শৈলেন ঘোষ

পাহাড়টা কত উঁচু। এত উঁচু যে চোখই যায় না। পাহাড়ের ঠিক কোল-বরাবর একটা নদী। নদীর গায়ে একটা গা-ছমছম গভীর বন। সেই বসে থাকত একটা বাঘ। বাঘ তো বাঘ, কী পেল্লাই। গাভর্তি ভোরা-ডোরা দাগ। পাভর্তি খোঁচা-খোঁচা নখ। আর, চোখদুটো ঠিক ভাটার মতো ড্যাব-ড্যাবে। বাঘটা দিনের বেলা হাই তুলত। রাত্তিরবেলা হাঁক পাড়ত হালুম, হালুম। আর খিদে পেলে যাকে সামনে পেত তার ঘাড় মটকাত। সে শেয়ালই হোক, কি হরিণ। বাঁদরই হোক, কি বনমানুষ।
বনে সব ছিল। যেমন ছিল গাছের গায়ে গাছ, তেমনই শেয়ালের পেছনে নেকড়ে। ছিল ভালুকের সঙ্গে হাতি। আর হাজার হাজার পাখি। কিন্তু কারও মনে সুখ ছিল না। বাঘের ভয়ে সবাই এক্কেবারে কাঁচুমাচু।
এই পাহাড়টার হুই-ই ওপরে একটা ঝরনা। ঝরনার জল তো পাহাড়ের ওপর থেকে ঝরঝর করে ঝরেই চলেছে। বাঘটা করত কী, জল খেতে যেত ওই ওপরে, ঝরনার ধারে। জলটল খেয়ে একটা নিঝুম জায়গায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ত। আরাম করত। আর চোখ পিটপিট করে আকাশ দেখত। আকাশে যদি তখন চাঁদ উঠত, তা হলে তো আর কথাই নেই।
একদিন হয়েছে কী, অমনই করে শুয়ে শুয়ে বাঘটা চাঁদ দেখছে। চাঁদের আলো আকাশ-ছুঁয়ে পাহাড়ে উপচে পড়েছে। জোছনায় কী সুন্দর দেখতে লাগছে চারদিক। ঠিক তেমন সময় একটি পাখি ডাকল গাছের বাসায়। তা, পাখি তো বনে হরদমই ডাকছে। পাখির কিচির-মিচির শুনতে শুনতে তো কান ঝালাপালা। কিন্তু চাঁদের আলোয় পাখির ডাক শুনে বাঘটা কেমন যেন চমকে উঠল। চমকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার নোলা দিয়ে জল গড়াল। কী জানি কেন, সেই চাঁদনি-রাতে চিবিয়ে চিবিয়ে একটি পাখি খাবার বড্ড ইচ্ছে হল বাঘটার। এমন ইচ্ছে হল যে, লোভে তার চোখদুটো জ্বল-জ্বল করে উঠল। গাছের দিকে ঠাওর করে পাখি খুঁজতে লাগল। কিন্তু জোছনা-রাতে পাখির কি আর টিকি দেখা যায়। দেখতে না পেয়ে রেগে গেল বাঘটা খুব। রেগে হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিলে। বয়েই গেল। চেঁচালে নিজের গলা-ই ভাঙবে। পাখিদের তো আর ধরতে হচ্ছে না। শেষকালে বাঘটা পাখি দেখতে না পেয়ে মারল লাফ। ব্যাস, লাফ মেরে একটা ঝাঁকড়া মতো গাছের ডালে উঠে পড়েছে। কিন্তু ওই কেঁদো বাঘের ভারে গাছে এমন ঝাঁকুনি লাগল যে, ডাল বুঝি ভেঙেই পড়ে। খুব রক্ষে, ভাঙল না। কিন্তু সেই গাছের ডালে ছিল একটাই পাখির বাসা। আর সেই বাসাতে তখন ছিল একটা ছোট্ট মতো পুঁচকে পাখি। তার তো ঘুম ভেঙে গেছে। চাঁদের আলোয় সে দেখতেও পেয়েছে বাঘকে। দেখতে পেয়েছে, বাঘ-বাবাজি আলতো পায়ে এগিয়ে আসছে। পাখি করল কী, টুঁ শব্দটি না করে বাসার থেকে বেরিয়ে পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তারপর বাঘটা যেই বাসার কাছে এসে পাখির খোঁজে মুখ বাড়াল। সেই পাখিটা অমনই বাঘের পেছনে এসে চেঁচিয়ে উঠল, “এই বাঘ, আমচুর খাবি?”
আচমকা পাখির গলা শুনে বাঘটা চমকে গেছে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ। সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে বাঘ গাঁক করে লাফ মেরে পাখি ধরতে গেল। যাঃ ফসকে গেছে! পাখি পালাল আর-এক ডালে! এদিকে বাঘের মাথা ঠুকল ঠকাস করে অন্য ডালে! উহুহুহু! বড্ড লেগেছে! বাঘ তো রেগে কাঁই। তার অপমানের একশেষ। একটা পুঁচকে পাখির সামনে মাথা ঠোকার বদনামটা তাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলল। সে আজ ভেঙেই ফেলবে ওই পাখির বাসা। হল কী, সে যেই একটা ঠ্যাং তুলে বাসাটা ভাঙতে গেছে, অমনি তার চোখে লেগে গেছে ধাঁধা। দ্যাখে কী, বাসার ভেতর দুটো না তিনটে ডিম। একেই তো বাঘের মাথা ঠুকে মাথাটা বোঁ-বোঁ করছে, তার ওপর পাখির বদলে বাসায় পাখির ডিম দেখে, তার মেজাজ গেল আরও বিগড়ে। রেগেমেগে সে গর্জে উঠল, “আমি ডিমই খাব!” বলে যেই ডিমে মুখ ঠেকাতে গেছে, অমনই সেই ডিমের মা, পুঁচকে-পাখিটা “ছ্যা-ছ্যা” করে উঠল। বলল, “বাঘের ভিমরতি ধরেছে। কোনকালে কে শুনেছে বাঘে ডিম খায়!”
বাঘ বলল, “কে রে তুই পুঁচকে পাখি!”
“আমি পুঁচকে নই। আমি পাখির মা।”
বাঘ চোখ পাকিয়ে বললে, “লুকিয়ে আছিস কেন! সামনে আয়! তোর খোঁচা দিয়ে কথা বলা চিরদিনের মতো ঘুচিয়ে দেব। জানিস আমি বাঘ।”
পাখিটা তখন আড়াল থেকে সত্যি-সত্যি বেরিয়ে এল। বেরিয়ে ঠোঁট ভেংচিয়ে বলল, “বাঘ তো হয়েছে কী! মাথা কিনে নিয়েছ নাকি!”
বাঘের রাগ আরও বেড়ে গেল। দাঁত খিঁচিয়ে পাখিকে বলল, “দেখেছিস আমার দাঁত!”
“ফুস!” পাখি তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল, “অমন দাঁত কত দেখেছি।”
“দেখছিস আমার নখ!” বাঘ থাবা তুলল।
পাখি বলল, “দুর দুর, ওই নখ ফড়িংকে দেখাও গিয়ে। ভয় পেলে সে-ই পাবে। আমি নই।”
“ও! তাই নাকি! তো, আয় না একবার আমার কাছে। দূরে দাঁড়িয়ে সবাই অমন ভ্যাংচাতে পারে। কাছে এলে আমার পেটের ভেতর তোর জন্যে একটা বাসা বানিয়ে দেব। সেখানে থাকবি, আর ডিম পাড়বি।” বলে বাঘটা কেমন বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠল।
পাখিও ছাড়বে কেন। সে চেঁচাল, “ঘেন্না ঘেন্না! বাঘ হয়ে একটা এইটুকুন পাখি খেতে লজ্জাও করে না। একবার মানুষের পাল্লায় পড়লে, বুঝতে কত ধানে কত চাল।”
“মানুষ!” বাঘ থতমত খেয়ে গেল, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সে জিনিসটা আবার কী?”
“ওমা! মানুষ চেনো না? কখনও মানুষ খাওনি? তুমি কেমনতর বাঘ?” বলতে বলতে পাখি হেসে কুটোপুটি।
এবার কিন্তু বাঘটা পাখির কাছে কাত। লজ্জায় মাথা কাটা যায় আর কী। পাখি মানুষ চেনে, অথচ সে চেনে না। তবু, বাঘ তো! লজ্জাটাকে সামলে নিলে সঙ্গে সঙ্গে। সামলে না-নিয়ে থাকতেও পারত না। কারণ, মানুষের নামটা কানে যেতেই বাঘের ভীষণ মিষ্টি লেগে গেছে। এমন মিষ্টি লাগল, বাঘ নোলার জল টেনে রাখতে পারল না। পাখির ডিম খাওয়ার কথা সে ভুলেই গেল। রাগটা তার গলে জল। আদরি-গলায় পাখিকে ডাকতে ডাকতে বললে, “হ্যাঁ রে, মানুষ কেমন দেখতে রে?”
পাখি বললে, “সব বলে দেব। আগে বলো তুমি আমার ওই ডিমগুলো খাবে না!”
বাঘ ঠোঁট উঁচিয়ে মুখে চুক-চুক করে বলল, “ছিঃ ছিঃ, ওকথা বলতে আছে! আমি যদি ডিমে মুখ দিই তো তুই আমায় বাঘ না-বলে ছুঁচো বলে ডাকিস! বল, বল, কেমন দেখতে মানুষ?”
“লম্বা।” পাখি উত্তর দিল।
“লম্বা! সে কী জিনিস?” বাঘ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ঢ্যাঙা।” পাখি জবাব দিল।
“লম্বা আবার ঢ্যাঙা?” বাঘের মাথা গুলিয়ে গেল।
পাখি উত্তর দিল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। লম্বা, ঢ্যাঙা, বেঁটে, খাটো, তালপাতা, বাঁশপাতা, হাঁড়ি-মুখো, ব্যাঙা-মুখো, বাদামি, হলদে, নাদা, হাঁদা, বোকা, ঘোড়েল, কচি, কাঁচা, প্যানপেনে, ঘ্যানঘেনে, হাহা, হুহু—সব মিলিয়ে মানুষ।”
বাঘ বললে, “পাখি রে পাখি, তোর কথা শুনে আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।”
পাখি জিজ্ঞেস করলে, “কেন? কেন?”
“শুনতে গিয়ে বুঝতে পারছি না। বুঝতে গিয়ে মাথার ভেতর ভোঁ-চক্কর লেগে যাচ্ছে।”
পাখি বললে, “মানুষও অমনই। তাদের বুঝলেও ভোঁ-চক্কর, না বুঝলেও ভোঁ-চক্কর। তবে খেতে যা-না। ফাস্টো কেলাস! একবার মুখে দিলে আর রক্ষে নেই। যতই খাও পেট আর ভরছে না। এই খাচ্ছ, এই হজম হয়ে যাচ্ছে। আবার খাচ্ছ, আবার হজম হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আবার খাই, আবার খাব। তবে মুশকিল কী জানো?”

“কী মুশকিল?” বাঘ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
পাখি উত্তর দিল, “মানুষের মাথা তো অনেক রকমের। তাই কার মাথায় কী বুদ্ধি লুকিয়ে আছে কেউ জানে না। হেঁড়ে-মাথার একরকম বুদ্ধি, আবার টেকো-মাথার আর-এক রকম। তেমনই কাঁচা-মাথার বুদ্ধি কাঁচা-কাঁচা, পাকা-মাথার পেঁকো-পেঁকো। তবে সব মাথাই খেতে ভারী মিষ্টি।”
শুনতে শুনতে বাঘের নোলা দিয়ে টস-টস করে জল গড়িয়ে পড়ল। বললে, “পাখি রে, আয়, আয় আমার কাছে আয়, তোকে একটু আদর করি!”
পাখি বললে, “খুব হয়েছে। আর আদরে কাজ নেই। ওই বলে পেটপুজো করার মতলব।”
“ওই তোদের দোষ,” বাঘ যেন একটু অভিমান করল। তারপর বলল, “আমায় তোরা বড্ড অবিশ্বাস করিস। ঠিক আছে আমার কাছে আসতে হবে না। শুধু আর একটা কথা জিজ্ঞেস করেই আমি এখান থেকে চলে যাব।”
“কী কথা?”
“মানুষ কোথায় পাওয়া যায়?”
“হা কপাল! মানুষ কোথায় পাওয়া যায়, তা-ও তুমি জানো না? তোমার যত ধিঙ্গিপনা এই বনের ভেতর! ওই নদী ধরে চলে যাও, তা হলেই গ্রাম পাবে, শহর পাবে। হাট পাবে, গঞ্জ পাবে। গ্রামেও মানুষ, শহরেও মানুষ। হাটেও মানুষ, গঞ্জেও মানুষ। গিজগিজ করছে। ধরবে, আর টপাটপ মুখে পুরবে।”
বাঘ চেঁচিয়ে উঠল “সত্যি?”
পাখি বললে, “মিথ্যে বলে লাভ?”
বাঘ লাফিয়ে উঠল। গাছের ডাল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। “যাচ্চি” বলে এমন এক হাঁক পাড়ল যে, সারা বন কেঁপে উঠল। পাখির ডিম ছেড়ে, বাঘ তক্ষুনি মানুষ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
ভাগ্যিস তখন সাঁঝ ঘনিয়ে রাত নেমে আসছিল। নইলে, বনের বাইরে এসে বাঘের যে দুর্দশার শেষ থাকত না, এ সবাই জানে। এ ভারী মজার ব্যাপার। কেমন দ্যাখো, সূর্য উঠলেই আকাশটা আলোয়-আলোয় ভরে যাচ্ছে, আবার রাত হলেই সূর্যটা কেমন অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে! বন থেকে বেরিয়েই সেই অন্ধকারে বাঘ থমকে গেল। অন্ধকারটা যতই জমে জমে উঠছে, বাঘের বুকের ভেতরটা ততই শিরশির করে কাঁপছে। বন ছাড়া তো বাঘ এতদিন আর কিছু জানত না। তাই বনটা পেছনে ফেলে বাঘ যত সামনে এগোচ্ছে, ততই চোখদুটো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এপাশ-ওপাশ চাইছে। চাইবেই তো। বনের ভেতর ইচ্ছে করলেই ঝুপঝাপ লুকিয়ে পড়ো, কেউ টের পাবে না। তবে হ্যাঁ, ঠান্ডা লাগিয়ে তুমি যদি আচমকা ফ্যাঁচ-চ-চ করে হেঁচে ফেল, তবে অন্য কথা। সে তোমার কপালের দোষ। কিন্তু বনের বাইরে? হাঁচিরও কথা নেই। কাশিরও নেই। এখানে আর চোখকে ফাঁকি দিতে হচ্ছে না। কেউ দেখতে পেলে তোমার পালাবার পথ নেই, লুকোবারও উপায় নেই। চোখে পড়বেই।
“এই বাঘ!”
এ কী রে! কে ডাকল এমন আচমকা! কে দেখতে পেল বাঘকে! গলাটা কেমন ফিনফিনে! ওই ফিনেফিনে গলা শুনেই বোকারাম বাঘটা মারলে একলাফ! লাফ মারতেই আর এক কাণ্ড, পা ফসকে চিতপটাং। অমনি সেই ফিনফিনে গলায় খিলখিল করে হাসি। হাসতে হাসতে চেঁচাতে লাগল, “পড়ে গেছে! পড়ে গেছে!”
বাঘের তো দফা রফা। উঠে পড়! উঠে পড়! বাঘ উঠেই দেখে, তার চোখের সামনে একটা বাকসো। বাকসোর ওপর ঠোক্কর লেগেই যে তার পা ফসকেছে, তা আর বুঝতে বাকি রইল না বাঘের। সে ভীষণ রেগে গেল! বাকসোটার পেটে মারলে ক্যাঁত করে লাথি। সাঁই-ই-ই করে ছিটকে গিয়ে বাকসোটা চেঁচিয়ে উঠল, “মেরো না মেরো না!” বলতে বলতেই বাকসের ঢাকনাটা ফটাস করে খুলে গেল! খুলে যেতেই, তার ভেতর থেকে এইটুকুনি একটা মানুষ-মানুষ পুতুল বেরিয়ে এল। ফিক ফিক করে হেসে বাঘকে দেখতে লাগল।
বাঘের তো চক্ষু ছানাবড়া। এটা কে রে! অত বড় বাঘটা তাকে দেখে একেবারে ভয়ে চুপসে গেল। যতটা চুপসে গেল, ভয়টাকে লুকোবার জন্যে ঠিক ততটা সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ফোঁস ফোঁস করতে করতে হঠাৎ সে হেঁড়ে গলায় হাঁকার দিল, “আহা! আবার হাসি হচ্ছে!”
কোথাও কিছু নেই এ আবার কী কথা! অচেনা কারও সঙ্গে দেখা হলে কোথায় ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করবে, “হাই, আপনি কেমন আছেন?” তা নয়, গলার স্বর কী, যেন কুম্ভকর্ণ নাক ডাকাচ্ছে! তো বলব কী, তার কথা শুনে এবার আর ফিকফিক করে নয় খিলখিল করে হেসে উঠল পুতুলটা। হাসতে হাসতে হাততালি দিতে লাগল। দিতে দিতে বলল:
ঘোড়া দেখিনি, হাতি দেখিনি
ছাগল, ভেড়া শুয়োর,
সাপ দেখনি, নেংটি, ছুঁচো,
ব্যাঙ দেখিনি কুয়োর।
লাল দেখিনি, নীল দেখিনি,
শরৎ মেঘের সাদা,
আমার সামনে দাঁড়িয়ে যিনি,
হয়তো তিনি গাধা।
এবার আর বাঘের না-রেগে উপায় আছে! শেষে কিনা এই পুঁচকেটা তাকে গাধা ঠাউরাল! বাঘ গর্জে উঠল, “এই বেঁটে, তুই আমাকে গাধা বললি কেন রে?”
পুতুল বলল, “তুমি কেন বেঁটে বললে শুনি?”
“বেঁটে নয়তো তুই কে?” বাঘের গলায় তেমনই হাঁকার।
“আমি মানুষ। আমি পুতুল।”
পুতুল বলতে বাঘ কিছু বুঝল কিনা কে জানে। কিন্তু মানুষের নাম শুনেই তার নোলায় জল গড়িয়ে পড়ল। বাঘের অত বড় মুখখানা এত বড় হাঁ করে, খাই খাই করে উঠল। বাঘ পুতুলের ঘাড়ে মারলে লাফ! পুতুল তো এইটুকুনি। পুতুল টুপ করে বসে পড়ল। তাক ফসকে বাঘ পা পিছলে সড়াত! তাই না দেখে, মানুষ-মানুষ ছোট্ট পুতুল হেসে লুটোপুটি। বাঘ এদিকে রেগে বোম-পটকা। ঝটকা মেরে ঘুরে দাঁড়িয়ে গাঁক-গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল, “শোনরে বেঁটে, বাঘের খপ্পর থেকে কেউ নিস্তার পায় না। একবার যখন আমার নজরে পড়েছিস, তখন তোকে খাবই। এখন যত হাসছিস, আমার পেটের ভেতর ততই কাঁদবি।”
“ও এবার বুঝতে পেরেছি, তুমি তা হলে গাধা নও, বাঘ!” বলে, পুতুলটা আরও জোরে হেসে উঠল, হাসতে হাসতে বলল:
গাধা তবু গাধার মতো
আর কিছু নয় অন্য
তুমি দেখি বাঘের নামে
বিচ্ছিরি জঘন্য!
বাঘ এবার সত্যি-সত্যি ভীষণ রেগে গেল। বাঘকে গাধা বললে যেমন সহ্য করা যায় না, তেমনই জঘন্য বললে আরও সহ্য করা যায় না। বুঝতেই পারছ, এখন বাঘ তাই আরও রেগে, আরও টং! তার নখের যুগ্যি নয় একটা বেঁটে, তাকে এমন করে ডেঁটে দিল! বাঘ ভেতরে ভেতরে গজরাতে লাগল। তার ল্যাজ রাগে ওলোট-পালট খেয়ে ছটফট করতে লাগল। তার চোখের চাউনি লাল-টকটকে হয়ে গেল। এবার বোধহয় সে আবার পুতুলটার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে। তাক কষছে। এই পড়ল বলে!
এই দ্যাখো, ওদিকে আবার কী কাণ্ড হয়েছে। সেই যে-বাকসোটার ভেতর থেকে এই পুতুলটা বেরিয়েছে তার ভেতর থেকে কেমন একটি একটি করে আরও ক’টি পুতুল বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এল চুপি চুপি। বেরিয়ে এসে বাঘের পেছনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রইল। বাঘ যেই না লাফাতে যাবে, অমনি চারটে, না, পাঁচটা না, দশটা, দশটা না, বিশটা পুতুল তিড়িং তিড়িং করে বাঘের ল্যাজে উঠে পড়ল। বাঘ তো থতমত খেয়ে গেছে। ল্যাজটা সাঁই-সাঁই করে ঝাপটা মারতে লাগল। ঝাপটা মারলে কী হবে, ততক্ষণে তারা তরতর করে কেউ বাঘের পিঠে উঠে পড়েছে। কেউ কানে ঢুকে পড়েছে। ঠিক যেমন করে পিঁপড়ে রস-টুপটুপ পানতুয়া ছেঁকে ধরে, তেমনি করে ছেঁকে ধরল। ধরে, কেউ বাঘের ল্যাজে চিমটি কাটে। কেউ পিঠ খামচে লোম টানে। কেউ পেটের নীচে দোল খায়। কানের ভেতর কু-উ ডাকে। নাকের ডগায় ঘুঁষি মারে। গলার তলায় সুড়সুড়ি দেয়! বাঘ লাফ মারবে কী, লাফ মারতে গিয়ে হেসে মরে। হাসতে হাসতে নেচে মরে। নাচতে নাচতে কেঁদে মরে। কাঁদতে কাঁদতে গড়গড় গড়াত, পা ফসকে পড়াত! তারপর গাঁক গাঁক গাঁকাচ্ছে। চার-পা তুলে কোঁকাচ্ছে। কোঁকাতে কোঁকাতে শেষকালে বাঘের দফা রফা। যেখানে গড়াচ্ছিল, সেইখানে গড়াতে গড়াতে বাঘের দাঁতে দাঁতকপাটি। বাঘ আর হাসেও না, নাচেও না। কাঁদেও না, কোঁকায়ও না। ঠান্ডা মেরে জ্ঞান হারাল। ঠ্যাং উলটে পড়ে রইল সেইখানে।
তারপর?
তারপর আর কী? যখন জ্ঞান ফিরল, বাঘ তখন আধমরা হয়ে আছে। কোনওরকমে পা ছড়িয়ে উঠে বসল। জুলুক-জুলুক এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। ভোঁ-ভাঁ! কেউ কোথাও নেই। সেই পুতুলগুলো নেই। পুতুলের বাকসোটাও নেই। আশ্চর্য, গেল কোথায়?
তাদের দেখতে না-পেয়ে বাঘ স্বস্তির নিশ্বেস ফেলল। মনে মনে ভাবল, যাক বাবা, গেছে, ভালই হয়েছে। এই নাক খত, আর এই কানমলা! আর যদি কোনওদিন এ-মুখো হই! পুতুল নামের এই বেঁটে মানুষগুলোই যখন এমন ঠ্যাটা, তখন না জানি মানুষ নামের লম্বাগুলো কী দজ্জাল! ঢের হয়েছে। আর দরকার নেই মানুষ খেয়ে। মানে মানে নিজের ডেরায় ফিরে যাওয়াই ভাল। বলে, অনেক এঁকা-বেঁকা পথ পেরিয়ে, আবার বাঘ বনে ফিরে গেল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন