শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট সোনা টুই,
কাল তোমার চিঠি পেয়েছি ঘাটশিলা থেকে। জানতে পারলুম, মামাবাড়িতে তুমি ভালই আছ। তোমার দুঃখু শুধু, আমার মুখে অনেকদিন কোনও গল্প শোনা হয়নি বলে। কিন্তু তুমি এখন এতদূরে আছ, আমি চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে গল্প বললেও, সে গল্প এখান থেকে তোমার কানে পৌঁছবে না। কাজেই, তোমার খেদ আমি এই চিঠিতেই একটি গল্প লিখে মেটাবার চেষ্টা করছি। এ গল্প আমার নিজের। সত্যি, আর ভারী অদ্ভুত।
সেদিন কলকাতার ব্যস্ত মোড় এসপ্ল্যানেড পেরিয়ে হাঁটছিলুম গঙ্গার দিকে। রাজভবনের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলেছি। সামনেই, রাস্তার ওপর দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি এদিকে ওদিকে ছুটছে। মানুষ আসছে-যাচ্ছে। একটু দূরে, ওই কোণে দেখা যাচ্ছে আকাশবাণী ভবন। আমি রাস্তাটা পেরোবার জন্যে খুব সাবধানে ফুটপাত থেকে নামলুম। ফাঁক পেয়ে তড়িঘড়ি পেরিয়েও গেলুম। একদিকে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম, তার উলটোদিকে বিধানসভা ভবন। এখান থেকে ক’পা হাঁটতেই গঙ্গার তীর। আরও ক’-পা হাঁটতেই আমি পৌঁছে গেলুম সেই মিলেনিয়াম পার্কে। তোমার কি মনে আছে, সেই পার্কে একদিন তুমিও গেছলে আমার সঙ্গে।
এখন হেমন্তের শেষবেলা। সন্ধে নামছে। আমি একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়লুম গঙ্গার কিনারে পাতা বেঞ্চের ওপর। গঙ্গা শান্ত। ফুরফুরে বাতাস বইছে জল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে। ঢেউ উঠছে টুপটাপ। ছড়িয়ে পড়ছে পাড়ে-পাড়ে। মাঝদরিয়ায় নোঙর ফেলে নৌকো দুলছে একটি-দুটি। আলো জ্বলছে মিটি-মিটি। পাড়ের আলো ঝিলমিলিয়ে দোল খাচ্ছে জলের ওপর। দু’-একটি পাখি তখনও আকাশ সাঁতরে উড়ে যাচ্ছে বাসায়। আমি দেখছি।
দেখতে দেখতে হঠাৎ যেন কেমন অন্যমনা হয়ে গেলুম। কেমন যেন স্বপ্নের মতো আমার চোখের ওপর ভাসছে সবকিছু। আমি ভুলে যাচ্ছি সব। তুমি যে এখন ঘাটশিলায় বেড়াতে গেছ, এসব আর কিছুই আমার মনে নেই। এখন তুমিই আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছ। তুমি আমাকে আদর করে জড়িয়ে ধরেছ। বলছ, বাবা, তুমি আমাকে একটুও ভালবাস না।
আমি অবাক হই। চমকে উঠি। জিজ্ঞেস করি, কেন একথা বলছ?
তুমি উত্তর দিলে, তুমি বলেছিলে আজ গল্প বলবে, বললে না। বলছিলে, আমার সঙ্গে খেলা করবে, করলে না।
আমি বললুম, ঠিক আছে টুই, এসো খেলাই করি। বলো, কী খেলা খেলবে?
চোর-পুলিশ। আমি চোর, তুমি পুলিশ। আমায় ধরো! বলেই তুমি ছুট দিলে।
আমিও হেসে উঠে তোমার পেছনে ধাওয়া করলুম।
তুমিও হাসছ। হাসতে হাসতে ছুটছ।
তা, আমি আর কতক্ষণ পারব তোমার সঙ্গে? হাঁপিয়ে গেলুম। তাই চেঁচিয়ে ডাক দিলুম, ছোট্ট সোনা, দাঁড়াও। আর পারছি না। আমি হেরে গেছি। তার চেয়ে বরং গল্প করি। এসো!
এমন সময় হঠাৎ ঘটে গেল একটা আজব কাণ্ড। আমি দেখলুম, ছুটতে ছুটতে তুমি টুক করে লুকিয়ে পড়লে। কোথায় যে লুকোলে আমি বুঝতেই পারলুম না। ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। দু’-এক মূহূর্ত এদিকে ওদিকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। তারপর চিৎকার করে উঠলুম, টুই-ই-ই!
আমার চিৎকারের রেশ ফুরোতে না-ফুরোতেই আচমকা একটা দমকা বাতাস কোত্থেকে যে আমার দিকে, তীব্রগতিতে ধেয়ে এল! ধুলো-ঝঞ্ঝায় নাস্তানাবুদ হয়ে আমি পাক খেতে লাগলুম। তারপর আরও সর্বনাশের কথা, বাতাসের এত তোড় যে আমার পা আর মাটিতে রাখতে পারলুম না। সেই বাতাস আমায় শূন্যে তুলে চরকি খাওয়াতে লাগল। মনে হল আমি বুঝি গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে যাই। কিন্তু তেমন কিছু হওয়ার আগেই আমাকে দারুণ জোরে একটা ঝাপটা মারল বাতাস। আমি হাত-পা চরকুট্টে পড়লুম মাটিতে। তারপরেই ধন্দ লেগে গেল আমার চোখে! বাতাসের ধাক্কায় এ কোথায় এসে পড়েছি আমি!
টুই, তোমার কি মনে আছে, ক’দিন আগে তোমাকে কোরসিকা দ্বীপের গল্প বলেছিলুম। বলেছিলুম, প্রস্তরযুগে ভূমধ্যসাগরের এই দ্বীপে একদল শান্তিপ্রিয় মানুষ বাস করত। তারা জমিতে ফসল ফলাত। মেষ চরাত। তাদের আপনজন মারা গেলে পাথরের তৈরি মস্ত-মস্ত ঘরে কবর দিয়ে রাখত। তারপর বিরাট বিরাট পাথর খোদাই করে মানুষের মূর্তি গড়ত। সেইসব মূর্তি সাজিয়ে রাখত স্মৃতিস্তম্ভের মতো কবরের সামনে। তারা মনে করত, এই পাথরের মূর্তির বুকের মধ্যেই আশ্রয় নেয় মৃতমানুষের আত্মা।
তোমাকে বলব কী, আমার যেন মনে হল, এই দমকা বাতাস আমাকে ঝাপটা মেরে। কোরসিকা দ্বীপের এমনই এক মূর্তির সামনে ফেলে দিয়েছে। আমি থমকে গেছি। দাঁড়িয়ে দেখছি, কেউ নেই কাছেপিঠে। চারদিক নির্জন, সুনসান! ফাঁকা-মাঠ। হু-হু করে বাতাস বইছে। ওই দূরে দেখা যাচ্ছে পাথরের সারি। সবুজ গাছগাছালি। পাহাড় আর গাছের আড়ালে সূর্য ঢলে পড়েছে। তার মানে, তখন দিনের শেষবেলা। রক্তরাঙা সূর্যের আভায় আমার চোখে পড়ে গেল, এমনই সারবাঁধা আরও ক’টা মূর্তি। আর কোনও সন্দেহই নেই। আমার মনে হল, আমি এখন সেই কোরসিকা দ্বীপের সেই মূর্তির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।
আমার এই আজগুবি কথা শুনে তুমি নিশ্চয়ই হেসে কুটিপাটি হচ্ছ। ভাবছ, বাবা মনগড়া কথা শোনাচ্ছে! ঠিকই, তুমি একথা ভাবতেই পার। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখো টুই, মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু হচ্ছে বই। আমি তো ভূমধ্যসাগরের ওই ছোট্ট দ্বীপ কোরসিকায় কোনওদিন যাইনি। অনেক অজানা কথা তো মানুষ বই পড়েই জানতে পারে। এক-এক সময় মানুষ যখন বইয়ে পড়া এমন সব অজানা কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায়, তখনই অজান্তে তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে সেইসব না-জানা ছবি স্বপ্নের মতো। স্পষ্ট।
সে যাই হোক, আমি এখানে হতবাক হয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখছি, আর অবাক হয়ে ভাবছি, কোথায় গেলে তুমি আচমকা! এখন কোথায় খুঁজব তোমায়!
ভয়ে আর স্থির থাকতে পারি না। আর কিছু ভেবে না পেয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠলুম, টুই-ই-ই!
এই থমথমে নির্জন জায়গাটা আমার চিৎকারে নিমেষে খানখান হয়ে গেল। আর, তারপরেই বাজ পড়লে যেমন কানফাটা শব্দ শোনা যায়, তেমনই শব্দ করে কারা যেন হেসে উঠল একসঙ্গে, হা-হা-হা!
আমি থতমত খেয়ে গেছি। হাসির সেই শব্দ আমার বুকের ভেতর থরথরানি শুরু করে দিল। আমি আতঙ্কে ফিরে তাকাই এদিক ওদিকে। ভাবি, এ কি সত্যিই হাসি, বিনা মেঘে বজ্রপাত।
আশ্চর্য, কয়েক মুহূর্ত হেসেই সেই শব্দ থমকে গেল। আবার নেমে এল সেই জমাট নিস্তব্ধতা। কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল মাথার ভেতরটা। কী যে করি, কিছু ভেবে না পেয়ে দিলুম ছুট।
এমন করে ছুটতে গিয়ে একবার আলটপকা একটা পাথরের মূর্তিকেই জাপটে ধরলুম। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল একটা অবিশ্বাস্য কাণ্ড! সেই মূর্তিটা আচম্বিতে গর্জে উঠল হুংকার ছেড়ে:
হুল্লো-হুল্লো হল্লা,
নাকের গর্ত খামচে ধরে
কাটব পাজির গল্লা।
আমি থতমত খেয়ে আর্তনাদ করে উঠেছি, বাঁচাও-ও-ও! সঙ্গে সঙ্গে মারলুম লাফ। চোখ-কান বুজে। মারলে কী হবে, তার আগেই আমার চুল খামচে ধরেছে মূর্তিটা। টেনে ছাড়াতে গিয়ে আমার মাথার ঝিক্কুর নড়ে গেল। আমি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলুম, উঃ হু-হু-হু!

আর বলব কী, আমার দুর্দশা দেখে সারা কবরস্থানে যতগুলো পাথরের মূর্তি ছিল, তারা একসঙ্গে বিকট স্বরে হা-হা-হা করে হেসে উঠল। সে হাসির এমনই উৎকট রব যে, আমার পায়ের নীচে মাটি পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে থাকল। তারা হাসতে হাসতে খেঁকিয়ে উঠল:
এই চোর, শোন তার মাথাখানা মুড়িয়ে,
ঠক-ঠক ঠুকে-ঠুকে দেব ঠিক গুঁড়িয়ে।
মতলব জানি তোর সোনাদানা হাতানো,
খবরটা দিল কে রে, কার মাথা খাটানো?
কবরে যে সোনা আছে খোঁড়াখুঁড়ি গর্তে,
জানিস তা ছুঁলে ঠিক হবে তোকে মরতে!
ভাল যদি চাস তবে কেটে পড় চোট্টা!
তা না হলে দেব টেনে গাঁট্টার চোটটা!
ফেটে মাথা চৌচির পেয়ে যাবি অক্কা,
লোভ তোর চুকে যাবে সোনাদানা ফক্কা!
বলতে বলতে আবার হাসি-হা-হা! হো-হো! আর আমার মাথার ঝুঁটি নুড়োমুড়ি উঃ-আঃ! বাপ রে! আমি যন্ত্রণায় নাস্তানাবুদ হয়ে বলে উঠলুম, শোনো হে পাথরের মূর্তি, আমি চোরও নই, ছ্যাঁচড়ও নই। আমি একটি ছোট্ট মেয়ের বাবা। আমি তারই সঙ্গে ছুটে ছুটে খেলা করছিলুম। হঠাৎ এক ধাঁধা লেগে গেল আমার চোখে। আমি দেখি, ছুটতে ছুটতে আমার মেয়ে অতর্কিতে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা বিশ্বাস করো, আমি মিথ্যে বলছি না। তোমরা আমাকে দয়া করে ছেড়ে দাও!
টুই, বলতে নেই, আমার মুখের কথা ফুরোতে-না-ফুরোতে, সেই মূর্তির হাত থেকে আমার খামচে ধরা চুলের মুঠি খুলে গেল। খুলে যেতেই সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল:
লাংমি লাংমি ড্রাগনের পথ,
সেই পথে পা দিলে দিতে হবে খত!
আমারও ছেলেটা সেই পথে পড়ে হায়
জানি না, জানি না আমি হারাল কোথায়!
সেই মূর্তি বলতে বলতে কাঁদতেই থাকল। আর আমি ‘লাংমি’ কথাটা শুনে শিউরে উঠলুম। কারণ, আমি জানতুম, চিনারা বলে, ড্রাগনরা যে-পথ দিয়ে চলাফেরা করত, সেই পথকে বলে লাংমি। এই পথ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। এদিক ওদিক থেকে এসে এই পথ যেখানে মিশে গেছে, সেইখানেই মাটি খুঁড়ে বেরিয়েছে পাহাড়-পর্বত। বড় বড় পাথরের চাঁই। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে শক্তিশালী চুম্বকের। সেই চুম্বকের ওপর কারও পা-পড়লেই, তাকে মারবে টান। মাটির নীচে তার সমাধি হয়ে যাবে! আমি শিউরে উঠে ভাবলুম, আমার টুইও কি তবে এমনই লাংমির পথে পা দিয়ে মাটির নীচে হারিয়ে গেছে! ভয়ে আমারও যেন রক্ত হিম হয়ে যায়!
দ্যাখো, ছেলের শোকে পাথরের মূর্তিটা এখনও কেমন বেদম হয়ে কাঁদছে। অমন একটা রুক্ষু পাথরের মূর্তি যে, এমন করে একটা কচিছেলের মতো কাদতে পারে—সে-দৃশ্য যে না দেখেছে তাকে বোঝানো যাবে না। অবশ্য সেই মূর্তিটা এখন অন্ধকারে ঝাপসা, তার কান্নায় উপছেপড়া চোখ এখন দেখাও যাবে না।
এমন সময় ঘটল আর-এক উদ্ভট কাণ্ড! যতগুলো মূর্তি ছিল, সবক’টাই একসঙ্গে কেঁদে উঠল। এ কী বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! তাদের কান্নার শব্দে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছে।
ঠিক এই মূহুর্তেই আবার আচমকা কান্না থেমে গেল। নিথর হয়ে গেল কবরস্থান। নিঃসাড় চারদিক। এমন সময় শোনা গেল, একটি ছোট্ট মেয়ের গলার স্বর, বাবা-আ-আ!
আমি চমকে উঠলুম!
মনে হল সে ছুটতে ছুটতে এদিকেই আসছে।
আমিও অস্থির হয়ে উঠলুম।
সে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে উঠল, বাবা আমি টুই। তুমি কোথায়?
আমি আর থাকতে পারলুম না। আমিও আকুল হয়ে চিৎকার করে উঠলুম, টুই-ই-ই, আমি এখানে। বলে, আমার আর তর সইল না। আমি অন্ধকারেই লাফ মারলুম। দেখতে পাচ্ছি না কিছুই। তাই লাফ মারলুম একটা পাথরের মূর্তির গায়েই। ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লুম মাটিতে। মাথায় লাগল।
হ্যাঁ, লাগল, তবে পাথরের মূর্তিতে নয়। এতক্ষণ আমি মিলেনিয়াম পার্কের যে বেঞ্চে বসে আছি, মাথা ঠুকে গেল সেই বেঞ্চের হাতলে। এতক্ষণ আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলুম। বুঁদ হয়ে, সেই প্রস্তর যুগের স্বপ্ন। যে-যুগের মানুষ মৃতের কবরের সামনে মূর্তি গড়ে সাজিয়ে রাখত, আর ভাবত, তার আত্মা বুঝি ওই পাথরেই আছে।
যাই হোক, এই ভাল যে, তুমি সত্যিই লাংমির পথে পা দিয়ে, মাটির নীচে আটকা পড়োনি! ভাল থেকো। কেমন লাগল লিখো।
—বাবা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন