শৈলেন ঘোষ

কোথাও কিচ্ছু নেই, ঠিক মাঝরাতে, রাজা কাক্কাবোক্কার ঘুম ভেঙে গেল। হয়তো তাঁর জলতেষ্টা পেয়েছিল। কিংবা হয়তো তাঁর মাঝরাতে গান শোনবার ইচ্ছে হয়েছিল। রাজা বলে কথা! কখন যে কী ইচ্ছে যায় কে বলতে পারে। তাই তিনি আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন, “কোই হ্যায়?”
হ্যায় তো নিশ্চয়ই। রাজার হুকুম শোনার জন্য কেউ না-থাকলে রক্ষে আছে! আরে বাবা অত কী, ঘুমোতে ঘুমোতে রাজা একবার খুক করে কাশুন না, অমনি সারা রাজবাড়িতে গেল গেল রব উঠে যাবে, কোথায় বদ্যি রে, কোথায় দাওয়াই রে! সুতরাং এখন এই নিশুতিরাতে রাজার হাঁক শুনলে কার এমন বুকের পাটা আছে যে, সাড়া না-দিয়ে থাকে! আশ্চর্য, আজ কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। সবাই ঘুমোচ্ছে। এমনকী, রাজার রাতের প্রহরীর দলও বেমালুম নাকে সরষের তেল ঢেলে ঘুম দিচ্ছে। এই রে, গেল এবার নোকরি!
অবিশ্যি ঘুমকে তুমি দোষ দিতে পারো না। কেন না, মানুষগুলোকে কাল সারারাত চরকিবাজি খেতে হয়েছে। কী, না রাজামশাই হুকুম দিয়েছিলেন, রাজবাড়ির মন্ত্রী অমাত্য, সেপাই-সান্ত্রি, নোকর-চাকর, সক্কলকে একতলা থেকে দোতলা, দোতলা থেকে তিনতলা, তিনতলা থেকে পাঁচতলা উঠতে হবে, নামতে হবে। আবার উঠতে হবে, আবার নামতে হবে। একবার-দু’বার নয়, সারারাত ধরে একশোবার, দুশোবার। এ বাবা যে-সে রাজা নয়! এর নাম রাজা কাক্কাবোক্কা। তাঁর হুকুম অমান্য করেছ কী—ঘ্যাঁচ! সুতরাং কাল সারারাত ধরে রাজবাড়িতে সে কী তুলকালাম কাণ্ড! একবাড়ি লোক শুধু ওপরে উঠছে আর নীচে নামছে। আর রাজা কাক্কাবোক্কা তাই দেখছেন, হো-হো করে হাসছেন। কী উদ্ভুটে রাজা রে বাবা! সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন বুড়ো মন্ত্রীমশাই, আর রসুইঘরের বড়কর্তা। শাঁসেজলে দু’জনেই তো একটু ইয়ে! বলতে নেই, তবু বলি, দুটিকে হোঁদলকুতকুত বললেও কম বলা হয়। তা বলো, ওই বিশাল বপু নিয়ে সারারাত ধরে সিঁড়ি ভেঙে ওঠা-নামা করা কি চারডিখানি কথা! সুতরাং আজ রাতে সবাই যদি বেহাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তবে নিশ্চয়ই দোষ দেওয়া যায় না কাউকে!
সুতরাং রাজা কাক্কাবোক্কা “কোই হ্যায়” বলে হাঁক পাড়লেও কেউ সাড়া দিল না। সাড়া দিল না বললে ভুল হবে। বলা উচিত, দিতে পারল না। সাড়া না-পেয়ে তিনি প্রথমটা একটু অবাক হলেন। অবশ্য মনে মনে ভাবলেন, হয়তো তাঁর হাঁক কেউ শুনতে পায়নি। তাই তিনি আর-একবার আর-একটু জোরে ডাক দিলেন, “কোই হ্যায়!”
এবার কিন্তু রাজা সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কেন না, এবারও তিনি সাড়া পেলেন না। সুতরাং বুঝতেই পারা যায়, তিনি ভেতরে ভেতরে খেপছেন। খেপতে খেপতে প্রথমটা দাঁত কড়মড় করলেন। অতঃপর ঘুষি পাকালেন। তড়াং করে দাঁড়িয়ে পড়ে তিড়িং করে লাফ মারলেন। লাফ মেরে তাঁর শয়নকক্ষের বাইরে এসে তিনি চক্ষু কপালে তুললেন। কেন না, তিনি দেখলেন, তাঁর প্রহরী দু’জন ঘরের দু’পাশে চিতপটাং হয়ে ঘুম দিচ্ছে। আর দেখতে হয়! এই বুঝি একজনের পেটে চালিয়ে দিলেন ঘুষি! বুঝি, গেল পেট ফেঁসে! না, মারলেন না তো! তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হঠাৎ যেন মনে হল, তাঁর কানে কীসের শব্দ ভেসে আসছে! তিনি ভাল করে কান পাতলেন। শব্দটা শুনতে শুনতে তিনি শব্দের দিকেই এগিয়ে চললেন। রাজবাড়ি এখন একেবারে সুনসান। তিনি বুঝতে পারলেন সবাই এখন ঘুমোচ্ছে। অথচ, এই রাতে প্রহরীদের জেগে থাকার কথা। তাদের পায়ের শব্দ এখন কানে না এসে ভুর-র-র, ভুর-র-র শব্দ তাঁর কানে আসছে! তিনি আরও ক’পা এগোলেন। তিনি এ-ঘরে ও-ঘরে উঁকি মারলেন। অলিন্দের বাঁদিকে ক’পা গেলেন। তিনি জানেন এর পরেই মন্ত্রীর ঘর। তিনি মন্ত্রীর ঘরের সামনে এসেই থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝতে পারলেন, শব্দটি মন্ত্রীর ঘর থেকেই আসছে। তিনি আর দেরি করলেন না। দরজা ঠেলে মন্ত্রীর ঘরে ঢুকে পড়লেন। হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই! মন্ত্রীমশাই ঘুমোচ্ছেন। তাঁর ইয়া পেল্লাই পেটটি চিত হয়ে মৃদু মৃদু দোল খাচ্ছে আর নাকের গর্তদুটি তালে তালে মধুর সুরে ভুরভুরি কাটছে।
রাজা কাক্কাবোক্কা তো দেখেশুনে থ। মনে মনে বললেন, “ও, এ তোমার কীর্তি!” বলেই, তিনি খপ করে মন্ত্রীমশায়ের নাকের গর্তদুটো চেপে ধরলেন। মন্ত্রীমশাই ঘুমের ঘোরে হাঁসফাস করতে করতে দিলেন ঝেড়ে এক লাথি। এক ঘায়েই রাজা কাক্কাবোক্কা ধপাস! একেবারে মাটির ওপর চিতপটাং। সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীমশাইয়ের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি ঘুমচোখে ভাল করে ঠাওর না-করতে পেরে ভাবলেন, ঘরে বুঝি চোর ঢুকেছে। তাই চিৎকার করে হাঁক পাড়লেন, “চোর, চোর।”
উফ! মন্ত্রীমশায়ের এই আকাশ-ফাটানো চিৎকার শুনে কার চোখে আর ঘুম থাকে। গোটা রাজবাড়িটাই আতঙ্কে চেঁচাতে লাগল, “চোর, চোর!” তারপর লেগে গেল হুড়োহুড়ি। এ ছোটে এদিকে, ও ছোটে ওদিকে। ছুটতে ছুটতে তারা মন্ত্রীর ঘরেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই তো চক্ষু ছানাবড়া। দেখে কী, মহারাজ মাটির ওপর চিতপটাং হয়ে পড়ে আছেন, আর মন্ত্রীমশাই চোরের ভয়ে চোখ কান বুজে “চোর চোর” করে গোঙাচ্ছেন। তোল, তোল আগে রাজামশাইকে তোল! সবাই মিলে রাজাকে টেনে তুলতে না তুলতেই, মন্ত্রীমশাই চোখ খুলেছেন! খুলেই হতভম্ব! আরে, এ তো চোর নয়! এ যে রাজামশাই স্বয়ং!
রাজা তো খেপে লাল! কী! এত বড় আস্পদ্দা! রাজাকে মন্ত্রী লাথি মারে! রাজাকে বলে কিনা চোর! রাজা গর্জন করে উঠলেন, “মন্ত্রীকে পাকড়াও! নিয়ে চলো আমার ঘরে।”
সান্ত্রিরা মন্ত্রীকে পাকড়াও করে নিয়ে গেল রাজার ঘরে। তারপর মন্ত্রীকে রাজার জিম্মায় রেখে সান্ত্রিরা বেরিয়ে গেল।
রাজা কাক্কাবোক্কা কটমট করে মন্ত্রীর দিকে চাইলেন। বললেন, “এই যে মন্ত্রীমশাই, এখন নিশ্চয়ই ঘুম পাচ্ছে না!”
মন্ত্রী আমতা আমতা করতে লাগলেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা টেনে এক ধমক দিলেন, “ডেকে ডেকে আমার গলা কাঠ হয়ে গেল, আর পড়ে পড়ে আপনি নাকের গর্তে ভুড়ভুড়ি কাটছেন!”
মন্ত্রী কী বলি, কী বলি, ভাবতে ভাবতে ফট করে বলে বসলেন, “আজ্ঞে হুজুর, নাকের আর দোষ কী! শরীরের ওপর ধকলটা তো কাল কম যায়নি। সারারাত ধরে একতলা আর পাঁচতলা করলে—” বলতে বলতে হঠাৎ মন্ত্রীর নজরটা রাজার চোখের ওপর গিয়ে পড়ল। ব্যাস! মন্ত্রীর হয়ে গেছে! একদম চুপ!
রাজা ঠেস দিয়ে বললেন, “বলুন, বলুন, থামলেন কেন?”
মন্ত্রীমশাই ভীষণ ভয় পেয়ে ঢোঁক গিলতে লাগলেন।
রাজা ধাতিয়ে উঠলেন, “আপনি তো ভীষণ ধড়িবাজ মশাই! নাকও ডাকবেন, আবার নাকের দোষও ঢাকবেন! নাঃ, আমার কাছে আপনার চাকরি করা চলবে না। কাল থেকে আপনার মন্ত্রিত্ব নট।”
মন্ত্রী চমকে উঠলেন, “আজ্ঞে।”
রাজা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “আপনি এখন যেতে পারেন।”
মন্ত্রী এবার কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “আজ্ঞে নাক তো আমার একদিনই ডেকেছে। বার বার তো আর ডাকে না। একদিনেই চাকরি খাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?”
“বেঠিক কি সঠিক, সে-জ্ঞানটা কি আপনার কাছে শিখতে হবে?” রাজা ভীষণ রেগে কড়কে উঠলেন, “আমি বলেছি চাকরি নট, তো নট!”
মন্ত্রী এবার কাকুতিমিনতি করতে শুরু করলেন। বললেন, “আজ্ঞে চাকরিটা গেলে বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে মরে যাবে। আমরা সবাই মরব।”
রাজা সাফ-সাফ উত্তর দিলেন, “মরবেন তো মরবেন। আমার কী!”
মন্ত্রী যখন বুঝলেন রাজা কিছুতেই শুনবেন না, তখন তিনি বেপরোয়া হয়ে গেলেন। বললেন, “আমার মরণই যখন আপনার ইচ্ছে, তখন আমি আপনার এই ঘরেই মরব। এখান থেকে আমি এক পাও আর নড়ছি না।”
রাজা চিৎকার করে উঠলেন, “আমার ঘরে আমি আপনাকে মরতে দেব না। আপনি এখান থেকে এক্ষুনি চলে যান।”
মন্ত্রীও গোঁ ধরলেন, “না, আমি যাব না। আমি এখানেই মরব।”
রাজা যখন দেখলেন, এই একরোখা লোকটাকে শায়েস্তা করা সহজ নয়, তখন তিনি মনে মনে ফন্দি আঁটতে লাগলেন। হঠাৎ একটা ফন্দি তাঁর মাথায় এসেও গেল। রাজা কাক্কাবোক্কা বললেন, “ঠিক আছে, আপনার চাকরি আমি খাব না, তবে এক শর্তে।”
মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে শর্তটা কী?”
রাজা বললেন, “অনেকদিনের ইচ্ছে, আমি কাঁদব। কান্না কেমন আমি কোনও দিন জানি না। আমায় কাঁদাতে হবে।”
মন্ত্রী ফ্যালফ্যাল করে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিক। তারপর বললেন, “এ আবার কী ধরনের শর্ত! আপনি কচিখোকা হলে না হয় কাঁদানো যেত। আপনার মতো বুড়োখোকাকে আমি কাঁদাব কী করে?”
রাজা রেগে গিয়ে বললেন, “দেখুন, আপনার বকবকানির দরকার নেই। পারলে আমাকে আপনি কাঁদাবেন, না হলে চাকরি খোয়াবেন।”
এবার মন্ত্রী ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি ফুঁসতে লাগলেন। তারপর চোখের পলকে তিনি রাজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ঝাঁপিয়ে পড়েই রাজার গায়ে যেখানে সেখানে তিনি চিমটি কাটতে লাগলেন। আর চেঁচাতে লাগলেন, “দেখি আপনি কাঁদেন কি না!”
হায় কপাল! কোথায় কান্না! রাজা কাক্কাবোক্কা চিমটির জ্বালায় চিৎকার করে উঠে মন্ত্রীর চুলের ঝুঁটি খামচে ধরলেন। তারপর রাজাতে আর মন্ত্রীতে টানামানি শুরু হয়ে গেল। কিন্তু রাজা এ্যাইসা জোরে মন্ত্রীর চুলের ঝুঁটি ধরেছেন যে, কার সাধ্যি ছাড়ায়! রাজাকে কাঁদাতে গিয়ে মন্ত্রী নিজেই ককিয়ে উঠলেন, “আজ্ঞে রাজামশাই, আমায় ছেড়ে দিন, আমায় ছেড়ে দিন।”
শেষমেশ রাজা ছেড়ে দিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি রেগে কাঁই। তিনি মন্ত্রীকে এই মারেন তো, সেই মারেন, “কী, আমি রাজা আমার গায়ে চিমটি কাটা!”
মন্ত্রী তাড়াতাড়ি রাজার সামনে হাতজোড় করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “মহারাজ, আপনার গায়ে ইচ্ছে করে চিমটি কাটিনি। আমি ভেবেছিলুম চিমটি কাটলে আপনি কাঁদবেন। মহারাজ আমার ছেলেটা যখন দুষ্টুমি করে, তাকেও আমি এমনি করে চিমটি কেটে শাসন করি। সে কাঁদে।”
রাজা এমন রেগে গেছেন, সে কী বলব! তিনি মন্ত্রীর দিকে হাত-পা ছুড়ে বলে উঠলেন, “যান, আমার সামনে থেকে আপনি বিদেয় হোন। কাল থেকে আমার নতুন মন্ত্রী হবে। কাঁদাবার নামে নিজের ছেলের মতো রাজাকে ঠ্যাঙানো! আপনার আস্পদ্দা তো কম নয়!”

রাজাকে অমন রাগতে দেখে মন্ত্রীও ভয়ে জুজু। তিনি ঢোঁক গিলতে গিলতে বললেন, “মহারাজ আজকের রাতটা আমায় ক্ষমা করে দিন। কাল রাতের মধ্যে যদি আপনাকে কাঁদাতে না পারি, তখন আপনার যা খুশি তাই করবেন।”
রাজার তবু রাগ গেল না। তিনি রেগেই উত্তর দিলেন, “ঠিক আছে, কাল রাত অবধিই আপনাকে সময় দেওয়া হল। এরপরেও যদি আমাকে আপনি কাঁদাতে না পারেন, তবে আপনার শুধু চাকরিটাই যাবে না, প্রাণটিও যাবে।”
মন্ত্রী ধমক খেয়ে রাজার ঘর থেকে সুড়সুড় করে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। বাকি রাতটুকু মন্ত্রীমশাইয়ের আর ঘুম হল না। মন্ত্রীমশাই জেগে জেগে ছটফট করতে লাগলেন, আর ভাবতে লাগলেন, এই বে-আক্কেলে রাজাকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া যায় কেমন করে!
সকাল হতেই, কাউকে কিছু না-বলে মন্ত্রীমশাই শুকনো মুখে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। সারাটা সকাল তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেন। এখনও পর্যন্ত তাঁর মাথায় এল না, কী করলে তাঁর মুশকিল আসান হয়। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে যখন আর পারলেন না, তখন তিনি বসলেন। সামনেই নদী। একটুখানি বসতেই ফুরফুরে হাওয়ায় তাঁর চোখ জুড়িয়ে এল। তিনি বসতে পারলেন না। শুয়ে পড়লেন। তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন।
অনেকক্ষণ পর তাঁর ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙতেই মন্ত্রীমশাই দেখলেন, একটা লোক সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে চেয়ে চেয়ে হাসছে। মন্ত্রীমশাই ঝটপট চোখ সরিয়ে নিতে গিয়েও পারলেন না। কেননা, তিনি দেখলেন, লোকটা দু’পা এগিয়ে এল। যাচ্ছেতাই রকম নোংরা তার জামা-কাপড়। তেমনি ন্যাংলা-পটকা চেহারা। কীরে বাবা, লোকটা তাকে মন্ত্রী বলে চিনে ফেলল নাকি!
হ্যাঁ, ঠিক তাই! লোকটা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে বসল, “কী মন্ত্রীমশাই, আপনি এখানে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছেন? কার সঙ্গে ঝগড়া হল?”
বুকটা ধড়াস করে উঠল মন্ত্রীমশায়ের। এই রে, লোকটা সব জানে নাকি!
লোকটা আবার বলল, “আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন! আমার যদি ভুল না-হয়, তবে বলতে পারি, রাজামশাইয়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনার একটা গণ্ডগোল হয়েছে।”
চমকে উঠলেন মন্ত্রীমশাই। তিনি এবার নিশ্চিত, লোকটা সব জানে। কিন্তু কালকের রাতের ঘটনা, আজ সকালেই এ লোকটা জানল কী করে! সুতরাং এবার মন্ত্রীমশায়ের কথা না-বলে উপায় নেই। তিনি বললেন, “হ্যাঁ, দুশ্চিন্তা আমার ঠিকই। কিন্তু রাজার সঙ্গে আমার গণ্ডগোল হয়েছে, এটা আপনাকে কে বলল?”
“আরে মশাই, এসব জানতে আমাকে সাধ্য-সাধনা করতে হয় না। আপনার মুখই তো বলে দিচ্ছে। কী হয়েছে বলুন দিকি?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।
সত্যি কথা বলতে কী, কালকে রাতে রাজার সঙ্গে অমন একটা সাংঘাতিক গণ্ডগোল হবার পর থেকেই, মন্ত্রীমশাই কেমন যে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। একজন কাউকে প্রাণের কথা বলার জন্যে তিনি কাল থেকেই ছটফট করছিলেন। সুতরাং অন্য কাউকে না-পেয়ে, এই লোকটাকে পেয়েই তিনি কেমন যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো একটা চাপা আনন্দ মনের ভেতর আঁচ করতে পারলেন। কিন্তু তিনি লোকটাকে আর একটু পরখ করার জন্যে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে, সে আপনি শুনে কী করবেন?”
লোকটা চটপট উত্তর দিল, “আমি আপনার কাজেও তো লেগে যেতে পারি।”
সত্যি তাই! মন্ত্রীমশাই মনে মনে একজন সঙ্গীও নিশ্চয়ই খুঁজছিলেন। সুতরাং এই লোকটা ন্যাংলা-পটকা হলেও তাকে সঙ্গী করতে মন্ত্রীমশাইয়ের এখন একটুও আপত্তি নেই। কাজেই তিনি রাজামশাইয়ের বেয়াড়াপনার সব ঘটনা লোকটাকে বললেন। এবং রাজামশাইকে কাঁদাতে না-পারলে তিনি যে মন্ত্রীমশাইয়ের প্রাণ নেবেন, এই ভয়ানক কথাটাও বলতে তিনি ভুল করলেন না।
লোকটা সব শুনেটুনে কোথায় ভয় পাবে, তা নয়, হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, “দুর দুর! এই কথা! এর জন্যে আপনার এত দুশ্চিন্তা! রাজাকে কেমন করে কাঁদাতে হয়, আমার চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না। বাছাধনকে এমন কাঁদান কাঁদাব যে, আর কোনওদিন আপনার সঙ্গে ট্যাঁ-ফুঁ করার সাহস পাবে না।”
“সত্যি!” মন্ত্রীমশাই আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাকে কী দিতে হবে?”
“কিচ্ছু না।” উত্তর দিল লোকটা। তারপর বলল, “আপনার ডানহাতটা আমার কাছে শুধু এগিয়ে দিতে হবে। হাতটা দেখি!”
“কেন?”
“আরে মশাই দেখি না!”
মন্ত্রীমশাই আর উচ্চবাচ্য করলেন না। ডানহাতটা সটান তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
লোকটা মন্ত্রীর হাতটা নিজের মুখের কাছে টেনে আনল। হাতে একটা ফুঁ দিল। তারপর বলল, “হাতটা মুঠো করে ফেলুন। একদম খুলবেন না। এমনই হাত মুঠো করে রাজবাড়িতে চলে যান। দরবারে রাজা যে সিংহাসনে বসেন, সেই সিংহাসনের গদির নীচে আপনার মুঠো খুলবেন। আর আপনাকে কিছু করতে হবে না। তবে দেখবেন, কেউ না জানতে পারে।”
মন্ত্রী ফুর্তিতে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এতেই রাজা কাঁদবেন?”
“অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? দেখুন না কী হয়!”
মন্ত্রীর আর তর সইল না। তিনি প্রায় ছুটতে শুরু করলেন। লোকটাকে যে একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ছিল, এটা পর্যন্ত তাঁর খেয়াল হল না। এমনকী জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গেলেন, লোকটা কোথায় থাকে।
হ্যাঁ, ডানহাতের মুঠো শক্ত করেই মন্ত্রী রাজবাড়িতে ঢুকলেন। এবং কাউকে তোয়াক্কা না-করেই দরবারে ঢুকে পড়লেন। ঢুকে রাজামশাইয়ের সিংহাসনে বসার মখমলের গদির নীচে হাতের মুঠো খুলে ফেললেন। কিন্তু কী যে হল, তাঁর কিছুই বোধগম্য হল না। যাই হোক, সে নিয়ে এখন ভেবে কী হবে! তিনি দরবার থেকে বেরিয়ে সটান নিজের ঘরে। আর কিছু জানা গেল না।
খানিক পরে দরবার শুরু হবার কথা। শুরুর আগে ভেঁপু বাজল। রাজা কাক্কাবোক্কা মুখখানা আধখানা হাসি আর আধখানা গোমড়া করে সিংহাসনে বসলেন। তারপর সারাক্ষণ নানান জনের নানান কথা শুনলেন। নানান ব্যবস্থা বাতলালেন। দরবারশেষে সিংহাসন ছেড়ে তিনি যখন অন্দরমহলে যাবার জন্যে পা বাড়ালেন, তখনই একটা চাপা হাসির শব্দ শোনা গেল। কী ব্যাপার!
হাসি শুনে রাজা কাক্কাবোক্কা একটু থতমত খেয়ে গেলেন বটে, তবে তিনি থামলেন না। দ্রুত পা চালালেন। তিনি দেখলেন না, একঘর লোক তাঁর পেছনটা অবাক হয়ে লক্ষ করছে আর ফিকফিক করে হাসছে।
এ কী রে, হাসছে কেন?
হাসবে না? রাজার পেছনে যে একটি ল্যাজ গজিয়েছে! রাজা যতই হাঁটছেন, সেটি তাঁর পেছনে ততই দোল খাচ্ছে। রাজা ল্যাজ ঝুলিয়ে নিশ্চিন্ত মনে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। আর এদিকে দরবার-ভর্তি লোক রাজার ল্যাজ দেখে হাসাহাসি করলেও, অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এ তো আচ্ছা তাজ্জব ব্যাপার! মানুষরাজার বাঁদরের মতো ল্যাজ গজাল কোত্থেকে!
কথাটা মন্ত্রীমশায়ের কানে পৌঁছতে বেশি দেরি লাগল না। শুনে ইস্তক মন্ত্রীমশাই আনচান শুরু করে দিলেন। এ কী সর্বনেশে কথা! তবে কি সেই লোকটা মন্ত্রীমশায়ের হাতের মুঠোর ভেতর ল্যাজ গজানোর মন্ত্র পুরে দিয়েছিল! এবার তিনি আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে বসে রাজার ওপর নজর রাখতে লাগলেন। দেখা যাক তো কী হয়!
দেখতে দেখতে রাত্রি এসে গেল। এক্ষুনি রাজা শুয়ে পড়বেন।
এদিকে মন্ত্রীমশাই কী করেছেন, রাজার চোখকে ফাঁকি দিয়ে, এক ফাঁকে টুক করে রাজার শোবার পালঙ্কের নীচে সেঁদিয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়েছেন।
রাজা মন্ত্রীর কথাও জানতে পারলেন না। আর এতক্ষণ পর্যন্ত নিজের ল্যাজের কথাও টের পেলেন না। কিন্তু যেই না রাজামশাই শোবার জন্যে পালঙ্কে বসতে গেছেন, ব্যাস, ল্যাজটি রাজা কাক্কাবোক্কার পায়ের ফাঁকে কিলবিল করে উঠেছে। এটা কীরে বাবা! রাজামশাই চমকে উঠলেন। তিনি ঝপাং করে ল্যাজটি খামচে ধরে টান মারলেন। উঃ হু-হু-হু! লাগছে কেন! তিনি আর একবার টান দিলেন। এবারও লাগছে কেন! তিনি আর একবার টান দিলেন। এবারও লাগছে যেন! তিনি বারবার টানলেন, বারবার লাগল। শেষবার টানতেই তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি তাঁর নিজের ল্যাজ নিজেই ধরে টান দিচ্ছেন! তাঁর একটি ল্যাজ গজিয়েছে! তিনি ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি ভয়ে-ময়ে তিড়িং করে বিছানা থেকে লাফ মারলেন। নিজের ল্যাজ নিজেরই হাত দিয়ে উপড়ে ফেলার জন্য মোচড় দিলেন! কিসসু হল না! ল্যাজ ল্যাজেই আটকে রইল। ওরে বাবা রে, এ কী হল রে! তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠছিলেন! কিন্তু না, না, চিৎকার নয়, চিৎকার করলে সব জানাজানি হয়ে যাবে। সুতরাং ল্যাজ ধরে তিনি মরিয়ার মতো টানাটানি লাগালেন। শেষকালে যখন কিছুই করতে পারলেন না, তখন বুড়োখোকা রাজা কচিখোকার মতো নিজের ঘরে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললেন! এই চুপ, চুপ, কেউ শুনে ফেলবে! আর শুনে ফেলবে! ছিঃ, ছিঃ, এই ল্যাজ নিয়ে তিনি কেমন করে লোকের কাছে মুখ দেখাবেন। তিনি কোথায় যাবেন, কী করবেন, অগত্যা তিনি ভ্যানভেনিয়ে কাঁদতেই লাগলেন। দ্যাখো, চোখ উপচে ঝরঝর করে জল গড়াচ্ছে।
ঠিক এই সময়ে খাটের নীচ থেকে মাথা বার করলেন মন্ত্রীমশাই। হা-হা করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলেন মন্ত্রীমশাই। হাসতে হাসতেই চিৎকার করে উঠলেন, “রাজামশাই কেঁদেছেন, রাজামশাই কেঁদেছেন।”
রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে দেখে তো একেবারে ফুস! মানে ফানুসের মতো চুপসে গেলেন। কোথায় মন্ত্রীকে দেখে তিনি তুলকালাম শুরু করে দেবেন, তা নয়, তিনি হাত জোড় করে মন্ত্রীমশায়ের কাছে কাকুতিমিনতি শুরু করে দিলেন, “মন্ত্রীমশাই, আমি আপনার চাকরিও খাব না, প্রাণও নেব না। আপনি দয়া করে আমার ল্যাজের একটা ব্যবস্থা করে দিন।” বলে হাপুস নয়নে কাঁদতেই লাগলেন। অমনি টুপ করে রাজার ল্যাজটি খসে পড়ল মাটিতে।
মন্ত্রীমশাই সঙ্গে সঙ্গে সেটি তুলে নিলেন। বললেন, “এই যে আপনার ল্যাজ। আপনি কেঁদেছেন, ল্যাজও খসেছে। আর আপনার লজ্জা পাবার কিছু নেই। আজ আপনার লজ্জা পাবার কিছু নেই। আজ আপনার ল্যাজ দেখে আমার শুধু একটা কথাই বার বার মনে হচ্ছে, বোধহয় মানুষ বেশি বাড়াবাড়ি করলেই তার ল্যাজ গজায়! সে ল্যাজ কাউকে ছেঁটে দিতে হয় না। আক্কেল হলেই যার ল্যাজ গজায় সে কাঁদে। কাঁদলেই সে-ল্যাজ আপনা-আপনি খসে পড়ে। আপনারও তাই।” বলে মন্ত্রীমশাই রাজার ল্যাজটি রাজার হাতে তুলে দিয়ে হো-হো করে হেসে উঠলেন।
কিন্তু রাজা কাক্কাবোক্কা হাসলেন না। তিনি সেই ল্যাজটি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন। আর ভাবতে লাগলেন, “এটা কি গাধার ল্যাজ, না বানরের! কে জানে!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন