শৈলেন ঘোষ

তার নাম পাপুই। ছোট্ট একটি মেয়ে।
কী মিষ্টি গান গায় পাপুই! পাখির মিষ্টি গানের সব সুর, কে যেন ঢেলে দিয়েছে পাপুইয়ের গলায়। ভোমরার মিষ্টি সুরের গুন-গুন, কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে ওর গানে।
আহ্! কী সুন্দর আজ সকালটা! খুশিতে উছলে গেছে আকাশ। সোনা-সোনা রোদ ছড়িয়ে গেছে মুঠো মুঠো। মাঠে মাঠে। গাছে গাছে। ফুলে ফুলে। ছড়িয়ে গেছে পাপুইয়ের চোখদুটিতে। পাপুই আজ কাজল পরেছে চোখে। চোখের পাতাদুটি নেচে নেচে উঠছে। খুশিতে। কাজল চোখে আলো দেখছে পাপুই। গান গাইছে।
সেজেছে পাপুই। ডুরে ডুরে শাড়ি পরেছে। লাল-পাড়।
কানে কানে ফুল দুলছে দুল-দুল।
পায়ে পায়ে মল বেজেছে ঝুম-ঝুম।
এমন সকালে মন নেই ঘরে। ওর পা দু’খানি শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে ছুটছে। রাঙা টুকটুক আলতা-পরা পাদুটি নাচছে। শিশিরে ভিজে ভিজে।
এখানটা বেশ লাগে। এই নিঝুম জায়গাটা। এখানে রোজ আসে পাপুই। কেউ নেই এখানে। আছে কাঠবিড়ালি। মুঠি ভর্তি বাদাম এনেছে পাপুই। ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘাসে ঘাসে। ছুটে আসছে কাঠবিড়ালি। অগুনতি। খেলা করছে পাপুইয়ের সঙ্গে। ধরতে যাচ্ছে পাপুই। পালাচ্ছে। গাছের ওই আগডালে লুকিয়ে পড়ছে কেমন!
“আয় আয়।” ডাকল পাপুই।
আসবে না।
ঝুম-ঝুম মল বাজাল পাপুই।
শুনল না।
গুন-গুন গান গাইল।
ওমা! কোথা ছিল কাঠবিড়ালি এত! একেবারে পাপুইয়ের হাতের মুঠোয়। গায়ের ওপর লুটোপুটি লাগিয়ে দিল। ওরা গান শুনবে। পাপুইয়ের গান। আর বাদাম খাবে।
গাইছিল পাপুই। গান। আপন মনে গাইছিল। আর খেলছিল।
হঠাৎ যেন চমক লাগে!
“টগ-বগ, টগ-বগ!”
কে যেন আসছে ঘোড়া ছুটিয়ে? কে আসে এইখানে, এই নির্জনে?
“টগ-বগ, টগ-বগ।” ঘোড়া ছুটছে। দূর থেকে ভেসে ভেসে আসছে, “টগ-বগ, টগ-বগ।”
শুনতে পেল না পাপুই। ও শুনতে পাবে না। এত আলো আজ আকাশ-ভরা। ও শুধু গান গাইবে। মিষ্টি-মিষ্টি কাঠবিড়ালির দুষ্টু-দুষ্ট চোখের দিকে চেয়ে চেয়ে।
ঘোড়া থামল।
ও কে? ঘোড়ার পিঠে বসে?
রাজা।
রাজা! এ কেমন রাজা! রাজার মাথায় মুকুট কই?
নেই, নেই।
মুকুটে মানিক কই?
তাই তো!
রেশমি পোশাক কই?
নেই তো?
কেমন করে থাকবে? রাজা আজ রাজপোশাক সরিয়ে রেখেছেন। তিনি আজ ছদ্মবেশে লুকিয়ে বেরিয়েছেন। দেখতে বেরিয়েছেন রাজ্যের অবস্থা!
কিন্তু এখানে কে গান গায়? এই নির্জনে? শুনতে পেয়েছেন রাজা। ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়িয়েছে রাজার ঘোড়া। চুপিসারে নেমেছেন তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়েছেন।
ও কে? চমকে চাইলেন রাজা।
একটি ছোট্ট মেয়ে!
আঃ! কী মিষ্টি ছোট্ট মেয়েটি। কী মিষ্টি গান গাইছে। যেন একটি পাখি! অবাক!
থাকতে পারলেন না রাজা লুকিয়ে। এগিয়ে গেলেন একেবারে তার সামনে!
দ্যাখো! দ্যাখো! ছুটে পালাল কাঠবিড়ালিরা ঝটপট।
উঠে দাঁড়াল পাপুই চোখের নিমেষে। থেমে গেছে গান। রাজার দিকে তাকিয়েছে। পাপুই। ঠোঁটদুটি কাঁপছে। চোখের পাতাদুটি নামছে। আস্তে। লজ্জা হয়েছে।
রাজার মুখে আদরমাখা হাসি। হাত বাড়ালেন রাজা। ডাকলেন, “এসো।”
মুখ ঘুরিয়ে নিল পাপুই। লজ্জা! লজ্জা! কী লজ্জা! ছুট দিল পাপুই।
পায়ের মল বেজে উঠল, ঝুম-ঝুম।
ডুরে শাড়ি উড়ে গেল, ফুর-ফুর।
কানের ফুল দুলে উঠল, দুল-দুল।
দাঁড়াল না পাপুই। ছুটতে ছুটতে লুকিয়ে গেল। লুকিয়ে গেল রাজার চোখের আড়ালে।
রাজা হেসে উঠলেন।
আবার ঘোড়া ছুটল, “টগ-বগ, টগ-বগ।”
ঘোড়া ছুটল রাজবাড়ির দিকে।
তারপর?
পরের দিন ঘোড়া সাজল, একশো।
ঘোড়ার পিঠে সিপাই ছুটল, একশো।
কোথা?
গ্রামের দিকে। পাপুইয়ের বাড়ির দিকে। রাজার হুকুম।
পাপুইয়ের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল, “টক, টক, টক।”
“কে?” ঘরের দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এল একটি ছোট্ট ছেলে। চাঁদ। পাপুইয়ের দাদা।
দরজা খুলে হকচকিয়ে গেল চাঁদ। ঘরের সামনে সিপাই। ঘোড়ার পিঠে। এদিক ওদিক চারদিকে সিপাই ঘিরে আছে। ভয় পেয়ে গেল চাঁদ। কথা বলতে গলা কাঁপল। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কাকে চান আপনারা?”
সর্দার সিপাই জিজ্ঞেস করল, “এ বাড়ি কাদের?”
“আমাদের।” উত্তর দিল চাঁদ।
“এ বাড়িতে গান গায় কে?”
“আমার বোন, পাপুই।”
নেমে এল সর্দার ঘোড়ার পিঠ থেকে। বলল, “আমরা রাজার কাছ থেকে আসছি।”
“কেন?” অবাক হল চাঁদ।
“রাজা তোমার বোনকে এই মানিকমালা পাঠিয়ে দিয়েছেন।” এগিয়ে দিল সিপাই-সর্দার মানিকমালা চাঁদের হাতে। আর দিল একটি চিঠি।
অবাক হল চাঁদ, “কার চিঠি!”
ঘরের ভেতর থেকে ছুটে এল পাপুই, “কার চিঠি?”
উত্তর এল, “রাজার।”
চাঁদ খুলে ফেলল চিঠি। হাত কাঁপছে। লিখেছেন:
ছোট্ট মেয়েটি,
তোমার আমি নাম জানি না। কী মিষ্টি গান গাও তুমি! গাছের ছায়ায় নেচে নেচে তুমি গাইছিলে। তোমার গান শুনছিলাম। পালিয়ে গেলে কেন? লজ্জা করল? একদিন এসো না আমার রাজবাড়িতে? আমায় গান শুনিয়ে যাবে। নিমন্ত্রণ রইল। সাতদিন পরে চৌদোলা পাঠিয়ে দেব। আসবে তো? মানিকের হার পাঠালাম। তোমার অমন মিষ্টি গানের জন্যে আমার ছোট্ট উপহার। গলায় পরো, কেমন?
মুখখানা খুশিতে উছলে গেল চাঁদের। আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল চাঁদ, “পাপুই-ই-ই।” জড়িয়ে ধরল বোনটিকে। পরিয়ে দিল মানিকমালা পাপুইয়ের গলায়। আলো, আলো। চারদিকে আলো দুলছে। মানিকের আলো। হেসে উঠল পাপুই। ছুটল বাইরে। খোলা আকাশের নীচে। গেয়ে উঠল পাপুই। হেসে নেচে গড়িয়ে গেল চাঁদ।
চাঁদ আর পাপুই। ভাই আর বোন। আর কেউ নেই ওদের। ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে থাকে ভাইটি আর বোনটি। পাশে থাকে এক বুড়ো। একটু দূরে। পুতুলওলা। ওরা ডাকে পুতুলদাদু।
পুতুলদাদু খুব বুড়ো। হাঁটতে পারে না। ঘরে বসে বসে পুতুল তৈরি করে। কোনওটা রাজা। কোনওটা রানি। কোনওটা হাঁস। কোনওটা পাখি। চাঁদ বেচে আসে সেই পুতুল মাথায় নিয়ে হাটে, মেলায়। দোরে দোরে। পয়সা পায়। নিজে নেয়। পুতুলদাদুকে দেয়। একবার পুতুলদাদু কী সুন্দর একটা পুতুল তৈরি করেছিল! নাম দিয়েছিল, ‘মিষ্টি তারা’।
আহা! সত্যিই যেন তারা। আকাশ থেকে নেমে এসেছে। মিষ্টি তারার মাথায় একটি তারার ফুল। মুখখানি গোল। কানে তার তারার দুল। কপালে তারার টিপ। চাঁদ দ্যাখে পুতুলের মুখখানির দিকে রোজ। দ্যাখে রোজ পাপুইয়ের চোখদুটির দিকে। লুকিয়ে লুকিয়ে। ভাবে যেন ঠিক এক। পাপুইয়ের চোখদুটি যেন কে ঠিক পুতুলের চোখে বসিয়ে দিয়েছে। কাজলে সাজিয়ে দিয়েছে। বেচবে না চাঁদ এ-পুতুলটি কোনওদিন। কোনওদিন না। রেখে দেবে দেরাজে। যখন ইচ্ছে হবে দেখবে মুখটির দিকে। ওই চোখদুটির দিকে। দেখতে দেখতে হাসবে। আপন মনে।
একদিন চাঁদ সত্যি-সত্যি হাসছিল পুতুলটির দিকে চেয়ে। দেখে ফেলেছিল পাপুই। জিজ্ঞেস করেছিল, “হাসছ কেন দাদা, পুতুল দেখে?”
চাঁদ বলেছিল, “ভাল লাগে।”
“কই দেখি আমারও হাসি পায় কি না?”
দেখেছিল পাপুই। হেসে উঠেছিল খিলখিল করে। বলেছিল, “কী মিষ্টি পুতুল, না দাদা?”
আজ মেলা। পুতুল বেচতে গেছে চাঁদ আজ সকাল সকাল। আজ অনেক পুতুল বেচতে হবে। অনেক পয়সা চাই যে! পাপুই রাজবাড়ি যাবে। রাজাকে গান শোনাবে। কী সাজে যাবে পাপুই?
চাঁদ আজ সবুজ শাড়ি কিনে আনবে। সবুজে ঝুমকোসারি দেখে আনবে। ওর গায়ে সাজিয়ে দেবে সবুজ শাড়ি। ওর পায়ে বাজিয়ে দেবে রুপোর মল।
পা ছুটছে চাঁদের, অনেক দূরে। মেলায়।
ভাবছে পাপুই, ঘরে। রাজাকে কোন গানটা শোনাই! ভাবছে, গুন-গুন-গুন গাইছে। গাইছে, আবার ভাবছে।
এমন সময় কে যেন ডাকল বাইরে, “ঘরে কে আছ?”
ঘরের দরজা নড়ে উঠল, “খট, খট, খট।”
ওমা! ওমা! একটা চিল কেন চেঁচিয়ে ওঠে ভরদুপুরে অমন করে!
একটা বেড়াল কেন কেঁদে ওঠে দিনদুপুরে এমন স্বরে!
পাপুইয়ের গুন-গুন গান থেমে গেল। চমকে চাইল। সাড়া দিল, “কে?”
“আমি।” খ্যান-খ্যানে সরু গলা। কাঁপা কাঁপা।
ঘরের দরজা খুলে গেল।
একটা বুড়ি দাঁড়িয়ে। দোরে। থুত্থুড়ি। নড়বড়ি। না-ডাকতে তরতরিয়ে ঘরে ঢুকল। গড়গড়িয়ে বলে গেল, “তোমার নাম বুঝি পাপুই? আমি রাজার বাড়ির ঝি। রাজা আমায় পাঠিয়ে দিলেন তোমার কাছে। আমার হাতে ভেট পাঠালেন তোমার জন্যে। রাজাকে কী গান শুনিয়েছ মা? রাজা তোমার গান শুনে সব ভুলেছেন। রাজ-কাজে মন নেই তাঁর। খালি বলছেন, তোমার কথা। তোমার গানের কথা।”
পাপুই আর জানবে কী করে, এ বুড়ি রাজার বাড়ির ঝিও নয়, এ ভেট রাজারও নয়? এ যে এক ডাইনি-বুড়ি! হিংসুটে! দুষ্টু! পাপুইয়ের গলায় ওই যে মানিকমালা, ওইটাতে তার চোখ পড়েছে। লোভে লোভে চোখ জ্বলছে। তাই তো রোদ-দুপুরে ঝি সেজেছে রাজবাড়ির। মিথ্যে মিথ্যে। এই সেরেছে! কী হবে তা হলে?
পাপুইরানি তো আর তা জানে না। ভাবলে বুঝি সত্যি সত্যি। তাই ব্যস্ত হল। ছুট্টে গেল। পিঁড়ি আনল। তাড়াতাড়ি বসতে দিল। বলল, “তুমি রাজার বাড়ির ঝি। তোমায় কীসে বসতে দিই!”
বুড়ির বাঁকা ঠোঁটে হাসি। দেখতে পেল না পাপুই। বলল, “না, না, তোমায় অত ব্যস্ত হতে হবে না আমার জন্যে। আগে দেখে নাও মা ভেটের ফর্দটা।”
ভেটের থালা হাতে নিল পাপুই।
আহা! চাঁপা-বরণ রেশমি শাড়ি। নীল-আকাশি জামা। রূপার থালায় সোনার বাটি। বাটি ভর্তি মিষ্টি চাঁচি। মণ্ডা-মিঠাই।
পাপুই বললে, “বুড়িমা, ভরদুপুরে আসছ। মুখ-হাত-পা ধুয়ে নাও। মিঠাই খাও।”
বুড়ি থমকে গেল। ভয় পেল। উঠে দাঁড়াল। বললে, “না, মা! ও মিঠাই রাজা তোমাকে দিয়েছেন। আমি কেমন করে খাই!”
“না, না। তুমি রাজার মিঠাই কেন খাবে? আমার ঘরে আর কি কিছু নেই! শুধু মুখে যেতে আছে?” বলে পাপুই নাড়ু আনল বাটি সাজানো। জল আনল ঘটি ভর্তি।
বুড়ি বলল, “এত নাড়ু কী হবে?”
“খাও।” বাটি রেখে বুড়ির সামনে বসল পাপুই।

“বেশ, আমি নাড়ু খাচ্ছি। তুমি রাজার দেওয়া একটি মিঠাই খাও আগে।” বলে একটি মিঠাই তুলে নিল বুড়ি ভেটের থালা থেকে। পাপুইয়ের মুখের কাছে ধরে দিল।
সব্বনাশ! ওই মিঠাইটা জাদুকরা। বিষ পোরা!
খেয়ে ফেলল পাপুই। আহ্! কী মিষ্টি! কী সুন্দর! মুখখানি হাসিতে ভরে গেল তার।
কী হবে এখন?
গপগপ করে গালে ফেলে গিলে ফেলল বুড়ি নাড়ুগুলো। ঢকঢক করে জল খেল। তারপর পাপুইয়ের মুখের দিকে চেয়ে দেখল।
“কী দেখছ?” জিজ্ঞেস করল পাপুই।
“মুখখানি তোমার!’
লজ্জায় নামিয়ে নিল মুখখানি পাপুই মাটিতে।
বুড়ি আবার বলল, “দেখছি কী আর সাধ করে! কী জাদু করেছিস মা রাজাকে, তাই দেখছি। কী গান শুনেছেন রাজা? আমায় একটা শোনা না মা।”
“নিশ্চয়ই শোনাব। তুমি রাজবাড়ির ঝি। তোমায় শোনাব না! কী গান শুনবে বলো?”
“যে গান খুব ভাল।”
কোন গানটা একটু ভাল, আর কোন গানটা খুব ভাল ভাবছে পাপুই। একটু চোখ মেলে আকাশে চাইল। তারপর গুন-গুন-গুন সুর তুলল।
এ কী! এ কী! পাপুইয়ের কী হল? গান গাইতে পারছে না যে! গলা আটকায়! বিষম খায়!
কেন?
“কী হল মা?” বুড়ি জিজ্ঞেস করল। “কী হল? গান গাইতে কষ্ট হচ্ছে? বিষম লাগছে?”
পাপুই মুখটা ঘুরিয়ে নিল। নিজেকে সামলে নিল, বলল, “না, না, কিচ্ছু না।” আবার গাইল।
না, না! পারল না তো!
আবার।
সুর আসে না।
আর একবার।
দোল আসে না।
সেই শেষবার।
গান এল না।
কেঁদে ফেলল পাপুই। কাজল-পরা চোখদুটি ওর উপচে গেল। জিজ্ঞেস করল, “বুড়িমা, তোমার মিঠাই খেয়ে এ আমার কী হল! তোমার মিঠাইয়ে কী ছিল তাই বলো।”
বুড়ি চমকে উঠল থতমত খেয়ে বলল, “ওমা! ওমা! এ যে রাজার দেওয়া মিঠাই। এ মিঠাইয়ে কী থাকবে?”
“তবে কেন গান আসে না আমার মিঠাই খেয়ে? সুর আসে না মনে? দোল আসে সুরে?”
বুড়ি বাঁকা চোখে চাইল। বলল “আর একবার চেষ্টা করে দ্যাখো।”
কী হবে চেষ্টা করে?
তবু চেষ্টা করল পাপুই আর একবার। না, না, পারল না সে। পারল না সে বসে থাকতে। হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কান্নার জলে ভেসে গেল ওর চোখদুটি। গালদুটি। মুখখানি।
বুড়ি উঠে দাঁড়াল। ট্যারা চোখে পাপুইয়ের গলার দিকে তাকাল। গলায় তার মানিকমালা! লোভে চোখদুটো ঠিকরে আসছে। হঠাৎ বলল, “দোষ লাগেনি তো!”
চমকে উঠল পাপুই। “কীসের দোষ?”
“ওই মানিকমালার!”
থমকে গেল কান্না। “সে কী!”
ড্যাবড়া-ড্যাবড়া চোখদুটো বুড়ির। লাল-লাল। লাল-লাল চোখদুটো কেঁপে কেঁপে উঠল। বলল, “ও যে রক্তমানিক!”
“তাতে কী!”
“শক্ত বড় গলায় পরে সহ্য করা।”
“কেন?”
“মানিক কি আর সবার গায়ে সয়! মানিক কি আর সবার কাছে রয়!”
“তবে?”
“এক্ষুনি খুলে ফেলো। তোমার গান গেছে। তোমার দাদারও যদি কিছু হয়?”
ভয়ে শিউরে উঠল পাপুই। না, না। দাদার সে কিছু হতে দেবে না। কিছুতেই না। খুলে ফেলল গলার মালা। ছুড়ে ফেলে দিতে গেল।
বুড়ি ছুটে গেল। বাধা দিল, “ফেলো না, ফেলো না।”
“তবে? এ মালা আমি রাখব কোথা?”
“যার মালা তাকে ফেরত পাঠাও। আমাকে দাও। আমি ফেরত দিয়ে দেব রাজাকে।”
ভাবল না আর কিছু পাপুই। তুলে দিল বুড়ির হাতে মানিকমালা।
বুড়ি হেসে উঠেছে খ্যান-খ্যান করে। ছিনিয়ে নিয়েছে মানিকমালা পাপুইয়ের হাত থেকে। দোর ঠেলেছে। দুড়-দুড় করে পালিয়ে গেছে।
আঁতকে উঠল পাপুই। বুড়ির হাসি শুনে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। বিছানায় আছাড় খেয়ে লুটিয়ে পড়ল। মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল পাপুই।
আজ অনেক দেরি হয়ে গেল চাঁদের ঘরে ফিরতে। দেরি তো হবেই। কত জিনিস কিনেছে চাঁদ পাপুইয়ের জন্যে। দোকানে ঘুরে ঘুরে। ঘরে এসেছিল সে খুশিতে গাইতে গাইতে। হাতে তার রুপোর মল। নতুন। পায়ে পরিয়ে দেখবে চাঁদ, এ-মল পাপুইয়ের পায়ে কেমন মানায়। ঝুম-ঝুম রুপোর মল বাজাতে বাজাতে ঘরে ঢুকেছিল চাঁদ। ডাকতে ডাকতে, “পাপুই-ই-ই।”
কিন্তু পাপুই কই?
কোথা?
কাঁদছে পাপুই ঘরের কোণে। চুপটি করে।
কেন? চমকে ওঠে চাঁদ। “কী হয়েছে?” ছুটে গেল চাঁদ। “কী হয়েছে?” অবাক হল চাঁদ।
পাপুইয়ের দু’ চোখে জল। শুধু জল। গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
“কাঁদছ কেন পাপুই?” আদরে জড়িয়ে ধরল চাঁদ বোনকে।
হাউ হাউ করে ককিয়ে উঠল পাপুই, “দাদা।” তারপর দাদার কোলে লুটিয়ে পড়ল। হারিয়ে গেছে—তার সব হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে তার গান। তার সুর। তার দোলা।
চাঁদের হাত থেকে গড়িয়ে পড়ল রুপোর মল। মাটিতে। লুটিয়ে গেল রেশমি শাড়ি, রং-বাহারি। হারিয়ে গেল কানের দুল, রঙিন-ফুল। চাঁদের মুখে মেঘের ছায়া। বোনটির মুখের দিকে তাকিয়ে তারও চোখ ছলছল। ভাবছে চাঁদ, কী হবে এখন? কেমন করে রাজার কাছে যাবে পাপুই। কেমন করে গান শোনাবে? ছি! ছি!
তিন দিন কেটে গেল। ঘুমোয় না চাঁদ। ঘুমোয় না পাপুই। ক’দিন আকাশে মেঘ ছিল। আজ রোদ উঠেছে। আজ থেকে আবার পুতুল বেচতে যাবে চাঁদ। কী মনে হল, ও আজ দেরাজ খুলেছে। মিষ্টি তারা পুতুলটিকে আজ সঙ্গে নেবে চাঁদ। কী হবে দেরাজে সাজিয়ে রেখে মিছিমিছি। বেচে দেবে।
“কোথা যাচ্ছ দাদা?” জিজ্ঞেস করল পাপুই।
“হাটে।”
হঠাৎ মনে পড়ে গেল ডাইনির মুখটা। সেই ভয়ংকর চোখদুটো। খ্যান-খ্যানে হাসি। দাদার হাতদুটো চেপে ধরল পাপুই। ব্যস্ত হয়ে বলল, “না-ই বা গেলে আজ।”
শুনল না চাঁদ। হাটে চলল।
জানলায় চোখ মেলে দাঁড়িয়ে রইল পাপুই।
হাঁটছে চাঁদ। পাপুইয়ের চোখদুটি যতক্ষণ দেখতে পায় দাদাকে, চেয়ে রইল। তারপর দুটি চোখ দিয়ে দু’ ফোঁটা জল দুটি মুক্তোর মতো গড়িয়ে পড়ল।
হাঁটছে চাঁদ। এখনও। এখনও অনেকক্ষণ হাঁটবে।
কিন্তু ও কে সামনে?
একটা বুড়ি। পিঠে কাঠের বোঝা। বোঝার ভারে নুয়ে পড়েছে। হাঁটতে পারছে না। ভারী কষ্ট!
দেখতে পেয়েছে চাঁদ। মায়া লাগল। আহা-রে! বুড়ি মানুষ। অত কাঠ বইবে কেমন করে?
ছুটে গেল চাঁদ। বুড়ির কাছে। বলল, “ও বুড়িমা, ও বুড়িমা, কোথা যাচ্ছ? দাও তোমার কাঠের বোঝা। আমি পৌঁছে দিই তোমার ঘরে।”
বুড়ি ক্লান্ত। ঘাম ঝরছে। হাঁপাচ্ছে। চাঁদের মুখের দিকে তাকাল। হাসি ফুটল ক্লান্ত মুখে। বলল, “লক্ষ্মী ছেলে।”
চাঁদ মাথায় পুতুলের সাজি নিল। পিঠে কাঠের বোঝা বাঁধল। হাঁটল বুড়ির পিছু পিছু। জানতেও পারল না কার পিছু হাঁটছে ও। ও যে সেই ডাইনি! জানতেও পারল না, ডাইনির চোখ আজ তার ওপরে!
সামনে বিপদ!
হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা এসে চাঁদ ভাবল, এদিকে তো সে কোনওদিন আসেনি। এ কোথায় চলেছে সে! জায়গাটা তো চেনা নয়। তাই বলল, “ও বুড়িমা, কোনদিকে গো তোমার ঘর?”
বুড়ি বলল, “ওইদিকে। কেন বাছা, তোমার কষ্ট হচ্ছে?”
চাঁদ বলল, “না, না।”
ওই ওদিকে আর একটু হাঁটল চাঁদ। পথটা যখন আরও অচেনা লাগল, তখন চাঁদ আবার জিজ্ঞেস করল, “ও বুড়িমা, আর কতদূরে তোমার ঘর?”
বুড়ি বলল, “আর নয় গো, দূর নয়।” বলে বুড়ি একটা ঘুপচুপ বনে ঢুকল। চাঁদও পিছু পিছু হাঁটল।
অবাক কাণ্ড! এতক্ষণ আকাশে রোদ ছিল। হঠাৎ মেঘ এল কোত্থেকে? বাব্বা! কালো মেঘে আঁধার করে এসেছে। মেঘের সাজন কী! এক্ষুনি ঝড় উঠবে। মনে হচ্ছে।
বলতে বলতেই ঝড় উঠল। গাছের মাথায় মাথায় ঝড়ের লুটোপুটি। ঠোকাঠুকি। ঝরা-পাতায় ঝড়ের ঘূর্ণি লেগেছে। গুড়-গুড়-গুড় মেঘ ডেকেছে।
ঝির, ঝির, ঝির,
ঝিম, ঝিম, ঝিম,
ঝুম, ঝুম, ঝুম,
ঝম, ঝম, ঝম,
বিষ্টি নামল।
সামনে চাইল চাঁদ তাড়াতাড়ি। এ কী! বুড়িকে তো দেখতে পাচ্ছে না চাঁদ! কোথায় গেল!
ডাকল চাঁদ, “ও বুড়িমা।”
না, কিচ্ছুই শোনা গেল না। যা ঝড়। কোনওই সাড়া পেল না।
আর দাঁড়ানো যাবে না। পুতুলগুলো ভিজে যাবে। নষ্ট হবে।
সামনে ওটা কী?
একটা ভাঙা-ভাঙা ঘর।
কী মনে হল চাঁদের, ছুট্টে ঘরের দাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াল। কেউ নেই ঘরে। ফাঁকা। ওখান থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ওর চোখদুটি খুঁজতে লাগল বুড়িকে! তাই তো বুড়িমা গেল কোথা? ঝড়ে পড়ল? না ঘরে ছুটল? ঘর কোথা, কোনদিকে? ঝড় না থামলে খুঁজবে কেমন করে চাঁদ?
খুলে ফেলল পিঠের বোঝা কাঠগুলো। পাশে রাখল পুতুলের সাজিটা। চেয়ে দেখল। না, বেঁচে গেছে। জল লাগেনি পুতুলদের গায়ে। না, কিচ্ছু হয়নি মিষ্টি তারা পুতুলটির। সত্যি, কী সুন্দর মিষ্টি তারা পুতুলটি! হাতে তুলে নিল চাঁদ। চোখ মেলে চেয়ে রইল পুতুলের চোখের দিকে। পাপুইয়ের চোখের দিকেও এমনই করে চেয়ে দেখে চাঁদ। পাপুই! মনে পড়ে গেল চাঁদের হঠাৎ। ছোট্ট বোনটি তার কী করছে এখন? আহা! কী হল তার? কে চুরি করল তার গান?
ঘুম পাচ্ছে চাঁদের বসে বসে।
কেন? এখন তো ঘুমোয় না চাঁদ?
থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল ঘরের দাওয়ায়। ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর কিচ্ছু জানে না। জানে না চাঁদ, কখন ঝড় থেমে গেছে। কখন বিষ্টি ধরে গেছে। জানে না এখনও মেঘ কেটেছে কি না। আবার কি ঝড় উঠবে? আবার কি আকাশ কাঁপিয়ে বিষ্টি নামবে ঝমঝমিয়ে?
হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল ডাইনিটা!
কোথা থেকে?
উঃ বাব্বা! চমকে উঠতে হয়। লুকিয়ে ছিল বনে। ওই গাছের আড়ালে। ওখান থেকেই জাদু করেছে চাঁদের চোখদুটিতে। ঘুম-পাড়ানি জাদু! তাই তো ঘুমিয়ে পড়েছে চাঁদ। এখন ওর ঘুম ভাঙবে না।
সত্যি, ঘুম ভাঙেনি চাঁদের।
দিন পেরিয়ে সাঁঝ এসেছিল। ঘুম ভাঙেনি।
সাঁঝ পেরিয়ে রাত এসেছিল। তবুও জাগেনি।
বুড়িটা সারাদিন হেসে হেসে নেচেছিল। নেচে নেচে গেয়েছিল। সে-গান শুনতে পায়নি চাঁদ!
এখন একটি একটি তারা আকাশে। রাত নেমেছে।
একটি একটি জোনক নাচছে গাছের ফাঁকে।
একটি একটি পেঁচা ডালে ডালে।
ওটা কী? কী ওটা? ডাইনির হাতে? অন্ধকারে চকচক করছে!
একটা দা। দা-টা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল ডাইনি চাঁদের দিকে। মারবে নাকি চাঁদকে?
হ্যাঁ, কাটবে। ওই তো দা তুলেছে। এই মারল, মারল!
না, পারল না।
“ক্যাঁক ক্যাঁক।” একটা পেঁচা চেঁচিয়ে উঠল আচমকা। চমকে ভয়ে থমকে গেল ডাইনি। গাছের দিকে চাইল। পেঁচাটাকে দেখতে পেল। খ্যান-খ্যান করে চেঁচিয়ে উঠল। হাসল, না কাঁদল কে বুঝবে? ভয়ে পালাল পেঁচাটা ডাল ছেড়ে আকাশে! চেয়ে রইল ডাইনি আকাশের দিকে।
হঠাৎ এত আলো এল কোত্থেকে? চাঁদের পাশে পুতুলের সাজি। নড়ছে মনে হয়! হ্যাঁ, হ্যাঁ! দ্যাখো, দ্যাখো মিষ্টি তারা পুতুলটি নড়েচড়ে বসছে যেন!
বসছে না তো উঠছে।
তাই তো!
ওই তো সাজি ডিঙিয়ে বাইরে আসছে! দ্যাখো, দ্যাখো কত আলো! ঠিকরে পড়ছে মাথার তারার ফুলটি থেকে, কানের তারার দুলটি থেকে।
ওমা! দাঁড়াল যে মিষ্টি তারা পুতুলটি চাঁদের মাথার সামনে! কে বলবে তাকে পুতুল এখন? ঠিক যেন একটি মিষ্টি মেয়ে। আলোর মেয়ে।
কত আদর বুকে বুকে জমা হয়েছে ওর এতদিন চাঁদের। কত ভালবাসা পাপুইয়ের। চাঁদের বিপদ। আজ সে কেমন করে পুতুলটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকে!
হঠাৎ ঝলসে গেল ডাইনির চোখদুটো। ঘুরে দাঁড়াল। হাত দুটো কেঁপে উঠল। লোভে! চকচকে দা-টা হাত থেকে পড়ে গেল মাটিতে। ও কী? আলো, না মানিক? মানিক, না হিরে? হিরে, না পান্না? চোখ ধাঁধিয়ে গেল ডাইনির! ডাইনির চাই। সব চাই। মানিক চাই, মণি চাই, পান্না চাই। হাত বাড়াল ডাইনি। ধরতে গেল আলোর মেয়েকে। ছুট দিল মিষ্টি তারা। ছুটল ডাইনি তার পেছনে।
অন্ধকার বন। মিষ্টি তারা ছুটছে। আলোয় নাচছে। বুড়ির চিৎকারে বন কাঁপছে।
ছুটতে ছুটতে বন পেরোল। বনের শেষে একটা মস্ত পাহাড়। পাহাড় উঁচু। পাহাড় নিচু। এদিকে খাদ। ওদিকে পথ। আলোর মেয়ে পাহাড়ে উঠে গেল।
হাঁপিয়ে গেছে বুড়ি। তবু উঠবে। পাহাড়ে। আলো দেখবে। আলোর পিছু ছুটবে।
ছুটতে ছুটতে, আলো দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে গেল বুড়ির। দেখতে পেল না সামনে খাদ। ভীষণ! এই যাঃ! পা ফসকে গেছে বুড়ির। পড়েছে। ধপাস! ধাঁই! একেবারে খাদের ভেতর! ব্যাস! চিৎকার করে উঠল বুড়ি খাদের ভেতর থেকে, “বাবা-গো, মলুম-গো!” তারপর আর কোনও সাড়া নেই। সব থমথম। চুপচাপ। ডাইনি খাদের ভেতর অক্কা পেয়ে গেল।
কোথা গেল আলোর মেয়ে?
ওই তো, ওই দ্যাখো এখনও ছুটছে।
পাহাড়ের মাথায় নীল আকাশ। আকাশের বুকে কত, ক—ত তারা। গোনা যায় না। আলোর মেয়ে ছুটছে। ছুটছে পাহাড়ের ওপরে। আরও ওপরে। ও যাবে তারার দেশে।
টুপ! হারিয়ে গেল হঠাৎ। আর দেখা যায় না।
কোথা হারাল?
ওই যে, ওই দ্যাখো, চুপটি করে বসে আছে নীল আকাশে। চুপটি করে একটি তারা! মিষ্টি তারা। কেমন চোখ পিটপিট করে হাসছে দ্যাখো! আহা!
সারারাত কেঁদেছে পাপুই। দাদা আসেনি তার। কোথা গেল? ভেবেছে। জানলায় মুখটি বাড়িয়ে চোখদুটি খুঁজেছে দাদাকে আঁতিপাতি।
ভোর হয়নি তখনও। পাখি গায়নি। রাত যায়নি। পাপুই থাকতে পারেনি ঘরে। ওর মন কোনও মানা মানবে না। ও বেরিয়ে পড়েছে পথে। দাদাকে খুঁজবে ও। ডাকছে, “দাদা-আ-আ।” কাঁদছে।
এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল চাঁদ। হঠাৎ ওর চমক লাগল। জেগে উঠল। ছিঃ! ছিঃ! এ কী! এ যে রাত! ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। এ কোথা এসেছে সে? তার পুতুল? ওই তো সাজিতে। একটি একটি করে দেখল অন্ধকারে। কিন্তু কই তার মিষ্টি তারা পুতুলটি?
নেই, সে নেই।
কোথা গেল?
হাতড়ে হাতড়ে খুঁজল। হঠাৎ মন কেঁদে উঠল পাপুইয়ের জন্যে। ছুট দিল সে। ছুট দিল বনের বাইরে।
হঠাৎ শুনতে পেয়েছিল চাঁদ পাপুইয়ের ডাক। বনের বাইরে। এ তো ডাক না। এ যে কান্না। এ যে কান্নার গান। দাদার জন্যে আকুল হয়ে কাঁদছে পাপুই। ওর কান্না যেন গান হয়ে ভেসে যাচ্ছে।
ভোর হয়ে আসছে। তখনও জাগেনি আলো। জাগেনি পাখি। জাগেনি ফুল। শুধু জেগে উঠেছে চাঁদের মন। আনন্দে। খুশিতে আর জেগে আছে তখনও আকাশে অনেক তারা। একটু পরে ভোরের আলো আসবে। তারারা ঘুমিয়ে পড়বে।
চাঁদ চেঁচিয়ে ডাকল, “পাপুই-ই-ই।”
দেখতে পেয়েছে দাদাকে পাপুই।
ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরল চাঁদ পাপুইয়ের গলাটি।
“দাদা।” ককিয়ে উঠল পাপুই। লুটিয়ে পড়ল দাদার বুকে। ভেসে গেল দাদার বুক চোখের জলে।
“পাপুই।” মিষ্টি, ছোট্ট একটি ডাক। দাদা ডাকল। বুক থেকে মুখটি তুলে নিল। চিবুকে হাত দিল চাঁদ। চোখদুটি মুছে দিল। বলল, “কাঁদছ পাপুই?” বলে নিজেই কেঁদে ফেলল।
দাদার চোখে হাত দিয়ে পাপুই বলল, “তুমি কেন কাঁদছ?”
“আমার যে আজ খুশির দিন। তুমি যে আবার গান গাইছ। কেমন করে গাইছ পাপুই?”
“জানি না।” আকাশে চাইল পাপুই।
চাঁদও চাইল আকাশে। ওপরে। পাপুইয়ের চোখদুটির দিকে চেয়ে চেয়ে বলল, “দ্যাখো পাপুই, আকাশে কত তারা।”
পাপুইয়ের ছলছল চোখদুটি টলমল করে উঠল। বলল, “দ্যাখো, দ্যাখো, ওই তারাটি কত সুন্দর!”
“সত্যি! ভারী সুন্দর! ও যেন আমার বোন, আমার পাপুই।”
তারপর তারাটি টুপ করে ডুবে গেল আকাশে।
তখন আলো ফুটছে একটু একটু। ভোরের আলো। চাঁদ জানতেও পারল না, ওই তো তার মিষ্টি তারা পুতুলটি!
তারপর?
সাতদিন পরে রাজার চৌদোলা এল। ডুরে শাড়ি পরল পাপুই। পায়ে মল বাজাল। কানে দুল সাজাল। চৌদোলায় দুলে দুলে পাপুই রাজাকে গান শোনাতে গেল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন