঠার পরও মইটি যেন সরিয়ে নেবেন না। যেমন ছিল তেমনই গাছে হেলিয়ে রেখে আপনি সরে পড়বেন। সরে পড়ার সময় বলে যাবেন, “রাজামশাই মই রইল গাছে হেলে। আপনার কাজ হলে মই বেয়ে আবার নেমে আসবেন। আমি আড়ালে থাকব। কেননা, আপনি যখন পাকা আমটি মুখে দেবেন, তখন যদি আমার নজর লেগে যায়, তবে কাজ হবে না।”

জ্যোতিষমশায়ের কথা শুনে মন্ত্রীমশাই দোনোমনো করতে করতে রাজা কাক্কাবোক্কার সামনে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁকে জ্যোতিষমশায়ের পরামর্শমতো সমস্ত কথা বললেন। আশ্চর্য, রাজা কাক্কাবোক্কা একটুও গাঁইগুই করলেন না। সটান রাজি হয়ে গেলেন। মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে রাজা ঠিক করলেন, খুব ভোরে, কাকপক্ষী ওঠার আগে তাঁরা দু’জনে রাজবাড়ির গায়ে যে আমবাগান আছে, সেখানে যাবেন। মানুষের ঘুম ভাঙার আগেই, তিনি গাছের সবচেয়ে বড় পাকা আমটি খেয়ে দুটো হয়ে মই বেয়ে নেমে আসবেন। তারপর কেল্লাফতে! উফ! তখন সারা রাজ্যে হই হই কাণ্ড বেধে যাবে। সুতরাং কালকের ভোরের জন্যে আজ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন কাক্কাবোক্কা।

কথামতো খুব ভোরে রাজা আর মন্ত্রী চললেন আমবাগানে, নিঃসাড়ে। কেউ ঘুণাক্ষরে টেরও পেল না। বাগানের মইটি রাজা আর মন্ত্রী দু’জনেই টানতে টানতে সবচেয়ে উঁচু আমগাছের গায়ে হেলিয়ে রাখলেন। তারপর মন্ত্রী ইশারা করতেই রাজা কাপড়ে মালকোচা মেরে চোরের মতো, মই বেয়ে গাছের ওপর উঠতে লাগলেন। মন্ত্রী পড়লেন সরে। দেখতে লাগলেন আড়াল থেকে রাজার কাণ্ডকারখানা।

আরে বাবা, রাজা কি আর গাছে উঠেছেন কোনওদিন? সুতরাং কোন ডালে সবচেয়ে বড় পাকা আমটি ঝুলছে, সেটি খুঁজতে তাঁকে এ-ডাল-ও-ডাল করতেই হবে। কাজেই তিনি এ-ডাল থেকে ও-ডাল হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। কখনও তাঁর হাত ফসকায়, নয়তো পা হড়কায়। কখনও কোঁত পাড়েন, নয়তো কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে। শেষমেশ হাঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে তিনি নাজেহাল হয়ে যান। কোন আমটি যে সব চেয়ে বড়, ঠাওর করতে পারেন না।

এদিকে ভোর তো কেটে রোদ উঠেছে। লোকজন তো ঘুরছে-ফিরছে। আমবাগানের নজরদাররা তো লাঠিসোঁটা নিয়ে পাহারা দিতে শুরু করেছে। সুতরাং রাজামশাই এবার বুঝি পড়লেন ধরা।

বলতে না-বলতেই একজন পাহারাদার গাছের গায়ে মই দেখেই ঘাবড়ে গেছে। এ কী কাণ্ড! আমগাছে মই লাগানো কেন? কে লাগাল? পাহারাদারকে গাছের নীচে দেখে রাজামশায়ের বুক উঠল ঢিপঢিপিয়ে। তিনি গাছের ডালে সিঁটিয়ে গা ঢাকা দিলেন। লুকোলে কী হবে? পাহারাদারদের চোখ ঠিক দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েই মই বেয়ে সে তরতর করে উঠে গেছে। উঠেই চেঁচিয়ে উঠেছে, “আমচোর! আমচোর!” রাজাকে চিনতেই পারেনি সে।

পাহারাদারদের চেঁচামেচি শুরু হতেই, রাজা কাক্কাবোক্কা কিছু ভেবে না পেয়ে গাছের ওপর থেকে দিলেন লাফ। একেবারে মাটিতে। উঃ হু-হু-হু! বড্ড লেগেছে। লাগলে কী হবে! চেঁচামেচিতে এক্ষুনি লোকজন জড়ো হয়ে যাবে। কাজেই লাগলেও তাঁকে ছুটতে হবে। তিনি পড়েই উঠে পড়লেন। মারলেন ছুট। উঃ হু-হু-হু। তাঁর ভীষণ লাগছে। তিনি খোঁড়াচ্ছেন।! খোঁড়াতে খোঁড়াতেই তিনি পালালেন বাগান থেকে। বাগান থেকে সটান রাজবাড়ির খিড়কির দোর দিয়ে নিজের ঘরে।

চেঁচামেচি শুনে ততক্ষণে চোর ধরার জন্যে বাগানে লোকে লোকারণ্য। তারাও ছুট দিল এদিক-ওদিক-সেদিক। তখন কোথায় চোর। চোর তখন তাঁর শয়নকক্ষে। বিছানার গদির ওপর শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণায় হাঁসফাস করছেন। অবিশ্যি খুব সামলে-সুমলে। যেন কেউ না শুনতে পায়। শুনলে, কী লজ্জা!

আর, ওদিকে মন্ত্রী তখন জ্যোতিষমশায়ের গলা জড়িয়ে বেদম হাসি জুড়ে দিয়েছেন। এখন খানিকটা হেসে নেওয়া যাক। পরে কী হবে, সে পরে দেখা যাবে।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%