পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং

শৈলেন ঘোষ

আহ্‌! আহ্‌! সকালটি দ্যাখো, কী চমৎকার! যেন ঝলমল করে জলুস ছড়াচ্ছে! হাওয়া বইছে ফুরফুর। শিশিরভেজা গাছের পাতা নড়ছে তিরতির। সূর্য-আলো ঝিলিক দিয়ে পাতার ওপর দুলছে—দুলদুল। এমন সময় কার আর শান্তশিষ্ট-ল্যাজবিশিষ্ট হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। তাই, ছোট্ট একটা গঙ্গাফড়িং পিড়িং-পিড়িং ভাবল, যাই, এবার একটু বাতাসে ভেসে রোদে সাঁতার কেটে আসি।

ভাবতে না-ভাবতেই পিড়িং-পিড়িং গঙ্গা ফড়িং তার ফিনফিনে ডানা ছড়াল বাতাসে। সাঁতার দিল ঝুরঝুর সোনাঝুর রোদে। কী ভালই না লাগছে। আর সত্যি-সত্যি তার এমন ভাল লেগে গেল যে, মনটা তার কেবলই নাচা-নাচি করতে লাগল। শেষকালে আর থাকতে না-পেরে গিয়ে বসল একটা শিউলি ফুলের গাছের দোলনায়। দোলনা হাওয়ায় দোল খায়, একটি একটি ফুল টুপটুপ ঝরে পড়ে। পিড়িং-পিড়িং দোলনায় চেপে নাচ করে, দুটি দুটি ফুল টুপটাপ ছড়িয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে যখন গাছের তলা ফুলে ফুলে ভরে গেল তখন পিড়িং-পিড়িং আর থাকতে পারল না। তার ভীষণ গান গাইতে ইচ্ছে করল।

পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং তখন শিউলি গাছের একডালে উড়ে ও-ডালে বসে ঘাসের ওপর নেমে এল। নেমে এসে মনে মনে ভাবতে লাগল, কী গান গাই? কী গান গাই? ভাবতে ভাবতে সে তিড়িং করে লাফ মেরে বসল গিয়ে একটা কাশফুলের গাছে। বসতেই কাশফুলের ফুটফুটে পাপড়ি এমন খিলখিল করে হেসে উঠল যে পিড়িং-পিড়িং ভয়েময়ে পা পিছলে পড়ে আর কী! সে দিল লাফ। আবার ঘাসে। খিলখিলে-হাসা পাপড়ি তখন হাসি থামিয়ে বলে উঠল, “আরে ভাই পিড়িং-পিড়িং, ভয় পাবার কিছু নেই। পালাচ্ছ কেন? তুমি আচমকা আমার গায়ে বসলে বলেই আমার সুড়সুড়ি লেগে গেল। তাই হেসে ফেলেছি।”

পিড়িং-পিড়িং হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলল, “তাইং বলং! হাসিং শুনে আমিং ভয়েং মরিং।”

কাশের পাপড়ি পিড়িং-পিড়িং-এর কথা শুনে আবার হেসে উঠল।

পাপড়িকে হাসতে দেখে কপালে চোখ উঠিয়ে পিড়িং-পিড়িং ফিনফিনে গলায় জিজ্ঞেস করল, “কীং হলং? বারংবার হাসছং যে?”

পাপড়ি বলল, “হাসছি তোমার কথা শুনে।”

“কেনং?”

পাপড়ি উত্তর দিল, “তুমি ফড়িং তোমার কথাগুলোও কেমন ফড়িং-ফড়িং।”

এবার পিড়িং-পিড়িং একটু চটিং চটিং গলায় বলল, “তুমিং তো আচ্ছা বোকাং। ফড়িং-এর গলাং ফড়িং-ফড়িং হবেং না তো কিং ব্যাঘ্রং ব্যাঘ্রং হবেং? যাও, এ নিয়েং বর্তমানে আমিং তর্কাতর্কি করতে চাই নাং। আমিং এখন অন্য কথাং নিয়ে ভাবছিং।”

পাপড়ি জিজ্ঞেস করল, “কী কথা নিয়ে ভাবছ?”

পিড়িং-পিড়িং উত্তর দিল, “গানের কথাং।”

“কী গান?”

“আরে বাবাং সেটাই যদি জানাং থাকতং, তবে এত কথাং বলার দরকার ছিলং না।”

পাপড়ি জিজ্ঞেস করল, “গান গাইবার ইচ্ছে হয়েছে বুঝি তোমার?”

“আজ্ঞেং,” পিড়িং-পিড়িং চোখ টেরিয়ে উত্তর দিল।

পাপড়ি বলল, “আমার একটা গান মাথায় এসেছে। যদি বলো শোনাতে পারি।”

“তুমিং গাইবেং?”

“না রে বাবা না। গাইবে তুমি। আমি খালি কথাগুলো তোমাকে শোনাব।” ফড়িং বলল, “বলং, শুনিং!”

পাপড়ি বলল, “বলছি, কিন্তু তোমার ভাল লাগবে কিনা জানি না।”

“আরেং বাবাং ভালং মন্দং পরের কথাং। আগে বলং, শুনিং।”

পাপড়ি বলতে শুরু করল:

পিড়িং-পিড়িং গান গাইবেং

তিড়িং বিড়িং নেচেং

গান শুনেং তার ব্যাঘ্রমশাই

দিলেন গায়ে হেঁচেং।

পিড়িং-পিড়িং গাইছে শুনেং

ঢুলুং ঢুলুং গাধাং

আকাশে ঠ্যাং তুলেং তিনিং

ঘুমিয়ে হলেন কাদাং।

বাহং! বাহং! পাপড়ির মুখে গানের কথা শুনে পিড়িং-পিড়িং চিৎকার করে তারিফ করে উঠল। বলল, “তুমিং যে এত বড়ং কবিং এতোং আমার জানাং ছিলং না।”

পাপড়ি উত্তর দিল, “এবার তুমি গাও! দেখি, তুমি কত বড় গাইয়ে।”

পিড়িং-পিড়িং-এর প্রথমটা একটু বাধো বাধো ঠেকল। তারপরে চিনচিনে গলাটাকে একটু কেশে সাফ করে নিলে। নিয়েই গেয়ে উঠল: “পিড়িং পিড়িং গান গাইছেং...”

চেঁচিয়ে উঠল পাপড়ি তালি দিয়ে, “চমৎকার! চমৎকার!”

গাইতে গাইতে ভেসে গেল ফড়িং বাতাসে। ও হো! সে কী গানের বহর। বাতাসও যেন সে-গান শুনে দুলে উঠছে!

গাইতে গাইতে বাতাসে ভেসে সে চলে এল অনেকটা দূরে। হঠাৎ সে দেখতে পেল, একটা উঁচুমতো ঢিপি। ঢিপিটা দেখে গান থামাল সে। ভাবল, যাই, ঢিপিটার ওপর বসে এবার গান গাই। গাওয়াও হবে, জিরনোও হবে। গান যখন গাইতে পেরেছি, এখন আর কী ভাবনা।

বলতেই পারি, এখন আমি বনের রাজা না-হলেও, গানের রাজা। ওই ঢিপিটা আমার সিংহাসন। এইসব ভাবতে ভাবতে, ঢিপিটার ওপর বসে গান ধরল আবার! আহা! গান বটে! কী মিষ্টি!

এ কী! গাইতে গাইতে হঠাৎ যেন পিড়িং-পিড়িং চমকে উঠল। কী ব্যাপার!

চমকে তো উঠবেই। কেন না তার মনে হল সিংহাসনটা যেন নড়ে উঠেছে! সিটিয়ে গেল পিড়িং-পিড়িং। গান থামিয়ে চুপ করে বসে রইল সে খানিক। না, আর নড়ছে না। ধ্যাত, ঢিপি কখনও নড়ে! মনে হয় মনের ভুল। আবার গান ধরল ফড়িংটা।

“এ্যাই!” সিংহাসনটা যেন ভেতর থেকে ধমক মারল! ধমক মেরে বলল, “আমার ঘাড়ে চেপে গান গাওয়া হচ্ছে! দেব নাকে কামড়ে!”

গঙ্গাফড়িং ঢিপির ওপর থেকে মারলে এক লাফ! মেরেই মাটিতে। কীরে বাবা, ঢিপির ভেতর ভূত নাকি! মাটির ওপর বসে সে ঢিপির দিকে চেয়ে রইল জুলজুল করে। অনেকক্ষণ। কই, আর তো কারও গলা শোনা যাচ্ছে না!

পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং ভাবল, ধুস, সে একটা আস্ত বোকা! কে কথা বলল তার নেই ঠিক, ভেবে বসল, ঢিপির ভেতর ভূতে কথা বলছে! তাই সে মনে মনে বলল, যাই, আর একবার দেখি। বলে, তিড়িং করে লাফ দিয়ে ঢিপির ঘাড়ে চড়ে বসল। বসে তেড়েমেড়ে গান ধরল। যেই না গান ধরা, ঘটে গেল উলটো বিপত্তি। অমনি সেই ঢিপিটা নাচতে শুরু করে দিলে:

ধিন ধিন ধিন তাক,

গিলে খাব তোর নাক।

আর দেখতে হয়, ভয়ে ছিটকে ফড়িংটা পড়ল গিয়ে ঘাসের গাদায়। অমনই সেই ঢিপির মতো দেখতে খোলটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা লম্বা মতো মুখ। হ্যা-হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠল সেই মুখটা। হাসতে হাসতে বলল, “কেমন ঠকালুম। পিড়িং ভায়া, তুমি শেষে আমার খোলটাকে তোমার সিংহাসন ঠাউরালে। আরে রামো, রামো তুমি আমাকে চেনো না? আমি শামুক!”

ফড়িং তো থ। হাঁদা গঙ্গারামের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “যাঃ চল্লেং, আমিং, তো আচ্ছা বোকাং।” তারপর দু’জনেই দু’জনের মতো প্রাণখুলে হেসে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%