সোনা-ঝুরঝুর হাসি

শৈলেন ঘোষ

হিমসাগরের রং যেমন রুপো-ঝরানো সাদা, শরৎরানির আকাশ যেমন হাসি-মাখানো নীল, ভোরবেলাকার সূর্যি যেমন সোনা-ছড়ানো রঙিন, তেমনই যেন সকল রঙের রং-মেশানো ছবি-সাজানো একটি রাজবাড়ি।

আর?

সন্ধ্যারাতের একটি তারা যেমন হাসে ঝলমল, গাছের ডালে একটি পাখি যেমন নাচে ঝুমঝুম, পদ্মপাতায় শিশির ফোঁটা যেমন দোলে টলমল, রাজবাড়িতে একটি তেমন রাজকন্যা।

রাজকন্যে সাত বছরের ছোট্টটি।

কন্যের মুখটি যেমন মিষ্টি, মুখের কথা তেমন মিষ্টি।

গায়ের রংটি যেমন মিষ্টি, গলার গানটি তেমন মিষ্টি।

কিন্তু সবচেয়ে মিষ্টি কী?

রাজকন্যের মিষ্টি মুখের হাসি। রাজকন্যে হাসলে যেন চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে। ফিনিক দিয়ে।

হঠাৎ এক কাণ্ড হল! কী হল?

রাজকন্যে হাসতে ভুলে গেল।

সে কী!

রাজকন্যে আর হাসে না।

সাত-সাতটি দিন পেরোল। রাজকন্যা হাসে না।

সাত-সাতটি রাত কাটল। রাজকন্যা হাসে না।

রাজকন্যার মুখ ভার। মুখ তার অন্ধকার। কে তার হাসি চুরি করল?

রাজবাড়িও অন্ধকার।

রানিমার চোখ টলমল। চোখের জলে বুক ভেসে যায়।

রাজামশাই ভেবে ভেবে কান্না চাপেন। বুক ভেঙে যায়।

কবরেজ এল। হাকিম এল। বদ্যি এল। তিনমুন্ডু এক করল। মাথার ঘাম পায়ে ফেলল। সাতশো পাতার ফর্দ এঁটে সটকে গেল। কিছুতেই কিছু হল না। রাজবাড়িতে হায়-হায় পড়ে গেল। অমন যে সোনার টুকরো মেয়ে তার এ কী হল!

তারপর?

ডিড্ডিম, ডিড্ডিম-ডিম। ঢেঁড়া পড়ল। এ-রাজ্যে সে-রাজ্যে ঢাকিরা ঢাক পিটিয়ে পিটিয়ে হেঁকে গেল, “রাজার মেয়ের হাসি চুরি গেছে। রাজকন্যে হাসতে ভুলেছে। যে মেয়ের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে দেবে, রাজা তাকে রাজ্য দেবেন।”

ঢেঁড়া পড়ল, আশ্চর্য! কেউ এল না!

এক দিন যায়। দু’দিন যায়। তিনদিন যায়। চার-পাঁচ-ছ’ দিন যায়। তবু কেউ এল

না।

হায়! হায়! কেউ বুঝি এল না সত্যি আর! আর বুঝি পেল না রাজকন্যা হাসি ফিরে তার মিষ্টি মুখে!

ছ’দিনের রাত গড়াল।

রাত গড়িয়ে ভোর হল।

সূর্যিঠাকুর মুখ তুলল।

আলো ফুটল।

পাখি ডাকল।

রাজকন্যের ঘুম ভাঙল।

ঠিক তক্ষুনি রাজবাড়ির সিংদরজায় ঘা পড়েছে। কে যেন কাঁপা গলায় গেয়ে উঠেছে, “জয় হোক রানিমার। জয় হোক রাজামশায়ের।”

দ্বারী হাতের লাঠি ঠুকে হাঁক দিল, “কৌন হ্যায়।”

“আমি হ্যায় বাবা, আমি হ্যায়।”

দ্বারী সিংদরজার সামনে এল। দেখল এক খুনখুনে বুড়ি দাঁড়িয়ে। লাঠি ধরে ঠকঠক করে কাঁপছে।

দ্বারীকে দেখে বুড়ি বলল, “আমি রাজামশায়ের সঙ্গে দেখা করব। আমি রাজকন্যার অসুখ সারাব বলে এসেছি।”

বুড়ির মুখের কথা শেষ আর হল না।

দ্বারী হাঁকল।

সেপাই ছুটল।

সান্ত্রী নাচল।

মন্ত্রী উঠল।

সবাই জুটল।

রাজবাড়ি সরগরম। হই-হই, রই-রই। সাড়া পড়ে গেল, “এসেছে, এসেছে।”

রাজবাড়ির তুলসী-মঞ্চ। সেখানে সকালের রোদ এসে পড়েছে। ছড়িয়ে গেছে সোনার রোদ। সোনার মেয়ে সেই রোদে এসে বসল। বুড়ি বসল তার সামনে। হাঁ করে চেয়ে রইল বুড়ি রাজকন্যার মুখের দিকে। অনেকক্ষণ। বসে থাকতে থাকতে একটি তুলসী পাতা ছিঁড়ে নিল বুড়ি গাছ থেকে। খকখক করে কেশে উঠল। তুলসী পাতাটা রাজকন্যার মাথায় ছিঁড়ে, ছড়িয়ে দিল। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “হয়েছে মা। এবার তুমি যাও। খেলা করো গে।”

তুলসী-মঞ্চের পাশ থেকে রাজকন্যা উঠে গেল দাসীর ঘরে। আর গম্ভীর মুখে বুড়ি উঠে গেল রানির ঘরে।

রানি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী দেখলেন মা? মায়ের আমার কী হয়েছে?”

বুড়ি ভারী গলায় উত্তর দিল, “তোমার মেয়ের হাসি চুরি যায়নি মা। হাসি ফুরিয়ে গেছে।”

চমকে উঠলেন রানি। জিজ্ঞেস করলেন, “সে আবার কী! কেমন করে হাসি ফুরোয়?”

বুড়ি মাথা নাড়ল। ফোকলা দাঁতে হেঁ-হেঁ করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল, “হয় মা, হয়। কেমন জানো? এই যেমন সোনার বাটি ভর্তি দুধে চুমুক দিলে দুধ ফুরোয়, যেমন গাওয়া ঘি ভর্তি সোনার পিদিমে আলো জ্বলতে জ্বলতে ঘিও ফুরোয়, পিদিমও নেভে, তেমনই হাসতে হাসতে হাসিও নেভে। ফুরিয়ে যায়। এতে অবাক হবার কিচ্ছু নেই।”

রানির চোখদুটি ছলছল করে উঠল। বলল, “তা হলে মেয়ে কি আমার আর কোনওদিন হাসবে না?”

বুড়ি আবার ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলল, “হাসবে গো, হাসবে। কিন্ত ব্যামোটা বড় কঠিন রকমের। দাওয়াই জোগাড় করাও তেমনই শক্ত। পারবে কি তোমরা?”

সোনার প্রতিমার মতো রাজরানি। বুড়ির পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “পারব মা, পারব। আমার বুকের বাছা ওই একটি মেয়ে। তার মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার জন্যে যা বলবে, আমরা তাই করব।”

“বেশ! তা হলে একটু থির হও মা লক্ষ্মী! ওষুধটা মন দিয়ে শুনে নাও।”

রানি হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী মা? ওষুধটা কী?”

বুড়ি বলল, “হাতি।”

রাজা অবাক হলেন, “হাতি!”

রানি চমকালেন, “হাতি!”

“হ্যাঁ মা, হ্যাঁ। হাতি! একটি সাত বছরের হাতি। তোমার মেয়ের যেদিন জন্ম, ঠিক সেইদিনে জন্মেছে যে-হাতি, তার কান্না যখনই তোমার মেয়ের কানে পৌঁছবে, তখনই ও আবার হাসবে। ওর হাসি ফিরে আসবে।”

রাজা গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন, “এমন হাতি পাই কোথা?”

রানি হতাশ হয়ে কেঁদে পড়লেন, “হাতির খোঁজে যাই কোথা?”

বুড়ি বলল, “সে-কথাটাও শুনে নাও। একদল লোক পুবে পাঠাও। একদল লোক পশ্চিমে হাঁটাও। একদল লোক দক্ষিণ ছাড়ুক। একদল লোক উত্তরে বাড়ুক। এই চারদল লোক চলতে চলতে যেখানে গিয়ে মিলবে, ঠিক সেখানে এই হাতিটি দেখতে পাবে।”

অমনই সাজ সাজ রব পড়ে গেল। চারদিকে চার হাজার রাজসৈন্য হাতির খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।

একদল যায় মরুর দেশে।

একদল যায় গহন বনে।

একদল যায় পাহাড়চূড়ায়।

একদল যায় নদীর বুকে।

পাহাড়চূড়ায় শব্দ ওঠে।

নদীর জলে তুফান ছোটে।

গহন বনে গাছের কাঁপন।

মরুর দেশে বালির নাচন।

যেতে যেতে সাত মাস সাত দিন কেটে গেল। চারদিক থেকে চার হাজার রাজসৈন্য এক জায়গায় এসে পড়ল। মিশে গেল।

এ এক বন। গভীর বন। এই বনে চার হাজার রাজসৈন্য তাঁবু গেড়ে বনের এ-কোণ, সে-কোণ ঘুরে ঘুরে সাত বছরের হাতি খুঁজতে লাগল।

ক’দিন কেটে গেল। কিন্তু হাতি কই?

একদিন হঠাৎ সবাই থমকে গেল। কে যেন গান গায়!

গভীর বন। গাছের ছায়ায় অন্ধকারে পথ-পাথালির চিহ্ন নেই। জন-মানুষের দেখা নেই। অথচ গান গায় কে?

সঙ্গে সঙ্গে হুস-হাস। ফুস-ফাস। চার হাজার রাজসৈন্য চার হাজার গাছের ফাঁকে লুকিয়ে পড়ল। চুপচাপ। ঘাপটি মেরে তাকিয়ে রইল।

গানের সুর এগিয়ে আসছে। কাছে।

আরও কাছে।

তারপর কী দেখল চার হাজার রাজসৈন্য? দেখল, একটি ছোট্ট হাতি। হাতির পিঠে একটি ছোট্ট ছেলে। দুলছে। গান গাইছে। এগিয়ে আসছে। আহ্ কী মিষ্টি গান!

আর কি দেখতে হয়! চার হাজার সৈন্য। আট হাজার হাত ওপরে তুলল। “হা-রে-রে-রে” করে চেঁচিয়ে উঠল। হাতির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ছেলের গান চমকায়।

হাতির চলন থমকায়।

এক হাজার চেঁচাল, “নাম কী?”

এক হাজার চেঁচাল, “বাড়ি কোথা?”

এক হাজার চেঁচাল, “কার হাতি?”

এক হাজার চেঁচাল, “বয়স কত?”

ছেলেটা সামলে নিল। আস্তে বলল, “আজ্ঞে আমার নাম মংলু। আমার হাতির নাম রাজপুত্তুর। আমার বন্ধু। হাতির বয়স সাত। আমার বয়স সাত। আজ্ঞে আপনারা কারা?”

মংলুকে আর কথা কইতে হল না। চার হাজার রাজসৈন্য চেঁচিয়ে উঠল, “মার-মার, ধর-ধর, কাট-কাট!” ঝাঁপিয়ে পড়ল হাতির ওপর। মংলুকে হাতির পিঠ থেকে তুলে নিল। পাখির মতো আকাশে ছুড়ে দিল। মংলু “ও মা গো” বলে ককিয়ে কেঁদে উঠল। আকাশ থেকে আছাড় খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

লোহার শেকল বাঁধা হল হাতির পায়ে।

লোহার শেকলের ফাঁস লাগল হাতির গলায়।

“হেঁইও মারি জোয়ান ঠেলা,” চার হাজার রাজসৈন্য হাঁক পাড়ল! শেকলে টান মারল। হাতিকে নিয়ে চলল। টানতে টানতে।

“ছেড়ে দাও, আমার হাতিকে ছেড়ে দাও।” মংলু ছোট্ট দুটি হাত বাড়াল। রাজসৈন্যের পায়ে পায়ে লুটিয়ে লুটিয়ে কেঁদে উঠল|

চার হাজার রাজসৈন্য, তারা শুনবে না মংলুর কথা। তারা দেখবে না মংলুর দিকে চেয়ে। তারা মাড়িয়ে দিল মংলুকে। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মংলু। পড়ল, আবার উঠল। না, সে ছাড়বে না। কিছুতেই যেতে দেবে না তার বন্ধুকে। তার রাজপুত্তুরকে। ছুট্টে গিয়ে মংলু পড়ে গেল রাজপুত্তুরের পায়ের সামনে। ঠেলে দিল তাকে রাজসৈন্যরা। মংলু রাজসৈন্যের পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে কেঁদে পড়ল, “ওগো ছেড়ে দাও, ওগো ছেড়ে দাও।”

শুনল না রাজসৈন্যরা। তারা মংলুকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। বেঁধে, হাতিকে টানতে টানতে বন পেরোল। মাঠ ছাড়ল। ঘাট ডিঙুল। মংলুর চোখের আড়ালে চলে গেল।

মংলু গাছের বুকে মাথা ঠুকে, গাছের বুকে হাত জড়িয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল।

কাঁদতে কাঁদতে দিন গড়াল।

রাত ফুরোল। আলো ফুটল।

কেউ এল না মংলুর কান্না শুনে।

গভীর বনে মংলু ক’দিন কাঁদল, কেউ শুনল না। ক’দিন ধরে একটি ছোট্ট ছেলের কান্না বনে বনে, গাছে গাছে ফিরেছে, কেউ জানল না।

একদিন মংলুও জানতে পারল না কিচ্ছু। জানতে পারল না, আলো নিভছে, না জ্বলছে। দিনের আলো ফুটছে, না রাতের কালো নামছে। দিনের পাখি ডাকছে, না রাতের পেঁচা হাঁকছে। কাঁদতে কাঁদতে নিভে গেছে মংলুর দুটি চোখের দুটি তারা। চিরদিনের মতো। মংলু অন্ধ।

একদিন আর পারছিল না মংলু। কাঁদতে পারছিল না। ভাঙা বাঁশির সুরের মতো ওর কান্না ভেসে আসছিল। থেকে থেকে।

কে যেন ডাকল এমন সময়, “কেঁদো না মংলু, কেঁদো না। আমি আছি। ভয় কী?”

আহা! কী মিষ্টি গলা!

ফিরে তাকাল। দেখতে পেল না। তার চোখে আলো কই? সে যে অন্ধ! চারদিক অন্ধকার।

“আমি বলছি তুমি আবার তোমার রাজপুত্তুরকে ফিরে পাবে। তোমার সব দুঃখের শেষ হবে।”

বলতে বলতে কে যেন ওর বাঁধন খুলে দিচ্ছে!

মংলু বুঝতে পারল না, কে? কিন্তু আর সবাই দেখল। দেখল বনের গাছ। দেখল বনের ফুল। দেখল বনের লতাপাতা। এ-যে বনের দেবী!

বনদেবী হাতটি বাড়িয়ে দিল মংলুর হাতে। বলল, “এসো মংলু। তোমায় রাজপুত্তুরের কাছে নিয়ে যাব।”

বনদেবীর হাত ধরল মংলু। অন্ধ চোখে কাঁদতে কাঁদতে বনের পথে পা বাড়াল।

বনের পথে মংলু কাঁদছে অন্ধ চোখে রাজপুত্তুর-হাতির জন্যে।

রাজবাড়িতে রাজপুত্তুর-হাতি কাঁদছে মংলুর জন্যে।

কই? হাতির কান্না শুনে রাজকন্যা তো হাসি ফিরে পায়নি?

তবে?

সেদিন ভোর হল।

রাজবাড়ির সিংদরজার সামনে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। সে ডাকছে, চেঁচিয়ে, “রাজপুত্তুর-র-র-র।”

দ্বারী তেড়ে এল, “কে রে?”

সে বলল, “আমার রাজপুত্তুর কোথা? আমার রাজপুত্তুর? কোথা তাকে বন্দি করে রেখেছ?” আবার ডাকল সে, “রাজপুত্তুর-র-র।”

দ্বারী দেখল, একটা অন্ধ ছেলে। “হট” বলে এক ঠেলা মারল। ফেলে দিল রাস্তায়।

ঠিক তখুনি রাজকন্যা যাচ্ছিল দাসীর হাত ধরে। তার হাতে ফুলের সাজি। সে যাচ্ছে মন্দিরে।

দাসীর হাত ছাড়িয়ে নিল রাজকন্যা। ফুলের সাজি ফেলে দিল। ছুটে এল। দ্বারীর হাত ধরে আকুল হয়ে বলল, “না, না! মেরো না, মেরো না ওকে।”

তুলে নিল রাজকন্যা অন্ধ ছেলেকে ধুলো থেকে। গায়ের ধুলো ঝেড়ে দিল। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ভাই তোমার? খিদে পেয়েছে?”

“না।”

“ভিক্ষা নেবে?”

“না, না।”

“কাপড় চাইছ?”

“না, না, না। আমার রাজপুত্তুরকে ফিরিয়ে দাও।”

রাজকন্যা অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, “কে তোমার রাজপুত্তুর? আমার তো কোনও ভাই নেই!”

“তোমার ভাই কেন হবে? রাজপুত্তুর আমার বন্ধু। আমার হাতি। তোমাদের লোকেরা তাকে ধরে এনেছে। বেঁধে এনেছে।”

চমকে উঠল রাজকন্যা। আপন মনে ভাবল, “ও বুঝেছি। তাই দেখি ক’দিন ধরে হাতিশালে নতুন হাতি। ছোট্ট হাতি। তাই বলি ছোট্ট হাতি কাঁদে কেন রাতদিন।”

রাজকন্যে দ্বারীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে উঠল, “ছেড়ে দাও, পথ ছেড়ে দাও।”

দ্বারী ভয়ে সরে গেল।

অন্ধ ছেলের হাত ধরল রাজকন্যা। বলল, “আমার সঙ্গে এসো।” ছুট দিল রাজকন্যা রাজপুরীর হাতিশালের দিকে।

অন্ধ ছেলে রাজকন্যার হাত ধরে ছুটতে লাগল। ডাকতে লাগল, “রাজপুত্তুর-র-র-র।”

আহা! হাতিশালে কাঁদছে রাজপুত্তুর! তার পায়ে শেকল বাঁধা। কাঁদছিল আপন মনে। মংলুর জন্যে।

কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ চমকে ওঠে হাতি। কে যেন ডাকে তার নাম ধরে! এ যে তার চেনা গলা! এ যে তার মংলুর সুর।

হ্যাঁ, সত্যিই তো! ওই তো তার মংলু। রাজকন্যার হাতটি ধরে ছুটে আসছে!

আর দেখতে হয়! কোথায় কান্না আর কোথায় কী! নেচে উঠল হাতি। মাথায় শুঁড় দুলে উঠল। কানের পাতা কেঁপে উঠল। হেলে-দুলে-গড়িয়ে ডেকে উঠল।

মংলু দু’ হাত বাড়িয়ে আকুল হয়ে এগিয়ে গেল। বলল, “কই? কই? কই, তুই রাজপুত্তুর?”

রাজকন্যা হাতটি ছুঁয়ে মংলুকে নিয়ে গেল রাজপুত্তুরের কাছে। অমনই রাজপুত্তর শুঁড়টি দিয়ে জড়িয়ে ধরল মংলুকে। পিঠে তুলে নিল।

মংলু দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল রাজপুত্তুরের গলাটি। জড়িয়ে ধরে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। সে কী কান্না! সমস্ত আকাশ ভেঙে যেন মেঘের কান্না! কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি আর দেখতে পাই না রে, দেখতে পাই না। তোর জন্যে কেঁদে কেঁদে আমার চোখ গেছে। কই, তোর মুখখানা কই?”

রাজকন্যা কেঁদে ফেলল। মাহুতকে বলল, “খুলে দাও। এক্ষুনি হাতির পায়ের শেকল খুলে দাও।”

রাজকন্যার কথা কে ঠেলবে? হাতির বাঁধন খুলে গেল।

মংলুকে পিঠে নিয়ে বেরিয়ে এল রাজপুত্তুর হাতিশাল থেকে। বাইরে। হাঁটা দিল।

“শোনো।” ডাকল রাজকন্যা হঠাৎ। ওর গালদুটি ভেসে গেছে চোখের জলে। “শোনো ভাই।”

হাতি দাঁড়াল।

রাজকন্যা বলল, “আমার বাবা তোমার রাজপুত্তুরকে ধরে এনেছেন। রাজপুত্তুরের জন্যে কেঁদে কেঁদে তোমার চোখদুটিও হারিয়ে গেছে। কেউ জানবে না এ-কথা কোনওদিন। কেউ জানবে না তোমার এ দুঃখের কথা। জানলেও কেউ তো আর পারবে না তোমার চোখদুটিতে আলো ফিরিয়ে দিতে। আমি ছোট্ট। সত্যি বলছি আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কোনও দোষ করিনি। শুধু একটি কথা তোমায় বলব। রাখবে?”

“কী কথা?”

“একটিবার তুমি হাতির পিঠ থেকে নেমে আমার কাছে আসবে?”

রাজপুত্তুর শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল মংলুকে। নামিয়ে দিল রাজকন্যার পাশে।

আঁচল দিয়ে মংলুর চোখের জল মুছিয়ে দিল রাজকন্যা। চুনি-পান্নার হারটি খুলে নিল নিজের গলার থেকে। পরিয়ে দিল মংলুর গলায়।

মংলু চেঁচিয়ে উঠল, “না, না। চাই না আমার।”

কথা শেষ হল না। এ কী!

কী?

চুনি-পান্নার মালার আলো মংলুর গলায় দুলে উঠছে। যেন সেই মালার আলো তার চোখের তারায় ভেসে উঠছে! মংলুর চোখে যেন আলো নামছে। একটু-একটু। আরও একটু।

হ্যাঁ, সত্যিই তো! মংলু দেখতে পেয়েছে সকালের সোনার রোদ। সোনার রোদে রুপোর চাঁদের মতো একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার সামনে।

এ কি সত্যি!

সত্যি! সত্যি! সত্যি! হঠাৎ হেসে উঠল মংলু, “হা-হা-হা।”

ঝরনার সুরের মতো মিষ্টি হাসি। ভোরের ফুলের মতো রঙিন হাসি! হাসতে হাসতে গড়িয়ে গেল মংলু। ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরল রাজকন্যার হাতটি।

ওমা! অমনই রাজকন্যা হেসে উঠেছে, “হি-হি-হি!” এতদিনের হারিয়ে যাওয়া হাসি হঠাৎ ফিরে পেয়েছে রাজকন্যা। মুখখানি তার উছলে গেল আলোতে-হাসিতে। সে কী আনন্দের হাসি! কাঁচা রোদের মতো সোনার হাসি।

ভোরের ফুল, কাঁচা রোদ, ঝরনার সুর সব মিলিয়ে সে এক হাসির রাশি। সেই হাসির সুরে সুর মিলিয়ে রাজপুত্তুর তুলে নিল মংলুকে। তুলে নিল রাজকন্যাকে নিজের পিঠে।

ওপরে আকাশ। নীল। আলো তার উপচে গেছে। নীল আকাশের নীচে একটি মিষ্টি ছেলে, একটি মিষ্টি মেয়ে হাতির পিঠে বসে। ওরা দুলছে। দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে। ওরা হাসছে। হাসতে হাসতে তাকিয়ে দেখছে।

দেখতে পেয়েছেন রাজা। হেসে উঠেছেন।

দেখতে পেয়েছেন রানি। হেসে ফেলেছেন।

মন্ত্রী হেসেছেন।

সান্ত্রি হেসেছে।

সিপাই হেসেছে।

হেসেছে হাতিশালের হাতিগুলো। আস্তাবলের ঘোড়াগুলো। উটগুলো।

সব্বাই হেসেছে। হেসে কুটোকুটি হয়ে লুটোপুটি খেয়েছে। রাজবাড়িতে হাসির হাট বসে গেল।

কিন্তু কেউ দেখতেও পায়নি রাজকন্যার পুতুল-পুতুল মাছরাঙা সে-ও আজ মুচকি মুচকি হাসছে!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%