শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল নেংটিছানা। পুঁচকে।
নেংটিছানার কেউ ছিল না। মা ছিল না। বাবা ছিল না। ভাই ছিল না। বোন ছিল না। পিসি-মাসি কেউ না। তারা কেউ গেছে কাগের ঠোঁটে। কেউ গেছে পুষির পেটে। কেউ গেছে নেংটি ধরার চেপটা কলে। নেংটিছানা এক্কেবারে একলাটি। একলাটি সে এধার-ওধার ঘুরত। ঘুরত আর ভাবত। ভাবত আর কাঁদত।
একদিন ঘরের কোণে বসে বসে কাঁদছে, ঠিক সেই সময়ে তাড়া করল একটা ইয়া তাগড়াই হুলো বেড়াল। তাঁর গোঁফজোড়া লম্বা লম্বা। চোখদুটো ড্যাবড়া-ড্যাবড়া। কানদুটো খাড়া খাড়া। সে তাড়া করতেই নেংটিছানা মারল লাফ তিড়িং। মেরেই দে ছুট! কিন্তু বেড়ালও কী ছাড়ে! সেও করল তাড়া।
তাড়া খেয়ে নেংটি ছোটে।
তাড়া মেরে বেড়াল ছোটে।
ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যায়। পিছিয়ে যায়। সামনে যায়। ডাইনে যায়। খাটের তলায় সেঁদিয়ে পড়ে। ইটের ফাঁকে লুকিয়ে ডরে। শেষে নেংটিছানা হাঁপিয়ে হাঁসফাস!
আর যখন পারছে না, পা যখন টানছে না, তখন শেষ চেষ্টা—ধাঁ করে সামনের নর্দমায় ঢুকে পড়ল। ঢুকে সুট করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
গোবদা-মুখো বেড়ালটা পা দিয়ে নর্দমার ইট ঠেলল। ইট নড়ল না। পায়ের নখ দিয়ে ইটের গায়ে আঁচড়ে দিল। ইট সরল না। ফ্যাঁচ করে ধমক মারল। ইট রইল যেমনকে তেমন। কিছু করতে না পেরে, অগত্যা বেড়াল গোঁফ ফুলিয়ে ওত পেতে সেইখানে বসে রইল। নেংটি এলেই খপাত। তারপরেই চাকুম-চুকুম গালের ভেতর।
এদিকে নেংটিছানা বাইরে বেরিয়ে দেখে এটা একটা বাগান। গাছ-গাছ-গাছ। ফুল-ফুল-ফুল। আর চারদিকে সবুজ। সে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
তারপর অনেকক্ষণ গেল। বেড়াল এল না।
সকাল পেরিয়ে দুপুর গেল। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয় হয়, তবু বেড়াল এল না। আর ঠিক তক্ষুনি নেংটির খিদে পেয়ে গেল। খিদে পেয়েছে, এখন কী করবে? নেংটিছানা চুপি চুপি বাদামতলায় গেল। খুঁজে খুঁজে বাদাম কুড়িয়ে খেতে বসল। খেতে খেতে পেট প্রায় ভরে এসেছে, ঠিক তক্ষুনি একটা ল্যাজফোলা কাঠবিড়ালি তাকে দেখতে পেয়েছে। চেঁচিয়ে উঠেছে, “কে হে তুমি, লুকিয়ে লুকিয়ে বাদাম খাচ্ছ?” বলেই, একেবারে এক লাফে নেংটির মুখোমুখি। নেংটি না-পারে নড়তে, না পারে লাফাতে। মুখের বাদাম না-পারে গিলতে, না পারে উগরোতে।

ল্যাজফোলা কাঠবিড়ালি নেংটির মুখের চেহারাটা দেখে এমন চিক-চিক, ফিক-ফিক করে হেসে উঠল যে, তাই দেখে নেংটি আরও ভয় পেয়ে গেল।
কাঠবিড়ালি হাসতে হাসতে বলল, “তুই তো আচ্ছা হাঁদা, আমায় দেখে তোর যে দেখি মূর্চ্ছা যাবার গোত্তর। আমাকে তুই কাগ ঠাউরেছিস, না চিল? না, হুলো-বেড়াল? আমাকে ভয় পাবার কী আছে শুনি? খা, যত পারিস বাদাম খা! পেট ভরে খা! কেউ মানা করবে না। ওরে বাবা, এখানে যে আসে, সে-ই খায়, তুইও খাবি। তাতে হয়েছেটা কী? তবে হ্যাঁ, একটু নজর রেখে খেয়ো। নইলে কাগ-চিল দেখতে পেলে তোমার কম্ম সারা!”
নেংটিটা এই ফাঁকে চিবনো বাদামগুলো মুখের ভেতর থেকে পেটের ভেতরে কোঁত করে গিলে ফেলল।
কাঠবিড়ালি দেখতে পেয়েছে। বলে উঠল, “যাক, ভয় ভেঙেছে। আরও খা।”
নেংটি ঘাড় নাড়ল।
“খাবি না?” জিজ্ঞেস করল কাঠবিড়ালি।
“না।” এতক্ষণে মুখে তার কথা সরল।
“কেন?”
“পেট ভরে গেছে।” উত্তর দিল নেংটি।
“ও! তার মানে তুমি অনেকক্ষণ চালাচ্ছ?” হাসতে হাসতে ঠাট্টার ছলে বলল কাঠবিড়ালি। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কোথায় থাকা হয়?”
“ওই বাড়িতে।”
“বলিস কী রে! ওই বাড়িতে একটা হুলো-বেড়াল আছে না?” জিজ্ঞেস করল কাঠবিড়ালি।
এবার নেংটিছানার অনেকখানি ভয় কাটল। বলল, “আর একটু হলেই সে আমায় ধরে খেয়ে ফেলত। তার ভয়েই আমি পালিয়ে এসেছি।”
“বেশ করেছিস।” বলে সাহস দিল কাঠবিড়ালি। তারপর বলল, “কিন্তু সে তো হল, তোর বাবা-মা যে ভাববে!”
“তারা নেই।” বলতে বলতে নেংটির চোখ ছলছল করে উঠল।
“তুই তা হলে একা থাকিস?”
“হ্যাঁ। আমার কেউ নেই।”
কাঠবিড়ালি তখন ল্যাজ ঝাঁকিয়ে বলল, “তুই তা হলে এক কাজ কর! আর দরকার নেই ওই বাড়িতে যাবার। তুই এই বাগানেই থাক। এখানে তো আর খাবারের অভাব হবে না। আরে বাবা, গেরস্তবাড়িতে চোরের মতো চুরি করে খেতে হয়। এখানে সেসব নেই। ঢালাও ব্যবস্থা। যখন ইচ্ছে বাদাম চিবোও। আর আমার ল্যাজে বসে গাছের ডালে ডালে উড়ে বেড়াও। কী বলিস, ভাল নয়?”
নেংটির তো কাঠবিড়ালির এইসব কথায় খুশি হওয়ারই কথা। কিন্তু কাঠবেড়ালির ল্যাজে বসে গাছের ডালে উড়ে বেড়ানো কথাটার মানে সে খুঁজে পেল না। তাই সে হাঁদারামের মতো জিজ্ঞেস করে বলল, “তোমার ল্যাজে বসে উড়তে হবে কেন? তুমি আকাশে উড়তে পারো?”
“দুর বোকা! আকাশে উড়তে যাব কেন? গাছের ডালে ডালে লাফ মেরে ঘুরব। এই ডাল থেকে ওই ডাল। কিংবা ধর, এই গাছ থেকে ওই গাছ। মারব লাফ তিড়িং, একলাফেই ওই গাছের ডালে।” বলেই কাঠবিড়ালিটা আবার হেসে উঠল।
নেংটিছানাটা তার কথা শুনে কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
“বুঝতে পেরেছি, তুই এখনও সব ঠিকঠাক বুঝতে পারিসনি। তুই এক কাজ কর, আমার ল্যাজে বস। ভয় পাবার কিছু নেই। দ্যাখ, তোকে ল্যাজে নিয়ে কেমন করে ডালে ডালে উড়িং!” বলে কাঠবিড়ালি নিজের ল্যাজটা দু’বার ফুড়ুং-ফাড়াং করে নেড়ে নেংটির মুখের কাছে নাচাতে লাগল, “নে ওঠ।”
নেংটি উঠব, কি উঠব না এই ভেবে দোনোমনা করছে। তার ভয়ও লাগছে। আবার উঠতেও ইচ্ছা করছে।
কাঠবিড়ালি তাকে ইতস্তত করতে দেখে আবার বলল, “আরে বাবা, একবার উঠেই দ্যাখ না! কীরকম মজা দেখবি।”
আর দোনোমনা করা ঠিক নয় ভেবে, নেংটি কাঠবিড়ালির সেই নরম ল্যাজের ওপর বসে পড়ল। দেখাই যাক না কী হয়।
কাঠবিড়ালি বলল, “চেপে ধরবি।”
নেংটি বলল, “তোমার ল্যাজটা বড্ড নরম।”
কাঠবিড়ালি বলল, “এবার দেখবি ল্যাজের কেরামতি।” বলে কাঠবেড়ালি নেংটিকে ল্যাজে বসিয়ে, গাছের গুঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে পড়ল গাছের ওপরে। তারপর মারল লাফ এ-ডাল থেকে হুই-ই-ই ও-ডালে! ভয়ে নেংটিটা চেঁচিয়ে উঠল, কুঁই-ই-ই!
এমনই করে কাঠবিড়ালির ল্যাজে বসে লাফাতে লাফাতে নেংটির সাহস হয়ে গেল।
এমনই করে লাফাতে লাফাতে নেংটির সঙ্গে কাঠবিড়ালির খুব ভাবও হয়ে গেল।
নেংটি জিজ্ঞেস করল, “এমন করে তুমি লাফাও কেমন করে কাঠবিড়ালি ভাই?”
নেংটির কথা শুনে খুব ওপরের একটা ডালে বসে পড়ল কাঠবিড়ালি। তারপর বলল, “হুঃ হুঁঃ বাবা! সবটাই ম্যাজিক! আমার ল্যাজটা আমার প্যারাসুট। এখান থেকে আমি যদি ওই মাটিতে লাফ মারি, আমার একটুও লাগবে না। লাফ মেরে আমার ল্যাজকে এমনভাবে খেলাব, মনে হবে আমি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নামছি। লাগা দুরে থাক, একটু ঝাঁকুনি পর্যন্ত লাগবে না। দেখবি? তবে দ্যাখ!” বলে নেংটিকে হুঁশিয়ার করল, “আমাকে বেশ ভাল করে জাপটে ধর। একদম ছাড়বিনি।” বলতে না-বলতেই কাঠবিড়ালি দিল লাফ!
ও মা! এ কী! কেমন ধীরে ধীরে হাওয়ায় ভেসে নামছে। নেংটির একেবারে আক্কেল গুড়ুম। ভাগ্যিস হুলোটা তাকে তাড়া করেছিল! নইলে কি এমন বন্ধু সে পেত! না কি বন্ধুর ল্যাজে চেপে গাছের ডালে ঘুরে-উড়ে খেলা করতে পারত! ঘরের কোণের চেয়ে বাইরের পৃথিবীটা কত সুন্দর বলো? বাইরের পৃথিবীতে কত সুন্দর সুন্দর বন্ধু আছে। ঘরের কোণে বসে থাকলে কী তার টের পাওয়া যায়! সুতরাং সুন্দর এক বন্ধুর সঙ্গে নেংটিছানার সেইদিনই দোস্তি হয়ে গেল। সেই বন্ধুর নাম কাঠবিড়ালি।
তোমরা যদি কোনওদিন সেই নাম-না-জানা বাগানে গিয়ে পড়, তবে নিশ্চয়ই দেখতে পাবে, একটা নেংটিছানা, তার বন্ধু কাঠবিড়ালির ল্যাজে চেপে এ-ডালে, ও-ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খেলা করছে। কী মজার সে খেলা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন