নীল গোলাপের গল্প

শৈলেন ঘোষ

ভারী শান্ত এই জায়গাটা। ভারী নির্জন। ওই যে একটা মস্ত প্রাসাদের ভাঙা স্তূপের ফাঁকে ফাঁকে ঝোপ-ঝাড়গুলো চারদিকে এলোমেলো ডালপালা ছড়িয়ে রেখেছে, ওখানে একা-একাই ঘুরে বেড়ায় বালু। ওই ভাঙা পাথরের গায়ে গায়ে পা ফেলে গান গায়। নয়তো, পাথরের তৈরি ওই মানুষের মূর্তিটাকে জড়িয়ে ধরে হাসে, চিৎকার করে। হ্যাঁ, তুমি দেখলেই বুঝতে পারবে, অনেক, অ-নে-ক দিন আগে হয়তো এখানে কোনও রাজার প্রাসাদ ছিল। হয়তো রাজার রাজত্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাসাদের সিংদুয়ারও ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়েছে মাটির ওপর। এখানে কেউ আসে না। এই ভাঙা প্রাসাদের ঝোপজঙ্গলে কে আর সাধ করে আসতে চায়! তাই বালু এখানে একা। ভাল লাগে ওর এখানে একা থাকতে আর ওই পাথরের মূর্তিটার দিকে চেয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়তে।

এইখানেই বালু ঘুমোয়। ওই মূর্তিটার পায়ের গোড়ায় ওই যে ফাটা চত্বরটা চকচক করছে, ওইটার ওপর। কেন না, ওর তো আর ঘুমোবার জায়গা নেই! নিথর রাতে এই নির্জনে যখন ফাটা পাঁচিলের গর্তের ফাঁকে টিকটিকি ডেকে ওঠে টক-টক করে কিংবা খুব দূরে, অন্ধকারে গাছের ডালে হুতুমপেঁচা ক্যারকেরিয়ে হেঁকে ওঠে, সে-হাঁক শুনে বালু চমকে ওঠে না। কারণ, এই শব্দ এই ডাক, এই নিঃঝুম অন্ধকার, কিংবা এই খোলা আকাশের হাতছানি—ওরা সবাই ওর বন্ধু। আর বন্ধু এই মানুষের মূর্তিটি। যদিও মূর্তিটির চোখদুটি ক্ষয়ে ক্ষয়ে প্রায় মুছে গেছে, একটি হাত ভেঙে পড়েছে মাটিতে, পায়ের আঙুলগুলি ক্ষতবিক্ষত, তবু দেখলে তোমার চিনতে কষ্টই হবে না এটি একটি বুড়োমানুষের মূর্তি। মানুষটি যেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। হ্যাঁ, হয়তো অনেক বয়েস। তুমি যদি মূর্তিটি দেখতে দেখতে ভাব, ওর বয়স একশো, তবে বালুকে দেখলে তোমার ঠিক মনে হবে, বালুর বয়স দশ।

এটা একটা ছোট্ট পাহাড়তলি। এক্কাগাড়ি, টাট্টু ঘোড়া, বাজারহাট, দোকানপাট সব আছে। ক’পা হাঁটলেই মস্ত উঁচু পাহাড়। দূরে ছোট্ট রেল-ইস্টিশান। পাহাড়ের গায়ে রেললাইন। মাঝখানে ঝরনা। ঝরনার জল জমে জমে কেমন ছোট একটি ঝিল! ঠিক ছবির মতো। শীত যখন পড়ি পড়ি করে, তখন নানান দেশ থেকে কত লোক বেড়াতে আসে এখানে! যেদিকে চাইবে, দেখবে, সবার গায়ে ঝকমকে রঙিন পোশাক! চারদিকে ঝলমল করছে। কেউ হাসছে, কেউ-বা গান গাইছে। নয় তো ছুটতে ছুটতে নাচছে আর খাচ্ছে। চারদিকে খুশি আর খুশি!

লজ্জা করে বালুর। ওদের সামনে যেতে লজ্জা করে। করবেই তো। বালুর যা চেহারা! জামাকাপড়ের যা ছিরি! তবু বালুকে যেতেই হয়। যেতে হয় এই ফুলের ডালিটা হাতে নিয়ে। আর পাহাড়তলির উঁচু-নিচু পথ হাঁটতে হাঁটতে ওকে হাঁকতে হয়, “ফুল নেবে ফুল, রঙিন ফুল!”

হ্যাঁ, বালু ফুল বিক্রি করে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে যে-ফুলগুলি রোজ সকালে ফুটে থাকে, সেগুলি তুলে আনে বালু। তারপর ডালি ভরে সেগুলি সাজিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। কত রকম ফুল যে সে তুলে আনে! কত রং! দেখলে তোমারও চোখ জুড়িয়ে যাবে। তবু একটি ফুল, সে তার ডালিতে কোনওদিন তুলে আনেনি। তুলে আনেনি সেই নীল পাপড়ির গোলাপটি! কেন না, বালু জানে, সেই নীল গোলাপটি তার মা। বালু জানে, ঠিক জানে, ওই যেখানে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের শিখর উঁকি মারছে, সেইখানে ওই উঁচুতে নীল গোলাপটি ফুটে আছে।

এক-একদিন ফুল বেচতে বেচতে, সাঁকো পেরিয়ে ওই পারে চলে যায় বালু। পাহাড়ের গায়ে গায়ে যেখানে পাইন গাছের ছায়ারা গড়িয়ে পড়েছে, সেখানটা বেশ লাগে তার! একটু দূরে ঝিলের ধারে কত লোক আজ বনভোজন করতে এসেছে! কী খুশি দ্যাখো! কেমন গাছের ডালে দোলনা ঝুলিয়ে দোল খাচ্ছে আর গান গাইছে! ওদের খুশির সুর দূর থেকে দুলতে দুলতে ভেসে আসছে। সেই খুশি বালুর কানে কানে যতই ছড়িয়ে যায়, ততই যেন আনন্দে শিউরে ওঠে সে। আপন মনে বালুও গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে। গাইতে গাইতে সবুজ ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ে। তারপর ডালিভর্তি ফুলগুলি ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে গলায় তার যত গান ছিল সব যেন উজাড় করে দেয়!

হঠাৎ কে যেন খুব কাছে হেসে উঠল, “হি-হি-হি।” যেন একটি ছোট্ট মেয়ের গলা। গান থামিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল বালু। হ্যাঁ। তাকিয়ে দেখে, যা ভেবেছে ঠিক তাই, ছোট্ট একটি মেয়ে। বালুর চেয়েও ছোট্ট। বেগনি রঙের ফ্রক পরেছে। ফ্রকের গায়ে লাল ফুটকির ফুল আঁকা। মাথায় রিবন। এক গোছা চুল কপালে লুটিয়ে আছে। অদ্ভুত নীল তার চোখদুটি। কী ভালই লাগছে!

“হি-হি-হি!” বালুর দিকে চেয়ে আবার হাসল সে। তার চোখের পাতাদুটি হাসতে হাসতে কেঁপে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, “থামলে কেন?”

কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে বালু।

মেয়েটি তেমনই হাসতে হাসতেই বলল, “কী মিষ্টি গান গাও তুমি।”

কেমন যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেল বালুর মুখখানা।

সে আবার বলল, “গাও না আবার!”

বালু চুপ করে রইল।

সে জিজ্ঞেস করল, “গাইবে না? তবে এসো না খেলা করি। তুমি দোলনায় চাপতে পারো?”

এবার যেন “হ্যাঁ” বলে বালুর ঘাড়টা আপনা থেকে দুলে উঠল। মেয়েটি অমনই আচমকা বালুর হাতটা ধরে ফেলল। বলল, “তবে এসো আমার সঙ্গে!” বলতে বলতে সে বালুর হাত ধরে ছুট দিল। বালু কিচ্ছু বলতে পারল না। সেও ছুটল আর আনন্দে শিউরে উঠল। কেন না, এমন করে আপন ভেবে কেউ তো আর কোনও দিন হাত ধরেনি। কেউ তো তাকে এমন করে খেলতে ডাকেনি। মেয়েটি ছুটতে ছুটতে যতই ডাকছে আর হাসছে, বালুর যেন ততই মনে হচ্ছে, ওই ঝরনার ঝিরিঝিরি নতুন সুরে নূপুর বাজাচ্ছে। মেয়েটির মাথার রাশি রাশি চুল হাওয়ায় যতই নেচে উঠছে, বালুর মনের খুশি ততই যেন উপচে উঠে ওই ঝরনার জলের মতো লাফিয়ে পড়ছে। এই প্রথম, আজই প্রথম ওর হাতটি ধরে ডাক দিয়েছে ওর খেলার সাথি। আজই প্রথম ওর ছোট্ট বুকখানি দোলনায় দুলে দুলে ঢেউ খেলছে।

দোলনায় দোলা দিয়ে বালুকে জিজ্ঞেস করল সে, “কেমন লাগছে তোমার?”

বালু বলল, “খুউব ভাল।”

সেই মেয়েটি এবার সেই দোলনা ঠেলতে ঠেলতে একটু কাছে একটু দূরে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”

বালু এবার একটু কাছে, একটু দূরে দুলতে দুলতে বলল, “বালু। তোমার?”

“তিতু।” মেয়েটি উত্তর দিল।

তারপর তিতু বললে, “বালু, যে-গানটা গাইছিলে, সেইটা এবার গাও।”

বালু বলল, “ধ্যাত! আমি গাইতে পারি না।”

সে বলল, “কে বললে পারো না। হ্যাঁ পারো, খুব ভাল পারো।”

বালু গান গাইল। সেই ছোট্ট পাহাড়তলির সেই সবুজ মাঠ তার গানের সুরে ভরে গেল। সেই গান তিতুর কানে বাজতে বাজতে খুশিতে উছলে উঠল। সুন্দর সেই ঝিলের জলে ঝিলিমিলি পাখনা মেলে রুপোর মতো মাছের দল সাঁতরে উঠল। আর ছোট্ট রেল ইস্টিশানের ছোট্ট গাড়ি ঠিক তখনই কু-কু করে হেঁকে উঠল। তিতু তখন দোলনা ছেড়ে ছুট দিল পাহাড়ের ওই ওপারে।

বালু তখন দোলনা থেকে লাফিয়ে নেমে, ছুটতে ছুটতে হাঁক দিল, “তিতু, যেয়ো না। ওদিকে বন।”

তিতু ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের বনে লুকিয়ে পড়ল। লুকিয়ে লুকিয়ে ডাক দিল, “বালু বলে টুকি-ই-ই!”

বালু বনের ভেতর ঢুকে পড়ল। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পেল, পাইন বনের আড়ালে লুকিয়ে আছে তিতু। পিছন থেকে চুপি চুপি গিয়ে তিতুর চোখদুটি চেপে ধরল। তিতু হেসে উঠে ডাক দিল, “বালু-উ-উ!”

বালুও খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলল, “কেমন ঠকিয়েছি!”

তারপর দু’জনেই হেসে উঠল। দু’জনেই আপন হয়ে সেই পাইনের ছায়ায় ছায়ায় লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিল। খেলতে খেলতে তিতু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “বালু, কে আছে তোমার?”

“আমার?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ।”

“তাকে দেখবে তুমি?”

“হ্যাঁ”

“তবে এসো!” তিতুর হাত ধরে বালু এবার ছুট দিল। ছুটে এল সেই ভাঙা স্তূপের জঞ্জালে।

“এ কী! এ যে জঞ্জাল!” অবাক হল তিতু।

“এইখানেই তো আমি থাকি।”

“এখানে?”

“হ্যাঁ, এদিকে এসো।” বলে বালু সেই পাথরের মূর্তির সামনে এসে দাঁড়াল।

“এ যে পাথর!” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে তিতু।

“এই তো আমার আপনজন, আমার বন্ধু।” বলে আনন্দে আত্মহারা বালু তিতুর হাত ধরে সেই পাথরের মূর্তি ছুঁয়ে লাফিয়ে উঠল। বলল, “দ্যাখো, দ্যাখো তিতু এসেছে। আমার বন্ধু। দ্যাখো, এই তো তোমার সামনে দাঁড়িয়ে।” তারপর তিতুর হাত ধরে নেচে উঠল বালু। যেন চিরদিনের জন্য ও এক বন্ধু খুঁজে পেয়েছে। এ-বন্ধু বুঝি-বা ওকে আর কোনওদিন ছেড়ে যাবে না। কোনওদিনও না।

বালুর মতো খুশি হয়ে তিতুও জিজ্ঞেস করল, “তোমার মা-ও বুঝি এখানে থাকেন?”

“না।” বালু থামল। “আমার মা এখানে থাকেন না। মা আমার ওই দ্যাখো দূরে, ওই যে আকাশছোঁয়া পাহাড়চুড়োটা দেখা যাচ্ছে, ওখানে আমার মা আছেন!”

তিতু ওই পাহাড়ের চুড়োর দিকে তাকাল। নীল, শুধু নীল ওই পাহাড়ের চুড়োয় ছড়িয়ে ছড়িয়ে দোল খাচ্ছে।

তিতু জিজ্ঞেস করল, “ওখানে এত নীল কেন?”

বালু বলল, “ওখানে যে ফুটে আছে গোলাপ। শুধু নীল গোলাপ! ওইখানেই একটি নীল গোলাপ আমার মা হয়ে ঘুমিয়ে আছেন!”

তিতু চমকে চাইল বালুর মুখের দিকে। তার হাসিটুকু ঠোঁট থেকে হারিয়ে গেল। তবে কি বালুর মা নেই!

বালু হঠাৎই জিজ্ঞেস করল, “তুমি নেবে একটি নীল গোলাপ? আমি তুলে আনব?”

তিতু ভয় পেল। বলল, “যে-ফুলটি তুলবে, সেটি যদি তোমার মা হয়!”

বালু বলল, “না, না। যে-ফুলটি আমার মা, তাকে তো আমি চিনি। তুমি দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।” খুশিতে বালু তখনই ছুটতে যায়!

তিতু বালুর হাত ধরে ফেলল। বলল, “আমিও যাব!”

বালু বলল, “না, ওই ওপরে উঠতে তোমার কষ্ট হবে। অনেক উঁচু। তুমি আমার এই বন্ধু পাথরের মূর্তির কাছে বসে থাকো। আমি যাব আর আসব।” বলে বালু ছুট দিল। ছুটতে ছুটতে হাঁক দিল, “তিতু-উ-উ!”

তিতু ডাক দিল, “বালু-উ-উ।”

তারপর তিতু দেখল বালু ছুটতে ছুটতে একটু একটু করে পাহাড়ের ওপর উঠছে। উঠতে উঠতে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। তারপর হারিয়ে হারিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। তারপর একেবারে মিলিয়ে গেল। তিতু চেয়ে রইল সেইদিকে।

অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। এখানে, এই ভাঙা স্তূপের সারা রাজ্যে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব। মাঝে মাঝে হাওয়ার ধাক্কায় যেন শিউরে উঠছে চারদিক। শিউরে উঠছে তিতুও।

ওর চোখদুটি চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। অনেকক্ষণ পরেও যখন ও আর বালুকে দেখতে পেল না, তখনই তিতু ভয়ে ভয়ে ভেবেছিল, তবে কি বালু হারিয়ে গেল! তাই যেন আচমকা হঠাৎ-ই সে ডেকে উঠেছিল, “বালু-উ-উ!” সাড়া পায়নি। আবার ডেকেছিল, “বালু-উ-উ-উ!” সেই ভাঙা প্রাসাদের পাথরে পাথরে তিতুর গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবু কোনও সাড়া নেই। তারপর হঠাৎ যখন চোখদুটি তার ওই ভাঙা মূর্তির মুখের ওপর চমকে থেমে স্থির হয়ে যায়, তখনই যেন কেমন একটা অজানা ভয়ে ওর বুকটাও থরথর করে ওঠে। এবার তিতু আকুল স্বরে চিৎকার করে ডাক দিল, “বালু-উ-উ-উ! বালু-উ-উ! বালু-উ-উ!”

কারা যেন হাসছে! হ্যাঁ, কারা যেন তিতুর চিৎকার শুনে বিকট সুরে হেসে উঠেছে, “হা-হা-হা।” সেই ভাঙা স্তূপের অন্দর থেকে সে-হাসি ছুটে আসছে তিতুর দিকে। ভয়ংকর সে হাসি! ভয়ে আঁতকে উঠল তিতু। তারপর সেই ভাঙা প্রাসাদের চত্বর থেকে সে প্রাণপণে ছুট দিল। কোথায় ছুটল তিতু নিজেও জানে না।

সত্যিই, অনেকক্ষণ পর ওই পাহাড়ের চুড়ো থেকে নেমে এসেছিল বালু একটি নীল গোলাপ হাতে নিয়ে। ভারী ক্লান্ত সে। আর হাঁটতে যেন পারছে না। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বালু। কই, তিতু কই! সে নরম গলায় ডাক দিল, “তিতু!” কেউ সাড়া দিল না। তাই তো, তিতু গেল কোথায়! ব্যস্ত হয়ে উঠল বালু। ব্যস্ত গলায় আবার ডাকল, “তিতু-উ-উ।” পারছিল না, তবু সে ব্যস্ত পায়ে পাথর টপকাল। টপকে টপকে সে পাহাড়তলির পথে হাঁটল। হাঁটতে হাঁটতে ডাকল, “তিতু-উ-উ! তিতু-উ-উ!” না, তিতু সাড়া দিল না। খুঁজে পেল না বালু তিতুকে। নীল গোলাপটি হাতে নিয়েই সে আবার ফিরে এসেছিল এই ভাঙা স্তূপের প্রাসাদে। তারপর নীল গোলাপটি যত্ন করে মাথার কাছে লুকিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

খুব সকালে ঘুম ভেঙেছিল বালুর। খুব সকালে সেই নীল গোলাপটি হাতে নিয়ে পাহাড়তলির পথে পথে সে তিতুকে খুঁজতে বেরিয়েছিল আবার। কিন্তু খুঁজে পায়নি। তখন তার মনে হয়েছিল, নীল গোলাপের পাপড়িগুলি একটু পরেই হয়তো ঝরে পড়বে। একটু পরেই মাটির ওপর ছড়িয়ে পড়বে। দুঃখে ভার মনটি তার। হতাশ হয়ে ফিরে আসছিল সে। হয়তো ফিরেই আসত! কিন্তু হঠাৎ একটা এক্কাগাড়ি ছুটে গেল পলকে তার চোখের সামনে দিয়ে। চোখদুটি ধাঁধিয়ে গেল বালুর। গাড়ির ভেতর ছোট্ট মেয়েটি, ও কে? তিতু না? সঙ্গে কারা? মা আর বাবা? নিমেষে গাড়িটা পাহাড়ি পথে নিচু বাঁকে ছুটতে ছুটতে নেমে যাচ্ছে। বালু চিৎকার করে উঠল, “তিতু-উ-উ!”

কে জানে তিতু শুনতে পেল কি না! এক্কাগাড়ির ঘোড়া ছুটছে। ঘোড়ার গলায় ঘুঙুর বাজছে ঝনঝন। সেই শব্দ শুনতে শুনতে বালুও ছুটল। কিন্তু পারল না। গাড়ি ছুটতে ছুটতে ওর চোখের আড়ালে চলে গেল। আর ঘুঙুর বাজতে বাজতে দূর থেকে আরও দূরে মিলিয়ে গেল। তবু বালু থামল না। এক্কাগাড়ির চাকার দাগ ইস্টিশানের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বালুও ইস্টিশানের পথ ধরল। ওই দেখা যায় ইস্টিশানের রেলগাড়ি, ছোট্ট গাড়ি। তবে কি তিতু ওই গাড়িতে চলে যাচ্ছে!

হ্যাঁ, বেড়াতে এসেছিল তিতু মা আর বাবার সঙ্গে এই পাহাড়তলিতে। আজ ফিরে যাচ্ছে। ওই তো তার মুখখানি রেলের জানালায় উঁকি দিচ্ছে।

কু-ঝিক-ঝিক রেল ছাড়ল।

বালুও এল।

কু-ঝিক-ঝিক রেল ছুটল।

বালু তিতুকে দেখতে পেল। বালু চেঁচিয়ে উঠল, “তিতু-উ-উ!”

চমকে উঠছে তিতু। দেখেছে সেও! ওই তো তার বন্ধু বালু ছুটে আসছে রেলগাড়ির পাশে পাশে পা ফেলে। তিতুর চোখদুটি জ্বলজ্বল করে উঠল। চকিতে সে হাত বাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “বালু-উ-উ!”

রেল ছুটছে। বালুও ছুটছে। তিতুর হাতের আঙুলগুলি ওকে ছোঁয়ার জন্যে ছটফটিয়ে উঠছে। বালুও হাত বাড়াল। নীল গোলাপটি তার হাতে। বালু চিৎকার করে উঠল, “তিতু, তোমার নীল গোলাপ।”

তিতুর হাতের আঙুলগুলি কাঁপতে কাঁপতে ধরে ফেলল সেই গোলাপ। তারপর হুস্‌-স্‌-স্‌। রেলগাড়ি ছুটে নাগালের বাইরে চলে গেল।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বালু। চেয়ে রইল সেইদিকে। চেয়ে চেয়ে দেখল, ছোট্ট গাড়ি ঝিকঝিকিয়ে পাহাড়ে বাঁক নিচ্ছে। পাহাড়ের খাদ পেরিয়ে দোল খাচ্ছে। তারপর হারিয়ে যাচ্ছে।

গাড়ি হারিয়ে গেল। বালুর চোখ ছলছলিয়ে ফোঁটা হয়ে গালের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। তারপর ফিরে এল সে। ফিরে এল সেই পাথরের তৈরি ভাঙা মানুষটার সামনে! সেই ভাঙা স্তূপের জঞ্জালে! ওই পাথরটাকেই জড়িয়ে ধরল বালু। ওই পাথরের মানুষটাকেই! জড়িয়ে ধরে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেলল! এ-কান্নার যেন শেষ নেই।

কিন্তু আবার সকাল হয়েছিল। আবার বালু পাহাড়ের বন থেকে ফুল তুলে আনল। আবার সে পাহাড়তলির উঁচু-নিচু পথে পথে ডালি ভরা সেই ফুল মাথায় নিয়ে হাঁক দিল, “ফুল নেবে, ফুল! রঙিন ফুল!”

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%