শৈলেন ঘোষ

রাজা কাক্কাবোক্কার কখন যে কী নিয়ে বায়নাক্কা শুরু হবে কেউ জানে না। কখন তিনি হাঁকবেন, আর, কখনই-বা তিনি রাগবেন, কার সাধ্যি আগেভাগে তার খবরটা আমাদের শুনিয়ে দেয়! কিছুই নয়, এই সেদিনের কথাই ধরো, কী, না রাজা কাক্কাবোক্কার গালে একটি ফুসকুড়ি হয়েছে। হতেই পারে। দেহ থাকলে দেহে ছাল-চামড়া থাকবে। ছাল-চামড়া থাকলে ফুসকুড়ি হবে না, এমন কথা কেউ হলপ করে বলতে পারে? হবেই। তা, তুমি সেই গোলাপ-পাপড়ির রসানি মেশানো জলেই চান করো, কি শ্বেত-চন্দনের প্রলেপ গায়ে বুলিয়ে ফুরফুরে হাওয়ায় বসে থাকো। কখন যে চামড়া কুঁড়ে তিনি উঁকি মারবেন হাকিম-বদ্যির সাধ্য কী, তার আগাম খবর আগেই জানিয়ে রাখে! তা এ-নিয়ে রাজা কাক্কাবোক্কার এত অস্থির হয়ে বাড়ি মাথায় করার যে কী কারণ থাকতে পারে, ভেবে পাই না। একটা ফুসকুড়ি বই তো আর অন্য কিছু নয়। আর এটা একটা হই হই করে বলার মতো কথা হল! ফুস করে ফুটিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়! তা হবে না। কী, না রানি বলেছেন, “রাজামশাই তোমার গালে ওটা কী?” ব্যাস! ওই “ওটা কী, ওটা কী,” করতে করতে রাজা কাক্কাবোক্কা তুলকালাম শুরু করে দিলেন। অমন একজন ধুমসো রাজার হাত-পা ছুড়ে “বাবা রে, মলুম রে” বলে সে কী চিৎকার। যেন একটি আহ্লাদে বুড়োখোকা! আচ্ছা, তোমরাই বলো, ‘মল্লুম রে’ বললেই কি মানুষ মরে! না, ‘গেলুম রে’ বললেই মানুষ কপালে চোখ তুলে সগ্গে যায়! হুঁ, হুঁ বাবা, সেটি হচ্ছে না! তোমার যতদিন না সগ্গে যাওয়ার সময় হচ্ছে, ততদিন টানো ঘানি! অবিশ্যি রাজা কাক্কাবোক্কা কি আর ঘানি টানবেন! যতই হোক, রাজা বলে কথা!না, না, টানামানি করাটা তাঁর একেবারেই সাজে না। তা বলে একেবারে সাজে না মানে এই নয় যে, তিনি একেবারেই টানেন না। এ-কথা বললে মিথ্যে বলা হবে। তিনি টানেন গড়গড়া। অম্বুরি তামাকের সুগন্ধ ছড়িয়ে তিনি যখন ভুড়ুক ভুড়ুক করে গড়গড়ায় টান দেন, আঃ, তখন মন খুশিতে ভুরভুর করে ওঠে। তখন যে তাঁর মাথায় কতরকমের ভাবনা কিলবিল করে চাগাড় দেয়! কখনও ভাবেন, ময়ূরের মতো পেখম তুলে নাচেন তিনি। কখনও ভাবেন, ফুল-বাগিচায় ভ্রমর হয়ে ফুলে ফুলে মধু খান। নয়তো ভাবেন, রাজবাড়িটা মাথায় নিয়ে লাফান তিনি। লাফিয়ে চাঁদে যান। চাঁদের বুড়ি থুড়ত্থুড়ি। দুষ্টুমি করে তার কানে কু-উ-উ দিয়ে দেন! আচমকা। বুড়ি চমকে উঠে তাড়া করলেই মার ছুট!
ভাবতে ভাবতে থমকে যান রাজা কাক্কাবোক্কা। ভয়ে তাঁর গায়ে কাঁটা দেয়। ভাবেন, ছুটে
পালাতে গেলে, তিনি যদি পা হড়কে চাঁদ থেকে পড়ে যান! পড়তে পড়তে ধপাস! একেবারে মর্তে। তারপরেই গর্তে।
শেষমেশ জিব বের করে, চোখ কপালে তুলে অ্যা! মানে অক্কা! পেট ফেটে পটকা।
ভাবতে ভাবতে প্রথমটা যদিও রাজা কাক্কাবোক্কা শিউরে উঠেছিলেন, কিন্তু তারপরেই কেমন যেন খট করে তাঁর খটকা লেগে গেল! ঝট করে তাঁর মাথার ঝিকুর নড়ে উঠল। তিনি ফট করে ভেবে বসলেন, তিনি মরবেন। এক্ষুনি। মরে দেখবেন, মানুষ যায় কোথায়! ব্যাস! সেই যে মাথায় ঢুকল, তারপরেই হুলুস্থূল কাণ্ড বাধল। ডাক পড়ল মন্ত্রীর।
মন্ত্রী ছুটে এলেন, “আজ্ঞে, হুজুর, ডাকছেন?”
“হ্যাঁ, বসুন।”
মন্ত্রী বসলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা আড়চোখে মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন।
মন্ত্রীর বুক শুকিয়ে গেল। এই রে! আবার কী বলে দ্যাখো!
রাজা ভুরু কোঁচকালেন।
মন্ত্রীর চোখ ড্যাবড্যাব করে উঠল।
রাজা হাঁচলেন না। কাশলেন না। তিনি আচমকা বলে উঠলেন, “আমি মরব। আপনি ব্যবস্থা করুন!”
রাজার মুখের থেকে ঝরে পড়া বাক্যি, সেই বাক্যি মন্ত্রীর অমনোযোগী হয়ে শোনার সাধ্যি কী! রাজার কথা কানে ঢুকতেই মন্ত্রী একটা ঢোঁক গিলে ফেললেন। যেই গিললেন, অমনই তাঁর কানের ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। তিনি ফ্যালফ্যাল করে রাজা কাক্কাবোক্কার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। এ কী কথা বলেন রাজামশাই! তিনি যেন স্বপ্ন দেখছেন!
রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে অমন বোকার মতো চেয়ে থাকতে দেখে তড়পে উঠলেন, “আমার কণ্ঠস্বর কি কানে ঢুকল না? আমি বলছি, আমি এক্ষুনি মরতে চাই। আপনি মরণের ব্যবস্থা করুন।”
মন্ত্রীর আর চুপ মেরে বসে থাকার জো নেই। রাজার তেড়িয়া মূর্তি দেখেই তাঁর ধুকধুকি-প্রাণ ধাপার মাঠ! মন্ত্রী আমতা আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে, আপনার কণ্ঠস্বর না-শোনার মতো তেমন কোনও অসুবিধে হয়নি। কিন্তু আজ্ঞে, আপনি কথাটা কতখানি সজ্ঞানে বলেছেন, সেই নিয়েই আমি একটু গোলমালে পড়েছি।”
ব্যাস, বাতাসে ঝড় উঠল। মন্ত্রীর কথা শুনে একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা কাক্কাবোক্কা ঝটাপটি লাগিয়ে দিলেন, “কী! আমাকে আপনি তাচ্ছিল্য করেন! আমাকে নিয়ে সজ্ঞান-অজ্ঞান তুলে কথা! কাক্কাবোক্কাকে আপনি বোকা ঠাওরে জ্ঞান দেন! জানেন, এত বড় রাজ্যটা কার হুকুমে উঠছে-বসছে! আপনি জানেন, আমার হাতের এই আঙুল তর্জনীর জোর কত? আমি যদি এক্ষুনি এই তর্জনী তুলে গর্জন করি, তখন হয় আপনি থাকবেন, নয় আপনি যাবেন, তা জানেন? আর এই বৃদ্ধাঙ্গুলিটি আপনার মুখের সামনে তুলে যদি নাচাই, তখন আপনার ভাগ্যে কী জুটবে জানেন? স্রেফ লবডঙ্কা!”
রাজা কাক্কাবোক্কার কথা শেষ হতেই মন্ত্রী খুব উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ হুজুর, আপনি যথার্থই বলেছেন। আমার যখন বয়েস হয়নি, মানে খুবই ছোট, তখন, আপনার ওই বুড়ো আঙুলটির মতো আমিও এমনি করে বুড়ো আঙুল নেড়ে বানর খ্যাপাতুম। বলতুম, এই বানর, কলা খাবি...” বলতে বলতে মন্ত্রী নিজের বুড়ো আঙুলটি রাজার মুখের ওপর নাচিয়ে দিলেন। একেবারে নাকের ডগায়।
এই রে, মন্ত্রীমশাইয়ের গর্দান বুঝি গেল এবার। কী বে-আক্কেলে মন্ত্রী রে বাবা! বুড়ো আঙল নাচিয়েছেন, ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে একেবারে রাজার নাকের ডগার ওপর আঙুল তুলে, “এই বানর, কলা খাবি” বলাটা কি ঠিক হল! এ-নাকের ডগা তোমারও নয়, বানরেরও নয়। নাক তো নাক, রাজার নাক! ছিঃ! এই বুঝি তিনি রাগলেন!
রাগলেন মানে? তিনি তো রেগে বসেই আছেন। মন্ত্রীকে তেড়ে উঠলেন, “কী, আমাকে বানর ঠাওরেছেন আপনি! আমাকে আপনি কলা দেখান!”
যাঃ! কী বলতে কী হয়ে গেল! মন্ত্রী বুঝি গেলেন এবার! এইরকম একটা সোজা কথার এমন যে একটা উলটো মানে করে বসবেন রাজামশাই, এটা মন্ত্রীর একেবারেই মাথায় ঢোকেনি। তাই রাজা কাক্কাবোক্কার রাগটাকে সামাল দেওয়ার জন্যে তিনি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে, আপনি আমাকে অহেতুক ভুল বুঝছেন। আমি আপনাকে বানর ঠাওরাতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছি সেই বানরের কথা, সেই গাছের বানর, যে কলা খায়।”
আর কি সামলানো যায় রাজা কাক্কাবোক্কাকে! তিনি গলা চড়ালেন। তিনি বেশ হম্বিতম্বি করেই বললেন, “আপনি তো মশাই দেখছি বহুত ধড়িবাজ। নিজের দোষ চাপা দেওয়ার জন্যে কলা-খাওয়া বানরের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন! বানরই কি শুধু কলা খায়? আমিও তো কলা খাই। কলা খেলে, কলা-খাওয়া বানর যদি বানর হয়, তবে, আপনার কথামতো কলা-খাওয়া রাজাও বানর! ঘুরিয়ে নাক দেখাবার জায়গা পাননি! ভাবছেন, আমি এতই বোকা, আপনার কথার মানে আমি বুঝতে পারব না! আমি আপনাকে যা-ই বলি, তাই-ই আপনি ঘোরাবেন! সিধে কথাটা সোজাসুজি বললে কি মন্ত্রীর জাত যায়?”
কাক্কাবোক্কার কথা শুনে মন্ত্রীর চোখ কপালে। কেননা, তিনি যা বলতে চাননি, রাজামশাই শুধুমুধু সেইসব কথা গায়ে মেখে মন্ত্রীকে ঝুটমুট বকাবকি করছেন। তাই মন্ত্রী এবার খুবই নরম গলায় বললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, আপনি আমাকে আগাগোড়াই ভুল বুঝছেন। আপনাকে আমি যে-কথাটা বলতে চেয়েছি, তার অর্থ নিয়ে আপনি যদি অনর্থক এভাবে রাগারাগি করেন, তবে আমার আর কিছু বলার নেই।”
“বলার নেই মানে!” রাজা আবার কড়কে উঠলেন, “যা বলার সবই তো আপনার বলা হয়ে গেল! একটু আগে আমাকে বানর বলেছেন। এইমাত্তর আমাকে ‘অবুঝ’ বললেন, এমনকী, আমাকে গাধা বলতেও ছাড়লেন না।”
চমকে উঠলেন মন্ত্রীমশাই। বললেন, “আজ্ঞে, আপনাকে তো গাধা বলিনি।”
রাজা কাক্কাবোক্কা আরও খেপলেন। বললেন, “বলেননি? আপনি বলেননি, অর্থ না-বুঝে আমি অনর্থক রাগারাগি করছি? তা, অর্থ না-বুঝে যে অনর্থক রাগারাগি করে, তাকে গাধা ছাড়া কী বলতে চান আপনি?”
মন্ত্রী লাফিয়ে উঠলেন, “ছিঃ, ছিঃ, এ আপনি কী বলছেন! না, না, আপনি গাধা হতে যাবেন কোন দুঃখে! আমি আপনাকে গাধাও ভাবিনি, বানরও বলিনি। এমনকী, আপনার মতো জ্ঞানী লোককে জ্ঞান দেওয়ার কথাও কস্মিনকালে আমার মনে আসেনি।”
মন্ত্রীকে আর কথা বলতে দিলেন না রাজা। তিনি যেন চোর ধরেছেন, এইরকম একটা ভাব দেখিয়ে বলে উঠলেন, “এই তো ধরা পড়ে গেছেন। আমি জানতে পারি কি আপনাকে কেন রাখা হয়েছে?”
“আজ্ঞে, মন্ত্রিত্ব করার জন্যে।” জবাব দিলেন মন্ত্রী।
“মন্ত্রিত্ব মানে কি শুধু বসে বসে খাওয়া!” বেশ রাগত স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন রাজা।
খাওয়ার খোঁটা দিতে মন্ত্রীর আবার মেজাজ গেল বিগড়ে। তিনি বললেন, “আপনার বিবেচনায় আমি কি শুধু বসে বসে খাই? আমি কোনও কাজই করি না?”
রাজা জবাব দিলেন, “কই করেন? আপনি তো নিজের মুখেই স্বীকার করলেন, আমাকে জ্ঞান দেন না! তার মানে, আপনি আমাকে সুপরামর্শ দেন না! জ্ঞানী মানুষের সুপরামর্শ দেওয়াটা কি জ্ঞান দেওয়া নয়?”
মন্ত্রী কেমন হকচকিয়ে গেলেন রাজার এমন অবাক-করা কথা শুনে। এইমাত্তর রাজা কাক্কাবোক্কা জ্ঞান দেওয়া নিয়ে মন্ত্রীকে দুষলেন। আবার, এই দ্যাখো, জ্ঞান না-দেওয়ার জন্যে মন্ত্রীকে একহাত নিলেন। এ যেন দু’মুখো করাত। এদিকে টানলেও কাটে, ওদিকে টানলেও রক্ত ঝরে! এ তো বড় বিপদে পড়া গেল! মন্ত্রী তো আর কথাই বলতে পারেন না। না-বলাই ভাল। কথা বললে রাজামশাই যদি আবার অন্য কোনও মানে করে বসেন!

“কী, মুখে যে আবার কুলুপ আঁটলেন!” মন্ত্রীকে চুপ থাকতে দেখে রাজাই কথা বললেন।
মন্ত্রী রাজার কথা শুনে খুসখুস করলেন, কিন্তু উত্তর দিলেন না।
“আবার আমাকে আপনি অগ্রাহ্য করছেন?” আবার কড়কে উঠলেন রাজা।
মন্ত্রীর সসেমিরা অবস্থা। আচ্ছা ঝামেলায় পড়েছেন তিনি। এই ঝামেলা থেকে কেমন করে যে তিনি নিষ্কৃতি পাবেন, এখনও পর্যন্ত তার হদিস খুঁজে পেলেন না। তা হলে কী করা!
এমন সময় রাজা কাক্কাবোক্কাই আচমকা কথা বলে উঠলেন, “আপনি ভাববেন না, কথা না-বলে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনাকে আমি ছেড়ে দেব। ব্যবস্থা করুন!”
“আজ্ঞে, কীসের?”
“বাঃ! খুব ঘুঘু লোক আপনি মশাই। এরই মধ্যে কথাটা চেপে যাওয়ার মতলব।”
“আজ্ঞে, আমি কিছুই চাপছি না। কীসের ব্যবস্থা সেটা না-বললে, আমি করব কেমন করে?” খুব বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন মন্ত্রী।
“কেন, একটু আগে যে আপনাকে আমার মরণের ব্যবস্থা করতে বললুম!” রাজা জবাব দিলেন।
আবার বুকটা ধড়াস করে উঠল মন্ত্রীমশায়ের। তিনি যে এই কথার কী উত্তর দেবেন কিছুই ভেবে না পেয়ে, মাথা চুলকোতে লাগলেন।
রাজা ধমক দিলেন, “চুলকোচ্ছেন কেন? রাজার সামনে কোন দেশের মন্ত্রী চুলকোয় মশাই।”
মন্ত্রী তেমনই চুলকোতে চুলকোতে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে, চুলকোচ্ছি না, ভাবছি।”
রাজা একটু ঠাট্টা করেই বললেন, “আপনার শরীরে তা হলে ভাবনাও আছে? কী ভাবছেন, সেটা বলা যেতে পারে কি?”
মন্ত্রী বেশ দুঃখ-মেশানো গলায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, “আজ্ঞে হুজুর, আপনি মরে গেলে আমার কী গতি হবে! আমি কার কাছে থাকব! সেই কথাই ভাবছি।”
রাজা উত্তর দিলেন, “ওঃ, আপনাকে নিয়ে আর পারা যায় না। আপনি আমার একজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী, আমার বন্ধু, আপনি আমার কাছে ছাড়া আর কোথায় থাকবেন! আপনিও আমার সঙ্গে মরবেন।”
আচমকা চিৎকার করে উঠলেন মন্ত্রী, “ওরে বাবা রে...” চিৎকার করেই তিনি মারলেন ছুট। কিন্তু পারলেন না। রাজা খপাত করে তাঁর জামাটা খামচে ধরলেন। মন্ত্রীও ছাড়বেন না। মারলেন টান। লেগে গেল টানামানি। শুরু হল চেঁচামেচি। এই রে, এই বুঝি খবরটা রাজবাড়ির এ-মহল সে-মহলে ছড়িয়ে পড়ল। এই ভয়েই বোধহয় রাজা চাপা গলায় মন্ত্রীকে ধমক দিলেন, “কী হচ্ছেটা কী, আপনার কোনও জ্ঞানগম্যি নেই! এমন ছেলেমানুষের মতো চেঁচিয়ে লম্ফঝম্ফ করছেন যেন আপনার ঘাড়ে আকাশ ভেঙে পড়েছে! এক্ষুনি কেউ শুনে ফেললে তখন কী হবে।”
মন্ত্রী তবু থামলেন না। না থামলেও আর চেঁচালেন না। গলার স্বর নামিয়ে ঠোঁট কাঁপিয়ে বললেন, “আজ্ঞে, এ আপনার কী ভয়ংকর আবদার। আপনি মরতে চান মরুন হুজুর। আমায় মরতে বলবেন না। আমি মরে গেলে আমার যে সব ঝরঝরে হয়ে যাবে। আপনাকে জোড়হাত করে বলছি, আমাকে ছেড়ে দিন।”
রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর এমন ঘ্যানঘ্যানানি শুনে প্রথমটা ভেবেছিলেন, এক ধমকে ঠান্ডা করে দেন। না, তা তিনি করলেন না। কী ভাবলেন কে জানে, নিজেই ঠান্ডা হয়ে গেলেন। বেশ মোলায়েম স্বরেই তিনি বললেন, “ঠিক আছে, আপনাকে মরতে হবে না। আমিই মরব। আপনি শুধু আমাকে মরতে সাহায্য করবেন।”
রাজার কথা শুনে মন্ত্রীর গলায় কাঁপুনি ধরে গেল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে কী সাহায্য?”
“সে পরে বলব।”
তবুও মন্ত্রীর কাঁপুনি থামল না। আরও বাড়ল। কাঁপতে কাঁপতেই তিনি বললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কী কথা?”
“আজ্ঞে আপনি মরতে চাইছেন কেন? আপনার কি না-মরলেই নয়?”
রাজা মন্ত্রীর কথা শুনে খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, “রাজার সঙ্গে আপনাদের তফাত কোনখানে এবার বুঝতে পেরেছেন? রাজার মনের কথা বুঝতে পারা অত সহজ নয়। আমি মরব। মরে দেখব, মানুষ যায় কোথা! শুনেছি সগ্গে যায়। আমিও যাব। শুনেছি সগ্গে অনেক কিছু পাওয়া যায়। আমিও পাব।”
“কী পাবেন হুজুর?”
“এই ধরুন, আপনি চোখ বুজে বললেন, ‘এক বস্তা আলু আনো!’ কাকে বললেন আপনি নিজেও জানলেন না। অমনই আলু এসে গেল! আপনি চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার চক্ষু ছানাবড়া!” বলা শেষ করেই রাজা কাক্কাবোক্কা খিল খিল করে হেসে উঠলেন।
এবার মন্ত্রীও রাজার হাসির তালে তালে খিল খিল করে উঠলেন। খিল খিল করতে করতেই মন্ত্রী বললেন, “হুজুর যদি সাহস দেন তো আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”
“করুন।”
“আজ্ঞে, আপনি কি শুধু এক বস্তা আলু চাইতেই সগ্গে যাবেন?”
“ধ্যাত! বোকা! বোকা! আপনি একেবারে বোকা! আপনার মতো এমন বোকা লোক নিয়ে যে আমি কী করব!” বলতে বলতে রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ফেলে একবুক দম নিয়ে বললেন, “আরে মশাই, আলু দিয়ে শুরু। তারপর..., তারপর...”
রাজার কথা শেষ হওয়ার আগেই মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে, শুনেছি সেখানেও রাজা আছে।”
“থাকতে পারে।”
“সেই রাজা যদি আপনাকে পাকড়াও করে উত্তম-মধ্যম দিয়ে দেয়?”
“অ্যাই! আপনি আবার একটি মূর্খের মতো কথা বলে বসলেন।” বলতে বলতে রাজা কাক্কাবোক্কা ‘ফুঃ’ বলে মুখে একটি তাচ্ছিল্যের শব্দ করলেন। তারপর আবার বললেন, “আরে মশাই, মর্তের রাজার বুদ্ধির সঙ্গে স্বর্গের রাজা! জানেন, আমরা হাজার রকমের ভড়কি জানি। আপনি কোনওদিন হাডুডু খেলেছেন?”
“আজ্ঞে?” মন্ত্রী অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
“হাডুডু? ভেলিমারি কিত কিত...”
“ও! হ্যাঁ হ্যাঁ, খেলেছি।”
“তা হলে তো আপনি ভড়কি কাকে বলে জানেন!” বলে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর মুখের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হবে নাকি!”
“আজ্ঞে!” মন্ত্রী চমকে উঠলেন।
রাজা উত্তর দিলেন, “এক দান?”
“কী আজ্ঞে?”
“খেলা, খেলা? হাডুডু?”
“আপনি রাজা। আপনি হাডুডু খেলবেন?”
রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “আরে মশাই, রাজারাই তো হাডুডু খেলে। আমি এমন ভড়কি দিতে পারি, এক প্যাঁচেই আপনি ক্যাঁচ! আসুন একহাত হয়ে যাক!” বলতে বলতে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর হাতটা চেপে ধরলেন।
রাজামশাই হাত ধরতেই মন্ত্রীমশাই কেমন যেন লজ্জা পেলেন। লজ্জায় একেবারে আধখানা হয়ে তিনি তোতলাতে লাগলেন, “না, না, ছিঃ, ছিঃ, আমি? এই বয়সে হাডুডু? আপনার সঙ্গে?”
রাজা মন্ত্রীর হাত ধরে টানামানি করতে করতে বললেন, “আরে মশাই, খেলার আবার বয়েস আছে! নেমে পড়লেই হল!”
মন্ত্রী রাজার টান খেতে খেতে চাপা স্বরে বলে উঠলেন, “এই, কেউ দেখে ফেলবে!”
“আরে মশাই, কী দেখবে! দরজায় হুড়কো এঁটে দিলে কার সাধ্যি ঘরে ঢোকে!”
“আজ্ঞে, হুজুর,” মন্ত্রী প্রায় মরিয়া হয়ে উত্তর দিলেন, “আমি পারব না। রানিমা দেখে ফেললে বকুনি আমাকেই খেতে হবে।”
উলটে রাজাই মন্ত্রীকে বকুনি দিয়ে বললেন, “আপনার মুন্ডু! আমি থাকতে রানি বকবে আপনাকে? জানেন আমি হুকুম দিলে রানির নির্বাসন হয়ে যেতে পারে! আসুন এইখানেই লড়ে যাই!”
মন্ত্রী এতক্ষণ অনুরোধ-উপরোধ করছিলেন। এবার তাঁরও মেজাজ গেল বিগড়ে। বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি রাজাকে অমান্য করলেন, “না, আমি খেলব না!”
“কী! আমার মুখের ওপর আপনি কথা বলেন! আপনি আমার অবাধ্য হন!” রাজাও রাগলেন।
মন্ত্রীও ছাড়বার পাত্তর নন। তিনিও বললেন, “আপনার মুখখানা কী এমন চাঁদপানা যে, আপনার মুখের ওপর কথা বললে কলঙ্ক পড়ে যাবে!”
আর থাকতে পারলেন না রাজা কাক্কাবোক্কা। তিনি মোটকা, ধানিপটকা! খপাত করে মন্ত্রীর দাড়িটা খামচে ধরে কড়কে উঠলেন, “আপনার মুখখানাই বা কী এমন আহামরি! আপনি নিজে একগাল দাড়ি নিয়ে আমার মুখের বিচার করেন! দেব দাড়ি উপড়ে!” বলে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর দাড়িতে মারলেন টান।
মন্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন, “ওরে বাবা রে ছিঁড়ে গেল!” দাড়িতে যত টান পড়ে, চিৎকার তত বাড়তে থাকে। তা অমন গলা-ফাটানো চিৎকার শুনলে রাজবাড়ি তো তটস্থ হয়ে উঠবেই। যে যেখানে ছিল, দাস-দাসী, সিপাই-সান্ত্রি সবাই ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল। রাজবাড়িতে সে এক হুলুস্থূল কাণ্ড! কোথায় ছিলেন রানিমা, তিনিও “কী হল? কী হল?” বলে প্রায় ছুটতে ছুটতে রাজার ঘরে ঢুকে পড়লেন। ঢুকেই থ! এ কী কাণ্ড! রাজামশাই মন্ত্রীর দাড়ি টানছেন কেন!
দেখবি তো দ্যাখ, রাজা কাক্কাবোক্কা প্রথম দেখতে পেলেন রানিকে। দেখতে পেয়ে, মন্ত্রীর গলার ওপর গলা চড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “উচ্চিংড়ে, উচ্চিংড়ে!”
রানি থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কই উচ্চিংড়ে?”
রাজা উত্তর দিলেন, “মন্ত্রীমশায়ের দাড়ির ভেতর।”
মন্ত্রীও ঠিক এই সময়ে আচমকা চেঁচালেন, “আমার দাড়ি ছেড়ে দিন মহারাজ, উচ্চিংড়ে পালিয়েছে।”
“পালিয়েছে?”
“আজ্ঞে হাঁ।”
রাজা আর একমুহূর্ত দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীর দাড়ি ছেড়ে রানির মুখের দিকে তাকালেন। মন্ত্রী বাঁচলেন বটে, কিন্তু যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা চট করে রানিকে বলে উঠলেন, “একে বলে ভাগ্য! রানি, তুমি ভাগ্যিস এলে! তোমাকে দেখেই ব্যাটা উচ্চিংড়ে পালাল।”
রানি হাঁদার মতো একবার রাজার মুখ আর একবার মন্ত্রীর মুখ দেখতে লাগলেন আর ভাবতে লাগলেন, তাই তো! রাজবাড়িতে উচ্চিংড়ে এল কোত্থেকে! এল, এল আর জায়গা পেল না, একেবারে মন্ত্রীর দাড়িতে ঢুকে পড়ল! আশ্চর্য!
আসল কথাটি যে উচ্চিংড়ে নয়, সে-কথাটি কিন্তু রানি আজ পর্যন্ত জানতে পারেননি। জানো শুধু তোমরাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন